ফিরে আসা পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব

0
409

#ফিরে_আসা__
লেখা: ShoheL Rana শামী
পর্ব:-০৬ (শেষ পর্ব)

পাহাড়ি রাস্তা ধরে গাড়ি ছোটাচ্ছে আলভিন। তারপাশে বসে আছে লিয়া। পেছনের সিটে অ্যারিক আর হেনা। রাত নেমেছে অনেকক্ষণ হয়েছে। চারপাশটা অন্ধকার ঘিরে রেখেছে। হেডলাইটের আলোতেই গাড়ি চালাচ্ছে আলভিন। প্রায় আধঘণ্টা ওরা জার্নিতে আছে। পেছন থেকে হেনা একটু অধৈর্য হয়ে গেল,
-আর কতক্ষণ? আমরা ঠিক পথে এগোচ্ছি তো?’
-হুমম… পুরনো রাজপ্রাসাদ তো এদিকেই শুনেছি। ব্লাডি মেরি যে দুর্গটির কথা বলেছিল ওটা হয়তো রাজপ্রাসাদ থেকে বেশি দূরে হবে না। কারও কাছে ‘উডচেস্টার হিল’ দুর্গের কথা জানতে চাইলেই হয়তো দেখিয়ে দেবে।
-কিন্তু আর কতক্ষণ? খিদেয় তো পেট চুকচুক করছে।’ বলে ওঠলো অ্যারিক।
-আচ্ছা, আশেপাশে কোথাও থাকার মতো কিছু পাই কি না দেখি।’ গাড়ি চালাতে চালাতে বললো আলভিন।
আরও কিছুদূর যাওয়ার পর লিয়া উত্তেজিত হয়ে ওঠলো,
-ঐতো ঐতো… একটা বিল্ডিং দেখা যাচ্ছে।’
হেডলাইটের আলোতে আলভিনও দেখলো বিল্ডিংটা। ওদিকেই গাড়ি নিয়ে গেল সে। তারপর বিল্ডিংয়ের সামনে থামালো গাড়িটা। চারজনে গাড়ি থেকে নামলো। সাথে রাতে খাওয়ার জন্য খাবার নিলো। গাড়িতে কয়েকদিন চলার মতো যথেষ্ট খাবার আছে তাদের।
চারজনে বিল্ডিংয়ের সামনে দাঁড়িয়ে কী যেন দেখতে লাগলো। টর্চের আলো ফেললো অ্যারিক বিল্ডিংয়ের উপর। তারপর মন্তব্য করলো,
-মনে হয় অনেক পুরনো কোনো পরিত্যক্ত প্রাসাদ।’
ওর কথা শেষ হতেই হেনা বলে ওঠলো,
-লাইটটা আরেকটু উপরে ফেলো তো। মনে হয় ওখানে বিল্ডিংয়ের নাম লেখা আছে।’
অ্যারিক আরও উপরে আলো ফেললো। হ্যাঁ, একটা নাম। প্রায় মুছে যাচ্ছে নামটা।
-হ্যাম্পটন কোর্ট।’ বিড়বিড় করলো আলভিন।
-তাহলে আজকে আমরা এই ‘হ্যাম্পটন কোর্ট’ প্রাসাদেই রাতের অতিথি হতে যাচ্ছি।’ মন্তব্য করলো লিয়া।
-হুমম, চলো ভেতরে গিয়ে দেখি, থাকার মতো পরিস্থিতি আছে কি না।

প্রাসাদের ভেতরে ঢুকে ওরা দেখে, কেমন যেন একটা অবস্থা। চারপাশে ধুলো, হাঁটতে গেলেই মাকড়শার জাল আটকে যায় মুখে। বিরক্ত হয়ে হেনা বললো,
-উহহ, আর কোনো ভালো জায়গা জুটলো না থাকার মতো।’ বলেই কাচের চশমাটা মুছে আবার চোখে লাগালো। তার কথার জের ধরেই আলভিন বললো,
-এর চেয়ে ভালো জায়গা তুই ডিজার্ভ করিস?’
-হুহ্, এরকম পরিবেশে তোর থাকার অভ্যাস আছে। আমার নেই।’ হার মানলো না হেনা। দুজনের তর্কের মাঝখানে লিয়া বললো,
-হয়েছে, ঝগড়া থামাও। থাকার জন্য জায়গাটা একটু পরিষ্কার করো।’
তারপর চারজনে মিলে ওরা দুটো কক্ষ পরিষ্কার করলো। ক্লান্ত হয়ে গেছে ওরা। শরীর আর ধকল নিতে পারছে না। রাতের খাবারটা রেডি করে খেয়ে নিলো ওরা দ্রুত। খাওয়ার পর একটা কক্ষে হেনা আর লিয়া গেল শুতে। অন্য কক্ষে আলভিন আর অ্যারিক। বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই ঘুম চলে এলো সবার। ঘুমানোর আগে বাতি নিভিয়ে দেয়ায় মনে হলো, অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল এক ভৌতিক প্রাসাদ। আশেপাশে আর কোনো প্রাসাদ বা মানুষের অস্তিত্ব নেই।

