প্রিয় প্রত্যয় পর্ব-০৯

0
29

#প্রিয়_প্রত্যয়
#পর্ব৯
#রাউফুন

একটা দ্বিধাবোধ থেকেই বিউটি নিজের নিকাবটা সরাতে পারছে না। অথচ রমিসা খাতুন কতোই না আশা নিয়ে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। রমিসা খাতুন বোধকরি বিউটির সংকোচ বুঝতে পারলেন৷ বিউটির ব্যাপারে মেয়ে মহিমার কাছ থেকে শুনেছেম। তাই বিজ্ঞদের মতো করে অত্যন্ত কোমল, আদর মাখানো গলায় রমিসা খাতুন মিষ্টি হেসে বললেন,“আমাকে মুখ দেখাতে সংকোচ কিসের নাতবৌ? আমি জানি না কিভাবে তোকে বলবো, বা স্বান্তনার বানী শোনাবো, তবে একটা কথা বলতে পারি, আমার নাতি যদি কোনো পূন্য করে থাকে সেটা তোকে বিয়ে করেই করেছে। তাই আমার সামনে মুখ দেখাইতে গিয়ে কুকড়ে থাকিস না, আমিও তো একটা নারী! আমি তোকে অবহেলা করবো এমনটা কেন ভাবছিস?”

বিউটি অবাক হয়ে তাকালো। ওর চোখে সামান্য অশ্রু জমেছে। বিউটি নিজেকে ভীষণ ভাবে শক্ত রাখতে পারে। নিজের দূর্বলতা দেখানোটা ওর কাছে বড্ড বোকামো। সে নিকাব উঠালো মুখ থেকে। রমিসা খাতুন, একটুও চমকালেন না দেখে বিউটিই অবাক হলো। যারপরনাই অবাক হয়ে ও বৃদ্ধার দিকে তাকালো। বললো,“আপনি জানতেন আমার চেহারা এমন?”

মাথা নাড়লেন রমিসা খাতুন, যার অর্থ হ্যাঁ। তিনি সুরেলা কণ্ঠে বললেন,“শোন নাতবৌ, ঐ যে চাঁদ দেখিস না? আকাশের ঐ চাঁদেরও তো কলঙ্ক আছে। তুই হলি সেই চাঁদ। চাঁদের এই একটু আধটু কলঙ্ক বিশেষ। একদমই মনে এমন চিন্তা আনিস না যে তোকে আমি মিথ্যা, আর বানভাসি কথায় ভোলাচ্ছি। আমি শিক্ষিত একজন মানুষ, তাই আমাকে অন্য সব কুচুটে দাদি, নানিদের তালিকায় ফেলিস না! আমি আমার নাতির উপর ভীষণ সন্তুষ্ট। কারণ টা তোকে বিয়ে করেছে বলেই। আয় দেখি নাতবৌ, তোর হাদিয়া নে তো দেখি! ”

বিউটি মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইলো শুধু। ওর ধারণা সম্পুর্ন বদলে গেছে রমিসা খাতুনকে দেখে। সত্যিই ও অন্যান্য নানি দাদির মতোই ভেবেছিলো যারা একটু খুতখুতে টাইপের হয়৷ আগের যুগের মানুষেরা যেমন হয় আর কি৷ কিন্তু তাঁরা যে আদতে মানুষ হিসেবে খারাপ তা নয়। কিন্তু রমিসা খাতুনের কথা ও সুন্দর ব্যবহার, আর মুখের বাচনভঙ্গি দেখে ও সত্যিই মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় তাকিয়ে থাকে। ততক্ষণে রমিসা খাতুন নিজের হাত থেকে সোনার মোটা বালা দুটো খুলে বিউটির হাতে পড়াতে পড়াতে বললেন,“একটাই নাতি আমার, আমি ঠিক করে রেখেছিলাম যে ওর বউকে আমি আমার এই সোনার বালা গুলো দেবো। এগুলো আমার বিয়ের, আমার শ্বশুর আমাকে গড়িয়ে দিয়েছিলে। দেখতো পছন্দ হয়? যদিও ডিজাইন টা সেকেলে! কিন্তু শ্বশুর মশাই দিয়েছেন বলে এটা আমার অনেক পছন্দের বুঝলি?”

