প্রিয় প্রত্যয় পর্ব-০৫

0
31

#প্রিয়_প্রত্যয়
#পর্ব৫
#রাউফুন

বাঙালি বিয়ের ঐতিহ্য অনুযায়ী বিয়ের দ্বিতীয় দিন নতুন জামাই প্রথমবার শ্বশুরবাড়ি যায়। সুপ্রিয় আর বিউটিও আজ সেই যাত্রায় বের হচ্ছে। সুপ্রিয়র বাবা মোজাম্মেল আহমেদ আর মা মহিমা বেগম অনেক নির্দেশনা দিয়ে বিদায় দিতে এলেন। যদিও মহিমা বেগম একটু রক্ষণশীল প্রকৃতির, তবুও আজ তার মুখে একটা মৃদু হাসি। মোজাম্মেল আহমেদ এর জন্যই ব্যাপারটা হজম করতে হচ্ছে তাকে।

সকালবেলা। নতুন জামাই হিসেবে সুপ্রিয় প্রথমবার শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছে। সুপ্রিয়র মন খানিকটা উত্তেজিত, খানিকটা দ্বিধাগ্রস্ত। পূর্বে যখন বিউটি দের বাড়ি গিয়েছে সে তখন ছিলো সম্পর্ক ছিলো অন্য, বিউটির বাবা অর্থাৎ হাশেম আলী ছিলো তার ছোটো চাচা, আর এখন সম্পর্ক বদলে চাচা থেকে শ্বশুর। চাচার বাড়ি হলো শ্বশুর বাড়ি। মহিমা বেগম ছেলের জামাই হিসেবে শ্বশুরবাড়ি যাওয়া নিয়ে কিছুটা বিরক্ত হলেও মোজাম্মেল আহমেদের মধ্যে বেশ খুশি খুশি ভাব।

বিউটির বাপের বাড়ি, অর্থাৎ হাশেম আলীর বাড়ি, পুরোপুরি সেজে উঠেছে নতুন জামাইকে বরণ করে নেওয়ার জন্য। বিউটির বড় ভাই আনাস আর ভাবি সন্দীপ্তা পুরো আয়োজন সামলাচ্ছে। মা শাহানা বেগম নতুন জামাইকে খাওয়ানোর জন্য কী কী রান্না হবে, তার শেষ মুহূর্তের নির্দেশনা দিচ্ছেন।

গাড়ি বাড়ির সামনে পৌঁছতেই আনন্দের হুল্লোড় পড়ে গেল। আনাস এগিয়ে এলো সুপ্রিয়কে নিয়ে আসার জন্য। গাড়ি থামতেই আনাস এগিয়ে এল। হাত বাড়িয়ে কুর্নিশ করে বলল,
“এইযে নতুন জামাই! স্বাগতম আমাদের ছোট্ট রাজ্যে।”

আনাসের রসাত্মক কথায় সুপ্রিয় হেসে বলল,
“তোমাদের ছোট্ট রাজ্যে রাজা হয়ে ওঠার সাধ্য আমার নেই, ভাই। তবে অতিথি হিসেবে যত্নটা ঠিকঠাক নিও।”

আনাস ওর ঘাড়ের উপর হাত দিয়ে চেপে ধরলো। চিবিয়ে চিবিয়ে বললো,

“কিসের অতিথি রে ব্যাটা, বেদ্দপ, হাড় বজ্জাত। এখন কই পালাবি? শেষ পর্যন্ত আমারই বোনকে বিয়ে করতে হলো তোর?”

“ইচ্ছে করে কি আর কেউ আ’গু’নে ঝা’প দেয়?”

”আমি থাকতে তোকে শান্তিতে থাকতে দেবো ভেবেছিস? সবাই কেমন রাজকীয় অভ্যর্থনা জানানোর জন্য তোড়জোড় করছে।”

“আগে বল,বিয়ের দিন ছিলি না কেন?”

