প্রিয় প্রত্যয় পর্ব-০৬

0
49

#প্রিয়_প্রত্যয়
#পর্ব৬
#রাউফুন

সুপ্রিয়র চেতনা ফিরে পেতেই দেখলো বিউটি বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়েছে। শীতের দিন হওয়ায় মাথায় কোম্বল টেনে নিয়েছে। সুপ্রিয়র নিজেকে অসহায় বোধ হতে লাগলো। সে নিজের ল্যাপটপ টা বের করলো ব্যাগ থেকে। টেবিলে বসে ল্যাপটপে কাজে মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করলেও মনোযোগ সম্পুর্ন বিউটির দিকে। নিজের উপর বিরক্তিতে চ শব্দ বের হলো তার মুখ থেকে।

বিউটি কোম্বল টেনে নিলেও দম বন্ধ হয়ে আসছে তার। অযথায় কান্না পাচ্ছে। বুকে অসহ্য ব্যথা হচ্ছে।

কান্নার দমকে পিঠটা যেনো খিল ধরে যাবে। সুপ্রিয় একবার তাকিয়ে দেখলো যেনো বিউটি কাঁপছে। ল্যাপটপ অফ করে সে দ্রুত বিউটির নিকট গেলো। কোম্বলের উপর দিয়েই আলতো করে ডাকলো।
“বিউটি! এই বিউটি!”

হঠাৎ ই কম্পন বন্ধ হলো৷ সবকিছুই স্বাভাবিক সেভাবেই ঘাপটি মেরে পড়ে রইলো বিউটি। সুপ্রিয় ফের ডাকলো।

“কি হয়েছে বিউটি? তুই কি কাঁদছিস?”

তবুও বিউটি টু শব্দ টিও করলো না৷ শুধু নিঃশ্বাসের শব্দ বাড়ালো। যেনো সুপ্রিয়র মনে হয় সে ঘুমের মধ্যেই কাঁপছিলো বাজে স্বপ্ন দেখে। সুপ্রিয় আরও একবার ডেকে ওর শিয়র থেকে সরে গেলো। বিউটি ওর সামান্য পায়ের শব্দ শুনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ মুছে ফেললো। ছোটো থেকেই ও নিজের কান্না এভাবেই সবার থেকে আড়াল করেছে। কাউকেই নিজের দূর্বলতা দেখানোটা ওর কাছে ভীষণ লজ্জার। কিন্তু বিয়ের দিন ওর কাঁন্না দেখেছে সুপ্রিয়। ঐদিনের কান্নাটা স্বাভাবিকভাবেই নেবে সকলেই। একজন বিয়ে ভেঙে যাওয়া মেয়ে নিশ্চয়ই না কেঁদে হেসে খেলে বেড়াবে না। এছাড়া সে কখনোই নিজের পরিবার কিংবা বাইরের কারোর সম্মুখে কাঁদে নি।

বিউটি নিজের ঘরে বসে আছে। মনটা ভালো নেই। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখেছে, মা রান্নাঘরে ব্যস্ত, ভাই-ভাবি নিজেদের কাজে মগ্ন। কেউই তার সঙ্গে তেমন একটা কথাও বলেনি।

বিউটি আপন মনে ভাবছে,
“এখন তো আমি শ্বশুরবাড়ির মানুষ। হয়তো সবার জীবনে আমার কোনো গুরুত্ব আর নেই।”

সে শুধু সবার ব্যবহারের আড়ালে একটা হালকা ব্যথা অনুভব করছে। সুপ্রিয় তাকে অনেকবার জিজ্ঞেস করেছে,
“তোর মুখ এত শুকনো কেন? কী হয়েছে বল তো?”

কিন্তু বিউটি উত্তর দেয়নি। বলেছিল,
“কিছু না। তোমার এসব জানার দরকার নেই।”

সুপ্রিয় কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলে,
“আরে, বলিস না কেন? কি মনে হচ্ছে তোর আমি কিছু বুঝি না? তুই শুকনো মুখে ঘুরে বেড়াবি আমি বুঝবো না?”

