প্রিয় রুমু পর্ব-০৭ এবং শেষ পর্ব

0
3

প্রিয় রুমু
শেষ পর্ব
_________________________

“তোমার মা বলে, আমি তোমার প্রতি একটু বেশিই বায়াসড। বিষয়টা আমি অস্বীকার করি না। তুমি তো বাবার জান। তুমি যেদিন হলে সেদিন আমি বিজনেসের কাজে সুনামগঞ্জের কাছাকাছি। সময়ের প্রায় মাস দুয়েক আগে ভীষণ ঝড়বৃষ্টির রাতে তোমার মায়ের সাডেন লেবার পেইন ওঠে। ওয়েদারের কারণে সেখানে এত ভয়াবহ অবস্থা ছিল! আমাকে কন্টাক্ট করার কোনো ওয়ে ছিল না। তোমার মা এদিকে একা কীভাবে হসপিটাল পৌঁছেছে, তুমি পৃথিবীর আলো দেখেছ আমি ওখানে বসে কিচ্ছু জানি না। এবং সবচাইতে দুঃখজনক ব্যাপার হলো, তোমাদের নিউজ শুধু সেদিন রাতে নয় তারপর আরও তিনদিন আমি পাইনি। বন্যায় গোটা দেশ থেকে সুনামগঞ্জ আলাদা হয়ে গিয়েছিল। আমি বেঁচে ফিরব কিনা তার নিশ্চয়তা পাইনি প্রথম দু’দিন। যাকগে, সৃষ্টিকর্তার ইশারা ছিল, রেসকিউ টিমের সাহায্যে বেঁচে ফিরতে পেরেছিলাম। এরপর ঢাকা ফিরে যেখানে তোমার জন্মানোর নিউজ পেয়ে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুখী ব্যক্তিটা হওয়ার কথা ছিল আমার, সেখানে জানতে পারি ক্রিটিক্যাল ইস্যু নিয়ে আমার সদ্য জন্মানো মেয়েকে ইনকিউবেটরে রাখা হয়েছে। জন্মানোর প্রায় সাথে সাথেই এত খারাপ অবস্থা তার হয়েছিল! ডক্টর, নার্স আর টুকিটাকি দু একজন আত্মীয়স্বজন ছাড়া কেউ ওকে দেখার কিংবা কোলে নেয়ার সুযোগ পায়নি, এমনকি ওটি ফেরত তোমার মাও না। গোটা চারদিন একটা দুর্যোগ মোকাবিলা করে ফেরার পর এতসব খারাপ খবর শুনে আমি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। তোমার মা যখন ব্যথায় কাতর শরীর নিয়ে হসপিটালের বেডে আমার দু হাত ধরে অনুনয় করে বলল, তোমাকে একবার যেন তার কাছে নিয়ে আসি, একবার যেন কোলে দেই, সেই সময়ের অসহায়ত্ব কীভাবে বোঝাব আমি রুমু!”

বাবার গলার স্বর আর্দ্র হয়ে উঠেছে বুঝতে অসুবিধে হলো না আমার। নিজের চোখের পানি মুছে বিছানার এক কোণে গুটিসুটি হয়ে বসলাম। বাবা কিছুটা বিরতি নিয়ে আবারও বলল,
— তোমাকে দেখিনি এর আগে একদিনও, মায়েদের মতো গভীরভাবে অনুভব করার সুযোগও বাবাদের থাকে না। অথচ আমার না দেখা, না অনুভব করা ছোট্ট পরীটার জন্য বুকের ভেতর অসহ্যরকমের একটা চাপ টের পেতে লাগলাম। আর আমার এই চাপটা টনটনে ব্যথায় কখন পাল্টে গেল জানো?

আমি জানি উত্তরটা। তবু নাক টেনে মৃদু শব্দ করে বললাম,
— কখন?
— নিওনাটালের বাইরের গ্লাস থেকে যখন অসংখ্য সূঁচ আর নলে তোমাকে জড়ানো দেখলাম।
কাছে যাওয়ার পারমিশন তখনও পাইনি। প্রায় দশ হাত দূর থেকে অসহায়ভাবে মেয়েকে দেখে চোখ জুড়তে হতো। আমি অভিযোগ করিনি কাউকে। আমার ছোট্ট পরীকে চোখের দেখা অন্তত দেখতে পারছি এটাও আমার কাছে অনেক বড় একটা গিফট ছিল। তুমি নিওনাটালে যতদিন ছিলে, ঘন্টার পর ঘন্টা গ্লাস ডোরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আমার অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল। সেই দিনগুলো তোমার মা আর আমার দু’জনের কাছেই ট্রমার মতো ছিল রুমু। এরপর একটু সুস্থ হয়ে অবশেষে যখন কোলে এসেছিলে আমাদের, তারপরও আমরা অনেকদিন ট্রমাটা কাটিয়ে উঠতে পারিনি। চোখ বন্ধ করলে আমার চোখের পর্দায় ভেসে উঠত কীভাবে একরত্তি দুর্বল শরীরটায় যন্ত্রণাদায়ক সূঁচ ফোটানো হচ্ছে, কীভাবে তোমার কোমল শিরা থেকে টেনে রক্ত নেয়া হচ্ছে। আজও ভেসে ওঠে। ভুলতে পারি না ওই দিনগুলো আমি, আজও ভুলতে পারি না।
— কি হয়েছে রিদার বাবা? এসব কথা আজ..

মায়ের চিন্তামাখা গলা ভেসে এলে বাবা যেন কি বলে তাকে সামলালো। তারপর অল্প হেসে আমায় বলল,
— আজ এসব পুরনো কথা কেন তুলেছি জানো? কারণ বাবারা সবসময় চায়, সে পৃথিবীতে থাকুক কিংবা না থাকুক, তার কলিজার টুকরা যেন পৃথিবীর বুকে সর্বোচ্চ সুখেই থাকে। ভীষণ ভয়ে গুটিয়ে যাওয়ার সময় শেষ আশায় যে ক্ষুদে হাতগুলো বাবার আঙুল ধরে ভরসা পেয়েছিল, সেই হাতজোড়া একসময় এমন কারোর হাতে পড়ুক যে তাকে ঠিক বাবার সংসারের মতোই যত্নে রাখবে, ভরসায় রাখবে, আগলে রাখবে। তুমি আমার কাছে প্রিন্সেস হলে যেন ওই ছেলের কাছে একটা কুইন হও;তোমার বাবা সবসময় তাই চেয়েছে৷ এবং দেখো পেয়েও গেলাম অবশেষে। রুশান, এই ছেলেটা ঠিক ততটাই অপেক্ষা করেছে তোমার জন্য, ততটাই তড়পেছে, যতটা একদিন আমি তড়পেছিলাম তোমাকে আমাদের জীবনে ফিরে পাওয়ার জন্য। তোমার বাবার টেস্টে ও অনেক আগেই উতরে গেছে এটা কিন্তু ও নিজেও জানে না।
— বাবা তোমার কথা আমি কিছু বুঝতে পারছি না।

বিভ্রান্ত অস্ফুট স্বরে আমি উত্তর দিলাম।
— বোঝার কথাও নয়। এটা এমন একটা সিক্রেট যেটা গত পাঁচ বছর যাবৎ নিজের ভেতরে লুকিয়ে রেখেছে তোমার বাবা, পৃথিবীর কাউকে জানতে দেয়নি।
— আর সেটা কি?
— রুশান ছেলেটা আরও অনেক আগে থেকেই তোমাকে পছন্দ করে। যখন তুমি কলেজে পড়ছ সেসব দিনে।
— হোয়াট! কীভাবে? আর তুমি.. তুমি জানলে কি করে বাবা?
— ছেলেটা চিঠি পাঠিয়েছিল তোমাকে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তোমার হাতে না পড়ে চিঠিটা পড়েছিল আমার হাতে। ওটা পড়েই..
ও সম্ভবত রিদা অথবা সাফিনের মাধ্যমে জেনেছিল তোমার কথা। ছেলেটা কিন্তু চিঠিতে ডিরেক্ট তোমাকে বিয়ের প্রস্তাবই দিয়েছিল। সাচ এন অবসেসিভ বয়!

