প্রিয় রুমু
৩
______________________
সমস্যা হয়ে গেল বেবি সিটার আসার পর। উনি আমার চাইতে বয়সে বেশ বড়। বলতে গেলে মধ্যবয়সী এক নারী। জব যেহেতু, তাই স্বাভাবিকভাবেই অভিজ্ঞতা তারই বেশি।
রুশান তো তাকে পাঠিয়ে দিয়েই খালাস। এরপর জানার চেষ্টা করল না, যে উদ্দেশ্যে মহিলাকে সে পাঠিয়ে দিয়েছিল তা আদৌ পূরণ হলো কিনা।
এদিকে মহিলা আসামাত্র আমার ওপর হুকুমজারি শুরু করল। যেন আমি তার কাজের লোক এমনভাবে এটা করো না, ওটা করো না; ধমকাতে ধমকাতে আমার মাথা গরম করে দিল। নিজের ওপর করা তার স্পর্ধাকে আমি নাহয় সয়ে নিতাম, কিন্তু জাইদিকে সে যখন জোর করে আমার কোল থেকে টেনে নিতে গিয়ে কাঁদিয়ে ফেলল, তখন আর সহ্য হলো না। আমার কাছে তো রুশানের নম্বর ছিল না। রাগের চোটে সোজা বড়পুকে কল করে ফেললাম। ও তখন অফিসে। লাঞ্চ আওয়ার শেষ হয়েছে সবে। অসময়ে আমার কল দেখে অবাক হলো। খুব ব্যস্ত গলায় বলল,
— কিরে অসময়ে?
আমি ওর ব্যস্ততায় বিন্দুমাত্র নজর দিলাম না। একগুঁয়ের মত বললাম,
— তুমি এক্ষুনি হসপিটালে এসো।
— হসপিটালে! কিছু হয়েছে? তুই ঠিক আছিস তো?
ওর কণ্ঠে ভয়। প্রতুত্তরে আমি গম্ভীর স্বরে বললাম,
— এসেই দেখবে।
— সোনা সত্যি করে বল তোর কি হয়েছে? সিরিয়াস কিছু? আমি তো অফিসে।
— কেন আমি মরে গেলে তারপর আসবে?
সামলাতে না পেরে বেশি রাগে আমি কেঁদে ফেললাম। আপু বুঝল পরিস্থিতি জটিল। আমতা আমতা করে,
— আসছি।
বলে ফোন রেখে দিল।
এদিকে ওই মহিলা আমার রাগ আর কান্না দেখে কিছুটা দমে গেলেও জাইদিকে কোলে নিয়ে জোরজবরদস্তি ঝাঁকাঝাঁকি করে ওর কান্না থামানোর চেষ্টা করতে লাগল। অ্যাজ ইফ আমি অদৃশ্য এমনভাবে সে আমাকে ট্রিট করতে লাগল। ওদিকে বাচ্চাটা ওর কোলে একদম থাকতে চাইছিল না। দু-হাত বাড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে আমায় ডাকছিল,
— মাম কোলে, কোলে।
আর সহ্য হলো না। কাঁদছিলাম তো আমিও; রাগে, জেদে। তবে ভেতরে যা চলছিল তা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছিলাম যতটা পারা যায়।
সাধারণত মানুষের সাথে চট করে খারাপ ব্যবহারের স্বভাব আমার নেই। কিন্তু সেদিন জাইদির কান্না দেখে আমার যেন কি হয়ে গেল। চোখ মুছে আগুনের দৃষ্টিতে এগিয়ে গিয়ে চিলের মতো ছোঁ মেরে নিলাম বাচ্চাটাকে ঐ মহিলার কোল থেকে। আঙুল তুলে ধমকে বললাম,
— গেট আউট অফ হিয়ার। নাউ।
মহিলা নিশ্চয়ই কোমর বেঁধে ঝগড়া করত। কিন্তু নাটকের চূড়ান্ত মুহুর্তে আপু আর ম্যাম চলে আসায় সে আর সুবিধে করতে পারল না। মুখ কালো করে বেরিয়ে গেল কেবিন থেকে।
বলা বাহুল্য আপুর অফিসের নিউ ব্রাঞ্চ হসপিটাল থেকে মাত্র বিশ কদমের দূরত্ব। আমার জেদি কণ্ঠস্বর শুনে নিশ্চয়ই কোনো যানবাহন করে ও এসেছে। ভাগ্যিস এসেছিল সময় করে। নইলে ঐ মুহুর্তে কি যে কুরুক্ষেত্র বেজে যেত হসপিটালে!