রাত আরও গভীর হয়। সুনসান নীরবতা ভঙ্গ করে হঠাৎ কীসের যেন শব্দ হয়৷ শব্দ শুনে ঘুম ভাঙে হেনার। তখন আবার শুনে সে শব্দটা। কেউ মনে হয় সিঁড়িতে হাঁটছে। পাশে হাত বাড়িয়ে হেনা লিয়ার অস্তিত্ব অনুভব করলো। তবে কি অ্যারিক বা আলভিন সিঁড়িতে হাঁটছে? এতো রাতে না ঘুমিয়ে ওরা কী করছে? বাতি জ্বালালো হেনা। ফোনের স্ক্রিনে টাইম দেখে নিলো, রাত চারটা বাজে প্রায়। ফোনের টর্চ জ্বেলে সে পাশের কক্ষে এলো। দেখলো, দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। তারমানে আলভিন বা অ্যারিক কেউ যায়নি সিঁড়িতে। তবে কে? আবারও সিঁড়িতে হাঁটার শব্দ হলো। ওদিকে আলো ফেললো হেনা। দেখলো, কে যেন নেমে আসছে সিঁড়ি বেয়ে। একজন মহিলা। তার গায়ে যে পোশাক তা দেখে মনে হলো, সভ্যতার বহুবছর আগের পোশাক। হয়তো কোনো রাজরানির পোশাক। কে এই মহিলা? এখানে এলো কী করে? ঘুমানোর আগে তো এই প্রাসাদে আর কেউ ছিল না ওরা ছাড়া। তবে কে উনি? এমন অদ্ভুত পোশাকই বা কেন পরে আছেন? ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল হেনা মহিলাটির দিকে।
-কে আপনি?’ দ্বিধান্বিত কণ্ঠে প্রশ্ন করলো হেনা। এবার সে মহিলার চেহারাটা ভালো করে খেয়াল করলো। কেমন যেন বিষণ্ণ চেহারা। চুপ হয়ে আছেন তিনি। হেনা আবারও প্রশ্ন করলো,
-মন খারাপ আপনার?’
কোনো জবাব দিলো না মহিলা। হেনা মহিলাাটির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ধীরকণ্ঠে প্রশ্ন করলো,
-কী হলো আপনার?’ প্রশ্ন করেই মহিলাটিকে ছুঁতে চায়লো হেনা। সাথে সাথে সে দেখলো মহিলাটির ভয়ংকর রূপ। ধড় থেকে মাথাটা আলাদা হয়ে শূন্যে ভাসতে লাগলো তার। আর ধড়হীন দেহটা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগলো। দেখে আর্তনাদ করে ওঠলো হেনা। জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেল সে সিঁড়ি থেকে।
হেনার আর্তনাদ শুনে ঘুম ভেঙে গেল বাকিদের। ওরা ছুটে এলো ওখানে। হেনাকে বেহুশ হয়ে পড়ে থাকতে দেখা গেল। সিঁড়ির উপরে চোখ গেল ওদের। দেখলো একটা ধড়হীন মাথা শূন্যে ভাসছে। পরস্পরের দিকে তাকালো ওরা।
-কী ওটা?’ ভয়ে ভয়ে প্রশ্ন করলো লিয়া। শক্ত করে আলভিনের বাহু আঁকড়ে ধরে আছে সে। আলভিনও ভয় পাচ্ছে। অ্যারিকেরও একই অবস্থা। তবে জ্ঞান হারালো না ওরা হেনার মতো। একসাথে তিনজন থাকাতে কিছুটা সাহস এখনও বাকি ওদের। ওরা হেনার জ্ঞানহীন দেহটা তুলে নিলো। তখন ধড়হীন মাথাটা শূন্যে মিলিয়ে যেতে লাগলো। ওরা দ্বিতীয়বার ওদিকে না তাকিয়ে হেনাকে নিয়ে একটা কক্ষে এলো। তারপর ওর চোখেমুখে পানি ছিটিয়ে জ্ঞান ফেরালো। সারারাত আর ঘুমালো না ওরা। জেগেই কাটিয়ে দিলো বাকি রাতটা। জ্ঞান ফেরার পর থেকেই একদম চুপচাপ ছিল হেনা। অনেকটা ভয় পেয়েছে সে।

ভোরের আলো ফুটতেই হ্যাম্পটন কোর্ট প্রাসাদ ত্যাগ করলো ওরা। ওখান থেকে সোজা এলো পুরনো রাজ প্রাসাদে। ওখানে এসেই ওরা প্রাণের অস্তিত্ব দেখলো। মনে হলো যেন সভ্য জগতে ফিরে এসেছে। লোকজনের চলাফেরা দেখতে পেল। গাড়ি থামিয়ে আলভিন একজনকে জিজ্ঞেস করলো,
-মাফ করবেন, আপনি কি আমাদের একটু সাহায্য করতে পারবেন?
-জি বলুন…?
-দয়া করে কি বলবেন, ‘উডচেস্টার হিল’ দুর্গটি কোথায়?’
প্রশ্ন শুনে লোকটা যেন ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল। আশেপাশে তাকাতে লাগলো বোকার মতো। তারপর বললো,
-নাহ্, আমি জানি না ওটা কোথায়।
-ঠিক আছে।’ আলভিন গাড়ি ছেড়ে দিলো। কিছুদূর এসে আবার আরেকজনকে একই প্রশ্ন করলে, লোকটা পাল্টা প্রশ্ন করে,
-আপনারা ঐ দুর্গে কেন যেতে চান বলেন তো?
-আসলে ওখানে আমাদের একটা কাজ আছে। আপনার জানা থাকলে আমাদের সাহায্য করুন।
-কিন্তু, আপনারা ওখানে যাবেন কেন? জানেন না ওখানে কেউ যায় না ভয়ে?
-কীসের ভয়?
-ওখানে বিভিন্ন খারাপ জিনিসের বাস। একসময় ওখানে রাজা অষ্টম হেনরি লোকদের আটকে রেখে শাস্তি দিতো, ওখানেই ওদের আত্মা এখনও বন্দী অবস্থায় ঘুরে বেড়ায়।’
লোকটার কথা শুনে পরস্পরের দিকে তাকালো আলভিনরা। হেনা বলে ওঠলো,
-চল বাবা, ওখানে গিয়ে কাজ নেই। এমনিতেই গতরাত থেকে ভয়ে আছি।
-কিন্তু ওখানে না গেলেও যে আমার বাঁচার কোনো উপায় নেই।’ হতাশ কণ্ঠে বললো আলভিন। তার কথা শেষ হতেই অ্যারিক লোকটাকে বললো,
-আপনি তবুও আমাদের বলুন, দুর্গটি কোথায়।’
-বেশ, আপনারা যখন আমার কথা শুনবেন না, নিজেদের বিপদ নিজেরাই ডেকে আনুন।’ বলেই লোকটা তাদেরকে উডচেস্টার হিল দুর্গের ঠিকানা দিলো। ঠিকানা অনুযায়ী গাড়ি ছোটাতে লাগলো আলভিন।

