#প্রিয়_প্রত্যয়
#পর্ব৪
#রাউফুন
বাসর রাতে কে কাজ করে? সুপ্রিয় ল্যাপটপে বসে এক মনে কাজ করছে। বিউটির ভেতরটা অদ্ভুত ছটফট করছে। একবার বিছানা, তো একবার কর্মে ব্যস্ত থাকা সুপ্রিয়র দিকে তাকাচ্ছে। রাত গভীর হতে লাগল। বিউটি বারবার বিছানার দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগল, সে কোথায় শোবে? নতুন পরিবেশ, নতুন সম্পর্ক—সবকিছু মিলিয়ে অস্বস্তি যেন তাকে গ্রাস করছে। বিউটির মনের দ্বিধাটা সুপ্রিয় বুঝতে পারল। ল্যাপটপ থেকে একবার মাথা তুলে বিউটির মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“সিনেমার মতো একজন বিছানায় আরেকজন ফ্লোরে ঘুমাবে—এমন কোনো নাটকীয় চিন্তা মাথায় আনিস না। কারণ আমি নিজেও সোফায় ঘুমাব না, আর তোকেও ঘুমাতে দেব না।”
সুপ্রিয়র সরল কথায় বিউটির চোখ বড় হয়ে গেল। তার মনের কথা এই মানুষ টা বুঝলো কিভাবে? মন পড়তে জানে নাকি? সে হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল তার দিকে। মুখে কিছু বলল না, শুধু অস্বস্তি মেশানো এক মৃদু হাসি দিল ক্যাবলাকান্তের মতো।
সুপ্রিয় ল্যাপটপে চোখ রেখেই আবার বিউটির দিকে তাকিয়ে বলল, “তোর হাসি দেখে মনে হচ্ছে, তুই ভাবছিস আমি মজা করছি। কিন্তু আমি সিরিয়াস, বিউটি। আমি আমার নতুন বউকে একা রেখে আর কোথাও ঘুমাব না। তুই আমার পাশে ঘুমোবি, আর আমিও তোর পাশেই ঘুমাব—দুইজনই থাকব একসঙ্গে।”
বিউটি কিছু বলল না। কেবল তার কানে “বউ” সম্বোধন টা বাজতে লাগলো সাইরেনের মতো। কি আশ্চর্য বিয়ে হয়েছে কয়েক ঘন্টা হলো। যেনো সবকিছুই বদলে গেছে। কি অবলীলায় বউ সম্বোধন করছে মানুষটা। এদিকে সে অস্বস্তিতে গাট হয়ে আছে প্রতিটি মূহুর্তে। তার ভেতরের বিব্রতবোধটা মুখে স্পষ্ট। সে জানত না কীভাবে তার অনুভূতি প্রকাশ করবে। বিউটির এক ধ্যানে তাকিয়ে থাকাই সুপ্রিয়র কাজে ব্যাঘাত ঘটলো। একটু আগে সে কি বলেছে বুঝতে পেরে এবারে সুপ্রিয়ও খানিক অস্বস্তি বোধ করল, এভাবে বউ বলে ফেলায়। কারণ সে বিউটিকে এতদিন বোনের মতোই দেখেছে। কিন্তু এখন তাদের সম্পর্কের নতুন রূপ এই অস্বস্তি আরও বাড়িয়ে তুলছিল।
কিছুক্ষণ পর দুজনেই বিছানায় শুতে গেল। কেউ কিছু বলছে না, কিন্তু বোঝা যাচ্ছিল দুজনেই বিব্রত। এপিঠ ওপিঠ করেও কোনো ভাবেই ঘুমাতে পারলো না সুপ্রিয়। বিউটিও নড়ছে, সেটা বুঝতে পারলো সুপ্রিয়। চুপচাপ বিছানায় শুয়ে ফ্যানের দিকে তাকিয়ে বলল,
“বিউটি, তুই কি ঘুমাচ্ছিস?”
বিউটি মুখ ফিরিয়ে মৃদু স্বরে বলল, “না। ঘুম আসছে না।”
“একটা কথা বলবো?”
“বলো!”
“কিছু মনে করবি না তো?”
