#প্রিয়_রোদ্দুর🤍
#লেখনীতে:অনুসা_রাত❤️(ছদ্মনাম)
#পর্ব:০৬
তিন দিন পর আজ পড়াতে আসলেন রোদ্দুর স্যার।আমার মন খারাপিটা টুক করে ভালো হয়ে গেলো।বেশ খুশি খুশি হয়ে বসলাম।নাক টানছে।নাকটা লাল টকটকে হয়ে গেছে। বারবার টিস্যুর সাহায্যে নাক মুছে চলেছে। আমি ওনার সামনে বসে ধীর গলায় বললাম,
-“শরীর খারাপ নিয়ে আসার কি দরকার ছিলো?”
বলেই চুপ হয়ে গেলাম।ভাবলাম বকা দিবে।কিন্তু উনি মিষ্টি হেসে বললেন,
-“ঘরে বসে থাকলেই যে সুস্থ হয়ে যাব সেটা কে বললো?আমি ঘরে বসে তো আমার মেডিসিনকে অসুস্থ করতে পারব না অতসী।”
আমি ওনার দিকে অবাক হয়ে তাকালাম। এটা কি বললেন?মুখ থেকে বের হয়ে এলো,
-“মানে?বুঝলাম না! ”
-“আব..মানে হলো ঘরে বসে থাকলে আম্মুরও জ্বর হয়ে যেতে পারে।আর আম্মু তো আমার মেডিসিন তাই না!”
আমি ওনার দিকে সন্দেহের দৃষ্টি নিক্ষেপ করলাম।উনি আমার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বললেন,
-“এত জোনে তোমার কি কাজ!আমি না আসলেই তো খুশি তাই না?ফাঁকিবাজ!পড়ায় মন দাও! ”
বলেই অংক করাতে লাগলেন।আমি আর কিছু বললাম না।কি বলবো!রাক্ষসটাকে যাই বলি তাই খারাপ।
তবে আজ আমায় বকাবকি করলো না।হয়ত শরীর খারাপ তাই!পড়াশোনা শেষ করে উনি হঠাৎ বললেন,
-“আচ্ছা শোনো,আমি আর তিনদিন আসতে পারব না!”
-“কেন?কোনো সমস্যা?”
-“হ্যা একচুয়েলি আমার এক বন্ধুর বাসায় বিয়ের দাওয়াত।তাই সেখানেই যাচ্ছি। দুদিন থাকব।আমি আগেই বলতাম বাট তার আগেই তো অসুস্থ হয়ে গেলাম।”
-“হুমম..সমস্যা নেই স্যার।এনজয়!”(হালকা হেসে)
আমি ওনার জন্য আদা চা বানিয়ে দিলাম।চা শেষ করে উনি উঠে দাঁড়ালেন।সাথে আমিও।উনি আমার মাথায় হাত দিয়ে বললেন,
-“সাবধানে থাকবে!”
আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম।মাথা থেকে হাত গালে নামলো।গালের একপাশ ছুঁয়ে ধীর গলায় বললেন,
-“বাচ্চামো একদম করবে না।রাস্তায় যাওয়ার সময় সাইড হয়ে সুন্দর ভাবে যাবে।তিনদিনে কোনো গন্ডগোল করে বসিও না!”
-“আমি কই গন্ডগোল করি?আমার মত ভদ্র মানুষ আছে নাকি?”(নিম্ন স্বরে)
-“তা আর বলতে!তাই তো মানুষকে খাটিয়ে মারছো!”
-“আমি কি করলাম!”
-“নাহ কিছু করেননি।শোনেন,যা যা বললাম মেনে চলবেন।পড়াগুলো করে রাখবেন।এতরাত জাগবেন না।ওকে?”
আমি মাথা একপাশে হেলিয়ে সায় দিলাম।উনি চলে যাচ্ছেন। কি ভেবে আমিও পিছন থেকে বলে উঠলাম,
-“নিজের যত্ন নিয়েন।টেক কেয়ার!”
উনি দাঁড়িয়ে গেলেন।আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে মাথা চুলকে বের হয়ে গেলেন।আমার হাত আপনাআপনি গালে চলে গেলো। এই প্রথম বারের মত কেউ আমাকে এভাবে স্পর্শ করলো।তাও সেটা রোদ্দুর স্যার!ওনার কথাগুলো বারবার কানের কাছে বাজতে লাগলো।
রাতে খেয়েদেয়ে বিছানায় শুয়ে ফোনটা হাতে নিলাম।
কি ভেবে রোদ্দুর স্যারের ইনবক্সে মেসেজ দিলাম,
-“আপনি কি এখন ঠিক আছেন?”
ওমা!সাথে সাথে সিন হয়ে গেলো। রিপ্লাই এলো,
-“হ্যা আগের থেকে।রওনা হবো…”
-“আচ্ছা ভালো ভাবে যাবেন!”
-“তুমি খেয়েছো?”