বাবা হাসল শব্দ করে। আমি ভীষণ বিব্রত হলাম। আমতা আমতা করে বললাম,
— তুমি আমায় বলনি বাবা।
— আরে আমি নিজেও তো সিরিয়াসলি নেইনি বিষয়টাকে। ভেবেছিলাম তোমার কোনো ফলোয়ার! ফেলে রেখেছিলাম চিঠিটা ড্রয়ারের এককোণে।
— কোনো রিপ্লাইও দাওনি? ওকে ধমকাওনিও গিয়ে?
— উমম, ভেবেছিলাম একবার ডেকে ধমকে টমকে মেয়ের থেকে একশো হাত দূরে থাকতে বলব। কিন্তু তোমার মা! সে আমাকে আটকে দিল। বলল, ছেলেটা তো প্রস্তাবই পাঠিয়েছে, ডিস্টার্ব তো করেনি। এরপর বাড়াবাড়ি করলে ব্যবস্থা নেবে না-হয়।
পরে আমিও ভেবেছিলাম তোমার মা ঠিক। এছাড়াও কম বয়সী ছেলে, তোমারো বয়স কম। আবেগ হতে পারে বিষয়টা।
— বাবা তুমি এজন্যই কলেজে আমার ওপর খুব নজরদারি করতে। সন্দেহ করেছ আমাকে?
— না মা সন্দেহ করিনি, তবে প্রোটেক্টিভ ছিলাম তোমার প্রতি। বাইরের একটা ছেলে ওকে বিশ্বাস তো করা যায় না চট করে।
— তাহলে? বিশ্বাস করলে কীভাবে?
— বিশ্বাস করলাম ওর বিশ্বাস করানোর ধরন দেখে। ছেলেটা খুব ইন্ট্যালিজেন্ট বুঝলে। তোমার প্রতি আমার এক্সট্রা প্রোটেক্টিভ আচরণ কিন্তু ওর নজর এড়ায়নি। ও তারপর আরও দুটো চিঠি দিয়েছিল টানা। যখন উত্তর পায়নি তখন সরাসরি আমার অফিসে এসে দেখা করেছে আমার সাথে।
— তোমার সাথে দেখাও করেছে?
— হ্যাঁ। যে বিয়ের প্রস্তাবটা ও চিঠিতে লিখেছিল সেটা নির্ভয়ে মুখে এসে বলল আমাকে।
— তা..তারপর। তুমি কি বললে?

বিস্ময়ে আর সুখ সুখ আবেশে কান্না এসে গেল আমার। বিছানার চাদর খামচে ধরে শক্ত থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করলাম যদিও, তবু চিকন ধারা হয়ে কান্নাগুলো গড়িয়ে পড়লই। বাবা শান্ত স্বরে জবাব দিল,

— আমি তাই বলেছিলাম যা একজন বাবার বলা প্রয়োজন। তোমাকে কতটা চায় তা তোমার সামনে প্রমাণের আগে তোমার বাবাকে প্রমাণ দিতে হতো ওকে। ও দিয়েছে। আমার কথা শুনে তোমাকে বিন্দুমাত্র ডিসটার্ব করেনি, তোমার জন্য অপেক্ষা করেছে। বাট ছেলেটা তোমাকে চিঠি দেয়া কিন্তু বন্ধ করতে পারেনি। আমিও এতটুকু এক্সেস ওকে দিয়েছিলাম।

রুমু, অ্যাকচুয়ালি দ্য আল্টিমেট থিং আই হ্যাভ লাইকড আবাউট দ্য বয় ইজ, একটা সময়ের পর ও কিন্তু বুঝতে পেরেছিল চিঠিগুলো যে আসছে তা সঠিক ঠিকানায় এলেও সঠিক মানুষের হাতে পড়ছে না। সে কোনো রিপ্লাই পাচ্ছে না, এছাড়াও স্পেসিফিক অন্য কারণও হতে পারে। কিন্তু তারপরেও ছেলেটা চিঠি পাঠানো বন্ধ করেনি, আর না সামনে থেকে এসে তোমার বাবাকে অসম্মান করে কখনো চার্জ করেছে কেন সে চিঠিগুলো সঠিক মানুষের হাতে পৌঁছে দেয়নি। কত আপস অ্যান্ড ডাউনস গেছে, তোমাদের বয়স বেড়েছে, ম্যাচিওরিটি বেড়েছে, কিন্তু ওই ছেলেটার তোমার জন্য অপেক্ষা করা বন্ধ হয়নি। আর এটাই আমাকে মুগ্ধ করেছে বেশি।
— আর চিঠিগুলো..

কাতর স্বরে জানতে চাইলাম আমি।
— ভয় পেও না। প্রাইভেসি নষ্ট করেনি তোমার বাবা। চিঠিগুলো সব যত্ন করে রেখে দেয়া আছে ড্রয়ারে। আর আমি খুলে পড়িওনি কিন্তু।

বাবার বলার ধরণে হেসে ফেললাম আমি। খানিক চুপ থেকে বললাম,
— বাবা তুমি কি মেনে নিয়েছ ওকে? ওর সবকিছু জানার পরেও..
— সবকিছু মানে? ওহ ওই বেবিটা! মানব না কেন? কত ভালো কাজ করেছে ছেলেটা। মৃত বন্ধুর একমাত্র বাচ্চাকে এডপ্ট করে নিয়েছে, বন্ধুর পাশে দাঁড়িয়েছে ফ্যামিলি, সমাজের বাঁধাকে ভয় না পেয়ে। বেবিকে এডপ্ট করার পর ও তো জানিয়েছিল এসে আমাকে। কনসেন্ট নিয়েছিল আমার। একটু খুঁতখুঁত করলেও আমি অমত করিনি আর। খারাপ কাজ তো করেনি ছেলেটা।

এ পর্যায়ে বাবার কথা শুনে আমি অবাক হয়ে গেলাম। বিভ্রান্ত মস্তিষ্কে এককোণে পড়ে থাকা রিপোর্টের দিকে তাকিয়ে ভ্রু জোড়া কুঁচকে গেল আমার। বন্ধুর বাচ্চা? কিন্তু আমি তো রিপোর্টে স্পষ্ট দেখলাম সাফিন ভাইয়া জাইদির বাবা। তাহলে বাবার কথার সাথে রিপোর্ট কনফ্লিক্ট করছে কেন?
— রুমু তোমার তো এনাফ বয়স হয়ে গিয়েছে, এখন জিজ্ঞেস করাই যায়। তুমি কি চাও ছেলেটার বিষয়ে পারিবারিকভাবে আমরা এগোই? কথা বলি ওদের সাথে?

বাবার সরাসরি প্রশ্নে আমি একটু থমকে গেলাম। যা হয়েছে, হতে পারত কিংবা হবে এসব সম্ভাবনায় সময় নষ্ট না করে মাথা নেড়ে অস্ফুটে বললাম,
— তোমরা যদি ভালো মনে করো..

