#ফুলপিসি
#লেখা_Bobita_Ray
পর্ব- ০৩
ফুল পিসির উদ্ভট সাজপোশাক ঋষির একটুও পছন্দ হলো না। শাড়ি পরতে পারতো। তা না একে তো দেখতে গুলুমুলু। তার উপর প্লাজো আর কানিজ পরেছে। এটা তাও মানা যায়। কিন্তু মাথায় ইয়াবড় একটা প্লাস্টিকের লাল টুকটুকে ফুল পরেছে। একা একা লিপস্টিক পরতে পারে না। ঠোঁটের বাইরে দিয়ে ভুলে লিপস্টিকের রেখা টেনেছে। ঋষি বলল,
-‘এমন উজবুকের মতো সেজেছো কেন?
-‘চুপ কর বেয়াদব। এটা এখনকার ফ্যাশন। ও..তুই বুঝবি না। এত কথা না বলে যেতে হলে চল। না হলে আমি একাই যাব।
ঋষি রোদ-চশমাটা শার্টের কোণায় মুছে নিয়ে চোখে পরে নিল। বলল,
-‘আচ্ছা চলো।
ঋষির বাইকের পেছনে ফুলপিসি চেপে বসতেই বাইক স্টার্ট দিল ঋষি। পিসি মৃদু ধমকে উঠল।
-‘আরেহ…আস্তে চালা? আমি ভাল করে বসে নেই।
ফুলপিসিকে নিয়ে সোজা নিউমার্কেটের সামনে চলে গেল। পৃথিলা আগেই এসেছে। ওদের দেখে এগিয়ে এলো। পৃথিলা কুশলাদি করে মিষ্টির প্যাকেট পিসির হাতে ধরিয়ে দিতেই ঋষি অবাক হয়ে বলল,
-‘এটা কী?
পিসি খুশিতে গদগদ হয়ে বলল,
-‘মিষ্টি।
ঋষি দুজনের ভাব জমানো দেখে ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে দিল। পিসি বলল,
-‘চলো পৃথিলা? তোমাকে কিছু কিনে দেই?
-‘না..না। আমার কিছু লাগবে না পিসি।
পিসি, পৃথিলাকে বগলদাবা করে মার্কেটের ভেতরে ঢুকলো। অগত্যা ঋষি ওদের পেছন পেছন হেঁটে গেল।
অনেক বেছে বেছে পৃথিলার জন্য একটা কফি কালারের হাফ সিল্কের শাড়ি পছন্দ করল পিসি। পৃথিলার গায়ে মেলে ধরে বলল,
-‘বাহ..এই শাড়িতে তো তোমায় দারুণ লাগছে।
দোকানীকে বলল,
-‘এটার দাম কত ভাই?
-‘পঁচিশশো দিলেই হবে।
-‘আরেহ..আমরা কী নতুন কেনাকাটা করি না কী? নেওয়ার দাম বলেন?
দোকানী হালকা হেসে বলল,
-‘আপনি বলেন?
পিসি চট করে বলল,
-‘পাঁচশো টাকায় দিবেন?
ঋষি দাম শুনে লজ্জায়, মান-সম্মান হারানোর ভয়ে আস্তে করে কেটে পরল। মাথা নাড়িয়ে বিড়বিড় করে বলল,
-‘আমি এদের চিনি না…আমি এদের চিনি না।
একপা, দু’পায়ে মার্কেটের বাইরে গিয়ে দাঁড়াল।
দোকানী বলল,
-‘এত কমে কিনতেও পারিনি ম্যাডাম।
-‘আরে রাখেন আপনার ভাঁওতাবাজি। একদাম ছয়শো টাকা দিবেন?
-‘না ম্যাডাম।
-‘আচ্ছা আপনার কথাও থাক। আমার কথাও থাক। শেষ দাম আটশো টাকায় দিবেন?
-‘না ম্যাডাম।
-‘এই পৃথিলা চলো? এর থেকেও সুন্দর শাড়ি কিনে দেব তোমাকে।
-‘ম্যাডাম দাঁড়ান? আর কিছু বাড়িয়ে বলেন?
-‘আর এক পয়সাও না।
-‘আচ্ছা এক হাজার টাকা দেন? শুধু আযান দিয়েছে দেখে কেনা দামেই ছেড়ে দিলাম।
-‘নয়শো টাকা দিমু?
