#প্রিয়_প্রত্যয়
#পর্ব৮
#রাউফুন
সবাইকে বিদায় জানিগে বিউটি আর সুপ্রিয় রওনা হলো গ্রামের বাড়ি। গন্তব্য সুপ্রিয়র নানা-নানির বাড়ি। সুপ্রিয় গাড়িতে বসে নিজের চুল গুলো ব্রাশ করে নিচ্ছিলো হাত দিয়ে। বিউটি গাড়িতে উঠে বসতে গিয়ে থমকে দাঁড়ালো, পা কেমন অসার হয়ে আসছে অজানা অনূভুতিতে। সুপ্রিয়র দিকে তাকালো ও আরও সুক্ষ্ম ভাবে। হালকা স্কাই ব্লু চেক চেক শার্ট পড়েছে সুপ্রিয়। মাঝে মধ্যে চুল ঠিক করার পাশাপাশি ও শিষ বাজাচ্ছিলো। বিউটি ওর প্রতিটি কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করছিলো। ওর লাল খয়েরী ঠোঁটের মাঝে সামান্য ভাজ আছে, থুতনিতে তিল, কালো কুচকুচে আইব্রো, ঘণ পল্লব বিশিষ্ট আইলেশ, আশ্চর্য মেয়েদের থেকেও গভীর লোকটার চোখ। সবশেষে আবারও ওর দৃষ্টি আটকালো সুপ্রিয় ঠোঁটে। ধনকুবের ওর দৃষ্টি আটকে রইলো সুপ্রিয়র নজরকাঁড়া লাল খয়েরী ঠোঁটে। বিউটি আগে কখনোই এভাবে সুপ্রিয়কে দেখে নি। এই মূহুর্তে ওর গলা শুকিয়ে গেলো,এক মূহুর্তের জন্য ওর হার্ট মিস করে গেলো যেনো। বুকের বা পাশে ওর হৃদস্পন্দন ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলেছে। এ কেমন অদ্ভুত অনুভূতি? একুশ বছরে ওর সঙ্গে এমন কখনোই হয়নি। এই সুন্দর সুদর্শন যুবকটা ওর স্বামী? ভাবতেই মনের মধ্যে নিষিদ্ধ কিছু বাসনা জাগলো মূহুর্তের মধ্যেই। শুকনো ঠোঁট জোড়া ভিজিয়ে এক ধ্যানে তাকিয়ে ছিলো ও সুপ্রিয়র সুন্দর মুখপানে। ওর দৃষ্টিতে বিভ্রম, মুগ্ধতা। তম্বন্ধে সুপ্রিয়র এক রাম ধমকে ওর সম্বিত ফিরলো। বিপাকে পড়ে নিজের চক্ষু সরিয়ে এলোমেলো ভাবে চোখের পলক ফেলতে লাগলো।
“কি দেখিস ওভাবে? আমার কি রূপ বেড়িয়েছে? আগে দেখিস নি আমাকে?”
বিউটি তৎক্ষনাৎ জবাব দিতে পারলো না। মনে মনে বললো,“সত্যিই আগে দেখি নি আপনাকে। এমন ড্যাশিং কেন আপনি? চকলেটের মতো চেখে দেখতে ইচ্ছে আমার। ওমন সুন্দর ঠোঁট কেন হবে একটা পুরুষ মানুষের?”
“হা করে দাঁড়িয়ে না থেকে,গাড়িতে উঠে বস!”
কালো নিকাবের আড়ালে বিউটির মুখাবয়ব দেখলো না সুপ্রিয়। যার দরুণ বিউটির গতিবিধি বুঝতে সক্ষম হয়নি। গাড়িতে উঠেও বিমূর্ত হয়ে বসে রইলো বিউটি। একদম আটঁশাট হয়ে। কিছুক্ষণ পূর্বে ও কি ভাবছিলো? ছিঃ ছিঃ, ও তো এমন ধরনের মেয়ে না। তাহলে এমন বাসনা কেন মনের মধ্যে উঁকি দিচ্ছিলো? নিজেকে বেশ কিছুক্ষণ শাসালো। পরক্ষণেই মনে পড়লো, যাকে নিয়ে ওর এসব ভাবনা মনের মধ্যে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে, সে তার স্বামী। ওর একান্তই ব্যাক্তিগত পুরুষ। তাকে নিয়ে ভাবনাটা ভুল নয়৷ ভুলক্রমেও আর সুপ্রিয়র দিকে তাকালো না।
“তুই কি আমার পাশে বসতেও আন-ইজি ফীল করছিস বিউটি? এভাবে গাঁট হয়ে বসে আছিস কেন? দম নে, শ্বাস আঁটকে যাবে তো। এভাবে দম আঁটকে আছিস কেন?”
