প্রিয় প্রত্যয় পর্ব-০৭

0
33

#প্রিয়_প্রত্যয়
#পর্ব৭
#রাউফুন
(গল্পের নাম #সহধর্মী থেকে #প্রিয়_প্রত্যয় করা হয়েছে।)
বিয়ের কয়েকদিন কেটে গেছে। নিজের বাড়ি থেকে আসার পর প্রায় সবকিছুই নিজ হাতে সামলাচ্ছে বিউটি।৷ মহিমা বেগমকে কাজে হাত দিতে দিচ্ছে না একদমই। বিউটি এখন ধীরে ধীরে নতুন সংসারের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। শ্বশুরবাড়ির পরিবেশটা মোটামুটি তার কাছে স্বাভাবিক হলেও, মনের ভেতর একটা শূন্যতা মাঝে মাঝেই তাকে আচ্ছন্ন করে। সুপ্রিয়ও যেন একটু বদলে গেছে। বিয়ের আগের সেই সহজ-সরল কথাগুলো যেন একটু চাপা পড়ে গেছে। হইতো তাকে এখনো মেনে নিতে অসুবিধা হচ্ছে, যার দরুণ অস্বস্তি বিমুঢ় হয়ে থাকে৷ শুধু দায়িত্ব পালন করে তার প্রতি। তার কাছে মনে হয় সে কেবলই সবার দায়িত্ব হয়েই থেকে যায়, কারোর ভালোবাসা হতে পারে না। সেইটা হইতো ওর ঝলসানো চেহেরার কারণেই। একটু অনুগ্রহ, একটু করুণা, একটু দয়া, কিংবা হইতো কারোর একচ্ছত্র দায়িত্ব বোধ।

সুপ্রিয় অফিসে যাওয়ার পর সকালে সবাই নাস্তা টেবিলে বসেছে। মহিমা বেগম বিউটির দিকে তাকিয়ে বললেন,
“বিউটি, আজ দুপুরের একটু খাস্তা পরোটা বানিয়ে দিস তো জেঠা মশাইকে। তোর হাতের পরোটা তোর জেঠা মশাই পছন্দ করেন।”

বিউটি হেসে বললো,
“জ্বী,ঠিক আছে জেঠিমা। তবে যদি ভালো না হয়, তখন কিন্তু অভিযোগ করতে পারবেন না।”

মহিমা বেগম হালকা ধীর গলায় বললেন,
“তোর হাতের রান্না খারাপ হতে পারে, তা আমি বিশ্বাস করি না।”

বিউটি মহিমা বেগমের দিকে তাকিয়ে রইলো। ওর মুখে হাসির আভা ফুটে উঠলো।
মোজাম্মেল আহমেদ বলে উঠলেন,
“আরে মহিমা, বিউটিকে একটু বিশ্রাম দাও। দেখছো না, ও বিয়ের পর থেকেই শুধু কাজ করে যাচ্ছে। নতুন বউয়ের একটু আরাম দরকার।”

মহিমা বেগম চাপা স্বরে মিনমিন করে বললেন,
“তাহলে কি তুমি গিয়ে রান্নাঘরে নিজের পছন্দের পরোটা বানাবে? আমি ওসব বানাতে পারি না। একবার রুটি বানাও, এরপর সেটা কাটো,এরপর গোল করে ঘুরিয়ে চেপে চেপে রুটি আবার বেলতে হয়, এতো ঝামেলা ভালো লাগে না৷ আমি বাবা সাধারণ রুটিই বানাতে পারি৷ ওতো ধৈর্য্য নেই, বয়স হয়েছে আমার।”

মহিমা বেগমের কথা শুনে মোজাম্মেল আহমেদ ঠোঁট চেপে হেসে উঠলেন। বিউটি মৃদু হেসে ঘাড় নেড়ে বললো,
“না,না, জেঠিমা আমিই তৈরি করব। আমি থাকতে আপনাকে বানাতে দেবো নাকি?”

