ফেরারি প্রেম পর্ব-১৬+১৭+১৮

0
310

#ফেরারি_প্রেম
#পর্ব_১৬
#নিশাত_জাহান—নিশি

লোকটির মাথায় আলাদা করে একটি কালো ক্যাপ রয়েছে। ক্যাপটি দেখে নীহারিকা কেমন যেন ভাবনায় ডুবে গেল! ক্যাপটি তার পরিচিত মনে হলো। ঘণ্টা খানিক আগেও সে ক্যাপটি কোথাও দেখেছে। তবে মনে পরছেনা কোথায় দেখেছে! হয়ত সুহাসিনীর দাফনের সময় লোকটি কোথাও ছিল তাই মানুষের চেয়ে ক্যাপটিকে তার বেশি পরিচিত মনে হলো!

সিঁড়ি বেয়ে হেঁটে দুজনই ক্রমশ নীহারিকার দিকে এগিয়ে এলো। কথার মারপ্যাচে ব্যস্ত ছিল বিধায় নীহারিকার উপস্থিতি তারা টের পেলনা। নিজের উপস্থিতি জানান দেওয়ার জন্য নীহারিকা হুট করে দুজনের মুখোমুখি এসে দাড়ালো! চলতি পথে ব্যাঘাত পড়ায় অমনি দুজন হাঁটা থামিয়ে সোজা দাড়িয়ে পড়ল। চোখ টেনে মেলতে পারছেনা রূপল। অতিরিক্ত ক্লান্তি, অনিদ্রা, বিষণ্নতা এবং কান্নার দরুন তার শরীরটা প্রায় নিষ্প্রাণ হয়ে আছে। দেহের কোথাও প্রাণ আছে বলে মনে হচ্ছেনা। রূপলের এই দুর্বস্থা দেখে নীহারিকার ভেতরটাও কেমন যেন হাহাকার করে উঠল! বুকের ভেতরটায় নিদারুন এক ক্ষত অনুভব হলো। ব্যথাভরা চোখে সে নিষ্পলকভাবে বিধ্বস্ত রূপলের দিকে তাকিয়ে রইল। পাশে থাকা লোকটি এতে বিব্রতবোধ করল! বিরক্তিকর গলায় সে নীহারিকার দিকে প্রশ্ন ছুড়ল,

“এই কে আপনি?”

প্রশ্নের কোনো জবাব না দিয়ে নীহারিকা দৃষ্টি ঘুরিয়ে এক পলক লোকটির দিকে তাকালো। ভ্রু যুগল নাচিয়ে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ল,

“আগে বলুন আপনি কে? এর আগে আপনাকে কোথাও দেখছি বলে তো মনে হচ্ছেনা!”

“হাউ স্ট্রেঞ্জ! আমার বাড়িতে দাড়িয়ে আমার রুমের সামনে দাড়িয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করছেন আমি কে?”

অমনি ভড়কে উঠল নীহারিকা! হাত চলে গেল তার মুখে। অবিশ্বাস্য গলায় প্রশ্ন ছুড়ল,

“হোয়াট? এটা আপনার বাড়ি?”

লোকটি হাত উঁচিয়ে রাগতা দিয়ে বলল,

“নয়ত কী? আপনি আমার বাড়িতে কী করছেন হুম?”

পরিস্থিতি বিগড়ে যাওয়ার আগেই রূপল ঢুলুঢুলু শরীর নিয়ে লোকটির কাঁধে হাত রাখল। সন্তপর্ণে লোকটিকে থামিয়ে সে ধীর গলায় বলল,

“ভাইয়া। ইনি আমাদের পিয়াসার ননদ। প্লিজ আর কথা বাড়িও না।”

কৌতূহল যেন আরও দ্বিগুন বেড়ে গেল নীহারিকার। রীতিমতো চমকিত গলায় সে রূপলের দিকে প্রশ্ন ছুড়ল,

“ইনি আপনার ভাই? আপনারা না এক ভাই এক বোন? এই ভাই আবার কোথা থেকে আসল?”

এমনিতেই রূপল বেশ ক্লান্ত এবং নিস্তেজ। তার উপর নীহারিকার বাড়তি প্রশ্ন তাকে আরও বেশী অতিষ্ট করে তুলছিল। অবিন্যস্ত দৃষ্টি ফেলে সে নীহারিকার দিকে তাকালো। রাগ থাকা সত্ত্বেও কণ্ঠে সাবলীলতা এনে বলল,

“আজকের জন্য ছাড় দিন প্লিজ। কাল সকালে সব বুঝিয়ে বলছি।”

দুজনকেই পাশ কাটিয়ে রূপল সামনের দিকে হাঁটা ধরল। এলোমেলো পায়ে হেঁটে সে তার রুমে ঢুকে পড়ল। রুমের ভেতরে ঢুকতেই তার সমস্ত শিউরে উঠল! বেদনারা আবারও জাগ্রত হয়ে উঠল। দেহে প্রাণ ধরা দিলেও নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে ইচ্ছে করছেনা তার। বেঁচে থাকার সমস্ত আশা যেন সে হারিয়ে ফেলছে! আত্নহত্যা মহাপাপ না হলে, হয়ত সে এতক্ষণে তার জীবনটাও ঝরিয়ে দিত! সুহাসিনীর কবরের পাশে তারও সমাধি হত। এসব ভাবতে ভাবতেই রূপল দু-দুটো সিগারেট ধরালো। একই সাথে সিগারেট দুটি ফুঁকতে লাগল! বেদনারা যেন সিগারেটের ধূসর ধোঁয়ার সঙ্গে মিলিত হয়ে তার ভেতর বের হয়ে হারিয়ে যাচ্ছে দূর থেকে দূরে! তবে বেশিক্ষণ এই সুখ স্থায়ী হবেনা। সিগারেটের নেশা শেষ হলে বেদনারাও তখন হারিয়ে যেতে ভুলে যাবে! আবারও হুমড়ি খেয়ে তার ভেতরে প্রবেশ করে নিজেদের বাসস্থান তৈরী করে তুলবে!

লোকটি এখনও নীহারিকার সামনেই দাড়িয়ে রইল! নীহারিকার আগা গোঁড়া তলিয়ে দেখতে লাগল। দেখাদেখির পর্ব শেষে লোকটি কৌতূহলে আচ্ছাদিত হয়ে থাকা নীহারিকার দিকে প্রশ্ন ছুড়ল। বলল,

“হেই। হোয়াট ইজ ইউর নেইম?”

ভাবনায় ছেদ পড়ল নীহারিকার। অপ্রস্তুত দৃষ্টি পড়ল লোকটির উপর। প্রত্যত্তুরে নম্র গলায় বলল,

“নীহারিকা।”

“বাহ্। বেশ সুন্দর নাম তো!”

