“প্রিয় রুমু”
পর্ব: ১
Sinin Tasnim Sara
“তখন আমি জানতাম না, উনি বড় আপুর দেবর হয়। ভাইয়ার আপন ছোটভাই।”
রাগী, গম্ভীর, রাক্ষুসে একটা লোক। এমনিতে দেখতে ভীষণ হ্যান্ডসাম কিন্তু চোখেমুখে সবসময় বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট। একটা ঊনত্রিশ বছর বয়সী সৌম্যদর্শন মানুষ গাম্ভীর্যের চূড়ান্ত পর্যায়ে এমনভাবে পৌঁছে যেতে পারে, ওনাকে না দেখলে জানা হতো না কখনো।
যদিও প্রথম দেখায় বয়স আরও কিছুটা কম মনে হয়েছিল! মনে হয়েছিল বরযাত্রীর একমাত্র আনম্যারেড টল ডার্ক হ্যান্ডসাম ম্যান, যাকে দেখে অন্তত গিল্টফ্রী ক্রাশ খাওয়া যাবে। কিন্তু কোথায়! আমাদের বোনেদের ভেবে নেয়া টল ডার্ক হ্যান্ডসাম ম্যান আদতে যে একজন দেড় বছর বয়সী বাচ্চার বাবা বেরুবে তা দুঃস্বপ্নেও কল্পনায় ছিল না কারোর। ভাগ্যিস সময় থাকতে ডেকে নিয়ে বলেছিল আপু! নইলে কি সিনক্রিয়েট যে হয়ে যেত উৎসবমুখর দিনটাতে, ভাবলেও গায়ে কাঁটা দেয়।
তবে হ্যাঁ, মিথ্যে বলব না৷ উনি ম্যারেড কিংবা বাচ্চার বাবা শুনে মনটা একদিকে খারাপ হয়ে গেলেও, পরক্ষনে একরাশ আগ্রহ চিড়বিড়িয়ে উঠে জানতে চাইছিল,
“ভাইয়া তো ওনার বড় ভাই৷ ওনারও বয়স তেমন বেশি নয়, এটলিস্ট আমাদের দেশের সারকামস্ট্যান্সে কমই। তাহলে এত জলদি, বড় ভাইয়ের আগে গোমড়ামুখো লোকটার বিয়ে হলো কি করে! আবার বাচ্চাও। ইজন্ট ইট সাসপিশাস? লোকটা কি সামহাউ লাভ ম্যারেজ করেছে? তাহলে ওর বউ কোথায়?”
প্রশ্নের ভার সামলাতে না পেরে দুম করে চাপিয়ে দিয়েছিলাম আপুর কাঁধে ঐ সময়েই। কিন্তু উত্তর পাইনি তখন। বিয়ে নিয়ে বেচারি নার্ভাস ছিল কিনা! ধৈর্য ধরে আমার প্রশ্নের উত্তর দেবে অত সময় কোথায়।
আমি বরাবর ভীষণ ডানপিটে একটা মেয়ে। বড়রা বলে পাকা। আমার যেমন দুষ্টুমির ক্লান্তি নেই, তেমনই নেই প্রশ্নে। মন চাইলে খুব অপ্রাসঙ্গিক কোনো বিষয়েও হাজার খানেক প্রশ্ন বানিয়ে ঘুরে বেড়ানোর অসীম ধৈর্য আমার আছে। সেখানে মিস্টার রাহাতের বিষয়টা তো কোয়াইট ইন্টারেস্টিংয়ের চাইতেও অনেক বেশি। সেখানে আমার আগ্রহ তরতর করে বাড়বে বৈ কমবে কেন! আপু বলেনি তো কি হয়েছে। আমি একাই একশো না উত্তর খোঁজার জন্য?