বিউটির বুকের মধ্যে ধ্বক করে উঠলো। কি এমন বলতে চাইছে সুপ্রিয় ভাই তাকে, যে এভাবে অনুমতি চাইছে। যতোই একটা পুরুষ মানুষ তো। উপরন্তু মানুষ টা তার এখন স্বামী। পূর্বে যেমন সম্পর্কই থাকুক না কেন এখন তো সেটা বদলে অন্য রূপ নিয়েছে। যদি তার কাছে স্বামীর অধিকার চেয়ে বসে সে তো মানা করার মতো কোনো শব্দ পাবে না। কারণ তাকে স্পর্শ করার পূর্ন অধিকার আছে মানুষটার। তার আকাশ পাতাল চিন্তার মধ্যেই
সুপ্রিয় হেসে বলল,“ লুডু খেলবি? ফোনে?”
বিউটি একটু অবাক হয়ে তাকাল। তার আঁটকে রাখা দমটা যেনো ফোস করে বেরিয়ে এলো। উফ এতক্ষণ কি চিন্তাটাই না সে করলো। মনে মনে নিজেকে কত গুলো গালি দিলো সে। সুপ্রিয় অদ্ভুত ভাবে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। সে হেসে বলল, “তুমি মজা করছ, তাই না? এতো রাতে লুডু খেলবে?”
“সত্যি বলছি, বাসর রাতে বর বউ লুডু খেলবো, ব্যাপারটা কেমন না? তাই অনুমতি নিলাম। লুডু খেলে দেখি কে জেতে। আমি একদম হারি না কারোর কাছেই, এটা জানিস তো? দেখি তুই আমারবসঙ্গে পারিস কি না।”
বিউটি মুচকি হেসে রাজি হয়ে গেল। তারা লুডু খেলতে শুরু করল। খেলার মধ্যে হাসি-ঠাট্টা চলতে লাগল। দুজনেই যেন ভুলে গেল যে তারা একে অপরের জন্য কতটা নতুন। দুবার ই বিউটি জিতেছে। সুপ্রিয় প্রতিবার হেরে কটমট করে তাকাচ্ছিলো তার দিকে। বিউটি ব্যাপারটা বেশ এনজয় করছিলো৷ বিউটির জেতার আগ্রহ ছিলো না, কিন্তু এখন আগ্রহ হচ্ছে বার বার সুপ্রিয়কে হারতে দেখে। তৃতীয় বার খেলা শুরু করার আগে ফজরের আজান কানে লাগলো। এতক্ষণ খেলেছে তারা? যেহেতু অনেক্ষণ ধরে একেকটা দান খেলেছে সেজন্য এতোটা সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে তারা বুঝতেই পারেনি।
ফজরের নামাজের আজান শুনে বিউটি উঠে পড়ল। সুপ্রিয় তাকিয়ে বলল, “তুই নামাজ পড়বি? ঠিক আছে, আমি মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ব।”
সুপ্রিয় মসজিদে চলে গেল, আর বিউটি নিজে নামাজে মন দিল।
নামাজ শেষ করে সুপ্রিয় ওয়ার্ক আউট করেই ফিরেছে। ক্লান্ত শরীরে জড়ানো টি-শার্ট টি ঘামে অল্প অল্প ভেজা। সুপ্রিয় এসেই কোনো দিকে না তাকিয়ে গোসল করতে গেল। অফিসের জন্য তাড়াহুড়ো করছিল সে। গোসল শেষ করে সাধারণ অভ্যাস অনুযায়ী, তোয়ালে পেঁচিয়ে অর্ধনগ্ন অবস্থায় রুমে ঢুকল। কিন্তু মনে ছিল না, সে এখন বিবাহিত।
বিউটি তখন সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে ছিলো। সুপ্রিয় এসেছে দেখে রুমে ঢুকে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইলো। ওয়াশরুমের দরজা খোলার শব্দে বিউটি তাকালো। সুপ্রিয় দরজা ঠেলে রুমের ভেতরে ঢুকতেই তোয়ালেটা প্রায় অর্ধেক পড়ে গেল। বিউটি হকচকিয়ে, হতচকিত, হতভম্ব হয়ে পেছন ফিরে তাকানোর কথায় ভুলে গেলো। সুপ্রিয় নিজের দিকে একবার তো আরেকবার বিউটির দিকে তাকালো। অতঃপর দুজনেই চিৎকার করে উঠলো।
সুপ্রিয় এক মুহূর্তে চমকে উঠে দৌড়ে ওয়াশরুমের দিকে ছুটল। বিউটির চোখে বিস্ময় আর লজ্জা স্পষ্ট। সে বিছানার উপর চিৎপটাং হয়ে পড়ে গেলো৷ চোখে তার এখনো এক আকাশসম বিস্ময়। এখনো ভুলতে পারছে না বিষয়টি।
কিছুক্ষণ পর ওয়াশরুম থেকে মাথা বের করে সুপ্রিয় বলল,
“কিছু দেখিস নি তো, বিউটি?”
