প্রিয় নীড়হারা পর্ব-০৪

0
60

#প্রিয়_নীড়হারা
পর্ব: ০৪

দৃতী আজ অনেক সাজগোজ করেছে। এই সাজগোজের কারণ অর্ণিত জানে না। মেয়েরা স্বভাবত কোনো বিশেষ দিনে সাজগোজ করে, এটা তার জানা। তাই আজকে কোন বিশেষদিন তা খুঁজে বের করতে মরিয়া হয়ে উঠল৷

অনেক ভেবেচিন্তে অর্ণিত কল করলো দানিয়াকে৷ ইতিমধ্যে দুই শ্যালিকার সঙ্গে অর্ণিতের বেশ সখ্যতা গড়ে উঠেছে৷ তাই সরাসরি জানতে চাইল,

“তোমার বোন আজকে আলমারি থেকে গাঢ় লাল রঙের একটা শাড়ি বের করেছে। সেই শাড়ি গায়ে জড়িয়ে চোখে মোটা করে কাজল এঁকেছে। ঠোঁটে বোধহয় খানিকটা লিপস্টিকও দিয়েছে৷ লম্বা বেণীর গাঁথন খুলে খোঁপা বেঁধেছে৷ আলগা সেই খোঁপায় একটা গোলাপ শোভাবর্ধন করছে৷”

দানিয়া ঠোঁট চেপে হেসে বলল,

“আপনার তো আজকের ঈদের দিন ভাইয়া৷ চোখের সামনে এমন সৌন্দর্য দেখার সুযোগ পাচ্ছেন৷ এমনিতেই আপু সাজগোজ খুব একটা পছন্দ করে না৷ মেঘ না চাইতেই জল পেয়েছেন, তাতে আপনার খুশি হওয়া উচিত।”

“খুশির থেকে চিন্তা হচ্ছে বেশি৷ এই সাজগোজের রহস্য উদ্ধার করতে পারছি না৷ তোমার সাহায্য প্রয়োজন। আজকে কি কোনো বিশেষ দিন?”

“বিশেষদিন তো বটেই। তবে সেটা আপনাকে বলা যাবে না। আপনি নিজে খুঁজে বের করুন।”

“প্লিজ হেল্প মি, শ্যালিকা সাহেবা৷ বিশেষ দিনটি খুঁজে না পেলে তোমার আপু আশাহত হবে৷ তুমি কি চাও তোমার আপু আশাহত হোক?”

“আপুর সাজগোজের কারণ আপনি নিজে খুঁজে বের করলে আপু বেশি খুশি হবে। খুঁজে না পেলেও খুব একটা সমস্যা হবে না। আমার বোন এতোটাও অভিমানী নয়৷ আপনি হেরে গেলে সে নিজে থেকেই আপনাকে উত্তর জানিয়ে দিবে।”

“তারমানে তুমি আমাকে সাহায্য করবে না?”

“একদম-ই না।”

“কিছু ক্লু অন্তত দেও।”

“উহু।”

“আচ্ছা তবে আমি নিজেই গেস করি। আজ কি তোমার আপুর জন্মদিন?”

“জেনেও এতোক্ষণ ধরে তালবাহানা করছিলেন আপনি!”

“তালবাহানা নয়, শ্যালিকা সাহেবা। শিওর হয়ে নিচ্ছিলাম।”

“শিওর হওয়ার কি আছে?”

“আছে বৈকি! তোমার আপুর বার্থ সাটিফিকেটে জন্ম তারিখ আছে নয় ফেব্রুয়ারী, সেটা আমার মনে আছে। তবে অনেকের বার্থ সাটিফিকেটে ভুল জন্ম তারিখ দেওয়া থাকে৷ তাই শিওর হয়ে নিলাম।”

দানিয়ার সঙ্গে কথা শেষ করে অর্ণিত ঝটপট তৈরি হয়ে নিয়ে বাড়ির বাইরে রওনা হলো৷

আজ শুক্রবার। সরকারি ছুটির দিন৷ অর্ণিতের অফিস বন্ধ থাকা সত্ত্বেও এই ভর দুপুরবেলা অর্ণিতকে বাইরে যেতে দেখে তানিয়া জানতে চাইল,

“রান্নাবান্না শেষের দিকে। একটু পরেই সবাই খেতে বসব। এই অসময়ে আবার কোথায় চললে?”

