প্রিয় রুমু পর্ব-০৫

0
2

প্রিয় রুমু

_______________________

চিরকাল ভালোবাসার কাঙাল যারা, তাদের ভাগে ভালোবাসা প্রাপ্তির চাইতে এর যন্ত্রণাটুকু বেশি পরিমাণেই পড়ে যায়। জীবনে প্রথম প্রেমে প্রায় ব্যর্থ হওয়ার দিনগুলোতে এমন একটা অভিমানী সম্ভাবনার কথা ভেবে আমার ভেতরটা ভেঙেচুরে আসত প্রায়ই। অসহ্য পৃথিবীর সমস্ত আলো নিভিয়ে অস্পৃশ্য অন্ধকারে হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করত শুধু।
কারোর সাথে কথা বলতে ভালো লাগত না, বাইরে বেরতে ভালো লাগত না, ক্লাস-পড়াশোনা, খাওয়া, ঘুম সব;সব অসহ্য হয়ে উঠছিল। একই সাথে যাকে ভালোবাসি, কিংবা যার ভালোবাসার সামান্য পরিমাণও পেয়েছি বলে ধারণা করেছি, তা পুরো মিথ্যে হয়ে গিয়েছে এই অবিশ্বাস আমাকে পোড়াতো সবচাইতে বেশি। আমি না মানুষটাকে একমুহুর্তের জন্য ভুলতে পারছিলাম, না দ্বিধাহীন আগের মতো ভালোবাসতে পারছিলাম। আর জাইদি? ওই ছোট্ট শিশুটা। ওকেও তো বুকে জড়িয়ে আগের মতো স্নেহ করতে পারছিলাম না। বারবার ওর মুখের দিকে তাকালে, ওর মিহি ঠোঁটে মা ডাক শুনলে কল্পনার একটা চেহারা মনে করে বুকের জ্বালা দ্বিগুণ হয়ে যেত। ওর সত্যিকার মা আর বাবার ভালোবাসার মুহুর্তগুলো কিছুটা অনুমান করে আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে চাইত। মনে হতো কোন অভিশাপে একটা তারকাঁটা আমার শ্বাসনালিকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রেখেছে। যখন মন চাইছে মারণ চাপ দিয়ে রক্তাক্ত করছে, আবার মৃত্যুমুখে পতিত হলেই টেনে অসহ্যকর জীবনে ফিরিয়ে আনছে। আর আমার জীবন-মৃত্যুর দোলাচল দেখে অদূরে দাঁড়িয়ে একটা অবয়ব প্রেতের মতো হাসছে। সে অবয়বটা কি জাইদির মা? রুশানের ভালোবাসা? নাকি আমার অভিশাপ!

আমি জানতাম বেশিদিন এভাবে চলতে থাকলে ধ্বংসের হাত থেকে আমাকে কেউ বাঁচাতে পারবে না। হয় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে পৃথিবী ভুলে যাব, নয়তো চাপ নিতে না পেরে পৃথিবীর বুক থেকেই চিরতরে হারিয়ে যাব। আর ত্রিমুখী এই চাপের কথা এত গোপন ছিল, কাউকে মুখ ফুটে বলে একটুখানি আশ্রয় চাওয়ার সুযোগ আমার ছিল না। শুধু আপু বাদে আর কেউ ছিল না আমার মাথায় হাত বুলিয়ে একটু শান্ত করার মতো, দুটো কথা বলে মনের বোঝা হালকা করে দেয়ার মতো। অগত্যা, নিজের সাপোর্ট সিস্টেম নিজেকেই হতে হলো।
ঠিক করলাম ভালোবাসার থেকে দূরে সরে যাব তো অবশ্যই, কিন্তু হুট করে নয়। আস্তে আস্তে ওদের জীবন থেকে আমার প্রয়োজনটুকু কমিয়ে তারপর সরে আসব। আর আমার সিদ্ধান্তের প্রাথমিক রূপ হবে, রুশান রাহাত।

