ফুলপিসি পর্ব-০৭

0
319

#ফুলপিসি
#লেখা_Bobita_Ray
পর্ব- ০৭

-‘এই তোমরা কী করো?
ঋষি ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল।
ফুলপিসি ভেংচি কেটে বলল,
-‘তুই তো বেকার। তাই তোর বউকে আমি টিকটক করা শিখাচ্ছি। এতে যদি দুই পয়সা রোজগার হয়।
ঋষি ফোনটা ফুলপিসির হাত থেকে কেড়ে নিল। টিকটক একাউন্ট ডিলিট করে দিয়ে বলল,
-‘পারলে ভাল কিছু শিখাও। আমার বাপের অঢেল আছে। আমার বউকে টিকটক করে খেতে হবে না।
-‘তোর বাপের আছে। তোর তো নাই গাধা। ধর আজ যদি দাদা আরেকটা বিয়ে করে। তাহলে তোকে কী আগের মতো হাত খরচ দিবে? আর না এই সম্পত্তির ভাগ তুই একা পাবি।
-‘কেন তোমার ভাইয়ের বুড়ো বয়সে আরেকটা বিয়ে করার শখ জাগছে না কী?
-‘জাগলেও পারে। পুরুষ মানুষ তো। বলা যায় না।
ঋষি, পৃথিলার হাত টেনে ধরে বলল,
-‘চলো তো। এই কুটনি মহিলার কাছে তোমাকে থাকতে হবে না।
ফুলপিসি পৃথিলার আরেকটা হাত আঁকড়ে ধরে বলল,
-‘তোর চৌদ্দ গুষ্টি কুটনি বেয়াদব। যা ভাগ?
-‘আমার বউকে নিয়ে তবেই যাব।
-‘তোর বউ তো এখন আমি কিছুতেই দেব না রে ঋষি।
-‘পিসি ভাল হচ্ছে না কিন্তু?
-‘কেন.. এই দিনের বেলা তোর বউকে নিয়ে শুয়ে পরার প্লান করছিস না কী?
-‘ধেৎ..
ঋষি লজ্জা পেয়ে একাই চলে গেল। রাগে শরীর চিড়বিড় করছে।
পৃথিলা শব্দ করে হেসে দিল। বলল,
-‘তুমি পারোও বটে।
ফুলপিসিও পৃথিলার চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে মুখ টিপে হেসে দিল। ঋষিকে রাগিয়ে দিতে এত কেন ভাল লাগে। কে জানে!

পৃথিলা ইতঃস্তত করে বলল,
-‘তুমি ভাল গাইনী ডাক্তার দেখিয়েছিলে? এখন কিন্তু দেশে উন্নত চিকিৎসা বের হয়েছে।
ফুলপিসি আনমনা হয়ে গেল। বলল,
-‘তোকে একটা গল্প বলি! কাউকে বলিস না পৃথিলা।
পৃথিলা ফুলপিসির চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
-‘বলো? কাউকে বলব না। কথা দিলাম।
ফুলপিসি বুকচিরে গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে শুরু করল।
-‘যৌবনে অনিলবাবুর একটা মেয়ের সাথে উত্তাল প্রেম ছিল। পাশাপাশি বাড়ি হওয়ায় মেয়েটা অনিলবাবুর কাছে রোজ রাতে পড়তে আসতো। ওদের সম্পর্ক অনেকদূর গড়িয়ে গিয়েছিল। একসময় মেয়েটার পেটে অনিলবাবুর বাচ্চা এলো। কিন্তু অনিলবাবু কিছুতেই মেয়েটাকে বিয়ে করতে রাজি হলো না। মেয়েটা পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিল। গর্ভবতী অবস্থায় জোর করে অনিলবাবুর বাড়িতে এসে উঠেছিল। কিন্তু অনিলবাবুর মা অকথ্য ভাষায় গালাগালি করে, শাপশাপান্ত করে মেয়েটাকে তাড়িয়ে দিল। এদিকে অনিলবাবুকেও পড়াশোনার নাম করে ঢাকা পাঠিয়ে দিল। মেয়েটা না কী অনিলবাবুকে কঠিন অভিশাপ দিয়েছিল। বলেছিল,
-‘যে বাচ্চাকে আজ তুমি অস্বীকার করলে। একদিন এই বাচ্চার জন্যই তুমি পাগলের মতো কাঁদবে। কিন্তু জীবনেও বাচ্চার মুখ দেখবে না তুমি। তোমার বাচ্চা গর্ভে ধারণ করে, অভিশাপ দিলাম আমি। সারাজীবন নিঃসন্তান থাকবে তুমি।