উডচেস্টার হিলের নিচে এসে গাড়ি থামালো আলভিন। তারপর গাড়ি থেকে নামলো সবাই। উপর দিকে তাকিয়ে একটা দুর্গ দেখতে পেল ওরা। ক্ষীণ হয়ে দেখা যাচ্ছে দুর্গটি। গাছপালা আর লতাপাতা ঘিরে রেখেছে ওটাকে। হয়তো এদিকে বহুবছর ধরে লোকজনের পা পড়ে না। গাছপালা, লতাপাতা অনেক বেড়ে গেছে। বহুবছর হয়তো এগুলো ছাটা হয় না। জঙ্গলের মতো হয়ে আছে। দুর্গটি লোকালয় থেকেও অনেক দূরে। রাজা অষ্টম হেনরি অপরাধীদের শাস্তি দেয়ার জন্য এমন জায়গা কেন বেছে নিয়েছিলেন তা কারও বোধগম্য হলো না। উপরে গিয়ে হয়তো এ প্রশ্নের উত্তর মিলতে পারে।
-চলো, উপরে ওঠি।’ উপর দিকে তাকিয়ে, কোমরে হাত দিয়ে বললো আলভিন।
-আমি অনেক ক্লান্ত। কী করে ওঠবো?’ হতাশ দেখালো হেনাকে।
-সিঁড়ি আছে তো। চল…’ বলেই সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগলো আলভিন, তাকে অনুসরণ করলো বাকিরা।

উপরে এসে ওরা দেখে দুর্গে বিশাল এক তালা ঝুলানো। ওদের হাতে চাবিও নেই। এখন ওরা ভেতরে ঢুকবে কী করে। তালা ভাঙতে হবে। কিন্তু এত বড় তালা ভাঙাটাও সহজ কাজ না। তবুও চেষ্টা তো করতে হবে। এতদূর এসে ফিরে যাওয়া তো যাবে না। আলভিন অ্যারিককে আবার নিচে পাঠালো। গাড়ি থেকে লোহার রডটি আনতে হবে। অ্যারিক বাধ্য ছেলের মতো আবার নিচে গেল। ওরা তার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো। আলভিন দুর্গের দরজায় কান পেতে কী যেন শুনতে লাগলো এক ধ্যানে। আচমকা লিয়া তার কাঁধে হাত রাখলে, চমকে ওঠে সে।
-ওহ তুই..?’ হাসলো আলভিন।
-কোনো আত্মা ভাবছিস নাকি?’ খোঁচা দিলো হেনা।
-নাহ্, হঠাৎ কাঁধে হাত রাখাতে একটু ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। পরিবেশটাও তো ঘাবড়ে যাওয়ার মতো।
-তো কিছু শোনা গেছে ভেতর থেকে?’
-নাহ্, তবে না জানি কী কী দেখতে হয়, যদি ভেতরে ঢুকতে পারি।’
অ্যারিককে দেখা গেল লোহার রড নিয়ে ফিরে আসতে।।

অ্যারিক রড নিয়ে এসে আলভিনের হাতে দিলো। আলভিন সেই রড দিয়ে তালায় বাড়ি মারতে গিয়ে থেমে গেল। কী যেন ভাবলো সে। তাকে হঠাৎ এভাবে থামতে দেখে বাকিরা অবাক হলো। অ্যারিক জিজ্ঞেস করলো,
-কী হলো আলভিন, তুই ঠিক আছিস তো?’
কয়েকমুহূর্ত চুপ থেকে আলভিন জবাব দিলো,
-এই তালাটা কেমন যেন চেনা চেনা। আমি কোথায় যেন দেখেছি।
-এতো পুরনো তালা, তুই আবার কোথায় দেখবি? বাজারেই খুঁজলে পাওয়া যাবে না।
-দাঁড়া…’ অ্যারিকের কাঁধে হাত চাপড়ে আলভিন দুর্গটি পর্যবেক্ষণ করতে লাগলো। তারপর হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে ওঠলো,
এই সেই দুর্গ, যেটা আমি স্বপ্নে দেখি প্রায়।
-হোয়াট! এটাই সেই দুর্গ?’ আশ্চর্য হলো সবাই।
-হুমম, আমি ড্যাম শিওর, এই সেই দুর্গ। এর ভেতর থেকেই একটা পুরুষকণ্ঠ আমার নাম ধরে ডাকছিল।
-কিন্তু, এটা তো পুরনো পরিত্যক্ত দুর্গ। এর ভেতর কে থাকবে?
-দাঁড়া, ভেতরে ঢুকতে পারলেই অনেক প্রশ্নের উত্তর জানা যাবে। হয়তো এর সূত্র ধরেই সেই সমাধিস্থলেও আমরা পৌঁছতে পারবো।
-তাহলে দেরি না করেই তালাটা ভাঙা যাক।’ বাকিরা একসাথে গলা মিলালো।