নিজেই নিজের হিলার হব ডিসিশন ফাইনালের পর সবার আগে আমি রুশানের সাথে ডিরেক্ট দেখা করা স্টপ করে দিলাম। ফোনে কথাবার্তা তো ছাড়া ছাড়া হচ্ছিল। তারই মধ্যে একদিন সোজাসাপটা বলে দিলাম,
— শুনুন বাবুকে নিয়ে মিটের জন্য আপনাদের আর হলের সামনে আসার দরকার নেই। নানা লোকে নানা কথা বলে। অ্যান্ড ফিউচারে এটা আসলে প্রবলেম ক্রিয়েট করতে পারে। তারচাইতে বেটার জাইদির সাথে আমিই নিজে গিয়ে দেখা করে আসব।
— বাট রাতে কীভাবে আসবে? তোমার হল থেকে আমাদের লোকেশন বেশ দূরে।

শান্তভাবে জানতে চাইল সে। আমার একটু অস্বস্তি হলেও তা আড়াল করে বললাম,

— রাতে আসব না তো। আসব বিকেল করে, আমার টিউশনের পর। আপনাদের আশেপাশের লোকেশনে আমার স্টুডেন্টের বাসা। ওকে পড়িয়েই ডিরেক্ট..

আমার অসমাপ্ত কথা শুনে রুশান একটু থমকাল বোধহয়। হয়তো বুঝতে পারল আমি কোনো কারণে তার সাথে সরাসরি আর দেখা করতে চাইছি না, কিংবা ডিসটেন্স মেইনটেইন করতে চাইছি। অনেকটা সময় নিশ্চুপ থেকে বলল,
— অলরাইট।

কে জানে কেন, কথাগুলো বলে দেওয়ার পর এতটুকু প্রতিক্রিয়া আমার একটুও সহ্য হলো না। ইচ্ছে করছিল চিৎকার করে বলি,
জাস্ট অলরাইট? এতবড় একটা ডিসিশান কীভাবে অলরাইট হতে পারে? আমরা আর সরাসরি দেখা করব না, কথা বলব না, আমি আপনাকে ভালোবাসব না, আপনিও ক্লান্ত চোখে আমায় দেখে স্বস্তি পাবেন না। তারপর ধীরে ধীরে আমাদের দূরত্বের সৃষ্টি হবে। এক মহাকাশ পরিমাণ বিচ্ছেদ নিয়ে আমরা দুজনের অপরিচিত হয়ে যাব। শুধুমাত্র ভালোবেসে বিনিময়ে পাওয়া এত এত অপ্রাপ্তি, কীভাবে আপনার কাছে অলরাইট হতে পারে রুশান? কীভাবে?

সবসময়ের মতো মুখ ফুটে বলা হয় না। ঠোঁট কামড়ে কান্না সামলাতে সামলাতে আমি ফোনের এপাশে মাথা নাড়ি। এগিয়ে নেওয়ার মত আর একটা শব্দ আমাদের মধ্যে অবশিষ্ট নেই জেনেও দুজনের কেউ ফোন নামিয়ে রাখতে পারি না। আমি বৃথা অপেক্ষা করি তার পক্ষের কোনো কথা, কোনো এক্সপ্লানেশনের। সেও বোধহয় অপেক্ষা করে আমার জন্য? কিন্তু আমরা কেউই একে অন্যের অপেক্ষার তৃষ্ণা মেটাতে পারি না। শেষে দীর্ঘক্ষণের স্তব্ধতার শেষে “রাখছি” বলে লাইন কেটে যায়। হয়তো চিরদিনের জন্য?