আনাস চুপ করে গেলো। গম্ভীরমুখে বললো,“মাথার চাকরি করি, বোনের বিয়ের দিনেও ছুটি নাই। কিন্তু কিছু করার, ওটা আমার ডিউটি।”

আনাস আর্মি অফিসার। সে কোয়াটারে ছিলো। সে চেয়েছিলো স্বপরিবারে কোয়াটারে উঠবে তাঁরা। কিন্তু হাশেম আলীর এক কথা তিঁনি জীবন থাকতে নিজের বাপের ভিটে ছাড়বেন না। অগত্যা আনাসও বাবার মুখের উপর কথা বলতে পারে নি। ওর মন খারাপ বুঝে সুপ্রিয় ওর পেটে কনুই দিয়ে গুতো দিলো। বললো,

“রাজকীয় ব্যবহার তো দূর থাক, তুই হারামী আমাকে পেয়ে নিজের বোনকেই ভুলে গেছিস। দেখ কেমন চাক্ষুষ রাক্ষসী আমার গলায় ঝুলিয়ে দিয়েছিস! কটমট করছে আমার দিকে তাকিয়ে। মনে হচ্ছে আস্তো গিলে খাবে।”

বিউটি গাড়ির সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দৃষ্টি ওদের দিকেই। আনাস বোনের দিকে তাকিয়ে সহসা বললো,
“ব্যাটা বেদ্দপ, আমার সামনেই আমার বোনকে রাক্ষসী বলিস? সাহস তো কম না? সোজা জে’লে ঢুকিয়ে চালান করে দেবো।”

“আমাকে কি চোখে পড়লো তবে? তোমরা এমন আমাকে ফেলেই রেখে এলে? এটা কেমন বিচার ভাইয়া?”

আনাস মাথা চুলকে কানে হাত ধরে বললো,“স্যরি শাকচুন্নী! বোন জামাইকে একটু আপ্যায়ন করছিলাম!”

“তুমি থাকো ওকে নিয়ে, আমি গেলাম।”

বলেই বিউটি হনহনিয়ে চলে এল। সুপ্রিয় ওর যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইলো চোখ ছোটো ছোটো করে। বিড়বিড় করে বললো,“মাইয়া মানুষের হিংসে বড়ো বেশি! আমার দিকে ওভাবে তাকানোর কি আছে,আমি করেছি! আজব!”

”ভাগ্য ভালো তোর, আমার বোনকে পাইছস!”

“হিংসুক বোন তোর।”

”চুপ ব্যাটা বেদ্দপ!”

শাহানা বেগম খানিকটা বিরক্ত হয়ে বললেন,
“তোরা কি ওখানেই থাকবি? আমার জামাইটাকে আদর-যত্ন না করতে দিবি না?”

“ওর জন্য যদি আমার আদর কমে যাই মা,আমি কিন্তু কিছুতেই মেনে নেব না।”

আনাসের কথায় সবাই হেসে উঠল।

“কি সুপ্রিয় ভাই ভালো? আসতে না আসতেই দুটো মিলে শুরু করে দিয়েছো!”

সুপ্রিয় লজ্জায় হেসে বলল,
“ভাবি, তোমার বরকে সামলাও, না হলে ওর কপালে দুঃখ আছে!”

সুপ্রিয় আর আনাস প্রায় একই বয়সের। বয়সের পার্থক্য কেবল দুই মাসের। ওরা পিঠেপিঠি হওয়ায় দুজনের মধ্যে সব এমন খুনসুটি চলতে থাকে। দুজনকে দেখলে মনে হবে কেউ কাউকে দেখতে পারে অথচ তলে তলে দুজনেই দুজনের প্রাণ। বিউটি বাড়ির ভেতরে দাঁড়িয়ে ছিল গাল ফুলিয়ে।
মা শাহানা বেগম বিউটির দিকে তাকিয়ে বললেন,
“বিউটি, কী হলো? তোর মুখ ওমন আমশির মতো করে রেখেছিস কেন?”

“আমশির মতোই আমার মুখ। যাও নতুন জামাইকে গিয়ে বরণ করো!”

“বাড়ি আসতে না আসতেই কি হলো তোর? মাথা গরম কেন?”

“কিছু না!”