বিউটি রান্নাঘরে কাজে ব্যস্ত সন্ধ্যা বেলায়। বাড়ির বেল অনবরত বাজছে, সে যে গিয়ে দরজা খুলবে সেই ফুরসত নেই৷ সে চুলা লো ফ্লেমে দিয়ে দরজা খুলতে যাবে তখনই দেখলো মহিমা বেগম যাচ্ছে। সে আর না গিয়ে আবার কাজে মন দিলো। ব্যস্ত পায়ে সুপ্রিয় পাশ দিয়ে যেতে যেতে বললো,
“তুই এত কাজ করিস কেন? এটা তো তোর স্বভাবের সঙ্গে যাচ্ছে না।”

বিউটি অবাক হয়ে তাকিয়ে বললো,
“তোমার কী মনে হয়? আমি কি অলস?”

সুপ্রিয় মৃদু হেসে বললো,
“না, অলস বলছি না। তবে তোর তো অভ্যাস নেই তাই না? এভাবে এতো চাপ নিলে অসুস্থ হবি তো। আমি তোকে সেই ছোটো থেকে চিনেছি, কাজ জানলেও কাজ তেমন করতে হয়নি বাসায়। কিন্তু এখন তো তুই পুরো গৃহিণী হয়ে যাচ্ছিস।”

বিউটি হাসতে হাসতে বললো,
“এটাই তো নতুন জীবন, না? মানিয়ে নিতে শিখতে হয়। জেঠিমার বয়স হয়েছে, সারাজীবন খেটে এসেছেন, এখন বিশ্রাম দরকার। আমার চোখে সহ্য হয় না, জেঠিমা আমি থাকতে এতো কাজ করবে এটাও হয়?”

“উম, পাক্কা গিন্নি আমার!”

“যাও, যাও ফ্রেশ হও৷ অফিস থেকে এসেই রান্না ঘরে দাঁড়াচ্ছো কেন!”

বিউটি ওকে ঠেলেঠুলে পাঠালো রুমে। সুপ্রিয় রুমে গিয়ে লম্বা সময় ধরে ফ্রেশ হলো। বিউটি কাজ শেষ করে ঘাম মুছতে মুছতে রুমে গেলো। এখন ফ্রেশ হয়ে নামাজ টা পড়বে। মাগরিবের আজান দিয়েছে।

মাগরিবের নামাজ শেষে দু কাপ কফি করে আনলো বিউটি৷ সুপ্রিয়র মাথা ধরেছে। ও কপালে হাত ঠেকিয়ে বসে ছিলো।

“কফি খাও, মাথা ধরা কমবে!”

“তুই বুঝলি কিভাবে আমার মাথা ধরেছে!”

“যখন এসেছো তখনই বুঝেছি। তোমার চোখে মৃদু ব্যথার আভাস দেখেছিলাম।”

“দাঁড়িয়ে থাকিস না, বস!”

বিউটি বসলো। বিউটি কফিতে চুমুক দিলো৷
সুপ্রিয় কিছুক্ষণ চুপ থেকে নিজের অস্বস্তি টা বলেই ফেললো,
“তুই হইতো মানিয়ে নিতে পারছিস আমার সঙ্গে, এই সংসারের সঙ্গে, কিন্তু আমি এখনও তোর সঙ্গে ঠিক ভাবে মানিয়ে নিতে পারিনি। তুই তো জানিস, তোকে আমি কি নজরে দেখতাম, এখন হয়তো সেই নজরে দেখি না, কিন্তু তোর প্রতি আমার অনুভূতিটা একদিনে তো বদলে যাবে না। অন্তত আমার দিক থেকে সময় প্রয়োজন।”

বিউটি একটু বিষণ্ণ গলায় বললো,
“আমি বুঝি, সুপ্রিয় ভাই। তোমার যতটা ইচ্ছে সময় নিতে পারো। আমি কখনো তোমার ওপর কিছু চাপিয়ে দেব না। তোমার নিজের মতো করে সব মেনে নিতে চেষ্টা করো।”

সুপ্রিয় এবার হেসে বললো,
“কবে এতো ম্যাচিউরড হলি রে বিউটি? এতো মনোবলই বা কোথা থেকে পাস? আমিই কি তবে এখনো তোর মতো ম্যাচিউরড হতে পারিনি? এই যে কেমন সবকিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখি।”