কিঞ্চিৎ দম নিয়ে লোকটি পুনরায় প্রশ্ন ছুড়ল,

“আমার নাম জিজ্ঞেস করবেন না?”

লোকটির প্রশ্নের দিকে কোনো ধ্যান নেই নীহারিকার। সে এখন নিজের খেয়ালেই ব্যস্ত। আগ্রহী গলায় সে লোকটির দিকে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ল,

“আচ্ছা আপনি ভাবির কেমন ভাই হোন? চাচাতো, ফুফাতো বা মামাতো ভাই?”

“জি না।”

“তাহলে কেমন ভাই?”

“সৎ ভাই!”

“মানে?”

“আমি আমার বাবার প্রথম সংসারের বড়ো ছেলে! আমার মা মারা যাওয়ার পর বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। এবার সব ক্লিয়ার?”

নীহারিকা বোকার মত মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ জানালো! তাজ্জব দৃষ্টিতে লোকটির দিকে তাকিয়ে রইল। চালনা আগ্রহ থেকে প্রশ্ন ছুড়ল,

“তাহলে আপনি এতদিন কোথায় ছিলেন?”

“দেশের বাহিরে ছিলাম। আজই দেশে ফিরলাম।”

ভ্রু উঁচিয়ে লোকটি আবার প্রশ্ন ছুড়ল,

“আপনার আর কোনো প্রশ্ন আছে?”

“আপনার নামটা যেন কী?”

“রাতুল।”

“আচ্ছা, আপনি মাথায় ক্যাপ পড়ে আছেন কেন? আপনার এই ক্যাপটা মনে হচ্ছে এর আগেও আমি কোথাও দেখেছি!”

রাতুল হেয়ালি হেসে বলল,

“হুম দেখতেই পারেন। কারণ, এমন অসংখ্য ক্যাপ আজকাল ছেলেরা ইউজ করে। এতে বিশেষ কী আছে?”

“না কিছুনা। আচ্ছা আমি ঘুমাব। বায়।”

মাথায় অসংখ্য মারপ্যাচ নিয়ে নীহারিকা পিছু ঘুরল। অমনি রাতুল নীহারিকাকে পেছন থেকে ডেকে বলল,

“এইযে বেয়াইন সাহেবা। আপনার চুলগুলো আমার বেশ ভালো লেগেছে! একটু যত্ন করবেন চুলগুলোর! অযথা বাড়তি চিন্তা করে চুলগুলো ঝরাবেন না!”

হটকারিতায় আচ্ছন্ন হয়ে নীহারিকা পিছু ঘুরে তাকাতেই রাতুল মৃদু হেসে জায়গা থেকে প্রস্থান নিলো। সোজা রূপলের রুমে ঢুকে পড়ল! রাতুলের যাওয়ার পথে তাকিয়ে নীহারিকা গভীর চিন্তায় ডুবে গেল। সন্দেহ বাদি হয়ে বিড়বিড় করে বলল,

“লোকটি কী আমার চুলের প্রশংসা করল নাকী আবার অন্যদিকে ইঙ্গিত দিলো? সত্যিই তো এখন আমার চিন্তার কারণ হচ্ছে তার মাথার ক্যাপটি! কেন সাধারণ বিষয়টা আমার মাথায় ঢুকছেনা? এমন অসংখ্য ক্যাপ তো ছেলেরা প্রতিদিনই ইউজ করছে। তাহলে এই সিম্পল বিষয়টা নিয়ে আমার এত চিন্তার কারণ কী?”

গোটা রাত নির্ঘুম কাটিয়ে দিলো নীহারিকা। চোখ বন্ধ করলেই কেমন যেন আজগুবি চিন্তাভাবনারা তার মাথার মধ্যে গিজগিজ করছে। কিছুতেই যেন স্বস্তি খুঁজে পাচ্ছেনা সে। এদিকে আবার রূপলের জন্যও টেনশন হচ্ছে। সুহাসিনীকে হারানোর শোকে না সে আবার উল্টোপাল্টা কিছু করে বসে। যদিও তাকে সামলানোর জন্য তার বড়ো ভাই রয়েছে। তবুও মনের ভেতরে তো একটা খচখচানি থেকেই যাচ্ছে। বিশেষ করে নীহারিকার চিন্তার মূল কারণ হলো রাতুল! পিয়াসার পরিবার রাতুলের বিষয়টা পুরোপুরি গোপন করে গেছে তাদের থেকে! পিয়াসার যে একজন সৎ ভাই আছে তা নীহারিকার পরিবার আগে জানত না। আপাত দৃষ্টিতে যদিও এই মুহূর্তে এটা কোনো বড়ো ব্যাপার নয় তবে এই মুহূর্তে নীহারিকার কাছে সবকিছুই কেমন যেন ঘোলাের মত লাগছে!

________________________________

চারিদিকে ভোরের মিটমিটে আলো ফুটতেই নীহারিকা রেডি হয়ে তার রুম থেকে বের হয়ে গেল! উদ্দেশ্য ভোরের স্নিগ্ধ আলোয়, মৃদু হাওয়ায় গাঁ ভাসিয়ে সে পায়ে হেঁটেই বাড়ির দিকে রওনা হবে। এত সকাল বাড়ির কাউকে ঘুম থেকে ডেকে সে বিরক্ত করতে চায়না। তাই যেই ভাবা সেই কাজ। রুম থেকে বের হয়ে নীহারিকা নিচ তলায় নেমে যেইনা সদর দরজার দিকে আগাতে যাবে অমনি তার আকস্মিক দৃষ্টি পড়ল রান্নাঘরে। এই ভোর সকালে রান্নাঘরে নাজনীন বেগমকে দেখা যাচ্ছে। বিষয়টায় বেশ অবাক হয়ে নীহারিকা রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ালো। পেছন থেকে কারোর পায়ে হাঁটার শব্দ পেয়ে নাজনীন বেগম পিছু ঘুরে তাকালেন। কান্নারত অবস্থায় নাজনীন বেগমকে দেখামাত্রই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল নীহারিকা। চিন্তিত গলায় প্রশ্ন ছুড়ল,

“আপনি কাঁদছেন কেন আন্টি?”

শাড়ির আঁচল দ্বারা চোখের জলগুলো মুছে নাজনীন বেগম নিবিড় দৃষ্টিতে নীহারিকার দিকে তাকালেন। পাল্টা প্রশ্ন ছুড়লেন,

“এত ভোরে তুমি ওঠে এলে যে?”

“পরে বলছি আন্টি। আগে বলুন আপনি কাঁদছেন কেন?”

“কাঁদছি কী আর সাধে? ছেলেটা কাল সকাল থেকে অভুক্ত। দানা পানি কিছুই মুখে তুলছেনা। রাতে কত রিকুয়েষ্ট করলাম খেতে, খেলো না। মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছেনা তার। মা হয়ে কীভাবে সহ্য করি বলো?”