পরবর্তী এক ঘণ্টা ব্যয় হলো ওদের তালাটা ভাঙতে। যখনই দুর্গের দরজা খুললো, তখন কেমন যেন একটা বিভৎস গন্ধ নাকে এলো। সাথে সাথে বমি করে দিলো হেনা। বাকিরা নিজেদের কন্ট্রোল করার চেষ্টা করলো নাকে হাত দিয়ে। লিয়া পারফিউম বের করে স্প্রে করে দিলো। গন্ধটা কিছুটা কমলো তখন। ভেতরে ঢুকলো ওরা। বাইরের আলো খুব বেশি আলোকিত করতে পারলো না ভেতরটা। তাই টর্চলাইট জ্বালালো ওরা। বেশ কয়েকটা কঙ্কাল পড়ে থাকতে দেখা গেল ভেতরে। আঁতকে ওঠলো সবাই। সামনে এগোনোর আর সাহস পেল না মেয়ে দুইটা। কিছুটা সাহস তখনও বাকি ছিল আলভিন আর অ্যারিকের। আলভিন বললো,
-চলো সঙ্গীরা, আরও ভেতরে যায়।’
ভয়ে ভয়ে পা ফেললো সবাই।
-আলভিন…’ ডাক দিলো লিয়া।
-হমম…
-ওই দেখ, বইটা…’ দেয়ালের দিকে ইশারা করলো লিয়া। চোখ জ্বলজ্বল করে ওঠলো সবার। দেয়ালের পাশেই পড়ে আছে কয়েকশো বছর পুরনো সেই বইটা। ধুলো জমেছে উপরে। বইটা যেখানে পড়ে আছে, তার পাশের দেয়াল জুড়ে রক্তের দাগ। শুকিয়ে গেছে তা এতদিনে।
-কার রক্ত হতে পারে?’ প্রশ্ন করলো হেনা।
-এখানে যেহেতু বন্দীরা এমনিতেই মারা যায়, তাই হয়তো বন্দীদের রক্তাক্ত করার প্রয়োজন নেই। এমন কারও রক্ত, যে এখানে বন্দী ছিল না।’ মন্তব্য করলো অ্যারিক। তাকে সম্মতি জানিয়ে আলভিন বললো,
-ঠিক, এটা ব্লাডি মেরির রক্ত হতে পারে। এই বইটার সন্ধান যেহেতু সে-ই আমাকে দিয়েছে, তারমানে এটা হয়তো সে নিজেই এখানে ফেলে গেছে। আর তার মৃত্যু এখানে হয়নি আমরা জানি। সে হয়তো রক্তাক্ত হয়ে এখানে আশ্রয় নিয়েছিল।
-হতে পারে।’ বিড়বিড় করলো অ্যারিক। লিয়া আর হেনা রক্তের দাগের উপর হাত বুলালো। কতো বছর আগের রক্ত! তাও ইংল্যান্ডের এক রানির রক্ত, এভাবে ছুঁয়ে দেখতে পারছে ওরা। কেমন যেন একটা অনুভূতি হতে লাগলো। আসলেই মেয়েদের আবেগ একটু বেশি।
আলভিন হাত বাড়িয়ে নিতে গেল বইটা। সাথে সাথে তার হাত আটকে গেল বইয়ের সাথে। চিৎকার করে ওঠলো সে,
-আমি হাত ছাড়াতে পারছি না, সাহায্য কর আমাকে।’
উত্তেজিত হয়ে ওঠলো তখন সবাই। দেরি না করে আলভিনের হাত ছাড়াতে চেষ্টা করলো ওরা। তখন অদৃশ্য এক কণ্ঠ শোনা গেল।
-তোমাদের উদ্দেশ্য আমরা জানি…’
-কে? কে? কে তুমি?’ ভয়ে ভয়ে প্রশ্ন করলো আলভিন।
-আমরা এই দুর্গের বন্দীরা। বইটা যেখানে আছে, ওখানেই ছেড়ে দাও।’
আলভিন বইটা ছেড়ে দিলো। তখন সে দাঁড়াতে পারলো সোজা হয়ে। কিন্তু ভয়টা কাটেনি কারও তখনও। হেনা বললো,
-আয়নার একটা ভূতের কথা শুনেই আমরা এখানে এসেছি শুধু শুধু। কোনো মানে হয় না। এখন পড়লাম তো বিপদে। চল, বের হয়ে পড়ি, বইটা তো নিতে দেবে না ওরা।’ বলেই পা চালালো হেনা ওখান থেকে বের হতে। জোরে শব্দ করে তখন দুর্গের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। চিৎকার করে ওঠলো তখন সবাই। এগিয়ে গিয়ে দরজা খোলার চেষ্টা করলো, কিন্তু খোলা গেল না কিছুতেই। হতাশ হয়ে বসে পড়লো সবাই। ফিসফিস করলো অ্যারিক,
-আমরা সবাই মরতে চলেছি। হয়তো আমরাও একদিন ওদের মতো হয়ে যাবো।’
-নাহ্, এভাবে বলিস না। কিছু একটা কর এখান থেকে বের হতে। আহ্, দম বন্ধ হয়ে আসছে আমার।’ ভয়ে কাঁপতে লাগলো লিয়া। হেনা দ্বিতীয়বারের মতো বমি করলো ওখানে। পারফিউমের গন্ধটা আর নেই। লিয়া পারফিউমটা বের করে আবার স্প্রে করলো। এবার আর আগের মতো সুগন্ধি পাওয়া গেল না। ধীরে ধীরে বাতাস ফুরিয়ে আসছে ভেতরে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে সবার। এভাবে থাকলে কেউ বেশিক্ষণ বেঁচে থাকতে পারবে না। আলভিন তখন চিৎকার করে বললো,
-আমাকে আটকে রাখো তোমরা, কিন্তু আমার বন্ধুদের মুক্তি দাও।’
পরমুহূর্তে সবকিছু যেন শান্ত হয়ে গেল আলভিনের কথায়। অ্যারিক, হেনা এবং লিয়া শান্ত দৃষ্টিতে চেয়ে থাকলো আলভিনের দিকে। তারপর হঠাৎ ‘হু হু’ করে কেঁদে ওঠলো ওকে জড়িয়ে ধরে। কাঁদতে কাঁদতে লিয়া বললো,
-তুই কী করে ভাবলি, তোকে এভাবে এখানে রেখে আমরা বেঁচে যাবো?’ লিয়ার কথা শেষ হতেই হেনা বললো,
-তোকে একা ছাড়বো না বলেই তো বিপদ জেনেও আমরা সাথে এসেছি।’
আলভিনও এবার শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো ওদের। তখন অ্যারিক বললো,
-ভেঙে পড়িস না। নিশ্চয়ই বাঁচার কোনো উপায় আছে।’
-হ্যাঁ, আছে, বাঁচার উপায় তোমাদের আছে।’ অদৃশ্য কণ্ঠে শোনা গেল। পরস্পরের দিকে তাকালো ওরা। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে আলভিন প্রশ্ন করলো অদৃশ্য কণ্ঠটার উদ্দেশ্যে,
-কী উপায়? বলো, আমাদের কী করতে হবে?
-আমাদের সাথে কয়েকটা চ্যালেঞ্জ নিতে হবে। তোমরা চ্যালেঞ্জে জয়ী হতে পারলেই, বেঁচে ফিরতে পারবা।
-কী চ্যালেঞ্জ?’ প্রশ্ন করলো আলভিন।
-প্রথম চ্যালেঞ্জ, আমাদের সাথে এক রাত এই দুর্গে কাটাতে হবে।
-অসম্ভব।’ সাথে সাথে বলে ওঠলো অ্যারিক। ‘এখানে আর কিছুক্ষণ থাকলেই আমরা দম বন্ধ হয়ে মারা যাবো।’
অ্যারিকের কথা শেষ হতেই দুর্গের দরজা খুলে গেল। প্রাণভরে নিশ্বাস নিলো তখন সবাই। অদৃশ্য কণ্ঠে আবার শোনা গেল,
-দুর্গের দরজা বন্ধ হবে না, কিন্তু কেউ আগামীকাল আমরা না বলা পর্যন্ত এখান থেকে বের হতে পারবা না।
-আর আমাদের খাবার তো সব গাড়িতে। না খেয়ে তো থাকতে পারবো না।
-একজন গিয়ে খাবার নিয়ে আসতে পারো…’
-এই পরিবেশে খাবার খাবো? নু ওয়ে…’ বলেই আবারও বমি করার উপক্রম হলো হেনার। তবুও কিছু করার নেই। আলভিন মাথা নেড়ে ইশারা করলো অ্যারিককে। অ্যারিক খাবার আনতে গেল।