বিউটি তাকে এক পল সুপ্রিয়র দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নেয়৷ সম্পুর্ন এড়িয়ে যায় ওকে। কিন্তু সুপ্রিয় লক্ষ করেছিল, বিউটির চোখের কোণায় একটুখানি অশ্রুর আভাস। সারাদিন এভাবেই কাটলো। বিয়ের পর সে প্রথম বার নিজের বাড়ি এসেছে, অথচ তাকে নিয়ে কারোর কোনো মাথা ব্যথা নেই৷ তাকে নিয়ে কোনো আয়োজন নেই, সব আপ্যায়ন, আদর যত্ন সুপ্রিয়র জন্য। তার জন্য কারোর কোনো মায়া নেই। সারাদিন বিউটি গুমড়ে গুমড়ে কাটালো৷ কারোর যখন ওকে দেখার সময় নেই ও নিজেও কারোর সঙ্গে যেচেপড়ে কথা বলেনি। তীব্র অভিমানে সবার থেকে মুখ ঘুরিয়ে থেকেছে।

রাতের নিস্তব্ধতায় বাড়ির প্রতিটি ঘর যেন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। কিন্তু বিউটির চোখে কোনো ঘুম নেই। বিছানায় শুয়ে বারবার পাশ ফিরছে। সবাই যেন আজ তাকে ইচ্ছে করেই এড়িয়ে চলেছে। এমনকি তার বাবা-মাও! ভাই-ভাবি পর্যন্ত ব্যস্ত হয়ে পড়েছে নিজেদের কাজ নিয়ে। সে উঠে বসলো। দেখলো সুপ্রিয় অনবরত হাত চালাচ্ছে ল্যাপটপের কীবোর্ডে। মৃদু আওয়াজ হচ্ছে কীবোর্ডের। ওকে লক্ষ্য করার মতো এই বাড়িতে কেউ-ই নেই।

হঠাৎ করেই বিউটির চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। পরক্ষণেই সুপ্রিয় দেখার আগেই তা উড়না দিয়ে মুছে ফেললো৷ একটানা ভাবতে থাকলো— “সবাই এমন করলো কেন? আমি কি এতটাই অপ্রিয় হয়ে গেছি?” মনে পড়লো, আগের দিনগুলোর কথা। বাবা-মা, ভাই-ভাবি সবাই কতটা আনন্দ করতো। আজ যেন সেই দিনগুলোর কোনো ছোঁয়া নেই।

সুপ্রিয় পাশে বসে ল্যাপটপে কাজ করছিল। বিউটির মুখের দিকে তাকিয়ে একটা গভীর চিন্তার ভাঁজ খুঁজে পেলো। সে প্রশ্ন করলো,
“বিউটি, তুই এমন মন খারাপ করে বসে আছিস কেন? কিছু বলছিসও না। আমার কোনো ব্যবহারে কষ্ট লাগলে আমাকে বলতে পারিস।”
বিউটি মাথা নেড়ে বললো,
“না, কিছু না।”
সুপ্রিয় নাছোড়বান্দা।
“কিছু না মানে? তুই তো সারাদিন এমন হাড়ি মুখ করে ঘুরছিস। এখন তোকে বলতেই হবে, বল, কী হয়েছে?”
বিউটি একটু বিরক্ত হয়ে বললো,
“বললাম তো, কিছু না!”

সুপ্রিয় ভ্রু কুঁচকে তাকালো। বিউটির কথায় তার মনে হলো, মেয়েটা কিছু একটা লুকাচ্ছে। কিন্তু জোরাজুরি করার মানুষ সুপ্রিয় নয়। সে মুখে মৃদু বিরক্তির ছাপ নিয়ে বললো,
“আচ্ছা, থাক। তুই যদি বলতে না চাস, তাহলে বলবি না। কিন্তু এত গুমোট হয়ে বসে থাকবি না আমার সামনে। দেখতে বিশ্রি লাগে। কোনো সমস্যা বা কষ্ট হলে মনের লুকিয়ে না রেখে শেয়ার করতে তো পারিস। আমি কি নেই? আমি তো আছি তোর সব কথা শোনার জন্য। সারাদিন থেকে জিজ্ঞেস করছি, শুধু বলছিস কিছু না, কিছু না।”

বিউটি কিছু বললো না৷ শুধু স্বগতোক্তি করলো,“সারাদিন শুধু ল্যাপটপে মুখ গুজে থাকলেই সবকিছু চোখে পড়ে না।”