এরপর দিনগুলো কেটে যায় কিছুটা দ্রুত। নতুন অভ্যেসে অভ্যস্ত হতে যদিও আমার অনেক কষ্ট হয়, তবু মানিয়ে নিতে চেষ্টা করি রোজ। পড়াশুনো, টিউশন, জাইদিকে আদর করে আসা, সব কেমন রোবোটিক হয়ে যায়। রোজ ভাবি আমি আর যাব না ঐ পথে, ভালোবাসব না ওই বাচ্চাটাকে, ওর বাবাকে। কিন্তু একবার ওদের বাড়ির ত্রিসীমানায় পা রাখলে, মিহি হাতজোড়ার সামান্য স্পর্শ পেলে, কিংবা দেয়ালে টাঙানো ইউনিফর্ম পরা সুপুরুষ মানুষটার একটা ছবি দেখলেই কঠোর প্রতিজ্ঞা ভেঙে চুরচুর হয়ে যেত আমার। ছেড়ে যাব বলেও যে মানুষ এভাবে মিশে থাকে অস্থিমজ্জায় তাকে ভোলার প্রতিজ্ঞা কোন সাহসে করব আমি? ভালোবাসা ভোলা আদতে এত সহজ তো নয়।

নিজের ভালোবেসে এলোমেলো হওয়ার এই ভাবনাগুলো মাথায় এলে মনে হতো,
তাহলে রুশানও কি ভুলতে পারেনি নিজের প্রথম ভালোবাসাকে? ওর সন্তানের মাকে? ভুলতে যদি নাই পারবে তাহলে তো সে আমাকেও ভালোবাসতে পারেনি। তবে তার চোখের নমনীয়তা, তার কণ্ঠের অপেক্ষা এসবকে কি বলা হবে? চরিত্রহীনতা! কম বয়সী মেয়ে দেখে তার প্রতি যৌনতার টান? ইশশ!
অস্বস্তিকর শব্দগুলো মাথায় এলেই সারা শরীর-মন বিদ্রোহ করে উঠত আমার। রুশান আর যাইহোক চরিত্রহীন নয়, হতে পারে না। আমি অনুভূতি অনুভবে কাঁচা হতে পারি, কিন্তু মানুষ চিনতে এতবড় ভুল? তা নিশ্চয়ই করতে পারি না। তাহলে অসামঞ্জস্যতাটা কোথায়? কেন আমার বিশ্বাস আর সিদ্ধান্ত বারবার বিপরীতমুখী হয়ে যাচ্ছে এভাবে? কেন ওরা একে অপরের থেকে ভিন্ন পথে চলে বিভ্রান্ত করছে আমাকে? কেন বোঝাতে চাইছে বারবার সমান্তরাল ভাবা পথে একটা অসামঞ্জস্য রেখা আছে। যে রেখাকে আমি এড়িয়ে যাচ্ছি বারবার, ইমোশন থেকে অথবা বেশি ভাবনা থেকে।

অকস্মাৎ এমন ধারণা হওয়ার পর আমার চিন্তাগুলো একটু ধাক্কা খেয়ে গেল। দুঃখী রুমুর ছায়াতল থেকে ভেতরের প্রেমিকা রুমু পুনরায় মাথা চাড়া দিয়ে উঠে ঠেলতে লাগল, সদ্য আবিষ্কার করা প্রশ্নগুলোর যথাযথ উত্তর খোঁজার দিকে। আমিও একসময় ঠিক করে ফেললাম ভাবনার এতসব তলকে যেহেতু একাহাতে সামলে একযোগে বাঁধতে পারব না, তাহলে বেসামাল পথে হেঁটে যতটুকু করা যায় তাই করি। এবং আমার লাভ লাইফের ট্রায়াল টার্নিং পয়েন্ট ছিল এটাই। ট্রায়াল টার্নিং পয়েন্ট! অদ্ভুত শব্দ। অথচ এর গভীরতা কত জটিল। দিন আর রাতের ফারাকের মতো।