— কি হয়েছে ময়না? তুই এখানে? কার ওপর চেঁচালি ওভাবে। আর বাচ্চাটা!
হড়বড়িয়ে একসাথে এতগুলো প্রশ্ন করতে করতে রীতিমতো ছুটে এলো আপু। এবং আমার কাছাকাছি এসে বাচ্চার মুখ দেখতেই ওর চেহারায় অন্ধকার ছায়া নামল একটা। ম্যাম আছে বলে ভদ্রতা করে তৎক্ষনাৎ কিছু বলতে পারল না। কিন্তু ওর ফ্যাকাশে দৃষ্টি আমায় যেন না বলেও অনেক কিছুই বলে দিল। মনে মনে কিছুটা ভয় পেলেও মুখে কিছু বলতে পারলাম না আমি। ওদিকে ম্যামও চিন্তাগ্রস্ত মুখে এগিয়ে এসে কি হয়েছে জানতে চাইলেন।
আমি আর আড়াল করতে পারলাম না। মহিলার আসা থেকে শুরু করে, আমাকে ধমকানো, জাইদিকে জোরজবরদস্তি টানাটানি করে কাঁদানো সব বলে দিলাম।
ম্যাম নিজেও শুনে রেগে গেলেন। সাথেই বাচ্চার গার্ডিয়ান এলে যেন অবশ্যই তার চেম্বারে পাঠাই নির্দেশ দিয়ে বাবুকে পরীক্ষা করে ফিরে গেলেন চেম্বারে।
ওদিকে ম্যাম যাওয়ার অনেকক্ষণ পর আপুকে কোনো কথা না বলে চুপচাপ বেডের ওপর বসে থাকতে দেখে আমি দুরুদুরু বুকে এগিয়ে গেলাম ওর কাছে। যতটা পারা যায় নিঃশব্দে বসে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
— তুমি কীভাবে জানলে আমি এই কেবিনে? ম্যামের সাথে দেখা করেছিলে এসে?
— তোর কল কাটার পরই কল দিয়েছিলাম আন্টিকে।
খুব ঠান্ডা স্বরে উত্তর দিল আপু। পাল্টা আমি কিছু বলব বলব করেও কথা গুছিয়ে উঠতে পারলাম না। ও বুঝল আমার ভয়। কিছুটা সময় নিশ্চুপ কাটিয়ে ফোঁস করে শ্বাস ফেলল। তারপর তর্জনী আর বুড়ো আঙুল দিয়ে কপাল চেপে একসময় বলল,
— তুই কীভাবে জড়িয়ে গেলি এদের সাথে? এসবের পরিণাম জানিস!
— জড়িয়ে! জড়িয়ে তো আমি যাইনি আপু। আই ওয়াজ জাস্ট হেল্পিং দেম। বাচ্চাটা কত অসুস্থ হয়ে পড়েছিল জানিস? আর রুশান..
— রুশান! তুই ওকে নাম ধরে ডাকিস? হি ইজ ইওর সিনিয়র।
ধারালো চোখে চাইল আপু। যেন মেপে নিতে চাইছে আমার ভেতরটা। তার গৃহত্যাগী দেবরের সাথে কতটা কীভাবে জড়িয়ে গেছি এক দেখাতেই বুঝে নেবার চেষ্টা করছে।
আমি সেকেন্ড কয়েক এর জন্য একটু বিভ্রান্ত হলাম, তবে সেই বিভ্রান্তি ছড়াতে না দিতে দ্রুত সামলে বললাম,
— আজই ওনার সাথে সরাসরি কথা হলো। সেভাবে কখনো অন্য নামে সম্বোধন করা হয়নি বলে…
— সম্বোধনের তো কোনো ভ্যারাইটি থাকার কথা নয়। তুই ডিরেক্ট ওকে ভাইয়া বলে ডাকবি। যেহেতু তোর দুলাভাই এর ভাই হয় সে হিসেবে তোরও ভাই ই হচ্ছে।
কথাটা এত স্বাভাবিকভাবে বলল আপু! আমার সদ্য জমাট বাঁধতে শুরু করা অনুভূতিগুলো গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে গেল নিমেষে।
আমি আর ভাইয়া! তাও রুশানকে!
