#ফেরারি_প্রেম
#পর্ব_১৯
#নিশাত_জাহান_নিশি
“হৃদিকে ঘিরেই সমস্ত রহস্য লুকিয়ে আছে!”
ঘাড় দুলালো রূপল। নীহারিকার অভিব্যক্তি সে মানতে নারাজ! পাল্টা নীহারিকার ভুল ভাঙানোর জন্য সে স্পষ্ট ভাষায় নীহারিকাকে বলল,
“উঁহু। আপনার হয়ত কোথাও ভুল হচ্ছে! হৃদির জন্মের পর থেকেই হৃদির প্রতি সুহাসিনীর আলাদা এক টান ছিল। সবিতাও হয়ত মা হয়ে হৃদির প্রতি এতটা যত্নশীল ছিলনা যতটা সুহাসিনী ছিল। যবে থেকে সুহাসিনীর আমার সাথে পরিচয় হয়েছে ঠিক তবে থেকেই দেখেছি সুহাসিনী হৃদিকে কতটা ভালোবাসে! সুহাসিনীর দেখাদেখি আমারও হৃদির প্রতি আলাদা এক টান তৈরী হয়েছিল! যা হয়ত সুহাসিনী বুঝতে পেরেছে যার জন্য সুহাসিনী মৃত্যুর আগে হৃদিকে আমার কাছে আমানত হিসেবে রেখে গেছে।”
রূপলের কথার পরিপ্রেক্ষিতে অট্ট হাসল নীহারিকা! পুনরায় সে রূপলের দিকে ঝুঁকে এলো। শক্ত গলায় রূপলকে বলল,
“লিসেন, মায়ের চেয়ে খালার দরদ বেশী মানা যায়! তবে দরদটা অতিরিক্ত হলে বুঝে নিতে হবে এখানে নিশ্চয়ই কোনো ঘটনা আছে। যা আপনি বা আমরা কখনও জানার বা বুঝার চেষ্টা করিনি।”
“আপনি কী বুঝাতে চাইছেন একটু ক্লিয়ারলি বলবেন?”
“আমি নিজেও এই বিষয়ে পুরোপুরি ক্লিয়ার না। ডায়েরিটা পড়লেই তবে সব ক্লিয়ার করতে পারব।”
কপাল কুঁচকালো রূপল। নীহারিকার দিকে উজবুক দৃষ্টি নিক্ষেপ করল সে। হটকারি গলায় প্রশ্ন ছুড়ল,
“হোয়াট? কীসের ডায়েরী?”
“সুহাসিনীর ডায়েরী।”
“কোথায় পেলেন এটা? আপনি কী তাদের বাড়িতে গিয়েছিলেন?”
“হুম। আর হৃদিকেও ভাবির কাছে রেখে এসেছি।”
স্বস্তি খুঁজে পেল রূপল! অতিশয় নীহারিকার দিকে ভরসার দৃষ্টি নিক্ষেপ করল সে। সন্তুষ্ট গলায় বলল,
“থ্যাংক ইউ সো মাচ। এতকিছুর চাপে আমি হৃদির কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। সবিতার মাথা থেকেও হয়ত হৃদির বিষয়টা বের হয়ে গিয়েছিল! তাই তাকে সাথে নিয়ে যেতে ভুলে গিয়েছিল। এতকিছুর মাঝেও হৃদির কথাটা আপনি মনে রেখেছেন দেট’স হোয়াই আপনাকে ম্যানি ম্যানি থ্যাংকস।”
ফিচেল হাসল নীহারিকা। অকপটে গলায় প্রত্যত্তুরে রূপলকে বলল,
“এবার বুঝতে পেরেছেন তো? মা হয়ে সবিতা আপু হৃদির প্রতি কতটা কেয়ারলেস? আদোতে একজন মায়ের পক্ষে কী সম্ভব তার মেয়েকে একা একটা বাড়িতে রেখে বের হয়ে যাওয়া? এতটা সময় পাড় হয়ে যাওয়ার পরেও মেয়ের কোনো খোঁজ খবর না নেওয়া? এতটা কেয়ারলেস কী একজন মাকে মানায় বলুন?”
বিষয়টা নিয়ে কোনোকিছু না ভেবেচিন্তেই রূপল ফট করে নীহারিকাকে বলে উঠল,
“এসব আপনার মনের সন্দেহ! সবিতা এখন তার মধ্যে নেই। তার স্বামীকে খু/ন করা হয়েছে। তার স্বামী যতই খারাপ হোক না কেন স্ত্রী হয়ে তো সে তার স্বামীর জন্য পাগলামী করবেই। এই সময়ে কী কারো মাথা ঠিক থাকে?”
“আপনার সাথে অযথাই তর্ক করে আমি পারবনা! তাই এই মুহূর্তে আমি আপনার সাথে কোনো তর্কে যেতে চাইছিনা।”
তিক্ততা নিয়ে রূপল দাঁতে দাঁত চাপল। রুষ্ট গলায় প্রশ্ন ছুড়ল,
“আপনার খাওয়া শেষ হলে এবার উঠি?”
“খাওয়া শেষ হলেও আমার কথা এখনও শেষ হয়নি!”
“কী কথা বাকী আছে আবার?”
“সাফোয়ান ভাইয়ার খু/নটা কী আজই হয়েছে নাকী কাল?”
ভরা রেস্টুরেন্টে কোনো সিনক্রিয়েট করতে চায়না রূপল। তাই সে সাবলীলভাবে রাগ নিয়ন্ত্রণ করে শিথিল গলায় বলল,
“ভোর চারটায় হয়েছে।”
“আর একটা লাস্ট কুয়েশ্চন।”
“কী?”