এরপর টুকটাক আরও কিছুটা কথা বলে ফোন রেখে দিল বাবা। আমার মাথায় কিন্তু গেঁথে রইল বাবার কথার বিভ্রান্তি। তবে সেই মুহুর্তে নতুন করে কিছু প্রমাণের বালাই আমার ছিল না। দিন কয়েক কাটতে বরং নিজের মনে ভাবতে ভাবতে খুঁজে পেলাম, রুশান বোধহয় আপু আর দুলাভাইয়ের সংসারের ওপর কোনো এফেক্ট যেন না পড়ে সেজন্যই বাবার থেকে সত্যিটা গোপন করেছিল। কে জানে বাবার কানে সত্যি পৌঁছলে আমাদের চারটে জীবনের দশা কি হতো!

শুরুতে এটা তো আমার ধারণা ছিল শুধু। প্রেমে ডুবে বিশ্বাসী মনের ধারণা। কিন্তু এই ধারণা যে শতভাগ সত্যি তা জানতে পারলাম তখন, যখন রুশান নিজমুখে সব জানাল আমাকে; আমাদের বিয়ের প্রসঙ্গ জানাজানির দিনকয়েক আগে সরাসরি তাকে জিজ্ঞেস করার পর। স্বীকার করল,
যেহেতু ততদিনে আপু ভাইয়ার এঙ্গেজমেন্ট হয়েই গিয়েছিল, তাই নতুন করে এসব প্রসঙ্গ তুলে দু পরিবারে ঝামেলা সৃষ্টি করতে চায়নি সে। আমার কিন্তু বিনিময়ে একটা খটকা থেকে গিয়েছিল, ভাবছিলাম ভাইয়ার চরিত্রগত ত্রুটি জানা সত্ত্বেও আমার বোনের সাথে তাকে ভিড়তে দিল কেন রুশান? ওর জীবন নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা কি সে করেনি! নাকি আপু ভাইয়ার ভাঙনের সাথেসাথে আমাকেও হারিয়ে ফেলবে এমন ভয়েই থেমে গিয়েছিল? কে জানে!
প্রশ্নটা কি ভেবে তখন জিজ্ঞেস করা না হলেও এর উত্তর পেয়েছি পরে অন্যভাবে।
________________________

ওদিকে বাবার সাথে ডিরেক্ট কথা হবার সপ্তাহখানেকের মাথায় আমাদের বিয়ের প্রসঙ্গ সবার সামনে খোলাসা হয়ে গেল। জাইদির সাথে শেষবার পাতানো মা হিসেবে দেখা করার দিন রুশান হতাশভাবে মাথা নেড়ে বলল,
— সাচ এ্যান অবসেসিভ বিহেভিয়ার রুমু! আনবিলিভেবল।

আমি বাঁকা চোখে কপট রাগ দেখিয়ে তাকালে স্পষ্ট দেখতে পেলাম প্রাপ্তির পুলকে আমার প্রিয় ক্লান্ত চোখজোড়া হাসছে। আমি অবসেসড হলে সে নিজে কি? বলেছিল না সেদিন
“ইউ কান্ট ইম্যাজিন হাউ মাচ রুশান রাহাত ক্রেভড ইওর এক্সিসটেন্স রুমু”

আর এখন? হাহ, এত অভিনয় জানে মানুষটা! একে ডিফেন্সে যেতে বলেছে কে? এফডিসির সামনে দাঁড়ালে তো প্রডিউসার-ডিরেক্টরদের লাইন লেগে যেত অনায়াসে।
ভাবতে ভাবতে পাশের সিটে মাথা এলিয়ে অপলক আমার দিকে তাকিয়ে থাকা মানুষটার ঘোরগ্রস্ত দৃষ্টি স্পষ্ট টের পেয়ে, অভিনেতা হলে তার সৌম্যদর্শন সত্ত্বার প্রেমে অন্য মেয়েদের দিওয়ানা পরওয়ানার কথা কল্পনা করে দ্রুত নিজের ভুল শুধরে নিলাম। নাহ্ ঠিকই আছে সে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে না গিয়ে ডিফেন্সে আছে। নইলে ফিল্মের গ্ল্যামারাস মেয়েদের মৌমাছির মতো ওকে ঘিরে ঘুরঘুর করা আমি সহ্য করতাম কি করে? আমি ছাড়া অন্যকারোর প্রতি এমন নেশালো দৃষ্টি দেখলেই তো ঈর্ষায় জ্বলেপুড়ে খামচে একেকজনের মুখের নকশা পাল্টে দিতাম। থাক বাবা, আমার কাঠখোট্টাটা ঘরের মানুষ হিসেবে আছে, আমার হয়ে আছে;চিরকাল আমারই থাকবে।

আমার হওয়া, আমারই থাকা এগুলো মনে মনে স্বীকৃতি পাবার পর সামাজিক স্বীকৃতি পেতে আর পাঁচটা সম্পর্কের মতো আমাদেরও আরও কিছুটা ঝড় সামলাতে হলো। যে ঝড়টা সৃষ্টি করল আমার বড়বোন। রুশানের সাথে আমার বিয়ের ব্যাপারে যেদিন বাবা কথা বলল ওর সাথে, ও কোনোকিছু না ভেবে সোজা হলে চলে এলো আমার। তারপর বলা নেই কওয়া নেই রুমভর্তি বান্ধবীদের সামনে ঠাস করে চড় মেরে দিল গালে। রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে বলল,
— কথা রাখলি না তো বড়বোনের? ধোঁকা দিলি আমাকে। ভুলে গেছি, ভুলে গেছি বলে লাজলজ্জার মাথা খেয়ে ডিরেক্ট বাবাকে বললি বিয়ের কথা! এবার দেখ, আমি কি করি। এই ছেলের সাথে বিয়ে তো হতে দেব না আমি তোর। কিছুতেই হতে দেব না। তুই জেদ দেখিয়েছিস, এবার আমার জেদ দেখবি। তোর রুশানের জারিজুরি সব যদি আমি বের করে না দিয়েছি!

রীতিমতো শাসিয়ে বেরিয়ে গেল ও। রেখে গেল আমাকে বাইরের কতগুলো মানুষের সামনে অপমানিত, লজ্জিত।

রুমু শিকদার না হয়ে সেখানে অন্যকেউ হলে নিশ্চয়ই লজ্জায় কাঁদত, বোনের কাছে রিকোয়েস্ট করত। কিন্তু আমি তা করলাম না। যে রুশানের জারিজুরি শেষ করার জন্য ও উঠেপড়ে লেগেছে, সেই রুশান একপাক্ষিক ক্ষত সয়ে নিভৃতে থেকে কীভাবে ওর সংসার আগলে রাখছে তা ও না জানতে পারে, কিন্তু আমি তো জানি। হতে পারে ও কনসার্ন আমাকে নিয়ে, তাই এমন রিয়্যাক্ট করে ফেলেছে। কিন্তু যে মানুষটা নিজে অপমানের বোঝা বয়ে ওদেরকে অপমানের হাত থেকে বাঁচিয়েছে, তার কোনোপ্রকার ক্ষতি আমার পক্ষে বরদাস্ত করা সম্ভব ছিল না। কাজেই আপু বেরিয়ে যাওয়ার পর খুব ঠান্ডা মাথায় ভেবেচিন্তে আমার কাছে থাকা রিপোর্টের ছবি তুলে সোজা পাঠিয়ে দিলাম সাফিন ভাইয়ার হোয়াটসঅ্যাপে, লিখলাম,

