প্রিয় রোদ্দুর পর্ব-০৩

0
634

#প্রিয়_রোদ্দুর🤍
#লেখনীতে:অনুসা_রাত❤️(ছদ্মনাম)
#পর্ব:০৩

খাতা নিয়ে অংক করছি। আর আমার ঠিক সামনেই ফোনে কাউকে ট্রাই করে চলেছেন রোদ্দুর স্যার।
মুখটা কেমন চিন্তিত দেখাচ্ছে। আমি নিজের মত অংক করছি আবার মাঝে মাঝে তাকাচ্ছি।ভাবলাম জিজ্ঞেস করে দেখি এত চিন্তিত হবার কারণ!আন্টি অসুস্থ নয়ত?যেই না জিজ্ঞেস করতে যাব ঠিক সেই সময় ওনার ফোনটা রিসিভ হলো।উনি জোরে শ্বাস ছেড়ে বললেন,

-“হ্যা জোনাকি,তুমি বাসায় গিয়েছো?”

অপরপাশ থেকে কি বলছে শোনা যাচ্ছে না।আবার জোনাকি!কি রে ভাই!সারাদিন গার্লফ্রেন্ড নিয়ে থাকতে হয়!জোনাকির আলো জ্বালিয়েই যাচ্ছে! আবার আমাকে সেদিন বলে কিনা এসব প্রেম-ভালোবাসা ওনার কাছে নিমের রসের মত লাগে।আমি অবশ্য মনে মনে বলেছিলাম যে,আপনি নিজেই তো একটা আস্ত নিমগাছ।আমার ভাবনার মাঝেই উনি আবার গম্ভীর কণ্ঠে ফোনে বললেন,

-“তোমায় না বাসায় যেতে বললাম আমি?”

কিছু সময় চুপ থেকে আবার বললেন,

-“হুম গুড!”

তারপর আমার দিকে তাকালেন।আমি অংক করায় মনোযোগ দিলাম। উনি বললেন,

-“আচ্ছা বাসায় গিয়ে কল দিবোনে।”

বলেই ফোন কেটে দিলেন।আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

-“অংক করেছো?”

আমি খাতা এগিয়ে দিলাম। উনি আঁড়চোখে দেখলেন শুধু। আমি জোরপূর্বক হাসলাম।উনি হোমওয়ার্ক লিখতে লিখতে বললেন,

-“শোনো,বাহিরে গেলে অবশ্যই রাস্তা ঘাট দেখে চলতে হয়।সব জায়গায় বাচ্চামো করলে হয় না। রাস্তায় ভদ্রভাবে আর সাবধানতা অবলম্বন করে চলতে হয়।তাছাড়া…”

-“কিন্তু স্যার আমাকে কেন বলছেন?আমি কি বাচ্চা নাকি?”

ওনার হাত থেকে গেল।আমার দিকে শান্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন,

-“ওহ তুমি তো বড় তাই না?”

-“হ্যা অবশ্যই।কয়েকদিন পর এইচএসসি দিবো।”

-“সেটা আমিও জানি।কিন্তু তোমার শয়তানি যেসকল বুদ্ধি সেগুলো বাচ্চাদের মাথায়ই আসে।এগুলো মাথা থেকে বের করো!”

আমি ওনার কথায় পাত্তাই দিলাম না।নিজের মত বলা শুরু করলাম,

-“স্যার আপনি নুডুলস খাবেন?আজ আমি নিজের হাতে রান্না করেছি।”

-“টেস্ট করে দেখতে হয়!”

-“আপনি খাবেন?”(খুশি হয়ে)

আমি চটজলদি ওনার জন্য নুডুলস নিয়ে এলাম।উনি মুচকি হেসে মুখে দিলেন।আমি অধীর আগ্রহে বসে আছি।উনি তাও কিছু বলছেন না।খেয়েই যাচ্ছেন।আমি মুখ ফুলিয়ে বললাম,

-“আরে কেমন হয়েছে বলুন না!”

-“হুম মজা হইছে!”

-“আরেকটু দিবো?”(খুশি হয়ে)

-“না লাগবে না!”

আমি বসে পড়লাম।উনি খেয়ে এক গ্লাস পানি খেলেন।তারপর উঠে চলে গেলেন। আমি আমার প্লেট থেকে এতক্ষণ খাইনি।স্যারের সামনে কিভাবে খাবো!উনি যেতেই মুখে দিলাম।বাপরে!কি ঝাল!মনে পড়ে গেলো এতগুলো মরিচের গুঁড়া মিশিয়েছিলাম।আসলে আমি ঝাল খেতে ভালোবাসি।যাই হোক!মজাই তো হয়েছে। একটু ঝাল বেশি।আমি নিজের মত করে খেয়ে হু হা করতে করতে রুম থেকে বের হয়ে ড্রইং রুমে চলে এলাম।জগ থেকে পানি ঢেলে খাওয়ার সময় সামনে তাকিয়ে দেখলাম স্যারকে সোফায় বসিয়ে দাদী আর আম্মু যেন কি কথা বলছে।আমি নিজের মত পানি খাচ্ছি।দাদী বলছে,

-“শোনো,তুমি কিন্তু কালকে সন্ধ্যায় চলে আসবা ঠিকাছে?বিকালের দিকে আসলে তো ভালো হয়।সময় হবে তো?”