ঠিক আছে, বেশি কিছু ভাবিনি নাহয় মানুষটাকে নিয়ে অতটুকু মুহুর্তে। কিন্তু তার বাচ্চাকে? ওর অঘোষিত মা তো আমি হয়েই গেছি একমুহুর্তে বুকে জড়িয়েই। একটা বাচ্চাকে মাঝখানে রেখে সম্পর্কের নাম যদি একবার বাবা আর মা হয়ে যায়। তাহলে সেটাকে পাল্টে ভাইবোন কীভাবে বানাবে মানুষ। ছিহ্! ভাবতেও তো গা ঘিনঘিন করে ওঠে।
মুখ তেঁতো করে আমি আপুর দিকে তাকিয়ে রইলাম। ও নিজেও সতর্কতার দৃষ্টিতে আমাকে পড়া অব্যাহত রেখেছে। যার মনে একবার সন্দেহ ঢুকেছে, তাকে সন্দেহের থেকে দূরে রাখব কি করে? কথা ঘোরাবার জন্য বললাম,
— আচ্ছা একটা কথা জিজ্ঞেস করি? সত্যি সত্যি উত্তর দেবে প্লিজ?
— আমি জানি তুই কি জিজ্ঞেস করতে চাস। কিন্তু ইটস অ্যাকচুয়ালি ভেরি পার্সনাল। তোর ভাইয়ার স্ট্রিক্টলি বারণ ছিল কাউকে বলতে।
তীব্র হতাশার সাথে মাথা দোলালো আপু। আমার মন খারাপ হয়ে গেল। অস্ফুটে বললাম,
— আমি তোর পর নই।
— আই নো দ্যাট। এখানে ওই ডিবেটও আসবে না সোনা। কিন্তু এটা যেহেতু তোর ভাইয়ার ফ্যামিলির ম্যাটার, তাই সবটা বলার আগে ওর পারমিশান নিতে হবে।
রুমু, তুই বরং একটু ওয়েট কর বুঝলি। জানতে তো তোকে হবে এমনিতেও। বাট আমি সাফিনের সাথে কথা বলে নেই আগে।
স্নেহার্দ্র স্বরে কথাটা বলে আমার গালে হাত রাখল আপু। ওর সেই স্পর্শটুকু পেয়ে আমি পাল্টা জোর করতে পারলাম না। একটু হেসে মাথা হেলিয়ে সায় দিলাম।
আপু এতক্ষণ কথাবার্তা বললেও জাইদির দিকে তাকাচ্ছিল না। কিন্তু আমার সম্মতি দেবার পর অবশেষে তাকাল।
দেখলাম প্রথমবার কেবিনে ঢুকে বাচ্চাকে দেখেই যেমন ওর মুখ অন্ধকারে ছেয়ে গিয়েছিল, সেই অন্ধকার এবারের তাকানোয় নেই। বরং এতটুকুনি মিষ্টি আদুরে বাচ্চাকে দেখে ওর ফ্যাকাসে চোখে রঙ লাগল।
কোলে না নিলেও জাইদির গালে আলতো আঙুল বুলিয়ে দিল। তারপর ওর হাত মুঠোয় নিয়ে আস্তে আস্তে চুমু খেল। জাইদিও অদ্ভুতভাবে একটুও কাঁদল না। বরং অভিমানী চোখ দিয়ে পিটপিট করে আপুর দিকে তাকিয়ে অস্ফুটে আওয়াজ করল। যেন বোঝাতে চাইছে, এই আদর ওর পছন্দ হয়েছে।
আমি জানি না বিয়ের পর আদৌ আপু জাইদিকে পেয়েছিল কিনা! কিংবা ওদের সেই তথাকথিত পারিবারিক ঝামেলা ফুটফুটে বাচ্চার ওপর সামান্য মমতা দেখানোর থেকেও ওকে আটকে রেখেছিল কিনা!