সব শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেলল নীহারিকা। মাথাটা নুইয়ে ভরাট গলায় বলল,

“আমি এখানে আর কী বলব আন্টি? তবে আমার মনে হচ্ছে আপনার ছেলেকে কয়েকটা দিন সময় দেওয়া উচিৎ। দেখুন না, শোক কাটিয়ে উঠতে পারে কী-না।”

“শোক এমনি এমনি কাটবে না তার। আমার মনে হচ্ছে তাকে যত দ্রুত সম্ভব বিয়ে দিয়ে দেওয়া উচিৎ!”

“মানে? এসব আপনি কী বলছেন আন্টি?”

“যা বলছি একদম ঠিক বলছি। নতুন কাউকে পেলে সে ঠিকই স্বাভাবিক হয়ে উঠবে।”

“এসব আপনাকে কে বলল আন্টি? এতে বরং দুই দুটো জীবন নষ্ট হয়ে যাবে! আমি অন্তত জানি আপনার ছেলে কখনও সুহাসিনীর জায়গায় অন্য কাউকে মানতে পারবেনা। এতে নতুন করে যে তার জীবনে আসবে তার জীবনটাই নষ্ট হয়ে যাবে!”

নীহারিকার কথাগুলো মোটেও পছন্দ হলোনা নাজনীন বেগমের! মুখটা বাঁকিয়ে তিনি কাজে মনোযোগ দিলেন। গম্ভীর গলায় নীহারিকাকে বললেন,

“আজ বিকেলে আমাদের তোমাদের বাড়িতে যাওয়ার কথা।”

“বাহ্। বেশ ভালো খবর তো।”

“হুম। পিয়াসার বিয়েতে তো আমার বড়ো ছেলেটা থাকতে পারলনা, যেহেতু কাল সে দেশে এসেছে তাই রিসেপশনটা অন্তত দেখুক।”

“ভাবি পুরোপুরি সুস্থ হলেই তবে রিসেপশন হবে আন্টি।”

“হ্যাঁ তা তো জানি। তবে আজ বিকেলে আমরা সবাই একবার তোমাদের বাড়িতে যাব। মেয়েটাকে দেখে আসব।”

“ওকে আন্টি। তাহলে আমি এখন বাসায় যাচ্ছি। বিকেলে দেখা হচ্ছে।”

“আরে আরে কী বলো? নাশতা করে তারপর যাবে। এই সাত সকালে কেউ কারো বাড়ি থেকে খালি মুখে যায়না।”

নীহারিকাকে জোর করে ধরে বেঁধে রেখে দিলেন নাজনীন বেগম! নাশতা তৈরী করতে কিছুটা সময় লাগছিল বিধায় নীহারিকা উপরে তার রুমে চলে গেল। তবে তার মন পড়ে রইল রূপলের কাছে! রূপল এখন কী অবস্থায় আছে তা জানার জন্য আগ্রহী হয়ে উঠল। ধীর পায়ে হেঁটে সে রূপলের রুমের সামনে গেল। সাবধানে দরজায় হাত লাগাতেই বুঝতে পারল দরজাটা ভেতর থেকে খোলা! সুযোগ পেয়ে নীহারিকা দরজা খুলে রুমের ভেতর ঢুকে পড়ল।

গাঁয়ে আতর মেখে, সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামা পড়ে রূপল ভেজা চুলগুলো তোয়ালে দ্বারা মুছে নিচ্ছে! চোখ দুটো অসম্ভব রকম ফুলে আছে তার! বুঝাই যাচ্ছে এসব সারা রাতের কান্নার ফল। দেহ থেকে মন মাতানো সুবাস ভেসে আসছে রূপলের। সেই সুবাসে বুদ হয়ে নীহারিকা স্তব্ধ হয়ে একই জায়গায় দাড়িয়ে রইল। চোখেমুখে তার মুগ্ধতার ছড়াছড়ি। চুলটা কোনোভাবে সেট করে রূপল পিছু ফিরে তাকাতেই ঘোলা ঘোলা চোখে নীহারিকাকে দেখল। ভ্রু কুঁচকে সে বিস্মিত গলায় প্রশ্ন ছুড়ল,

“আপনি এখানে?”

সম্বিত ফিরে পেল নীহারিকা। মাথাটা ঝাকিয়ে সে শুকনো ঢোক গিলল। ভাবমূর্তি পাল্টে সে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে বলল,

“আপনি কোথায় যাচ্ছেন?”

“সুহাসিনীকে দেখতে!”

“কোথায়?”

“কবরস্থানে।”

“এই ভোরে?”

“হ্যাঁ। তো?”

“আমাকে নিয়ে যাবেন?”

“আপনি যেয়ে কী করবেন?”

“আমিও তাকে দেখব!”

“উঁহু। আপনি গেলে আমি বিরক্ত হব!”

“প্রমিস। আমি আপনাদের মাঝখানে আসব না!”

“তবুও আমি আপনাকে আমার সাথে নিবনা!”

বলেই রূপল নীহারিকাকে পাশ কাটিয়ে রুম থেকে বের হয়ে গেল। অমনি ওয়াশরুম থেকে ভেজা শরীরে রাতুল বের হয়ে এলো! চুল মুছতে মুছতে সে নীহারিকার মুখোমুখি পড়ে গেল। অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল নীহারিকা। দ্রুত সে রুম থেকে বের হওয়ার জন্য পা বাড়াতেই রাতুল পিছু ডেকে নীহারিকাকে থামিয়ে দিলো। দেঁতো হেসে দুষ্টুমিভরা গলায় বলল,

“আপনি জানতেন তাইনা? আমি এখন শাওয়ার নিয়ে ওয়াশরুম থেকে বের হব?”

তাজ্জব বনে গেল নীহারিকা। উল্টো পাশ ফিরেই সে প্রশ্ন ছুড়ল,

“মানে?”

নির্লজ্জের মত রাতুল ঠোঁট কামড়ে বলল,

“মানে এই তো। উন্মুক্ত শরীরে আপনি আমাকে দেখে ফেললেন! যা সব মেয়েরাই দেখতে চায়!”

“আরে কী আশ্চর্য! আমিতো এসেছিলাম মিস্টার রূপলকে দেখতে। আপনিও এই মুহূর্তে শাওয়ার নিয়ে বের হবেন কে জানত?”

“আরে হয়েছে হয়েছে। সত্যিটা স্বীকার করুন। তাহলেই তো সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেল!”

“রাবিশ!”