কত ডাক্তার, কত কবিরাজ দেখাইছি জানিস পৃথিলা? কিছুতেই আর বাচ্চা হলো না। ডাক্তার বলেছে, আমার শরীরে কোন রোগ নেই। তবে অনিলবাবু বাবা হওয়ার ক্ষমতা হারিয়েছে সারা জীবনের জন্য। আমি চাইলে টেস্ট টিউবে বাচ্চা নিতে পারব। কিন্তু আমি রাজি হইনি। যার সাথে আমার বিয়ে হয়েছে। তার বাচ্চাই যদি গর্ভে ধারণ করতে না পারি। বিদেশিদের বাচ্চা দিয়ে আমি কী করব? আর একটা মজার ব্যপার কী জানিস? সবাই জানে আমি বন্ধ্যা৷ আমার সমস্যার জন্যই না কী বাচ্চা হবে না। যদিও এই রটনাটা আমার শাশুড়ীই নিজ দায়িত্বে ছড়িয়েছে। এরজন্য অনিলবাবু খুব অনুতপ্ত। যদিও মানুষটা জানে না। আমি তার প্রেম ঘটিত ব্যপারটা অনেক আগেই জেনে গেছি। আমিও আর বলি না। একসাথেই যখন থাকতে হবে। কী দরকার! শুধু শুধু নিজেদের মাঝে অশান্তি করে।
পৃথিলা মন খারাপ করে বলল,
-‘তোমাকে কে বলেছে?
-‘যার সাথে অনিলবাবুর প্রেম ছিল। পাশাপাশি বাড়ি তো। সেই মেয়েটাই আমাকে বলেছে।
-‘সেই মেয়েটার এখন কী অবস্থা?
-‘স্বামী-সন্তান নিয়ে সে বেশ আছে।
-‘অথচ আমি পিসেমশাইকে কত ভাল ভাবতাম পিসি। তোমাকে কত আদর করে। তুমি যা বলো তাই শুনে ও অক্ষরে অক্ষরে পালন করার চেষ্টা করে। তোমাকে মাথায় করে রাখে। একটা কাজও করতে দেয় না। তোমার ভেজা জামাকাপড় গুলোও পিসেমশাই ধুয়ে দেয়। অথচ…
-‘মানুষটা ভালোই রে পৃথিলা। যৌবনে একটা ভুলের জন্য তাকে আমি খারাপ বলতে পারি না।
-‘তুমি যখন সত্যিটা জানলে তখন চলে আসলে না কেন পিসি?
-‘ততদিনে মানুষটার বড্ড মায়ায় পরে গিয়েছিলাম রে। কী হবে সন্তান দিয়ে? যদি বুড়ো বয়সে বাপ-মাকে না দেখে, বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেয়। তখন কী করব? সৃষ্টিকর্তা যা করে হয়ত ভালোর জন্যই করে।
পৃথিলা বিষণ্ণ কণ্ঠে,
-‘তোমার মনের ভেতরে এক আকাশ পরিমাণ কষ্ট লুকিয়ে রেখে, তুমি কীভাবে এতটা হাসিখুশি থাকো পিসি?
-‘এই রে বেশি ইমোশনাল হয়ে গেলি না কী? এবার যা তো! ঋষি বোধহয় ডাকছে তোকে। এই শোন? ঋষিকে আবার বলিস না কিন্তু? ওর যে জেদ। দেখা যাবে এই বয়সে আমাকে ডিভোর্স করিয়ে দেবে। যে মাথা পাগল ছেলে আমাদের।
পৃথিলার চোখের কোণের জল মুছে নিয়ে মলিণ হাসল। তারপর ধীর পায়ে চলে গেল।