রহমান আলীর মিষ্টি মুখে বললেন,“এই রে, তুমি তো সোনার বালা দিলে, এবারে আমি কি দিই বলো তো?”

বিউটি বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে কেবলই সবার দিকে। ওর এতোটাও স্নেহ, আদর পাবে এক বিন্দুও আশা করেনি। অথচ আসতে আসতে মনসাপটে কতো কিছুই না ভাসছিলো। সুপ্রিয় মুখ গোমড়া করে বললো,“সুন্দরী এটা কিন্তু ঠিক না, বিউটি যদি নতুন বউ হিসেবে গিফট পায়, তবে আমি কেন পাবো না কিছু? আমিও তো নতুন বিয়ে করেছি, সে হিসেবে আমিও নতুন বউর পাশাপাশি নতুন বর! এ কেমন অবিচার?”

রহমান আলী আর রমিসা হেসে ফেললেন। তম্বন্ধে সুপ্রিয়র মামি, মামাতো দুই বোন এসে দাঁড়ালো। ওরা ওর মাকেই ডাকতে গেছিলো নিজেদের ঘরে । সুপ্রিয়রা আসবে শুনে সুপ্রিয়র মামা রমিজ উদ্দিন বাজারে গেছেন, সঙ্গে ছেলে মারুফকে সঙ্গে নিয়েছেন। যেনো আসার সময় ব্যাগ ভর্তি বাজার বয়ে আনতে অসুবিধা না হয়। মুক্তা অবাক হয়ে নিজের মুখ হাত দিয়ে বললো,“ওমা গো, ভাবির মুখের এক পাশে এমন কেন?”

রিক্তা বললো,
“আরেএএ, সিনেমায় দেখিস না, এসিড মারলে এমন হয়? মনে তো হয় এসিডেই এরকম হইছে।”

সুপ্রিয় মামি ওদের দুবোনকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে বিউটির মুখ নিজের হাতে ঘুরিয়ে দেখলেন৷ চমকে বললেন,“একি দশা, এমন রাজপুত্রের মতো ছেলেটার বউর এমন বিভৎস চেহেরা? এও সম্ভব মানা?”

বিউটি জানতো এমন কথার বাণ আসবেই সেই জন্য আগে থেকেই ও তৈরিই ছিলো। ওকে ঘিরে যে এমন কথা হবে তা ও আগে থেকে তা টের পাচ্ছিলো বৈকি, এটা নতুন কিছু নয়। সে ওদিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে তার নেওয়াই শ্রেয় মনে করলো।
রমিসা খাতুন বিরক্ত হয়ে বললেন,“কি সমস্যা সালেহা? এটা কি ধরনের ব্যবহার আমার নাতবৌ এর সঙ্গে? আমি এতো এটা মেনে নেবো না!”

“মা, আপনারে তো আমি আগেও বলছিলাম। আমার মুক্তার লগে সুপ্রিয়র বিয়েটা দেন,একবার চাইয়া দেখে ওঁদের দুজনের চেহেরাটা মিলিয়ে দেখেন। আমার মাইয়া বহু গুণে সুন্দরী সুপ্রিয়র বউর চাইতে। আমার তো আফসোস হচ্ছে৷ ছেলেটা এমন বিশ্রি চেহারার মাইয়ার সঙ্গে আজীবন ক্যামনে কাটাইবো?”

