প্রিয় প্রত্যয় পর্ব-২২ এবং শেষ পর্ব

0
58

#প্রিয়_প্রত্যয়
#পর্ব২২(অন্তিমকাল প্রথম অংশ)
#রাউফুন
রাত গভীর হয়ে আসে। বাড়ির আলো নিভে যায় এক এক করে। শুধু বিউটি বসে থাকে লিভিং রুমে। তার চোখ বারবার দরজার দিকে চলে যায়। সময়ের সাথে তার ভেতরের অস্থিরতা বেড়ে যায়।

ঘড়ির কাঁটা রাত দুটো ছুঁয়েছে। সুপ্রিয় আসেনি। বিউটি কিছুটা ক্লান্ত হয়ে সোফায় শুয়ে পড়ে, কিন্তু তার চোখের পাতা এক মুহূর্তের জন্যও বন্ধ হয় না।

ভোরের আলো ফুটতে শুরু করলে দরজার পাশে শব্দ হয়। সুপ্রিয় ঢুকতেই বিউটি উঠে দাঁড়ায়। তার ক্লান্ত চোখ দেখে সুপ্রিয় এক মুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে যায়। গম্ভীরমুখে বললো,
“রাতভর জাগতে বলেছি কাউকে?”

বিউটি কোনো কথা না বলে এগিয়ে আসে। নির্বিকার চিত্তে তাকায়। চোখে ক্লান্তি স্পষ্ট।
“তোমার জন্য কফি বানাই?” বলে রান্নাঘরের দিকে যেতে চায়।

সুপ্রিয় তার হাত ধরে টেনে কাছে নিয়ে আসে।
“তুমি কি বোঝোনি, আমার তোমার সঙ্গে রাগ করার কারণ কি? বিশ্বাস করো,আমি শুধু তোমার আর আমাদের সন্তানের মঙ্গল চাই। তাই তখন ডেস্পারেট হয়ে অনেক কিছু বলে ফেলেছি। সেজন্য এভাবে রাত জাগাটা কি ঠিক হয়েছে? এর প্রভাব কি ছোট্ট এই ভ্রুনটার উপর পড়েনি? আরও একটা ভুল করলে তুমি!”

বিউটি চোখ নিচু করে বলে,
“তোমার রাগ দুটো কারণে করাই সাজে। অনর্থক নয় তোমার রাগ৷ আমি জানি, সুপ্রিয়, আমি ভুল করেছি। আমি আর এমন করব না। ক্ষমা করো।”

সুপ্রিয় তার মুখে দুই হাত রেখে বলে,
“তোমার যা প্রয়োজন, আমাকে বলবে। আমি আছি তোমার সকল প্রয়োজন মেটানোর জন্য। আর কোনো কিছু গোপন করবে না। যা আমি অপছন্দ করি, সেসব থেকে দূরে থাকলেই চলবে। মনে রেখো আমি কিন্তু তোমার খারাপ চাই না। ভালোবাসি তোমায়, তোমার জন্য চিন্তা হয়, আমাদের অনাগত বাচ্চার জন্য চিন্তা হয়। ওর যদি কিছু হয়ে যাই আমি পাগল হয়ে যাবো। বাবা হওয়ার প্রথন অনুভূতি টা আমি হারাতে চাই না। আজকে তোমায় ক্ষমা করে দিয়েছি, শুধু মাত্র আমাদের বাচ্চার জন্য। আর আমিও ক্ষমা চাইছি তখন ওভাবে চেচামেচি করার জন্য। আমাদের বাচ্চাকে নিয়ে আর কোনো রিস্ক নেবে না,মনে থাকবে? ওর ক্ষেত্রে চুল পরিমান ছাড় পাবে না তুমি!”

বিউটি মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। হাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরে সুপ্রিয়কে। এরপর মিনহাজের সঙ্গে কথোপকথন সবটা সুন্দর ভাবে বুঝিয়ে বললো। সুপ্রিয়ও শান্ত হয়ে স্ত্রীর কথা শুনলো। বক্ষপিঞ্জরে পিষ্ট করে রাখলো, স্নেহময় স্পর্শে আহ্লাদে কেঁদে উঠে বিউটি। সুপ্রিয় কিছু বলে না কেবলই তাকে শান্ত করতে ব্যস্ত হয়ে যায়।

মিনহাজের মনের গভীরে যে সিদ্ধান্তের বীজ দীর্ঘদিন ধরে বেড়ে উঠছিল, আজ তা রূপ নিল এক দৃঢ় সংকল্পে। অফিস থেকে ফিরে নিজের মার সামনে গিয়ে সোজাসাপ্টা জানাল সে একজনকে বিয়ে করতে চায়।

শান্তাহারা বেগম চমকে গেলেন। মিনহাজ সাধারণত বিয়ের বিষয়ে কথা বললে এড়িয়ে চলে, রাগ করে। অথচ আজ সে নিজেই এসে এমন কথা বলছে! বিস্মিত গলায় বললেন,
“কাকে বিয়ে করতে চাস?”