বৈশাখের শুরুতে ঋষিদের গ্রামের বাড়িতে ঐতিহ্যবাহী বায়েলের মেলা হয়। ফুলপিসি আর ঋষি সেই ছোট্ট বেলা থেকে এই মেলায় ঘুরতে যেতে খুব পছন্দ করে। মাষকলাইয়ের ডালের জিলাপির সুন্দর ঘ্রাণ নাকে এসে লাগলেই মেলার আমেজটা শতগুণ বেড়ে যায়। কিংবা নতুন পাঁচফোড়নের ঘ্রাণটা অন্যরকম এক দুনিয়ায় নিয়ে যায়। সেই মজা লাগে বায়েল দেখতে। একদল তরুণ ছেলে মুখে রঙচঙ মেখে, নেশা জাতীয় কিছু খেয়ে ভাড়ে বসে। তারপর মন্ত্রজপ করতেই গা ছাড়া দিয়ে ওঠে দাঁড়ায় সবগুলো ছেলেছোকরা। হাতে বেত নিয়ে বেশ কায়দা করে ঘুরাতে ঘুরাতে কিংবা নিজের গায়ে চাবুকের মতো বেত মারতে মারতে হেলেদুলে মেলায় বটগাছের নীচে এসে হাজির হয়। সবাই আবার আসতে পারে না। কিছু বায়েল রাস্তায়ই টাল হয়ে পরে থাকে। বায়েলের কীর্তিকপাল দেখতে বেশ লাগে। যদিও সামনে থাকলে একটু ভয় ভয়ও লাগে।
পৃথিলা কখনো এমন অদ্ভুত মেলার নাম শুনেনি। পিসির মুখে গল্প শুনে দারুণ এক্সাইটেড৷ সে বায়েল দেখতে মেলায় যাবে।
পিসি, ঋষি আর পৃথিলা তিনজন লাল, সাদা, শাড়ি, পাঞ্জাবি পরে সেজেগুজে মেলায় চলে গেল। বেশ ভীড়। মিষ্টির দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ওরা ভরপেট মাষকলাইয়ের ডালের গরম গরম সুস্বাদু জিলাপি খেলো।