রহমান আলী এবারে ধমকে উঠলেন। ছেলের বউকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “এতো কথা তো আমার পছন্দ হচ্ছে না। যার বউ তার যদি কোনো সমস্যা না থাকে তবে তোমার এতো কথা কিসের? তোমার এই ছুলছুল স্বভাব পছন্দ না আমার।”

“আপনি যাই বলেন আব্বা, পুরুষ মানুষ সারাদিন খেটে খুটে আসে, ঘরে এসে সুন্দর এক খানা মুখ দেখতে না পারলে কি মন মেজাজ ভালো থাকে? সারাদিনের কাজ করে তিক্ততা তো এমন চেহারা দেখলে তরতর করে আরও বাড়বে৷ কিন্তু যদি সুন্দরী বউ হয় তবে পুরুষ নিজের সুন্দর বউ দেখেই শান্ত হয়ে যায়। মন ভালো করার ওষুধ তো হয় ঘরের বউ, সেখানে এমন….!”

ব্যস মামি, অনেক দিন পরে এসেছি বলে অনেকক্ষণ থেকে তোমার আজেবাজে কথা শুনছিলাম। আমি কোনো ভাবেই চাচ্ছিলাম না তোমার সঙ্গে দু চারটে কথা বলে মনোমালিন্য হোক। কিন্তু তুমি একেবারে লিমিট ক্রস করে ফেলেছো। আরেকটাও বাজে কথা যদি আমার বউকে নিয়ে বলো তবে ভুলে যাবো তুমি সম্পর্কে আমার মামি৷”

সালেহা বললেন,“আমি তো তোর ভালো চিন্তা করেই বললাম, কি দেখে বিয়ে করলি তুই তোর এই চাচাতো বোনকে? এভাবে এমন একটা মেয়ে তোর গলায় গছালো কিভাব তোর চাচা?”

সুপ্রিয়র মেজাজ বেশ ভালো ভাবেই হারিয়েছে। তাই ছোটো বড়ো কাউকেই সে তোয়াক্কা করলো না। ক্ষুব্ধ গলায় বললো,
“আমার স্ত্রীকে নিয়ে আর একটাও কথা হলে এক্ষুনি আমরা এবাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবো নানু!”

“আমি না হয় থামলাম, কিন্তু গ্রামের মানুষ যখন নতুন বউ দেখতে আসবে,তখন সবার কথার তোপে পিষ্ট করবে তখন কি বলবে?”
আর কোনো কথা হওয়ার আগেই রহমান আলী ধমকে ওদের ঘরে যেতে বললেন। সবাই যাওয়ার আগে সুপ্রিয় সবাইকে উপেক্ষা করে বিউটির হাত ধরে ভেতরের ঘরে নিয়ে গেল। রমিসা খাতুন বিরক্ত হয়ে ছেলের বউকে শাসিয়ে সুপ্রিয়র জন্য বরাদ্দকৃত রুমের দিকে পা বাড়ালেন। সুপ্রিয়র নানা বাড়িটা বেশ বড়ো। বংশপরম্পরায় রহমান আলীর বাবার স্বসম্পত্তি অনেক। এই বাড়িটার বয়স পঁচিশ বছরের বেশি। সুপ্রিয়র জন্মের ছয় বছর পর এই বাড়িটা করা হয়। সুপ্রিয় যখনই নানু বাড়ি মায়ের সঙ্গে আসতো সারা বাড়ি দাপিয়ে বেড়াতো। অথচ বড়ো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সুপ্রিয় হয়ে গেছে একদম আলাদা গোছের। ওর চঞ্চলতা হারিয়ে একদম শান্ত বাচ্চা হয়ে যায়, পড়াশোনায় বেজায় ব্যস্ত হয়ে খেলাধুলা সব বন্ধ করে দিয়েছিলো এক অজানা কারণেই। যেটা এখনো অব্দি সুপ্রিয় কাউকেই বলেনি৷ বিউটি বোরখার নিকাব খুলতে খুলতে বললো,“মামি কিন্তু ভুল কিছু বলেন নি সুপ্রিয় ভাই!”