“মিস্টার রাতুল কী রাতে আপনার সাথেই ছিল?”
“খেয়াল করিনি। রাতে আমি বেলকনিতে ছিলাম।”
“ওকে। ভোরে যখন আপনি শাওয়ার নিতে ওয়াশরুমে ঢুকলেন তখন কী উনাকে রুমে দেখেছিলেন?”
আপত্তি সত্ত্বেও রূপল প্রত্যত্তুরে বলল,
“বাইরে থেকে তখন রুমে ঢুকছিল। পানি খেতে নিচে গিয়েছিল।”
অমনি নীহারিকা সংক্রিয় হয়ে উঠল। চোখেমুখে তার অস্থির ভাব ফুটে উঠল। উত্তেজিত গলায় সে রূপলের দিকে প্রশ্ন ছুড়ল,
“বাইরে থেকে এসে উনি আপনার পর পরই শাওয়ার নিতে ঢুকেছিলেন রাইট?”
“হুম। কিন্তু কেন?”
তৎক্ষনাৎ জায়গা থেকে ওঠে দাড়ালো নীহারিকা। প্রশ্নবিদ্ধ ভাবমূর্তি পাল্টে সে ব্যস্ত স্বরে রূপলকে বলল,
“চলুন আমরা উঠি।”
“আগে তো বলুন আপনার মাথায় ঘুরছেটা কী?”
“প্রমাণ ছাড়া কিছু বলে আপনার হাতের চড় খাব না-কী? সকালের চড়টা এখনও আমার গালে লেগে আছে!”
নীহারিকার কথার আগামাথা কিছুই বুঝতে পারলনা রূপল। তবুও এই বিষয়ে তেমন কোনো ঘাটাঘাটি করলনা সে। নীহারিকাকে কোনো ভাবেই সিরিয়াসলি নিতে চাইছেনা সে! এই মুহূর্তে নীহারিকাকে অপ্রোজনীয় হিসেবে ভাবতেও দু’বার বেগ পেতে হচ্ছেনা তাকে! বেপরোয়া ভাব নিয়ে রূপল ওয়েটারকে ডাকল। খাবারের বিল মিটিয়ে নীহারিকাকে নিয়ে রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে গেল। বাধ্য হয়ে নীহারিকাকে তার বাড়ি অবধি পৌঁছে দিয়ে রূপল আবার হসপিটালের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেল।
সন্ধ্যার দিকে বাড়িতে ঢুকতেই নীহারিকার মা-বাবা এবং নিহাল মিলে নীহারিকাকে আচ্ছেমত বকতে শুরু করল! সবার বকুনি খেয়ে নীহারিকা সীমিত সময়ের জন্য মন খারাপ করলেও পরক্ষণে আবার সব ভুলে গেল। কারো সাথে কোনো কথা না বাড়িয়ে সে চুপিসারে নিজের রুমে ঢুকে পড়ল। রুমের দরজাটা ভালো করে ভেতর থেকে আটকে সে বিছানার তলা থেকে সুহাসিনীর সেই ডায়েরীটি বের করল। ডায়েরিটি খুলে সে হতবাক হয়ে গেল! মাঝের কয়েকটা পৃষ্ঠা ছেঁড়া ডায়েরিটির। আগে থেকেই ডায়েরিটির পৃষ্ঠাগুলো ছেঁড়া ছিল না-কী নতুন করে কেউ ছিঁড়েছে তা ঠিক ঠাওর করতে পারলনা সে। তবে সন্দেহ থেকে সে খাটের উপর ডায়েরিটা রেখেই দৌঁড়ে গেল পিয়াসার রুমে। গিয়ে দেখল পিয়াসা হৃদিকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে। রুমে তৃতীয় কারো উপস্থিতি টের পেয়ে পিয়াসা পিছু ঘুরে তাকালো। নীহারিকাকে এক ঝলক দেখামাত্রই পিয়াসা মৃদু হাসল। উৎফুল্ল গলায় প্রশ্ন ছুড়ল,
“তুমি এসেছ নীহারিকা?”
বিনিময়ে নীহারিকাও শুকনো হেসে পিয়াসাকে বলল,
“হ্যাঁ ভাবি। হৃদি কী ঘুমুচ্ছে?”
“হ্যাঁ। মাত্র ঘুমুলো। আগে বলো তো এতক্ষণ তুমি কোথায় ছিলে?”
“পরে বলছি ভাবি। আগে বলুন আজ আমাদের বাড়িতে কী কেউ এসেছিল?”
“তুমি তো জানোই নীহারিকা, আজ আমার মা-বাবা আসার কথা ছিল।”
“মিস্টার রাতুলও কী এসেছিলেন?”
“হ্যাঁ। তবে ভাইয়া বেশিক্ষণ থাকেনি। জরুরি কল আসাতে চলে গিয়েছিল।”
“ওহ্ আচ্ছা। তাহলে আপনি রেস্ট করুন ভাবি। আমি আসছি।”
পিয়াসাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই নীহারিকা হনহনিয়ে রুম থেকে বের হয়ে গেল। পুনরায় নিজের রুমে ঢুকে সে দরজা আটকে দিলো। ডায়েরিটা হাতে নিয়ে সে গভীর চিন্তায় ডুব দিলো। বিড়বিড় করে বলল,
“তবে কী মিস্টার রাতুল আমার ঘরে ঢুকেছিলেন? ডায়েরির কথাটা কোনোভাবে জেনে গিয়েছিলেন তিনি? না-কী এসব আমার মনের ভুল? হতে পারে ডায়েরির পৃষ্ঠাগুলো আগে থেকেই ছেঁড়া ছিল! তবে কী সুহাসিনীই ডায়েরির পাতাগুলো ছিঁড়েছিল না-কী অন্যকেউ?”