ভয়ংকর এক দুর্গে রাত কেটে চলেছে ওদের। সবাই হালকা খাবার খেয়েই কোনোমতে খিদে মিটিয়েছে। দুর্গের দরজা খোলা। বাইরের বাতাস ভেতরে ঢোকায়, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে না। তবে দুর্গন্ধে টিকে থাকা যেন দায় হয়ে পড়েছে। বাতাস বেড়ে গেলে দুর্গন্ধটাও বেড়ে যায়। ঘনঘন স্প্রে করতে করতেও ক্লান্ত হয়ে পড়েছে লিয়া। দুর্গের বাইরে ঘুটঘুটে আঁধার। ভেতরে নিজেরাই বাতি জ্বালিয়েছে ওরা। সামনে কঙ্কালগুলো পড়ে আছে, আর ওরা দেয়ালে হেলান দিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করছে। চোখ বন্ধ করে আছে, কিন্তু ঘুম কিছুতেই আসে না। কয়েকমুহূর্ত চোখে ঘুম ধরা দিলেও আবার চলে যায়। লিয়া মাঝেমধ্যে স্প্রে ছিটাই চারদিকে। তেমনি একবার স্প্রে ছিটানোর সময় বামপাশে কারও যেন অস্তিত্ব অনুভব করে। অথচ তার বামপাশে কেউ নেই, তার স্পষ্ট মনে আছে। চোখ খুলে তাকায় সে বাঁদিকে। সাথে সাথে আর্তনাদ করে ওঠে। কে যেন দেয়ালে হেলান দিয়ে আছে তার পাশে। আর অদ্ভুতভাবে তার দিকে তাকিয়ে আছে। চোখ দুটো রক্তবর্ণ। চোখের পলক পড়ছে না। মুখটা থেঁতলানো। কেউ যেন মেরে থেঁতলে দিয়েছে। হাঁপাতে থাকে লিয়া। একপাশে সরে দাঁড়িয়েছে সে। বাকিরাও ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে আর্তনাদ শুনে। কাঁপতে থাকে সবাই। কিন্তু লোকটার মাঝে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। একইভাবে চেয়ে আছে সে। তারপর ধীরে ধীরে কোথায় যেন মিলিয়ে যেতে থাকে।
লোকটা মিলিয়ে যেতেই সবাই যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলো। ধপ করে বসে পড়লো লিয়া। পরক্ষণে কিছু বুঝে উঠার আগেই কারা যেন কেঁদে ওঠলো অদৃশ্য সুরে। লিয়া আবার উঠে দাঁড়িয়ে ওদের পাশে এলো জড়োসড়ো হয়ে।
-কারা কাঁদছে আবার?’ নিজে নিজেই প্রশ্ন করলো।
-হয়তো আত্মারাই কাঁদছে।’ জবাব দিলো আলভিন।
-এই মুহূর্তে আমাদের ভয় পেলে চলবে না। আমরা জানি যে ওরা আমাদের ক্ষতি করবে না। তাই ভয়টাকে দূর করে শক্ত হও।’ বন্ধুদের উদ্দেশ্যে বললো অ্যারিক।
-ঠিক বলছে অ্যারিক। ভয় পাওয়া চলবে না আমাদের।’ আলভিনও সাহস জুগালো।’
তারপর চারজনে দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে বসলো আবার। বাকি রাতটা ওভাবে কেটে গেল।

পরদিন সকালে আবার অদৃশ্য কণ্ঠ শোনা গেল,
-প্রথম চ্যালেঞ্জটা তোমরা ভালোভাবে জয়ী হয়েছো। এবার দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ।’
দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ শুনে আবারও যেন পিলে চমকে ওঠলো ওদের। না জানি দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জটা কতো ভয়ংকর হয়। ভয়ে ভয়ে প্রশ্ন করলো অ্যারিক,
-দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জটা কী?’
-আজকের মধ্যেই এই দুর্গে যতটা কঙ্কাল আছে, সব কঙ্কালের সমাধি করতে হবে।’
-কিন্তু সমাধি করার জন্য তো আমাদেরকে দুর্গের বাইরে যেতে হবে?
-দুর্গের বাইরে যেতে পারবে। তবে উডচেস্টার হিল থেকে নামতে পারবে না। দুর্গের পেছনেই বড় একটা গর্ত পাবে। সেই গর্তে সব কঙ্কালের সমাধি করতে হবে।’
চ্যালেঞ্জটা শুনে পরস্পরের দিকে তাকালো ওরা। তারপর আলভিন রাজি হয়ে বললো,
-বেশ! আমরা রাজি।’
ওরা তখন ভয়ে ভয়ে কঙ্কালগুলো একটা একটা করে তুলে নিলো। জানে, অসাড় কঙ্কালগুলো তাদের কোনো ক্ষতি করবে না। তবুও কেমন যেন একটা ভীতি কাজ করছে মনে। পরবর্তী কয়েক ঘণ্টায় ওরা কঙ্কালগুলো সমাধির কাজ শেষ করলো। এবার আরেকটা চ্যালেঞ্জ নেয়ার পালা। জানে না ওরা তৃতীয় চ্যালেঞ্জটা কী দেয়। ভাবতে ভাবতে আলভিন বলে,
-আমার মনে হয় ওরা আমাদেরকে কঠিন কোনো চ্যালেঞ্জ দেবে না।
-এরকম মনে হওয়ার কারণ?
-কারণ, চ্যালেঞ্জগুলো ওরা নিজেরাই সহজ করে দিচ্ছে আমাদের।
-প্রথম চ্যালেঞ্জটা কি সহজ ছিল? একটুর জন্যই প্রাণ বের হয়ে যায়নি ভয়ে।’ বলার সময় কিছুটা কেঁপে ওঠলো লিয়া।
-হুমম, প্রথম চ্যালেঞ্জটা একটু ভয়ের ছিল ঠিকই। কিন্তু এতে হয়তো কোনো কারণ থাকতে পারে।
-তোর এরকম মনে হওয়ার কারণ কী?’ প্রশ্নটা করে সরাসরি আলভিনের দিকে তাকালো অ্যারিক।
-কারণ, আমার মনে হচ্ছে, ওরা আমাদেরকে কোনো চ্যালেঞ্জ দিচ্ছে না। চ্যালেঞ্জের নামে আমাদের কাছ থেকে কিছু সাহায্য নিচ্ছে ওরা। কী সাহায্য জানি না। তবে আমাদেরও উচিত ওদেরকে সাহায্য করা।
-বেশ, তাহলে চলো, তৃতীয় চ্যালেঞ্জটা কী দেয় দেখি…’ বলতে বলতে দুর্গের ভেতর পা ফেললো অ্যারিক। তাকে অনুসরণ করলো বাকিরা।