ঘটনা এগিয়ে আরও মাসখানেক পরের। একটানা সাড়ে তিন মাস রুশানের বিরহ, ওকে ইগনোর করার জ্বালা, একটাবার ওকে চোখে দেখার তৃষ্ণায় তৃষিত হয়ে ভেতরের ছটফটানি যখন কিছুতেই আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না, সে সময়ে আবারও দৈব বলে আপু এসে টেনে নিয়ে গেল আমায় ওর বাড়িতে, মন ভাল করার উদ্দেশ্যে। আমি বারণ করলাম না, যেহেতু ক্লাস অফ ছিল, একাকী লাগত সবসময়, এছাড়া ওর লাইফের একটা নিউ স্টেজে পা রেখেছে বেচারি, মা হওয়ার সংবাদ পেয়েছে। এমন একটা মুহুর্তে ওর পাশে থেকে আনন্দ ভাগাভাগি না করলে ইনজাস্টিস হয়ে যায়। যদিও আমার জীবনে আনন্দ নামক শব্দের ছিটেফোঁটা অবশিষ্ট নেই ততদিনে, তবু একটু অভিনয়।

যাহোক, আপুর বাড়িতে পা রাখার পর আমার দিনগুলো একটু বেটার হবে এই আশায় রোজ ঘুমুতে যেতাম। পরদিন ঘুম থেকে উঠলে বেটার কিছু দেখতাম না যদিও, বরং রুশানের তালাবদ্ধ ঘর, টেরেসে দাঁড়ালে ওদের অপজিটের বন্ধ পড়ে থাকা বাড়ি; ফ্যামিলি ফটোতে সবসময়ের গম্ভীর ছেলেটার মুখে চাঁদের আলোর মতন মসৃণ হাসি, সব অবিচ্ছেদ্য অংশের মতো প্রতিমুহুর্তে ওর কথা স্মরণ করাতো। আমার এত কান্না পেত সে সময়গুলোতে! ছুটে গিয়ে মানুষটার কলার চেপে ধরে বলতে ইচ্ছে করত,
“আমাকে একটু বাঁচতে দেবেন প্লিজ? আর পারছি না তো। এভাবে একা একা ভালোবেসে, যন্ত্রণা পেয়ে আর কত? কেন এলেন না আপনি আমার জীবনে আগে? কেন আমাকে না বেসে ভালোবাসলেন অন্যকাউকে? কেন?”

তবে একটা জিনিস ভালো হয়েছিল এসবের মধ্যে, প্রেমিকা রুমুর ভেতরে ভেতরে কি হয়ে যায় যাক, বাইরে সে দিব্যি অভিনয় করে চালাতে পারত। মনের বিরুদ্ধে হাসি, আড্ডা, আগের মত সবার সাথে দুষ্টুমি; এমনভাবে বিষয়গুলো রপ্ত করে ফেলেছিলাম! আপুও বিশ্বাস করে ফেলল, ওর বোন এতদিনে অবাধ্য থেকে বাধ্য হয়েছে। রুশানের প্রতি আবেগকে প্রশ্রয় দিয়ে জোরজবরদস্তি ভালোবাসার নাম আর দেয়নি, বরং ওকে ভুলে পুনরায় নিজের সুস্থ জীবনে ফিরে গিয়েছে। এমন ধারণার গৌরবেই কিনা, যেকটাদিন বাড়িতে ছিলাম ও একবারের জন্যেও আমার সামনে তুলত না রুশানের কথা, যেন নাম গোপন করলেই অস্তিত্ব গোপন করা যাবে মানুষটার।
আমি আড়ালে হাসতাম। ওকে জানতে দিতাম না, ওর ধারণা যে কতটা মিথ্যে।