বিউটি মৃদু হেসে মাথা নিচু করে কফিতে চুমুক দিলো। ওর বুকে সুক্ষ্ম ব্যথার আভাস পেলো। হঠাৎই এই ব্যথার উপদ্রব কেন? সে কি চাইছিলো, সুপ্রিয় তাকে অন্য কিছু বলুক? সুপ্রিয়র ওর প্রতি অনুভূতি তো এমনই হওয়ার ছিলো, এতো দ্রুত তো সবকিছু বদলাবে না৷ কিন্তু এই ধ্রুব সত্যিটা ওর মানতে কেন কষ্ট হচ্ছে? সে কি সুপ্রিয়কে অন্য রকম ভাবে ভাবতে শুরু করেছে? বা ওর থেকে আরও অনেক কিছু এক্সপেকটেশন রাখছে?

রাতে বিউটি নিজের ঘরে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে। শীতল বাতাস তাকে অদ্ভুত এক স্মৃতির ভেতর নিয়ে গেল। ও যখন ক্লাস নাইনে পড়তো, ঠিক তখন থেকেই ওর পেছনে ছাপোষা ছেলে পেলে ঘুরঘুর করতো। ওর বাবার কাছে দিনে কতো গুলো বিয়ের সম্বন্ধ যে আসতো তার ইয়ত্তা নেই। অত্যন্ত রূপবতী হওয়ার দরুণ ছোটো বেলা থেকেই ও বোরখা পড়তো, হিজাব পড়তো। কিন্তু ওর চোখ দেখেই অদ্ভুত ভাবে ওকে সবাই পছন্দ করে বসতো। তারপর কিছু কিছু মহিলা এমন ছিলো যে ওকে বাড়িতে গিয়ে দেখতো, এরপর নিজের ছেলে কিংবা, কোনো আত্মীয় স্বজনের ছেলের দিয়ে বিয়ে নিয়ে আলাপচারিতা চালাতো। আনাস ভাই যখন জানতো বিষয় গুলো কি যে রেগে যেতো। সব ঘটক মহিলাদের তাড়িয়ে তাড়িয়ে দিতো। এরপর ও যখন মেট্রিক পাশ করে সবে কলেজে ভর্তি হলো তখনই ঘটলো এক অঘটন। ওর জীবনের কালো অধ্যায়, সবচেয়ে কঠিন মূহুর্ত। এখনো ভাবলে কেমন গায়ে কা’টা দিয়ে উঠে ওর৷ তখনই সুপ্রিয় ত্রস্ত পায়ে এগিয়ে এলো। বিউটির মনের এলোমেলো, এবড়োখেবড়ো ভাবনার সুতোই টান খেলো। সুপ্রিয় বারান্দায় উঁকি দিলো। তার হাতে একটা কাগজের মোড়ানো ছোট বাক্স। বিউটির দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,
“নে ধর, এটা তোর জন্য।”

বিউটি অবাক হয়ে বললো,
“এটা কী?”

সুপ্রিয় হেসে বললো,
“এত কথা বলতে বলেছি? তোর হাতেই তো জিনিসটা, খুলে দেখলেই তো হয়।”

বিউটি বাক্সটা খুললো। সেখানে দুটো সোনার চুড়ি আর একটা হাতের লেখা নোট ছিল। নোটে লেখা ছিল
“তুই শুধু আমার জীবনসঙ্গী না, তুই আমার জীবনের সবচেয়ে ভালো বন্ধু।”

বিউটির চোখ ছলছল করে উঠলো। সে বললো,
“তুমি হঠাৎই গিফট কেন আনলে?”