“জরুরি কাজ আছে, মা। তাড়াতাড়ি ফিরব।”

রান্নাবান্নার পর্ব শেষ করে দৃতী গিয়েছিল গোসলে। ভেজা চুলগুলো তোয়ালেতে মুড়িয়ে বাইরে বের হতেই সামনে দাঁড়ালো অর্ণিত। ও এতো তাড়াতাড়ি ফিরে আসবে দৃতী আশা করেনি৷ তাই খানিকটা হকচকিয়ে গেল।

ভালোভাবে লক্ষ্য করে দেখল, অর্ণিতের মুখে খেলা করছে চোরাহাসি৷ পাশ কাটিয়ে ড্রেসিংটেবিলের দিকে যেতে যেতে দৃতী জানতে চাইল,

“কী ব্যাপার অর্ণিত সাহেব? একা একা হাসছেন কেনো? পেটের ভেতর কোন রহস্য লুকিয়ে ঘুরে বেড়ানো হচ্ছে শুনি।”

মৃদু পায়ে অর্ণিত এসে দাঁড়ালো দৃতীর পেছনে। এক হাতে দৃতীর কোমর জড়িয়ে ধরে কাঁধে চিবুক ঠেকিয়ে বলল,

“লুকানোর চেষ্টা করছ তুমি। তাতে বিশেষ লাভ কিছু হয়নি। তুমি ধরা পড়ে গেছো অথবা আমি বুঝে নিয়েছি।”

ভেজা চুলে মুছতে থাকা হাত দুটো থামিয়ে দৃতী তাকালো আয়নায়৷ চোখ দুটো স্থির হলো অর্ণিতের প্রতিবিম্বে। ভ্রু উঁচু বাক্যের অর্থোদ্ধার চেষ্টা চালাল। বিপরীতে আলতো হেসে পেছনে লুকিয়ে রাখা হাতটি দৃতীর সামনে ধরল অর্ণিত। টকটকে একটি লাল গোলাপ শোভা পাচ্ছে অর্ণিতের হাতে৷

দৃতী অবাক হয়ে তাকালে ওর কানের নিকট মুখ নামিয়ে অর্ণিত ফিসফিসিয়ে বলল,

“শুভ জন্মদিন, দৃতী।”

অপ্রত্যাশিত কিছু পাওয়ার আনন্দে ঝলমল করে উঠল দৃতীর মুখমণ্ডল।

দৃতীকে আনন্দে বিমূঢ় হতে দেখে অর্ণিত বলল,

“জন্মদিন উপলক্ষে কি গিফট চাও বলো৷ আজকে তোমার দিন। সকল ইচ্ছা পূরণের দিন।”

দাঁত দ্বারা ঠোঁট কামড়ে দৃতী কিছুক্ষণ গভীর ভাবনায় বিভোর থাকার ছদ্ম অভিনয় করল। যেনো অভাবনীয় কিছু চেয়ে নিবে এই সুযোগে৷ মুখখানা গম্ভীর করে বলল,

“সংসার জীবনে কখনো একঘেয়েমি এসে গেলে ক্লান্তি দূর করতে এমন হুটহাট সারপ্রাইজ দিতে হবে।”

অর্ণিতও ভ্রু জোড়া কুঞ্চিত করে জবাব দিল,

“ঠিক আছে।”

“প্রতি মাসে একবার ফুচকা খাওয়াতে নিয়ে যেতে হবে।”

ফুচকার প্রতি দৃতীর এই সরল ভালোবাসায় অর্ণিত হেসে ফেলল। বলল,

“নোটেড।”

“এগুলো স্টাটার ছিল। এখন মেইনকোর্সের কথা বলি। আমার সাথে রাগারাগি করা যাবে না। চিৎকার করা যাবে না। ধমক দেওয়া যাবে না। ঝগড়া করা যাবে না। কখনো কিছু ভুল করলে ভালোভাবে বুঝিয়ে বলতে হবে৷ আর অনেক অনেক ভালোবাসতে হবে।”

দৃতীকে নিজের দিকে ফিরিয়ে কোমর জড়িয়ে আরও কাছে টেনে অর্ণিত বলল,

“মেইনকোর্স ডেজার্টের মতো লাগছে কেনো, মিসেস? আমার তো তর সইছে না। ভালোবাসা-বাসি কি এখনি শুরু করে দিবো?”