ওহ বলা হয়নি, আমার সেসময়ের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুর একমাত্র ক্যারেক্টার, দ্য গ্রেইট নাক উঁচু মানুষটার নাম কিন্তু রুশান রাহাত; এনএসআই অফিশিয়াল।
পার্সোনালিটির সাথে পেশা কিংবা পেশার গুণে পার্সোনালিটি, কোনটা যে রুশানের জন্য প্রযোজ্য ছিল তা উহ্য থাকুক। কারণ আপুও তখন জানত না, তার নাকউঁচু দেবর মানুষটা বাইরে কিংবা ভেতরে আদতে কেমন। যদিও বিয়ের আগে ভাইয়ার সাথে আপুর সম্পর্ক অনেকদিনের, পারিবারিকভাবেও বোঝাপড়া ছিল শুরু থেকে। তবু রুশান রাহাত বরাবর নিজেকে পরিবার থেকে সরিয়ে রাখতে পছন্দই করতেন কিনা! তাই চেয়েও ওনার সাথে সু সম্পর্ক করার দুঃসাহস কারোর ছিল না।
প্রথমবার আপুর মুখে এমন উদ্ভট কথা শুনে আমি বিস্মিত হয়েছিলাম। নাক কুঁচকে ভাবছিলাম, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া একটা মানুষের আদতে হৃদয় বলতে কিছু আছে বলে মনে হয় না। এমন হৃদয়হীন মানুষ তাহলে লাভ লাইফ কীভাবে বিল্ড আপ করল, এমনকি এত কম বয়সে বাচ্চার বাবা হবার গৌরবও অর্জন করল কোন জাদুবলে?
উমম্ জাদুটা যে কি তা জানা সত্যি ভীষণ কঠিন ছিল। তবে চেষ্টার কমতি আমি রাখিনি। সবার সাথে খুব খুশিমনে মিশতে পারার একটা গুণ আমার আছে। তবু রুশানের ত্রিসীমায় যাবার দুঃসাহস কেন যেন শুরু থেকেই আমার ছিল না। পাছে আমাকে ক্যারেক্টারলেস অথবা অ্যাটেনশন সিকার ভেবে বসে! বলতে গেলে গোটা পৃথিবীর সামনে রুমুঝুমু ঝর্ণাধারার মতো প্রাণোচ্ছল মেয়েটা আমি, রুশানকে দেখলে দিঘির জলের মতো শান্ত হয়ে যেতাম। তাঁর সামনে জোরে হাসি না, অযথা দুষ্টুমি করে সবার অ্যাটেনশন নেবার চেষ্টা করি না;এমনকি একবার চোখ তুলে রুশানের উপস্থিতি অনুভব করার পর দ্বিতীয়বার আর চোখ তুলেও তাকাই না। ভাবখানা এমন আমার চাইতে শান্ত, অন্তর্মুখী মেয়ে সে সময়ে আর একটাও নেই যেন।
কাজিনদের মধ্যে শিপড়া আমার সবচাইতে ক্লোজ;পার্টনার ইন ক্রাইম যাকে বলে। ওর শিরা-উপশিরার খবর আমি যেমন জানি, আমার রগ-রেশাও শিপড়া কিন্তু চেনে। কাজেই অন্যকেউ ভাল করে খেয়াল করার আগেই রুশানের সামনে আমার অকস্মাৎ পরিবর্তন প্রথমে বুঝতে পারল শিপড়া। ও অবশ্য ভেবেছিল আমি বুঝি অভিনয় করছি। ক্রাশকে পটাব বলে বাড়তি একটু ভালোমানুষির চেষ্টা করছি। একদিন সুযোগ পেয়ে শিপড়া আমায় জেঁকে ধরল। মাথায় টোকা মেরে বলল,
— লোকটা ম্যারেড রুমু।
আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম ওর কথা শুনে। পাল্টা প্রশ্ন করলাম,
— কে?
— কে তুই জানিস না? তোর শখের সুমুন্দি। দ্যাট এনএসআই ম্যান। রুশান।
— তো! আমাকে বলছিস কেন?
— তোকে বলব না? কিসব করে বেড়াচ্ছিস তুই লোকটার চোখে ভাল হওয়ার জন্যে। আগের মত হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়ছিস না, অযথা দুষ্টুমি করে সবার মাথা খাচ্ছিস না। নাহ্ আমাদের সামনে মোটামুটি স্বাভাবিকই আছিস, কিন্তু লোকটাকে দেখলে চুপ। যেন মূর্তি। চেনা রুমুর সাথে এই রুমুর একটুও মিল নেই। ইজন্ট ইট উইয়ার্ড?
শিপড়ার কথা শুনে আমার শুরুতে মন খারাপ হলো। অপমানবোধে জ্বলে উঠল বুকের ভেতর। একটা ম্যারেড লোকের অ্যাটেনশন নেবার জন্য ডাবল ফেইসড হবে রুমু শিকদার? সে কি আদৌ এত ছোট হয়ে গেছে! তাকে চাইলেই এমন মিসআন্ডারস্টুড করা যায়!