এসব নানাবিধ প্রশ্ন মাথায় নিয়ে নীহারিকা ডায়েরিটি খুলল। হুট করেই তার মাথাটা ধরে এলো! শরীরটাও কেমন ম্যাচম্যাচিয়ে উঠল। জ্বর জ্বর অনুভূত হলো। শক্তিতে কুলালো না তার ডায়েরিটি পড়ার। অসুস্থ এবং দুর্বল শরীর নিয়ে সে কাত হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল। জীর্ণ শীর্ণ শরীর নিয়ে একদফা ঘুমানোর চেষ্টা করল। ডায়েরিটি আবারও সযত্নে সে বিছানার তলায় রেখে দিলো।
মাঝখানে কেটে গেল প্রায় সপ্তাহ খানেক! এই এক সপ্তাহে নীহারিকার অবস্থা এতটাই খারাপ হয়ে গিয়েছিল যে, সে শোয়া থেকেও অবধি উঠতে পারছিলনা। রূপলের সাথেও কোনো প্রকার যোগাযোগ করতে পারছিলনা। অথচ রূপলের সাথে যোগাযোগ করাটা তার অত্যাবশকীয় ছিল। সাফোয়ানের খু/নিকেও খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে পুলিশ। তবে জোরদার কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছেনা তারা। সাভারের একটি বস্তি এলাকা থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়েছিল। সেখানেই অভিযান চলছে পুলিশের। আসল খু/নিকে খুঁজে বের করাটা এখন সময় সাপেক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এরমধ্যেই নীহারিকা শুনল রাতুল আবারও দেশের বাহিরে ফিরে যাচ্ছে! যদিও মাসখানিক বাদে তার বাহিরে যাওয়ার কথা ছিল। তবে সেই ডেট সে একমাস আগেই এগিয়ে আনলো! বিষয়টায় বেশ সন্দেহ হলো নীহারিকার! শরীরের অসুস্থতা নিয়েই সে ডায়েরিটি পড়ার সিদ্ধান্ত নিলো! বিছানার তলায় রাখা ডায়েরিটি সে খুলল! খুব মনোযোগের সাথে সে ডায়েরিটি পড়তে লাগল। ডায়েরির পৃষ্ঠাগুলো ক্রমশ যতই এগিয়ে যাচ্ছিল ততই যেন তার গাঁয়ের লোমগুলো শিউরে উঠছিল! মাঝে মাঝে সে আঁতকেও উঠছিল। ডায়েরির গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো ছেঁড়া হলেও লিখার ছাপ অনুযায়ী নীহারিকা কিছুটা মিলিয়ে হলেও ডায়েরিটা পড়তে পারছিল! ডায়েরিটা সম্পূর্ণ শেষ করার পর নীহারিকার গাঁ থেকে অঝরে ঘাম ঝরতে লাগল! ঢকঢক করে সে এক গ্লাস পানি নিমিষেই গিলে খেল। ড্রেসিং টেবিলের উপর থেকে সে ফোনটি হাতে নিয়ে তৎক্ষনাৎ রূপলের নাম্বারে কল করল। প্রথম দুটি কল বেজে যাওয়ার পর রূপল দ্বিতীয় কলটি তুলল। অমনি নীহারিকা দ্রুত গলায় বলল,
“কোথায় আপনি?”
ব্যস্ত গলায় রূপল বলল,
“পুলিশ স্টেশন। কেন?”
“একবার আপনাদের বাড়িতে আসুন। কথা আছে।”
খিটখিটে মেজাজে রূপল বলল,
“আমি এখানে জরুরি কাজে ব্যস্ত নীহারিকা। আপনার কথামত আমি এখান থেকে ওখানে দৌড়োদৌড়ি করতে পারবনা! তাছাড়া আপনি এখন অসুস্থ। এই রোগা শরীর নিয়ে আপনি আমাদের বাড়িতে কী করছেন?”
রুদ্ধশ্বাস ফেলল নীহারিকা৷ রূপলের রাগী ভাবমূর্তি দমন করার জন্য সে রূপলকে চমকে দিয়ে বলল,
“আমি জানি আপনার সুহাসিনীকে কে খু/ন করেছে!”
অমনি উত্তেজিত হয়ে উঠল রূপল। পুলিশ স্টেশন থেকে দ্রুত পায়ে হেঁটে বের হয়ে গেল সে। মাথার চুলগুলো টেনে সে বিশৃঙ্খল গলায় প্রশ্ন ছুড়ল,
“হোয়াট? কে খু/ন করেছে সুহাসিনীকে?”
“প্লিজ একবার আপনাদের বাড়িতে আসুন। আর একটু দেরী হয়ে গেলেই হয়ত সব আমাদের হাতের বাইরে চলে যাবে!”
“আপনি কী আমার সাথে ইয়ার্কি করছেন?”
“আমি এখন ইয়ার্কি করার মুডে নেই মিস্টার রূপল। প্লিজ ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড। আপনার যদি আমার উপরে আস্থা থাকে তো আপনি এক্ষুণি, এই মুহূর্তে আপনাদের বাড়িতে আসুন। আমি আপনার জন্য অপেক্ষা করব।”
অনর্গল কথাগুলো বলেই নীহারিকা কলটি কেটে দিলো। বাড়ির কাউকে কিছু না জানিয়েই সে অসুস্থ শরীর নিয়ে রাতের অন্ধকারে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেল! চুপিসারে রওনা হলো রূপলদের বাড়ির উদ্দেশ্যে। হাতে গোনা প্রায় আধা ঘণ্টার মধ্যেই নীহারিকা রূপলদের বাড়ি এসে পৌঁছে গেল। বাড়ির সদর দরজাটা খোলা! দেখেই বুঝা যাচ্ছে বাড়ি আজ জনমানবশূন্য! ফাঁকা বাড়িতে কোনো প্রকার ভয় ভীতি ছাড়াই নীহারিকা বাড়ির ভেতর ঢুকে সোজা রাতুলের বেডরুমে ঢুকে পড়ল!