মিনহাজ একটু ইতস্তত করে বলল,
“মারিয়াম।”

মারিয়ামের নাম শুনে শান্তাহারা বেগম খানিকটা ভ্রু কুঁচকালেন। তারপর ধীরস্বরে জিজ্ঞেস করলেন,
“ও মেয়েটা, যাকে তোর অফিসের সামনের রাস্তার পাশে প্রায়ই দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতাম? যে নুহাশের বোন? মাঝে মধ্যেই আসে তোর কাছে”

মিনহাজ মাথা নিচু করে বলল,
“হ্যাঁ মা, ওকেই।”
পরক্ষণেই বিস্ময় নিয়ে প্রশ্ন ছোড়ে,
“কিন্তু তুমি এসব জানলে কি করে? মারিয়াম কে চেনো তুমি?”

শান্তাহারা বেগম খানিকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তার পর বললেন,
“আমি কিভাবে জেনেছি, সেসব জানার দরকার নেই তোর। পছন্দ যখন একবার করেছিস আমার মাথা থেকে চিন্তা নামলো। আমি কাল একবার ওর বাড়ি যাব।”

মারিয়ামের বাবা-মা সম্প্রতি গ্রাম থেকে শহরে এসেছেন মেয়েকে দেখতে। তাদের চোখে-মুখে একটা চাপা উদ্বেগ। গ্রামে মারিয়ামের জন্য যে প্রস্তাব এসেছিল, সেটা তারা বরাবরই মানসিকভাবে ঠিক মেনে নিতে পারেনি। তাছাড়া নুহাশ, মারিয়ামের বড় ভাই, তাদের চাইনি বোনের জীবন গ্রামে আটকে যাক।

পরদিন সকালে, মিনহাজের পুরো পরিবার, অর্থাৎ তার মা শান্তাহারা বেগম, দুলাভাই রাশেদ, বোন রাহেলা এবং তার ছোট ছেলে সামন্তকে নিয়ে মারিয়ামের বাসায় গেল।

মারিয়ামের বাসাটা ছোট হলেও বেশ গোছানো। দরজার পাশে টবে সাজানো গাঁদা আর ডালিয়ার গাছগুলো যেন অতিথিদের সাদর আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। বসার ঘরে সাধারণ একটি সোফা, পাশেই ছোটো একটি টেবিলে রাখা ফলমূল, মিষ্টি।

মারিয়ামের বাবা-মা অতিথিদের বেশ আন্তরিকভাবেই অভ্যর্থনা করলেন। শান্তাহারার বেগমের চোখ সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছিল। তার দৃষ্টি আটকে গেল যখন মারিয়াম দরজা দিয়ে এসে মাথা নিচু করে অতিথিদের সামনে দাঁড়াল।

মারিয়াম পরেছিল একটি সাধারণ সাদা সুতির শাড়ি, যার পাড়ে নীল নকশা। তার মাথায় হালকা করে আঁচল দেওয়া, গায়ের রং শ্যামলা হলেও তার মুখের কোমলতায় এক ধরনের চুম্বকীয় আকর্ষণ ছিল। চোখ দুটি যেন চাঁদের আলোয় ভরা।

শান্তাহারা বেগম তাকিয়ে দেখলেন। ভেতরে একটা প্রশান্তি অনুভব করলেন। মিনহাজ ঠিকই বেছে নিয়েছে। মারিয়ামের নম্র স্বভাব এবং সৌন্দর্য তাকে মুগ্ধ করেছিলো প্রথম দিন দেখেও।
মারিয়াম বসলো তাদের সামনে। চোড়া চোখে একবার মিনহাজের দিকে তাকিয়ে থাকে। বিস্মিত হতে যেনো ভুলে যায় সে। কেঁদে কে’টে একশা মেয়েটা। অথচ, যার সামনে পাত্রী হিসেবে সে বসছে সে তার পছন্দের ব্যাক্তি। মিনহাজ পরেছিল একদম হালকা রঙের একটি ফরমাল শার্ট আর প্যান্ট। চুলগুলো ব্যাকব্রাশ করা, চোখে একধরনের স্থিরতা,একদম নিশ্চুপ শান্ত মুখ তার।