— রুশানের সাথে আমার বিয়েতে বিন্দুমাত্র বাঁধা যদি সৃষ্টি হয় তাহলে গোপনের অনেক কথা কিন্তু আর গোপন থাকবে না ভাইয়া। সময় আছে, তোমার বউকে আটকাও। তোমরা আমার আপনজন, আমার চাইতে বয়সে বড়। বাধ্য করো না তোমাদের চেনজানা হাসিখুশি রুমু থেকে রুমু শিকদারে পাল্টে যেতে। রুমু শিকদার, মেয়েটা কিন্তু এতটাও ভাল নয়।

সীন হলো খানিক বাদেই, আর যত দ্রুততায় তা সীন হলো, তারচাইতে কয়েকগুণ দ্রুত কল আসতে লাগল আমার ফোনে। আমি অবশ্য রিসিভ করলাম না, বরং তৈরি হয়ে ব্যাগট্যাগ গুছিয়ে সোজা আপুর শশুরবাড়িতে গেলাম, রুশানের বাবা-মায়ের সাথে কথা বলতে। গোপন সত্যির কিছু অংশ মানুষগুলোও নিশ্চয়ই জানে। কাজেই কোনোভাবে সেই সত্যি তাঁদের মুখ থেকেও যেন বেরিয়ে না যায় এটাই ছিল আমার ওনাদের সাথে দেখা করে বুঝিয়ে শুনিয়ে বিষয়টাকে শর্টআউট করার মূল উদ্দেশ্য।
তবে ওখানে গিয়ে সত্যের অপরপীঠ জেনে অবাক হতে হলো উল্টো আমাকেই। সামান্য জানা সত্যের পেছনে লুকিয়ে ছিল যে আরও বড় রহস্য, এটা বাবা-মায়ের সাথে সেদিন দেখা করতে না গেলে জানা হতো না কোনোদিন।

যে সত্য আপাত কলুষিত এবং সাদাসিধা রুমুর ভাবনার বাইরে, তা কিছুটা এরকম,

“প্রথমদিন আপুর বলা রাইসাং মারমা আর রুশান রাহাতের গল্প পুরোটা আগাগোড়া সত্যি হলেও মূল চরিত্রে রাইসাং মারমার পার্টনার রুশান রাহাত নয় বরং সাফিন জাওয়াদ ছিল। রাইসাংয়ের সাথে বয়সের পার্থক্য বলার মতো অত বেশি না হলেও বছর চারেকের তো ছিল অবশ্যই। তবে একই স্কুল-কলেজে পড়ার দরুন বয়সের পার্থক্য বন্ধুত্বকে আটকাতে পারেনি ভাইয়া আর রাইসাংয়ের। বরং রোজ নিয়ম করে চেনা পথে হাঁটতে হাঁটতে সবার সামনের বন্ধুত্ব অগোচরে প্রেমের সম্পর্কে পাল্টে যায় অনায়াসে। আপু যেমনটা বলেছিল।

রুশান টের পেয়েছিল শুরু থেকে। তবে আপুর গল্পের মত করে সে ভাইকে সাবধান করা বা আটকানো, এসবে যায়নি। রুশান হয়তো ভেবেছিল পারিবারিক বন্ধুত্ব আছে, বাবা-মা অমত করবে না। ভালোবাসা তো ক্রাইম নয়। কিন্তু আমার মানুষটা ভুলে গিয়েছিল ভালোবাসাও কিছুক্ষেত্রে ক্রাইম। সমাজের লোকের মতের সাথে না মিললে, বাবা-মায়ের ইচ্ছের সাথে না মিললে এবং সম্পর্কে থাকা মানুষদুটোর কনসেন্টের সাথে না মিললেও সেটা ক্রাইমই।

যাহোক, ভার্সিটি অবধি ঠিকঠাকভাবে রাইসাংয়ের সাথে সম্পর্ক এগলেও বিপত্তি বাঁধে ক্যাম্পাসে আমার আপুর সাথে ভাইয়ার দেখা হওয়ার পর। কে জানে রাইসাংকে সম্পূর্ণভাবে পেয়ে যাওয়ার পর বিতৃষ্ণা জমতে শুরু করেছিল, নাকি আপুকে দেখার পর বিতৃষ্ণার শুরু! তবে তাদের মধ্যে ঝামেলার সূত্রপাত তখন থেকেই। মাঝখানে বিষয়টা এমন হয়ে গিয়েছিল, ঝামেলা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়ার পর ওদের ছাড়াছাড়িও হয়। এবং এরপরেই ভাইয়া রিলেশনশীপে জড়ায় আপুর সাথে। স্বাভাবিকভাবেই তাই রাইসাংকে ফেরানোর চেষ্টা করে না।

সেপারেশন বোধহয় থাকে তাদের বছর দুয়েক। তবে ভাইয়া পুরোপুরি মুভ অন করে ফেললেও মেয়েটা পারে না কোনোমতে। রোজ মুখোমুখি পড়ে যাওয়া, আপুকে ভাইয়ার পাশে দেখার ঈর্ষা! একসময় বেচারি না থাকতে পেরে আত্মসম্মানের বলি দিয়ে পায়ে লুটিয়ে পড়ে ভাইয়ার। এবং সবচাইতে জঘন্য বিষয় ঘটে এখানে, ভাইয়া তাকে ফেরায় না। আমার বোনের সাথে সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়ার মাঝখানে সে আবারও রাইসাংকে জায়গা দেয় নিজের জীবনে। জানি না মেয়েটা কীভাবে ভালোবাসার মানুষের সাথে অন্যকাউকে দেখেও তার জীবনে একটুখানি জায়গার জন্য আঁচল বিছিয়ে ভিক্ষা চেয়েছিল! তবে তাদের সম্পর্ক বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল আগের চাইতে অনেকগুণ বেশি। যেন ভালোবাসার চাইতে শারিরীক চাহিদা মুখ্য হয়ে উঠেছিল দুজনের কাছে। ভাবেনি এত বেপরোয়া হওয়ার ফলাফল ভয়ানক কিছু হতে পারে।

জাইদির আসার খবর শুনে রাইসাং কিন্তু শক্ত হয়ে গিয়েছিল সাথেসাথে। ভাইয়াকে অনুনয়-বিনয় নয়, বরং ব্ল্যাকমেইল করে বলেছিল, বিয়ে না করলে বাসায় সব জানিয়ে দেবে, এমনকি আপুকেও জানাবে সেটাও খুব খারাপভাবে। ভাইয়া ভয় পেয়ে গিয়েছিল, পরিস্থিতি থেকে পালাতে রাইসাং বলার আগেই ও মিথ্যে বলে পুরো গল্পের মোড় ঘুরিয়ে নিজের জায়গায় রুশানের নাম করে আপুর কাছে সত্যিটা প্রকাশ করে দিয়েছিল। সাথে এও বলেছিল,
“তার ভাই আর ভাইয়ের প্রেমিকা নিজেদের ওপর থেকে কলঙ্কের কালি মুছতে যেকোন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যাকে তাকে ফ্রেম করতে পারে, আপু যেন উড়ো কথায় বিশ্বাস না করে।”