আপুর বাসায় দিনগুলো আমার মন্দ কাটছিল না। রুশানের স্মৃতিতে লুটিয়ে পড়ার সময়টুকু বাদ দিলে ওর শশুর-শাশুড়ির নিঃস্বার্থ স্নেহ, আপু দুলাভাইয়ের সাথে খুনসুটি, ঘোরাঘুরি সব আমার বাহিরের সত্তাকে খুব তরতাজা করে দিল। ভেতরে ভেতরে একটু কষ্ট হলেও সে কটাদিন জাইদির সাথে ফোনেই কথা বলাটাকে নিয়ম করে নিলাম আমি। যদিও ফোনের স্ক্রিনে অচেনারূপে মাকে দেখে ও খুব কষ্ট পেত, তড়পাত কোলে আসার জন্য। কিন্তু খারাপ লাগলেও আমি শক্ত থাকার চেষ্টা করতাম। আমাকে নিশ্চয়ই সেসব দিনগুলোতে নিষ্ঠুর ভাবত রুশান? সজ্ঞানে তো ছিলাম না তখন তাই বুঝতে পারিনি। তবে ঘোর ভাঙতেই যখন বাস্তবজ্ঞানে ফিরেছি, তখন কিন্তু সবার আগে ঐ দিন সাতেকের নিষ্ঠুরতার কথা ভেবেই সবচাইতে বেশি যন্ত্রণা হয়েছে আমার। নিজেকে অভিশাপ দিয়েছি, দু-হাত তুলে সৃষ্টিকর্তার দরবারে ফরিয়াদ জানিয়েছি কঠোরতম শাস্তির। যে শাস্তি বলে আমি যেন চিরকাল মনে রাখি নিজের স্বার্থে অন্ধ হয়ে কতটা অমানবিক হয়ে গিয়েছিলাম একটা শিশুর প্রতি, যাকে আগলে নেবার জন্য উনি আমাকে বিশেষভাবে পাঠিয়েছিলেন।

সৃষ্টিকর্তা আমাকে ভালোবাসেন আসলে অদ্ভুতভাবে। খুব চমৎকারভাবে আমার কিছু ফরিয়াদ তিনি সাথে সাথে কবুল করে নেন, কিছু কবুল করার আগে তড়পান অনেক। যেমন শাস্তির চাওয়াটা কত দ্রুত কবুল করে নিয়েছিলেন। হৃদয়ে মোহর মেরে সেই নিষ্ঠুরতার গল্প এমনভাবে সিলগালা হয়ে গিয়েছিল আমার, জীবনের শেষভাগ পর্যন্ত কোনোদিন তাকে ভুলতে পারব না উপলব্ধি করে ফেলেছিলাম আমি।
আর এই উপলব্ধি এলো যেভাবে, তা গোটা এক ইতিহাসের সমান। ছোট্ট জীবনে দ্বিতীয়বার এত বাজে ভাবে চমকাতে হতে পারে আমাকে, আপুর বাড়িতে সপ্তম দিনটা না এলে জানা হতো না কোনোদিন।

সাফিন ভাইয়ার অফিস শেষ হতো প্রায় সন্ধ্যার দিকে। জ্যামট্যাম ঠেলে বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত আটটা অথবা নয়টা। আমি যতদিন থেকেছি ওই বাসায়, ভাইয়াকে পেয়েছি একদম ডিনার টেবিলে, নইলে ডিনারের পর বাড়তি যতটুকু জেগে সে আড্ডা জমানোর চেষ্টা করে, ততটুকু সময়ে।
কিন্তু ঘটনা যেদিনের, সেদিন ভাইয়া তার গৎবাঁধা সময়ের চাইতে কিছুটা আগেভাগে চলে এলো বাড়িতে। বোধহয় বিকেলে বেরিয়েছিল, তাই ফিরল একদম সন্ধ্যায়। ফিরেই তো হুলুস্থুল, শালির হাতের চা-নাশতা খাবে। আমিও মজা করে বললাম, শালি একা কেন কষ্ট করবে? আপনিও হেল্প করুন।
ভাইয়া মানা করল না। উল্টো ফ্রেশট্রেশের বালাই নেই। বাইরের কাপড়েই ছুটল আমার সাথে রান্নাঘরে। ভাইয়া আমাকে বরাবর ছোটবোনের মতো স্নেহ করেছে, আমিও তাকে পাল্টা ভালোবেসেছি ভাইয়ের মতো। কখনো ভাইয়ের ছক থেকে বেরিয়ে দুলাভাই নামক ফর্মালিটির কথা যেন মনে না পড়ে, সেজন্য ভাইয়া খুব দুষ্টুমি খুনসুটি করত আমার সাথে। আমিও আনন্দের সাথে তাল মেলাতাম। সেদিনও মেলাচ্ছিলাম আর হাসাহাসি করছিলাম প্রচুর।
আপাতদৃষ্টিতে এভ্রিথিং ওয়াজ অলরাইট আন্টিল চা বানাতে বানাতে বেখেয়ালে আমার নজর পড়ে গেল পিছু ঘুরে সিংকে কাপ ধুতে থাকা সাফিন ভাইয়ার কানের পেছনে প্রায় চুলের পাশ থেকে উঁকি দেয়া অদ্ভুত রকমের কালো লম্বাটে একটা দাগে।
শুরুতে ভাবলাম পোকা বোধহয়! দুষ্টুমি ভুলে চোখ সরু করে ভাইয়াকে ডেকে প্রায় প্যানিক করে যখন বললাম পোকার কথা, তখন পাল্টা সে হাসতে হাসতে জানাল,
— বোকা এটা তো আমার বার্থ মার্ক।পোকাটোকা নয়। সী?