শান্তাহারা বেগম মারিয়ামের বাবা-মাকে বললেন,
“আপনাদের মেয়েটা খুবই ভালো, সেদিন মার্কেটে গিয়ে ওকে দেখেই ভালো লাগে আমার। এর মধ্যে ওর সঙ্গে আমার প্রায় কয়েকবার দেখা হওয়ায় বেশ ভাব হয়ে গেছে, মেয়েটা অনেক কিছু শেয়ারও করেছে। কেন করেছে তা তো জানি না, সেসব আর নাই বলি। শুনুন, আপনাদের মেয়েকে ভীষণ পছন্দ হয়েছে আমার। ওকে আমি আমার মেয়ে করে নিয়ে যেতে চাই। যদি আপনারা অনুমতি দেন।”

কন্ঠঃস্বর শুনে খুকখুক করে কাশে মারিয়াম। একবার তাকায় মহিলার দিকে। এক আকাশ বিস্ময় নিয়ে সবার দিকে তাকিয়ে দেখে সবাই মিটিমিটি হাসছে কেবল মিনহাজ বাদে। মিনহাজের মা ইনি? কেন যে সে বলতে গেছিলো যে একজনকে পছন্দ করে, তার জন্য দাঁড়িয়ে থাকে অফিসের সামনে গিয়ে হ্যাংলার মতো। বেশ কয়েকবার দেখা হওয়ায় বেশ ভাব হয়ে গেছিলো। ভীষণ ফ্রী হয়ে যাওয়াই একদিন মিনহাজের অফিসের সামনে গিয়ে দেখিয়েও এনেছে এখানে সে আসে, ছেলেটার জন্য দাঁড়িয়ে থাকে। নিজের কপালে হাত রেখে লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে পড়ে সে।

“হ্যাঁ, অবশ্যই। আপনারা বলুন কবে বিয়ের ডেট আগালে ভালো হয়?”

মারিয়ামের বাবার ত্রস্ত স্বর। নূহাশ বাবার কথা শুনে বললো,“এতো তাড়াহুড়োর কিছু নেই বাবা, এটা বিয়ে এরেঞ্জমেন্টের ব্যাপার আছে তো।”

“বিয়েটা এক সপ্তাহের মধ্যে হবে!” মিনহাজের দৃঢ় গলায় বলে।

মারিয়ামের বাবা-মায়ের মুখে স্বস্তির হাসি ফুটে উঠল। রাহেলা একটু মজার ছলে বলল,
“ভাবি হওয়ার জন্য তো দারুণ মেয়ে, তাই না মা? চেহেরাও সুন্দর, প্রথম জনের মতো মুখে দাগ নেই। কি বলো মা?”

মারিয়ামের মা,অদ্ভুত ভাবে তাকায়। শান্তাহারা মেয়ের দিকে কঠিন দৃষ্টিতে তাকালে রাহেলা চুপ করে যায়। মারিয়ামের মা কিছু জিজ্ঞেস করতে নিলে মারিয়াম তার হাত টেনে ধরে থামায়। চোখের ইশারায় আশ্বস্ত করে সব বলবে। তিনি শান্ত হোন।মেয়েরা ইশারায়।

মিনহাজ মারিয়ামের দিকে তাকিয়ে বলল,
“একান্তে কথা বলা যাবে আপনার সঙ্গে?”

মারিয়াম আরেকদফায় অপ্রস্তুত হয়ে কেশে উঠে। কি হচ্ছে আজকে তার সঙ্গে? কেমন অদ্ভুত লাগছে সবকিছুই। সবাই হাসে মিটমিটিয়ে। মারিয়াম উঠে আস্তে আস্তে নিজের রুমের দিকে যায়। তাকে অনুসরণ করে মিনহাজও যাচ্ছে।

“আপনার চোখ মুখের এই হাল কেন? কাঁদছিলেন?”

প্রথম প্রশ্নই হয় এটা মিনহাজের। মারিয়াম থমকায়, ভড়কায়। মাথা তুলে তাকায় মিনহাজের দিকে।
মিনহাজের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই লজ্জায় মুষড়ে গেলো সে। কিছুই বলতে পারল না। তবে এই মূহুর্তে তার চোখে-মুখে এক ধরণের আনন্দ ঝলমল করছিল। মিনহাজ বললো,

“একান্তে কথা বলতে এসেছি, বাসর সারতে নয় যে এভাবে লজ্জা পেতে হবে। বাঁচাল মেয়ে।”

#চলবে

অন্তিম পর্ব শেষ অংশ আসলে আপলোড করে দেওয়া হবে।