“কি?”
“সত্যি কথা বল!”
“সত্যি বললে কি দেবে?”
“যা চাইবি তাই দেবো!”
বিউটি ঠোঁট কামড়ে বলল, “আমি একদম সম্মুখে ছিলাম, কিছু না দেখার কথা কি?”
সুপ্রিয় অপ্রস্তুত হয়ে বলল,“এখন থেকে খুব সাবধানে থাকতে হবে, এই বাড়িতে এমন বিব্রতকর পরিস্থিতি বারবার হয় কি না কে জানে! আমি এখন পরাধীন হয়ে চলবো। ধ্যাৎ!”
সুপ্রিয় ঠোঁট বেকিয়ে নিচে চলে গেলো। বিউটি লজ্জায় হেসে ফেলল।
তখনকার অপ্রাকৃতস্থ ঘটনার পর বিউটি আর সুপ্রিয় দুজনেই নিজেদের কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। তবে সুপ্রিয়র যেনো বারবার তখনকার ঘটনার কথা মনে পড়ছিলো। সে ভেতরে ভেতরে নিজের অনুভূতিগুলো নিয়ে দ্বিধায় পড়ে গেল। বিউটি তো তার কবুল বলা বউ, একদিন না একদিন তো সবকিছু স্বাভাবিক করতেই হতো। ঐ ঘটনা নিয়ে এতো ভাবার তো কিছু নেই। কিন্তু সে কোনো ভাবেই লজ্জায় যেতে পারছিলো না বিউটির সামনে। মনে মনে ভাবতে লাগলো,
‘‘আমি কি বিউটিকে সত্যিই মেনে নিতে পারব? এতদিন তো ওকে ছোট বোনের মতো দেখেছি। এখন হঠাৎ এই নতুন সম্পর্ক—কীভাবে সামলাবো?’’ এই চিন্তা তাকে অস্থির করে তুলছিল।
সকালের খাবারের সময় মহিমা বেগম (সুপ্রিয়র মা) বিউটির প্রতি কিছুটা অন্যমনস্ক আচরণ করছিলেন। তার মুখের অভিব্যক্তি দেখে মনে হচ্ছিল, বিয়েটা তিনি মন থেকে মেনে নিতে পারেননি।
খেতে বসে মহিমা বেগম বললেন, “বিউটি, খাবারটা নামিয়ে দাও।”
বিউটি একটু লজ্জা নিয়ে বলল, “জ্বি জেঠি মা দিচ্ছি।”
মহিমা বেগম মাথা নাড়িয়ে বললেন,“এখন থেকে তোমাকেই সব দায়িত্ব, কাজকর্ম দেখে শুনে, বুঝে নিতে হবে। এই বাড়িতে নতুন মানুষ, তাই সবার খেয়াল রাখার দায়িত্বও তোমার।”
“জ্বী আচ্ছা, ঠিক আছে জেঠিমা!”