“এক চড়ে দাঁত ফেলে দেবো। তুই কি বুঝিস এসবের? উনার কোনো রাইট নেই আমার ব্যাক্তিগত বিষয় নিয়ে হস্তক্ষেপ করার। এখন কি উনি ঠিক করবেন আমি কাকে বিয়ে করবো না করবো? বিয়েটা যেভাবেই হোক, তুই আমার স্ত্রী। তাই তোকে কেউ আঘাত করতে এলে তাঁর সর্ব প্রথম আমাকে টপকাতে হবে।”

বিউটি চেঞ্জ করে উড়না পেচিয়ে নিজের চুল ঢেকে ফেলল। কিছু বলার জন্য মুখ খুলবে তখনই রমিসা খাতুন হাতে শরবত নিয়ে ঢুকলেন৷

“সুপ্রিয় নানু ভাই তুই আর তোর বউ যে আসবি, সেটা তো আমরা স্বপ্নেও ভাবিনি। আমি ভীষণ খুশি হয়েছি।”

বিউটি আর কিছু না বলে সামান্য জোর করে সামান্য হাসলো৷ নানি তার হাসি মাখা মুখ ছুইয়ে আদর করলেন৷ এরপর মাথায় হাত রেখে বললেন,
“তোর মুখ এত মলিন কেন নাতবৌ? নতুন বউয়ের মুখে তো সবসময় হাসি থাকবে। ওসব কথা মনে রাখিস বা বুঝলি? আচ্ছা করে বকে দিয়েছি!”

বিউটির খারাপ লাগা বাড়ল। এ বাড়িতে আসতে না আসতেই এক দফা ঝামেলা হলো। ওর জন্য মামি কতো গুলো কথা শুনলো ভাবতেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো৷ রমিসা খাতুন মস্করা করে বললেন,

“আমার নাতিকি তোকে খুশি করতে পারে নাই? ও কি অক্ষম নাকি? এমন শুকনা কেন তুই? বিয়ের পর তো মাইয়া মানুষ মোটা হয়, যেমন আমি হইছিলাম।”

খুকখুক করে কেশে উঠলো সুপ্রিয়। শেষ কথা শুনে রহমান আলীও কাশলেন। বুড়ো বয়সে এসে এসব কি শুনতে হচ্ছে। তিনি বললেন,
“আরে, রমিসা কি শুরু করলা? নাতি আমার কাশিতে কাশিতে শেষ হইয়া যাইবো তো!”

বিউটি লজ্জায় পাড়লে মাটিতে মিশে যাবে। সুপ্রিয় তড়িঘড়ি করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে রমিসা হেসে ফেললেন৷

“নাতি আমার বড়োই লাজুক!”

বিউটি মাথা নাড়লো কেবল। এমন পরিস্থিতিতে পড়বে সেও কি ভেবেছিলো?

বাইরে ভিড় জমতে শুরু করলো। আশেপাশের প্রতিবেশীরা এসেছে নতুন বউকে দেখতে। গ্রামে এমনই হয়। বউ দেখার ঝোক বেড়ে যায় নতুন বউ শুনলি।
একজন বললো,
“নতুন বউ দেখতে এলাম।”

রমিসা খাতুন বললেন,“এসো, এসো সব।”
সবাই বিউটিকে ঘিরে ধরলো। সুপ্রিয় তখন রহমান আলীর সঙ্গে খোশমেজাজে গল্প কর‍তে ব্যস্ত। বিশাল গাছ বাগানে টঙ পাতা হয়েছে। সুন্দর হিমেল বাতাস বইছে। সুন্দর বাতাসে আরামে সুপ্রিয় বার বার চোখ বন্ধ করে নিচ্ছে। ইশ, প্রকৃতি কি সুন্দর!