কে জানে আপু বিশ্বাস করেছিল কিনা ভাইয়ার কথা! ও এত বোকা তো নয়, সহজে ব্রেইন ওয়াশড হওয়ার মতো। অন্যকেউ না হলেও আমি আজও মনে করি, সেদিনও করেছিলাম, আপু ভাইয়ার মিথ্যেটা অনায়াসে ধরতে পেরেছিল এবং ভালোবাসায় অন্ধ হয়ে ও উল্টো রাইসাংয়ের থেকে ভাইয়াকে টেনে সরানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিল নিশ্চিত।
অবশ্য কষ্ট করে ওকে চেষ্টা করতে হতো না। ভাইয়া আর রাইসাংয়ের বিষয়টা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়ার ঠিক পূর্বমুহুর্তে অকস্মাৎ ঘেঁটে যাওয়া পরিস্থিতিতে রুশানের আগমন ঘটে। ও ট্রেনিং থেকে ফিরে রাইসাংয়ের মুখে এসব শোনার পর বিন্দুমাত্র দেরি করেনি, দু পরিবারকে ডেকে ভাইয়ের কলুষিত সত্য সবটা উন্মোচিত করে দিয়েছিল। সাথে এও দাবী করেছিল, বাচ্চাটাকে স্বীকৃতি দিতে ওর ভাইকে ইমিডিয়েটলি রাইসাংকে বিয়ে করতে হবে।
রুশান ভেবেছিল ভাইয়া পালাতে চাইলেও, পরিবারের মানুষগুলো কিংবা রাইসাংয়ের বাবা-মা, ভাই বিষয়টাতে সম্মতি দেবে। অথচ ওকে অবাক করে দিয়ে রাইসাংয়ের ভাই আর মা বাদে ওর বাবা এবং রুশানের বাবা-মা, কেউ সম্পর্কটাকে পরিণতি দিতে রাজি ছিল না। উল্টো যতদ্রুত সম্ভব রাইসাংয়ের অ্যাবর্শন করিয়ে পারিবারিক যা আছে সেসব সম্পর্ক চুকিয়ে দেবার জন্য উঠেপড়ে লেগেছিল।

এটাই মানতে পারেনি রুশান। তার ভাই, পরিবার, সকলের এমন বিবেকহীন কর্মকাণ্ড ওর পক্ষে মেনে নেয়া সম্ভব ছিল না। এছাড়া রাইসাং নিজেও অ্যবর্শনের জন্য ফিট ছিল না। সময়ের থেকে অনেকটা আগে চলে এসেছিল তারা। ফলে বেবিটাকে অ্যাবর্ট করা কোনোভাবে সম্ভব ছিল না ডাক্তারি ভাষায়৷ শেষে পরিবার থেকে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, বেবির জন্মের পরপর ওকে কোনো অনাথ আশ্রমে দিয়ে রাইসাংকে বিদেশে পাঠিয়ে দেবেন ওর বাবা। ওদিকে ব্যবসার শেয়ার আলাদা আর স্থান ত্যাগ সবটার প্রিপারেশন হয়েই গিয়েছিল প্রায়। রুশানেরও করার কিছু ছিল না। তাই বাধ্য হয়ে রাইসাংকে তার পরিবারের হাতে দিয়ে রুশানকে পিছিয়ে যেতে হয় একসময়।

বিষয়টা এতদূর অবধি ঠিকঠাক। নিজের জীবনে ব্যস্ত হয়ে ওর আর বিশেষ জানাশোনা ছিল না রাইসাংদের সাথে। রুশান চেষ্টা করেছিল, কিন্তু রাইসার বাবা নিজে থেকে সমস্ত পথ বন্ধ করে দেন। চেয়েও রুশান পায়নি রাইসার খোঁজ দীর্ঘ ছয়, সাড়ে ছয়মাস। হয়তো এভাবে সৃষ্টির নিয়মে দৃষ্টির আড়াল হতে হতে, স্মৃতি থেকেও বেরিয়ে যেত দুঃখী মেয়েটার পুরো সত্ত্বা। কিন্তু সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছে যে অন্যরকম ছিল।
মাস ছয়েক পর দৈবাৎ অফিস থেকে ফেরার মুহুর্তে একটা কল আসে রুশানের ফোনে। কাছের একটা হসপিটাল থেকে কর্তৃপক্ষ ফোনে জানায় জাইদির জন্ম আর রাইসাংয়ের অসুস্থতার খবর। স্মৃতিতে মাত্র আবছা হতে থাকা দুর্ঘটনার গল্প আরও একবার তাজা হয়ে যাওয়ায় বিস্মিত তো হয় রুশান। তবে এড়িয়ে যেতে পারে না। উল্টো ফোনের নির্দেশমতো ঠিকানায় গিয়ে রাইসাংয়ের কেবিনে ডিউটিরত মেয়েটার নার্স বান্ধবীর মাধ্যমে জানতে পারে, চট্টগ্রামে শিফট করার পরপর পরিবারে বেশ ঝামেলা করে একদিন হুট করে বলা নেই কওয়া নেই বাড়ি থেকে পালিয়ে এসে নার্স বান্ধবীটির আশ্রয়ে ওঠে রাইসাং। ফোন নষ্ট করে, সীম নষ্ট করে, ওর সাথে যোগাযোগের সমস্ত পথ বন্ধ করে এতদিন ওখানেই পড়েছিল। তবে আজ যখন লেবার পেইন উঠল, ওটিতে নেবার আগে আগে কি ভেবে রুশানের নম্বরটা বান্ধবীর হাতে দিয়ে গিয়েছিল রাইসা। যেন সৃষ্টিকর্তা ওর হাত দিয়ে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়েছিলেন জাইদির, আমার মানুষটার হাতে।
নার্স মেয়েটা নিজেও সংসারী, ওর পক্ষে সত্যি বলতে সুস্থ সবল বান্ধবীকে রাখা সম্ভব হলেও, অসুস্থ রাইসাং আর তার সন্তানকে রাখা সম্ভব ছিল না। অগত্যা, কোনোকিছু ভেবে না পেয়ে সে রুশানকে কল করেছিল বাধ্য হয়ে।
এরপর অবশ্য তাকে আর রাইসাংয়ের দায়িত্ব কষ্ট করে নিতে হয়নি, না কনসার্ন হতে হয়েছে বাচ্চার ব্যাপারে। তাকে নির্ভার করে নিজের সম্মান, ক্যারিয়ার এসবের কথা না ভেবে খুশিখুশি রুশান তুলে নিয়েছিল ভাইয়ের করা অন্যায়ের প্রায়শ্চিত্তের দায়িত্ব নিজের কাঁধে।”

এতসব একসাথে শোনার পর আমার মাথার ভেতরটায় বোঁ বোঁ শব্দ ছাড়া কিচ্ছু ভাসছিল না। বহু কষ্টে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে জানতে চেয়েছিলাম,
— রুশানকে কেন ত্যাগ করলেন আপনারা?

জবাবে অপরাধবোধে জর্জরিত ওর বাবা আমাকে উত্তর দিয়েছিল,
— ত্যাগ তো ওকে আমরা করিনি মা। বরং ও-ই আমাদেরকে ত্যাগ করেছে। বাচ্চাটা হবার দিন কয়েক পর ও নিয়ে এসেছিল বাচ্চাকে আমাদের কাছে। আরও একবার সুযোগ দিয়েছিল অসুস্থ রাইসা আর বংশের প্রদীপকে মেনে নেয়ার। আমরা মেনে নিতে পারিনি কেউ, বরং তিরস্কার করে বলেছিলাম ও নিজেও যেন হাত উঠিয়ে নেয় এসব ঝামেলা থেকে। নইলে পরিবার হারাবে।
আমার ছেলেটা অন্য ধাতুতে গড়া তো। জেদও কম নয় ওর। এতবড় কথা মেনে নিতে পারেনি। আমরা ত্যাগ করার আগেই ও আমাদের ত্যাগ করে চলে গিয়েছে নিজের মতো। তারপর অনেকবার ফিরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছি, ফেরেনি।
— আপনারা নিশ্চয়ই ছেলেকে চাইলেও জাইদিকে ফেরাতে চাননি।