রোদ্দুর স্যার ভদ্রভাবে উত্তর দিলেন,

-“জ্বী চেষ্টা করবো।”

এই লোকের বিহেভিয়ার দেখে মনে হচ্ছে যে ভাজা মাছটা উল্টে খেতে জানে না।অথচ দিন-রাত আমার উপর অত্যাচার করে।দুনিয়ার ম্যাথ করায়।পাজি লোক!আম্মু আবার বলছেন,

-“আরে কিসের চেষ্টা। তোমাকে কিন্তু আসতেই হবে।”

এবার শ্রেয়াও এসে যোগ দিলো,

-“ভাইয়া প্লিজ আসবেন!আমার বার্থডে!”

কি মেয়েরে বাবা!নিজের বার্থডের ইনভাইট নিজেই দিচ্ছে।
রোদ্দুর স্যার আমার দিকে তাকালেন।আমি তখনো পানি খাচ্ছি।আসলে আমি ওনাদের কথা শোনার জন্য অল্প অল্প পানি খাচ্ছি।আর পানিটা জিভে রাখছি একটু আরামের জন্য। তখন ঝাল লেগেছিলো তো তাই।ওনার তাকানোতে ওনার সাথে আমার চোখাচোখি হয়ে গেলো।আমি অন্যদিকে ফিরে গেলাম গ্লাসটা মুখে ধরেই।তখনই ওনার আওয়াজ এলো,

-“হ্যা আসবো!”

এবার আমার আর বিষম না।ডাইরেক্ট হিচকি উঠে গেলো।আমি গ্লাসটা রেখে বারবার হিচকি দিচ্ছি। হঠাৎ তাকিয়ে দেখলাম সবাই আমার দিকে হা হয়ে তাকিয়ে আছে।আমি জোরপূর্বক হাসলাম।দাদী চেঁচিয়ে বললো,

-“কিরে মাইয়া,পানি খা বেশি কইরা!”

আমি পানি খাচ্ছি। তাও হিচকি থামছে না।রোদ্দুর স্যার এসে আমার হাত থেকে গ্লাসটা নিয়ে নিলেন।তারপর পানি ঢেলে মুখের সামনে ধরে বললেন,

-“পুরোটা খাও!”

আমি বসে বসে পুরোটা পানি খেলাম।উনি সবার দিকে তাকিয়ে বললেন,

-“একটু পরেই থেমে যাবে।”

আমি আর কিছু না বলে ছুটে রুমে চলে এলাম।এই লোকটার না কত কাজ?কত ব্যস্ততা!জোনাকির আলোয় আলোকিত হবে!তাহলে বার্থডেতে কেন আসবে?হুহ ভালো লাগেনা!ভাবলাম আমি,টিনা আরো কয়েকজন মিলে নাচানাচি করবো,আনন্দ করবো।
ইনি থাকলে তো জ্ঞান দিবেন।আর এনার সামনে কি নাচা যাবে নাকি?ভাবতেই আমার চোখগুলো অটোমেটিক রসগোল্লা হয়ে গেলো।

সকাল থেকে ঘর গুছাচ্ছি।বার্থডে আমার বোনের।অথচ কাজ আমার।আর যেহেতু ও আর আমি একসাথে থাকি তাই নিজের রুমই বেলুন দিয়ে সাজাতে হবে।সারাঘরের আবর্জনা আজ আমাকে দিয়েই সাফ করানো হচ্ছে। বাসায় এত এত মেহমান আসবে।সবকিছু তো গুছিয়ে রাখতে হবে।এসব করতে করতে বিকাল চারটা বেজে গেলো।সারাঘর বেলুন দিয়ে সাজিয়ে ফেলেছি!এবার কাপড়চোপড় হাতে নিয়ে
গোসলে ঢুকে গেলাম।লং একটা শাওয়ার নিলাম।শ্যাম্পু করতে আমার শীতে যতটুকু কষ্ট হয় তারচেয়ে বেশি আরাম লাগে গরমের দিনে।তারমধ্যে এমন ময়লা গায়ে লং শাওয়ার উইথ শ্যাম্পু হলে তো কথাই নেই!
ডাভের গন্ধটা তো জাস্ট ওয়াও।পাক্কা আধাঘন্টা পর বের হলাম আমি।চুল মুছতে মুছতে যেই না বাঁধবো এমন সময় দেখলাম একটা বেলুনের কস্টেপ খুলে পড়ে যাচ্ছে। আমি টাওয়ালটা চুলেই রেখে দিলাম।বাধলাম না।আগে এটাকে সেট করি।আমি চেয়ার নিয়ে বেলুনটা লাগাচ্ছি। চুল থেকে টপটপ পানি পড়ে চেয়ার ভিজে যাচ্ছে। পিছনে ফিরতেই চেয়ারে স্লিপ করে সোজা পড়ে গেলাম।চোখ-মুখ খিঁচে বন্ধ করে নিলাম।এমন সময় মনে হলো আমি ভাসছি।পিটপিট করে চোখ খুলে দেখলাম রোদ্দুর স্যার আমাকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।আর আমি তার শার্টের কলার শক্ত করে ধরে আছি।টাওয়ালটা মাটিয়ে পড়ে গেছে।চুলের পানিতে তার শার্ট ভিজে যাচ্ছে। এই প্রথম ওনার চোখজোড়া এত কাছ থেকে খেয়াল করলাম আমি।ওনার চোখে আলাদারকম একটা মায়া আছে।ওনার চোখগুলো অসম্ভব সুন্দর। চোখের পাপড়িগুলোও কত ঘন।অথচ আমি মেয়ে হয়েও আমার পাপড়ি এত বড় না। আর উনি এভাবে আমাকে আগলে রেখেছেন।আগলে রেখেছন!!!!হঠাৎ আমার বিষয়টা খেয়াল হতেই আমি মিন মিন গলায় বললাম,