সুপ্রিয়র কথা তালগোল পাকিয়ে আনমনে বিউটি আবোল তাবোল ভাবে উত্তর দিলো,“আমি মোটেও তোমার দিকে তাকাইনি সুপ্রিয় ভাই। আমি আসলে গ্রামে যেতে ভয় পাচ্ছি! গ্রামে যাবো না আমি।”
সুপ্রিয় ভ্রুকুটি করে বললো,“আমি কখন বললাম আমার দিকে তাকিয়েছিস তুই? আশ্চর্য, ভয় কেন পাচ্ছিস হঠাৎ? আমি কি তোকে মে’রে ভাসিয়ে দিতে নিয়ে যাচ্ছি গ্রামে? গ্রামে যাওয়াটা কিন্তু তোরই ইচ্ছেতেই হচ্ছে। এভাবে মুখচোরা হয়ে বসে থেকে পরে আমায় দোষ দিলে আছাড় দিয়ে ফেলে দেবো।”
সহসা বিউটি এভাবে আবোল তাবোল কথা বলা না। কিন্তু এই মূহুর্তে ওর মস্তিষ্ক এলোমেলো, ভাবনা গুলো বড্ড বেসামাল। ওর ঘোর কাটছে না, কেবলই সুপ্রিয় ওষ্ঠযুগলের গোল করে শিষ বাজানোর দৃশ্য চোখে ভাসতে। ওর ভাবনা গুলো কেমন সমান তালে বেসামাল হচ্ছে। বিউটি এখন বড্ড বিরক্ত বোধ করছে নিজের ভাবনায়। এমন তো হয়নি আগে।
“কি হলো? আবার কি ভাবছিস তুই? কি হয়েছে তোর?”
বিউটি আবারও উদ্ভ্রান্তের মতো জবাব দিলো,“বললাম তো আমি তোমার ঠোঁটের দিকে তাকাইনি!”
সুপ্রিয় থম মেরে তাকিয়ে রইলো কিয়ৎক্ষণ বিউটির পানে। এরপর সপাটে চড়া গলায় বললো,“ঠাঁটিয়ে এক চড় দিয়ে তোর বিভ্রম ছাড়াবো। তখন তখন উল্টোপাল্টা বকছিস। কি হয়েছে তোর? হুশে আয়!”
বিউটি নিমজ্জিত হয়ে সরু চোখে এক পল তাকালো সুপ্রিয়র দিকে। আবারও ওর নজর না চাইতেও সুপ্রিয়র ঠোঁটের দিকে গেলো। ওর দম বন্ধ লাগছে। ওর মতো মেয়েদের যে কাউকে নিয়ে এভাবে ভাবা নিষেধ, ও কেন এভাবে নিজের খেই হারাচ্ছে? কি হচ্ছে ওর সঙ্গে? বিউটি অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে বললো,“আমার কেমন যেনো লাগছে। গাড়িতে উঠলে আমার দম বন্ধ লাগে। এই জন্য আমি গাড়িতে চলাচল করি না। তুমি প্লিজ কিছু মনে করো না সুপ্রিয় ভাই!”
সুপ্রিয় ওর দিকে পানির বোতল এগিয়ে দিয়ে বিচলিত হয়ে বললো,“আগে বলবি তো, নে পানি খা।”
বিউটির অজানা তৃষ্ণায় বুকটা খাঁ খাঁ করছিলো৷ ও পানির বোতল হাতে নিয়ে বোতলের সিপি খুলে মুখের উপর থেকে নিকাব সরিয়ে ঢকঢক করে পানি পান করলো। সুপ্রিয় ওকে সাবধান করে বললো,“আস্তে, আস্তে। আস্তে খা বিউটি, তোর থেকে পানি কেউ কেড়ে নেবে নাকি? এভাবে খাচ্ছিস কেন গর্ধব!”
বিউটির কানে কোনো কথায় যেনো পৌঁছাচ্ছে না। ওর মনে, মস্তিষ্ক জুড়ে অন্য রকম কিছুর আভাস।
শাঁ শাঁ শব্দ তুলে গাড়ি এগিয়ে চললো এক মনে। এর মধ্যে বিউটি আর নিজের অবাধ্য ভাবনা গুলো বাড়তে দেয়নি। অন্য রকম এক অস্বস্তি ওকে ঘিরে ধরেছে। সুপ্রিয়ও কেন যেনো ওকে আর ঘাটালো না। থাক, চুপচাপ থাকলে যদি ভালো লাগে তবে থাকুক।
দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে দিতে বিউটির মন এক অজানা আশঙ্কায় ভরে উঠছিল। একসময় গাড়ি থামলো, সুপ্রিয় বললো,
“পৌঁছে গেছি। এবার গাড়ি থেকে নাম।”
বিউটি হেসে বললো,
“তুমি আগে নামো। আমি একটু পরে নামছি।”
সুপ্রিয় তাকে হাত ধরে গাড়ি থেকে নামিয়ে বললো,
“কী হয়েছে তোর? এমন গুমোট হয়ে আছিস কেন?”