-ধন্যবাদ, তোমরা দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জটাও জয়ী হয়েছো। এবার তৃতীয় এবং শেষ চ্যালেঞ্জ?’ অদৃশ্য কণ্ঠে শোনা গেল।
-শেষ চ্যালেঞ্জ!’ হাসি ফুটলো ওদের মুখে।
-হুমম, শেষ চ্যালেঞ্জ। আসলে চ্যালেঞ্জ না, বলতে পারো অনুরোধ।
-অনুরোধ!’ ভ্রু কুঁচকে বিড়বিড় করলো হেনা।
-অনুরোধটি করার আগে জানাতে চাই, কেন তোমাদেরকে প্রথম চ্যালেঞ্জটি দেয়া হয়েছে। প্রথম চ্যালেঞ্জটি এইজন্য দেয়া হয়েছে, যাতে তোমরা আমাদের কষ্টটা বুঝতে পারো। প্রতিটা রাত আমাদের এভাবেই কান্না করে পার হয়। আমরা মুক্তি চাই। তোমাদের সাহায্য দরকার।
-কীভাবে আমরা সাহায্য করতে পারি?’ প্রশ্ন করলো আলভিন।
-যাওয়ার সময় এই দুর্গ জ্বালিয়ে দিতে হবে। এই অভিশপ্ত অধ্যায়টা যাতে ইতিহাসে আর চর্চা না হয়।
-কিন্তু আমরা কীভাবে সেটা করতে পারি কারও অনুমতি ছাড়া? তদুপরি আমরা এখানকার কেউ না।
-কেউ জানবে না। এদিকে লোকের সমাগম হয় না। তাছাড়া এই দুর্গ পুড়ে গেলে কেউ মাথাও ঘামাবে না।
-বেশ! আমরা রাজি।
-আমরাও তোমাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। চায়লেই এখন বইটা তোমরা নিতে পারো।’
আলভিন এগিয়ে গিয়ে বইটা এবার সহজেই তুলে নিলো। মৃদু হাসলো সে বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে। তারপর দুর্গের বাইরে এলো ওরা।

দুর্গটাকে পুড়িয়ে দেয়ার জন্য ওরা রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করলো। সন্ধ্যা পেরিয়ে যখন চারপাশটা অন্ধকার ঘিরে ফেললো, তখন ওরা উডচেস্টার হিল দুর্গে আগুন জ্বালিয়ে দিলো। ধীরে ধীরে আগুন ছড়িয়ে পড়তে লাগলো পুরো দুর্গে। বেশিক্ষণ লাগলো না দাউদাউ করে আগুন জ্বলতে। আলভিনরা গাড়ির কাছে চলে এলো। গাড়িতে বসেই আগুনের শিখা দেখতে পেল ওরা। ইতোমধ্যে আলভিন বইটা পড়ে শেষ করেছে। ওরা এখন যাবে গার্ডেন অব হ্যাভেন সমাধিস্থলে। ওখানে রানি ডায়ানার জীবন্ত সমাধিটা একবার দেখবে। গাড়ি স্টার্ট দিলো আলভিন।

একটা লোকের কাছেই গার্ডেন অব হ্যাভেনের ঠিকানা পেলো ওরা। রাত দশটা পেরিয়ে গেছে ওখানে আসতে আসতে। সবাই যখন ওরা ভেতরে ঢুকলো কেমন যেন একটা ভয় ভয় কাজ করা শুরু করলো পুরো শরীরে। প্রত্যেকটা সমাধিতে নাম ফলক ছিল। কিন্তু নাম পড়ে রানি ডায়ানার সমাধিটা খুঁজে বের করার প্রয়োজন পড়লো না। সহজেই খুঁজে বের করলো আলভিন। রানি ডায়ানার সমাধির দিকে তাকালো ওরা।
-এই সমাধিটাই স্বপ্নে আমি দেখেছি। এই সমাধি থেকেই রানি ডায়ানা আমাকে স্বপ্নে এসে ডাকতো।’ বলেই আশেপাশের সামাধিগুলো লক্ষ করলো আলভিন। আরও অনেকগুলো সমাধি চারপাশে। সবাই হয়তো জীবনের শেষ নিশ্বাসটা ত্যাগ করার সুযোগ পেয়েছিল পৃথিবীতে। একমাত্র রানি ডায়ানাই তার শেষ নিশ্বাসটা এই সমাধির ভেতর ছেড়েছে। কেমন যেন মায়া হতে লাগলো রানি ডায়ানার প্রতি। চেনে না, জানে না সে রানি ডায়ানাকে, তবুও বইটা পড়ার পর কেমন যেন আপন মনে হচ্ছে এই সমাধিতে শুয়ে থাকা মহিলাটিকে।
-আলভিন…’ ডাক দিলো লিয়া। লিয়ার দিকে তাকালো আলভিন। লিয়া ইশারায় সমাধির দিকে দেখিয়ে বললো,
-কেমন যেন একটু ফাঁক হয়ে গেছে না সমাধিটা?’
লিয়ার কথা শুনে সবাই ভালো করে খেয়াল করলো। হুমম, একটু করে ফাঁক হয়ে গেছে। একটু আগেও এই ফাঁকটা ছিল না সমাধির উপর। হয়তো রানি ডায়ানা ফিরে এসেছে। হঠাৎ চোখ গেল ওদের সমাধির প্রবেশপথে। একটা মহিলা বের হয়ে গেছে প্রবেশপথ দিয়ে। চমকে ওঠলো ওরা। দৌড়ে গেল ওরা ওদিকে। কিন্তু ল্যাম্পপোস্টের আলোতে ওরা কাউকে দেখতে পেল না।
-কোথায় উধাও হয়ে গেল হঠাৎ মহিলাটি?’ প্রশ্ন করলো লিয়া।
-হয়তো সেনাপতি পিটারের সাথে মিলতে গেছে। উনি রানি ডায়ানা ছিল হয়তো।’ জবাব দিলো অ্যারিক।
-কিন্তু, সেনাপতি পিটারের ফিরে আসার তো কোনো কিছুই দেখলাম না।’ মন্তব্য করলো হেনা।
-রানি ডায়ানা যেহেতু ফিরে এসেছে, নিশ্চয়ই সেনাপতি পিটারও এসেছে। দুজনের আবার মিলন হবে। আমাদের কাজও শেষ। এবার আমাদের ফিরে যাওয়ার পালা।’ বললো আলভিন।

