#প্রিয়_প্রত্যয়
#পর্ব২
#রাউফুন
কোনো ভাবেই মিনহাজ তার মাকে বোঝাতে সক্ষম হলো না। বিউটি কন্ঠে তেজ মিশিয়ে বললো,“সুপ্রিয় ভাই, এই মহিলা যখন আমার শাশুড়ী হবেন না তাহলে কি আর বেশি সম্মান করার দরকার আছে?”
ঠোঁট কামড়ে ধরে সুপ্রিয় চোখে হাসলো। বোঝালো না৷ কারণ ছোটো বেলা থেকেই বিউটির হঠাৎ রেগে যাওয়ার ধাত আছে। ওর নাকের পাটা ফুলতে দেখে বুঝলো এবারেই সঠিক সময়৷ অকাজ টা করেই ছাড়বে। বিউটি হাতের মধ্যে থেকে কালি বের করে শান্তাহারার সামনে গিয়ে শান্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে কালি গুলো মুখে ঘঁষে দিলো। উপস্থিত সবাই হতভম্ব। শান্তাহারা কিছুই বুঝে উঠার আগেই বিউটি সুপ্রিয়র হাত চেপে ধরলো। ছুটতে ছুটতে বললো,“স্যরি রাগী আন্টি। আপনার করা অপমানের ছোট্ট একটা প্রতিশোধ নিয়ে নিলাম।”
শান্তাহারা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে কি হলো তা বোঝার চেষ্টা করছেন। তিঁনি যেনো এখনো ভ্রমের মধ্যে আছে। মিনহাজ মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো পিটপিট করে। আরনাজের এই রূপের কথা তার জানা ছিলো না। রাহেলা আর সামন্ত ওখানেই ছিলো। কিছুক্ষণ সময় ব্যয় হতেই ওঁরা দুজন হো হো করে হেসে উঠলো। চেষ্টা করেও হাসি আঁটকে রাখতে পারলো না তারা। সামন্ত বললো,“মা নানুজি কে ভুতের মতো লাগছে। না না লুল্লুর শাকচুন্নী বউর মতো লাগছে। হিহি!”
রাহেলা ছেলের মুখ চেপে ধরলো এক হাতে। অপর হাতে নিজের মুখও ঢেকে রাখলো! শান্তাহারা রুমের ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখেই এক চিৎকার দিয়ে উঠলেন। মিনহাজ আগে থেকেই কানে হাত চেপে ধরেছিলো। কারণ সে জানে মায়ের চিৎকার নামক বিস্ফোরণ টা এখনই ঘটবে।
সুপ্রিয় আর বিউটি হাঁপাতে হাঁপাতে বললো,“কালি কেনার আইডিয়া টা জোস ছিলো সুপ্রিয় ভাই!”
“এখন তো উনি তোকে আরও অপছন্দ করবেন রে বিউটি। জীবনেও তোকে আর পুত্রবধূ করবে বলে মনে হয় না।”
“না করলে আমার কি? আমি কি ছাই উনার পুত্রের জন্য দিওয়ানা হয়ে বসে আছি? আমি তো জীবদ্দশায় মিনহাজ কে বিয়ে করবো না। সারাজীবন একা কাটাবো প্রয়োজনে। ওমন ডাইনি শাশুড়ী আমার হবে? কখনোই না।”
সুপ্রিয় দেখলো বিউটি কেমন যেনো স্বস্তির সঙ্গে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। ওর মুখের বাম পাশে ঝলসানো। ছোটো বেলা থেকেই মেয়েটা হিজাব ব্যতীত বাড়ি থেকে বের হয়নি। কালো হিজাবের উপরেই ওর মুখে এসিড মা’রা হয়েছিলো। নিকাব পুড়ে মুখের এক পাশে এসিডদগ্ধ হয়। সুপ্রিয় বিউটি নামক এই মেয়েটির মনোবল আর মানসিক শক্তি দেখে সব সময় অবাক হয়। একটু আগেও মনে হচ্ছিলো ভীষণ নড়বড়ে আর ভেঙে গেছে মেয়েটা। অথচ তাঁর জানাতে কিঞ্চিৎ ভুল ছিলো। মানসিক ভাবে স্ট্রং না হলে এতো কিছু সামলে উঠতে পারতো একটা মেয়ে?
“চল বাড়ি চল। বাড়ির সবাই ভীষণ চিন্তায় আছে!”