প্রচণ্ড ক্ষোভ নিয়ে নীহারিকা জায়গা থেকে প্রস্থান নিলো। বিপরীতে রাতুল দম ফাটা হাসিতে মত্ত হয়ে পড়ল। অস্বস্তিকর পরিস্থিতি থেকে রেহাই পেয়ে নীহারিকা একপ্রকার দৌড়োতে লাগল রূপলের পেছনে। বাড়ির ড্রয়িং রুম অবধি যেতেই রূপল হঠাৎ থেমে গেল। ফোনে কারো সাথে কথা বলছিল সে। কথা বলা বন্ধ করে সে হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেল। ছুটে গিয়ে নীহারিকা রূপলের মুখোমুখি দাড়াল। পেরেশানি গলায় রূপল নীহারিকাকে বলল,

“সাফোয়ানের খু/ন হয়েছে!”

#চলবে…?

#ফেরারি_প্রেম
#পর্ব_১৭
#নিশাত_জাহান_নিশি

“সাফোয়ানের খু/ন হয়েছে!”

তৎক্ষণাৎ স্তব্ধিত হয়ে দাড়িয়ে পড়ল নীহারিকা। বিস্ময়ে এবং আতঙ্কে তার চোখ দুটি বৃহৎ আকার ধারণ করল। উদগ্রীব হয়ে সে অধিক চিন্তাগ্রস্থ রূপলের দিকে পূর্ণ দৃষ্টি ফেলল। শঙ্কিত গলায় প্রশ্ন ছুড়ল,

“কীভাবে খু/ন হলো?”

পেরেশান হয়ে রূপল তার মাথার চুলগুলো এলোমেলো করে ফেলল! আগ্রাসী গলায় প্রত্যত্তুরে বলল,

“ছু/রির আঘাতে তাকে খু/ন করা হয়েছে। এখনি আমাকে একবার হসপিটালে যেতে হবে।”

“আমিও যাব প্লিজ!”

“ওখানে গিয়ে আপনার কোনো কাজ নেই। আপনি বরং বাসাতেই থাকুন।”

নীহারিকাকে ডিঙিয়ে রূপল হসপিটালের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেল। যাত্রাপথে রূপলকে বাঁধা দিতে চাইলনা নীহারিকা। মন খারাপ করে সে একই জায়গায় দাড়িয়ে রইল। মনে মনে চিন্তাভাবনা করে নিলো বাড়ি থেকে বের হলেই রূপলের পিছু নিবে সে! সুহাসিনীর মৃত্যু থেকে শুরু করে সাফোয়ানের খু/ন কোনোটাই তার কাছে স্বাভাবিক মনে হচ্ছেনা! এর পেছনে পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে অনেক রহস্য এবং ষড়যন্ত্র লুকিয়ে আছে। সেদিনের ছায়াটি এখনও তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে! এই ছায়াটির রহস্য ভেদ করতে পারলেই তবে সব ষড়যন্ত্র তার কাছে দিনের আলোর মত পরিষ্কার হয়ে যাবে।

এসব অসংখ্য ভাবনাচিন্তার মাঝখানে নীহারিকা হঠাৎ খেয়াল করল তার পেছনে কেউ দাড়িয়ে আছে! অমনি নীহারিকা ঝট করে পিছু ঘুরে তাকালো। মিচকে হাসি দিয়ে দাড়িয়ে থাকা রাতুলকে দেখামাত্রই নীহারিকা থতমত খেয়ে গেল! বুকে থুথু ছিটিয়ে সে রূঢ় গলায় বলল,

“আপনি এখানে?”

হাত দুটো ঝেড়ে রাতুল প্যান্টের পকেটে হাত রাখল! বেশ ভাবসাব নিয়ে সে নীহারিকার দিকে খানিক অগ্রসর হয়ে বলল,

“কেন? এক্সপেক্ট করেননি?”

“এক্সপেক্ট করার কথা ছিল কী?”

“হয়ত ছিল!”

“সামনে থেকে সরুন।”

“বেয়াইন সাহেবার দেখছি খুব রাগ! এত রাগী হলে উপস্থিত বুদ্ধি কাজ করবে কীভাবে? ব্রেন সচল থাকবে কীভাবে?”

ভ্রু দুটি নাচিয়ে রাতুল প্রশ্ন ছুড়ল নীহারিকার দিকে। সন্দেহজনক দৃষ্টিতে নীহারিকা রাতুলের দিকে তাকালো! তার কথাবার্তায় যেন বিশেষ কিছুর আভাস পাচ্ছে নীহারিকা। তবে রাতুলের প্রতি সন্দেহটা নীহারিকা প্রকাশ করলনা। বরং সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে সে রাতুলের বিস্তীর্ণ দেহে দৃষ্টি বুলালো! মিনিট কয়েক সে রাতুলকে নিঁখুতভাবে প্রত্যক্ষণ করে ভাবশূণ্য গলায় বলল,

“নাইস ওয়াচ।”

বলেই সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রাতুলকে উপেক্ষা করে সে খাবার টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। হন্ন হয়ে রাতুল নীহারিকার পিছু নিয়ে বলল,

“কেন? ওয়াচটা আপনার পছন্দ হয়েছে?”

খাবার টেবিলে বসে নীহারিকা আপেলে কামড় বসিয়ে বলল,

“কিন্তু এটাতো ছেলেদের ওয়াচ।”

নীহারিকার পাশের চেয়ারটি টেনে সেই চেয়ারটিতে বসে পড়ল রাতুল। ব্যস্ত গলায় নীহারিকাকে বলল,

“আপনি চাইলে সেইম ডিজাইনের লেডিস ওয়াচও আমি আপনার জন্য এনে দিতে পারি।”

“আরে না না। লাগবেনা। আমি জাস্ট এমনি বললাম।”

মৃদু হেসে রাতুল অন্য একটি আপেলে কামড় বসালো। নীহারিকার দিকে তাকিয়ে মিচকে হেসে বলল,

“পরীক্ষা নিলেন?”

রাতুলের হাসিমুখের দিকে তাকিয়ে নীহারিকা গভীর ধ্যানে ডুবে গেল। একদৃষ্টিতে সে রাতুলের হাসির দিকে তাকিয়ে রইল! বিষয়টায় বেশ মজা পেল রাতুল। দেঁতো হেসে সে টিটকারিপূর্ণ গলায় বলল,

“কী বেয়াইন সাহেবা? প্রেমে টেমে পড়ে গেলেন না-কী?”

“উঁহু! তবে আপনার হাসিটা অনেক সুন্দর। আমার পরিচিত একজনের সাথে মিলে।”

“কে সে?”