তড়িঘড়ি করে রাতুল তার ব্যাগপত্র গুছাচ্ছিল! এর মধ্যেই নীহারিকার আগমন ঘটল তার রুমে। ফাঁকা রুমে দ্বিতীয় কারো উপস্থিতি টের পেতেই রাতুল ঝট করে পিছু ঘুরে তাকালো৷ জোরে জোরে শ্বাস ফেলছিল নীহারিকা। ছুটোছুটিতে সে মোটামুটি ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তারই সুযোগ নিলো রাতুল। দ্রুত পায়ে হেঁটে এসে সে নীহারিকার গলার টুটি চেপে ধরল! রক্তিম চোখে নীহারিকার দিকে তাকালো। গভীর আক্রোশ ভরা গলায় বলল,
“খুব সাহস তোর তাইনা? মেয়ে মানুষদের এত সাহস থাকা ভালোনা তুই জানিস না?”
গলা চেপে ধরার রাখার দরুন নীহারিকা গলায় প্রচণ্ড ব্যথা পাচ্ছিল। একই সাথে তার শ্বাস ফেলতে ও বড্ড কষ্ট হচ্ছিল। চোখ দুটো কোটর থেকে বের হয়ে আসছিল প্রায়। নেতিয়ে পড়া শরীর নিয়ে নীহারিকা প্রাণপণে চেষ্টা করছিল রাতুলের হাত থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য। তবুও যেন শেষ রক্ষা হচ্ছিলনা! উপস্থিত বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে নীহারিকা তার হাতের কাছে থাকা ফুলের টবটি কোনো রকমে হাতে নিলো। শরীরের অবশিষ্ট শক্তি দ্বারা নীহারিকা রাতুলের ঠিক মাথা বরাবর জোরে এক আঘাত করল! অমনি রাতুল বাধ্য হলো নীহারিকার গলা থেকে হাত ছাড়াতে। ছাড়া পেয়ে নীহারিকা রুদ্ধশ্বাস ফেলে ব্যথায় কোঁকাতে থাকা রাতুলকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আপনার সব খেলা শেষ রাতুল! আমি বুঝতে পারিনি আপনি এত জঘন্য একটা মানুষ।”
এতক্ষণে মাথা ফুলে ঢোল হয়ে গেল রাতুলের। পূর্বের তুলনায় আরও অধিক ক্ষেপে গেল সে। সঙ্গে সঙ্গেই হিংস্র রূপ ধারণ করে সে নীহারিকার চুলের মুঠি চেপে ধরল! দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলল,
“আমি শুধু জঘন্য না, অতিরিক্ত জঘন্য একজন মানুষ। ভেবেছিলাম ভালোবেসে তোকে কাছে টেনে নিব! কিন্তু তুই যে ভেতরে ভেতরে এত চতুর আমার তা জানা ছিলনা! খেলা শুরু করার আগেই তুই আমার সব খেলা ভেস্তে দিলি। যেহেতু তুই এখন আমার সব ষড়যন্ত্র জেনেই গেছিস তাহলে তোর আর কোনো অধিকার নেই এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার!”
বর্বর রূপ ধারণ করে রাতুল যেইনা নীহারিকার মাথাটাকে দেয়ালের সাথে ধাক্কা মারতে যাবে অমনি রূপলের আবির্ভাব ঘটল ঘটনাস্থলে! আকস্মিকভাবে পেছন থেকে ছুটে এসে সে নীহারিকাকে আঁকড়ে ধরল! অগ্নিঝরা দৃষ্টিতে সে রাতুলের দিকে তাকালো।
#চলবে…?
#ফেরারি_প্রেম
#পর্ব_২০
#নিশাত_জাহান_নিশি
বর্বর রূপ ধারণ করে রাতুল যেইনা নীহারিকার মাথাটাকে দেয়ালের সাথে ধাক্কা মারতে গেল অমনি অপ্রত্যাশিতভাবে রূপলের আবির্ভাব ঘটল ঘটনাস্থলে! আকস্মিকভাবে পেছন থেকে ছুটে এসে রূপল নীহারিকাকে আঁকড়ে ধরল! অগ্নিঝরা দৃষ্টিতে সে রাতুলের দিকে তাকালো।
বেঘোরে চমকে ওঠে রাতুল রূপলের দিকে তাকালো। ভূত দেখার মত প্রকাণ্ড চোখ তার। গাঁ বেয়ে জবজবিয়ে ঘাম গড়াতে শুরু করল। রূপলের আকস্মিক আগমন তার মন ও মস্তিষ্ককে মুহূর্তেই নাড়িয়ে দিলো। তৎক্ষণাৎ মাথা নুইয়ে নিলো সে। ক্রোধে বশবর্তী হয়ে সে বিড়বিড় করে বলল,
“রূপল এখানে কী করছে? আজ তো রূপলের বাড়ি ফেরার কথা ছিলনা! তাহলে কী ঐ নীহারিকা…? ওহ্ শিট।”
মনে মনে ষড়যন্ত্র কষে এক পা দু’পা করে পিছু হটতে লাগল রাতুল। বুঝতে পারল আজই হয়ত তার শেষ দিন! সব খেলা পন্ড তার। অপরদিকে, রূপল এদিকের কিছুই বুঝতে পারলনা। তবে এতটুকু আঁচ করতে পারল তার অনুপস্থিতিতে এখানে ভয়াবহ্ কিছু ঘটতে চলছিল। সে এই মুহূর্তে এখানে উপস্থিত না হলে নীহারিকার মস্ত বড়ো একটা ক্ষতি হয়ে যেত। রাতুলের এই জঘন্য রূপ কিছুতেই যেন মানতে পারছেনা রূপল। চেনা মানুষটাকে আজ বড্ড অচেনা লাগছে। তবে কী মানুষের মন আকাশের রঙ বদলাতে সময় লাগেনা? তাজ্জব দৃষ্টিতে রূপল ভয়ার্ত রাতুলের দিকে তাকিয়ে রইল। রূপলকে দেখে অভয় পেল নীহারিকা। স্বস্তির শ্বাস ফেলল সে। ছলছল দৃষ্টিতে মাথা ঘুরিয়ে রূপলের দিকে তাকালো। গলাটা চুলকাতে চুলকাতে সে শুকনো কেশে বলল,
“থ্যাংকস রূপল। আপনি এখন না আসলে এই খারাপ লোকটা আমাকে আজ জানেই মে/রে দিতো।”
রাতুলের থেকে আকস্মিক দৃষ্টি সরিয়ে রূপল নীহারিকার দিকে তাকালো। নির্বোধ দৃষ্টি তার। কপাল কুঁচকানো। মিহি আওয়াজে সে প্রশ্নবিদ্ধ গলায় বলল,
“মানে কী? কী হচ্ছে এখানে?”