-‘আর কিছু বাড়ান ম্যাডাম?
পিসি নিজের ব্যাগটা দোকানীকে ভাল করে দেখাল। বলল,
-‘নয়শো ত্রিশ টাকাই আছে আমার কাছে। ত্রিশ টাকা রিকশা ভাড়া। আপনাকে ত্রিশ টাকা দিয়ে দিলে আমরা কী পায়ে হেঁটে যামু?
-‘আচ্ছা.. আচ্ছা নিয়ে যান।
শাড়ির প্যাকেট হাতে নিয়ে বিল মিটিয়ে পিসি নীচু কণ্ঠে পৃথিলাকে ফিসফিস করে বলল,
-‘আমরা কী ঠকে গেলাম পৃথিলা?
-‘কী জানি! বুঝতেছি না পিসি।
-‘ইশ..মনে হয় ঠকেই গেলাম। আটশো টাকা হলেই দিয়ে দিতো। ঋষি কোথায়?
পৃথিলা আশেপাশে একনজর চোখ বুলিয়ে, আঙুল সামনের দিকে তাক করে বলল,
-‘ওই তো ঋষি।
ওরা তিনজন ফুটপাতে একটা চটপটির স্টলে গিয়ে বসল। টেবিলে জলের বোতল রাখা ছিল। পিসি বোতলের ছিপি খুলে অর্ধেক বোতল জল গলায় ঢাকল। চার প্লেট চটপটি ও তিন প্লেট ফুসকা অর্ডার দিয়ে তিনজন আড্ডা দিতে লাগল। খাবারের ট্রে ওদের সামনে নামিয়ে দিতেই পিসি গপাগপ দুই প্লেট চটপটি একাই খেয়ে ফেলল। পৃথিলা নিজের খাওয়া ফেলে পিসির খাওয়ার দিকে মায়া মায়া চোখ তুলে তাকিয়ে রইল। মনে হয় কত বছর অভুক্ত ছিল মানুষটা। আহারে.. ঋষি নীচু কণ্ঠে বলল,
-‘আস্তে খাও পিসি?
-‘আস্তে খাইলে আমার পেট ভরে না রে ঋষি। খিদে কমার বদলে আরও বেড়ে যায়।
খেয়েদেয়ে তিনজন উঠে পরল। ঋষি বলল,
-‘বিল কত এসেছে মামু?
-‘জলের দামসহ ৪৭৫ টাকা এসেছে।
পিসি বড় বড় চোখ করে বলল,
-‘মানে? জলটাও কী কিনে খাওয়া লাগবে না কী?
-‘হ্যাঁ ম্যাডাম।
-‘আরেহ.. আগে কইবেন না? তাহলে আপনাদের জল খাইতাম না আমি। একটা চায়ের দোকানে গিয়ে জল চাইলেও তো ফ্রীতে এক গ্লাস জল দেয়। আর কী না কী দোকান। জলও কিনে খাইতে বলেন? আমাদের বাসার টাঙ্কি ভরা জল আছে। আগে জানলে, এক বোতল জল সাথে করেই নিয়ে আসতাম।
ঋষি শুকনো ঢোক চিপে বলল,
-‘পিসি চুপ করো? প্লিজ আপনারা আমার পিসির কথায় কিছু মনে করবেন না। আসলে অতিরিক্ত গরমে আমার পিসির মাথার তাঁর ছিঁড়ে গেছে।
ঋষি বিল মিটিয়ে পিসিকে আর কথা বাড়াতে না দিয়ে, পিসির হাত টেনে ধরে নিয়ে গেল।
তারপর পিসি আর পৃথিলাকে রিকশায় তুলে দিয়ে নিজে বাইক টান দিয়ে চলে গেল। পিসি বলল,
-‘এই পৃথিলা আইসক্রিম খাবা?
-‘একটু আগে আপনি ব্যাগ দেখিয়ে দোকানীকে না বললেন আপনার কাছে আর টাকা নেই।
পিসি একচোখ টিপে বলল,
-‘সব টাকা তো ব্যাগে রাখি না।
পৃথিলা অবাক হয়ে বলল,
-‘তাহলে কোথায় রেখেছেন?
-‘দেখবা?