“এখনি যাবো না৷ তুমি আমাকে এখন ফুচকা খাওয়াবে। একদম ফাটাফাটি ঝাল দিয়ে। যেনো কান দিয়ে ধোঁয়া আর নাক দিয়ে সর্দি বের হয় ঝালে।”
সুপ্রিয় হেসে ফেললো। বললো,“গাধী, এই সময় ফুচকা কই পাবো? রাতে খাওয়াবো চল আগে বাড়ি যাই।”
“নাহ সুপ্রিয় ভাই, আমি যখন বলেছি এখনই খাবো তার মানে এখনি।”
“তোর সাজ দেখেছিস? এই অবস্থায় যদি ফুচকা খেতে নিয়ে যাই তোকে, লোকে বলবে তোকে আমি ভাগিয়ে এনেছি। গণধোলাই খাওয়ার ইচ্ছে আমার নাই।”
“তা ঠিক। তবে কবে খাওয়াবে বলো?”
“আজই খাওয়াবো। আগে বাড়ি গিয়ে এসব শাড়ী ফাড়ী ছাড়, ফ্রেশ হয়ে তার আনবো।”
“পাক্কা!”
“ইয়্যেহ্ পাক্কা প্রমিস!”
বিউটি হাসলো। বিনিময়ে সুপ্রিয়ও হাসলো।
ওরা দুজনেই বাড়ি ফিরে আসার পরও পুরো পরিস্থিতি ছিলো অন্য রকম। ড্রয়িং রুমের সামনে এসে দেখল, তার বাবা মোজাম্মেল আহমেদ হাশেম আলীর পাশে বসে আছেন। হাশেম আলী একরকম ভেঙে পড়েছেন, চোখে লজ্জা আর অপমানের ছাপ স্পষ্ট।
মোজাম্মেল আহমেদ সুপ্রিয়কে কাছে ডাকলেন। সুপ্রিয় বুঝলো অনেক জরুরি কথা।
”সুপ্রিয়, আমার একটু শোনো দেখি।”
তার বাবা একদম জরুরি কথা বলার সময়ই তুমি সম্বোধন করেন। সে বিউটিকে ইশারা করলো ঘরে গিয়ে ফ্রেশ হতে। সে ঘরে যেতে নিলে মোজাম্মেল আহমেদ বললেন,“মা আরনাজ তুমি বসো এখানেই।”
বিউটি বাধ্য মেয়ের মতো গিয়ে সোফায় বসলো। হঠাৎই বুকের কেমন ধকধক করতে লাগলো। মনে হচ্ছে আজ ভয়ংকর কিছু হতে যাচ্ছে। যখনই তার বুকের মধ্যে এমন ধকধক করে তখনই তার সঙ্গে জীবনের বড়ো বড়ো বিপর্যয় গুলো চোখের নিমিষেই ঘটে যায়। সুপ্রিয় বাবার দিকে তাকিয়ে রইলো।
সুপ্রিয় এগিয়ে এসে বলল, “ হ্যাঁ বাবা, বলো।”
মোজাম্মেল আহমেদ তার ছেলের হাত শক্ত করে ধরে বললেন, “তুই জানিস, হাশেম আমার ছোট ভাই। আজকে যা হয়েছে, তাতে আমাদের মান-সম্মান মাটিতে মিশে গেছে। আরনাজের মতো একটা মেয়ে এই অপমানের যোগ্য নয়। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে একটাই উপায় আছে আমাদের মান-সম্মান রক্ষা করার। উপায় হলো তুই আরনাজের দায়িত্ব নে। একটা স্বীকৃতি আমার মেয়েটার দরকার, একটা অবলম্বন দরকার৷ যা কেবলই তুই পারবি।”
সুপ্রিয়র মাথায় যেনো আকাশ ভেঙে পড়লো। অবাক হয়ে বলল, “কী বলছো এসব বাবা? ভেবে বলছো?”
