#ফেরারি_প্রেম
#পর্ব_১৩
#নিশাত_জাহান_নিশি
“আমি আমার ছেলেকে সুখী দেখতে চাই আর কিছুই না। তুমি আমার হেল্প করতে পারবে কী-না বলো?”
মহা ঝঞ্জাটে ফেসে গেল নীহারিকা! ভেবে কুল কিনারা পাচ্ছিলনা এই প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকে কীভাবে বের হবে সে। কোনদিকে যাওয়া উচিৎ তার। মুহূর্ত কয়েক পর ঠাণ্ডা মাথায় কিছু একটা ভেবে নীহারিকা স্পষ্ট গলায় বলল,
“আন্টি আমি এই ব্যাপারে আপনার সাথে সরাসরি কথা বলব। সরি টু সে এই মুহূর্তে আমি আপনাকে কিছু বলতে পারছিনা!”
বলেই নীহারিকা ঝট করে কলটি কেটে দিলো। ফোনের ঐ প্রান্তে থাকা নাজনীন বেগম নীহারিকার ব্যবহারে বেশ অবাক হলেন। পাশাপাশি অসন্তোষও প্রকাশ করলেন! রূঢ় গলায় বললেন,
“এ কেমন ব্যবহার তার? মুখের উপর এভাবে কলটা কেটে দিলো? সহবোধ কী জানা নেই তার?”
ফোনটা বিছানার উপর ছুড়ে ফেলে নীহারিকা চিন্তিত হয়ে মাথার চুলগুলো টেনে ধরল। সারাঘর জুড়ে পায়চারি করে সে উপায় খুঁজতে লাগল। কিছুতেই যেন কোনো ভালো উপায় তার ছোটো মাথায় কাজ করছিলনা। এরই মধ্যে পুনরায় নীহারিকার ফোন বেজে উঠল। বিরক্ত হয়ে নীহারিকা ফোনের স্ক্রীণের দিকে তাকাতেই দেখল অচেনা নাম্বার থেকে ফোন। পরিচিত কেউ হবে সেই ভেবে নীহারিকা ফোনটি তুলতেই ঐ পাশ থেকে অপরিচিত পুরুষালী গলার স্বর ভেসে এলো। কর্কশ গলায় ছেলেটি বলল,
“রূপলের সাথে খুব ভাব হয়েছে তোর তাইনা? প্রেম চলছে তার সাথে?”
অবিলম্বেই ছেলেটির গলার স্বর ধরতে পেরে নীহারিকা রাগে গিজগিজিয়ে উঠল। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে সে উঁচু গলায় বলল,
“এত বড়ো সাহস আপনার? আপনি আমার নাম্বারে কল করে আমার সাথেই খারাপ ব্যবহার করছেন? কিছু বলছিনা বলে ভেবেছেন আপনি যা ইচ্ছা তা করে পার পেয়ে যাবেন? এতই সহজ সব?”
“দেমাগ কমেনা তাইনা? এত বড়ো একটা ছ্যাকা খেয়েও দেমাগ কমেনি তোর? এই ভাঙাচূড়া চেহারা নিয়েই তোর এত দেমাগ? আর দেখতে যদি একটু উঁচু, লম্বা, সুন্দরী হতি তাহলে তো তোর পা মাটিতেই পরত না। দেশের প্রধানমন্ত্রীর মত ভাব নিয়ে চলতি! আমার মুখে মুখে তর্ক করা তাইনা? দেখে নিব তোকে আমি।”
বলেই কলটি কেটে দিলো শাফকাত! রাগে সে নিজেই নিজের গাঁয়ে আ’ঘা’ত করতে লাগল। গালে চড়, থাপ্পর, ঘুষি মারতে লাগল! অতিরিক্ত চাওয়া মানুষকে হিংস্র করে তুলে। প্রতিহিংসায় মাতিয়ে তুলে। তখন যেন মানুষ বিবেক বিবেচনাবোধ সব হারিয়ে ফেলে। এদিকে নীহারিকা তব্দা হয়ে একই জায়গায় ঠায় দাড়িয়ে রইল। কান থেকে ফোনটাও নামানোর সুবোধ পাচ্ছিলনা সে! চোখ থেকে কেবল টলটলিয়ে জল গড়াচ্ছিল! তাকে মোটামুটি সব জায়গাতেই গাঁয়ের রঙ এবং উচ্চতার জন্য অপমানিত হতে হয়! যদিও গাঁয়ে এসব সয়ে গেছে তার। তবে মাঝে মাঝে শোক সামলানো যায়না। কাতর হতে হয়। নিজের প্রতি নিজের ঘৃণা তৈরি হয়। কাঁদতে কাঁদতে নীহারিকা বিছানার উপর বসে পড়ল। নিজের কুৎসিত চেহারা নিয়ে নানান খারাপ চিন্তাভাবনা করতে লাগল। এক পর্যায়ে সে মুখ হাত রেখে হাউমাউ করে কেঁদে বলল,
“কেন আমাকে দেখতে এতটা কালো আর বেঁটে বানালে আল্লাহ্? কেন একটু সুন্দর করে আমাকে তৈরি করলে না? কেন প্রতি পদে পদে আমাকে হেনস্তা হতে হয়? লোকজন কেন আমাকে অপমান করতে ছাড়েনা?”