সেই সুযোগ বুঝে রাতুল যেইনা তার ব্যাগপত্র নিয়ে রুম থেকে দৌঁড়ে পালাতে গেল অমনি নীহারিকা গলা ছেড়ে চিৎকার করে উঠল! রূপলকে সতর্ক করে সে উঁচু গলায় বলল,
“ঐ জোচ্চোরটাকে আটকান রূপল। এই আপনার সুহাসিনীর খু/নী!”
খুব বড়ো সড়ো একটা ধাক্কা খেলো রূপল! তৎক্ষনাৎ হকচকিয়ে উঠল সে। উপায়ন্তর খুঁজে না পেয়ে নীহারিকার কথামত দৌড়ে গিয়ে রাতুলকে পেছন থেকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরল। রূপলের থেকে নিজেকে ছাড়ানোর জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করল রাতুল। তবেই কিছুতেই যেন কোনো সুরাহা হচ্ছিলনা। বারংবার ব্যর্থ হয়ে রাতুল অবশেষে ঝাঁজাল গলায় রূপলকে বলল,
“আমাকে ছাড় রূপল। ফ্লাইটের দেরী হয়ে যাচ্ছে আমার।”
শরীরের সমস্ত শক্তি দ্বারা রূপল রাতুলকে এক প্রকার বেঁধে রাখার চেষ্টা করল। রাতুলের ব্যবহার আচরণে সন্দেহ তৈরী হতে লাগল তার। হতবিহ্বল গলায় সে রাতুলকে বলল,
“নীহারিকা এসব কী বলছে ভাইয়া? তুমি সত্যিই আমার সুহাসিনী র….?”
পুরো বাক্য সম্পূর্ণ করতে পারলনা রূপল! গলা ভিজে এলো তার। ক্লান্ত, দুর্বল এবং ব্যথাযুক্ত শরীর নিয়ে নীহারিকা কোনো রকমে হেঁটে এলো রূপল এবং রাতুলের মুখোমুখি। অবলীলায় চোখের জল ছেড়ে সে ভয়ে সিঁটিয়ে থাকা রাতুলের মুখের দিকে তাকালো। তেজী গলায় রূপলকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“হ্যাঁ মিস্টার রূপল। এই রাতুল-ই আপনার সুহাসিনীর খু/নী।”
বিস্ফোরক রূপলকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে রাতুল নীহারিকাকে ভুল প্রমাণ করার জন্য বলল,
“তুই ওর কথা বিশ্বাস করিস না রূপল! আমি কেন সুহাসিনীকে খু/ন করতে যাব বল? আমি তো তাকে তেমন চিনিই না। তোর মুখ থেকে তার নাম শুনেছি মাত্র! যে জায়গায় আমি মেয়েটাকে পুরোপুরি চিনিই না সেই জায়গায় আমি তাকে খু/ন করতে যাব কেন? আসলে মেয়েটা আমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে বিবেধ তৈরী করার জন্য এসব বলছে রূপল! জানিনা তার উদ্দেশ্য কী! কী ক্ষতি করেছিলাম আমি তার।”
অমনি রূপল আগ্রাসী দৃষ্টিতে নীহারিকার দিকে তাকালো। দুমনায় ভুগতে লাগল সে। মুহূর্তেই তেঁতে ওঠে সে উঁচু গলায় রূপলকে বলল,
“এসব কী নীহারিকা? আপনি কী সত্যিই আমাদের মধ্যে দ্বন্ধ তৈরী করার জন্য আমার ভাইকে ফাঁসাচ্ছেন?”
রূপলের বিশ্বাস ফিরিয়ে আনার জন্য নীহারিকা মরিয়া হয়ে উঠল। বিচলিত হয়ে সে দ্রুত গলায় বলল,
“বিশ্বাস করুন রূপল, আমি একটা কথাও মিথ্যে বলছিনা। আজ আমি সুহাসিনীর রেখে যাওয়া সেই ডায়েরিটা পড়েছি! যে ডায়েরিতে স্পষ্ট লিখা ছিল সুহাসিনীর জীবনে ঘটে যাওয়া প্রত্যেকটা লোমহর্ষক ঘটনা! যে ঘটনাগুলোর সাথে মিস্টার রাতুল ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছেন!”