বিউটি তার ভয় ঢাকতে চেষ্টা করে বললো,
“কিছু না। নতুন জায়গা তো, তাই একটু অস্বস্তি লাগছে।”
সুপ্রিয়র মামাতো দুই বোন বাড়ির আঙিনায় আগে থেকেই দাঁড়িয়ে ছিল। একজনের নাম মুক্তা,অপর জনের নাম রিক্তা। তাদের মুখে ছিল নতুন বউ দেখার কৌতূহল। রিক্তা, মুক্তার হাত চেপে বলছিল,
“সুপ্রিয় ভাইয়ার বউটা নিশ্চয়ই খুব সুন্দরী হবে! শহর থেকে এসেছে না! শহরের মেয়েদের দেখতে সিনেমার নায়িকাদের মতো সুন্দরী হয় রে।”
মুক্তা বলে উঠলো,
“আরে, সুপ্রিয় ভাইয়া তো বরাবর স্মার্ট। তার বউ নিশ্চয়ই কোনো দিক থেকে কম হবে না?”
কিন্তু যখন বিউটি গাড়ি থেকে নামলো। বিউটির মুখের এসিডে ঝলসানো চিহ্ন কালো নিকাবের আস্তরনে ঢাকা। বিউটির মুখ ঢাকা দেখে হতাশ হলো ওরা। সুপ্রিয়র মামাতো বোনের একজন ফিসফাস করে বললো,
“এই তো নতুন বউ মনে হচ্ছে, তার মুখ এমন ঢাকা কেন?”
“মনে হয় পর্দাশীল। চুপ করে থাক। পরে দেখবো সবার সঙ্গে!”
সুপ্রিয় ওদের দুই বোনের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসলো। সুপ্রিয়র একটাই মামা। মামার দুটো মেয়ে, একটা ছেলে। ছেলেটা ছোটো, আর মেয়ে দুটো পিঠেপিঠি৷ বয়সের তফাৎ দুজনের এক বছরের। সুপ্রিয় রিক্তার চুল এলোমেলো করে দিয়ে বললো, “কিরে পিচ্চি ভালো আছিস? তুই তো অনেক বড় হয়ে গেছিস!”
মুক্তা ওর দিকে ঘোর লাগা চোখে তাকিয়ে বললো, “আর আমি বুঝি বড়ো হয়নি সুপ্রিয় ভাই?”
“তুইও তো দেখছি বিশাল বড়ো হয়েছিস। একদম কলা গাছের মতো ফুলেও গেছিস!”
মুক্তা গোমড়া মুখে বললো,“এভাবে বলছো কেন সুপ্রিয় ভাই? আমি তো অল্প একটুই মোটা!”
“সর এখন সামনে থেকে৷ তোদের ভাবিকে নিয়ে ভেতরে যেতে দে। আমার সুন্দরীকে দেখার জন্য মনটা ব্যাকুল হয়ে আছে।”
বিউটি নিকাবের আড়াল থেকেই সুপ্রিয়র দিকে চোখ পাকিয়ে চাইলো। কোন সুন্দরীকে দেখার জন্য সুপ্রিয় ব্যাকুল হয়ে আছে? ওর মনটায় কেমন বিষাদ ছেঁয়ে গেলো,অগ্যত মনে খানিক হিংসার আভাসও বোধহয় পেলো ও। আশ্চর্য, এতে হিংসা হওয়ার কি আছে? বিউটি ভেবে পেলো না।
বিউটি সলজ্জ পায়ে হেঁটে যাচ্ছে সুপ্রিয়র পথ অনুসরণ করে। ওর মন্থর গতিতে হাঁটা দেখে সুপ্রিয় পিছনে ফিরে এসে ওর হাত চেপে ধরলো। সর্বাঙ্গে ঝংকার দিয়ে উঠার মতো অনূভুতি হলো ওর। এমনিতে ও অনেক্ষণ ধরে নিজের বেসামাল অনুভূতি কে সামলাচ্ছিলো এখন আবার সুপ্রিয় আচানক স্পর্শ। শরীর টা কেমন যেনো দুলে উঠল ওর।
সুপ্রিয়র নানা নানিকে দেখেই সুপ্রিয় হাসি মুখে এগিয়ে এলো। সুপ্রিয় সালাম দিয়ে ওর নানাকে জড়িয়ে ধরলো,“কেমন আছো বুড়ো?”
রহমান আলী স্বশব্দে হেসে বললো,
“আমাকে বুড়ো বলছো? এখনো অনেক বেশি ইয়াং আমি। একদম তরতাজা,এখনো এক খানা কচি বউ পাবার যোগ্যতা রাখি আমি।”
তখুনি রমিসা খাতুন ক্ষীপ্ত হয়ে খড়খড়ে আওয়াজে বললো,“বিয়ের শখ ঘুঁচিয়ে দেবো বুড়ো। কোন কচি সতীন তখন তোমার সঙ্গে সংসার করে তাই দেখব!”
বিউটি তাজ্জব বনে ঠাই দাঁড়িয়ে ওঁদের কান্ড দেখছে। রমিসা বিউটিকে লক্ষ করতেই সহসা বিউটি সালাম করলো বৃদ্ধাকে। রমিসা সালাম দিয়ে বললেন,“তোমার চাঁদপানা মুখ খানি দেখাও নাতবৌ। দেখে চোখ খানি জুড়াক আমার!”
“আমার বউকে তো এমনি এমনি দেখাবো না সুন্দরী। আগে হাদিয়া তারপর বউ দেখা!”
#চলবে