প্রিয় প্রত্যয় পর্ব-১৮+১৯

0
44

#প্রিয়_প্রত্যয়
#পর্ব১৮
#রাউফুন

সুপ্রিয় দুপুর থেকেই টের পাচ্ছিলো বিউটির শরীর ভালো নেই, কথা শুনেই সে বুঝেছিলো। তারপর সন্ধ্যায় আবার কল ধরেনি তার। বিউটি পিরিয়ডে সবসময় এমন কাহিল হয়ে পড়ে এই কথাটা সুপ্রিয় একবার না চাইতেও যেতে ফেলেছিলো। শরীর ম্যাজ ম্যাজ করে, পেটের ব্যথায় কুঁকড়ে থাকে, আর সঙ্গে জ্বরও আসে। তবু, বিউটি মুখ ফুটে কিছু বলে না। সুপ্রিয় জানে মেয়েটা ভীষণ জেদি। মুখে হাসি রেখে সবকিছু গায়ে মেখে নিতে চায়। কিন্তু আজ আর সে চুপ থাকতে পারলো না। বিউটির গা পুড়ে যাচ্ছে, তাপ এতটাই যে হাত দিলেই বোঝা যায়।

তখন সবে ক্লাস নাইনে পড়ে বিউটি। স্কুল থেকে খুব কষ্ট করে বাড়ি ফিরছিলো মেয়েটা। সুপ্রিয়র তখন পুরোদমে বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে। স্কলারশিপে বাইরে যাওয়ার স্বপ্নটা মস্তিষ্কে তখন প্রবল ভাবে গেঁথে গেছিলো। কতগুলো বই কিনে বাড়ির দিকে আসছিলো সে। তখনই খেয়াল করে রাস্তায় পেট চেপে ধরে কুকড়ে বসে আছে একটা মেয়ে। কালো নিকাবের আড়ালে মুখ ঢাকা থাকলেও শুধুমাত্র চোখ দেখেও চিনে ফেলেছিলো সুপ্রিয় তাকে। তবুও সন্দেহ ছিলো যে ওর পরিচিত কেউই কিনা। সন্দেহ কাটাতে ছুটে এসে জিজ্ঞেস করেছিলো,“কি রে, বিউটি না?”

সদ্য বালেগা মেয়েটি চমকে উঠে। চোখ পিটপিট করে তাকায় সে। কোনো রকমে বলে,“হ্যাঁ, তুমি এখানে?”

“আগে বল তুই এখানে কেন বসে আছিস এভাবে? কোনো সমস্যা?”

বিউটি আমতাআমতা করছিলো, খানিকটা লজ্জায়, খানিকটা সংকচে। ব্যথায় জর্জরিত মেয়েটা সেদিন মুখে কিছু না বললেও কিভাবে কিভাবে যেনো ওর সলজ্জিত চোখ দেখে সুপ্রিয় টের পেয়েছিলো। দ্রুত ফার্মেসী গিয়ে প্রয়োজনীয় সবকিছু নিয়ে এসে বিউটিকে দিয়েছিলো। লজ্জায় মেয়েটা কেমন কুকড়ে গেছিলো, যেনো সুপ্রিয় বুঝে ফেলে অনেক বড়ো ভুল করে ফেলেছে। অকারণে রেগেও গেছিলো মেয়েটা, কেন রেগে গেছিলো সুপ্রিয় বুঝতে পারেনি। বড়ো ভাইয়ের সামনে এমন পরিস্থিতিতে পড়ে যেনো সে মাটির সঙ্গে মিশে গেছিলো লজ্জায়। তখনও কি সুপ্রিয় জানতো এই মেয়েটাই ওর অর্ধাঙ্গিনী হবে? কিছু দিন আগেও তো সে মেয়েটাকে বোনের নজরে দেখেছে, অথচ ভাগ্যের কি এক খেলা, সেই মেয়েটাকে এখন বউ ব্যতীত অন্য কিছু ভাবতেও শরীর ঘিনঘিন করে সুপ্রিয়র। অন্য কেউ চোখ তুলে দেখলেও শরীরে জ্বা’লা সৃষ্টি হয়। মনে হয় তৎক্ষনাৎ খু’ন করে ফেলবে সে ঐ লোকটাকে।

ধ্যান ভাঙে সুপ্রিয়র। বিউটির মাথায় জলপট্টি দিতে দিতে সুপ্রিয়ের মনটা কেমন অস্থির হয়ে উঠলো। এই ছোট্ট শরীরটা কেমন নিস্তেজ হয়ে শুয়ে আছে। সে এক মুহূর্তও বিউটির পাশ থেকে সরলো না। ওর মাথার পাশে বসে থেকে, মৃদু মৃদু হাত বোলাচ্ছে। কখনো বিউটির কপালের ভাঁজ দেখে বলছে, “আর ব্যথা সহ্য করতে হবে না। আমি আছি না? সব ঠিক হয়ে যাবে”

এমন সময় দরজায় আওয়াজ হলো। ডাক্তার এসেছে। সবকিছু দেখে জ্বর মেপে ওষুধের ব্যবস্থা করলেন। ১০৩° জ্বর শরীরে। ডক্টর চলে যেতেই সুপ্রিয় আবার বিউটির শিয়রে বসলো।