পূর্বের তুলনায় ভয়টা আরও বেড়ে গেল রাতুলের! সে পুনরায় চেষ্টা করল রূপলের শক্ত বাঁধন থেকে নিজেকে ছাড়ানোর জন্য। রাতুল যতই চেষ্টা করছিল রূপলের কাছ থেকে নিজেকে ছাড়ানোর জন্য রূপল ততই যেন রাতুলকে শক্ত বাঁধনে বেঁধে নিচ্ছিল! নীহারিকার কথা একটু একটু করে বিশ্বাস করতে লাগল রূপল। নীহারিকাকে অভয় যুগিয়ে সে কঠিন গলায় বলল,
“আপনি বলুন নীহারিকা। ডায়েরিতে কী কী লিখা ছিল?”
রূপলের ভরসা পেয়ে সক্রিয় হয়ে উঠল নীহারিকা। কয়েক দফা দম ফেলে সে অনর্গল বলতে আরম্ভ করল,
“আজ থেকে প্রায় সাত বছর আগে যখন মিস্টার রাতুল বাইরে থেকে দেশে ফিরেছিলেন তখন তার সাথে সুহাসিনীর বেস্ট ফ্রেন্ড রামিশার দেখা হয়! প্রথম দেখাতেই মিস্টার রাতুল রামিশাকে ভালোবেসে ফেলেছিলেন! যদিও আদো এটা ভালোবাসা ছিলনা, শরীরের মোহ ছিল মাত্র। তবে রামিশার কাছে তা ভালোবাসাই মনে হয়েছিল! তখন রামিশার বয়স ছিল মাত্র সতেরো বছর! এই সতেরো বয়সী মেয়েকে তিনি ছলাকলায় প্রেমের জালে ফাঁসিয়ে তার সাথে ফিজিক্যাল রিলেশানে জড়ান! প্রায় অনেকবার তাদের মধ্যে এভাবে শারীরিক মেলামেশা হয়। সুহাসিনী এই বিষয়ে কিছুই জানত না৷ রামিশা তখন সুহাসিনীকে কিছুই জানায়নি। যখন ভুলবশত রামিশার পেটে বাচ্চা চলে আসে তখনই সুহাসিনী সবটা জানতে পারে! যদিও প্রথমে সুহাসিনী রামিশার সাথে খুব চোটপাট করে। তার সাথে সমস্ত যোগাযোগ করা বন্ধ করে দেয়, তবে পরে রামিশার কান্নাকাটি দেখে সুহাসিনী গলে যায়। তখন রামিশা এবং সুহাসিনী মিলে মিস্টার রাতুলকে অনেক জোর করে যেকোনো উপায়ে বাচ্চাটাকে স্বীকার করে রামিশাকে বিয়ে করার জন্য। কিন্তু তখন থেকেই মিস্টার রাতুল তার আসল রূপ দেখাতে শুরু করেন! বাচ্চাটাকে অস্বীকার করে তিনি রামিশার সাথেও সমস্ত সম্পর্ক ছেদ করেন। রামিশা ছিল অনাদ। এতিমখানায় থেকে মানুষ হয়েছে সে। ডানে বায়ে তাকে সাপোর্ট দেওয়ার জন্য কেউ ছিলনা! সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়ে রামিশা। তখন সুহাসিনীই তার পাশে এসে দাড়ায়। এতিমখানা থেকে তাকে এনে এলাকা থেকে অনেক দূরে কমদামী একটি ভাড়া বাড়িতে রাখে। যেন এলাকার কেউ তার পেটের বাচ্চাটার কথা জানতে না পারে। তার সম্বন্ধে খারাপ ধারণা করতে না পারে। তোঁপের মুখে পরে সুহাসিনী অনেক বার রামিশাকে বলেছিল বাচ্চাটাকে নষ্ট করে দিতে! তবে রামিশা কোনোভাবেই সুহাসিনীর এই প্রস্তাবে রাজি হয়নি। একটা পাপ ঢাকতে গিয়ে সে আরেকটা পাপ করতে চায়নি। পরিস্থিতি এড়িয়ে গিয়ে নিজের পাপ কর্মকে ঢাকার জন্য মিস্টার রাতুল তখন আবারও দেশের বাইরে ব্যাক করেন! রামিশা তখন এতটাই বোকা ছিল যে মিস্টার রাতুলের পদ পরিচয়, বাড়ির ঠিকানা এমনকি মিস্টার রাতুলকেও পুরোপুরি না জেনে সে তার সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েছিল। সুহাসিনীও তখন রামিশার হয়ে কিছু করতে পারছিলনা। একটা অপরিচিত ছেলেকে সে একা কীভাবে খুঁজবে? যেখানে রাতুলের সাথে তার মাত্র একবারই দেখে হয়েছিল। বয়সও কম ছিল বুঝার ক্ষমতাও তখন কম ছিল। এই ঘটনার কিছু মাস আগেই সবিতা আপু এবং সাফোয়ান ভাইয়ার বিয়ে হয়৷ বিয়ের তিন মাসের মাথায় সাফোয়ান ভাই দেশের বাইরে চলে যান। তখন সবিতা আপুও প্রেগনেন্ট ছিলেন! রামিশার একমাস আগেই সবিতা আপু প্রেগনেন্ট হোন। আস্তেধীরে দিন, মাস গড়াতে থাকে। এভাবেই মাঝখানে কেটে যায় আটমাস। এই আট মাসে রামিশা অনেকবার চেষ্টা করেছিল নিজেকে হ/ত্যা করার! কিন্তু বারংবার সে থেমে গেছে নিজের পেটের বাচ্চাটার কথা ভেবে। সুহাসিনী নিজে না খেয়ে তার খাবারটা রামিশাকে খাইয়েছে! টিউশনি করে টিউশনির পুরো টাকাটা রামিশার ঔষধ, খাওয়াদাওয়া, ঘর ভাড়া সবকিছুতে যতটুকু সম্ভব ব্যয় করেছ। সবিতা আপুকে বলেছে সে তার টিউশনির টাকা দিয়ে তার প্রাইভেট ফি দিচ্ছে! আসলেই কিন্তু না। সে কখনও কোনো প্রাইভেট পড়েনি। বরং প্রাইভেটের সময়টাতে সে আরও একটি টিউশনি বাড়িয়ে করেছে! রামিশার হয়ে সুহাসিনী অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছে। অথচ এমন স্বার্থহীন বন্ধুত্ব আজকালকার যুগে পাওয়া যায়না!”