সুপ্রিয় মৃদু হাসলো। বিউটির পাশেই দোলনায় বসলো। ওর গায়ের সঙ্গে বিউটির গা ঘেঁষে বসাটা বিউটি লক্ষ্য করে খানিক সংকীর্ণ হয়ে সরে বসলো। সুপ্রিয় জানালো থেকে আকাশের দিকে তাকিয়ে বললো,
“বিয়ের পর তো তোকে কিছুই দিতে পারিনি, এটা আমার কেনা কারোর জন্য প্রথম উপহার। আমি এর আগে কখনোই কারোর জন্য কিছু কিনিনি। এটা শুধু একটা উপহার না, এটা আমার জন্য অনেক কিছু, এই উপহারটা কখনো হাত ছাড়া করিস না বিউটি।”
“তুমি এতো কষ্ট করলে কেন? এতো দামী বালা তোমায় কিনতে বলেছিলাম আমি?”
“তোর পছন্দ না হলে বল, ফেলে দেবো।”
বিউটি তড়াক করে উঠে দাঁড়ালো। বালা জোড়া হাতে নিয়ে দেখলো, ডিজাইন টা বেশ সুন্দর। সুপ্রিয়র পছন্দ আছে বেশ। ও মুখ ভেংচি কে’টে বললো,“কখনো দেখেছো, উপহার দিয়ে সেটা আবার ফেলে দেয়?”

“পছন্দ হয়েছে?”

“খুউউব!”

“তাহলে পড়ছিস না কেন?”

বিউটি মাথা নত করে বললো,“যেদিন তোমার মনে হবে আমাকে সম্পুর্ন রূপে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে পারছো সেদিন না হয় এটা পড়িয়ে দিও নিজ হাতে? আমি সেদিনের অপেক্ষায় রইলাম সুপ্রিয় ভাই?”

“যদি সেইদিন টা কখনোই না আসে? তাহলে কি তুই কোনো দিন পড়বি না?”

বিউটি মিইয়ে গেলো। কিছু না বলে রুমে গেলো। যেতে যেতে মিনমিন করে বললো,“সেদিন টা খুব শীঘ্রই আসুক সুপ্রিয় ভাই। খুব শীঘ্রই আসুক!”

তখনই মহিমা বেগম রুমে এলেন। বিউটি হাতের বক্সটা ড্রয়ারে রাখলো। মহিমা বেগম বক্সটা রাখতে দেখলেন আড়চোখে। সুপ্রিয়ও ততক্ষণে রুমে এসেছে। মহিমা বেগম বললেন,“খেতে আয় সুপ্রিয়।”

“যাচ্ছি মা! বিউটি আয়!”

“কাল সকাল সকাল বেড়োতে হবে। সুপ্রিয় অফিসে কল করে সাত দিনের ছুটি নিয়ে নে!”

“হঠাৎই ছুটি কেন মা? এমন সময় আমাকে ছুটি দেবে? খুব টাফ হবে আমার জন্য!”

“ওতো কিছু তো জানি না আমি। তোর নানা নানি তাঁদের নাতির বউকে দেখবেন। একবারে মরিয়া হয়ে গেছে।”

“মা, অসম্ভব এখন!”

বিউটি এক কোণে দাঁড়িয়ে বললো,“দেখো না, তোমার বসকে বলে ব্যবস্থা করতে পারো কি না।”

“তুই জানিস না বিউটি, বস কি পরিমাণ কড়া। জীবনেও ঐ চিমসা বস ছুটি দেবে না আমায়! বহুত বদমাশ বস আমার। এমন খাইষ্টা লোক আমি জীবনেও দেখিনি।”

বিউটি চিমসা শব্দ শুনে ফিক করে হেসে ফেললো।
মহিমা বেগম ওর হাসির দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করতে লাগলেন৷ আজকালকার মেয়ে ছেলের লাজ লজ্জা নেই। জেঠিমার দিকে তাকিয়ে বিউটি মিইয়ে গেলো পরক্ষণেই। সুপ্রিয়কে বললো,“জেঠিমাকে বলো ছুটি নেবে! গ্রামে যাবো।”

সুপ্রিয় ওর পিড়াপিড়িতে রাজি হলো। মাকে জানালো ওরা গ্রামে যাবে। মহিমা বেগম বিউটির হাতের বক্সটার কথা মাথায় ঘুরতে লাগলো। কই তাকে তো কখনোই সুপ্রিয় গিফট দেয়নি। অথচ বউ বাড়ি আসতে না আসতেই তার জন্য লুকিয়ে চুরিয়ে গিফট আনছে।

“তাহলে ঐ কথায় রইলো। তোমরা তৈরি হয়ে থেকো।”

“তোমরা যাবে না মা?”

“না, আমরা এখন যেতে পারবো না।”

মহিমা বেগম কথা শেষ করে প্রস্তান করলেন।

#চলবে