কান্নাকাটির মাঝেই নীহারিকার ফোনটি পুনরায় বেজে উঠল। সেদিকে মনোযোগ নেই নীহারিকার। অঝরে কান্নায় ব্যস্ত সে। পর পর দশ থেকে বারো বার কলটি অনবরত বেজে যাওয়ার পর নীহারিকা শেষের বার বাধ্য হয়ে কলটি তুলল। অমনি রূপল ঐ পাশ থেকে তিরিক্ষিপূর্ণ গলায় বলল,,
“কোথায় থাকেন আপনি? কতবার কল করেছি দেখেননি আপনি?”
প্রত্যত্তুরে মৌন রইল নীহারিকা! কেবল মাথা নুইয়ে হেঁচকি তুলতে লাগল। নীহারিকার হেঁচকির আওয়াজ শুনামাত্রই রূপল নরম হয়ে এলো! ভাবল তার হুমকি ধমকির কারণে হয়ত নীহারিকা কেঁদে ফেলেছে! রাগ শান্ত করে রূপল নম্র স্বরে বলল,
“কোথায় ছিলেন আপনি? কতগুলো কল দিলাম দেখেননি?”
নীহারিকা ভেজা গলায় বলল,
“দেখেছি।”
“দেখলে কলগুলো তুলেননি কেন?”
“মন চায়নি।”
“মন চায়নি মানে?”
“কেন ফোন করেছেন বলুন?”
“কাল পিয়াসাকে হসপিটাল থেকে রিলিজ দেওয়া হবে এটা জানানোর জন্যই কল করেছিলাম।”
“ভাইয়া তো হসপিটালেই আছে। প্রয়োজনে আমিও কাল যাব। ভাবিকে এই বাড়িতে নিয়ে আসব।”
“না। পিয়াসা আমাদের বাড়িতে উঠবে। পুরোপুরি সুস্থ না হওয়া অবধি পিয়াসা আমাদের কাছেই থাকবে।”
“ভাইয়া যদি কোনো আপত্তি না করে তাহলে আমাদেরও এখানে কোনো আপত্তি নেই।”
“কাল কখন যাবেন এনজিওতে?”
“বলতে পারছিনা! মন ভালো থাকলে যাব।”
“মন ভালো থাকলে যাব মানে? ভুলে যাবেন না আপনি একটা দায়িত্ব নিয়েছেন। সেই দায়িত্বটা ঠিকঠাকভাবে পালন না করা অবধি আপনি এভাবে পল্টি খেতে পারেননা!
মাথায় কেন যেন জেদ চেপে বসল নীহারিকার। অস্বাভাবিকভাবে রেগে ওঠে সে চ্যাচিয়ে বলল,
“কী পেয়েছেনটা কী আপনারা আমাকে হ্যাঁ? যে যেভাবে পারছেন আপনাদের সিদ্ধান্ত আমার উপর চাপিয়ে দিচ্ছেন! দেখতে বিশ্রি আর বেটে বলে কী আমার কোনো দাম নেই? যে যেভাবে পারবে সেভাবে ইউজ করতে পারবে আমাকে?”
অঝরে কেঁদে নীহারিকা কলটি কেটে দিলো। তাজ্জব বনে গেল রূপল! অবাক হয়ে সে ফোনের স্ক্রীণের দিকে তাকিয়ে রইল। ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কী হলো ব্যাপারটা? কীসের সাথে কী মিলালো এই মেয়ে? মাথার তার টার ছিঁড়ে গেছে নাকী তার? আমি কখন তাকে বিশ্রি আর বেটে বললাম? আমিতো ভুলেও তাকে নিয়ে এসব ভাবিনি।”
রাতটা কোনো রকমে পার হতেই রূপল পরদিন সকালে নীহারিকাদের বাড়িতে এলো। সরাসরি নীহারিকার রুমে ঢুকে গেল সে! সকালের নাশতা খেয়ে নীহারিকা মাত্র-ই তার রুমে ঢুকেছিল। এরই মধ্যে হঠাৎ রূপলের আগমন। সারারাত বালিশ ভিজিয়ে কান্নার দরুন নীহারিকার চোখমুখ বেশ ফুলে ফেঁপে ছিল। রূপলের মুখোমুখি হতেই সে মুখটা নিচু করে নিলো। রূপলকে এই অসময়ে তার রুমে দেখে নীহারিকা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। আমতা আমতা করে বলল,
“আপনি এখানে?”
“আপনি কী কেঁদেছেন?”
“কই না তো!”
“আমার ব্যবহারে কষ্ট পেয়েছেন?”
“উঁহু।”
“তাহলে কাল হঠাৎ আমাকে ঝারি দিলেন কেন? আপনার কাছে হেল্প চাওয়াটা কী আমার ভুল হয়েছে?”
“কাল যা হয়েছে ভুলে যান। আমিও ভুলে গেছি।”
“না। কীভাবে ভুলব? এভাবে হুটহাট রেগে গেলে আমি আপনার উপরে ট্রাস্ট রাখব কীভাবে? এখন বলবেন এক কথা। কিছুক্ষণ পরে বলবেন আরেক কথা! এমন দুমুখো মানুষ আমার পছন্দ না।”
আনমনেই কেন যেন নীহারিকার চোখের কোণে জল জমে এলো! ছলছল দৃষ্টিতে সে রূপলের দিকে তাকালো। শুকনো ঢোঁক গিলে ভরাট গলায় বলল,
“আমাকে কেউই পছন্দ করেনা রূপল! আমি কখনও কারো মনমতো হতে পারিনি! আমার সাথেই কেন বার বার এমন হয় বলুন তো? আমার জন্ম হওয়াটাই কী পাপ ছিল?”