হতাশভাবে মাথা নেড়ে বলি আমি। বিনিময়ে বৃদ্ধ মানুষদুটো অপরাধবোধে আরও একবার মাথা নুয়ে নেয়।
সমাজ, সম্মান, সন্তানের চাইতে কখনো বড় হয়ে ওঠে। বড় হয়ে ওঠে ভালোবাসার চাইতে। অন্যদিকে ভালোবাসা, কে জানে সে কার চাইতে বড় কিংবা ছোট। কারোর ঘরে জোৎস্নার আলোর মতো আশীর্বাদ হয়ে নেমে আসে, কারোর ঘরে অভিশাপ। একটা শব্দ, এত জটিলতায় মাখা কেউ কল্পনা করতে পারে?
________________________

পৃথিবীর নিয়ম এমন, সুযোগ পেলে ঘেঁটে যাওয়া সবকিছু একসাথে স্থির করতে নেই। রয়েসয়ে সময় নিয়ে অল্প অল্প চেষ্টায় স্থির করতে হয়। আমিও রুশানের পরিবারের ঘেঁটে যাওয়া বিষয়গুলোকে তৎক্ষনাৎ সামলানোর চেষ্টা করলাম না হুট করে। তবে বুড়ো মানুষদুটোকে ভরসা দিয়ে এলাম, সব ঠিক হয়ে যাবে, অবশ্যই ঠিক হবে একদিন। বাবা-মাকে তো ত্যাগ করতে পারে না সন্তানরা অনায়াসে। বাবা-মা কিছুক্ষেত্রে পারে বোধহয়। যেমন রাইসাংয়ের পেরেছিল, জাইদির বাবা পেরেছে। অদ্ভুত তাই না? নাড়ির টান, রক্তের টান কিছু মানুষের ক্ষেত্রে কত ঠুকনো। আর কারোর কাছে…

ফেরার পথটা পুরোটা অভাগী রাইসাংয়ের কথা ভেবে আমার মনটা বিষণ্ণ হয়ে রইল। একটা মেয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলো, সন্তান জন্ম দিল, অসুস্থ হয়ে মরেও গেল, ওর পরিবারের কোনো ফারাক পড়ল না? একটুও খোঁজ নিলো না তারা! আর দুলাভাই? সে-ই বা দিনের আলোর মতো ঝকঝকে একটা সত্যকে কি অনায়াসে বুকের ভেতর চেপে রেখে ভালোমানুষির মুখোশ পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে আমাদের চোখের সামনে। জানে ওই মুখোশ খসে গেলে একমুহুর্ত লাগবে না সব তছনছ হতে। তবু, মুখোশ নিয়ে তার কি কনফিডেন্স!

আপু দুলাভাইয়ের সম্পর্কের মারপ্যাঁচ কষ্ট করে আর ঘেঁটে বের করলাম না আমি। নিজের বোনের শিরা-উপশিরা আমার জানা। ও যে ভালোবাসায় অন্ধ হয়ে নিজেও এতবড় অন্যায়ের সাথে পরোক্ষভাবে শামিল হয়েছিল তা বুঝতে দেরি হয়নি আমার। জেনেবুঝে একটা ঠকের সাথে সংসার পেতেছিল, এখনো দিব্যি বড়মুখ করে সংসার করে যাচ্ছে, সন্তান জন্ম দিচ্ছে। অথচ ওই মানুষরূপী অমানুষ লোকটা নিজের ঔরসজাত ফুটফুটে সন্তানকে অনায়াসে অস্বীকার করে বসে আছে।
সত্যিই! এক ভালোবাসার কি ভিন্ন একেক রূপ।
________________________

সময়গুলো এরপর কেটে গেল ফাল্গুনী হাওয়ার তোড়ে ভেসে যাওয়া পলকা মেঘের মতন।

ভোজবাজির মতো রিপোর্টের ছবিটা আমাদের অসামঞ্জস্য পূর্ণতার পথকে মসৃণ করে দিল অনায়াসে। ভেতরে ভেতরে আপু-দুলাভাইয়ের সাথে সম্পর্ক খারাপ হয়ে গেলেও বাইরে আমরা দিব্যি অভিনয় করে বুঝিয়ে দিলাম, এভ্রিথিং ইজ ফিট অ্যান্ড ফাইন।

সেদিন হলে যে ব্ল্যাকমেইল আপু করে গিয়েছিল, সম্ভবত দুলাভাইয়ের মহিমায় তা সফল করা সম্ভব হয়নি। এর শোধ হিসেবে ও অবশ্য খুব খুঁত খুঁত করেছে আমার বিয়েতে। এটা ভাল হয়নি, ওটা ভাল হয়নি, এমন নয়-অমন নয়, কত অভিযোগ অনুযোগ! আমি কিন্তু হেসেছি ওসব দেখে আড়ালে। চোখের পলকে বড়বোনের পাল্টে যাওয়া রূপ।জীবদ্দশায় আমাদের বোনেদের ভেতর এমন সত্য মিথ্যের বিষ বাষ্প মিশে যাবে ভেবেছিলাম কখনো?
তবে আর যাইহোক, ছোটোখাটো ঝামেলা পাকালেও বিয়েতে বিশেষ বাঁধার সৃষ্টি করতে পারল না আপু।
দিন কয়েকের মধ্যে অনাড়ম্বর আয়োজনের মধ্য দিয়ে রুমু শিকদারের নামটা লেখা হলো তার প্রিয়তম, চির আরাধ্য পুরুষ রুশান রাহাতের নামের পাশে প্রবল অধিকারবলে। আকদের দিন রেজিস্ট্রি পেপারে সাইন করার পরও আমার বিশ্বাস হতে চাইছিল না এই মানুষটাকে সত্যি সত্যি পেয়ে গিয়েছি আমি। পেয়েছি নিজের প্রথম এবং একমাত্র ভালোবাসা রূপে, পেয়েছি স্বামীরূপে, সর্বোপরি “আমার মানুষ” বলে ডাকার অধিকাররূপে।

অবিশ্বাসে বারবার চোখ গোলগোল করে তার দিকে ফিরে ফিরে তাকিয়ে স্বপ্ন নাকি সত্যি যাচাইয়ের চেষ্টা করছিলাম বোকার মতো। রুশান কিন্তু খেয়াল করছিল সবটাই, আশেপাশে মানুষজন ছিল বলে বলছিল না কিছু। তবে আমার হাতটা ধরে রেখেছিল শক্ত করে। যেন কিছুটা হলেও দ্বিধা কাটে তার বউয়ের।

ওদিকে আমাদের বিয়েতে সবচাইতে খুশি ছিল জাইদি। আজ থেকে মা আর দূরে দূরে থাকবে না বরং ওর বাসাতে ওর সাথেই থাকবে, একসাথে ঘুমুবে, খেলবে; ম্যাজিক্যাল কথাগুলো ওর বাবা কানে ঢুকিয়ে দিয়েছে থেকেই ছেলের কি আনন্দ! চুপটি করে কোলে বসে বারবার ফিরে তাকিয়ে ঘোমটা দেয়া আমাকে দেখে মিষ্টি হেসে নাকের ডগা ছুঁয়ে ছুঁয়ে বলছিল,
” মাম মাম, বাড়ি বাড়ি”

আমি এত একটা ঘোরে ছিলাম! ওকে মুখ ফুটে নিজের আনন্দটুকুও বলতে পারছিলাম না। ফিরতি শুধু দু’হাতে আগলে নিয়ে চুমু খেয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছিলাম,
— হ্যাঁ, মা এতদিনে তোর সত্যিকার মা হয়ে ভীষণ ভীষণ খুশি। যে খুশির পরিমাপ পৃথিবীর কোনোকিছু দিয়ে কেউ করতে পারবে না।