আঙুল দিয়ে চুল সরিয়ে দাগটা সে দেখালো আমার প্যানিক করা দেখে। সাথে বোধহয় খোঁচাতে শুরু করল এই বলে,
— সামান্য বার্থ মার্ক চিনতে পারিস না? পোকা ভেবে প্যানিক খাস! কেমন ডাক্তার রে তুই?

আমার তখন সেন্স হারাবে হারাবে করছে। কানে শুনতে কিংবা কথা বুঝতে পারছি না কিছুই। নিরবচ্ছিন্ন ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে তার দুষ্টুমি হাসিমাখা মুখ আর ভ্রু নাচানো দেখে এতটুকু ধারণা করতে পারছি, যা বলছে আমাকে ক্ষ্যাপাতেই বলছে নির্ঘাত। কিন্তু আমার কানে আপাত কোনো কথা ঢুকছে না।
বরং ঐ দাগটা, ঐ সিঙ্গেল দাগটা দেখে অচীরে মেরুদণ্ড বেয়ে ঠান্ডা রক্তের স্রোত বয়ে যাচ্ছে টের পেলাম। স্টিলের ছোট্ট চামচ যেটা দিয়ে চায়ের পাত্রে চিনি মেশাচ্ছিলাম, তা আমার হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে বসল। থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে আমি টের পেলাম, বিস্ময়ে প্রায় ঝাপসা হয়ে আসা চোখের পর্দায় সিনেমার রিলের মতো খুব পরিচিত একটা দৃশ্য ভেসে উঠল, যে দৃশ্যে এমনই কালো লম্বাটে দাগের অস্তিত্ব আছে ছোট্ট কোমল আরও একজন মানুষের কানের পিঠে। এবং মানুষটা আর অন্যকেউ নয় বরং জাইদি! এ বাড়ির সন্তান। আচ্ছা, সে আসলে অংশ কার? রুশান নাকি সাফিনের?

দৈবাৎ সন্দেহের ছোট্ট বীজ দানা বাঁধতে শুরু করল আমার বুকের ভেতর। ওরই অসহ্যকর খচখচানিতে ভাইয়ার সামনে আর দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি পেলাম না। কাঁপা কাঁপা পা নিয়ে ঝড়ের বেগে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে রুমে ঢুকে গেলাম। পেছন থেকে ভাইয়া ডাকল কয়েকবার, জবাব দেয়ার মতো সাহস জোটাতে পারলাম না।
এতদিন পর হুট করে আমার ভ্রমে ডোবা মস্তিষ্ক একটু একটু করে তার স্বাভাবিক গতি ফিরে পেতে লাগল যেন। দুঃখের সাগরে ডুবে থাকার দিনগুলোতে “সামথিং ইজ নট রাইট” ধাঁধার উত্তর একটু একটু করে চোখের সামনে পরিষ্কার হতে লাগল।
ঠোঁট কামড়ে অনবরত পায়চারী করতে করতে আমি বুঝে উঠতে পারছিলাম না, এরপর আমার করণীয় কি? সেই মাস তিনেক আগে, আপুর বলা প্রতিষ্ঠিত সত্যির সাথে আজকের সন্দেহের তফাৎ তো দিন আর রাতের মতো। সন্দেহ যৌক্তিক নাকি অযৌক্তিক আমি জানি না, কিন্তু এর তল পর্যন্ত পৌঁছানো আমার জন্য অনিবার্য হয়ে গেল।

