প্রিয় রুমু পর্ব-০৬

0
2

প্রিয় রুমু

____________________

ডিএনএ টেস্টের রেজাল্ট এলো তিনদিন পর। রিপোর্ট যা ভেবেছিলাম তাই, পজিটিভ। সাফিন খান জাওয়াদ ই হলো জাইদ রাহাতের বায়োলজিক্যাল বাবা। আর রুশান রাহাত? পেপারে তার ডেজিগনেশনের জায়গাটা বিরাট এক প্রশ্নবোধক চিহ্ন। তবু ইমোশনে সে জন্মদাতা বাবার চাইতে কয়েকগুণ ওপরে যা কেউ কল্পনাও করতে পারবে না।

লাঞ্চ ব্রেইকের সময়টায় রিপোর্ট পেয়ে অনেকক্ষণ থম মেরে বসে রইলাম আমি ল্যাবের বাইরে ওয়েটিং জোনের এককোণে। নিঃশব্দ কান্নায় ভেসে যেতে যেতে মনটা বারবার চিৎকার করে বলছিল,

“এতবড় ভুল আমি কি করে করতে পারি? কীভাবে ভুলে যেতে পারি ভালোবাসার ওপর আস্থা হারানো অন্যায়। একজন তৃতীয় মানুষের কথা শুনে সত্য মিথ্যা যাচাই না করে এভাবে নিজের ভালোবাসার মানুষকে দূরে ঠেলে দিয়েছি গোটা তিন মাস। আমার ভালোবাসার ওপর প্রশ্নবোধক চিহ্ন তৈরি করেছি, কীভাবে?”

দীর্ঘটা সময় নিজের অপরাধী সত্তাকে তিরস্কার করার পর অবারিত কান্নার ঢেউ যখন হালকা করে দিল সমস্ত ভারকে, তারপরেই একটা অবর্ণনীয় আনন্দ টের পেতে লাগলাম নিজের ভেতরে। যেটা চঞ্চলা বসন্ত বাউরির মতো ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ করে প্রবল সুখের নীলাভ আকাশে ভাসিয়ে নিচ্ছিল আমায় পরম আদরে।
আমার মানুষটার চরিত্রের ওপর থেকে গ্রহদোষের দাগটা যে তুলতে পেরেছি, এই সুখে অনেকটা সময় বুঁদ হয়ে রইলাম। বারবার রিপোর্টে চোখ বুলিয়ে সত্যিটাকে পরীক্ষা করে নিতে এত ভালো লাগছিল!
উপলব্ধি করছিলাম, আমার কাছে আসলে শুরু থেকে মুখ্য, ভালোবাসার বিনিময়ে ভালোবাসা পাওয়া। আমি যাকে মনপ্রাণ দিয়ে কামনা করি, তার হৃদয়ে অন্য একজনের ছায়া থাকবে, এটা বরদাস্ত করা আমার পক্ষে সম্ভব নয় কোনোদিন। ভালোবাসার মানুষটাকে নিয়ে অবসেশান তুঙ্গে কিনা! তার জীবনের আরাধ্য একমাত্র আমিই হব, এটাই ছিল প্রেমিকা রুমুর সবসময়ের চাওয়া। তাই তো নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টা করার পূর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত তার মন তাকে বারবার প্রশ্ন করেছে, একগাদা সন্দেহের উদ্রেক ঘটিয়ে সত্যি মিথ্যের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, এবং অবশেষে সঠিক আর ভুলের ফারাক করে নিজের হারিয়ে যাওয়া স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে।