একজন বৃদ্ধা মহিলা বিউটির মুখ হাত দিয়ে এদিক সেদিক ঘুরিয়ে নাক ছিটকে সরে গেলো। মিষ্টি কথার আড়ালে তির্যক মন্তব্য করতে ছাড়লো না। বলে উঠলো,
“বউয়ের মুখটা এমন কেন? শহুরে মেয়েরা তো এমন থাকে না। ওরা তো সুন্দর হয়, তা রমিসা, তোমার নাতি তো দেখি এক্কেরে রাজপুত্রের মতো। তা বউ এমন যে?”
আরেকজন বললো,
“সুপ্রিয় তো কত ভালো ছেলে, তার বউ এরকম! কোন দিক থেকে কম নাই৷ তা কোন দুঃখে এমন মেয়েকে নিজের কাধে নিলো?”

বিউটির সব শুনেও চুপ করে রইলো নিষ্প্রভ দৃষ্টিতে। সবার এতো অজস্র কথাতেও ওর মুখে এঁটে রইলো এক ফালি হাসি। তবে ওর শরীরটা কাঁপছিল কেন যেনো। আবারও সেই পুরনো কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতা হচ্ছে। ঘুরেফিরে ওর জীবনে এমন কিছু কথার বাণ আসেই। ওর ভবিতব্য এটা, যতদিন বাঁচতে হবে, মানুষের কটূ কথা, দয়া, করুণার চোখ, আফসোসের বাণী, তীব্র কথাঘাতে সবাই একেকবার ওকে জ্যান্ত অবস্থায় মে’রে যাবে এ আর নতুন কি?

“আহারে, ছেলেটা এমন একটা মেয়ের সঙ্গে সংসার করতে পারবে? আবেগে তো বিয়েটা করছে কিন্তু দেখা যাবে কদিন পর এসব আবেগ টাবেগ জানলা দিয়ে পালাবে। দেখা যাইবো ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। মাঝ খানে থেকে এই মেয়েটার কপাল পুড়বে।”
রমিসা খাতুন রেগেমেগে বললেন,“তোমরা বউ দেখতে আসছো দেখবা, চলে যাবা। অনেকক্ষণ ধরে তোমাদের আবোল তাবোল কথা শুনছি। প্রতিবেশি বলে যে সব সময় চুপচাপ তোমাদের কথা সহ্য করবো ভেবো না। বউ দেখা শেষ, এবারে তোমরা আসতে পারো আমার বাড়ি থেকে।”
“আমরা কি ভুল কিছু বলছি রমিসা বু? আপনে যাই বলেন, সত্যটা তো মিথ্যা হবে না।”

এমন সময় সুপ্রিয় সামনে দাঁড়িয়ে বললো,
“আপনারা সবাই শুনুন, এই যে মেয়েটাকে দেখছেন? ওর নাম বিউটি, আমার বউ। তার মুখের দাগ তার পরিচয় না। সে এখন আমার জীবনসঙ্গিনী, আমার সুখের কারণ। তার চেহারা নিয়ে যারা কথা বলছেন, তাদের বলছি আমি জীবন থাকতে আমার স্ত্রীকে ছাড়বো না। কোনো আবেগে ভেসে গিয়ে তাকে আমি বিয়ে করিনি, আর না আমার আবেগের বয়স আছে। অন্যের চেহারা নিয়ে মন্তব্য করার আগে নিজেদের দিকেও একবার তাকান।”

স্বভাবতই সুপ্রিয় কারোর সঙ্গে এভাবে কথা বলে না। কিন্তু বিউটিকে উদ্দেশ্য করে কথার ফলা আসছিলো সেটাই মানতে পারছিলো না সুপ্রিয়।

“কি বেয়াদব তোমার নাতি রমিসা। আমাদের সঙ্গে এইভাবে কথা কইতাছে ক্যা? আমরা তো আর ভুল কিছু বলি নাই। যা চেহারার বহর দেখলাম, কালা হইলেও না হয় মানা যেতো। কিন্তু এমন পোড়ামুখী মেয়ের সঙ্গে কি আর সংসার হয়?”