আসলে রুমুর প্রেমিকা মন তখনও নানা ছুতোয় ভালোবাসার মানুষকে হারিয়ে ফেলার হাত থেকে বাঁচানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করছিল কিনা! তার তো একটা ছোট্ট বাহানার প্রয়োজন ছিল, যেটাকে অবলম্বন করে এতদিনের অসহ্যকর কষ্ট পুরোদমে ঝেড়ে ফেলে পুনরায় ঐ মানুষটার দোরগোড়ায় সে পা রাখবে আগের মতো প্রবল ভালোবাসা হাতে।
___________________________

রাতটা কাটল ভীষণ অস্থিরতায়। নানারকম ভাবনায় দু চোখের পাতা এক করতে পারলাম না৷ কতবার মনে হয়েছিল মানুষটাকে একবার কল দেই, এই যে এত অশান্তি, বুকের ভেতরের ঝড়, তার কন্ঠ শুনলেই সব শান্ত হয়ে যাবে। কিন্তু এতদিন পর, এতকিছুর শেষে হুট করে এভাবে..
কষ্ট হলেও নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে হলো।পরদিন সকাল হতে ফ্রেশট্রেশ হয়ে মনের খচখচানি দূর করতে কোনোকিছু না ভেবে সোজা ছুটে গেলাম আমি রুশানের বাড়িতে।

রুশানের সেদিন অফ ডে। জার্সিটার্সি পরে বাপ ছেলে লনে ফুটবল নিয়ে ছুটোছুটি করছিল। অসময়ে আমায় দেখে দু’জনে থমকে গেল। ছোট্ট জাইদি গোটা সাতদিন পর তার প্রিয় মাকে পেয়ে স্থির থাকতে পারল না। টলোমলো পায়ে “মাম মাম” করতে করতে ছুটে এলো আমার কাছে। আমিও হাঁটু ভেঙে বসে দু’হাত বাড়িয়ে বুকে টেনে নিলাম ওকে। মনে হলো কালবৈশাখির রুদ্ররূপ শান্ত হলো যেন। রুশান থমকালেও এগিয়ে এলো না। আমি যে চোখ তুলে একবার তাকে দেখব, সে কথা মনে নেই। বরং সন্দেহটা মিটিয়ে নেবার জন্য অস্থিরতায় বেহাল দশা।
সত্যি বলতে সে সময় যতটা চাইছিলাম আমার ধারণা সত্য হয়ে যাক, ঠিক ততটাই মনের এক কোণ চিৎকার করে বলছিল,
“নাহ্, মিথ্যে হোক তোর অমূলক চিন্তা, ভয়। কারণ আজকের এই সত্য-মিথ্যের দ্বিধায় ঘর তো ভাঙবে কারো না কারোর। তোর ঘর সামলে গেলে, তোর বোনের ঘরে ঠিক ঝড় আসবে দেখিস”

তবে আমার দ্বিধায় কি এসে যায়? সৃষ্টির শুরু থেকে যা দিনের আলোর মতো উজ্জ্বল তা আমার অবচেতনের প্রার্থনায় পাল্টে যাবে কোন সাধ্যে?