-“ন..নামান আমাকে।”

উনি চটজলদি আমাকে নামিয়ে দিয়ে বললেন,

-“এক্ষুনি বড় কিছু একটা হতে পারত।ফ্লোরে পড়ে মাথা ফাটত।”

আমি ঢোক গিলে বললাম,

-“যা কিছু খারাপ হয় তার সবকিছুই আপনার জানা তাই না?”

-“মানে!”(ভ্রু কুচকে)

-“না কিছু না।”

-“হোয়াট ডু ইউ মিন বাই দ্যাট!”

-“নাথিং।ধরার জন্য থ্যাংক ইউ স্যার।”

বলেই আমি টাওয়াল হাতে নিয়ে যেতে লাগলাম।উনি পিছন থেকে বলে উঠলেন,

-“আজকাল মানুষের ভালো করতে নেই।”

আমি ওনার দিকে ফিরে বললাম,

-“থ্যাংক ইউ বললাম তো স্যার!”

-“পড়ে হাত-পা ভাঙলে বুঝতে কেমন লাগে।একটা কাজও ঠিক করে হয় না।”

আমি এবার রেগে গেলাম।ওনার সামনে দাঁড়িয়ে কোমড়ে হাত দিয়ে বললাম,

-“বুঝলাম না!আপনি এই ছোটখাটো বিপদের থেকে বাঁচিয়েছেন বলে কি যা ইচ্ছে তাই বললেন!”

-“ছোটখাটো?কি হতো ভাবতে পারছো।”

-“কিছুই হত না।”

-“কেয়ারলেস মেয়ে একটা।”

-“আমি মোটেও কেয়ারলেস নই!”

-“দেখাই যায়।খালি আছো বয়ফ্রেন্ড নিয়ে সারারাত চ্যাট করতে।বলবো আমি আন্টিকে।”

-“আমার কোনো বয়ফ্রেন্ড নেই ওকে!আমি সবার মত না।”

-“জানা আছে।সব দেখি!”

-“আমিও দেখি সবকিছুই। কিভাবে আলোকিত হচ্ছেন!”

-“কি বললে?”

এই রে মুখ থেকে সব বের হয়ে গেল।ভেবেই জিভে কামড় আমার।পরিস্থিতি সামাল দিয়ে বললাম,

-“না মানে পড়াশোনার আলোতে আলোকিত হচ্ছেন।”

-“তর্কটা তুমি ভালোই পারো।”

-“বরাবরই.. ”

-“অতসী তুমি…”

এমন সময় টুনা এসে ঘরে ঢুকলো।স্যার থেমে গেলো।টিনা এসেই স্যারের দিকে লাজুক লাজুক চোখে তাকিয়ে বললো,

-“কেমন আছেন ভাইয়া?”

-“এইতো বেশ।তুমি?”

-“আমিও আলহামদুলিল্লাহ। কিরে অতসী..স্যারকেও দাওয়াত করেছিস বললি না তো!”

আমি মুখ চেপে হেসে বললাম,

-“সাবধানে… আসলে উনি তো আলেকিত হওয়ায় ব্যস্ত!”

বলেই দিলাম দৌড়। রোদ্দুর স্যার ভ্রু কুঁচকে বললেন,

-“আবারো একই কথা বললো।পাগল নাকি মেয়েটা।”

এদিকে টিনার এটা শুনে মনে পড়ে গেলো জোনাকি নামের মেয়েটার কথা।সে লাজুক ভঙ্গি থেকে টুপ করে বিরহ ভঙ্গিতে চলে এলো।ডিপ্রেশন ডিপ্রেশন ভাব নিয়ে বিরবির করে বললো,

-“রোদ্দুর যখন জোনাকি নিয়া,আমার বাড়ির সামনে দিয়া হাইট্টা যায়…ফাইট্টা যায়..বুকটা ফাইট্টা যায়!”

চলবে…