#প্রিয়_রোদ্দুর🤍
#লেখনীতে:অনুসা_রাত❤️(ছদ্মনাম)
#পর্ব:০৪
গান বাজছে!সাথে সবাই নাচছে এক এক করে!আমার বান্ধবীদের মধ্যে শুধু টিনাকেই ডেকেছিলাম।আর কারোর সাথে এত খাতির নেই।সামনে শ্রেয়া আর ওর কিছু বান্ধবী রা নাচছে।আমরা হাততালি দিচ্ছি।
ভালোই শিখেছে।পারছি না শুধু আমি।কারণ আমার পাশের সোফাটায় বসে আছেন রোদ্দুর স্যার।আমি তো এটাই বুঝতে পারছি না যে আমার বোন হয়ে শ্রেয়া কিভাবে ধেই ধেই করে নেচে চলেছে।লজ্জাও করে না।
আমায় একটু ধাক্কা দিয়ে টিনা বললো,
-“তুই আর আমি কখন যাবো?”
-“আরে দেখছিস না স্যার আছে।”(ফিসফিস করে)
-“তো কি হইছে!এটা একটা অনুষ্ঠান ওকে!আর এখানে কোনো টিচার-স্টুডেন্ট নেই।”
রোদ্দুর স্যার আমাদের দিকে তাকালেন।আমি ওর হাতে চিমটি কেটে বললাম,
-“আস্তে বল।”
ও নিজের হাতে হাত ঘষতে ঘষতে বললো,
-“কি মেয়েরে বাবা!”
-“তুই যা।”
-“চল!তুই কতদিন ধরে প্ল্যান করছিস!!”
আমি তাও চুপচাপ বসে রইলাম।কেমনে নাচমু আমি ভাই!এই লোককে দেখলে আমার সাংঘাতিক ভয় করে।
হঠাৎ দেখলাম রোদ্দুর স্যার উঠে যাচ্ছে। সাথে ওদের ডান্সও শেষ।ব্যস!আমাকে আর পায় কে!এই তো সুযোগ।আমিও গিয়ে পিছনে ঘুরে দাঁড়িয়ে পড়লাম।আমার থেকে একটু দূরে দাঁড়ালো টিনা।তারপর বললাম,
-“মিউজিক!”
সাথে সাথে গান বেজে উঠলো।আমি আর টিনা মিলে নাচছি ‘salam e ishq’ গানে।
নাচের সময় আশেপাশে এতকিছু দেখিনি।কিন্তু নাচ শেষ হতেই যখন সবাই হাততালি দিলো তখন আমি আশেপাশে তাকিয়ে দেখলাম আমার থেকে দূরে খাবার টেবিলের সামনে হাতে-হাত ভাজ করে মুচকি হেসে তাকিয়ে আছেন রোদ্দুর স্যার।আমার হাসি মিলিয়ে গেলো।চোখ আটকে গেলো ওনার হাসিতে।উনি মাথা নিচু করে নিঃশব্দে হাসছেন।এমন হাসার কারণ কি?
জানা নেই আমার।দাদী আমার হাত ধরে ঝাঁকিয়ে বললো,
-“সুন্দর হইছে নাচটা।”
আমি হালকা হাসলাম।টিনা সবাইকে থ্যাংক ইউ বলছে।আমি গিয়ে সোফায় বসে পড়লাম।কিন্তু না চাইতেও চোখ বারবার রোদ্দুর স্যারের দিকে যাচ্ছে। উনি এখনো আমার দিকে তাকিয়ে? উনি কি পুরো ডান্স দেখে ফেলেছেন?
ভেবেই আমার চরম লেভেলের লজ্জা হতে লাগলো।হঠাৎ আমাদের বাসার কাজের মেয়ে লায়লা এসে বললো,
-“আফু,আফনের নাছটা অনেক সুন্দার হইছে।”
-“থ্যাংক ইউ লায়লা।”
লায়লা আমার সাথে সোফায় বসে পড়লো।আসলে ওকে আমরা কাজের মেয়ে হিসাবে ধরি না।বাসার মানুষই!
আমার থেকে দুই-তিন বছরের ছোট হবে।মাঝেমধ্যে আমি ওকে একটু একটু পড়াই।ও আমাদের বাসায়ই থাকে।তাই আমার পাশে বসাতে কোনো সমস্যা নেই।
লায়লা হঠাৎ করে বলতে লাগলো,
-“আফু, স্যারে আফনের দিকে এমনে তাকায় আছে ক্যা?”