জাইদিকে মন ভরে আদর করে নেবার ফাঁকে আঙুল চালিয়ে ওর ঘন চুলগুলো সরাতেই ঠিক ধূসর রঙা উড়ো মেঘের আস্তরণের ভেতর থেকে চনমনে সূর্যরশ্মির মতো আড়ালের সত্যিটাকে সৃষ্টিকর্তা আমার সামনে উন্মোচিত করে দিলেন। একইসাথে বুকভরা আশা আর শঙ্কা নিয়ে সাফিন ভাইয়ার অনুরূপ জন্মদাগের হদিস জাইদির শরীরে পাওয়ার পর নিজের বিশ্বাসকে যখন জিতে যেতে দেখলাম, তখন অন্যরকম অনুভূতিতে সারা শরীর থরথর করে কাঁপতে লাগল আমার। জাইদিকে ছেড়ে দু পা পিছিয়ে ধপ করে মাটিতে বসে পড়লাম নিজেকে সামলাতে।

রুশান আমার অদ্ভুতুড়ে আচরণে অবাক হয়ে এগিয়ে এলো এবার। পাশে বসে চিন্তাগ্রস্ত স্বরে জানতে চাইল,
— হোয়াটস হ্যাপেন্ড রুমু?

আমি তখন উত্তর দেয়ার পরিস্থিতিতে নেই। ঢোক গিলে কাঁপতে কাঁপতে উদভ্রান্তের মতো তাকালাম রুশানের দিকে। গোটা সাড়ে তিন মাস পর মানুষটাকে দেখার তৃষ্ণা অবশেষে মিটলে সামলাতে পারলাম না আর নিজেকে।

উত্তাল ঢেউ যেমন শেষ আশ্রয়ে সাগর তীরে আছড়ে পড়তে চায়! ঠিক তেমন করেই মানুষটার প্রশস্ত বুকে মুখ গুঁজে শব্দ করে কেঁদে ফেললাম আমি। একইসাথে আনন্দ আর বুক ভাঙা যন্ত্রণায় রীতিমতো পাগল পাগল দশা হলো আমার। মনে হলো, এখন এই অদ্ভুত সকালটায় সর্বহারা রুমুকে বাঁচাতে যদি পারে কেউ, তাহলে একমাত্র তার ভালোবাসার মানুষই পারবে। অন্য কেউ নয়।

অপরদিকে আমার কান্নায় রুশান যতটা হতভম্ব হলো, তার চাইতে বেশি অকস্মাৎ স্পর্শ তাকে জমিয়ে দিল। এক মুহুর্তের জন্য শরীর শক্ত হয়ে উঠলেও দ্রুত সামলে মাথার পেছনে হাত রাখল আমার। কিছু না জেনেও, না বুঝেও অস্ফুটে সান্ত্বনা দিয়ে বলল,
— ইটস ওকে। এভ্রিথিং উইল বি অলরাইট।
— ইট মাস্ট বি রুশান, ইট মাস্ট বি।

বিনিময়ে তার দিকে তাকিয়ে কান্নামাখা গলায় প্রতিজ্ঞা করলাম আমি। সে মৃদু হেসে আমার চোখে চোখ রাখল। আঙুলের আলতো স্পর্শে চোখের পানি মুছে দিয়ে সম্মতিতে মাথা নাড়ল।
তাকে দ্বিতীয়বার আঁকড়ে ধরে মাত্র পাওয়া সত্যিকে প্রমাণের রূপ দিতে ডিএনএ টেস্টের সিদ্ধান্ত নিলাম। রুশানের সাথে ডিএনএ টেস্ট করা যেত সহজে, কিন্তু প্যাটের্নাল টেস্টে সরাসরি বাচ্চার বাবার কনফার্মেশন আমার প্রয়োজন ছিল। তাই জাইদির সাথে দুলাভাইয়ের ডিএনএ টেস্টটাই করব ভেবে ফেললাম।
এরপর দিন দুয়েকে দু’জনের স্যাম্পল কালেক্ট করলাম প্রায় সংগোপনে। রিপোর্ট যে পজিটিভ আসবে তা তো জানাই ছিল। তবু আগে থেকে জেনে বসে থাকা রিপোর্টের জন্য আমার অপেক্ষা অধীর হলো।

চলবে,
Sara