রাত বাড়তে লাগলো। ওরা ফিরে যাচ্ছে নিজ গন্তব্যে। আলভিন গাড়ি চালাচ্ছে। তার পাশেই লিয়া। পেছনে অ্যারিক এবং হেনা। বইটা হেনার হাতে। লেখাগুলোর উপর হাত বুলাচ্ছে ও। সেনাপতি পিটার আর রানি ডায়ানার রক্তে লেখা হয়েছে এই বইটা। কেমন যেন একটা আবেগ কাজ করছে লেখাগুলোর উপর হাত বুলানোর সময়। হঠাৎ আলভিন গাড়ি থামালে, সম্বিত ফিরে পেল হেনা।
-কী হলো? গাড়ি থামালি কেন?’ প্রশ্ন করলো অ্যারিক।
-একটা দম্পতি লিফট চায়ছে। হয়তো এতো রাতে ওরা বিপদে পড়েছে। ওদেরকে সাহায্য করা দরকার।’
গাড়ি থামতেই দম্পতিটা এগিয়ে এলো। অ্যারিক ব্যাকডোর খুলে দিলো। ওরা গিয়ে অ্যারিকদের পেছনের সিটে বসতে বসতে কৃতজ্ঞতা জানালো। তারপর চুপচাপ বসে থাকলো। আলভিন গাড়ি ছেড়ে দিলো। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে ছুটে চলেছে গাড়ি। চলতে চলতে ওরা দেখতে পেলো হ্যাম্পটন কোর্ট প্রাসাদটি। সবার নজর এক মুহূর্তের জন্য ওদিকে গেল। গাড়ি থেকেই ওরা দেখতে পেলো প্রাসাদের ছাদে ছায়ার মতো কে যেন হাঁটাহাঁটি করছে। দেখেই চোখ সরিয়ে নিলো ওরা।
-চল, আজ রাতটা এখানে কাটায়, এই প্রাসাদে।’ মজা করে বললো অ্যারিক। সে থামতেই হেনা বলে ওঠলো,
-পাগল হয়েছিস? ভুলেও আর হ্যাম্পটন কোর্টের নাম নেবো না।
-আপনারা কি জানেন এই প্রাসাদটি কার?’ এইবার পেছন থেকে হঠাৎ বলে ওঠলো দম্পতির কর্তা।
-নাহ, কার প্রাসাদ?’ আগ্রহ দেখালো অ্যারিক।
-এই প্রাসাদটি ছিল রাজা অষ্টম হেনরির। তিনি এই প্রাসাদে অনেক মহিলাদের শাস্তি দেন। এমনকি নিজের স্ত্রী অ্যানি বোলকেও এই প্রাসাদে শিরশ্ছেদ করেছিলেন। ঐ যে ছাদে হাঁটাহাঁটি করতে দেখেছেন, ওটা রানি অ্যানি বোলের আত্মা। তাঁকে মাঝেমাঝে প্রাসাদে নাকি দেখা যায়।
-তাহলে ঐদিন যাকে দেখে আমি ভয় পেয়েছিলাম, ওটা নিশ্চয়ই রানি অ্যানি বোল ছিল।’ বলে ওঠলো হেনা।
-আচ্ছা, আচ্ছা… আমাদের এই জায়গাটাতে নামিয়ে দিন।’
পেছন থেকে এবার দম্পতিটা একসাথে বলে ওঠলো।
-এই নির্জন জায়গায়? আশেপাশে তো কোনো লোকালয়ও নেই।’ অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো আলভিন।
-দিন, আমাদের এইখানেই নামিয়ে দিন।’ পুনরায় বললো কর্তা। গাড়ি থামালো আলভিন। দম্পতিটা নেমে গেল। তারপর আলভিনের দিকে তাকিয়ে হাতজোড় করে বললো,
-আপনাদের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আপনাদের উপকার কখনও ভুলবো না। সবসময় মনে করবো। বলেই দম্পতিটা চলে যেতে লাগলো ওদের উল্টোদিকে। আলভিন অবাক হলো, কী এমন উপকার করলো ওরা, যার জন্য দম্পতিটা এতো কৃতজ্ঞ। কী যেন ভাবতে লাগলো আলভিন। ওদের কণ্ঠটা কানে বাজতে লাগলো তার। কেমন যেন পরিচিত, আগেও শুনেছে সে। হঠাৎ মনে পড়লো, স্বপ্নে সে শুনেছিল এই কণ্ঠগুলো।
-কী রে, কী ভাবছিস? গাড়ি ছাড়ছিস না কেন?’ অ্যারিক প্রশ্ন করলো। দ্রুতবেগে ঘাড় ঘুরালো আলভিন। দম্পতিটাকে কোথাও দেখতে পেল না। গাড়ি থেকে নেমে সে পেছনে ছুটলো কিছুদূর। ওর পেছন পেছন অ্যারিকরাও ছুটে এলো।
-হঠাৎ কী হলো তোর? আর দম্পতিটাও কোথায় হারিয়ে গেল?’ প্রশ্ন করলো অ্যারিক।
-ওরা সাধারণ কেউ ছিল না। ওরা সেনাপতি পিটার আর রানি ডায়ানা ছিল।
-কী বলছিস?’ চমকে ওঠলো লিয়া আর হেনা।
-হ্যাঁ, ওদের কণ্ঠ আমি শুনেছি স্বপ্নে।
-কিন্তু ওরা তো হারিয়ে গেল। আর ওরা অ্যানি বোলের কথা-ই বা জানলো কী করে? ওরা তো অ্যানি বোলের আগেই মারা গিয়েছিল।
-কী জানি। সব প্যারানরমাল ব্যাপার-স্যাপার।’ -বাদ দে, চল এখন।’ আলভিনের পিঠে আলতো করে চাপড় দিলো অ্যারিক। গাড়িতে ফিরে এলো ওরা। গাড়ি আবার স্টার্ট দিলো আলভিন, কিন্তু কিছুতেই সেনাপতি পিটার আর রানি ডায়ানার কথা মাথা থেকে গেল না তার। ওদের কথা ভাবতে ভাবতেই গাড়ি চালাচ্ছে সে হেডলাইটের আলোতে। গাড়ির ভেতরের লাইটটা অফ করে দিয়েছে। হঠাৎ লুকিং মিররে চোখ গেল ওর। দেখলো, আয়নায় ব্লাডি মেরি। মেরি হাস্যোজ্জ্বল মুখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। সেই মুহূর্তে পেছন থেকে আলভিনের নাম ধরে জোরে চিৎকার করে ওঠলো হেনা,
-আলভিন…’
আলভিন নিজেকে সামলাতে পারলো না আর। গাড়িটা গিয়ে ধাক্কা খেল এক গাছের সাথে। ভয়ানক এক শব্দ করে কয়েকমুহূর্ত শান্ত হয়ে রইলো পুরো পরিবেশটা। আলভিনকে দেখা গেল রক্তাক্ত হয়ে পড়ে আছে ড্রাইভিং সিটে। কাচ ভেঙে ওর চোখে মুখে আঘাত করেছে। লিয়াও কিছুটা আঘাত পেয়েছে। অ্যারিক আর হেনার কিছুই হয়নি। কিন্তু আলভিন অজ্ঞান হয়ে পড়েছে। কয়েকমুহূর্ত হিতাহিত জ্ঞান ছিল না কারও। তারপর হঠাৎ একসাথে ওরা চিৎকার করে ডাক দিলো আলভিনকে। আলভিন কোনো সাড়া দিলো না। তাড়াতাড়ি তাকে ধরে ওরা পেছনের সিটে নিয়ে গিয়ে শুয়ে দিলো। অ্যারিক ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি স্টার্ট দিলো এবার। গুগল ম্যাপে দেখে নিয়ে কাছাকাছি হাসপাতালের দিকে গাড়ি ছুটালো ও।