ওর কথা শুনে আমি রোদ্দুর স্যারের দিকে তাকালাম।সাথে সাথে উনি চোখ সরিয়ে ফোন কানে দিয়ে বেলকনির দিকে চলে গেলেন।আমি আর কিছু বললাম না।
রোদ্দুর স্যার কিছু সময় পর এসে সোফাটায় বসলেন।সাথে সাথে ঢুকলো আমাদের বাড়ির দারোয়ান জুয়েল।
লায়লা দাঁড়িয়ে গেলো।আমি টিনার দিকে তাকিয়ে মুখ
চেপে হেসে বললাম,
-“এখন শুরু হবে বাংলা ছায়াছবি লায়লা মজনু থুক্কু লায়লা জুয়েলের প্রেমকাহিনী।”
আমার কথা শুনে রোদ্দুর স্যার আমার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকালেন।আমি তেমন পাত্তা দিলাম না।বাসার বড়রা রান্নাঘরে ব্যস্ত।আমরা ছোটরাই ড্রয়িংরুমে। আমি রিমোট নিয়ে গান দিলাম ‘tujhe dekha to ye jana sanam’
লায়লা লাজুক লাজুক চোখে তাকাচ্ছে।আর জুয়েল বলছে,
-“তোমারে অনেক সুন্দার লাগতাছে।”
-“তাংকু!”
ব্যস!এই কথাটাই যথেষ্ট ছিলো।আমরা সবাই হো হো করে হাসতে লাগলাম।লায়লা লাজুক ভঙ্গিতে দৌড়ে চলে গেলো।টিনা হাসতে হাসতে বললো,
-“কি ঢংগী মেয়েরে বাবা!”
জুয়েল এসে আমাকে উদ্দেশ্য করে বললো,
-“আফামণি,আমারে দাওয়াত দেয়ার লাইগা ধন্যবাদ। বলে গিফটটা দিলো।”
আমি মুচকি হেসে বললাম,
-“আমার জন্মদিন না।শ্রেয়ার।”
-“ওহ আইচ্ছা।”
বলে উনি শ্রেয়ার দিকে গিফটটা এগিয়ে দিলেন।
এতক্ষণ পর আমি তাকালাম রোদ্দুর স্যারের দিকে।উনি আমার দিকেই তাকিয়ে। হা করে!যেমন মুগ্ধ হয়ে।
আমি ভড়কে গেলাম।আশেপাশে তাকাতে লাগলাম। কিন্তু ওনার কোনো নড়চড় হলো না।
দাদী আসতেই উনি বলে উঠলেন,
-“দাদী,বলছিলাম যে সবাইকে শাড়ি পড়তে বলেন।”
বুঝলাম না!এই লোকের এত শাড়ি পড়ানোর ইচ্ছে কেন!আমি টিনার দিকে তাকিয়ে দেখলাম লাজুক লাজুক হাসি দিচ্ছে।আমার মনে হচ্ছে কেউ আমায় দেখছে।সামনে তাকিয়ে দেখলাম স্যার টিনার দিকে তাকিয়ে।বুঝলাম এখন!মুখ ভেংচি কেটে অন্যদিকে তাকালাম আমি।এদিকে
জুয়েলও সম্মতি দিয়ে বললো,
-“হ হ।আফামণিগো শাড়ি পইড়া হেব্বি লাগবো।”
আবারো হাসির রোল পড়ে গেলো।টিনা তো বলেই ফেললো,
-“আফামণিগো নাকি লায়লা?”
আমি ওকে চিমটি কাটলাম।দাদী আমাদের সচরাচর শাড়ি পড়তে দিতে চায় না।কিন্তু আজ রাজি হয়ে গেলো।বাহ!স্যারের কথার এত দাম!বাহ!
হেসে বললো,
-“বেশ তো।পড়ুক সবাই।”
সবাই মিলে শাড়ি পড়লাম।তারপর কেক কাটা হলো।
খাওয়া-দাওয়ার পর সবাই বসলাম আড্ডা দিতে রাত ১০ টা বাজে।টিনাকে যেতে দিলাম না।সবার সাথে আ্ড্ডা দিতে দিতে হঠাৎ মনে হলো কেউ আমার দিকে তাকিয়ে আছে।গভীর ভাবে দেখছে।আমি পিছনে ফিরে তাকাতেই চুলের বাড়ি লাগলো রোদ্দুর স্যারের মুখে।উনি মুখটা কাত করে ঘুরিয়ে নিলেন।কথা বলতে বলতে খেয়ালই করিনি কখন রোদ্দুর স্যার আমার পাশে এসে বসেছেন।আমার হাত মুখে চলে গেলো।এবার তো আমি শেষ।আমি ঢোক গিলে তুতলিয়ে বললাম,
-“সস..সরি!”