রাত তখন দশ টা। জ্বর কিছুটা কমে এসেছে। সুপ্রিয় আসার সময় বাজার থেকে চকলেট, গরম পানির ব্যাগ, আর প্যাড এনেছিলো। বিউটিকে কাধ ধরে উঠালো৷ নিস্তেজ মেয়েটা ওর কাধে মাথা রেখে হাত আঁকড়ে ধরলো। সুপ্রিয় চকলেট বের করে বিউটির হাতে দিয়ে বললো, “চকলেট খা, ভাত তো খেলি না। ওষুধ খেতে হবে তো। তোর প্রিয় চকলেট এনেছি। জানি, এই সময় তুই এসব খেতে পছন্দ করিস।”

বিউটি ম্লান হাসি দিয়ে বললো, “তুমি বুঝলে কি করে আমার ওটার জন্য এমন অবস্থা হয়েছে?”

সুপ্রিয় ঠোঁট কামড়ে হাসলো। হেয়ালি করে বললো,
“ওটা কোনটা?”

“আমার মনের সব কথা না বলতেই বুঝে ফেলো। কিভাবে বলো তো?”

“তা তো জানি না। কথা না, ক্র‍্যাকার্স, চকলেট এসব এরকম সময়ে মেয়েরা একটু বেশিই পছন্দ করে।”

“হু।” বিউটি চকলেট খেতে খেতে জবাব দিলো। বিউটি একদম বাচ্চাদের মতো বিহেভিয়ার করছে। ঠোঁটের কোণায় কেমন চকলেট লেগে গেছে। বৃদ্ধা আঙুল দিয়ে ওর ঠোঁটের কোণ মুছে দিলো সুপ্রিয়। বিউটি সামান্য কেঁপে উঠলো। বললো,“তোমার হাত ঠান্ডা সুপ্রিয় ভাই!”

হঠাৎই সুপ্রিয় ভাই ডাক টা শুনে কেন যেনো রেগে গেলো সে। ওকে ওর বাহু থেকে সরিয়ে শুইয়ে দিলো।

“ভাগ্য ভালো অসুস্থ, না হলে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতাম!”

অসুস্থ বিউটি অসহায় চোখে তাকালো। মিনমিন করে বললো,“কি হলো? রেগে গেলে কেন?”

“সেটা আবার জিজ্ঞেস করছিস?”

“কি হয়েছে বলো না!”

“তুই কি আমায় এখনো মন থেকে মেনে নিতে পারিস নি?”

চমকে উঠে বিউটি। চোখ ছলছল করতে থাকে। শুধালো,“হঠাৎ এই কথা?”

“কোন আক্কেলে আমাকে এখনো ভাই ডাকিস?”

কাহিনি বুঝতে পেরে শুষ্ক ওষ্ঠ প্রসারিত হলো বিউটির। হাত দিয়ে ইশারায় কাছে ডাকলো সুপ্রিয়কে। ওর নিষ্পাপ মুখশ্রী দেখে সুপ্রিয় বিউটিকে উপেক্ষা করার মতো স্পর্ধা পেলো না। শুধু ও কেন, পৃথিবীর কেউ-ই বোধহয় পারবে না। গুটিগুটি পায়ে ওর কাছে এগিয়ে গেলো। বিউটি আঁকড়ে ধরলো ওর ডান হাত৷ বললো,“আর ভাই বলবো না। তাহলে কি ডাকবো বলো দেখি!”

সুপ্রিয় থমথমে মুখে বললো,“কেন আমার নাম নেই?”

“আন-ইজি লাগে!”

“কি?”

“শুধু নাম ধরে ডাকতে!”

“তাহলে ডাকিস না।”

“তাহলে কিভাবে ডাকবো!”

“ওগো, হেগো, শুনছো ময়নার বাপ এসব বলে ডাকবি, ফারদার যদি ভাই সম্বোধন এনেছিস মুখে টুপ করে ধরে ধপাস করে ফেলে দেবো নিচে!”

“কি নিষ্ঠুর তুমি!”

“খুউব!”

বিউটি নাক ঘষলো ওর বাহুতে। দূরত্ব কমালো আরও কিছুটা। সুপ্রিয় অনুভব করলো বিউটির উত্তপ্ত শরীরের স্পর্শ।

রাত গভীর হতে থাকলো। সুপ্রিয় বিউটির পাশে বসে আছে। মাঝে মাঝে মৃদু করে ওর মাথায় হাত রাখছে। দু চোখ ওর বন্ধ। বিউটির ঘুম নেই চোখে। দেখলো সুপ্রিয় খাটের সঙ্গে হেলান দিয়ে আছে নিভু নিভু করছে তার চোখ। হঠাৎই বিউটি তাকে ডেকে বললো,“আমি এই মূহুর্তে বাইরে হাঁটতে যেতে চাই।”

হকচকিয়ে গেল সুপ্রিয়। ওর দুই চোখ লাল। গোল গোল চোখে অবাক হলো, “এই অবস্থায়? তুই কি জানিস এখন কত রাত? ঘুমাস নি কেন?”