বহু আকাঙ্ক্ষিত আমার এই আনন্দের খবর কারোর সাথে শেয়ার করতে খুব ইচ্ছে করছিল। একাধারে ফোনের কললিস্ট ঘেঁটে একটা নম্বর বের করতে চাইলাম যাকে নির্দ্বিধায় বললেও অন্যায় হয়ে যাবে না। কিন্তু কথাটা এত গোপন! খুব আপনজনকেও বলার দুঃসাহস নেই। অগত্যা স্বস্তিটুকু নিজের ভেতরে চেপে রিপোর্ট হাতে বেরিয়ে এলাম ল্যাব থেকে।
সময়টা নিরবচ্ছিন্ন ভালো যেতে পারত চাইলেই, অথচ তা কিন্তু হলো না। খুব আকস্মিকভাবে ল্যাবের বাইরে পা রাখামাত্র অপ্রত্যাশিত একজন মানুষ আমার সামনে পড়ে গেল। মিশকালো বুটের সাথে কালো ফর্মাল প্যান্টে চোখ পড়তেই বিস্ময়ে আমি মুখ তুলে তাকাতে চাইলাম অথচ তার আগেই হ্যাঁচকা টানে সে আমাকে নিজের গাড়িতে তুলে নিল। বিষয়টা এত দ্রুত ঘটে গেল, প্রতিক্রিয়া দেয়ার সময় পেলাম না। যখন সম্বিৎ ফিরল, তখন চোখ মেলে দেখি শহরের ছোট্ট ছিমছাম একটা ক্যাফের সামনে দাঁড়িয়েছে গাড়িটা।
দ্বিতীয় দফা বিস্ময়ে তার মুখের দিকে তাকালাম আমি। চাবুকের মতো ধারালো বঙ্কিম মুখমণ্ডলে অনুভূতির লেশমাত্র নেই। বরং আমার কোনো কাজের জন্য তাকে অসন্তুষ্ট লাগল বেশি। ছোট্ট শ্বাস ফেলে আমি দু’দিকে মাথা নাড়লাম হতাশভাবে। সে দেখেও দেখল না। স্টিয়ারিংয়ে একটা ঘুষি মেরে গাড়ি থেকে নেমে ডোরটা খুলে বজ্রপাতের মতো গমগমে স্বরে বলল,
— ক্যাফেতে চলো। ইম্পর্ট্যান্ট কথা আছে।

মানুষটার কণ্ঠস্বরে কিছু একটা ছিল। আমাকে বেশ ভয় পাইয়ে দিলো। দ্বিরুক্তি না করে নিঃশব্দে আমি নেমে দাঁড়ালাম গাড়ি থেকে। বুঝতে পারছিলাম না একা একা হেঁটে যাব কিনা। সে অবশ্য আমার কনফিউশান দূর করে দিল। গাম্ভীর্যের পেছনের রাগটা প্রকাশ করতে শব্দ করে ডোর লক করে আমার কবজি চেপে ধরে হনহনিয়ে ক্যাফের ভেতরে একটা নিরিবিলি টেবিলে নিয়ে বসালো। আমি তখন ভূতগ্রস্তের মতো স্তব্ধ। অল্পসময় আগের আনন্দ সবটা ঢাকা পড়েছে অজানা ভয়ের পুরু চাদরে। অনেককিছু বলতে ইচ্ছে করলেও মুখ ফুটে বলতে পারছি না কিছুই। শুধু ভীতু চোখে তাকিয়ে আছি সামনের মানুষটার ধারালো চোখমুখের দিকে। অপরদিকে সেও পাথুরে দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমারই চোখে। পরিবেশটা এত অস্বস্তিকর! ছুট্টে পালিয়ে যেতে পারলে বেঁচে যাব মনে হচ্ছিল।

আমাদের এসব স্তব্ধতা রইল আরও কিছুক্ষণ। এরপর সময় গড়ালে সে-ই আগে কথা বলল। শান্ত স্বরে আমাকে জিজ্ঞেস করল,
— তুমি যা করলে, তার কি খুব প্রয়োজন ছিল?
— ছিল। নইলে শান্তি পাচ্ছিলাম না আমি।

ভয় পেলেও ধীর স্বরে বললাম আমি। সে ছোট্ট করে শ্বাস ফেলল। বলল,
— তোমার এসব ইমম্যাচিওরিটির পরিণাম কি হবে আইডিয়া করতে পারো?
— পরিণামের প্রসঙ্গ আসছে কেন? আমার শুধু ক্ল্যারিটির প্রয়োজন ছিল। তা হয়ে গেছে। এরপর এই রিপোর্ট সম্পর্কে পৃথিবীর আর কেউ কোনোদিন জানতে পারবে না।

এক ফোল্ড করা রিপোর্টটা দ্বিতীয়বার না ভেবে আমি বাড়িয়ে দিলাম রুশানের দিকে। রুশান এবারে আর বিস্ময়ভাব আড়াল করতে পারল না। হাত বাড়িয়ে নিলও না রিপোর্টটা। শুধু বলল,
— তোমার কাছে রেখে দাও।
— কেন? আমার কাছে রাখলে তো পরিণাম খারাপ হতে পারে।