দৃতী ভীষণ লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিলেও, জবাব দিতে ভুলল না।

“ইশ! শখ কতো! টেবিলে খাবার দিয়েছি। চলুন মা অপেক্ষা করছে।”

_______________

শ্বশুরবাড়িতে জন্মদিন নিয়ে আহ্লাদ করার ধৃষ্টতা দৃতী করেনি। এমনিতেও আগে কখনো ঘটা করে জন্মদিন পালন করা হয়নি। মাঝরাতে দানিয়া, দোয়েল হুড়মুড় করে এসে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতো। দুপুরবেলা মা একটু বেশিই আয়োজন করত। এই ছিল বিশেষ দিনের আয়োজন। তবে এ বছর অর্ণিতকে কাছে পেয়ে কেমন আহ্লাদী হয়ে উঠল মন। আলমারি থেকে সবচেয়ে সুন্দর শাড়িটা বের করে গায়ে জড়িয়ে অন্যদিনের তুলনায় একটু বেশি পরিপাটি হয়ে ঘর ছেড়েছিল দৃতী। অর্ণিতের চোখে মুগ্ধতা দেখতে ভালো লাগছিল। উদ্দেশ্য ছিল, অর্ণিত বুঝে নিক আজকের দিনটি দৃতীর জন্য স্পেশাল। দৃতী ভেবেছিল দিন ফুরিয়ে যাওয়ার আগে অর্ণিতকে জন্মদিনের কথা বলে দিবে৷ কিন্তু অর্ণিত ঠিকই খুঁজে নিয়েছে। ব্যাপারটি বেশ ভালো লাগল দৃতীর। আকাঙ্ক্ষার বেশি পেয়ে তৃপ্ত হলো মন।

তবে দৃতীর অবাক হওয়া তখনো বাকি।

সন্ধ্যার দিকে দরজা এসে কড়া নাড়ল ডেলিভারি ম্যান। দরজা খুলে পার্সেল হাতে নিয়ে দৃতী একটু হতবিহ্বল হয়ে পড়েছিল। প্রথমত নিজের নামে পার্সেল এসেছে, ব্যাপারটি প্রায় অবিশ্বাস্য। নতুন ঠিকানা বন্ধুমহলের কেউ জানে না৷ বাড়ি থেকে কিছু পাঠানোর সম্ভাবনাও নেই৷ বসার ঘরে পৌঁছে পার্সেল খুলতে বসল দৃতী। মোড়ক সরাতেই উন্মোচিত হলো কেকশপের প্যাকেট। কেক পাঠালো কে!

সেই তথ্য জানা গেলো ব্ল্যাক ফরেস্ট কেকের উপরের সাদা অক্ষরের লেখাগুলোর মাঝে।

“শুভ জন্মদিন মিসেস” কথাটি একজনই বলতে পারে। ততোক্ষণে বসার ঘরে এসে হাজির হয়েছে অর্ণিত। বুকের উপর দু হাত ভাঁজ করে দৃতীর দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে।

দৃতী খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে বলল,

“এসবের কী দরকার ছিল! বাবা-মা কী ভাববে বলো তো।”

“কী ভাববে? জন্মদিনে মানুষ কেক কাটবে, মজা করবে। এতে ভাবাভাবির কী আছে?”

“আমি কি এখনো ছোটো খুকি আছি!”

“আমার তো তাই মনে হচ্ছে। বয়স মাত্র একমাস।”

অর্ণিতের বাবা-মাকে দৃতীর কিছু বলতে হলো না। অর্ণিত নিজেই ডেকে এনে জানালো, আজ দৃতীর জন্মদিন। উচ্ছ্বসিত তানিয়া দৃতীকে জড়িয়ে ধরে শুভেচ্ছা জানালো। সিরাজ সাহেব গম্ভীর মুখে যেভাবে “শুভ জন্মদিন” বলল, তাতে দৃতীর অস্বস্তি আরও বাড়ল। শ্বশুরমশাইকে যথাসম্ভব ভয় পায় দৃতী। কলেজের প্রফেসর সিরাজ সাহেবকে আজ পর্যন্ত ও কখনও হাসতে দেখিনি। সদা গম্ভীরমুখের মানুষটিকে দেখলে ভয়ে দৃতীর বুক ঢিপঢিপ করে।

স্কুলের ম্যাথ টিচারকে যেমন ভয় পেতো, তেমনি ভয় পায় সিরাজ সাহেবকে। স্কুলের টিচারের থেকে না হয় একদিন মুক্তি পাওয়া গিয়েছে, কিন্তু নিজ গৃহের এই টিচারের থেকে মুক্তি সম্ভব নয়।

তাই শ্বশুরমশাইয়ের নজর থেকে যথাসম্ভব দূরে থাকার চেষ্টা করে দৃতী।

চলবে..
#অক্ষরময়ী