“আপনি চিনবেন না।”

“বলেই দেখুন না চিনি কী-না।”

“সময় হলে বলব।”

জোরপূর্বকভাবে সকালের নাশতা খেয়ে নীহারিকা বাড়ির উদ্দেশ্যে হাঁটা ধরল। চলতি পথে সে হঠাৎ হাঁটা থামিয়ে দিলো! কোনোভাবে সবিতার বাড়ির ঠিকানা জোগাড় করে সে ছুটে গেল সবিতার বাড়ির উদ্দেশ্যে! একতলা বাড়িটিতে ভাড়ায় থাকে সবিতা। যদিও এই মুহূর্তে সবিতার বাড়ি থাকার কথা নয় তবে বাড়িটির সদর দরজা খোলা! বাসার ভেতর থেকে ছোট্টো হৃদির কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে। চিন্তিত হয়ে নীহারিকা দরজা খুলে বাড়ির ভেতর ঢুকল। বাড়ির ড্রইং রুম পার হয়ে নীহারিকা বেডরুমে ঢুকতেই দেখতে পেল বিছানার উপর বসে হৃদি মা মা বলে চিৎকার করে কাঁদছে। বুঝাই যাচ্ছে সবিতা হৃদিকে বাড়িতে একা ফেলেই সাফোয়ানের মৃত্যুর সংবাদ শুনে হসপিটালে ছুটে গেছে! উদ্বিগ্ন হয়ে নীহারিকা হৃদির পাশে বসল। হৃদির মাথায় হাত বুলিয়ে আদুরে স্বরে বলল,

“কেঁদো না হৃদি। তোমার মা চলে আসবে তো।”

কাঁদতে কাঁদতে হৃদি নীহারিকার বুকের সাথে মিশে বলল,

“আমার মা কোথায় আন্টি?”

“আছে তো তোমার মা। এক্ষণি চলে আসবে।”

“আমি আমার বাবার কাছে যাব আন্টি! বাবা কেন এখনও আসছেনা?”

আচমকাই নীহারিকার চোখে জল চিকচিক করে উঠল। এই মুহূর্তে হৃদিকে সে কীভাবে শান্তনা দিবে? তার বাবা তো পৃথিবীতে আর নেই! চাইলেও তার বাবা আর কখনও তার কাছে আসতে পারবেনা। হৃদিকে বুকের সাথে মিশিয়ে নীহারিকা ব্যথিত গলায় বলল,

“তোমার বাবা আমাদের ছেড়ে অনেক দূরে চলে গেছে হৃদি! ফিরতে অনেকটা সময় লাগবে! সেই সময় অবধি তুমি তোমার মায়ের কাছে লক্ষ্মী মেয়ের মত থাকবে কেমন?”

“আমার মাকেও তো খুঁজে পাচ্ছিনা আন্টি।”

“তোমার মা একটু দরকারে বের হয়েছে হৃদি। তুমি বরং এখন আমার সাথে আমার বাড়ি চলো। তোমার মা ফিরে আসলে আমি তোমাকে আবার তোমার মায়ের কাছে দিয়ে যাব। রাজি?”

নীহারিকার এক কথায় রাজি হয়ে গেল হৃদি। অবুঝ মন নিয়ে রেডি হয়ে গেল সে নীহারিকার সাথে নীহারিকাদের বাড়িতে যেতে! তক্ষুণি হঠাৎ নীহারিকা কিছু একটা ভেবে পাশের রুমটিতে গেল। রুমটি যে সুহাসিনীর ছিল তা রুমে ঢুকেই হাতের বাঁ পাশে থাকা বড়ো দেখতে সুহাসিনীর ছবির ফ্রেম দেখেই বুঝা গেল! সমস্ত ঘরে চোখ বুলিয়ে নীহারিকার দৃষ্টি পড়ল হঠাৎ খাটের পাশে থাকা ছোটো পড়ার টেবিলটির দিকে। টেবিলের উপর অনেকগুলো বইয়ের সাথে একটি ডায়েরী দেখতে পেল নীহারিকা! ডায়েরীটি দেখামাত্রই সে আগপাছ না ভেবে ডায়েরীটি প্রথমে হাতে তুলে নিলো! সাবধানে ডায়েরীটি হাতে রেখে সে শুড়শুড়িয়ে হেঁটে রুম থেকে বের হয়ে গেল! আর এক মুহূর্ত কোথাও না দাঁড়িয়ে সে হৃদিকে কোলে নিয়ে সোজা বাড়ি থেকে বের হয়ে গেল!

বাড়ি পৌঁছে হৃদিকে পিয়াসার কাছে রেখে নীহারিকা ডায়েরীটি তার ঘরে যত্নসহকারে রেখে দিলো। সময় পেলে ডায়েরীটি পড়বে সেই আকাঙ্ক্ষা নিয়ে। এদিকে হসপিটালে কী হচ্ছে না হচ্ছে তা জানার আগ্রহ থেকে নীহারিকা হসপিটালের উদ্দেশ্যে রওনা হলো। কিছুক্ষণ পরই হসপিটালে পৌঁছে গেল নীহারিকা। রূপলের পাশে রাতুলকে দেখে অবাক হয়ে গেল নীহারিকা! দ্রুত পায়ে হেঁটে সে রূপল এবং রাতুলের মুখোমুখি দাড়ালো। নীহারিকাকে দেখে রূপল বিরক্তবোধ করল! কর্কশ গলায় বলল,

“আপনি এখানে কী করছেন?”

রূপলের প্রশ্নে মনোযোগ না দিয়ে নীহারিকা পাল্টা রূপলের দিকে প্রশ্ন ছুড়ল,

“সাফোয়ানের ড্যা/ড/ব/ডি কোথায়?”

“ফরেনসিক ল্যাবে। আপনি আবার এখানে আসতে গেলেন কেন?”

রাতুলও রূপলের সাথে তাল মিলিয়ে নীহারিকার দিকে প্রশ্ন ছুড়ল,

“হ্যাঁ। আপনি তো বাসায় গিয়েছিলেন তাইনা? এখানে আবার কী করছেন?”

খরখরে গলায় নীহারিকা প্রত্যত্তুরে রাতুলকে বলল,

“আমি আপনাকে জবাবদিহি করতে বাধ্য নই!”

নীহারিকার রূঢ় জবাবে তেতে গেল রূপল! রাগী দৃষ্টিতে সে নীহারিকার দিকে তাকালো। তেজী গলায় প্রশ্ন ছুড়ল,

“আপনি কী এখানে সিনক্রিয়েট করতে এসেছেন?”

প্রত্যত্তুরে নীহারিকা সোজাসাপটা গলায় বলল,

“না। তবে আপনার সাথে কিছু জরুরি কথা বলতে এসেছি!”