না চাইতেও আমার কণ্ঠে কিছুটা অভিমান ফুটে উঠল বোধহয়। রুশান হাসল। টেবিলে আঙুল দিয়ে মৃদু শব্দ করে মাথা দুলিয়ে বলল,
— ভেবেছিলাম তোমার এতবড় দুঃসাহস দেখে কতগুলো কড়া কথা শুনিয়ে দেব। অথচ সামনসামনি বসে আ’ম শানড নাউ। তোমাকে টেনে এতদূর নিয়ে আসার পর, মাই ওয়ার্ডস আর লস্ট।

শেষ কথাটা বলতে গিয়ে মানুষটার কণ্ঠে একটা বিব্রতভাব ফুটে উঠল। তা দেখেই কিনা আমার ভয় পুরোদমে কেটে ফুরফুরে আনন্দের হাওয়াটা ফিরে এলো এতক্ষণে। লজ্জা তো আমারও লাগছিল অনেকটা। কিন্তু প্রকাশ করলেই সে যদি গুটিয়ে যায় বরাবরের মতো! তাই জোর করে চাপিয়ে রাখলাম ভেতরে। উল্টো মেকি অভিমানের স্বরে বললাম,
— আমি নিশ্চয়ই আপনার কথা আটকে রাখিনি!

রুশান সাড়া দিল না আমার কথায়। বরং অল্পকিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— টেল মি ওয়ান থিং রুমু, হোয়াটস ইম্পর্ট্যান্ট ইন ইওর লাইফ? দ্য ট্রুথ, অর সামথিং এলস।

আমি সহসা ধরতে পারলাম না তার প্রশ্নটা। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। সেই আবারও বলল,
— হোয়াট ইফ দ্য রিপোর্ট ওয়াজ এ্য লাই। হোয়াট ইফ তুমি যে রুমার শুনে এত অস্থির হয়ে গিয়েছিলে সেগুলো সত্যি। তাহলে?
— আমি জানি না রুশান তাহলে কি হতো! শুধু জানি, এই তিন মাসে আই হ্যাভ ট্রাইড মাই লেভেল বেস্ট টু গেট রিড অব দিস ফিলিংস, টু গেট রিড অব ইউ।
বাট ফেইল করেছি। পারিনি আমি আপনাকে মন থেকে, মাথা থেকে সরাতে। অপশন আমার হাতে দুটো ছিল, এক আপনাকে বেছে নেয়া, দুই ফিলিংলেস হয়ে যাওয়া।
আর জিজ্ঞেস করলেন না হোয়াটস ইম্পর্ট্যান্ট? রুশান, দ্য আন্সার ইজ অলওয়েজ ইউ, জাইদ। ইউ বোথ হ্যাভ বিক্যাম পার্টস অফ মাই হার্ট। হাউ ক্যুড আই রিমোভ ইউ গাইস সো ইজিলি?
আমি সত্যিই না জানি না ফিলিংলেস হওয়ার প্রবল চেষ্টা করলেও কতটা করতে পারতাম!আবার একপাক্ষিক ফিলিংসকে ইগনোর করলেও জাইদের মা রুমুকে কীভাবে ইগনোর করতাম।

অসহ্য রকমের প্রিয় যন্ত্রণাগুলো নিজের ভেতরে আর চাপিয়ে রাখার সাধ্য আমার ছিল না। তাই আড়ালের সবটা উপুড় করে দিতে গিয়ে সেই কবে শিপড়ার সামনে খুব অ্যাটিটিউড দেখানো রুমু আজকের রুমুর হাত ছেড়ে চিরতরে হারিয়ে গেল।
চির আরাধ্য ভালোবাসার মানুষটার সামনে বসে, নিজের মনের সমস্ত অস্থিরতা এলেবেলে শব্দে বলতে গিয়ে শক্ত রুমুর খোলস ভেঙে বেরিয়ে আসা প্রেমিকা রুমুর চোখ ভরে আসতে চাইল বারবার। যা সে আড়ালের চেষ্টা অবধি করল না।