এই কথা শুনে সুপ্রিয় বিউটির দিকে তাকালে বিউটি ঘাপটি মেরে গুটিশুটি হয়ে শুয়ে পড়লো। বিড়বিড় করলো,“নিজের বাড়িতে এসে যে মেয়েরা খারাপ থাকে এই প্রথম দেখলাম।”

সময় এগিয়ে চললো। রাত যখন গভীর, ঘড়ির কাঁটা ঠিক বারোটায় পৌঁছাল, হঠাৎ পুরো বাড়ি আলোয় ভরে উঠলো।

তক্ষুনি দরজায় টোকা পড়লো। অনবরত কাজ করে সুপ্রিয় সবে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। এতো রাতে দরজায় টোকা পড়ায় ও বিচলিত হলো। দ্রুত সুপ্রিয় দরজা খুলতেই সবার হৈচৈ,
“হ্যাপি বার্থডে বিউটি!”

বিউটি চোখ কচলে উঠে বসলো চিৎকার শুনে। হতবাক হয়ে প্রত্যেকের বলা হ্যাপি বার্থডে বলা শুনতে লাগলো। ওর ঘুমের ঘোর তখনও কাটেনি। সবাই মিলে হ্যাপি বার্থডে সং গাইছে। আনাস, সন্দীপ্তা, শাহানা বেগম, হাশেম আলী, সুপ্রিয়ও ততক্ষণে সবকিছু বুঝে সবার সঙ্গে তাল মেলাচ্চজে। সবকিছু যেন হঠাৎ করে বদলে গেছে। তাদের হাতে রঙিন বেলুন, চকোলেট কেক। বড়ো ভাই আনাস এগিয়ে এসে বললো,
“তোর কি মনে হয়েছিলো, আমরা তোর জন্মদিন ভুলে যাবো?”

বিউটির চোখ জলে ভরে যাচ্ছিলো। পরক্ষণেই নিজেকে সংযত করলো। অবাক হয়ে দেখছিলো নিজের পরিবারের সবাইকে। তার জন্মদিন কেউ ভুলেনি তবে! সে কিছু বলতে পারছিলো না। সন্দীপ্তা এসে বললো,
“কী হলো বিউটি? সারাদিন তো গোমড়া মুখ করে ছিলে, এবার একটু হাসো দেখি।”

বিউটি অবাক হয়ে বললো,
“তোমরা ইচ্ছে করেই এমন করেছিলে? আর আমি কিনা কি ভেবেছিলাম…”

“তুই ভেবেছিলি, আমরা তোর জন্মদিন ভুলে গেছি, তাই না?”

সুপ্রিয় সামনে এসে বিউটির মাথায় হাত টোকা দিয়ে বললো,“আমাকে কিছুই বলিস না কি হয়েছে। এদিকে আমি চিন্তা করছিলাম আমি কিছু ভুল করেছি কি না। এখনি বুঝলাম সবটা কেন ম্যাডামের এতো অভিমান! তুই যে এমন ছিঁচকাদুনে জানতাম না তো!”

“মোটেই না। আমি কাঁদিনি তো!”

“হুম, হুম জানি আমি সব।”

সুপ্রিয়র কথায় মিইয়ে গেলো বিউটি।
সবাই মিলে কেক কাটার আয়োজন করলো। কেকের ওপর বড়ো বড়ো অক্ষরে লেখা, “হ্যাপি বার্থডে টু আওয়ার লাভলি বিউটি।”
সবার তুমুল করতালির মধ্যে বিউটি কেক কাটলো। আনাস কেকের প্রথম টুকরোটা বিউটির মুখে দিলো। সে বললো,
“আমার ছোট বোনটা বড়ো হয়ে গেছে, কিন্তু এখনো সেই ছোটো বেলার মতো অভিমান করে বসে থাকে।”

বিউটি আবেগে কাঁপা কাঁপা গলায় বললো,
“আমি ভেবেছিলাম, আমার বিয়ে হয়ে গেছে বলে তোমরা সবাই আমার জন্মদিন ভুলে গেছো, আমাকে পর করে দিয়েছো। এত ভালোবাসা পেয়ে আমি সত্যিই ধন্য।”