রমিসা এবার বেজায় চটে গেলেন। থমথমে মুখে বললেন,“অনেক হইছে, এইবার বের হও আমার বাড়ি থেকে। জীবনে আর এবাড়ি মুখো হবে না তোমরা। তোমরা আমার প্রতিবেশি ভাবতেই ঘেন্না লাগছে। তোমাদের মন-মানসিকতার এমন দুর্ভিক্ষ, ছিঃ!”

রাগান্বিত রমিসা খাতুনকে রেগে যেতে দেখে সবাই চুপ হয়ে গেল। কেউ কিছু বলার সাহস পেল না। গ্রামের লোকজন ছিঃ ছিঃ করতে করতে বেরিয়ে গেলো। পুরো টা সময় বিউটি ছিলো নিস্তব্ধ, নিরব। ওর এখন ঠিক কি রকম প্রতিক্রিয়া দেখানো উচিত তা বুঝতে পারছে না। সুপ্রিয় দুহাতের আঁজলায় ওর মুখ ধরে বললো,“আমরা যদি কালই ফিরে যায় তুই কি রাগ করবি বিউটি?”

বিউটি বললো,“আমার এসব কথা শুনে অভ্যাস আছে। আমি গ্রামে সাতদিনই থাকবো। ওসব কথা কিছুতেই আমার আনন্দে ভাটা ফেলতে পারবে না সুপ্রিয় ভাই! তাছাড়া আপনি আছেন তো, আপনি থাকতে বোধহয় আমাকে আর কেউ কিছু বলার সাহস দেখাবে না।”

রাতে খাওয়া দাওয়ার পর বিউটি সুপ্রিয়র কাছে গিয়ে বললো,
“তুমি আমাকে এত সম্মান কেন করো সুপ্রিয় ভাই? সবাই তো আমাকে অপমান করছিল। তুমি চুপ থাকলেই পারতে, এখন সবার কাছে তুমি বাজে প্রবনিত হলে।”

সুপ্রিয় মৃদু হেসে বললো,
“তুই আমার স্ত্রী। তোর সম্মান রক্ষা করা আমার দায়িত্ব। তুই কীভাবে ভাবলি আমি চুপ থাকব?”

বিউটির চোখ ভিজে গেল। সে বললো,
“এই গুরু দায়িত্ব টা পালন করতে করতে যদি হাপিয়ে যাও কখনো?”

সুপ্রিয় বললো,
“সেইদিন টা কখনোই না আসুক যখন আমি হাপিয়ে যাবো! আমি দায়িত্ব পালনে অপরাগ নয়। বরং যথাযথ ভাবে দায়িত্ব পালন করাই আমার কাজ!”

“আমি তোমার কাছে শুধুই দায়িত্ব তাই না সুপ্রিয় ভাই?”

সুপ্রিয় কিছু না বলে ওর মাথায় একটা টোকা দিলো। তিরিক্ষি স্বরে বললো,“সব সময় মাথায় আজেবাজে চিন্তা তাই না? ঘুমা। কাল সকালে গ্রামে একটা চক্কর কাটবো।”

বিউটি পাশ ফিরে শুয়ে চোখ বন্ধ করলো। মনে মনে বললো,“আমি সবার কাছে কেন শুধুই দায়িত্ব হয়ে থেকে যাই? কেন কেউ আমাকে খুব করে ভালোবাসে না? কেন কেউ আমাকে ভালোবাসায় মুড়িয়ে রাখলো না? আমি কি কখনোই এমন একটা বক্ষ পাব না যেখানে শান্তিতে দুদন্ড কাঁদতে পারবো? একান্তই নিজস্ব হবে সেই বুকটা।”

বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো বিউটির ভেতর থেকে।

#চলবে