বিউটি জেদ ধরে বললো, “আমি যেতে চাই মানে যেতে চাই। প্লিজ নিয়ে চলো। আমি মাঝে মধ্যেই ভাইয়ার সঙ্গে যেতাম বাইরে। এখন তো ভাইয়া নেই, তাই তোমার ই নিয়ে যেতে হবে।”

“না গেলে হয় না? তোর হুটহাট এমন ক্রেভিং হয় আগে বলিস নি তো?”

“এই সময় হয়। কি করবো আমি! চলো না প্লিজ!”

সুপ্রিয় বাধ্য হয়ে অসুস্থ বিউটির কথা মানলো। বিউটির জন্য একটা শাল নিয়ে এসে বললো, “এবার চল। তবে বেশি হাঁটবো না আমরা।”

দুজনে চুপিচুপি বাইরে এলো। মেইন দরজা বাইরে থেকে আঁটকালো। বাইরে আসতেই বিউটির শরীর কেঁপে উঠলো ঠান্ডা বাতাসে। শরীর একটা কুর্তি আর গায়ে শাল জড়ানো। সুপ্রিয় একটা হাফ হাতা কালো টিশার্ট আর কালো ট্রাউজার পড়ে আছে। বাইরের রাতটা যেন অন্যরকম। চারদিকে এক অদ্ভুত নীরবতা। চাঁদের আলোয় আলোকিত চারিপাশে। গাছের পাতাগুলো হালকা বাতাসে মৃদু শব্দ তুলছে। আকাশে বড় এক চাঁদ, নক্ষত্র জ্বলজ্বল করছে, সবকিছুই বিউটি উপভোগ করছে, অন্য রকম শিহরণ ছড়িয়ে পড়লো। আল্লাহর সৃষ্টি কতোই না নিখুঁত। একটা রিকশাও নেই। পুরো রাস্তা ফাঁকা।

বিউটি হাঁটতে পারছে না। পা টেনে টেনে এগোচ্ছে। সুপ্রিয় সেটা দেখে সহ্য করতে পারলো না, কিঞ্চিৎ রাগ হলো ওর উপর। ওর দিকে এগিয়ে গিয়ে বললো, “তুই হাঁটতে পারবি না কিন্তু হাঁটার বায়না করবি ঠিকই। আমাকে বলতে পারতিস, আমি কোলে নিতাম।”

বিউটি একটু লজ্জা পেয়ে বললো, “তুমি কি সত্যিই আমাকে কোলে নিয়ে হাঁটবে?”

“তুই কি ভাবছিস, আমি তোকে কোলে নিয়ে হাঁটতে পারবো না?”

একটুও দ্বিধা না করে সুপ্রিয় বিউটিকে কোলে তুলে নিলো। বিউটি একটু হতভম্ব হয়ে বললো, “তুমি কেমন করে আমাকে এভাবে…. মানে কতক্ষণ হাঁটবে এভাবে? কষ্ট হবে তোমার!”

“যতক্ষণ তোর রাতের শহর দেখার সাধ না মেটে।”

“তাহলে এক্ষুনি ফিরে চলো। আমি যাবো না।”

সুপ্রিয় শান্ত গলায় বললো,“ শশশ। কোনো কথা নয়৷ যখন থেকে উপলব্ধি করেছি তুই আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ তখন থেকেই আমি ঠিক করেছিলাম তোকে কখনো কষ্ট পেতে দেবো না। তোর জন্য এটা করাটা আমার জন্য কোনো কষ্ট নয়, এটা সামান্যই। প্রিয় মানুষের ছোট্ট একটা আবদারই যদি পূরণ না করতে পারি তবে কিসের পুরুষ মানুষ আমি? সে পুরুষ ব্যর্থ যে প্রিয় নারীর শখ পূরণে ব্যর্থ। তোর যা জেদ, কোলে না নিলে তুই হেঁটেই বেহাল হয়ে যেতি, কিন্তু মুখে বলতি না হাঁটতে পারছিস না।”

রাতের নীরবতায় সুপ্রিয়ের কণ্ঠ ভেসে আসছিলো। বিউটি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকলো ওর মুখের দিকে। এমন যত্ন, এমন ভালোবাসা যেন সে কখনো পায়নি। তার মনে হলো, এই মানুষটার কোলে থাকার অনুভূতিটাই হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে সেরা অনুভূতি।

হঠাৎ বিউটি বললো, “তুমি আমায় ভালোবাসো?”