“বাসায় গিয়ে শুনব। এখন আপনি যেতে পারেন। এমনিতেই আছি টেনশানের মধ্যে। তার উপর এই অসময়ে আপনার এসব নাটুকে কথা।”

“নাটুকে কথা না। আপনি সাইডে আসুন। আপনার সাথে সত্যিই আমার কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে।”

অমনি রাতুল রূপলকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে শান্ত গলায় নীহারিকাকে বলল,

“আচ্ছা যা বলার আমাকে বলুন। আমি পরে রূপলকে সব বুঝিয়ে বলছি।”

“না। যা বলার আমি মিস্টার রূপলকেই বলব।”

ঘাড়ত্যাড়ামো করে নীহারিকা ঝট করেই রূপলের হাত টেনে ধরল! রূপলকে টেনে এনে সে রাতুলের থেকে কিছুটা দূরে এসে দাড়ালো। অমনি রাগে গিজগিজ করে উঠল রূপল! নীহারিকা তার হাতে স্পর্শ করেছে তা তার মোটেও পছন্দ হয়নি! রাগ নিয়ন্ত্রণ না করতে পেরে সে আস্তে করে নীহারিকার গালে চড় বসিয়ে দিলো! মনে হলো মশা মারল! অমনি নীহারিকা গালে হাত দিয়ে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে রূপলের দিকে তাকালো। দাঁত কিড়মিড়িয়ে রূপল আঙুল তুলে নীহারিকাকে শাসিয়ে বলল,

“অকারণে আমার গাঁয়ে হাত দেওয়া আমি পছন্দ করিনা। সুহাসিনী ছাড়া এই অবধি কোনো মেয়ে আমার গাঁয়ে টাচ করতে পারিনি। আপনি এই নিয়ে দ্বিতীয় বার আমার গাঁয়ে টাচ করার সাহস দেখিয়েছেন! আশা করি তৃতীয় বারের বেলায় সতর্ক হয়ে যাবেন!”

হনহনিয়ে নীহারিকার সামনে থেকে প্রস্থান নিলো রূপল! মিটিমিটি হেসে রাতুল নীহারিকার দিকে এগিয়ে এলো। হাসি থামিয়ে সে নীহারিকার মুখোমুখি দাড়ালো। জোরপূর্বক উদ্বিগ্ন ভাব নিয়ে বলল,

“চড়টা কী বেশী লেগেছে?”

লজ্জায় তৎক্ষনাৎ মাথা নুইয়ে নিলো নীহারিকা। চোখ থেকে তার টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়ল। নীহারিকা কাঁদছে তা বুঝতে পেরে রাতুল ব্যথিত স্বরে বলল,

“কাঁদবেন না প্লিজ। রূপল একটু ওরকমই। মেয়ে মানুষদের তেমন পছন্দ করেনা। যা বলার আপনি আমার কাছে বলুন। আই সোয়ার, আমি আপনার সব কথা মনোযোগ দিয়ে শুনব!”

চোখ তুলে নীহারিকা রাগী দৃষ্টিতে রাতুলের দিকে তাকালো। না চাইতেও দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

“আপনাকে প্রথম থেকেই আমার পছন্দ হচ্ছেনা! আপনি প্লিজ আমার সামনে থেকে যাবেন?”

“কেন? আমি কী আপনার কোনো ক্ষতি করেছি? আমাকে পছন্দ না হওয়ার কারণ কী?”

“কারণটা জানা থাকলে নিশ্চয়ই আপনি আমার সামনে দাড়িয়ে থাকতে পারতেন না!”

“কী করতেন শুনি?”

“খু/ন করতাম!”

বলেই নীহারিকা রাগে রি রি করে সামনের দিকে হাঁটা ধরল। অট্ট হেসে রাতুল পিছু ডেকে নীহারিকাকে বলল,

“এমন তেজী মেয়েই আমার খুব পছন্দ বেয়াইন সাহেবা! হবেন না-কী আমার জীবনের নাইকা?”

#চলবে…?

[রি-চেইক করা হয়নি। ভুলত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।]

#ফেরারি_প্রেম
#পর্ব_১৮
#নিশাত_জাহান_নিশি

“এমন তেজী মেয়েই আমার খুব পছন্দ বেয়াইন সাহেবা! হবেন না-কী আমার জীবনের নাইকা?”

পরিস্থিতির চাপে পড়ে নীহারিকা মুখ বুজে রাতুলের সব ইয়ার্কি সহ্য করে নিলো! চোখে জল মনে অদম্য জেদ নিয়ে সে হনহনিয়ে হসপিটাল থেকে বের হয়ে গেল! জেঁচে পড়ে অপমানিত হওয়ার মত সহ্যশক্তি আর অবশিষ্ট নেই তার। সবিতা এখন কোথায় আছে, কেমন আছে, কী করছে সে সম্পর্কেও তার কিছু জানা হলোনা। রূপল যে কেন তাকে সহ্য করতে পারেনা তাই বুঝতে পারেনা নীহারিকা! সময়ে অসময়ে তার উপরে ক্ষোভ ঝেড়ে নেয়। কী এমন ক্ষতি করল সে রূপলের? যার রেশ ধরে রূপল যেখানে সেখানে তাকে অপদস্থ করতে ছাড়ে না? তবে রাতুলকে সে দেখে নিবে। এমন ফা’ল’তু টাইপ ছেলে তার পছন্দ নয়। বেয়াই হয়েছে তো কী মাথা কেটে নিয়েছে? যখন তখন তার সাথে ইয়ার্কি করবে? সবকিছুর তো একটা লিমিট থাকা উচিৎ। লিমিট অতিক্রম করা তার মোটেও পছন্দ নয়।

রাগে, ক্ষোভে, দুঃখে নীহারিকা পায়ে হেঁটেই বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলো! দিক-বিদিক তাকানোর সময় নেই তার। রূপলকে আর কখনও প্রশ্রয় দিবেনা সে! এজন্যই বলে, মানুষের উপকার করতে নেই। এই উপকারই এক সময় গলায় ধরে। তাই সময় থাকতে নিজেকে শুধরে নেওয়া ভালো।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। রাতুল তার মা-বাবাকে নিয়ে পিয়াসাকে দেখতে তার শ্বশুড়বাড়িতে এলো। অসুস্থ পিয়াসা তার মা-বাবা এবং রাতুলকে দেখে বড্ড খুশি হয়ে গেল। বিশেষ করে রাতুলকে দেখে তার মন খুশিতে ভরে উঠল। রাতুলকে জড়িয়ে ধরে সে আবেগাপ্লুত গলায় বলল,

“কত বছর পর তোমাকে দেখলাম ভাইয়া। মনটা সত্যি শান্ত হয়ে গেল।”

রাতুলও মুদু হেসে পিয়াসাকে জড়িয়ে ধরল। বিনিময়ে আবেগঘন গলায় বলল,

“সত্যিই অনেক বছর পর আমাদের দেখা হলো রে। বিশেষ করে তোকে, রূপলকে খুব মিস করছিলাম। ভাবছিলাম কবে আমরা একসাথে হব। আজ যেন ষোলোকলা পূর্ণ হলো। এখন বল তোর শরীরের কী অবস্থা?”