তবে আজকের খুব অল্প সময়ে সামান্য ইশারায় ওদের মিশে যাওয়া প্রমাণ করে দিল, বাচ্চারা আসলে বুঝতে পারে তাদের জন্য সেইফ কোল কোনটা, আর কোনটা কোল তাদের কষ্ট দেবে।
তার মানে ব্যস্ততার চাদরে মোড়া জাইদির বাবা যাকে বহু কষ্টে ভরসা করে নিজের ছেলের টেইক কেয়ারের জন্য রেখেছে, সে ই তার বাচ্চার জন্য ক্ষতিকর। রুশান কি জানে এই খবর?
লোকটার ইগোর ওপর পুরনো মেজাজ চিড়বিড়িয়ে ফিরে এলো আমার। ভেবে নিলাম এক ধমকে প্রশ্নটা করেই ছাড়ব আমি। অবশ্যই করব। দেখি সে কি উত্তর দেয়।
_______________________
কিন্তু ভাবনা একরকম থাকলেও আদতে তা ইমপ্লিমেন্ট করা হলো না।
ডিউটি শেষ করে রুশান যখন ফিরল, তখন জাইদির জ্বর নেই বললেই চলে। জোর করে খাইয়ে দাইয়ে ওষুধ দিয়ে আমি ওর সাথে একটু খেলাধুলোর চেষ্টা করছি।
আপু তখনও আছে। ও আর ফেরেনি অফিসে। রুশানকে নিয়ে সন্দেহ ঢুকেছে না ওর মনে! আমি যাই বলি তাতেই অবিশ্বাস। আমিও জোর করে ভুল ধারণা ভাঙাতে যাইনি। বরং মনে হয়েছে ও যা ভাবছে, ভুল অথবা ঠিক, তা প্রমাণ হয়ে যাক মানুষটার সামনেই। আমিও তো দেখি রুশানের আচরণ আপুকে দেখলে কেমন হয়ে যায়। বিষয়টাকে সে স্বাভাবিকভাবে নেয় নাকি অস্বাভাবিকভাবে।
উমম, আমার আগ্রহের সঠিক উত্তর যদিও পাওয়া হয় না তখন। রুশানের আচরণ এত বিভ্রান্তিকর হয়ে যায় সন্ধ্যায় এসে!
অবাক হয়ে খেয়াল করি সেই সকালের মানুষটা যেন এক ধাক্কায় হারিয়ে গেছে নিজের ভেতর থেকে। অফিস ফেরত এবারের রুশান হয়ে যায় ঠিক আগের মতো রাগী, গম্ভীর, ভয়ানক।
কেবিনে ফিরে শুরুতেই সে জাইদিকে আমার কোল থেকে নিয়ে নেয়। তারপর তার কোঁচকানো ভ্রু দিয়ে আমাকে আর আপুকে দেখে একবার একবার করে। আমার হালচালের খবর নেই। ডিরেক্ট জিজ্ঞেস করে,
— তুমি বেবি সিটারকে তাড়িয়ে দিয়েছ?
বুঝতে পারি বদমাশ মহিলা নির্ঘাত নালিশ করে দিয়েছে। আচরণ যেমন ছিল! নিশ্চয়ই বাড়িয়ে চাড়িয়ে বলেছে কিছু। নইলে দিনের বেলা ভাল মুড নিয়ে অফিসে যাওয়া মানুষ এমন রুক্ষ চোখমুখ নিয়ে ফিরবে কেন?
সংক্ষেপে উত্তর দিই,
— হ্যাঁ।
— কারণ?
— রুশান আই থিংক..