রেগে শিপড়াকে কয়েকটা কথা শোনাতে ইচ্ছে করল। কিন্তু পরমুহুর্তে নিজের পরিবর্তনের সঠিক কারণ আবিষ্কার করে রাগটা আর দেখালাম না। উল্টো পাশে বসিয়ে মৃদু হেসে বললাম,
— তুই ভুল ভাবছিস শিপু। এরকম কোনো সিলি কারণেই আমি চেইঞ্জ হয়ে যাচ্ছি না। আমি জাস্ট তোদের সামনে যা, তা ঐ লোকটার সামনে প্রকাশ করতে পারছি না। বড়পুর নতুন সংসার ওটা। কে জানে পরিবারের লোক কেমন! তার মধ্যে শুনেছি লোকটার নাকি পরিবারের সাথে বনিবনা নেই। এমন ছন্নছাড়া, ভাবগতিহীন একটা লোকের সামনে অযথা খাতিরের চেষ্টা করলে আমায় যদি সস্তা ভাবে। তাই তো ওনার সামনে একটু ডিসেন্ট হয়ে চলি। অ্যাজ ইফ আমার কোনো ইন্টারেস্ট নেই।
— বাট দিস ইজ নট ইউ রুমু। হাউ অ্যাম আই সাপোসড টু অ্যাকসেপ্ট দিস পার্সোনালিটি অফ ইওরস?
— চিল শিপু। দিস ইজ নরমাল। বরং আমি যদি ওই লোকটার সামনে উদ্ভট কাজকারবার করতাম তাহলেই না বিষয়টা খারাপ হয়ে যেত।
— ইউ আর ট্রাইং টু অ্যাক্ট ম্যাচিওর..
সরু চোখে তাকিয়ে কেমন পাজলড হয়ে বলল শিপড়া। আমি প্রতুত্তর করলাম না। ওর কাঁধে চাপড় দিয়ে হাসলাম শুধু।
তখন আসলে বুঝিনি এই যে “ট্রাইং টু অ্যাক্ট ম্যাচিওর” টার্মটা আসলে আমার একটু একটু করে পাল্টে যাওয়ার টার্ম। নিজের জন্য সে পরিবর্তন নয়, একটা মানুষকে কেন্দ্র করে পরিবর্তনের আবর্তন। যে মানুষের আদতে ছায়াও আমার সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
খুব ফিল্মি স্টাইলে আপুর বিয়ের মরশুম কেটে যাওয়ার পর তল্পিতল্পা গুছিয়ে আমায় হলে ফিরতে হলো; লাইফ অফ এ্য মেডিকেল স্টুডেন্ট! দিনভরের রোলারকোস্টার লাইফ শুরু।
লজিক্যালি আমার হোস্টেলে থাকার প্রয়োজন পড়ে না। বাড়ি ঢাকাতেই।
তবু রোজকার জার্নির ঝক্কি এড়াতে শখ করে হলে উঠলাম। আমার হল থেকে অবশ্য আপুর শশুরবাড়ি খুব কাছে। তাই প্রতিবারের মতো হলে উঠেই পরিবারের সাথে ছাড়াছাড়ি ব্যাপারটা ঘটলেও, আপুর সাথে ছাড়াছাড়ি হলো না।
ও সময় পেলে অফিসের পর এটাওটা রান্না করে আমায় দিয়ে যেতে লাগল। আমি যদি বারণ করতাম তাহলে ধমকে টমকে কি অবস্থা। উল্টো চোখ পাকিয়ে বলত, আসতে বারণ করলে আমায় উঠিয়ে নিয়ে বাড়িতে বসিয়ে রাখবে। তারপর ওর বাড়ি থেকে ক্লাস করব। রিস্ক নিলাম না, ও চাইলে যা-কিছু করে দিতে পারে।
আমার অবশ্য একটু লোভও ছিল। ঐ যে সদ্য জন্মানো আগ্রহটা? টিমটিমে আলো হয়ে সেটাও তো জ্বলছিল রোজ বুকের ভেতর। কি হয়েছিল রুশানের? কেন পরিবারের সাথে থাকে না ও? আর ওর বেবিটা? এরকম একটা ফর্মাল ডিউটির সাথে বেবিটাকে কি করে সামলায়! তার ওয়াইফ ই বা কোথায়!