ভ্রু যুগল কুঁচকে নিলো রূপল। কৌতূহলী হয়ে উঠল সে। আগ্রহী গলায় প্রশ্ন ছুড়ল,
“কী হয়েছে আপনার বলুন তো? কাল থেকে এসব অদ্ভুত অদ্ভুত কথা কেন বলছেন? কে আপনাকে কী বলেছে?”
হেয়ো হাসল নীহারিকা! বিদ্রুপের স্বরে বলল,
“যে যাই বলুক খারাপ তো কিছু বলেনি! আপনি বরং যান এখন। আমি সময়মত এনজিওতে পৌঁছে যাব।”
বলেই নীহারিকা পিছু ঘুরে নিলো। হাতের উল্টো পিঠ দ্বারা চোখ দুটো মুছে নিলো। নীহারিকার হেয়ালি আচরণে অধৈর্য্যে হয়ে উঠল রূপল। কপাল ঘঁষতে ঘঁষতে সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“কে আপনাকে কী বলেছে বলুন? কথা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলা আমার পছন্দ না। যা বলার ডিরেক্টলি বলুন।”
“আপনি খামোখা রেগে যাচ্ছেন! কেউ কিছু বলেনি আমায়। সব তো আমার কপালের দোষ। নিজের দোষেই নিজে কষ্ট পাই।”
এরই মধ্যে রূপল অবাক করা এক কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলল। টি-টেবিলের উপর থাকা ফুলদানিটা সে ভেঙে গুড়িয়ে দিলো! আতঙ্কিত হয়ে নীহারিকা পিছু ঘুরতেই রূপল চোয়াল শক্ত করে বলল,
“বলুন কে আপনাকে কী বলেছে?”
রূপলের ভয়ে সিটিয়ে উঠল নীহারিকা! কাঠ কাঠ গলায় সে গড়গড় করে শাফকাতের কথা সব বলে দিলো! অমনি রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে রূপল আচমকা নীহারিকার ডান হাতটা টেনে ধরল! নীহারিকাকে নিয়ে সে শোঁ শোঁ বেগে রুম থেকে বের হয়ে গেল! রাগমিশ্রিত কঠিন গলায় বলল,
“শুধু দেখুন আজ আমি শাফকাতের কী অবস্থা করি!”
#চলবে…?
#ফেরারি_প্রেম
#পর্ব_১৪
#নিশাত_জাহান_নিশি
“শুধু দেখুন আজ আমি শাফকাতের কী অবস্থা করি!”
স্তম্ভিত হয়ে গেল নীহারিকা। দেহ যেন চলছেনা তার। তবুও রূপলের গাঁয়ের জোরে সে ক্রমশ দৌড়চ্ছে! বাড়ির লোকজন সবাই পেছন থেকে রূপল এবং নীহারিকাকে হাঁকডাক ছেড়ে ডাকছে। কী হয়েছে জানতে চাইছে। সেদিকে যেন কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই কারো। রূপলের আ’ক্র’ম’না’ত্ন’ক ভাবকে কিঞ্চিৎ শিথিল করার জন্য নীহারিকা স্পষ্ট গলায় রূপলকে বলল,
“দেখুন রূপল। আমি কোনো ঝামেলা চাইছিনা। যা সত্যি শাফকাত ভাই তাই বলেছে! হ্যাঁ, মুখের উপর সত্যি কথা বলাটা কেউ-ই মেনে নিতে পারেনা। তেমনি আমিও প্রথমে মেনে নিতে পারিনি। কিন্তু এখন সব মেনে নিয়েছি। প্লিজ আপনিও এবার থামুন।”
বাড়ির গ্রাউন্ডে পার্ক করে রাখা বাইকটির সামনে এসে রূপল হাঁটা থামালো। নীহারিকার হাতটাও ফট করে ছেড়ে দিলো। রাগী ভাব নিয়ে নীহারিকার মুখোমুখি দাড়ালো। উগ্র মেজাজে নীহারিকার দিকে প্রশ্ন ছুড়ল,
“তার মানে আপনিও শাফকাতকে পছন্দ করেন? তাই তাকে প্রশ্রয় দিতে চাইছেন?”
নীহারিকা অধৈর্য্য হয়ে উঠল। ধৈর্য্যহারা গলায় বলল,
“বিষয়টা আপনি কেন বুঝতে পারছেননা রূপল? শাফকাত ভাই মানুষ ভালো না। আজ না হয় আপনি আছেন বলে তার সাথে ঝামেলা করে আমি পার পেয়ে যাব। কিন্তু কাল? কাল যদি সে আমার কোনো ক্ষতি করে বসে? তখন? তখন কী হবে বলুন? দুইদিন পর তো আমাকে ভার্সিটিতে যেতে হবে। তখন কে আমাকে প্রটেক্ট করবে?”