পাশে থেকে কিছু বলতে যায় আপু। রুশান হাত তুলে তাকে থামিয়ে দেয়। স্থির চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে উত্তরের আশায়। আমার মনে ভয়ডর, দ্বিধা নেই।
খুব স্বাভাবিকভাবেই আমি দিনের বেলার খবর সব জানিয়ে দিই তাকে। শুনে রুশানের খারাপ লাগে নাকি রাগ, বাইরে থেকে বোঝা যায় না। তবে সে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে শ্রান্তভাবে বসে পড়ে বিছানায়।
তার মনের ভেতর সেসময়ে কি চলছে আমি বুঝতে চাই খুব করে। পারি না। তবে রুশান অন্যমনস্কতা কাটিয়ে খুব ধারালো একটা স্বরে বলে,
— তুমি হলে ফিরে যাও রুমু। থ্যাংক্স ফর ইওর কনসার্ন। আমি জাইদির কাছে আছি।
খুব ছন্নছাড়া একটা জিনিস ভীষণ আগ্রহ নিয়ে জোড়ার চেষ্টা করার মুহুর্তে দমকা হাওয়া এসে যদি সামান্য গুছিয়ে তোলা সেই জিনিসটাকে জোর ধাক্কায় ভেঙে দেয়, তাহলে কষ্টের সাথে সাথে একটা হতাশা, একটা রাগ, আগুনের লেলিহান শিখার মতো দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে বুকের ভেতর। সে আগুন না কাউকে দেখানো যায়, না তার আঁচ সহ্য করা যায়। রুশানের বলা এই “ফিরে যাও” কথাটাতে আমার বুকের ভেতর তেমনই একটা আগুনের কুণ্ড জ্বলে উঠল সাথে সাথে। রাগ, হতাশাকে ছাপিয়ে নতুন করে যা টের পেলাম তা অভিমান আর অনেকটা অপমানবোধ।
আপুরও বিষয়টা ভাল লাগল না। নাওয়াখাওয়া ভুলে, এক মুহুর্ত রেস্ট করা ছাড়া তার বোন কোনো বেনিফিট না দেখে একটা মানুষের বাচ্চা সামলেছে, বিনিময়ে উহ শব্দটা করেনি। অথচ সে ফিরে উল্টো তাকেই কথা শোনাচ্ছে, যে না থাকলে চরম মুহুর্তে দিগ্বিদিক হারা হতে হতো নাকউঁচু মানুষটাকে।
আমার চাইতে কয়েকগুণ অপমানবোধ আপুর চোখের তারায় জ্বলে উঠল।
আমার দিকে আগুনঝরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে নিজেকে যথাসম্ভব শান্ত করে বলল,
— চলো রুমু। তোমাকে নামিয়ে আমার বাসায় ফিরতে হবে।
বলা বাহুল্য, আপু যখন রেগে যায় তখন তাকে সামলানো মুশকিল। আর সে রাগলেই আমাকে এভাবে “তুমি” করে বলে।
আপুর শক্ত চোখমুখের দিকে তাকিয়ে কিছু বলার সাহস আমার হলো না। কোনোরকমে কান্না চেপে সায় দিয়ে আমি হ্যান্ডব্যাগ গুছিয়ে নিলাম।