আইসিওতে ভর্তি করা হলো আলভিনকে। বাইরে অপেক্ষা করছে অ্যারিক, লিয়া আর হেনা। হেনার উপর কিছুটা বিরক্ত অ্যারিক আর লিয়া।
-তুই এভাবে চিৎকার করে না ওঠলে অ্যাক্সিডেন্টটা হতো না।’ বিরক্তি প্রকাশ করলো অ্যারিক।
হেনা কাঁদতে থাকে। কাঁদতে কাঁদতে ও বলে,
-আলভিন বাঁচবে না। ও আমাদের ছেড়ে চলে যাবে।’
-মানে? তুই কী করে জানলি?’ প্রশ্ন করলো লিয়া।
-কারণ, বইয়ের উল্টোদিকে একটা লেখা পড়েছি আমি।
-কী লেখা?’ ভয়ে ভয়ে প্রশ্ন করে লিয়া। অ্যারিকের চেহারায়ও ভয় ফুটে ওঠে।
-লেখাটা ছিল এইরকম, ‘বইটা যে পড়ে শেষ করবে, তার মৃত্যু হবে।’
-হোয়াট!’ চমকে ওঠলো অ্যারিক আর হেনা। বইটা হাতে নিয়ে উল্টিয়ে দেখলো অ্যারিক। তারপর বললো,
-কই? কোনো লেখা-ই তো নেই এখানে।’
-দাঁড়া, এদিকে আয়…’ বইটা নিয়ে বাইরে গেল হেনা। তার পিছুপিছু গেল অ্যারিক আর লিয়া। বাইরে অন্ধকারে এসে থামলো হেনা। তারপর বইয়ের উল্টোদিকটা দেখালো ওদের। তখন ওরা দেখলো, একটা লেখা ধীরে ধীরে উজ্জ্বল হয়ে ওঠছে। যখনই লেখাটা স্পষ্ট হলো, সাথে সাথে দৃষ্টি সরিয়ে ফেললো ওরা।

কয়েকমুহূর্তের জন্য চোখ খুললো অালভিন। দেখলো, সে অপারেশন কক্ষে শুয়ে আছে। আশেপাশে কেউ নেই। একটুপর ভেতরে একটা দম্পতি এলো, ওদেরকে দেখেই আলভিন চিনতে পারলো। পিটার আর ডায়ানা। পিটারের গায়ে এবার যুদ্ধ পোশাক, ডায়ানার গায়ে রানির পোশাক। আলভিন ওদের সাথে কথা বলতে গিয়ে দেখলো, তার মুখ থেকে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। পিটার আর ডায়ানা তার শিয়রে এসে দাঁড়িয়েছে। দুজনের চোখে অশ্রু দেখা গেল। পিটার বলে ওঠলো,
-যদি এরকম হবে জানতাম, তবে কখনও বইটা লিখতে বলতাম না পাদরিকে। কখনও তোমার জীবনের বিনিময়ে আমরা ফিরে আসতে চাইতাম না। বইটা যে পড়ে শেষ করবে, তার মৃত্যু হবে, সত্যি আমরা জানতাম না এটা।
-আমাদের তুমি ক্ষমা করো।’ হাত জোড় করলো ডায়ানা। আলভিনের ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে ওঠেছে। তার জীবনের বিনিময়ে যদি একটি অপূর্ণ ভালোবাসা পূর্ণতা পায়, তবে সে হাসতে হাসতে মরতে রাজি সে। ভালোবাসাগুলোর জয় হোক তবুও। পিটার আর ডায়ানা যেভাবে এসেছে ওভাবে চলে যেতে লাগলো। চারপাশের বাতাস ভারি হয়ে আসছে। ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ হয়ে গেল আলভিনের।

যেদিন আলভিনের সমাধি হলো, সেদিন বইটাও পুড়িয়ে দেয়া হয়। আর কেউ যাতে পড়তে না পারে বইটা। বইটা পুড়ে পুড়ে ধোঁয়াগুলো বাতাসে মিশে যেতে লাগলো। পাশেই আলভিনের সমাধিতে কান্নায় ভেঙে পড়লো তার বন্ধুরা।

[[সমাপ্ত]]