এমন সময় হুড়োহুড়ির শব্দে ওরা হকচকিয়ে উঠল। বায়েল আসছে..বায়েল আসছে..বলে বাচ্চাগুলো চিৎকার করছে। কেউ কেউ ভয়ে সামনে থেকে সরে যাচ্ছে। ফুল পিসি রাস্তার কিনারায় দাঁড়িয়ে ছিল। বায়েলকে হেয়ো হেয়ো..বলে তুমুল বেগে ছুটে আসতে দেখে, ভয় পেয়ে দৌঁড় দিতে গিয়ে, মিষ্টিভর্তি বড় এক গামলা দিয়ে উল্টিয়ে পরে গেল। মিষ্টির রসে পুরো শরীর ভিজে উঠেছে। মিষ্টির দোকানদার মাথায় হাত দিয়ে, গোল গোল চোখ করে দাঁড়িয়ে আছে৷ ফুল পিসির বেহাল দশা। গাল বেয়ে মিষ্টির রস টুপটুপ করে পরছে। কখনো জিহ্বা দিয়ে সেই রসটুকু বসে বসে চেটে খাচ্ছে। ঋষি দেখে হাসবে না কাঁদবে বুঝতে পারছে না। এগিয়ে যেতেই ফুলপিসি কোমরে হাত রেখে কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বলল,
-‘আমার কোমরটা বোধহয় ভেঙেই গেল রে ঋষি।
ঋষি অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
-‘তুমি পরেছো পরেছো! মিষ্টি নিয়ে কেন পরতে গেলে পিসি?
ফুলপিসি এবার ভয়ে ভয়ে শব্দ করে কেঁদে দিল। কাঁদলে মিষ্টির দোকানদার বেশি কিছু বলতে পারবে না শিওর। ব্যথা এতটাও বেশি লাগেনি। তবে অভিনয়টা ঠিক ভাবে চালিয়ে যেতে হবে। ফুলপিসি হামাগুড়ি দিয়ে মিষ্টির দোকানদারের একহাত আঁকড়ে ধরল। কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বলল,
-‘আপনি আমার ভাইয়ের মতো। ভাইয়ের মতো বলছি কেন? আগের জন্মে আপনিই আমার একমাত্র ভাই ছিলেন। এরজন্যই তো আমাদের চেহারায় এত মিল। আপনার ছোটবোন যে আপনার এতগুলো মিষ্টি ফেলে দিয়েছে। আপনার এতটাকা লস হলো। নিশ্চয়ই আমার উপর আপনার অনেক রাগ হচ্ছে? এখন আপনি কী আমাকে শাস্তি দিতে চান দাদা? শাস্তি দিলে দিতে পারেন। আমি মাথা পেতে দিলাম? তার আগে এই টাকাটা রাখুন প্লিজ? এর থেকে বেশি আর একটা পয়সাও আমার কাছে নেই দাদা।
দোকানদার আবেগপ্রবণ হয়ে গেল। বলল,
-‘থাক থাক বোন টাকা লাগবে না। আপনি তো আর ইচ্ছে করে করেননি। ব্যথার ঔষধ কিনে খাবেন।
ফুলপিসি চট করে টাকাটা ব্যাগে ভরে রাখলো। ঋষি বিড়বিড় করে বলল,
-‘কী অভিনয়রে মাইরি। ড্রামা কুইন।
-‘এই ঋষি আমাকে ধর? টেনে ওঠা? আমার কোমরটা বোধহয় সত্যি সত্যিই ভেঙে গেছে রে। আর জীবনেও বায়েল দেখতে আসব না। কানে ধরলাম।
ঋষি দোকানদারের হাতে জোর করে একহাজার টাকার দুটো নোট ক্ষতিপূরণ হিসাবে গুঁজে দিল। ভদ্রলোক নিতে চাইল না। ঋষি নাছোড়বান্দা। টাকা দিয়ে তবেই ফিরল।
ঋষির ব্যবহারে ফুলপিসি মুগ্ধ হয়ে গেল। ছোটবেলা থেকে এমন ভাবেই তো একটু একটু করে ঋষিকে গড়ে তুলেছে ফুলপিসি।

পৃথিলা শুয়ে শুয়ে নিউজফিড স্ক্রল করছিল। একটা দেড় মিনিটের ফানি ভিডিও ফুটেজে চোখে পড়তেই একলাফে উঠে গেল। ফুলপিসিকে ডেকে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
-‘পিসি.. পিসি..তুমি ভাইরাল হয়ে গেছো?
ফুলপিসি খুশিতে ডগমগ হয়ে বলল,
-‘বলিস কী রে? দেখি..দেখি?
কে যেন ফুলপিসির মিষ্টির গামলা নিয়ে ফুটবলের মতো গড়াতে গড়াতে উল্টে পরে যাওয়ার দৃশ্য ভিডিও করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছেড়ে দিয়েছে। ভিডিওর সাথে গান সেট করে দিয়েছে।
‘হরেক রকম পাগল দিয়া মিলাইছো মেলা’
‘বাবা তোমার দরবারে সব পাগলের মেলা’

ইতিমধ্যে ভিউ হয়েছে দেড় লক্ষ্য। গানটার জন্য একটু মন খারাপ লাগছে। তবে ভিডিওটা এত মানুষ দেখেছে দেখে খুব ভালোও লাগছে। ফুলপিসি বলল,
-‘ইশ, যদি আমার আইডিতে ভাইরাল হতে পারতাম! বলি, দুনিয়ার মানুষ আমার মরে যাওয়ার দৃশ্যটা ভিডিও করেছে। আর তোরা দুই গাধা তখন কী করছিলি রে পৃথিলা? বলি, দুটোই তো বেকার। অন্তত আমার ভিডিও করেও তো একটা কাজের কাজ করতে পারতি৷
পৃথিলা মিনমিন করে বলল,
-‘পিসি ওটা মরে যাওয়া হবে না। পরে যাওয়া হবে।
ফুলপিসি মৃদু ধমকে বলল,
-‘ওই একই হলো। ঢঙী মেয়ে.. যা নিজের ঘরে যা?
-‘যাহ্.. বাবা আমি আবার কী করলাম!

(চলবে)