ওদিকে আমার এমন আবেগতাড়িত প্রতিরূপ দেখে রুশান নতুন করে আর অবাক হলো না।ওর স্বাভাবিক মুখভঙ্গি দেখে বোঝা গেল, এমন উত্তর সে পেতে পারে এ যেন তার জানাই ছিল। বরং আমার উত্তরে তার পাথুরে চোখজুড়ে স্বস্তির কোমলতা ফুটে উঠল। সময় নিয়ে আমায় ইমোশনের সাথে কোপআপ করতে দিয়ে পরমুহর্তে হেলান দেয়া থেকে সোজা হয়ে বসল রুশান। আমার চোখে চোখ রেখে দৃঢ় গলায় বলল,
— দ্য থিং ইজ, একা রুমু শিকদারের পৃথিবী আর রুশান রাহাতের পৃথিবী দুটো একে অপরের থেকে আলাদা ছিল এতদিন। বাট সামহাউ, অ্যাট দিস মোমেন্ট, আওয়ার ওয়ার্ল্ড হ্যাভ কোলাইডেড (Collided)৷ এরপর সেপারেশন ওয়ার্ড আমাদের মাঝে এক্সিস্ট করে না।
বাট স্টিল, ইউ হ্যাভ অ্যান অপরচুনিটি রুমু। থিংক টোয়াইস।
কারণ তুমি তোমার আশেপাশের সবাইকে নিয়ে বানানো হাসি ঠাট্টার সুখী পৃথিবী থেকে বেরিয়ে একবার যদি রুশান রাহাতের ছকে ঢুকে যাও, এরপর দেয়ারস নো ওয়ে আউট অব হিয়ার। ইউ কান্ট ইম্যাজিন হাউ মাচ রুশান রাহাত ক্রেভড ইওর এক্সিসটেন্স রুমু।

অপ্রত্যাশিত সব কথামালা শোনার সাথে সাথে রুশানের চোখের দৃষ্টি ধারালো ফলা হয়ে আমার অন্তরে বিঁধে গেল মিষ্টি মধুর এক যন্ত্রণা হয়ে। যে যন্ত্রণা ওকে ভালোবাসার অনুভূতির চাইতেও ভীষণরকমের ভিন্ন, আরও আকাঙ্খিত। রুশান কিন্তু বুঝতে পারল আমার অনুভূতির প্রাবল্যে ভেসে যাওয়ার সুখ। নিশ্চুপ থেকে এই সুখটাকেও সয়ে নেয়ার যথেষ্ট সময় দিল।

এরপর অনুভূতিকে আপন করে নেবার পর মুখ ফুটে যখন আমি বলতে যাব কিছু, তখন খুব আলতো করে মাথা দুলিয়ে বলল,
— নো হারি। ঠান্ডা মাথায় ভেবে তারপর এসো। রুশান রাহাত হ্যাজ হ্যাপিলি ওয়েইটেড অল দিজ ইয়ার্স, অ্যান্ড হি উইল নেভার বি টায়ার্ড অব ওয়েটিং ফার্দার। রিমেম্বার রুমু শিকদার, ইউ আর অলওয়েজ ওয়েলকাম ইন মাই ওয়ার্ল্ড। অলওয়েজ।

হাত ধরা কিংবা আমাকে একটুখানি ছুঁয়ে দেবার প্রবল ইচ্ছায় ওর আঙুলগুলো নড়ে উঠে একটুখানি এগোলেও মাঝপথে থেমে গেল। আরও একবার ভালোবাসার উর্ধ্বে নিজের নিষ্ঠুরতাকে জিতিয়ে দিয়ে রুশান রাহাত আমাকে আর সুযোগ দিল না প্রতুত্তরে বলার, এই মুহুর্তটার জন্য আমি পাগলপ্রায় হয়ে অপেক্ষা করেছি এতদিন। হোক না সময়ের হিসেবে স্বল্প দিন, কিন্তু ভালোবাসার হিসেবে রুমু শিকদারের ভালোবাসা কেউ পরিমাপ করবে সাধ্য আছে বুঝি?

দাঁতে দাঁত চেপে তখনের মত চুপ করে রইলাম। এরপর কফির সিপ নিতে নিতে আমাদের কথা তেমন এগলো না। কে জানে রুশান কোনো খেয়ালে হারিয়েছিল কিনা! তবে রুমু শিকদারের প্রণয়িনী সত্ত্বা ততক্ষণে যা সিদ্ধান্ত নেবার নিয়ে ফেলেছিল। এই সিদ্ধান্তকে অবশ্যই জীবন মরণ সংশয় বলা চলে। এরপরই আসলে ফাইনাল হতো চিরকালের মতো রুশানের লাইফে রুমু থাকবে কি-না।
______________________

তখন ঠান্ডা মাথায় ভাবনার সময় আমার আর নেই। গোটা দিনের ঘটনাগুলোকে থরে থরে সাজিয়ে সদ্য নেয়া সিদ্ধান্তকে বাস্তবের রূপ দিতে, হলে ফিরেই সোজা বাবার নম্বরে কল করলাম। বাবা বোধহয় তখন সবে যোহরের নামাজ পড়ে খেতে বসেছে। আমার কল পেয়ে হাসতে হাসতে বলল,
— কি কো-ইন্সিডেন্স বলো তো। তোমার মা ভাত বেড়ে দিতে দিতে এক্ষুনি তোমার কথাই বলছিল। বলছিল হাঁসের মাংস দেখলেই..
— বাবা আই নিড টু টক টু ইউ রাইট নাও।