সুপ্রিয় শান্ত চোখে তাকালো। নিঃসংকোচে, অবলীলায় স্বীকার করলো, “তুই হয়তো জানিস না, তুই আমার জীবনের প্রথম আর একমাত্র ভালোবাসা। তোর জেদ, তোর হাসি, এমনকি তোর রাগ – সবকিছুই আমার ভালো লাগে। আমি শুধু চাই, তুই সারাজীবন এভাবেই আমার পাশে থাক, তোর অস্তিত্বে আমি আমাকে অনুভব করি, তুই নেই মানে সুপ্রিয়র অস্তিত্বও নেই। সে বিলীন হয়ে যাবে।”

বিউটির চোখ ভিজে উঠলো। সুপ্রিয় ওকে ভালোবাসে? কই লোকটা তো একটুও বুঝতে দেয়নি, নাকি সে নিজেই বুঝতে সক্ষম হয়নি? চোখের পানি লুকিয়ে ফেললো বিউটি। মনোহারি রাতটা যেন আরো গভীর হচ্ছে পাল্লা দিয়ে।

সুপ্রিয় বিউটিকে কোলে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে রাস্তার ধারে একটা ছোট্ট পার্কে গিয়ে বসল। পার্কে রাতের আলো-আঁধারি মিলে এক মায়াময় পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ঠাণ্ডা বাতাস বয়ে যাচ্ছে, আর চারপাশে পাখিরা তাদের শেষ গান গেয়ে যেন রাতকে বিদায় জানাচ্ছে। বিউটি সুপ্রিয়র কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়লো। ফিসফিস করে বললো,

“তুমি জানো, ছোটবেলায় যখন আমি অসুস্থ হতাম, মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন। কিন্তু এতটা যত্ন যে কেউ আমাকে করতে পারে, তা কখনো ভাবিনি। তুমি আমাকে এতটা ভালোবাসো বলোনি তো?”

সুপ্রিয় একটু থেমে গভীর গলায় বললো, “ভালোবাসা তো কারণ ছাড়াই আসে, বিউটি প্রকাশ করাটা কি খুব জরুরি? তুই আমার জীবনে এমন একজন, যার হাসি আমার দিনটাকে সুন্দর করে তোলে। তোর একটুখানি কষ্টও আমি সহ্য করতে পারি না। তোর সকল ব্যথা সৃষ্টিকর্তা আমাকে দিক, তুই শুধু ভালো থাকিস এটাই চাওয়া।”

বিউটি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। ঠাণ্ডা বাতাস ওর চুলের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ সে বললো, “আমি তোমাকে একটা কথা বলতে চাই।”

“বল, একটা কেন হাজার টা বল।”

বিউটি একটু ইতস্তত করে বললো, “তুমি জানো, আমাদের সংসারে শুরুর দিকে মনে হতো তোমার কাছে আমি শুধুই দায়িত্ব আর কিছুই নয়। তখন আমি ভাবতাম, হয়তো আমরা একে অপরের জন্য তৈরি নই। কিন্তু এখন আমি বুঝি, এই জীবন, এই ভালোবাসা, কিন্তু এখন উপলব্ধি করি আসলে আমার জন্য তোমার মতো কাউকেই দরকার ছিল। আমি… আমি তোমাকে অসম্ভব ভালোবাসি।”

সুপ্রিয়ের চোখে যেন এক অনাবিল আনন্দ খেলে গেলো। সে বিউটির দিকে তাকিয়ে বললো,“এই কথাটা বলতে এতটা সময় কেন নিলি বিউটি?”

বিউটি একটু লজ্জা পেলো। সুপ্রিয়র পেটের কাছে মুখ লুকালো।

সুপ্রিয় হেসে বললো,“তুই দেখি লজ্জা পাচ্ছিস, তোর লজ্জা দেখে মনে হচ্ছে চাঁদ ও লজ্জায় মেঘের আড়ালে মুখ লুকাচ্ছে দেখ। চাঁদ ঢেকে যাচ্ছে। চাঁদ কে বলতে ইচ্ছে করছে, ও চাঁদ তোমার মতো একটি চাঁদ আমারও আছে। সেও লুকোচুরি খেলে আমার সঙ্গে তোমার মতোই।তবে তোমার চাইতে আমার চাঁদ আমার কাছে বেশি সুন্দর, বেশি মনোমুগ্ধকর। কারণ সে আমার,ভালোবাসা, ভালোবাসা। ও চাঁদ হিংসে করো না আমার চাঁদকে দেখে।”

#চলবে

#প্রিয়_প্রত্যয়
#পর্ব১৯
#রাউফুন

মিনহাজের অফিসের নিচে রোজকার মতোই দাঁড়িয়ে আছে মারিয়াম। হাতে ছোট একটা ব্যাগ, পরনে হালকা গোলাপি সালওয়ার-কামিজ। তার চোখে এক গভীর অপেক্ষার ছাপ, কোনো এক অলিখিত প্রতিশ্রুতি তাকে প্রতিদিন এখানে টেনে আনে। যার দরুণ ও প্রতিবার, প্রতিমূহুর্ত, প্রতিনিয়ত বেহায়াপনার ট্যাগ পাচ্ছে। বলা যায় বেহায়ামির সর্বোচ্চ পর্যায়ে চলে গেছে।

নুহাশ তাকে একাধিকবার বোঝানোর চেষ্টা করেছে,
“মিনহাজ স্যারকে ভুলে যা। উনি তোর জন্য নন। প্লিজ, এটা আর করবি না, রোজ রোজ, হ্যাংলামি করে কিছু কি পাচ্ছিস? অফিসে তোর জন্য আমার মানসম্মান নেই।”