পিসি জামার ভেতর দিয়ে হাত ঢুকানোর আগেই পৃথিলা লজ্জা পেল। বলল,
-‘থাক থাক। আমার কাছে টাকা আছে।
দুজন আইসক্রিম খেতে খেতে সন্ধ্যা সাতটার দিকে বাসায় ফিরল।
চোখের নিমিষেই যেন একমাস কেটে গেল। বাড়িতে ঋষি – পৃথিলার বিয়ের খুব তোরজোর চলছে। সবাই খুব ব্যস্ত সময় পার করছে। বিয়েতে একে একে সব আত্মীয়-স্বজন আসতে শুরু করেছে। ঋষির দুটো মাসি ও একটা মামী। দুটো দিনের জন্য বেড়াতে এসেও তারা সারাক্ষণ ফুল পিসির নামে ঋষির মায়ের কান ভারী করে। মা অবশ্য পাত্তা দেয় না। তবে ঋষির প্রচুর রাগ হয়। এই তো হলুদের অনুষ্ঠানে শিখামাসি, ফুল পিসির মুখের উপরে বলেই দিল।
-‘আপনি একটু দূরে দূরে থাকেন তো দিদি। সবকিছু ছুঁয়ে দিচ্ছেন কেন? বাঁজা মহিলাদের শুভ কাজে থাকতে হয় না।
ফুলপিসির মুখটা শুকিয়ে গেল। মলিন হেসে সরে যেতে লাগল। ঋষি, পিসির হাতটা শক্ত করে ধরে ফেলল। রাগী কণ্ঠে বলল,
-‘তোমাকে এতবড় সাহস কে দিয়েছে মাসি? বিয়ে খেতে এসেছো। বিয়েতে এনজয় করো। আমার পিসির ব্যপারে খবরদার আর একটাও কটুকথা বলবা না। আমার পিসি আমার বিয়ের সবকিছুতে থাকবে এবং সবসময় আমার সাথে সাথে থাকবে। আর এখুনি ক্ষমা চাও আমার পিসির কাছে? তা না হলে আমি কিন্তু ভুলে যাব! তুমি আমার মায়ের বোন।
-‘ঋষি..এতবড় কথাটা তুই আমাকে বলতে পারলি?
-‘এখন কষ্ট পাচ্ছো কেন? একজনকে আঘাত দিয়ে কথা বলতে ভাল লাগে। শুনতে খারাপ লাগবে কেন?
ফুলপিসি বলল,
-‘ঋষি চুপ কর তো।
ঋষি ফুল পিসির হাত ধরে ওখান থেকে সরে গেল। পিসির দুইহাত আঁকড়ে ধরে বলল,
-‘যে যাই বলুক। তুমি কিন্তু আমাকে ছেড়ে কোথাও যাবা না পিসি। কথা দাও?
-‘তোর অমঙ্গল হবে তো।
-‘মায়েদের জন্য কখনো সন্তানের বুঝি অমঙ্গল হয়? আমি এত কথা বুঝি না পিসি। তুমি যদি আমার চোখের আড়াল হও আমি কিন্তু বিয়েই করব না।
পিসি ঋষির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
-‘পাগল ছেলে।
-‘এবার চলো তো? খিদেয় পেট চু চু করতেছে।
ঋষি পিসি, পিসেমশাই, বন্ধু বান্ধব নিয়ে এক টেবিলে খেতে বসল।
নিভা রানীর পাশে দাঁড়িয়ে শিখা রাগে চিড়চিড় করতে করতে বলল,
-‘ওই সঙটা নিশ্চয়ই ঋষিকে জাদুটোনা করেছে দিদি। না হলে এতবড় ছেলে সর্বক্ষণ পিসির ন্যাওটা হয়ে থাকে না কী?