সুপ্রিয় এ কথা শুনে বিরক্ত হলো, বিষয়টি তার পছন্দ হলো না। সে হেসে বলল, “মা, তুমি এবারে একটু বেশি বলছ। বিউটি এখানে নতুন, ওকে সময় দাও। এখন আমাকে খেতে দাও। আমি দেরি করব না।”
মহিমা বেগম চুপ করে গেলেন। কিন্তু তার মনের গোপনে খানিক অভিমান জমা হলো। বিয়ে হতে না হতেই ছেলের এই রোদবদল? ছেলের টা হাত ছাড়া হয়ে গেলো এক রাতেই? মনে মনে ক্ষোভ জন্মালো বিউটির উপর। সুপ্রিয় না খেয়েই উঠে গেলো।
সুপ্রিয় কাজের জন্য রেডি হচ্ছিল। বিউটি তার পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল, কিন্তু কিছু বলতে পারছিল না।
“তোর কিছু বলার আছে?”—সুপ্রিয় আচমকা জিজ্ঞেস করল।
বিউটি একটু থেমে বলল, “তুমি এত তাড়াহুড়ো করছ কেন? একটু চা খেয়ে যেতে পারতে।”
সুপ্রিয় হেসে বলল, “টিপিক্যাল বউয়ের মতো কথা বলছিস! ঠিক আছে, চা খেয়ে যাই। বানিয়ে নিয়ে আয়।”
বিউটি অবাক হয়ে বলল,“আমি… আমি বানাব?জেঠিমা যদি রেগে যান।”
সুপ্রিয় হালকা হাসি দিয়ে বলল,“মায়ের রাগ আমি সামলে নেব। তুই চা বানাতে পারিস?”
বিউটি একটু সাহস নিয়ে রান্নাঘরে গেল। চা বানিয়ে আনল। সুপ্রিয় এক চুমুকে চা খেয়ে বলল,“চা তো ভালোই বানাস!”
বিউটি হেসে বলল, “তুমি ভালো ভাবে খেলে না কেন?”
সুপ্রিয় তাকিয়ে বলল, “এমনি। চা টা ভালো হয়েছে। আমার অফিসের বসের মতো কঠিন মানুষও এই চা খেলে গলে যাবে!”
বিউটি হেসে ফেললো তার রসিকতায়।
অফিস থেকে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। সুপ্রিয় ক্লান্ত মুখে ঘরে ঢুকল। বিউটি তখন বারান্দায় বসে আকাশ দেখছিল। তার গায়ে হালকা শাল, চোখে এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা।
সুপ্রিয় দরজা খুলে বলল, “তুই বারান্দায় কেন? সন্ধ্যায় ঠান্ডা বেড়েছে।”
বিউটি মাথা ঘুরিয়ে বলল, “এখানে বসতে ভালো লাগে। মনটা যেন একটু হালকা হয়।”
সুপ্রিয় তার পাশে গিয়ে বসল। দুজনেই চুপচাপ বসে রইল কিছুক্ষণ। তারপর সুপ্রিয় বলল, “তুই ঠিক আছিস তো? কোনো সমস্যা হলে আমায় বলিস।”
বিউটি একটু ঝুঁকে বলল, “জেঠিমা হয়তো আমাকে তেমন পছন্দ করেন না। আমি যদি কখনও কিছু ভুল করি, তবে প্লিজ আমাকে ঠিক করে দিও। আমি চাই সবাই আমাকে মেনে নিক।”
সুপ্রিয় গভীরভাবে বিউটির দিকে তাকাল। তার মনে হলো, বিউটি শুধু মনের দিক থেকে নয়, জীবনের দিক থেকেও এখন একা হয়ে গেছে।
সে বিউটির মাথায় হাত রেখে বলল, “সব ঠিক হয়ে যাবে। তুই নিজের মতো থাক। কেউ যদি কিছু বলে, আমাকে জানাস।”
রাতের খাওয়া দাওয়া শেষে দুজনেই নিজেদের রুমে গেল। দিনের ক্লান্তি থাকলেও কথা বলতে বলতে আবার নতুন করে নিজেদের কাছে টেনে আনল।
“ঘুম আসছে না, আজকেও লুডু খেলবি?”—সুপ্রিয় নখ কামড়ে বলল।
বিউটি হেসে বলল, “আজ আবার হেরে যাবে, হেরে যাওয়ার ভয় পাচ্ছ না?”
“আজ তুই হেরে যাবি। খেলতে চাইলে চল।”
বিউটি হেসে সম্মতি দিলো।
#চলবে