জাইদি অবশ্য তখন দেখেনি আমায় চলে যেতে। বাবাকে পেয়ে তার বুকের ওমে মুখ লুকিয়ে ভাঙা ভাঙা কথায় সারাদিনের গল্প ফেঁদে বসেছে। রুশানের মনযোগ ওদিকে নিরবচ্ছিন্ন না থাকলেও সেও পাল্টা ছেলের মাথায় হাত বুলচ্ছে বিরতিহীন। বাবা-ছেলের এমন চমৎকার দৃশ্য আপাত ভীষণ মধুর লাগার কথা থাকলেও ঐ মুহুর্তটায় আমায় ঈর্ষান্বিত করে তুলল। বাবার ওপর অপ্রকাশিত রাগ স্থানান্তরিত হয়ে জাইদির ওপরেও বর্তে গেল। দুটো অসম বয়সী অকৃতজ্ঞ মানুষের সান্নিধ্যে এক সেকেন্ড ব্যয় করার ইচ্ছে আমার অবশিষ্ট রইল না। রাগে অন্ধ হয়ে লেশমাত্র দেরি না করে আপুর হাত ধরে বেরিয়ে এলাম দ্বিতীয় কোনো বাক্য ব্যয় না করে।
তবে যেতে যেতে চেয়েও নিজের ফিরে তাকানোর শখকে কিন্তু নিয়ন্ত্রণ করতে পারলাম না। নিষ্ঠুর মানুষটা কি ভাবছে ভাবুক, কিন্তু আমার বুকের ভেতর সদ্য জন্মানো মাতৃত্বের অনুভূতিকে অগ্রাহ্য করব এমন দুঃসাহস দেখিয়ে ওঠা হলো না। রাগ, ভয়, অভিমান সবকিছুকে পেছনে ফেলে শেষ মুহুর্তে একবার ফিরে তাকালাম বাচ্চাটার মিষ্টি মুখ আরেকবার দেখার আশায়।
ব্যাড লাক বলব নাকি গুড! বাবুকে তো দেখা হলো না আমার, তবে বাবুর বদমেজাজি নাকউঁচু বাবার চোখজুড়ে বিষণ্ণতার ছায়া ফুটে উঠেই মিলিয়ে যেতে দেখলাম মনে হলো।
সে যে ঠিক আমারই মতো থাকতে না পেরে তাকিয়ে ফেলেছে, তা অনুভব করে অদ্ভুত লাগল। খুশি হলাম নাকি অভিমান দ্বিগুণ হলো, জানা নেই। তবে আমাদের দ্বিতীয়বারের চোখাচোখি ধ্রুবতারার মতো সত্যি হয়ে মনের কোণে জ্বলজ্বলে হয়ে রইল চিরদিনের মত।
__________________
ঘটনাবহুল একটা দিনের স্মৃতি হলে ঢুকতে ঢুকতে ঝেড়ে ফেলতে চেয়েছিলাম পুরোদমে। শাওয়ারের সাথে কিছুটা অশ্রু মিশিয়ে, শক্ত গলায় নিজেকে শাসিয়ে, নিষ্ঠুর দুটোকে নিয়ে ভাবব না প্রতিজ্ঞা করেছিলাম। অথচ সেই প্রতিজ্ঞা পলকা মেঘের মতো উড়ে গেল মধ্যরাতের একটা কলে।
গোসল, খাওয়া শেষ করে বই খুলে যখন বসেছি জানালার ধারে, তখুনি শব্দহীন ফোনের ভাইব্রেশনে মনযোগ ছুটে গেল। ঘড়ির কাঁটায় রাত পৌনে একটায় আননোউন নম্বরের ইনকামিং কল দেখে ফোন ধরা হাতটাই কেঁপে উঠল আমার। আমি যেন জানতাম ফোনের ওপাশে কে আছে, কি উদ্দেশ্যে ফোন দিয়েছে সে। রিসিভ করব না বলে নিজেকে ধমকাতে চেয়েও শেষ মুহুর্তে রিসিভ করে ফেললাম। আর তারপরেই কান ভরিয়ে দেয়া মিহি কণ্ঠের কান্নার ঢেউ সরিয়ে কোনোরকমে উঁকি দিল রাক্ষসের বলা তিনটে শব্দ,
— উই নিড ইউ।
ব্যাস আরও একবার ভেসে গেল রুমু। ভেসে গেল তার প্রতিজ্ঞা, রাগ, কষ্ট, অভিমান, অপমান সব;সব। জানে না সে কি করে বেরবে মধ্যরাতে হল থেকে, ক্লান্ত পরিশ্রান্ত শরীর নিয়ে; কিন্তু তাকে বেরতে হবেই যেকোনো মূল্যে। যেন তার যাওয়া না যাওয়ার ওপর আটকে আছে গোটা দুটো জীবন। হ্যাঁ দুটো জীবন।
চলবে,
Sinin Tasnim Sara