মেজাজ যেন আরও তুঙ্গে ওঠে গেল রূপলের! খরতর গলায় সে নীহারিকাকে বলল,
“এই? আপনি এত ভীতু কেন? দুইদিন আগেও তো আমি আপনাকে অনেক সাহসী ভাবতাম! নিজের স্বার্থের জন্য সে সব করতে পারে। আজ হঠাৎ এত পরিবর্তন কেন?”
হেয়ো হেসে মাথা নুইয়ে নিলো নীহারিকা! গাঁয়ে থাকা ওড়নাটিকে সে হাতের আঙুল দ্বারা প্যাচাতে লাগল। তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল,
“আমি আমার পরিবারের জন্য ষোলো আনা ভাবলেও নিজের জন্য এক আনাও ভাবতে পারিনা রূপল! পরিবারের কোনো ক্ষতি হবার আগেই আমি যতটুকুনি সম্ভব রুখে দাড়াই। কিন্তু নিজের ক্ষেত্রে কেন যেন পারিনা!”
“আগে নিজেরটা ভাবতে শিখুন। এরপর বাকীদেরটা।”
অমনি নীহারিকা গাঁ ছাড়া ভাব নিয়ে মিনমিনে গলায় বলল,
“কার মুখে কী শুনতে হচ্ছে!”
কান খাঁড়া করে রূপল বাঁ পাশের ভ্রুটা উঁচিয়ে নীহারিকার দিকে প্রশ্ন ছুড়ল,
“কিছু বললেন?”
থতমত খেয়ে গেল নীহারিকা! রূপলের দিকে শঙ্কিত দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। আমতা আমতা গলায় বলল,
“না না কিছুনা। আপনি এখন বরং হসপিটালে যান। আমরাও কিছুক্ষণ পরে হসপিটালে আসছি।”
“প্রসঙ্গ এড়িয়ে চলছেন আপনি তাইনা? শাফাকাতকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন?”
“আরে ছাড়ুন তো। বিরক্ত করতে করতে একদিন সে অধৈর্য্য হয়ে থেমে যাবে। তাকে আমি কখনও সিরিয়াসলি নিইনি।”
“ওকে। তাহলে আমি চললাম। কারো ব্যক্তিগত ব্যাপারে নাক গলানোটা আমার পছন্দ নয়।”
বাইকে ওঠে রূপল হসপিটালের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেল। রূপলের যাওয়ার পথে তাকিয়ে নীহারিকা ভেতর থেকে চাপা এক রুদ্ধশ্বাস ফেলল। শূণ্য গলায় বলল,
“সুহাসিনী খুব লাকী জানেন? আপনার মত একজন ভালো মনের মানুষকে ভালোবাসতে পেরেছে! বিনিময়ে আপনার থেকেও অজস্র ভালোবাসা পেয়েছে। এবার সে ম’রে গেলেও হয়ত তার কোনো আফসোস থাকবেনা!”
দুপুর দুটোর মধ্যেই পিয়াসাকে হসপিটাল থেকে রিলিজ দেওয়া হলো। নিহালের জোরাজুরিতে পিয়াসাকে তার শ্বশুড় বাড়িতেই উঠতে হলো! হসপিটালের সমস্ত ফর্মালিটিজ সম্পন্ন করে রূপল পিয়াসা এবং নিহালকে এ্যাম্বুলেন্সে উঠিয়ে দিলো। সাথে রূপলের বাবা-মাকেও। যে যার মত করে নিজেদের বাড়িতে চলে গেল। রয়ে গেল শুধু নীহারিকা এবং রূপল। যদিও রূপল অনেকবার নীহারিকাকে জোর করেছিল সবার সাথে বাড়িতে চলে যাওয়ার জন্য। তবে নীহারিকা স্পষ্ট না বলে দিলো! বিষয়টায় বেশ অবাক হলো রূপল। নীহারিকার দিকে প্রশ্ন ছুড়ল,
“আপনি গেলেন না কেন?”
নীহারিকাও পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে বলল,
“আগে বলুন আপনি কাঁদছেন কেন?”
“কোথায় কাঁদছি?”
“চোখে হাত দিয়ে দেখুন। চোখ থেকে পানি পরছে!”
সম্বিত ফিরে পেল রূপল। চোখের কোটরে হাত দিয়ে দেখল সত্যিই তার চোখদুটো জলে ভিজে আছে! ভেজা হাত নিয়ে রূপল নীহারিকার দিকে তাকিয়ে ভাঙা গলায় বলল,
“বিলিভ মি আমি বুঝতেও পারছিনা আমি কাঁদছি। তবে বুকের ভেতরটা কেমন যেন তীব্র এক যন্ত্রণায় ফেটে যাচ্ছে!”
“আপনি কী সুহাসিনীর সাথে দেখা করতে চাইছেন?”
কাতর হয়ে গেল রূপল। হাহাকার নিয়ে বলল,
“প্লিজ একটা বার সুযোগ করে দিবেন?”
“চলুন। আজ আর কেউ আপনাকে আটকাতে পারবেনা!”