উনি কিছু না বলে আমার দিকে তাকালেন।
আমি ভাবলাম,মানে মানে কেটে পড়াই ভালো।যেই না উঠতে যাবো দাদী এসে বসে পড়লো সামনে।এখন গেলে অনেক কথা শুনতে হবে তাই চুপচাপ বসেই রইলাম।আড়চোখে তাকাচ্ছি ওনার দিকে।উনি আমার দিকেই তাকিয়ে। কি যে হলো!হঠাৎ আমারে এমনে দেখে ক্যান? ভেবেই আমি আমার শাড়ির দিকে তাকালাম।নাহ!সব ঠিকই তো আছে।টিনা আমার ধ্যান ভাঙিয়ে বললো,
-“দেখ ভাই,সামনে কি!”
আমি তাকিয়ে দেখি আবারো বাংলা সিনেমা চালু হয়ে গেছে। লায়লাকে জুয়েল বারবার দেখছে।আর বলছে,
-“তোমারে একদম নায়িকা শাবানার মত লাগতিছে।”
আমি হাসি আর চাপাতে পারছি না।লায়লা এবার আঙুল কামড়ে লাজুক হেসে বলছে,
-“আপনারেও একদম নায়ক আলমগীর,না না থুরি থুরি,রাজ্জাকের মতন লাগতিছে।”
জুয়েল শার্টের কলারটা ঠিক করে ভাব নিতে লাগলো।
এবার আর হাসি চাপা গেলো না।আমি জোরেশোরে হেসে দিলাম।আমার হাসি শুনে টিনাও হাসতে লাগলো।দাদী আমার দিকে রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
-“এত জোরে কেউ হাসে?”
-” হে হে হে!”(হাসার চেষ্টা করে)
আমি আর কিছু না বলে উঠে চলে গেলাম।আসার সময় শুনলাম টিনা স্যারকে বলছে,
-“আমাকে কেমন লাগছে?”
-“সুন্দর! ”
হাহ!কচু!আমারে তো বললো না।পাজি লোক একটা।
থাকগা আমার কি!তাছাড়া আমি অত আহামরি সুন্দর না যে আমাকে বলতে হবে। যাই এখন কাপড় ছেড়ে পড়তে বসি নয়ত কালকে আবার ধরাবে।অনুষ্ঠান তো শেষই।ভেবেই আমি ওয়াশরুমে চলে গেলাম।
।
।
মাথা নিচু করে বসে বসে স্যারের থেকে একগাদা বকা খাচ্ছি।কারণ হোমওয়ার্ক করিনি।কালকে রাতে হোমওয়ার্ক করবো ভেবে রাখলেও পরে বিছানায় শুতেই ঘুমিয়ে গেছিলাম। পরে আর করা হয়নি।
এদিকে আমি কখন থেকে বলছি যে গতকাল তো অনুষ্ঠান ছিলো।উনি মানবার পাত্র নন।
-“পড়াশোনার নাম নেই।নাচের বেলায় তো ঠিকই সব মনে থাকে।”
এইযে!জানতাম না।এটার জন্য আমি নাচতে চাইনি।উনি খাতা টেনে অংক করাতে করাতে বললেন,
-“কাজের কাজ কিছুই না।শুধু ফূর্তি!পুরো বান্দরের মত নাচ।”
রেগে গেলাম আমি।ভ্রু কুচকে বললাম,
-“কি বললেন আপনি?আমি বান্দরের মত নাচছিলাম?”
-“ইয়াহ।”
-“আপনি তাহলে দেখছিলেন কেন শুনি!”
-“আমি তোমায় দেখিনি।যত্তসব! ”
আমার মন খারাপ হয়ে গেলো।উনি আবার বলছেন,
-“সারাদিন -রাত নেটে।”
-“বলছে আপনাকে!”
-“জানি না আমি?”
-“আমিও সব জানি।কেউ একদম সাধু পুরুষ না।”
-“কি বললে?”
আমি ঢোক গিললাম।এই রে!কি বলে দিলাম।ধ্যাত!
কি যে করি আমি!
উনি রেগে টেবিলে বাড়ি দিয়ে বললেন,
-“বলো কি বললে!”
-“যা সত্যি তাই তো বলেছি।ভুল কি বলেছি।”
-“তাই না? তো কি বলেছেন আপনি।”
-“ঝগড়াটে চশমাওয়ালা খরগোশ একটা।”(ফিসফিসিয়ে)
-“আবার ফিসফিস করছো!”
আমি কেঁপে উঠে জোরপূর্বক হেসে বললাম,
-“ক..কিছু না স্যার।সরি।”
বলে চুপ হয়ল গেলাম।উনিও কিছু না বলে অংক করাতে লাগলেন। আমি নিজেকে বুঝালাম,
-“আর কখনো এই লোকের সামনে নাচব না।নেভার!”
চলবে….