#প্রিয়_প্রত্যয়
#পর্ব৩
#রাউফুন
বিয়ের মঞ্চের কোলাহল ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে এলো। বিউটির মুখে এক অদ্ভুত শূন্যতা। বিদায়ের ক্ষণে সবার চাহনির মাঝে সে একান্তে নিজের কাঁন্নাকে সামলানোর চেষ্টা করছিল। অভিমানে বাবার দিকে তাকাল না। হাশেম আলী কাঁপা কাঁপা হাতে মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন। কিছু বলতে গিয়েও যেন শব্দ আটকে গেল গলায়। বিউটি চুপচাপ, চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। কন্যাদানের এই মুহূর্ত তাকে আরও একা করে দিচ্ছে।
“মা, তুমি আব্বুর উপর অভিমান করো না। আব্বুর সঙ্গে একটু কথা বলো মা, আমার যে বুকটা ভেঙে যাচ্ছে তোমার ক্লেশিত মুখটা দেখে। ক্ষমা কর, মা। আমি তোর জন্য কিছুই করতে পারলাম না।”
বিউটি কোনো উত্তর দেয় না। কেবল বুক ভাঙা ব্যথা আড়াল করে বাবা-মায়ের সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। সে যেন সবকিছু মেনে নিয়েছে, তার ভেতরের ব্যথারা পাথরের মতো জমে আছে।
সুপ্রিয় বিদায়ের সময় নিজের মধ্যেও দ্বিধা অনুভব করছিল, বিয়ের সিদ্ধান্ত টা নেওয়া তার কাছে এখন হঠকারিতা মনে হচ্ছে। এভাবে হুট করেই হ্যাঁ বলে ফেলা উচিত হয়নি৷ কিন্তু সেসময় কিই বা করতে পারতো? তার বাবার তাকে করা অনুরোধ। হাত ধরে যখন অনুরোধ করছিলো সে কিভাবে অমত করতো? আদৌও সম্ভব হতো তার পক্ষে? বিউটি এতদিন তার কাছে বোনের মতো ছিল। হঠাৎ করেই এই সম্পর্কেরপরিবর্তন তাকে একেবারে নতুন পরিস্থিতিতে ফেলেছে। সে না পারছে বিউটির মুখের দিকে তাকাতে না পারছে নিজের বিবেকের কাছে ধরা দিতে। সব দিক থেকেই অসহ্য লাগছে তার।
বিউটির ছোট ছোট পায়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে যাওয়া দেখে সুপ্রিয় এক অজানা অস্বস্তি অনুভব করল। গাড়িতে বসার পর বিউটি তার শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছছিল। সুপ্রিয় সামনে তাকিয়ে রইল চুপচাপ।
যেতে যেতে সুপ্রিয় হঠাৎই বললো,“ড্রাইভার চাচা সামনে গাড়ি থামাবেন প্লিজ!”
“আইচ্ছা আব্বা!” মহসিন মিয়া হেসে বললো। ছোটো বেলা থেকেই সুপ্রিয় এই মানুষ টাকে পাশে পেয়েছে। তার হাত ধরেই বড়ো হওয়া সুপ্রিয়র। স্কুলে যেখানে নিজের পিতা মাতা নিয়ে যায় সন্তানকে সেখানে মহসিন মিয়া নামক এই মানুষ টাই তাকে বেশির ভাগ সময় স্কুলে হাত ধরে নিয়ে যেতো আসতো। সুপ্রিয়কে কখনোই আব্বা ডাকটা ছাড়া কথা বলতে শুনেনি সে। মহসিন মিয়া গাড়ির মিররে বিউটিকে দেখে বললো,“আম্মা, আপ্নে এ্যামনে মুখ গোমড়া করে রাখবেন না। আমার আব্বাজান কিন্তু ম্যালা ভালা মানুষ। যহন একবার দায়িত্ব নিছে সে, তহন আপনের জন্যি সব করবার পারবে। শুধু সময়ের ব্যাপার আম্মা!”