শাহানা বেগম মেয়ের দিকে ভ্রুকুটি করে তাকিয়ে চলে গেলেন। সুপ্রিয়কে ঘিরে সবাই দাঁড়িয়ে আছে। কতো গল্প করছে, হেসে হেসে। তাকে কেউ জিজ্ঞেস পর্যন্ত করলো না সে কেমন আছে? যেনো তাকে কেউ চোখেই দেখছে না। নিজের বাড়ি এসে নিজেকেই পরপর লাগছে তার।

বিউটি অদ্ভুত ভঙ্গিতে সুপ্রিয়র দিকে তাকালো। সুপ্রিয় হাসছে আর সবার সঙ্গে খোশমেজাজে গল্প করছে। বিউটির গা জ্বলে গেলো অদ্ভুত ভাবে। সুপ্রিয় সবার আড়ালে তার কাছে এলো।

সুপ্রিয় মৃদুস্বরে বলল,
“এখানে তোকে কেউ কিছু বলছে? শান্ত হয়ে আছিস কেমন।”

বিউটি মৃদু হেসে, ত্যাড়া ভাবে উত্তর দিল,
“নিজের বাড়ি। এখানে শান্ত না থাকলে আর কোথায় থাকব?”

“বাপরে এভাবে ক্ষ্যাপে আছিস কেন? কি হয়েছে?”

“কই না তো!”

সুপ্রিয় ঠোঁট উলটে ওর দিকে তাকিয়ে রইল। সে কি কিছু ভুলে গেছে? কি এমন হলো যে এভাবে বাকা বাকা কথা বলছে?

বাড়ির রান্নাঘরে যেন উৎসবের আমেজ। সুপ্রিয়কে নিয়ে খানাপিনা শুরু হলো। আপ্যায়নে কেউ কোনো ত্রুটি রাখছে না। হাশেম আলী মেয়ের সঙ্গে কথা বলার জন্য তৎপর হয়ে আছেন৷ অথচ সবার থেকে বিমূখ হয়ে বসে আছে। কারোর সঙ্গে ঠিক করে কথা বলেনি এসে। সব শেষে শাহানা বেগম হাতে কাউনের চালের পায়েস নিয়ে এলেন৷ সুপ্রিয়র সামনে রাখতে রাখতে বললেন,

“আমাদের সুপ্রিয়র জন্য বিশেষ এক পায়েস করেছি। একটু খেয়ে বলো, কেমন হয়েছে।”

সুপ্রিয় আলতো হাতে পায়েস সামনে নিলো। এক চামচ মুখে পুড়ে বললো,
“খুবই সুস্বাদু, চাচি আম্মা। আপনার হাতের রান্না সত্যিই অনন্য।”

খাওয়া-দাওয়ার পরে শুরু হলো জমজমাট আড্ডা। সুপ্রিয় থেকে থেকে বিউটির দিকে তাকাচ্ছিলো। মেয়েটার হলোটা কি? এমন বিমূঢ় হয়ে আছে কেন? কেমন গম্ভীর। হাশেম আলী মেয়ের দিকে তাকিয়ে দেখেছেন। বুঝতেও পেরেছেন মেয়ের অভিমান জমেছে। তিঁনি সুপ্রিয়র দিকে তাকিয়ে বললেন,

“সুপ্রিয়, আমার মেয়েটা কি তোকে জ্বালাচ্ছে খুব? মেয়েটা আমার অল্পতেই একটু রেগে যাওয়ার ধাৎ আছে। সে যেমনই হোক, তোর সংসারে কিন্তু সুখ নিয়ে আসবে। আমার মেয়েটাকে যে একবার বুঝতে পারবে সেই চিনবে। খাঁটি হিরে আমার মেয়েটা। ওর খেয়াল রাখিস বাবা!”