এসবে যেনো মারিয়ামের কিছুই যাই আসে না। বরং তার একগুঁয়েমি দিন দিন আরও বেড়েছে।

মিনহাজ রোজই তাকে দেখেও না দেখার ভান করে। তাকে এক প্রকার অগ্রাহ্য করে, ভুলেও তাকায় না তার দিকে। আজও তেমনই এড়িয়ে চলে যাচ্ছে নিজের গাড়ির দিকে। আজ অবশ্য বিরক্ত মুখে হলেও মারিয়ামের দিকে এক ঝলক তাকালো মিনহাজ। ওর তাকানোই মারিয়াম ঠোঁট এলিয়ে হাসলো। সঙ্গে সঙ্গে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে গাড়ির দিকে অগ্রসর হলো মিনহাজ। সে গাড়িতে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছিল ঠিক তখনই মারিয়াম একটু ছলনার আশ্রয় নিল। সে পেট চেপে ধরে হাঁটু মুড়ে মাটিতে বসে পড়লো। মুখে কষ্টের ছাপ, আর চিৎকার করে বললো, “ওমা গো! পেটে কী অসহ্য ব্যথা! কেউ একটু… সাহায্য করুন!”

মিনহাজের গাড়িতে ওঠার হাতটা থেমে গেল। সে বিরক্ত ভঙ্গিতে মারিয়ামের দিকে তাকালো। কিছুক্ষণ অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে এগিয়ে এলো।

“মিস মারিয়াম , আর ইয়্যু ওকেই? হোয়াট হ্যাপেন্ড?”

মিনহাজের গলার স্বর শুনে মারিয়াম ভেতরে ভেতরে খুশি হলেও, মুখে তীব্র কষ্টের ভাব ধরে রাখলো।

“স্যার… ইট’স মাই স্টমাক… আই কান্ট স্ট্যান্ড।”

অবিশ্বাসে ভরা চোখে মারিয়ামের অভিনয় দেখে মিনহাজ এবার গাড়ির দরজা খুলে বললো, “গেট ইন দ্য কার। আই’ল টেইক ইয়্যু টু দ্য হসপিটাল।”

“উঠতে পারছি না স্যার।”

বাধ্য হয়েই মিনহাজকে হাত বাড়িয়ে দিতে হলো। ধীর পায়ে এগিয়ে এসে বললো,“গেট আপ।”

মারিয়াম ওর বাড়িয়ে দেওয়া হাতটার দিকে তাকিয়ে থেকে ঠোঁট কামড়ে ধরলো। মিনহাজ ভাবলো হইতো সে সংকোচ করছে কিংবা লজ্জা পাচ্ছে। সে গম্ভীর কন্ঠে বললো,“সংকোচ বা লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই, আপনার জায়গায় অন্য কেউ থাকলেও আমি হাত বাড়াতাম। আমি এতোটাও নির্দয় নয় যে একজন অসুস্থ মানুষ কে ফেলে যাবো রাস্তায়।”

মারিয়াম বিড়বিড় করলো,“আলবাত আপনি নির্দয়, ইভেন আমার দেখা বেস্ট নির্দয় মানুষের একজন আপনি। অ্যাওয়ার্ড দেওয়া উচিত আপনাকে নির্দয়তার জন্য। ভেবে বলছি, আপনিই পাবেন অ্যাওয়ার্ড।”

প্রথম বারের মতো মিনহাজের হাত স্পর্শ করলো মারিয়াম। মারিয়ামের ঠান্ডা, শীতল হাতের স্পর্শ পেয়ে মিনহাজের অদ্ভুত ঠেকলো। তবে তা পাত্তা দিলো না। গাড়ির দরজা খুলে দিলো বসার জন্য। গাড়িতে ওঠার পর গাড়ি চালানোই মনোযোগ দিলো মিনহাজ। দশ মিনিট পর খেয়াল করলো মিনহাজ, মারিয়াম আর ব্যথায় গাইগুই করছে না। বরং উপচে পড়া খুশি মেয়েটার মুখে। গাড়িতে উঠে ধীরে ধীরে ব্যথাটা যেন ‘ম্যাজিক’ করে কমে গেল। কি এমন হলো যে মিনিট পাঁচেক পর সে পুরোপুরি ঠিক হয়ে গেল?

মিনহাজ তখনই বুঝতে পারলো, কিছু একটা গড়বড় আছে। ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করলো,

“সো, হাউ আর ইয়্যু ফিলিং নাউ? লুকস লাইক দ্য পেইন জাষ্ট ডিসএপেয়ার্ড।”

মারিয়াম একটু কাচুমাচু ভঙ্গিতে হাসি হাসি মুখে বললো, “উম … আই থিংক আ’ম ব্যাটার নাউ, স্যার।”

মিনহাজ সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকালে মারিয়াম প্রসঙ্গ বদলে বললো,“স্যার, একজনকে ঠিক কতটা ভালোবাসা যায় এক পাক্ষিক ভাবে? সে আপনার হবে না জেনেও তাকে কেন এতো ভালোবাসেন?”