-‘শিখা চুপ কর। ঋষিটা ছোটবেলা থেকেই ফুলির কাছে মানুষ হয়েছে। সম্পর্কে পিসি-ভাতিজা হলেও ওদের সম্পর্ক অনেকটা ভাইবোনের মতো।
-‘আমাদের তো তোর ছেলে চোখ পেতে দেখতেই পারে না। যত আদিখ্যেতা শুধু তার ফুলপিসিকে নিয়ে।
নিভার বিরক্ত লাগল। তার এই বোনটা প্রচণ্ড হিংসুটে ও ঝগড়ুটে।
ভরপেট খেয়েদেয়ে ঋষিরা গভীর রাতে ছাদে বন্ধু বান্ধব মিলে আড্ডা দিচ্ছিল। ব্যাচেলর জীবনের শেষদিন আজ। সেই উপলক্ষে বন্ধুরা ঋষিকে চেপে ধরেছে। একটু ওই আর কী! মদ খাওয়াতে হবে। ঋষি ওদের আবদার পূরণ করেছে। কিন্তু নিজে খেতে চাইল না। রাজ বলল,
-‘এক প্যাক খাও বন্ধু? পরে আর ইচ্ছে করলেও খাইতে পারবি না। প্যারা কারে বলে, বিয়ের পর বুঝবি।
পিসি ঋষিকে খুঁজতে খুঁজতে ছাদে উঠে এলো। বলল,
-‘এই তোরা এখানে সব কয়টা কী করিস? আরেহ বাহ.. সেভেনাপ খাচ্ছিস? এ্যাঁই আমিও খাব?
বলতে বলতেই ঋষি বাঁধা দেওয়ার আগেই পিসি একগ্লাস তরল পানীয় গলায় ঢাললো। কাশতে কাশতে অবস্থা খারাপ হয়ে গেল। এত তিতো কেন? গলাটা পুড়ে যাচ্ছে। চোখে ঝাপসা দেখছে ফুলপিসি। মাথা ভনভন করে ঘুরছে। ঋষি মাথায় হাত দিয়ে বলল,
-‘সর্বনাশ..
ততক্ষণে পিসির নেশা চড়ে গেছে। ঢুলতে ঢুলতে ছাদের মাঝখানে বসল। এলোমেলো কণ্ঠে বলল,
-‘তোদের পিসেমশাই একদম নিরামিষ। আমাকে একটুও ভালোবাসে না। ঘুমের ঘোরে খালি নাক ডাকে। ঋষির মাসিগুলাও একেকটা হাড়ে বজ্জাত। শালী গুলো আসেই আমার খুঁত ধরতে। আমি কী ইচ্ছে করে বন্ধ্যা হইছি? তোরাই বল? মনে চায় সব কয়টারে ছাদ থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেই। ঋষির হবুবউটা অনেক ভাল। আমাকে খুব সম্মান করে। কিন্তু ঋষির চালচলন সুবিধার না। ও যে বিয়ে করেই বউয়ের ন্যাওটা হয়ে যাবে। ওরে দেখলেই বোঝা যায়। রাত জেগে দুজনে মিলে ১৮+কথাবার্তা বলে। আমি হাতেনাতে ধরছি একদিন। তাছাড়া ঋষির বউ যদি ঋষিরে বলে, তুমি ঘরে হাগু করো। ও তাই হাগবে। তোরা বিশ্বাস করোস আমার কথা? পুরুষ মানুষের এত মিনমিন স্বভাব ভাল না৷ ঋষি তো..
আর কিছু বলার আগেই ঋষি পিসির মুখ চেপে ধরে পিসিকে জোর করে উঠিয়ে নিয়ে গেল। কী না কী বলে দিবে। শেষে বন্ধুদের সামনে মান-সম্মান থাকবে না।
পিসিকে ঘরে দিয়ে পিসেমশাইকে ঋষি বলল,
-‘আপনার বউ ভুল করে মদ খেয়ে ফেলছে। নেশা চড়ে গেছে। আমি লেবুর শরবত নিয়ে আসছি।
ঋষি চলে গেল। ভদ্রলোক কিছু বুঝে ওঠার আগেই পিসি অনিলবাবুকে জাপ্টে ধরল। চোখ ডলে নেশা জড়ানো কণ্ঠে বলল,
-‘আমার জানু…আমার ভালোবাসা.. তুমি দুইজন হলে কবে থেকে? দেখি লুঙ্গিটা খুলো তো ময়না? তোমার ছোটভাইও দুটো হয়ে গেছে না কী? আমি একবার চেক করে দেখতে চাই? ছোটভাই দুটো হয়ে গেলে তো সর্বনাশ হয়ে যাবে। হায় ঈশ্বর আমি সবকিছু দুটো দুটো দেখতেছি কেন?
(চলবে)