মোজাম্মেল গভীর দৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুই আরনাজকে বিয়ে কর। তোর মতো ছেলে ওর পাশে দাঁড়ালে আরনাজ আবার আত্মবিশ্বাস ফিরে পাবে। এটা শুধু হাশেমের সম্মান রক্ষা নয়, আমাদের পরিবারেরও মর্যাদা রক্ষা। আমি জানি, এটা হঠাৎ করে বলছি। কিন্তু তুই আমার ছেলে, আমি জানি তুই এই দায়িত্ব নিতে পারবি।”
সুপ্রিয় কিছুক্ষণ চুপ রইল। তার মনে নানা প্রশ্ন, কিন্তু তার বাবার প্রতিটি কথা যেন পাথরের মতো ভারী শোনাচ্ছে তার নিকট। সে বলল, “বাবা, এটা এত সহজ নয়। আমি আরনাজকে কখনো সেভাবে ভাবিনি। আর বিয়ের জন্য তো দু’পক্ষের ইচ্ছা থাকতে হয়।”
হাশেম আলী কাঁপা গলায় বললেন, “সুপ্রিয়, আমি জানি, এটা তোমার জন্য মানা কঠিন। একজন অসহায় পিতার তোমার কাছে অন্যায়, অযাচিত আবদার। কিন্তু আমার মেয়ে যদি তোমার মতো কারো সঙ্গে জীবন শুরু করতে পারে, তাহলে আমি নিশ্চিত থাকব, সে সুখে থাকবে। তুমি শুধু আমার বড়ো ভাইয়ের ছেলে না, তুমি আমার নিজের ছেলের মতো। প্লিজ, আমাকে এই শেষ অবধি ভেঙে যেতে দিও না।”
সুপ্রিয় কিছুক্ষণ পাথরের মূর্তির মতো চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল। তার সামনে বাবার সম্মান, চাচা হাশেম আলীর আকুতি আর আরনাজের কষ্ট মিশ্রিত মুখ। সে অবশেষে গভীর শ্বাস নিয়ে বলল, “ঠিক আছে, বাবা। আমি বিয়েতে রাজি।”
সুপ্রিয়র এই সিদ্ধান্তে সবাই অবাক হয়ে গেল। আরনাজ এই সিদ্ধান্ত শুনে হতবাক হলো। কারণ সে ভাবছিলো সুপ্রিয় এই প্রস্তাব নিঃসন্দেহে নাকোচ করবে। সে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “তুমি কেন রাজি হচ্ছো সুপ্রিয় ভাই? এটা অন্যায়। তোমাকে এটা করতে হবে না। প্লিজ ডোন্ট ডু দিস! আই ওন্ট বি এ্যাইবল টু হ্যান্ডেল সাচ্ আ’ বিলো।”
সুপ্রিয় শান্তভাবে বলল, “বিউটি, আমি এটা করছি কারণ আমি জানি, এটা সঠিক। তোর জন্য, আমাদের পরিবারের জন্য, সবার সম্মানের জন্য।”
বিউটি স্থিরচিত্তে বাবার দিকে তাকিয়ে রইলো। চাপা অভিমানে নাকের পাটা ফুলে ফুলে উঠছে তার। তার জীবনের কোনো একটা সিদ্ধান্তও কি সে নিজের মতো করে নিতে পারবে না? মোজাম্মেল আহমেদ দ্রুত বিয়ের আয়োজন করতে বললেন। সবার মধ্যে উত্তেজনা আর কিছুটা সংশয়ও ছিল। তবে বিয়ের মঞ্চে গিয়ে যখন সুপ্রিয় আর বিউটি একসঙ্গে দাঁড়াল, তখন সবার মুখে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল।
কাজি সাহেবকে মোজাম্মেল আহমেদ বেশি হাদিয়া দেওয়ার কথা বলে আঁটকে রেখেছিলেন। আসার পথে তাঁদের গাড়ি খারাপ হওয়াই বিয়েতে আসতে বিলম্ব হয় তাঁর। উপরন্তু তাঁর বৃদ্ধা শাশুড়ী অসুস্থ। ওখানে উনার স্ত্রীকে বিয়ে তে আসার জন্য রাজি করাতে চেয়েও পারেন নি। আর এখানে আসার পর ঘটনার আদ্যোপান্ত শুনেই তিঁনি মনে মনে সিদ্ধান্ত নেন সুপ্রিয়র সঙ্গেই বিউটির বিয়ে দেবেন। এভাবে কিছুতেই বিউটিকে আর ভেঙে যেতে দেবেন না। ছোটো বেলা থেকেই এই মেয়েটাকে নিজের মেয়ের চেয়েও বেশি স্নেহ করে এসেছেন। একটা মেয়ের জন্য তো কম আশা করেন নি। যখন ভাইয়ের মেয়ে হলো তখনই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এই মেয়েটাকে তিনি নিজের কাছে রাখবেন। কিন্তু ভাই ভাই বিরোধ হতে পারে এটা ভেবেই কথা বাড়ান নি। তবুও একবার বলার জন্য উম্মুখ হয়েছিলেন কিন্তু তখনই বিউটির বিয়ের খবর পান তিনি। যদিও এতে মনে মনে ব্যথিত হোন খুব। কিন্তু যখন সুযোগ পেয়েছেন তখন তার সঠিক ব্যবহার করলেন।
সুপ্রিয় বিউটির দিকে তাকিয়ে সন্তপর্ণে বললো,“জীবনে এক সঙ্গে থাকার জন্য ঠিক কতো কদম এক সঙ্গে পথ চলতে হয়? সহধর্মীকে ঠিক কতটা এফোর্ট দেওয়া প্রয়োজন?”
বিউটি তাকালো সপ্রিয়র দিকে। সে জানে, এই বিয়ে হয়তো তার জীবনে অপ্রত্যাশিত ছিল, কিন্তু সুপ্রিয়র মতো একজন মানুষ তার জীবনে ছিলো ভাবতেই গায়ে কা’টা দিয়ে উঠলো। কিছু সময়ের ব্যবধানে কি থেকে কি হয়ে গেলো তার জীবনে?
#চলবে