“হঠাৎ? এমন প্রশ্ন? এই আপনার পেটে ব্যথা, এতো কথা বলছেন কেন?”

“বলুন না স্যার।”

“নিঃস্বার্থ ভালোবাসার মানে কি সত্যিই আমরা বুঝতে পারি?
তাকে পাওয়ার কোনো আশা নেই, তবু তার প্রতিটি স্মৃতিতে, প্রতিটি চিন্তায় আনন্দ খুঁজে নেওয়া।
তার সুখে নিজেকে ধন্য মনে করা।
তাকে দূর থেকে দেখে হৃদয় জুড়িয়ে যাওয়া, কাছে না থাকলেও তাকে নিজের অস্তিত্বের অংশ করে রাখা।
শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত তাকে ভালোবাসা—
এই ভালোবাসা কি মানবিক সীমা ছাড়িয়ে যায় না?
কতজন পারে এমন নিঃস্বার্থ অনুভূতিকে ধারণ করতে?
যে ভালোবাসা প্রত্যাশাহীন, যা কেবল দান করে যায়,
যার বিনিময়ে কিছু চায় না, শুধুই সে ভালবাসা।

আপনি কি জানেন, এমন ভালোবাসার শক্তি পৃথিবীর সমস্ত ব্যথাকে অতিক্রম করতে পারে?
আপনি বুঝতেও পারবেন না,
যার জন্য ভালোবাসা তার অজান্তেই সে আপনার প্রার্থনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবে?
কিন্তু এ ভালোবাসার যন্ত্রণা, আনন্দ, এবং অমরত্ব—
তাকে উপলব্ধি করার সৌভাগ্য খুব কম মানুষেরই হয়। আমি মনে করি সেই সৌভাগ্যবানদের একজনই আমি।”

এই প্রথম, এই প্রথম বোধহয় মিনহাজ এক সঙ্গে এত গুলো কথা বললো। মারিয়াম মিনহাজের দিকে অপলক তাকিয়ে রইলো। শ্লোক হয়ে আসা ধীর, মোহনীয় কন্ঠে বললো,
“আমার কাছে ভালোবাসা মানে অন্য কিছু, কিছুটা পাগলামো, কিছুটা উম্মাদনা, কিছুটা চপলতা, আর অনেকটা অনুভূতিকে ধারণ করা, যাকে ভালোবাসবেন তাকে এক পল দেখার জন্য ছুটে আসা, অনেক, অনেকটা বেহায়াপনা, আর নির্লজ্জ হওয়ার নামই ভালোবাসা। ভালোবাসলে মানুষ সর্বোচ্চ স্তরের বেহায়া হয়। আপনি আপনার ভালোবাসা পেতে কোন পর্যায় পর্যন্ত বেহায়াপনা করেছেন স্যার?”

মিনহাজ এবার দৃঢ় দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো মারিয়াম এর দিকে। এই মেয়ে আসলেই অসুস্থ? দেখে মনে হচ্ছে সে এই মূহুর্তে সুখের সাগরে ভাসছে। ওসব ব্যথা ট্যথা সব ভাউ। ভাউতা বাজি করে কথা বলার চেষ্টা করেছে মেয়েটা। গাড়ির জোরে ব্রেক কষলো সে। মারিয়াম সামান্য ঝুকলো সামনের দিকে। মিনহাজ তার গাড়ির দরজা খুলে দিয়ে গুরু গম্ভীর স্বরে বললো, “গেট আউট অফ মাই কার। রাইট নাউ!”

মারিয়াম হতভম্ব হয়ে গেল, এই রে ধরা পড়া গেছে সে।

সে কাচুমাচু করে বললো,“বাট, স্যার… আই..”

মিনহাজ রাগান্বিত কণ্ঠে বললো, “আই হেইট ডিসঅনেস্টি. অ্যান্ড আপনি যা করেছেন সেটা পুরোদস্তুর ছলছাতুরী। ডোন্ট এভার ট্রাই দিস এগেইন। মিনহাজরা ছলছাতুরীতে নয়, সততায় গলে, মেয়ে।”

মিনহাজ বেরিয়ে এসে মারিয়ামকে নামিয়ে দিল গাড়ি থেকে। মাঝ রাস্তায় দাঁড়িয়ে মারিয়াম অসহায়ভাবে মিনহাজের চলে যাওয়া দেখলো। সে ভেতরে ভেতরে জানে, তার এই অভিনয় হয়তো ভুল ছিল। কিন্তু মিনহাজের একটু মনোযোগ পাওয়ার জন্য সে আর কোনো রাস্তা খুঁজে পায়নি।

মিনহাজ চলে যাওয়ার পর মারিয়াম মৃদু স্বরে বললো, “ইয়্যু মে হেইট ডিসঅনেস্টি, বাট আই কান্ট স্টপ লাভিং ইয়্যু। একটু অসততায় যদি আপনাকে পাওয়া যাই তবে তাই সই। এর জন্য আমি মোটেও দুঃখিত নয়!”