স্বস্তি খুঁজে পেল রূপল। দুজনই বাইকে ওঠে এনজিওর উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেল। সময়ের মধ্যে দুজনই এনজিওর সামনে পৌঁছেও গেল। বাইক থেকে নেমে নীহারিকা স্থবির গলায় রূপলকে বলল,
“আপনি বরং এখানেই দাড়ান। পরিস্থিতি বুঝে আমি আপনাকে কল করব। সাথে সাথেই কিন্তু ভেতরে যেতে হবে।”
রূপল ব্যস্ত স্বরে বলল,
“ঠিক আছে আমি আপনার কলের অপেক্ষায় থাকব।”
শান্ত এবং স্থির হয়ে নীহারিকা এনজিওর ভেতরে ঢুকে পড়ল। দুপুর টাইম বলে হয়ত এনজিওর ভেতরটা কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। সেই সুযোগে নীহারিকা দ্রুত পায়ে হেঁটে সুহাসিনীর রুমের দিকে এগিয়ে যেতেই মনে হলো তার পেছন দিয়ে কোনো একটা মানুষের ছায়া হেঁটে গেল! মনের ভুল বলে বিষয়টা নীহারিকা এড়িয়ে যেতে পারলনা! মাথাটা ঝাকিয়ে সে পেছনের দিকে তাকালো। তবে কারো কোনো অস্তিত্ব বিশেষ সে খুঁজে পেলনা! রীতিমতো অবাক এবং সন্দেহবাতিক হয়ে নীহারিকা সেই ছায়াটির উদ্দেশ্যে ছুটে যেতেই হঠাৎ সুহাসিনীর রুম থেকে উর্ধ্বগতিতে চলতে থাকা কারো শ্বাস-প্রশ্বাসের আওয়াজ তার কানে এলো। মনে প্রবল ভয় নিয়ে নীহারিকা ছুটে গেল সুহাসিনীর রুমের দিকে। দৌঁড়ে এসে রুমের দরজায় দাঁড়াতেই তার ভয়টা যেন তিনগুন বেড়ে গেল। মুমূর্ষু রোগীদের মত সুহাসিনী জোরে জোরে শ্বাস ফেলছে! মরণ বুঝি তার অতি সম্মুখে! অতিরিক্ত শ্বাস প্রশ্বাসের তাড়নায় তার চোখ দুটো যেন তার কোটর থেকে বের হয়ে আসছে। দেখতে বিভৎস লাগছে! ভয়ে চিৎকার করে উঠল নীহারিকা। এই পরিস্থিতিতে সে কী করবে উপায় বুদ্ধি খুঁজে পাচ্ছিলনা! অপ্রত্যাশিতভাবে সেখানে তখন রূপলও পৌঁছে গেল! আলাদা করে তাকে ডাকার প্রয়োজন পড়ল না।
রূপলের আর্বিভাবে সুহাসিনীর হৃদস্পন্দন যেন থমকে গেল! শ্বাস-নিশ্বাস নিতে ভুলে গেল সে। মাথাটা ঘুরিয়ে নিষ্প্রাণ দেহ নিয়ে সে কেবিনের দরজার দিকে তাকালো। মৃত পথযাত্রী সুহাসিনীকে এক পলক দেখামাত্রই রূপলের উত্তেজনা বেড়ে গেল। দিশেহারা হয়ে গেল সে। অস্থির হয়ে সে সুহাসিনীর দিকে এগিয়ে এলো। মরিয়া রূপলের দিকে হাত বাড়িয়ে সুহাসিনী রুদ্ধকর গলায় বলল,
“আমার হৃদিকে দেখে রেখো প্লিজ!”
আজীবনের জন্য সুহাসিনী চোখ দুটো বুজার আগে রূপলকে দু-চোখ ভরে দেখে নিলো! চোখ ভরা জল নিয়ে রূপল সুহাসিনীর হাতে আলতো করে স্পর্শ করতেই সুহাসিনী মন জুড়ানো এক হাসি দিলো। সঙ্গে সঙ্গেই সে বড়ো এক শ্বাস ফেলে নিঃশ্বাস নেওয়া থামিয়ে দিলো। মায়ার এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিলো! পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল রূপল! তার চোখের সামনেই সুহাসিনীর প্রাণবায়ু দেহ থেকে বেরিয়ে গেল তা যেন কিছুতেই মানতে পারছেনা। হিতাহিতজ্ঞানশূণ্য হয়ে সে সুহাসিনীর হাত ধরে রেখেই ধপ করে মাটিতে বসে পড়ল। নির্বিকার দৃষ্টিতে সুহাসিনীর দিকে তাকিয়ে রইল। চোখের পলকও যেন পরছেনা তার। এই মুহূর্তে পুরো পৃথিবীর ভার যেন তার বুকে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে।
চক্ষুভরা আতঙ্ক হয়ে নীহারিকা ছুটে এলো সুহাসিনীর কাছে। কাঁদতে কাঁদতে সে সুহাসিনীকে দু’হাত দ্বারা ধাক্কাতে লাগল। ক্রন্দনরত গলায় বলল,
“এই সুহাসিনী চোখ খুলুন। কথা বলছেন না কেন আপনি?”
সুহাসিনীর কোনো প্রতিক্রিয়া না পেয়ে নীহারিকা রূপলকে ধাক্কাতে লাগল। চিৎকার করে বলল,
“এই রূপল? আপনি এভাবে বসে আছেন কেন? প্লিজ সুহাসিনীকে উঠতে বলুন!”