ইশশ! কত কত প্রশ্ন। মনে হতো একবারেই হড়বড়িয়ে সব জিজ্ঞেস করে ফেলি।
পরক্ষণে থেমে যেতাম শিপড়ার সাথেকার স্মৃতিটার কথা ভেবে। আপুও এবারে যদি আমায় সন্দেহ করে তখন?
জানতাম আমার মতই বিয়ের প্রোগ্রাম সব মিটে যাওয়ার পর রুশানও নিশ্চয়ই তার লাইফে ফিরেছে। ডিউটি, বাচ্চা, সিঙ্গেল ফাদারের রোলপ্লে। আচ্ছা কি করে যায় তার দিন? একটুও কি খারাপ লাগে না! একটা ছেলে মানুষ আদতে ডাবল রোল প্লে করতে পারে?
শত ব্যস্ততায়, কাজের ফাঁকেও ভাবনাগুলো আমায় জ্বালিয়ে মারে। বুকের ভেতর উথাল-পাতাল একটা ঢেউয়ের মতো ওঠে। মনে হয় ছুটে আপুর বাড়িতে যাই। যদি অদ্ভুত মানুষটা আসে। যদি বাচ্চাটাকে দেখতে পাই! যদি তার রোজকার রুটিন একটু পাল্টে যায়।
মনের কথা আর শোনা হয় না। ভয় হয় আমার। তেইশ বছরের জীবনে প্রথম একটা বেঠিক মানুষের প্রেমে পড়ে যাওয়ার ভয়। আমি জানি আগ্রহ এভাবে খোঁচাতে খোঁচাতে টেনে ওর তলে নিয়ে গেলে রুমু ভেসে যাবে। রুমুর গোটা লাইফ খুব ফিল্মি কিনা! উল্টোপাল্টা মুভি দেখে জীবনকে নিয়ে একটা আলাদা কল্পনার জগতে বিচরণ আমার নতুন নয়। আর ওই কাল্পনিক পৃথিবীর রুমুকে সত্যিকার রুমু ভীষণ ভয় পেত। সত্যিকার পৃথিবীতে খুব প্রাণোচ্ছল হলেও ভীতুর ডিম আমি। অপরদিকে কল্পনার রুমু? তার তো সাহসের কমতি নেই। একবার যদি সে রুশান রাহাতকে আগ্রহ থেকে বের করে নিয়ে কল্পনার পৃথিবীতে ঢোকায় তাহলে ডিজাস্টার হতে কেউ আটকাতে পারবে না। না রুশান রাহাত নিজে, না তার জীবনের গোপনতম সত্যিগুলো আর না পরিবার, সমাজ।
বরং সবকিছুকে অতিষ্ট করে আমি যতখানি পাগলামি করব তা সকলের স্মৃতিতে মনে রাখার মত কিছুই হয়ে যেতে পারে।
____________________
পোয়েট্রি সেইস, হোয়েন লাইফ গিভস ইউ লেমন, ড্যু ট্রাই টু মেইক লেমনেড অ্যান্ড ড্রিংক ইট বিফোর থিংকিং টোয়াইস।
আমার জীবনে রুশান রাহাত ঠিক সেই লেমন ছিল, যাকে আমি প্রাণভরে না চাইতেও সৃষ্টিকর্তার কোনো এক ইশারায় পেয়ে গিয়েছিলাম। মা বলে, জুটি সবসময় ওপর থেকে তৈরি হয়ে আসে। কার সাথে কার ভাগ্য জুড়ে যাবে কেউ তো বলতে পারে না। তাই কেন ওর সাথে জুড়ল? কতটা তাদের মানাচ্ছে কিংবা মানাচ্ছে না, তা ভেবে লাভ কোথায়।
রুশান আর আমার ক্ষেত্রেও বিষয়টা ঠিক তেমন হয়ে গেল। আমি তো দ্বিতীয়বারের কো-ইন্সিডেন্সে বুঝে গিয়েছিলাম এই সত্যি। রুশানের বুঝতে অনেক সময় লেগেছে। অবশ্য সে যতদিনে বুঝেছে ততদিনে তার প্রেমে রুমু শিকদার জ্বলে পুড়ে ভস্ম।
চলিবে?