বিউটি নিষ্পলক চোখে তাকালো সুপ্রিয়র দিকে। সুপ্রিয়র কোনো ভাবান্তর নেই। গাড়ি থামলো একটা স্থানে। সে আলগোছে গাড়ি থেকে নেমে গাড়ির দরজা খুলে দিয়ে বিউটিকে বললো,“নাম।”
”এখানে কেন?”
“নাম আগে। নামলেই দেখতে পাবি!”
বিউটি নামলো। সামনেই তাকিয়ে দেখলো ফুচকার স্টল। বিউটির মনে পড়লো সন্ধ্যায় বলা কথা। তখন তাঁরা ছিলো অন্য একটা সম্পর্কে। আর এখন তাদেএ সম্পর্কের মোর নিয়েছে অন্য। কি অদ্ভুত তাই না? বিউটি স্বগতোক্তি করলো,“খাবো না আমি এখন!”
“কথা দিয়েছিলাম খাওয়াবো। আমি আমার কথা রাখি।”
“আচ্ছা?”
“হু!”
“ঠিক আছে!”
বিউটি ফুচকার দোকানের সামনে এগিয়ে গেলো। সুপ্রিয় ফুচকার প্লেট এনে সামনে ধরলো। বড্ড শীত লাগছে বিউটির। হাড়গোড় যেনো কাঁপছে। সুপ্রিয় তা লক্ষ্য করেছে। শরীরে থাকা জ্যাকেট খুলে পড়ালো বিউটিকে। বিউটি এক পলক তাকিয়ে বললো,“শীত কি শুধু মেয়েদের লাগে?”
“বেশি কথা না বলে ফুচকা খা!”
বিউটি দুটো ফুচকা খেতেই লক্ষ্য করলো সুপ্রিয় শীতে এক হাত অন্য হাতের সঙ্গে ঘঁষছে যেনো হাত উষ্ণ হয়। মৃদু কাঁপছেও। শীত প্রচন্ড পড়েছে। রাত নয়টার মধ্যে শীত বাড়বে এটা স্বাভাবিক ব্যাপার। সুপ্রিয় কোনো ভাবেই বুঝতে দিতে চাইছে না কিন্তু এই শীতে কি কুলানো যায়? বিউটির আর ফুচকা খেতে ইচ্ছে করছে না। সময়টাই অত্যন্ত অস্বস্তিকর।
“আর খেতে পারবো না।”
“দম শেষ? এই বলিস তুই এক নিমিষেই দু তিন প্লেট ফুচকা খেতে পারিস?”
“আজ পারছি না।”
সুপ্রিয় কিছু বললো না। এক পলক তাকালো শুধু বিউটির দিকে। বিয়ের এক দিন আগে থেকেই নাকি মেয়েরা ভালো ভাবে খেতে পারে না। আচ্ছা বিউটিও কি সেজন্য খেতে পারছে না? কিন্তু তাদের বিয়েটা তো অন্যান্য স্বাভাবিক বিয়ে নয়। একটা গুমোট ভাব যেনো এসে ভড় করলো দুজনের মধ্যে। গাড়িতে গিয়ে উঠে বসলো ওরা। বিউটি নিজের শরীর থেকে জ্যাকেট সরিয়ে সুপ্রিয়র দিকে বাড়িয়ে দিলো। বললো,“গাড়িতে শীত লাগছে না আমার।”
সুপ্রিয় জ্যাকেট টা নিলো। বিউটি যখন সুপ্রিয়র বাড়িতে পৌঁছাল, মহিমা বেগম তাদের দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। মুখে হাসি থাকলেও তা যে পুরোপুরি আন্তরিক নয়, তা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। এখানে আসার পূর্বেই মোজাম্মেল আহমেদ সবকিছুই জানিয়ে দিয়েছেন তাদের বিয়ের ব্যাপারটা। মহিমা বেগম না চাইতেও ব্যাপারটা হজম করতে কষ্ট হচ্ছে।
“বিউটি, ঘরে আয়।”
বিউটি কিছু না বলে পা বাড়াল। মহিমা বেগমের কণ্ঠে অম্লতার উপস্থিতি বিউটির মনে হালকা আঘাত হানল।
“ঘরে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নে। আমি হালকা পোশাক পাঠাচ্ছি। ভাড়ী পোশাক পড়ে তো থাকতে পারবি না!”