কথা হয়েছিল আপাতত আকদ করিয়ে সম্পর্কটার একটা নাম দিয়ে রেখে দেয়া হবে। এরপর আমার পড়াশুনো শেষ হলে ঘটা করে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নিজের সংসারে পা রাখব। ততদিন জীবন যেমন যাচ্ছিল, তেমনই যাক। রুশান শুরুতে আপত্তি না জানালেও বিয়েটা হয়ে যাওয়ার পর সম্পূর্ণ বেঁকে বসল। আত্মীয় স্বজনের চাপ কিছুটা কমে যেতেই ঘুমন্ত ছেলেকে কোলে নিয়ে সবার সামনে সে ঘোষণা করে দিল,
“অনুষ্ঠানের বালাই নেই। ওসব পরে যা হওয়ার হবে, কিন্তু আজ ফিরলে সে বউ নিয়েই ফিরবে একেবারে।”

চিরকালের গম্ভীর মানুষ, হুট করে এমন ডেস্পারেট হয়ে উঠলে তাকে থামায় সাধ্য কার! বাবা-মায়ের সামনে লজ্জায় নাক-কান কাটা গেলেও মনে মনে আমি দ্বিগুণ আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলাম এই ভেবে, মানুষটা অবশেষে তার অবসেসড রূপ দেখিয়েই ফেলল আমাকে। আড়ালে আড়ালে ভালোবাসতে বাসতে জানিয়ে দিল সবার সামনে কতটা চায় সে আমাকে, আমারই মতো কিংবা আমার চাইতে বেশি পাগল পাগল রূপে?

মুখ ফুটে কিছু না বললেও সবার আড়ালে আমি কিন্তু বাবার দিকে তাকালাম কাতর চোখে। বরের মতই, তার কাছে যাওয়ার জন্য কতটা পাগল হয়ে উঠেছি ভেতরে ভেতরে, বেহায়ার মতো বুঝিয়ে দিলাম ঐ কাতরতা দিয়েই। মেয়ের এমন চূড়ান্ত রূপ দেখে বাবা বিস্ময়ে হতবাক। হতাশভাবে মাথা নেড়ে সম্মতি দিয়ে বলল,
— তবে তাই হোক।

মা অবশ্য চায়নি আমরা সেদিনই চলে যাই রুশানের বাড়িতে। আড়ালে ডেকে খুব করে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল আমাকে। কিন্তু আমার ভেতরের প্রেমিকা রুমু ততক্ষণে উন্মুখ হয়ে উঠেছে প্রিয়তমের বাহুডোরে বাঁধা পড়ে আকাঙ্ক্ষিত এক স্বপ্নালু সময় কাটাবার, তাকে আটকায় সাধ্য আছে কারোর! অগত্যা, মাদারস ইমোশন কিছুটা পিছলে বেরিয়ে গেল।

ডিনার সেরে সবার থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম আমরা সাগ্রহে নিজেদের নতুন সংসারের উদ্দেশ্যে। ফেরার সময় গাড়িতে ওঠার পূর্ব মুহুর্তে বাবা কিন্তু ভুলল না আমানতের ঝুলিতে যত্নে সামলে রাখা প্রাপ্য সব চিঠিগুলোকে আমার হাতে বুঝিয়ে দিতে। বাবার দেয়া সেই জাদুকরী বাক্স পরম আদরে বুকে জড়িয়ে নিতে নিতে আমার মনে হলো, এই যে এতদিনের মানুষটার আড়ালের ভালোবাসা, এক সেকেন্ডে সব যেন হৃদয় বেয়ে উঠে বিস্ফোরকের মতো শিরা-উপশিরায় ছড়িয়ে পড়ল। ভালোবাসা অনুভবের চমৎকার এই মুহুর্তটাকে সমস্তটা দিয়ে উপলব্ধি করার লোভ সামলাতে পারলাম না আমি। চোখ বুঁজে একাধারে আঁকড়ে ধরে রইলাম বাক্সটাকে অনেকক্ষণ। পাশে ঘুমন্ত ছেলেকে কোলে নিয়ে অনিমেষ তাকিয়ে ছিল রুশান আমার দিকে। কে জানে কি ভাবছিল! কতটা ভাবছিল! খানিক বাদে ড্রাইভার যেন না শুনতে পারে এমন অস্ফুট আওয়াজে কানের কাছে মুখ নিয়ে ডাকল,
— রুমু?

মানুষটার ডাকে কল্পনার ভালোবাসার পৃথিবী থেকে চমকে ফিরলাম আমি বাস্তবে। মুখ ফিরিয়ে তাকাতে গিয়ে টের পেলাম দৃষ্টিজোড়া আনন্দাশ্রুতে ঝাপসা। রুশান হাসল আলতো করে। আঙুলের ডগা দিয়ে চোখের পানি মুছে দিতে দিতে বলল,
— এই যে বাক্সভর্তি চিঠিগুলো দেখছ? সব চিঠি আমি ঠিক তখন তখন করে লিখেছি, যে সময়গুলোতে খুব সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে হতো আমাকে। যখন এমন কোনো জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি পড়ে যেতাম, যে পরিস্থিতির থেকে বেরোনোর পথ ভেবে বের করা যেত না। অথচ তোমাকে ভাবলে, সম্বোধনে “প্রিয় রুমু” শব্দটা লিখলে আমার সব জটিলতা এমনভাবে সহজ হয়ে যেত, যেন ম্যাজিক। রুমু, তুমি কি ম্যাজিক জানতে? কেন তোমার নামে আমার সব মন্দ এভাবে ভালো হয়ে যেত?

আমাকে মুগ্ধতার সাগরে আকণ্ঠ ডুবিয়ে স্বল্পভাষী মানুষটা যেন আবেগের বেলাভূমি হয়ে উঠল। অপরদিকে আমি? চিরকালের বাকপটু, আমার কথার চপলতা তার কথার ভাঁজে পড়ে লুকিয়ে গেল কোন আড়ালে। পলকহীন তার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা সাজাতে গিয়েও পারলাম না সাজাতে। উল্টো খানিক বিব্রতভাবে হাসার চেষ্টা করে বললাম,
— ক্যান আই হোল্ড ইওর হ্যান্ড ফর ওয়ান্স?

অনুভূতির প্রাবল্যে বাঁধা পেয়ে রুশান একটু থমকাল। পরমুহুর্তে অবর্ণনীয় এক হাসির ছটা ঠোঁটজুড়ে ফুটিয়ে আমার হাত শক্ত করে চেপে ধরে বলল,
— হোয়াই নট? আ’ম ডাইং ফর দিস মোমেন্ট সুইটহার্ট।

আমাদের দেখাসাক্ষাৎ অল্পদিনের, চেনাপরিচিতি ছন্নছাড়াভাবে অনেকদিনের হতে পারে। কিন্তু একে অপরকে ভালোবেসে সামান্য স্পর্শের আনন্দপ্রাপ্তি আজ প্রথম। রুক্ষ ওর হাতের ভাঁজে নিজের ছোটোখাটো হাতখানি হারিয়ে ফেলার প্রবল সুখে আমি কেঁপে উঠলাম অজান্তে। ফিরে তাকিয়ে ওর চওড়া কাঁধের দিকে কাতর দৃষ্টিতে ফেলে ইচ্ছে করছিল বহুদিনের লালিত আরেকটা শখকে বাস্তবের রূপ দিতে। ওর কাঁধে মাথা রেখে বলতে, “ভালোবাসি”
কোন লজ্জায় মুখ ফুটে বলার সাহস আমার না হলেও বরাবরের মতো মানুষটা বুঝে ফেলল মনের বাসনা। সরে এসে নিজে থেকে টেনে বুকে নিয়ে মাথায় চুমু এঁকে বলল,
— আমি তো তোমারই। আমার কাছে দ্বিধা কিসের?
— দ্বিধা নয়। অবিশ্বাস। আপনাকে পেয়ে গেছি এই সুখে বিশ্বাস করতে পারছি না সত্যিই আপনি আমার বর কিনা!
— আচ্ছা! তাহলে আমার বউয়ের বিশ্বাস হবে কি করে, সত্যিই আমি তার বর কিনা?