শোকে হতবিহ্বল হয়ে রূপল পাথর গলায় বলল,
“সুহাসিনী আর নেই! আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। আমি আসতে বড্ড দেরী করে ফেলেছি।”
#চলবে..?🙂
#ফেরারি_প্রেম
#পর্ব_১৫
#নিশাত_জাহান_নিশি
“সুহাসিনী আর নেই! আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। আমি আসতে বড্ড দেরী করে ফেলেছি যে।”
হাত-পা ছুড়ে নীহারিকা কান্নায় ভেঙে পড়ল। উদ্ভ্রান্তের মত চ্যাচিয়ে বলল,
“সে ইচ্ছে করে আপনাকে ছেড়ে যায়নি রূপল। কেউ তাকে বাধ্য করেছে যাওয়ার জন্য!”
মুহূর্তেই যেন শোকাহত অবস্থা থেকে সক্রিয় হয়ে উঠল রূপল! বসা থেকে ফট করে দাঁড়িয়ে পড়ল সে। চোখের কোটর থেকে অবলীলায় গড়িয়ে পড়া জল গুলোকে হাতের উল্টেপিঠ দ্বারা মুছে নিলো। নীহারিকার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সে শুকনো গলায় প্রশ্ন ছুড়ল,
“হোয়াট? কী বলতে চাইছেন আপনি?”
এরই মধ্যে নীহারিকার কান্নাকাটির আওয়াজে এনজিওর প্রতিটি সদস্য হন্ন হয়ে দৌঁড়ে এলো সুহাসিনীর রুমে! ঘটনাচক্রে উপস্থিত হয়ে তারা তাজ্জব বনে গেল। সুহাসিনীর হঠাৎ মৃত্যু তারা কিছুতেই মানতে পারলনা! বিশেষ করে মিস চারুলতা সেন! সকালেও তিনি সুহাসিনীকে ফিট এন্ড ফাইন দেখে গেছেন। কিছুক্ষণ আগে অবধিও সবকিছু ঠিকঠাক ছিল। তাহলে হঠাৎয়ের মধ্যে কীভাবে এত বড়ো দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে? তবে কী উপর ওয়ালা সুহাসিনীর কপালে এভাবেই মৃত্যু লিখে রেখেছিলেন? পাথর রূপ ধারণ করলেন চারুলতা সেন। দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন তিনি। জ্ঞান হারাতে বোধ হয় বেশী সময় লাগবেনা তার!
সুহাসিনীর মৃত্যুর খবরটা এতক্ষণে সবিতা অবধিও পৌঁছে গেল। রান্নাবান্না ফেলে রেখে সে ছোট্টো হৃদিকে নিয়ে ছুটে এলো মৃত সুহাসিনীর কাছে। সুহাসিনীর মরা মুখটা এক ঝলক দেখা মাত্রই সবিতা পুরো এনজিওটা তুলে ফেলল কাঁদতে কাঁদতে! দিশেহারা হয়ে গেল সে। এসবের মাঝে রূপলও আবার শোকে তলিয়ে গেল। নীহারিকাও সুযোগ খুঁজে পেলনা তার মনের শঙ্কাটা রূপলের কাছে খুলে বলার! তবুও মনের সন্দেহ থেকে রূপল সুহাসিনীকে ট্রিটমেন্ট করা ডক্টরকে ডেকে আনল। ডক্টরও সুহাসিনীকে মৃত ঘোষণা করল! দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি রূপল এবং সবিতাকে শান্তনা দিয়ে বললেন,
“দেখো, তোমরা কেঁদো না। আজ না হয় কাল তো তাকে যেতেই হতো। সারাদেহ আগুনে ঝলসে গিয়েছিল তার! এসব রোগীর বাঁচার সম্ভাবনা খুবই কম থাকে। শতকরা একশ ভাগের মধ্যে বিশ ভাগ। তোমরা বরং এটা ভেবে শুকরিয়া আদায় করো যে এতটা বিভৎসভাবে পুড়ে যাওয়ার পরেও সে ছয়টা মাস সময় পেয়েছে বেঁচে থাকার জন্য! তোমাদের জন্য এই খবরটা সুখের হলেও সুহাসিনীর জন্য তা খুবই যন্ত্রণার ছিল! কারণ, এভাবে কষ্ট পেয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে বরং মরে যাওয়াই দ্বিগুন ভালো! শুধু নামাজ পড়ে তার জন্য দোয়া করো আল্লাহ্ যেন তাকে জান্নাতবাসী করেন। বেঁচে থেকে তো কম কষ্ট পেলনা মেয়েটা।”
বিষণ্ন মন নিয়ে ডক্টর জায়গা ত্যাগ করলেন। বিষাদে ভরপুর শিথিল দুটি চোখে রূপল কেবল একদৃষ্টিতে সুহাসিনীর দিকে তাকিয়ে রইল। নিথর দেহতে প্রাণের সঞ্চার খুঁজছিল সে! সুহাসিনীর কালসিটে এবং কুঁচকে যাওয়া মুখটি থেকে যেন নূরের জ্যোতি ঠিকরে পরছিল! সেই জ্যোতি রূপলের চোখ দুটিকে শান্ত করে তুলছিল। সবিতা বুক চাপড়ে কাঁদছে। আর্তনাদ করে বলছে,
“কেন আমাকে একা রেখে চলে গেলি বোন? এই পৃথিবীতে তো তুই ছাড়া আমার আপন কেউ ছিলনা! এত এত খারাপ মানুষদের ভীড়ে তুই আমাকে একলা রেখে চলে গেলি বোন?”