মারিয়াম মিনহাজের স্পর্শ করা হাতের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। পরপরই হাত টা বুকের সঙ্গে চেপে ধরলো। এরপর সেই হাতের ঘ্রাণ টেনে নিলো। কেমন ঐ মানুষ টার গন্ধ লেগে আছে হাতে। গন্ধটা কেমন মিনহাজ, মিনহাজ লাগছে। ও পাগলামী ভরা ঠোঁট ছোঁয়ালো। খুশিতে রাস্তাতেই লাফালাফি করলো খানিক। এরপর হেঁটেই ফিরলো নিজের গন্তব্যে।

বিউটি জানে সুপ্রিয় যখন অফিস থেকে ফেরে, তখন কিছু না কিছু নিয়ে আসে। কখনো ছোট্ট চকোলেট, কখনো বা তার প্রিয় আইসক্রিম অথবা ফুল। কিন্তু আজ, সুপ্রিয়কে একেবারেই অন্যরকম লাগছে। আজ শুন্য হাতে এসেছে। ফিরে একবার তার মুখের দিকে তাকায়নি পর্যন্ত। শুকনো মুখ, মুখে একটুও হাসি নেই। নিশ্চয়ই মাথা ব্যথা করছে। সুপ্রিয়র মাইগ্রেন আছে এটা বিউটি কিছুদিন আগে জেনেছে। মাইগ্রেন যার আছে সেই বোঝে ব্যথাটা কতটা জঘন্য, কতটা কষ্টকর এটা। দিন দুনিয়ার কিছু তখন ভালো লাগে না। বিউটি ছুটে গিয়ে কফি করলো। কফি নিয়ে ভয়ে ভয়ে দরজায় দাঁড়ায়। আলতো স্বরে জিজ্ঞেস করে,
“তুমি ভালো আছো তো? অফিসে কিছু কি হয়েছে? নাকি মাথা ব্যথা করছে?”

সুপ্রিয় উত্তর না দিয়ে সোজা নিজের ওয়াশরুমে চলে যায়। হাত থেকে কিছু একটা লুকিয়ে রাখে টেবিলের ড্রয়ারে। এরপর আর কিছু বলার আগ্রহ দেখায় না। বিউটি অবাক হয়ে যায়। প্রতিদিন এত আদর-সোহাগ করা মানুষটা আজ এমন করে কেন? বিউটি কফি রেখে নিচে আসে। ওর মুখটা একদম আমসির মতো হয়ে আছে।

মহিমা বেগম আর মোজাম্মেল আহমেদ ড্রইংরুমে বসে গল্প করছেন। মোজাম্মেল আহমেদ বললেন,“বিউটি, আম্মু চা দাও তো।”

বিউটি কিছু না বলে চা বানাতে গেলো। সুপ্রিয়ের আচরণে তার মন ভারী হয়ে আছে। চা করে নিয়ে এসে বললো,“জেঠিমা, আপনার চা।”

মহিমা বেগম খানিকটা বিরক্ত হয়ে বিউটিকে বললেন,
“ বিয়ের এতোদিনেও জেঠিমা, জেঠিমা করে। ছেলেকে অন্যত্র বিয়ে করালে সেই মেয়ে তো এসে আমাকে মা ই বলতো, আর এখন দেখো, মা ডাক টাও শোনা হয় না। হা করে দাঁড়িয়ে না থেকে চা দে দেখি।”

মোজাম্মেল আহমেদ ঠাট্টা করে বললেন,
“ওর মুখ থেকে মা ডাক শুনতে চাও বললেই হয়। এভাবে ত্যাড়া ব্যাকা কথা বলো কেন?”

মহিমা বেগম গম্ভীর হয়ে বললেন,
“বিয়ের প্রথম দিন থেকেই সে আমাকে জেঠিমা ডাকে, আমার কি ইচ্ছে করে না নাকি ছেলের বউর মুখ থেকে মা ডাক শুনি? তোমার ছেলের বউ সব বোঝে এটা বোঝে না?”

বিউটি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। তার চোখ ভিজে আসছে। জেঠিমা তাকে মেনে নিয়েছে? তাই মা ডাকতে বলছে? খুশিতে ওর চোখ চকচক করছে।

রাতে খাওয়া-দাওয়া শেষ করে সবাই যখন যার যার ঘরে, তখন সুপ্রিয় বিউটিকে ডাকলো। বিউটির মনে সন্দেহ জমেছে, সুপ্রিয় তখন কি লুকাচ্ছিলো ড়্রয়ারে? এরপর যতবারই সে ঘরে গিয়েছে কাজের বাহানা হোক বা অন্য কোনো বাহানা। ওকে সম্পুর্ন ভাবে অগ্রাহ্য করেছে সুপ্রিয়। বিউটি ভেতর থেকে কষ্ট পেলেও স্বাভাবিক ভাবেই থেকেছে। সন্ধ্যার পর থেকে ইগনোর করে এখন আবার ডাকা হচ্ছে। ঢং! সে ধীর পায়ে গিয়ে গেলো। সুপ্রিয় খাটের পাশে বসে আছে।

বিউটি ধীরে ধীরে কাছে গিয়ে বললো,
“কেউ কি কিছু বলবে? অফিস থেকে ফিরেই ইগনোর করেছে কেন সে?”