-“হ্যা,আপনি?”
-“না রে!খেতে মন চায় না।”
-“আপনার খেয়ে ঔষধ খাওয়া উচিত। নয়ত জ্বর আবার আসবে। আর আন্টি যা বললো!আপনার নাকি অল্পতেই জ্বর!”
বলেই মেসেজটা আনসেন্ড করতে গেলাম।যদি বকে!
কিন্তু সিন হয়ে গেলো। উনি একটা হা হা ইমুজি দিয়ে বললেন,
-“কিছু হবে না পাগলী!”
আমি থেমে গেলাম।ডাকটা কেমন আপন আপন লাগলো!এভাবে কেউ কখনো বলেনি।হেসে ফেলে বললাম,
-“আমি মোটেও পাগল নই।”
-“তুমি তো পাগলীই।পাগলী একটা!”
আমার বুকে আবারো কম্পন অনুভব করলাম।কিছু বলতে যাব তার আগেই উনি বললেন,
-“আচ্ছা আমায় ট্রেন ধরতে হবে। তুমি ঘুমাও।”
-“আচ্ছা। হেভ আ নাইস জার্নি।”
-“হুমম!”
আমি নেট থেকে বের হয়ে এলাম।বুকে বালিশ চেপে সামনের দিকে তাকিয়ে আছি। আস্তে আস্তে কখন চোখ লেগে গেলো টেরই পেলাম না।
।
কলেজ থেকে ফেরার পথে রাস্তায় ফুচকা দেখে আমি আর টিনা ফুচকা খাচ্ছি।এমন সময় দেখলাম সেই জোনাকি নামের মেয়েটা একটা ছেলের সাথে কোথায় যেন যাচ্ছে। এটা দেখে আমি হা হয়ে বললাম…
-“টিনা দেখ!জোনাকি অন্য গ্রামে আলো ছড়াচ্ছে! ”
টিনা ভালো করে তাকিয়ে বললো,
-“এটাই জোনাকি?”
-“আমার তো তাই মনে হয়।”
-“যাক এতদিনে একটা ভালো কাজ হয়েছে! “(খুশিতে গদগদ হয়ে)
-” কি ভালো কাজ?”(ভ্রু কুচকে)
-“এইযে ভাইয়ার পিছন থেকে,আই মিন আমার ক্রাশের পিছন থেকে মেয়েটা সরেছে!”
-“উফফ আল্লাহ!”
টিনা শুরু করলো রোদ্দুর স্যারের নামে হাজারো কথা।উনি এই,উনি সেই!অথচ আমার মাথায় ঘুরছে অন্য কথা।এই মেয়েটা স্যারকে এসব কেন লিখলো?লিখলেও এই ছেলের সাথে কি করছে?
এসব একটা মেয়ে কিভাবে লিখে?
তবে কি স্যারের সাথে ওর এমন সম্পর্কই হয়েছিলো?
স্যার এমন?
।
দুদিন যেতেই ধুম জ্বর এলো আমার।ছাদে বৃষ্টিতে ভিজেছিলাম।যার ফলস্বরূপ এই অবস্থা। আমার সচরাচর জ্বর আসে না।কিন্তু যখন আসে তখন কাহিল করে ছাড়ে!এইযে আপাতত যেমন বেডরেস্টে আছি।
আম্মু আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,
-“ভাত এনেছি।খেয়ে ঔষধ খা।”
আমি মুখটা ঘুরিয়ে নিয়ে উল্টোপাশ হয়ে শুয়ে বললাম,
-“আমার বমি আসে।”
-“খেয়ে নে।না খেলে কেমনে হবে।”
-“আমি খাবো না!”
-“যা ইচ্ছে কর!”
বলেই চলে গেলো।আমি এপাশ ফিরেই শুয়ে আছি।হঠাৎ আমার ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠলো।আমি ফোন নিয়ে ফেসবুকে ঘুরতে লাগলাম।
টুং করে শব্দ হতেই মেসেঞ্জার চেক করে দেখলাম রোদ্দুর স্যারের মেসেজ!ওহ গড!রোদ্দুর স্যার আমাকে মেসেজ করেছে তাও নিজ থেকে!টিনা এখানে থাকলে তো অজ্ঞান ই হয়ে যেত।ভেবেই হাসি পেল আমার।স্যার লিখেছেন,
-“কেমন আছো?”
আমি আস্তে আস্তে টাইপ করলাম,
-“বেশি ভালো না স্যার।আপনি?”
একটু পরেই রিপ্লাই এলো,
-“আমি তো ভালোই ছিলাম।তোমার কি হয়েছে! ”
আমি আস্তে আস্তে টাইপ করছি তাই রিপ্লাই দেরী হচ্ছে। তা দেখে উনি আবার লিখলেন,
-“কি হলো বলোহ!কি হয়েছে? তুমি ঠিক আছো তো?”
-“আমার জ্বর ভীষণ!”