চোখে জল নিয়ে ছোট্টো হৃদি রূপলের হাত ধরে দাঁড়ালো! অবুঝ মন নিয়ে সে রূপলের নিবিড় দু’চোখে ভরাট দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল,
“বাবা বাবা? সুহা মা কথা বলছেনা কেন? আমার মা তো অনেকক্ষণ ধরে সুহা মাকে ডাকছে। কেন কোনো জবাব দিচ্ছেনা মা?”
সুহাসিনীর থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে রূপল ছোট্টো হৃদির দিকে তাকালো। হৃদির মাথায় হাত বুলিয়ে সে আ’হ’ত গলায় বলল,
“তোমার সুহা মা আমাদের ছেড়ে চলে গেছে হৃদু। তাই আর কথা বলছেনা!”
“কোথায় চলে গেল মা?”
“আল্লাহ্’র কাছে।”
কান্নার মাঝেও ফিক করে হেসে দিলো হৃদি! খুশি হয়ে সে উদ্বেলিত গলায় বলল,
“এটা তো খুব ভালো জায়গা বাবা। চলো আমরাও তবে আল্লাহ’র কাছে যাই। ওখানে যাওয়া তো খুব ভালো কাজ।”
হৃদিকে ফেইস করতে মোটেও ভালো লাগছিলনা রূপলের! ছন্নছাড়া হয়ে সে সুহাসিনীর রুম থেকে বের হয়ে গেল। বারান্দায় এসে সে হাঁটু ভাজ করে বসে পড়ল! ভেতরের অসহ্য যন্ত্রণাটা সে আর চেপে রাখতে পারলনা। মৃদু আর্তনাদ করে বলল,
“কেন সুহাসিনী কেন? মৃত্যুর আগেও তুমি কেন আমাকে তোমার পাশে থাকলে দিলেনা? কেন আমাকে বার বার কোনো না কোনো অজুহাতে থামিয়ে দিতে? কেন আমাকে বাধ্য করতে তোমার থেকে দূরে থাকতে? আমার জীবনটাকে নষ্ট করে দিয়ে গেলে তুমি! বেঁচে থাকতেও তুমি আমাকে শান্তি দাওনি। মরে গিয়েও আমার জীবনটাকে নরক করে দিয়ে গেল! বেঁচে থাকতে তবুও তো একটা শান্তনা ছিল যে তুমি আছো। আজ না হয় কাল তুমি আমার হবে। কিন্তু এখন? এখন আমি নিজেকে কীভাবে শান্তনা দিব? কীভাবে নিজের মনকে সামলে রাখব? আমি যে আর পারছিনা সুহাসিনী। কিছুতেই নিজেকে সামলে রাখতে পারছিনা।”
দূর থেকে চুপটি করে দাঁড়িয়ে নীহারিকা সব শুনছিল! তার চোখেও অবাধ্য জলের ছড়াছড়ি। কী থেকে কী হয়ে গেল কিছুই বুঝতে পারলনা সে। মন থেকে সেও তো চেয়েছিল রূপল আর সুহাসিনীর বিয়েটা হোক। দুটি মন এক হয়ে যাক। কিন্তু হঠাৎ করে যে এতকিছু হয়ে যাবে ঘুনাক্ষরেও বুঝতে পারেনি সে। ভীরু পায়ে হেঁটে নীহারিকা রূপলের পেছনে এসে দাড়ালো। ভরাট গলায় রূপলকে ডেকে বলল,
“শান্ত হোন রূপল প্লিজ। সুহাসিনীর দাফন কাফনের ব্যবস্থা করুন। মৃত্যুর পর বেশিক্ষণ মৃত ব্যক্তিকে ফেলে রাখতে নেই।”
“আমি পারবনা নীহারিকা! সুহাসিনীকে আমি অন্ধকার কবরে রেখে আসতে পারবনা! আমার ভেতরটা যে ফেটে যাচ্ছে। আমি এই যন্ত্রণা কাউকে বুঝাতে পারছিনা।”
মনে খচখচানি নিয়ে নীহারিকা সন্দেহজনক গলায় প্রশ্ন ছুড়ল,
“আচ্ছা? সুহাসিনীর মৃত্যুটা কী আপনার স্বাভাবিক মনে হচ্ছে?”
“ডক্টর তো অস্বাভাবিক কিছু বললেন না! তবে সাফোয়ানকে আমি ছাড়বনা! তার জন্যই তো আজ আমার সুহাসিনীর এই অবস্থা হলো। এতদিন সুহািসনী মুখ খুলে সত্যিটা না বললেও এবার তার মৃত্যুর জন্য আমি সাফোয়ানকেই দায়ী করব! আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড না দিলেও আমি নিজ হাতে তাকে মৃত্যুদণ্ড দিব।”
“আচ্ছা আমরা এই বিষয়ে পরে কথা বলব। এখন প্লিজ সুহাসিনীর দাফন কাফনের ব্যবস্থা করুন। আপনি ছাড়া সুহাসিনীর আর কে আছে বলুন?”