সুপ্রিয় মাথা নিচু করে বলল,
“চাচা, বিউটি আমার দায়িত্ব। ওর জন্য যা কিছু করার দরকার, আমি করব।”

বিউটি মুখ নামিয়ে নিলো। ও বাড়িতে যাওয়ার পর কেউ কেন খোঁজ নেয় নি তার? বিয়ে হলেই বুঝি মেয়েরা পর হয়ে যায়? বিউটির সবার মাঝে থেকেই খারাপ লাগা বাড়ছে কেবল৷ এখানে আসার পরও সবাই সুপ্রিয়কে নিয়েই ব্যস্ত, কেউ একবারও ওকে জিজ্ঞেস করেনি ভালো আছে কি না। সবার খেয়াল যেনো শুধু সুপ্রিয়র দিকে৷ বড় ভাই আনাস এদিকে বিউটির মন খারাপ কিছু বুঝতে পেরে বললো,
“বাবা, সুপ্রিয় তো আমাদের ঘরের মানুষ, ওকে আবার এসব কথা নতুন করে বলতে হয় নাকি। বরং বিউটিকে ও ভালোই চেনে।”

সন্দীপ্তা বললো,
“তুমি যে কি বলো না, সুপ্রিয় ভাই আগে ছিলো ভাতিজা, এখন হয়েছে বাড়ির জামাই। বাবারা মেয়েদের নিয়ে সব সময় এমন চিন্তা করবেই। যতই ভালো ঘরে বিয়ে হোক না কেন।”

হাশেম আলী সোফা ছেড়ে উঠতে উঠতে বললেন,“তোমরা আড্ডা দাও, আমার ঘুমের সময় হলো।”

হাশেম আলী চলে গেলেন৷ শাহানা বেগমও উঠে পড়লেন উনার সঙ্গে সঙ্গেই! রইলো সন্দীপ্তা আর আনাস। বিউটি চোখ ভর্তি অশ্রু লুকাতে উঠে বারান্দায় গেলো। সুপ্রিয় কি যেনো ভেবে সবাইকে বলে বিউটির ঘরে চলে গেলো।

আনাস বিউটির পিছনে পিছনে বারান্দায় গেল। বিউটির চোখে এক ধরনের চাপা কষ্ট লক্ষ্য করল সে।

“বিউটি, কী হয়েছে? এমন লাগছে কেন? কি হয়েছে বলবি না আমাকে?”

বিউটি মাথা নিচু করে বলল,
“ভাইয়া, সবকিছু ঠিক আছে। তুমি এত ভাবছো কেন? আর কেউ তো আমাকে নিয়ে ভাবছে না৷”

“তুই আমার বোন। তোর চোখ-মুখ দেখে সব বুঝতে পারি। জানি, হুট করেই সব বদলে গেছে। সময় লাগবে মানিয়ে নিতে। তবে তুই শক্ত থাকিস।”

„আমি শক্তই আছি ভাইয়া।”

“তুই ভালো আছিস তো, বিউটি? হঠাৎই এমন গম্ভীর হলি কেন?”

বিউটি একটু হাসার চেষ্টা করল। ওর মুখে তাচ্ছিল্যের হাসি। দৃষ্টি সামনে স্থির রেখে বলল,

“ভাইয়া, আমি ভালো আছি। নতুন জায়গায় মানিয়ে নিতে তো একটু সময় লাগবেই।”

“বিউটি, এটা তোর জীবনের নতুন অধ্যায়। নিজের শক্তি আর সাহস দিয়ে সব সামলে নিস।”

বিউটির মনের মধ্যে লুকিয়ে থাকা কষ্টটা কেউ তেমনভাবে বুঝতে পারল না। একদিনেই সবার কাছে এমন পর কেন হয়ে গেলো সে?

এদিকে রুমে এসে পায়চারি করছে। কি হয়েছে বিউটির? ওকে মন ম’রা দেখে ওর ভেতরটা অস্থিরতায় ছটফট করছে। বিউটি এলো কিছুক্ষণ পর। ঘরে গিয়ে বিউটি ওয়াশরুমের দিকে যাচ্ছিলো। সুপ্রিয় ওর হাত ধরে সামনে দাঁড় করালো।

“কি হয়েছে তোর? এমন কেন লাগছে তোকে? আমার অশান্তি লাগছে।”

“অশান্তি লাগার কারণ কি? আমি?”

সুপ্রিয় নিষ্প্রাণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো বিউটর মুখের দিকে। বুঝতে চাইলো বিউটির মনের ব্যথা।

#চলবে