-“কিভাবে!কবে থেকে!আমাকে জানানোর প্রয়োজন আছে বলে মনে হলো না?”
ওরে আল্লাহ রে!এদিকে আমি দূর্বল হাতে ওনার সাথে টাইপ করতে গিয়ে পেরে উঠছি না।
-“কি হলো!কথা বলো!”
আমি আর না পেরে লিখলাম,
-“আমি জ্বর শরীরে লিখতে পারছি না।”
সাথে সাথে রিপ্লাই এলো,
-“তুমি এখন ফোন রেখে খেয়ে ওষুধ খাও।ওষুধ খেয়েছো?”
-“উহুম!”
-“এক্ষুণি খাবে।তারপর রেস্ট নাও।আমি আসছি।”
-“কিন্তু স্যার আপনার তো আরো দুদিন পর ব্যাক করার কথা।”
-“নেট থেকে বের হয়ে যা করতে বললাম করো!”
আমি নেট থেকে বের হয়ে গেলাম।শালার বেডা!জ্বরের মধ্যেও আমাকে বকছে। এত বকার কি আছে!
আমি খাবার আর ঔষধ কোনোটাই না খেয়ে শুয়ে পড়লাম। আস্তে আস্তে কখন ঘুমিয়ে গেলাম টেরই পেলাম না।
কপালে কারোর হাতের স্পর্শে ঘুম ভাঙলো আমার।আস্তে আস্তে চোখ খুলে রোদ্দুর স্যারের শুকনো মুখটা দেখতে পেলাম।উনি আমার কপালে হাত দিয়ে বলছেন,
-“এর তো জ্বরে শরীর পুড়ে যাচ্ছে! ”
আম্মু বলছে,
-“হ্যা বাবা।ওর আব্বু,দাদা,দাদী কেউই বাসায় নেই।জমির কাজে গ্রামের বাড়িতে গেছে। আমি শ্রেয়াই বাসায়।ও ওষুধ খায় না,খাবার খায় না।জ্বর না কমলে আমি একা কিভাবে দৌড়াদৌড়ি করব ওকে নিয়ে বলোতো?”
রোদ্দুর স্যার আমার দিকে শান্ত চোখে তাকালেন।আমি চোখ ঘুরিয়ে আম্মুর দিকে তাকিয়ে বললাম,
-“আম্মু কিছু হয়নি আমার।”
আম্মু রাগী গলায় বললেন,
-“তোর সাথে আমি পারমু না বাপু।আমি গেলাম,রোদ্দুরের জন্য কিছু নিয়ে আসি।”
-” না না আন্টি।একটু চা হলেই হবে।”
-“তুমি বসোতো বাবা।”
বলেই আম্মু চলে গেলেন।স্যার আমার চুলে হাত বুলিয়ে নরম গলায় বললেন,
-“কি?এভাবে শুয়ে থাকলে চলবে?”
আমি ওনার চোখের দিকে তাকিয়ে দূর্বল গলায় বললাম,
-“ভালো লাগছে না! ”
-“লাগবে কিভাবে?আমার মাথা খেতে পারছো না তো।”
-“মোটেও আমি আপনার মাথা খাই না।”
-“জ্বরের মধ্যেও ঝগড়া?”
আমি কিছু না বলে ঠোঁট উল্টে শুয়ে রইলাম।উনি আমার হাতে খাবারের প্লেট দিয়ে বললেন,
-“খেয়ে নাও!”
-“খেতে ভালো লাগছে না! ”
-“খেয়ে ওষুধ খেতে হবে।ফাস্ট!”
বলেই উনি খাবারে হাত দিতেই আম্মু রুমে ঢুকলো।খুশি হয়ে বললো,
-“ও খেতে রাজি হয়েছে? দাও আমি খাওয়াচ্ছি! ”
উনি খাবারটা দিয়ে দিলেন।আম্মু আমাকে খাওয়াতে লাগলেন।আমি আড়চোখে তাকাচ্ছি। উনিও আমার দিকেই তাকিয়ে আছেন।আমি বারবার আঁড়চোখে তাকাচ্ছি। আম্মু আমার ঠোঁট থেকে খাবার মুছে বলছেন,
-“এখনো মুখে খাবার লেগে থাকে!বাচ্চা নাকি তুই!”
খাওয়ানো শেষ হলে ঔষধ খাইয়ে দিলো আম্মু।
আমি খেয়ে আধশোয়া হয়ে শুতেই স্যার উঠে দাঁড়ালেন।আম্মু প্লেট রাখতে চলে গেলো।স্যার আমার গালে হাত দিতেই আমি মাথা তুলে তাকালাম।উনি গাল টেনে বললেন,
-“টেক কেয়ার পিচ্চিবুড়ি!”
আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে বললাম,
-“আমি বুড়ি না!আর পিচ্চিও না।না কেমন ডাক!”
-“আদরের ডাক!”
চলবে……..