ক্ষণিকের জন্য মন শক্ত করে ওঠে দাড়ালো রূপল। সন্ধ্যার মধ্যেই সুহাসিনীর দাফনের ব্যবস্থা করা হলো। পাশাপাশি রূপল পুলিশ প্রশাসনকেও নিয়ে এলো কবরস্থানে! আগুনে পুড়ে যাওয়ার কারণে যে সুহাসিনীর মৃত্যু হয়েছে তা পুলিশকে সরাসরি ঘটনাচক্রে এনে দেখালে। সাফোয়ানের বিরুদ্ধেও মামলা দায়ের করল। তবে হয়রানের ব্যাপার হলো সাফোয়ানকে গতকাল রাত থেকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা! সে পুরে নিঁখোজ! হুট করে সে কোথায় গেল, কেন গেল তার কিছুই জানেনা সবিতা। সাফোয়ান কখনও তাকে জানিয়ে কোথাও যায়নি। তাই এই বিষয়ে তার বিশেষ কিছু জানা নেই। নিখোঁজ সাফোয়ানকে খুঁজতে বেরিয়ে গেল পুলিশ ফোর্স। তাকে পেলেই ডিরেক্টলি রিমান্ডে নিয়ে যাবে!
সুহাসিনীর দাফন কাফন সম্পন্ন হওয়ার তিন/ চার ঘণ্টা হয়ে যাওয়ার পরেও রূপলকে সুহাসিনীর কবরের পাশ থেকে টেনে আনা যাচ্ছিলনা! কবরের পাশে বসে সে কেবল চোখের জল ফেলছিল। কাঁদা, মাটি লেগে সাদা পাঞ্জাবিটা নোংরা হয়ে যাচ্ছিল। রূপলের মা-বাবা অধৈর্য্য হয়ে পরছিল রূপলের আচরণে! সবিতা তো প্রায় অজ্ঞানই হয়ে যাচ্ছিল। তাদের এই করুন অবস্থা দেখে নীহারিকা ও কেঁদে ভাসাচ্ছিল। কান্নারত রূপলের পাশে বসে সে ভরাট গলায় রূপলকে বলল,
“রূপল প্লিজ চলে আসুন। সবাই আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।”
পাথর গলায় রূপল বলল,
“অন্ধকারে সুহাসিনী ভয় পায়! প্লিজ আপনারা যান।”
“এখন থেকে সুহাসিনীকে অন্ধকারেই থাকতে হবে রূপল! আপনি নিশ্চয়ই রোজ রোজ এসে সুহাসিনীকে পাহারা দিবেন না?”
“দিব! প্রয়োজনে এখানেই আমার বাসস্থান তৈরী করব।”
“খামোখা সময় নষ্ট করবেন। কবরের উপরে থেকে কবরের নিচের পরিবেশ জানা যায়না।”
ক্ষেপে গেল রূপল! রাগী দৃষ্টিতে সে নীহারিকার দিকে তাকালো। দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলল,
“আপনাকে আমার বিরক্ত লাগছে। প্লিজ এখান থেকে যান!”
ভয় পেয়ে গেল নীহারিকা। সঙ্গে সঙ্গেই সে রূপলের পাশ থেকে ওঠে দাড়ালো। রূপলকে একা রেখেই রূপলের মা-বাবা এবং নীহারিকা জায়গা ত্যাগ করতে বাধ্য হলো! শোকে পাথর হয়ে যাওয়া সবিতাকে কিছুতেই যেন মানাতে পারছিলেন না চারুলতা সেন। বাড়ি ফিরে সবিতার অবস্থা যেন পূর্বের তুলনায় আরও খারাপ হয়ে গেল। হৃদির যত্ন নেওয়ার কথাও সে ভুলে গেল!
___________________________________
মধ্যরাত তিনটে কী চারটে তখন। বিছানায় শুয়ে ঘুমের অভাবে কাতরাচ্ছিল নীহারিকা। মাথাটা যেন ব্যথায় ফেটে যাচ্ছিল তার। পানির তেষ্টাও পেয়ে গেল জোরে। মাথায় যন্ত্রণা নিয়ে সে রুম থেকে বের হলো। উদ্দেশ্য রান্নাঘরে গিয়ে পানি খেয়ে আসবে। যেহেতু রূপলদের বাড়িতে সে আজকের রাতটা থাকবে সেহেতু রুমে তার আলাদা করে পানি আনা হয়নি। দরজা খুলে নীহারিকা যেইনা সিঁড়ির দিকে অগ্রসর হলো অমনি করিডরে থাকা লাইটের আলোয় দেখতে পেল রূপল এবং একজন অপরিচিত ভদ্রলোককে! যাকে নীহারিকা এর আগে কখনও দেখেনি। তবে ভদ্রলোকটি বিধ্বস্ত রূপলকে কিছু বুঝিয়ে শুনিয়ে তার ঘরের দিকে নিয়ে আসছিল।
লোকটির মাথায় আলাদা করে একটি কালো ক্যাপ রয়েছে। ক্যাপটি দেখে নীহারিকা কেমন যেন ভাবনায় ডুবে গেল! ক্যাপটি তার পরিচিত মনে হলো। ঘণ্টা খানিক আগেও সে ক্যাপটি কোথাও দেখেছে। তবে মনে পরছেনা কোথায় দেখেছে! হয়ত সুহাসিনীর দাফনের সময় লোকটি কোথাও ছিল তাই মানুষের চেয়ে ক্যাপটিকে তার বেশি পরিচিত মনে হলো!
#চলবে…?