“এখন মোটামুটি ভালো আছি ভাইয়া। তোমাদের পেয়ে তো আরও ভালো হয়ে গেলাম।”

ফিক করে হেসে দিলো রাতুল। প্রসঙ্গ পাল্টে প্রশ্ন ছুড়ল,

“তোর বর কোথায়? দেখতে পাচ্ছিনা যে?”

“নিহাল তো অফিসে ভাইয়া। ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হবে।”

পিয়াসাকে ছেড়ে রাতুল তার পাশে হেলান দিয়ে বসল। নিজেদের মধ্যে নানা রকম আলাপে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। পিয়াসা তার বিয়ের দিনের সমস্ত ঘটনা এক এক করে রাতুলকে শুনাতে লাগল। রাতুলও সব মনযোগ দিয়ে শুনছিল। মাঝে মাঝে কটমট করে রাগও প্রকাশ করছিল! এরই মধ্যে নাজনীন বেগম হঠাৎ কৌতূহল বশত পিয়াসার দিকে প্রশ্ন ছুড়ে বললেন,

“কী রে পিয়াসা? তোর শ্বশুড় শ্বাশুড়ি কোথায়? তাদের দেখছিনা যে? বাড়ির কাজের মেয়ে এসে দেখি দরজা খুলে দিলো।”

শুকনো গলায় পিয়াসা জবাবে বলল,

“নীহারিকাকে খুঁজতে ব্যস্ত সবাই মা!”

রাতুল হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে উঠল! সবাইকে থামিয়ে সে পেরেশানি গলায় বলে উঠল,

“হোয়াট? কোথায় নীহারিকা?”

“জানিনা ভাইয়া! সকাল থেকে তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা।”

“আরে কী বলিস এসব? দুপুরের দিকেও তো তার সাথে আমার কথা হলো, দেখা হলো, দুষ্টুমিও হলো। এতটুকু সময়ের মধ্যে সে কোথায় গেল?”

অমনি ঘাবড়ে ওঠা গলায় পিয়াসা বলল,

“জানিনা ভাইয়া কোথায় গেল। তবে নীহারিকা কখনও এমন করেনা। আজই প্রথম এমন করল। খুব টেনশন হচ্ছে তার জন্য।”

সবার মধ্যে এবার আতঙ্ক কাজ করতে লাগল। ছটফটাতে লাগল সবাই। অমনি ওয়াশরুম থেকে ছোট্টো হৃদি গুটি গুটি পায়ে হেঁটে বের হয়ে এলো! কারো দিকে না তাকিয়েই সে আনমনা হয়ে পিয়াসাকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“তোমার ঘরে কে এলো গো পিয়ু আন্টি?”

তৎক্ষণাৎ পিয়াসার মা জায়গা থেকে নড়েচড়ে উঠলেন। বসা থেকে সোজা দাড়িয়ে পড়লেন তিনি। চোখ দুটো বড়ো বড়ো করে হৃদির দিকে তাকালেন। হতবাক গলায় বললেন,

“এই মেয়েটা এখানে কী করছে?”

রাতুলও আচমকা পিয়াসার পাশ থেকে ওঠে দাড়ালো! হৃদির দিকে এক ঝলক তাকিয়েই সে সঙ্গে সঙ্গে চোখ দুটো নামিয়ে নিলো। পকেটে থাকা ফোনটি হাতে নিয়ে সে ফোন ঘাটতে ব্যস্ত হয়ে গেল! তৎপর গলায় সকলকে উদ্দেশ্য করে বলল,

“আচ্ছা আমি একটু আসছি। একটা জরুরি কল এসেছে।”

বলেই রাতুল তৎক্ষনাৎ পিয়াসার বেডরুম থেকে বের হয়ে গেল! এদিক ওদিক ফিরেও তাকালো না। রাতুলের যাওয়ার পথে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে হৃদি হঠাৎ ভয় পেয়ে দৌঁড়ে এসে পিয়াসার পাশে চুপটি করে বসল। শঙ্কিত গলায় বিড়বিড় করে পিয়াসাকে বলল,

“ওরা কারা আন্টি? কেন এসেছে তোমার ঘরে?”

মৃদু হেসে অবুঝ হৃদির মাথায় হাত বুলালো পিয়াসা। হৃদির ভয় ভাঙানোন জন্য নরম স্বরে বলল,

“ওরা আমার মা-বাবা হৃদি। আমাকে দেখতে এসেছে।”

পিটপিটে চোখে হৃদি পিয়াসার মা-বাবার দিকে একবার তাকালো। তাদের রাগী চোখের দিকে তাকিয়ে পরক্ষণেই সে আবার দৃষ্টি নামিয়ে নিলো! ভয়ে আবারও সিঁটিয়ে উঠল। পিয়াসার পেছনে মুখ লুকালো। অমনি পিয়াসার বাবা হঠাৎ খিটখিটে মেজাজ নিয়ে পিয়াসাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

“মেয়েটা ঐ সুহাসিনীর ভাগনী না?”

পিয়াসা স্বাভাবিক স্বরেই বলল,

“হ্যাঁ বাবা।”

“মেয়েটা তোর এখানে কী করছে?”

“নীহারিকা হৃদিকে আমার কাছে দিয়ে গেছে বাবা।”

“কারণ কী?”

“পরে বলছি। হৃদির সামনে কিছু বলতে চাইছিনা।”

অমনি পিয়াসার মা মুখটা বাঁকিয়ে নিলেন! মুখমণ্ডলে তিক্ততার ছাপ ফুটিয়ে তুললেন। খরতর গলায় পিয়াসাকে বললেন,

“এখন দেখি তোদের দুই ভাই বোনের সাথে সাথে ঐ নীহারিকারও ভীমরতি ধরেছে! দয়ার সাগর একেক জন! দরদ একেবারে উতলে উঠছে!”

বিরক্তি নিয়ে পিয়াসা তার মাকে বলল,

“আহ্ মা চুপ করো তো। মেয়েটার দিকে একবার স্বচক্ষে তাকিয়ে দেখো, কতটা মায়ায় ভরা মেয়েটার মুখ। কেমন যেন পরিচিত মনে হয় তাকে! যেন যুগ যুগ ধরে তাকে চিনি!”