ভ্রু নাচিয়ে আমার চোখে চাইল রুশান। আমিও স্বল্প আগের লাজ লজ্জাকে দু’হাতে ঠেলে অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে চোখ মেলালাম মানুষটার সাথে। খানিকক্ষণ একাধারে তাকিয়ে থাকার পর দৃষ্টির ভাষা বুঝতে পেরে হেসে ফেলল সে। নাকের ডগায় নাক ছুঁয়ে শব্দ করে হেসে উঠে বলল,
— একটু ওয়েট করো ডার্লিং। তোমার বাবার জোরাজুরিতে ড্রাইভার নিয়েছি। নইলে আমি একা ড্রাইভ করলে এতক্ষণে তো..

এবার আর সহ্য করা সম্ভব হলো না। ভেসে যেতে যেতে লজ্জাটুকু ফিরে এলে তড়িঘড়ি হাত চাপা দিলাম তার ঠোঁটে। এতে তার হাসি দ্বিগুণ হলো। আমার হাতের পাতায় চুমু খেয়ে অস্ফুটে আবারও বলল,
— ভালোবাসি।

এই একটা শব্দ, কত প্রতীক্ষার, কত আকাঙ্ক্ষার! প্রিয় কোনো বাদ্যযন্ত্রের সুর হয়ে কানে বাজল যেন আমার। তড়িঘড়ি চোখ বন্ধ করে সে সুরকে আত্মস্থ করার প্রবল চেষ্টায় মেতে উঠতে উঠতে পাল্টা বললাম,

“আমিও। প্রচন্ড, পাগলের মতো। চিরকাল এভাবেই ভালোবাসব, মৃত্যুর পূর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত।”

রুশান কোনো জবাব দিল না আর। শক্ত করে বুকে আঁকড়ে নিয়ে শোনাতে লাগল ওর হৃৎস্পন্দন, যা ছন্দের মতো করে অবিরত আওড়াচ্ছিল একটা নাম “রুমু, রুমু, রুমু; আমার প্রিয় রুমু”
ওর ওই সর্ব বিধ্বংসী ডাকেই কিনা! অবশেষে বিশ্বাস হলো আমার প্রাপ্তির গল্প। প্রেমিকা রুমু, বাস্তবের রুমু মিলেমিশে এক হয়ে চিনে নিল তার পূর্ণতার গল্প। যা আকাঙ্ক্ষা না করেও হয়ে উঠেছিল একদিন চির আকাঙ্ক্ষিত..
______________________________

ভালোবাসার মাঝ সমুদ্রে ডুবুরি দুজনেরই যে একই হাল ছিল তা বুঝতে আর দেরি নেই নিশ্চয়ই। আসলে এই হাল পরিপূর্ণতার অনেক বছর পরেও আর পাল্টাল না। সংসার এগলো, জাইদির ভাইবোন এলো আরও তিনজন। আমরাও কম বয়সী প্রেমিক প্রেমিকার থেকে সহচর হয়ে বার্ধক্যের সময়ে পা রেখে ফেললাম, অথচ পুরনো সেই প্রেমের ঘোর? তা কিন্তু অবিচল রইল বুকের ভেতর সংগোপনে।

বললে বলা যায় অনেক কথা, রাখতে পারে ক’জন তাই না? আমি কিন্তু রেখেছি। বিয়ের রাতে যেমন করে ওয়াদা করেছিলাম, ভালোবেসে যাব আমৃত্যু, তেমন করেই কিংবা তারচাইতে কয়েকগুণ বেশি ভালোবেসেছি, ভালোবাসছি রোজ। এই যে ডায়েরির পাতায় নিয়ম করে আমাদের জীবনের ফেলে আসা বসন্তগুলোকে লিখছি! লিখতে গিয়ে ভালোবাসা বেড়ে যাচ্ছে স্ব-নিয়মে। আর শিখছি নতুন করে,
“তোমার জন্য যা সঠিক তা সময় হলেই চলে আসবে তোমার জীবনে। তার জন্য তোমাকে খুঁজতে হবে না কষ্ট করে।
অ্যাকচুয়ালি ফেইট হ্যাজ ইটস পারপাস। তোমার সাথে কারোর দেখা হওয়া, কারোর ছেড়ে যাওয়া, সবকিছুর পেছনে নিয়তির প্রত্যক্ষ সায় আছে। সব মিলন কিংবা বিয়োগ একমাত্র লেখা ওর হাতে। হয়তো জীবনের নতুন মোড় ঘুরতেই সংযোজন বিয়োজনের খেলা চলে। তবে এটা ডিভাইন। এতে কিন্তু ফেইট ছাড়া দ্বিতীয় কারোর কিচ্ছু করার নেই। কিচ্ছু না।”

ডায়েরির শেষ পাতাটায় কলম চালিয়ে সন্তুষ্টির হাসি হাসলেন মধ্যবয়সী বিখ্যাত চাইল্ড স্পেশালিষ্ট রুমু শিকদার। সময় নিয়ে লেখা শেষে সবটা আরও একবার পড়ে জিকজ্যাক বুক শেলফের ওপরের তাকে যত্ন করে ডায়েরিটা সামলে রেখে তার পাশে অন্য তাক থেকে নতুন আরেকটা কারুকার্যখচিত মলাটওয়ালা ডায়েরি টেনে নিতে নিতে ভাবলেন, নাহ্ এবারে মানুষটার চিঠিগুলো একে একে লিখে রাখতে হবে স্মৃতি করে। যদিও বাক্সবন্দী চিঠি একটাও নষ্ট করেননি তিনি, যেমন ছিল শুরুর দিনে, আজও তাই আছে। তবু মুখস্থ প্রেমময় সেই লাইনগুলো টুকে রাখার প্রবল ইচ্ছে!
মানুষটার ভালোবাসাময় প্রত্যেকটা শব্দ আওড়াতে, লিখতেই যে তার সুখ এ কথা কাউকে কীভাবে বোঝাবেন? কীভাবে বোঝাবেন সম্বোধনের শুরুতে লেখা “প্রিয় রুমু” শব্দদুটোয় রুমু শিকদারের প্রাণ আটকে।
অবশ্য বোঝানোর বাড়াবাড়িতে যাওয়ার প্রয়োজনও তেমন নেই বোধহয়। এ অনুভূতিটুকু তো তার আর তার রুশানের একার। পূর্ণতার প্রাপ্তিতে ভরে ওঠা দুটো ভালোবাসার মানুষ ছাড়া তাদের ভালোবাসার স্নিগ্ধ সুন্দর অনুভূতি সত্যি বলতে পৃথিবীর অন্য কারোর বোঝার দায় নেই। রুমুও কিন্তু বোঝাবেন না নতুন করে। শুধু স্মৃতি রোমন্থন করে নিজেদের বেঁচে থাকার রসদগুলোকে আরও জীবন্ত করে তুলবেন।
ভালোবাসা তার কাছে এক আশীর্বাদের মতো। যাকে পুঁজি করে বেঁচে থাকতে তার ভীষণ আনন্দ হয়। ভীষণ। ভীষণ!

সমাপ্ত
Sinin Tasnim Sara