একদফা দম নিয়ে নীহারিকা আবারও বলতে আরম্ভ করল,
“কাকতালীয়ভাবে একই দিনে সবিতা আপু এবং রামিশার ডেলিভারি ডেইট পড়ে! সুহাসিনী কোনদিকে যাবে বুঝতে পারছিলনা তখন। মহা চিন্তায় পড়ে গিয়েছিল সে। তাও আবার দুজনেরই নরমাল ডেলিভারি! সন্ধ্যায় যখন রামিশার ব্যথা ওঠে তখন সুহাসিনী রামিশাকে নিয়ে এনজিওতে তার ভরসার মানুষ মিস চারুলতা সেনের কাছে চলে যায়! সুহাসিনী তখন চারুলতা সেনের বোনজিকে পড়াত। সেই থেকে দুজনের মধ্যে বেশ সখ্যতা তৈরী হয়। ফ্রেন্ডলি সে রামিশার ব্যাপারে সব শেয়ার করে। চারুলতা সেনও তখন সুহাসিনীকে ভরসা দেন। বিতর্কিতভাবে তিনি সুহাসিনী এবং রামিশার পাশে এসে দাড়ান। তবে এরমধ্যেই ঘটে গেল বিপর্যয়! ব্যথা সহ্য করতে না পেরে বাচ্চা ডেলিভারি হওয়ার পর পরই রামিশা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে! মৃত্যুর আগে বাচ্চাটিকে সে সুহাসিনীর হাওলায় রেখে যায়। এর পর পরই সবিতা আপুর ব্যথা ওঠে। কোনোমতে কল করে সে সুহাসিনীকে তাড়াতাড়ি বাসায় আসতে বলে। সদ্য ডেলিভারি হওয়া ফুটফুটে কোলের বাচ্চাটিকে নিয়ে সুহাসিনী এনজিও থেকে বের হতে পারছিলনা। তার প্রাণপ্রিয় বান্ধবী রামিশার মরদেহ তার চোখের সামনে পরে আছে! এক প্রকার হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ে সে। তাই তার পরিবর্তে মিস চারুলতা সেন সবিতা আপুর কাছে যান। অপ্রত্যাশিতভাবে সবিতা আপু তখন মরা বাচ্চা জন্ম দেন! খবরটা সাফোয়ান ভাই জানতে পারলে সবিতা আপু এবং সুহাসিনীকে জানে মে/রে ফেলতেন। তাই সুহাসিনী রিস্ক নিয়ে রামিশার বাচ্চাটাকে সবিতা আপুর বাচ্চা বলে চালিয়ে দেয়! এই কাজে মিস চারুলতা সেন সুহাসিনীকে সাহায্য করেন।”
থামল নীহারিকা। ভরাট দৃষ্টিতে রূপলের দিকে একবার তাকালো। হতভম্ব হয়ে রূপল ভীতসন্ত্রস্ত রাতুলের দিকে তাকিয়ে রইল। হটকারিকা ভুলে সে শক্ত গলায় রাতুলকে বলল,
“ছিঃ ভাইয়া। তুমি এত জঘন্য? এতটা নিচ? একটা অসহায় মেয়েকে তুমি এভাবে ঠকালে? তার দুর্বলতার সুযোগ নিলে?”
রাতুল তবুও নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করল! রূপলের সহানুভূতি নেওয়ার চেষ্টা করল। শুকনো ঢোঁক গিলে সে কাঠ কাঠ গলায় রূপলকে বলল,
“বিশ্বাস কর রূপল। আমি এসবের কিছুই জানিনা এবং করিও নি। মেয়েটা বানিয়ে বানিয়ে সব মিথ্যে বলছে! তুইতো আমার ভাই। আমার চেয়ে তোর কাছে কী ঐ মেয়েটার বানোয়াট কথাগুলো বেশী বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে?”
গর্জে উঠল নীহারিকা। রাতুলের দিকে এগিয়ে এসে সে ফোঁস করে শ্বাস ছাড়ল। আকস্মিকভাবে রাতুলের গলার টুটি চেপে ধরল! দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“আমি মিথ্যা বলছি না? আমি মিথ্যা বলছি? সেদিন আমি তোকে আবছা আলোয় সুহাসিনীর রুম থেকে বের হতে দেখেছি! তোর মাথার ক্যাপটাও আমি তখনি দেখেছি। তবে ক্লিয়ারলি সব দেখিনি। ঝাপসাভাবে দেখেছি! সেই সাত বছর আগেই তো রামিশা ও সুহাসিনী মিলে তোকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল তাইনা? তাহলে কেন তুই সুহাসিনীকে হ/ত্যা করলি?”
#চলবে…?