সুপ্রিয় ধীরে ধীরে তাকালো। তার চোখে একরাশ অনুভূতি, কিন্তু মুখে অভিমান। হঠাৎ আলমারির ড্রয়ার খুলে ফুলের তোড়া বের করলো। বিউটি বিস্মিত হয়ে বললো,
“তুমি এটাই লুকাচ্ছিলে?”

সুপ্রিয় বললো,
“তোর কি মনে হয়? আর কি লুকাতে পারি?”

এরপর টেবিলের ড্রয়ার থেকে ছোট্ট বক্সটা বের করলো। এই বক্সটা বিউটি সেদিন রেখে দিয়ে বলেছিলো যেদিন সুপ্রিয়র মনে হবে পুরোপুরি ওকে মেনে নিয়েছে সেদিন যেনো এটা তাকে পড়িয়ে দেয়। আজ সুপ্রিয়র মনে হলো আজই সঠিক সময়। বক্সের ভেতর থেকে সেই বালা বের করলো। হাতে তুলে নিয়ে বিউটির হাতে পড়ালো যত্ন করে।
“তোমার জন্য যখন বানিয়ে ছিলাম তখন ভেবেছিলাম নতুন বিয়ে করা বউকে কিছু না কিছু দিতে হয়। কিন্তু আজ সারাদিন কী ভাবে কাটিয়েছি তা কেবলই আমি জানি। তোমার ঐ সাতটা দিন যখন তোমাকে গভীর ভাবে স্পর্শ করার অনুমতি ছিলো না তখনই বুঝেছি তোমার থেকে দূরে থাকা কতটা কঠিন। প্রতিটি মূহুর্তে আমি উপলব্ধি করেছি, আমি ম’রে যাচ্ছি। আজকের দিনটা কিভাবে কাটিয়েছি জানো? প্রতিটা ঘন্টা, প্রতিটা মুহূর্ত তোমাকে ভেবে।”

বিউটি চোখ পিটপিট করে তাকালো। এক চিমটি অভিমান মেশানো গলায় বললো,
“সব বাদ, আগে বলো তুমি আমায় সন্ধ্যার পর থেকে কেন কষ্ট দিলে, বলো?”

সুপ্রিয় মৃদু হেসে বিউটিকে কাছে টেনে বললো,
“তোমার থেকে সাতটা দিন দূরত্বে যে কষ্ট আমি পেয়েছি, সেই কষ্ট আমি তোমাকেও একটু খানি উপলব্ধি করাতে চেয়েছিলাম,আমার প্রতি তোমার ভালোবাসার মূল্য বুঝতে চেয়েছিলাম।”

বিউটি কিছু বলতে চেয়েও থেমে গেলো। এতক্ষণে খেয়াল করলো প্রথম বারের মতো সুপ্রিয় তাকে তুমি সম্বোধন করেছে। অবাক হয়ে শধায়,“তুমি আমাকে তুমি বলছো!”

“অনেক তো হলো তুই বলা, এবার না হয় তুমিতেই আবদ্ধ থাকি?”

বিউটি সুপ্রিয়কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো।
মায়ার আবেশে আচ্ছন্ন সে মুহূর্ত।
সুপ্রিয় বিউটির মুখের কাছে মুখ এনে বললো,
“তোমার হাসি, তোমার লজ্জা মাখা মুখ, আমার আমিকে, আমার পুরো পৃথিবীকে এক লহমায় বদলে দেয়, এলোমেলো করে দেয়, বেসামাল আমিকে সামালনো যে দায়। আজ, এই রাত তোমার জন্য, প্রিয় প্রত্যয়।”

বাতাসে যেন কেমন এক শিহরণ ছড়িয়ে পড়লো। সুপ্রিয় বিউটির ঠোঁটে একটি নরম চুম্বন এঁকে দিলো। দুজনেই একে অপরের মাঝে হারিয়ে গেলো। রাতের নিস্তব্ধতায় শুধু তাদের গভীর মায়ায় মোড়া।

একদম কাক ভেজা ভোরে বিউটি উঠে। গোসল করে ফজরের নামাজ পড়ে। ভেজা চুল ছেড়ে দিয়ে সে রান্নাঘরে যায়। কফি বানিয়ে নিয়ে আসে সুপ্রিয়ের জন্য। সুপ্রিয় তখনো বিছানায় আধশোয়া৷ ওর অর্ধনগ্ন শরীর দৃশ্যমান। বিউটি লক্ষ্য করলো ওর পিঠে, ন’খের আঁচড়ের দাগ লাল হয়ে আছে। বিউটি নিজের নখের দিকে তাকালো অসহায় হয়ে। ততক্ষণে সুপ্রিয় জেগে গেছে। বিউটিকে খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মুগ্ধ হয়ে বললো,
“আপনার এমন স্নিগ্ধ রূপে, আমার দুচোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে। আমি রোজ আপনার ভেজা চুলের কারণ হতে চাই ম্যাডাম।”

#চলবে