সবাই যখন হৈচৈ করছিল, সুপ্রিয় চুপচাপ দাঁড়িয়ে মুচকি মুচকি হাসছিল। বিউটির কথা শুনে সে বললো,
“বিউটি, তুই জানিস, এই বাড়িতে শুধু তুই নয়, তোর হাসিও সবার প্রিয়। তুই হাসলে সবাই হাসবে। তুই কষ্ট পেলে সবাই কষ্ট পাবে। সেজন্য দুঃখকে বাড়তে দিস না। আর আজ যা দেখলাম তুই ভালোই দুঃখ পুষিয়ে রাখতে পারিস।”

বিউটি তার কথায় মুগ্ধ হলো, খানিক লজ্জাও বোধ হয় পেলো সে মাথা নিচু করে মৃদু স্বরে বললো,
“তুমি এত কথা বলতে শিখলে কবে?”
সুপ্রিয় নিজের চিবুক চুলকে সামান্য মাথা নিচু করে বিউটির কানের কাছে মুখ নিয়ে বললো,
“সে তো আমি সবসময়ই ভালো কথা বলি। শুধু তুই লক্ষ্য করিস নি।”

মুহূর্তে তার মন কেমন যেন আনন্দ আর বিস্ময়ে ভরে উঠলো। বিউটি মুখচোরা করে বললো,“মা, তোমরা সবাই মিলে আমাকে ধোঁকা দিয়েছো, কথা নেই। আমি এতক্ষণে বুঝেছি, আসার পর থেকে সবাই আমাকে ইগনোর কেন করছিলে।”

মা শাহানা বেগম কাছে এসে বললেন,
“মা, ধোঁকা দিইনি। আসার পর তোর মুখে অভিমান দেখে ভাবলাম, একটু মজা করি। বিয়ের পর এটা তোর প্রথম জন্মদিন তাই আমরা ভাবলাম একটু অন্যরকম কিছু হোক।”

বিউটির চোখ ভিজে উঠতে চাইলো আবারও। সে মা-বাবার দিকে তাকিয়ে বললো,
“তোমরা সবাই যে এতটা ভালোবাসো, সেটা এতক্ষণ ভুলে ছিলাম তোমাদের ইগনোর পেয়ে। ধন্যবাদ, মা-বাবা। ধন্যবাদ,ভাইয়া-ভাবি।”

আনাস মজা করে বললো,
“শুধু ধন্যবাদে হবে না বিউটি। আমাদের একটা শর্ত আছে।”
বিউটি ওর দিকে সামান্য চোখ ছোটো করে তাকালো। তখনই দেখলো ওর বাবা ওর দিকে এগিয়ে আসছে। হাশেম আলী বিউটির মাথায় স্নেহের হাত রেখে বললো,“তুমি তো আমার রাজকন্যা মা, তোমায় আমরা অবহেলা করবো? সেই সাধ্যি কি আমাদের আছে?”

বিউটির অভিমানে ভাটা পড়লো। বাবাকে জড়িয়ে ধরে আড়ালে চোখের পানি মুছলো। সুপ্রিয় ইশারায় সন্দীপ্তাকে পরিস্থিতি সামলে নিতে বললো। ইশারা বুঝে সন্দীপ্তা বললো,
“আমার আর তোমার ভাইয়ার শর্ত একটাই। আমাদের কাল ভালো মন্দ রেধে খাওয়াতে হবে। কি আরনাজ পারবে তো? শর্ত কিন্তু মানতেই হবে।”

বিউটি হাসিমুখে রাজি হলো। কেক কেটে সবাই একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করলো। সুপ্রিয় এক কোণায় দাঁড়িয়ে বিউটির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসি তার ঠোঁটের কোণায়।

বিউটির চোখ ভরে গেলো ভালোবাসায়। তার মনে হলো, মূহুর্তেই তার পৃথিবীর সব ভালোবাসা যেন তার চারপাশে ঘিরে রেখেছে তার পরিবার। রাত গভীর হলেও সবার আনন্দ যেন শেষ হচ্ছিল না। এই রাতে বিউটি বুঝতে পারলো, তার জীবনের মানুষগুলো তাকে কতটা ভালোবাসে। তার অভিমান, কষ্ট সব যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো। জন্মদিনটা সত্যিই সেরা হয়ে রইলো। শেষে আবার সবাই সমস্বরে ওকে উইশ করলো।
সবার কণ্ঠ একসঙ্গে—
“হ্যাপি বার্থডে, বিউটি!”

#চলবে