__________________________________

বাড়ি থেকে অদূরে একটি বিশাল রেস্টুরেন্টে মুখোমুখি বসে আছে রূপল এবং নীহারিকা! রাগে ফোঁস ফোঁস করে রূপল ঝুঁকে আছে নীহারিকার দিকে। মনে হচ্ছে যেন এক্ষণি তাকে আস্ত চিবিয়ে খাবে! অথচ সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই নীহারিকার। সে ব্যস্ত একত্রে বার্গার, স্যান্ডুইচ, কোল্ড ড্রিংকস খেতে! তার খাওয়া দেখে মনে হচ্ছে যেন কত যুগ ধরে সে অভুক্ত! নীহারিকাকে একই প্রশ্ন বার বার করতে করতে প্রায় হাঁপিয়ে উঠেছে রূপল! তবুও যেন নীহারিকার মুখ থেকে একটা টু শব্দও বের হচ্ছেনা। সে ব্যস্ত তার খাবার খেতে। অবশেষে রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে রূপল টেবিলে সজোরে এক আঘাত করল! গলা উঁচিয়ে বলল,

“আমার কুয়েশ্চনের কোনো আনসার দিচ্ছেন না কেন?”

অমনি নীহারিকা ভয় পেয়ে খানিক কেঁপে উঠল। বার্গার মুখে নিয়ে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে রূপলের দিকে একবার তাকালো। রেস্টুরেন্টে থাকা মানুষজন সব বিরক্তিকর দৃষ্টিতে রূপলের দিকে তাকিয়ে রয়েছে! সবার রাগী ভাবমূর্তি দেখে রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার এগিয়ে এলেন রূপলের দিকে। নম্র ভাষায় রূপলকে বুঝিয়ে বললেন,

“আস্তে স্যার। এটা একটা পাবলিক প্লেস। সবাই বিরক্ত হচ্ছে। আশা করি আপনি বুঝতে পেরেছেন আমি কী বলতে চাইছি?”

পরিস্থিতি সামলাতে রাগ নিয়ন্ত্রণ করে রূপল জোরপূর্বক হাসল। ম্যানেজারকে উদ্দেশ্য করে বিনয়ী সুরে বলল,

“ওকে।”

ম্যানেজার চলে গেলেন। দাঁতে দাঁত চেপে রূপল পুনরায় ভীতসন্ত্রস্ত নীহারিকার দিকে তাকালো। চোয়াল উঁচু করে পুনরায় তাকে প্রশ্ন ছুড়ল,

“শাফকাতের সাথে আপনি একা এখানে কী করছিলেন? তাও আবার বাড়ি থেকে এত দূরের একটা রেস্টুরেন্টে?”

সব শুনে ডোন্ট কেয়ার ভাব নিলো নীহারিকা! বার্গারে পুনরায় কামড় বসিয়ে সে ছন্নছাড়া গলায় বলল,

“আপনার এতকিছু জেনে কী দরকার? আমি কার সাথে কী করছি না করছি এটাতো আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার!”

“শুনুন? আমার কোনো ইন্টারেস্ট নেই আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপারে এসে নাক গলানোর। এমনিতেই আমি আছি মহা শোকে। নেহাত আপনার মা এসে আমার কাছে রিকুয়েস্ট করে বলেছিলেন আপনাকে খুঁজে দিতে! খবর নিয়ে জানতে পারি আপনি শাফকাতের সাথে এখানে বসে চুটিয়ে প্রেম করছেন! মেয়েদের মন বুঝা বড়ো দায় বুঝেছেন? কিছুদিন আগে যাকে সহ্য করতে পারছিলেন না আজ তার সাথেই একই রেস্টুরেন্টে বসে প্রেমে করছেন!”

“বেশ করেছি প্রেম করে! শাফকাত আর যাই করুক আপনার মত কারণে অকারণে আমার গাঁয়ে হাত তুলবেনা। বুঝে শুনে এরপর হাত তুলবে।”

“কী বললেন আপনি? আমি অকারণে আপনার গাঁয়ে হাত তুলেছি? আগে বলুন আপনি বলা নেই কওয়া নেই হুট করে আমার গাঁয়ে টাচ করলেন কেন?”

“এই শুনুন? আমি অকারণে আপনার গাঁয়ে টাচ করিনি। আমি ঐ লেবেলের ফালতু মেয়ে নই যে অকারণে ছেলেদের গাঁয়ে টাচ করব। আপনাকে আমার একটা জরুরি কথা বলার ছিল। যা লোক সমাজে নয়, আড়ালে বলতে হত!”

ঝাড়ি মেরে রূপল বলল,

“তো এখন বলুন কী কথা?”

“আগে খেয়ে নিই এরপর বলছি! কাল রাত থেকেই অভুক্ত আমি!”

“বিল কে দিবে হ্যাঁ? শাফকাত তো আমার ভয়ে দৌঁড়ে পালালো!”

“কেন আপনি দিবেন! শাফকাতের হয়ে আপনি ডেমারেজ দিবেন। আপনার জন্যই তো শাফকাত দৌঁড়ে পালালো।”

“প্রেম করবেন আপনি আর বিল দিব আমি?”

“বেয়াইনের জন্য তো এতটুকু করতেই পারেন! তাছাড়া আমি তার সাথে প্রেম করছিলাম না। হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম আমি। খিদেও পেয়েছিল খুব। সামনে শাফকাতকে পেয়েছিলাম। তাই ভাবলাম তাকে মুরগি বানানো যাক! যাই হোক, এখন যেহেতু আপনি এসেই পড়েছেন তাই বিলটা আপনি দিলে খুশি হব!”

অপারগ হয়ে রূপল ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বলল,

“ওকে!”

মিটিমিটি হাসল নীহারিকা! রূপল যে বাধ্য হয়ে কথাটি বলেছে তা বুঝতে আর বাকী নেই তার। দাঁত গিজগিজিয়ে রূপল অপেক্ষা করছে কখন নীহারিকার খাওয়া শেষ হবে। ঐদিকে কত কাজ পড়ে আছে তার। সবিতাকে একা ফরেনসিক ল্যাবে রেখে এসেছে সে। না জানি ওখানে কী কী ঘটে যাচ্ছে। টেনশনে মাথা ফেটে যাচ্ছে তার। সুহাসিনীর কথা ভেবেও বুকের ব্যথাটা বাড়ছে তার। কোন দিকেই যেন শান্তি নেই তার।

হাতে থাকা বার্গারটি গপাগপ খেয়ে নীহারিকা পানি খেয়ে গলাটা ভিজালো। সক্রিয় দৃষ্টিতে রূপলের দিকে তাকালো সে। রূপলের মুখোমুখি ঝুকে এসে তৎপর গলায় বলল,

“আপনার মনে আছে? সুহাসিনী মৃত্যুর আগে আপনাকে কী বলে গিয়েছিল?”

রূপলও বেশ সক্রিয় গলায় নীহারিকাকে বলল,

“হ্যাঁ মনে আছে। হৃদিকে আগলে রাখতে বলেছিল।”

“ইয়েস। পয়েন্ট টু বি নোটেড! তার মানে কী দাঁড়ায় জানেন?”

“কী?”

“হৃদিকে ঘিরেই সমস্ত রহস্য লুকিয়ে আছে!”

#চলবে….?