অধৈর্য হয়ে বাবার কথাকে অর্ধেকে রেখে কেঁদে ফেলে বললাম আমি। বাবা শুরুতে ভয় পেল আমার অকস্মাৎ কান্না দেখে। অবাক হয়ে জানতে চাইল,
— কি ব্যাপার রুমু? কাঁদছ কেন মা?
— বাবা শোনো। আমি এখন একটা ভয়াবহ জিনিস কনফেস করব তোমার কাছে। জানি তুমি কষ্ট পাবে। কিন্তু বাবা আমি কি করব? আমার যে এত কষ্ট হচ্ছে বুকের ভেতর। মনে হচ্ছে মরে যাই।
— আচ্ছা। আচ্ছা তুমি শান্ত হও। আমি এক্ষুণি গাড়ি পাঠাচ্ছি। চলে এসো বাসায়। তারপর যা কথা হবে সামনাসামনি।
— না বাবা। আমি সামনে থেকে তোমাকে গুছিয়ে বলতে পারব না কিছু। যা বলার ফোনেই বলতে হবে। প্লিজ।
— ঠিকাছে বলবে। কিন্তু কান্না থামাও আগে। একটুও কাঁদবে না। স্থির হয়ে কোথাও বসে বলো। বাবা শুনছে।
— শ..শোনো বাবা, আমি না একটা ছেলেকে, নাহ, একটা মানুষকে ভালোবেসে ফেলেছি। প্রচন্ড। জানি না কীভাবে হলো বিষয়টা। আমি না চাইনি শুরুতে। দূরে দূরেও থাকার চেষ্টা করেছি অনেক। কিন্তু যতটা দূরে সরতে চেয়েছি ততই যেন দূরত্ব কমে গিয়েছে বাবা। এখন এই মুহুর্তে ঐ লোকটাকে ছাড়া আমার কিচ্ছু ভালো লাগছে না। আমি না পড়তে পারছি, না খেতে, ঘুমতে পারছি। কিচ্ছু করতে পারছি না আমি;জাস্ট কিচ্ছু না।

বলে একটু অপেক্ষা করলাম আমি। ওদিকে বাবার কোনো রেসপন্স নেই। নাক টেনে ডাকলাম নিজে থেকেই,
— বাবা তুমি কি শুনছ আমি কি বলছি?

আমার ডাকের পর বাবা উত্তর দিল। কোমল শান্ত কণ্ঠে জানতে চাইল,
— তুমি ওকে নিয়ে যেভাবে ভাবছ, ছেলেটাও কি সেভাবেই তোমাকে নিয়ে ভাবে রুমু?
— ভাবে। খুব ভাবে। আমি টের পাই বাবা। লোকটার চোখের দিকে তাকালে মনে হয় ও বোধহয় আমার চাইতেও কয়েকগুণ বেশি আমাকে নিয়ে ভাবে। কিন্তু প্রকাশ করতে ভয় পায়।
— তুমি নিশ্চয়ই তার ভয়ের কারণটা জানো?

আমি সাথেসাথে উত্তর দিতে পারি না। আমার বুকের ভেতরটা ঢিপঢিপ করে। শ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে চায়। বাবা বুঝতে পারে আমি জানি। ফোনের ওপাশ থেকে অল্প হেসে বলে,
— বাবাকে কারণটা কি বলা যায় রুমু?
— উনি.. ওনার আসলে একটা দেড় বছরের বাচ্চা আছে বাবা।
— রুমু, তুমি কি সামহাউ রিদার দেবর রুশানের কথা বলছ?

আমাকে বিস্ময়ের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে দিয়ে পরমুহুর্তেই বলে ওঠে বাবা। আমি ভীত স্তব্ধ বিব্রত মেয়ে, সহসা জবাব দেয়ার শক্তি পুরোপুরি হারিয়ে ফেলি। ফোনের ওপাশ থেকে যেন মৃদু হাসির আবছা শব্দ ভেসে আসে আমার কানে। বাড়তি কথার বালাই না করে সোজাসাপটা বাবা প্রশ্ন করে,
— তুমি কি ওকে বিয়ে করতে চাও রুমু?

চলবে?
Sara