বিউটি মাথা দোলালো। সুপ্রিয় চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। মায়ের দিকে তাকাচ্ছে না একটিবারের জন্যও। বিউটি রুমে প্রবেশ করে, কিন্তু তার মন ভারাক্রান্ত। সে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল, রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে নিজের মনে বলতে লাগলো,
“এতদিন যে মানুষটা ভাইয়ের মতো ছিল, আজ সেই মানুষটা আমার স্বামী হয়ে গেল। আমি কি এই সম্পর্কে টা মানিয়ে নিয়ে চলতে পারব? হাহ্ কি নিয়তি আমার! এ যেনো এক পুতুল খেলা হচ্ছে আমার জীবনের সঙ্গে।”
সুপ্রিয় রুমে এসে বিউটিকে না দেখে বারান্দায় গেল। সে একটুক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখল বিউটি আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। শব্দ পেয়ে বিউটি রুমে আসতে নিলে সুপ্রিয় তারাহুরো করে বললো,
“প্লিজ বারান্দাতেই থাক! আমি একটু একা থাকতে চাই।”
বিউটি জানে না সুপ্রিয়র এই কথাতে কি ছিলো। কিন্তু সে সুক্ষ্ম একটা ব্যথা অনুভব করলো বক্ষমাঝে। বিউটি নড়লো না। ঠাই দাঁড়িয়ে রইলো, অদ্ভুত এই ব্যথা টা এমন অসহ্য কেন? একেবারে অসহনীয়।বারান্দার দরজা টা ধপাস করে আটকে দিলো সুপ্রিয়। রুমের সব জিনিসপত্র ছুড়ে মারলো ফ্লোরে। সবকিছুই ছিন্নমূলের মতো পড়ে রইলো। রাগে মাথা দপদপ করছে। কোনো শব্দ বারান্দায় যাবে না। রুম সাউন্ড প্রুফ। তাই বিউটি কোনো শব্দ পাবে না। জানালাও লাগানো। উদ্ভ্রান্তের মতো সবকিছু ছুড়ে ফেলতে ফেলতে বললো,
“যাকে ছোটো বেলা থেকে বোনের মতো মনে করে এসেছি তাকে জীবন সঙ্গী হিসেবে মানবো কি করে? আয়ায়ায়ায়াঃ নিতে পারছি না আমি এসব। সব অসহ্য লাগছে। ঐ সিচুয়েশনে আমার কি করা উচিত ছিলো? আবারও বিয়েতে অমত করে মেয়েটাকে ভঙ্গুর করে দেওয়া উচিত ছিলো? তাহলে যদি বিউটির মনোভাব এমন হতো যে সেও উপরে উপরে ভালো চাইছে, সেও অন্যদের মতো তাকে ট্রিট করছে, দয়া দেখাচ্ছে, ওর ফেসের জন্য? এতো দোনামোনা, সংশয় আমি নিতে পারছি না এক সঙ্গে।”
ফ্লোরে বসলো সে। এক হাত খাটের উপর রেখে এক এক পায়ের উপর অন্য হাত রেখে অপর পা ছড়িয়ে দিয়ে বসে আছে সে। কেটে গেলো অনেকটা সময়। চোখ বন্ধ করেই এসব ভাবতে ভাবতেই তার মনে পড়লো আরও একটা ভুল সে করেছে তা হলো বিউটিকে রুম আসতে না বলে বারান্দায় থাকতে বলা। শিট! সে উঠে দাঁড়িয়ে দেয়ালে একটা প্রকাণ্ড ঘুষি মারলো৷ ব্যথাও পেলো হাতের অগ্রভাগে। জলদি করে রুমের সবকিছু ঠিক করলো৷ কিছু একটা করতে হবে যেনো বিউটির তার প্রতি বিরূপ ধারণা না হয়। ঘরটা পরিষ্কার করে দৌড়ে গিয়ে বাগান থেকে গোলাপ আর গাদা ফুল নিয়ে এলো। বিদেশ থেকে আনা অর্কিড গাছ থেকে অর্কিড ছিড়ে আনলো। অথচ এই ফুল কতোই না যত্নের তার৷ কাউকে হাত অব্দি লাগাতে দেয় না সে ফুলে৷ আজ কি নির্দয়ের মতো সেসব ছিড়ে ফেলছে সে। রুমে এসে সবকিছু সুন্দর করে সাজালো। ফ্লাওয়ার ভাসে টাটকা ফুল রাখলো। কোনো রকমে সাজানো হল্র এরপর বিউটির বারান্দায় গিয়ে বিউটিকে ডাকলো। দরজা খুলে দেখলো বিউটি গুটিশুটি মেরে বসে আছে৷ শীত নিবারনের জন্য পরিহিত শাড়ী পেঁচিয়েছে শরীরে। তবুও মৃদু কাঁপছে। সে অল্প স্বরে ডাকলো,
“বিউটি, এই বিউটি ঘরে আয়!”
“হ্যাঁ? কেন?”
“এখানে বসে থাকিস না প্লিজ? আমি আসলে কথাটা ওভাবে বলিনি! এক্সট্রেমলি স্যরি।”
“আমি এখানেই ঠিক আছি।”
সুপ্রিয় তার কণ্ঠে বিষণ্ণতার ছাঁয়া বুঝতে পারে।
“চল, ভেতরে চল। বারান্দায় ঠাণ্ডা পড়ছে।”
সুপ্রিয় বিউটির হাত ধরে রুমে নিয়ে এল। রুমে ঢুকেই অবাক হলো বিউটি। রুম সাজাচ্ছিল সুপ্রিয় ভাই? আর সে কি না কি ভাবছিলো এতক্ষণ। সবকিছু স্বাভাবিক করতে চাইছে নাকি অন্যান্য পুরুষদের মতোই নিজের চাহিদা, ছিঃ ছিঃ সুপ্রিয় ভাইয়ের সম্পর্কে এসব সে কি ভাবছে? সুপ্রিয় ইতস্তত করতে করতে বললো,
”আমার আনাড়ি হাতে সাজানো তো, ভালো হয়নি তেমন! পরে আবার সুন্দর করে সাজাবো হা?”
বিউটি অশ্রুসিক্ত লোচনে তাকালো সুপ্রিয় দিকে।
বিউটির চাহনি উপেক্ষা করে খাবার প্লেট নিয়ে তার সামনে রাখল। রুমটা সাজিয়েও তার অস্বস্তি বোধ হচ্ছে। কি জানি কি সব আবোল তাবোল করছে। রুম সাজানোর ফলে আবার উল্টো পালটা চিন্তা মাথায় না এনে বসে মেয়েটা। সুপ্রিয় ছটফট করতে করতে বললো,
“খাওয়ার সময় হয়েছে। চাচি ফোন করে বললেন, তুই সারাদিনে কিছুই খাসনি।”
“আমি খেতে পারব না।”
সুপ্রিয় একগাল ভাত তুলে তার দিকে বাড়িয়ে দিল,
“একটু খা। আজ থেকে এই সম্পর্কটা আমাদের দুজনের। যত সমস্যা থাক, একসঙ্গে সব ঠিক করব, হ্যাঁ তোর আর আমার দুজনের মেনে নিতে একটু সময় লাগবে কিন্তু যেহেতু বিয়েটা হয়েছে তাই আগে কে কাকে কি নজরে দেখেছি সেটা ভুলে যা।”
বিউটি কোনো উত্তর না দিয়ে চোখ মুছল। সুপ্রিয় তখন আরও একবার বলল,
“বিউটি, আমরাই আমাদের সম্পর্কের ভিত্তি মজবুত হয়েছে একটি পবিত্র শব্দের মাধ্যমে। আমি কবুল শব্দটাকে আমাদের সম্পর্কের মতোই পবিত্র মনে করি। আমি জানি, সবকিছু হঠাৎ হয়ে গেছে। কিন্তু চেষ্টা করব আমাদের ছোট্ট সংসারটা সুন্দর করে গড়ে তুলতে।”
বিউটি অল্প মাথা নত করে ভাত খেতে শুরু করল। সুপ্রিয়ের মনে থাকা দ্বিধাগুলো একটু একটু করে দূর করার প্রয়াস চালাচ্ছিলো। নিজের দায়িত্ব সে প্রানপনে পালন করে যাবে।
#চলবে