#ফেরারি_প্রেম
#পর্ব_২১
#নিশাত_জাহান_নিশি
“আমি মিথ্যা বলছি না? আমি মিথ্যা বলছি? সেদিন আমি তোকে আবছা আলোয় সুহাসিনীর রুম থেকে বের হতে দেখেছি! তোর মাথার ক্যাপটাও আমি তখনি দেখেছি। তবে ক্লিয়ারলি সব দেখিনি। ঝাপসাভাবে দেখেছি! সেই সাত বছর আগেই তো রামিশা ও সুহাসিনী মিলে তোকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল তাইনা? তাহলে কেন তুই সুহাসিনীকে হ/ত্যা করলি?”
নীহারিকার কথা শেষ হতে না হতেই রাতুল হঠাৎ হিংস্র হয়ে উঠল! আকস্মিকভাবে সে উচ্চশব্দে নীহারিকার উপর চিৎকার করে বলল,
“কারণ সুহাসিনী আমার সাথে ডাবল প্ল্যান খেলছিল!”
রাতুলের বিস্ফোরিত কথায় মুহূর্তেই শান্ত হয়ে উঠল পরিবেশ। তব্ধিত হয়ে নীহারিকা রাতুলকে প্রশ্নবিদ্ধ করার পূর্বেই রূপল হতভম্ব গলায় রাতুলের দিকে প্রশ্ন ছুড়ল,
“মানে? তুমি কী বলতে চাইছ ভাইয়া?”
“আমি আর কী বলব? আমার মুখের কথা তো তুই বিশ্বাস করবিনা। যা শোনার ঐ নীহারিকার কাছ থেকেই শুনে নে! সে তো সব জানেই। বাকিটাও নিশ্চয়ই জানবে।”
প্রশ্নবিদ্ধ দৃষ্টিতে রূপল নীহারিকার দিকে তাকালো। অস্থির দৃষ্টিতে নীহারিকা রূপলের দিকে তাকিয়ে শুকনো গলায় বলল,
“এরপর থেকে ডায়েরিতে আর কিছু লিখা ছিলনা মিস্টার রূপল। ডায়েরিতে যতটুকুন লিখা ছিল আমি ঠিক ততটুকুনই আপনাকে বলেছি।”
অমনি পৈশাচিক হাসিতে মেতে উঠল রাতুল! ঝট করে সে গলা থেকে নীহারিকার হাতটি ছাড়িয়ে নিলো! অট্ট হেসে নীহারিকার দিকে তাকিয়ে বলল,
“থাকবে কী করে? কেউ কী নিজের করা অপকর্মের সাক্ষী রাখতে চায়?”
তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল রূপল। বড়ো ভাইয়ের প্রতি থাকা আবেগ, ভালোবাসা, শ্রদ্ধাবোধ বিসর্জন দিয়ে সে রাতুলের শার্টের কলার চেপে ধরল! রক্তশূল দৃষ্টিতে সে রাতুলের দিকে তাকালো। বিধ্বংসী গলায় প্রশ্ন ছুড়ল,
“বলো আমার সুহাসিনী কী অপকর্ম করেছে? কী করেছে আমার সুহাসিনী?”
পুনরায় বিদ্রুপের হাসিতে মেতে উঠল রাতুল। রূপলের বিধ্বস্ত দু’চোখে চোখ রেখে ধীর গলায় বলল,
“তোর সুহাসিনীর অপকর্ম শুনলে সুহাসিনীকে “তোর” ‘তোর’ বলে দাবি করতে বিবেকে বাঁধতে তোর! যতটা ভালোবাসিস তাকে ঠিক ততটাই ঘৃণা করতে শুরু করবি!”
ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল রূপলের। ঘাড়ের রগ টান টান করে সে উত্তেজিত গলায় বলল,
“ভনিতা না করে যা বলার ক্লিয়ারলি বলো ভাইয়া। না হয় আমি বাধ্য হব তোমার গাঁয়ে হাত তুলতে।”
রূপলের ভয়ঙ্কর রূপ এবং কথাবার্তা শুনে থতমত খেয়ে উঠল রাতুল। হেয়ালি ভুলে সে তৎপর গলায় বলতে আরম্ভ করল,
“রামিশার মৃত্যুর তিন থেকে চার বছর পর সুহাসিনী হঠাৎ কোনোভাবে আমার ফেসবুক আইডি জোগাড় করে। ছদ্মবেশে দিনের পর দিন আমার সাথে কথা বলতে থাকে! এভাবে চার থেকে পাঁচ মাস ফ্রেন্ডলি কথা বলার পর আমি তাকে না দেখেই তার সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ি! তার কণ্ঠস্বর শুনে, তার আংশিক চোখ দেখে, তার ঠোঁট থেকে আমি সত্যিকার অর্থে তার প্রেমে পড়ি! সে চাইত আমি দেশে আসলেই আমাদের সরাসরি দেখা হবে। আমিও তার কথার গুরুত্ব দিই। দেশে ফিরার প্রস্তুতি নিতে থাকি। যখন আমি তার প্রতি পুরোপুরিভাবে দুর্বল হয়ে পড়ি তখনই সে তার মোক্ষম চাল চালে। আমাকে একদিন তার আসল পরিচয় জানায়!পুলিশকে এবং আমার পরিবারকে সব জানিয়ে দেওয়ারও হুমকি দেয়! ভয় পেয়ে আমি তার সাথে সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ করে দিই। আমার সাথে কোনোভাবে যোগাযোগ করতে না পেরে সে আমার রুমমেটকে জ্বালাতে শুরু করে! আমি জানতাম আমি নিজে থেকে তার সাথে যোগাযোগ না করলে সে আমার সব কুকীর্তি আমার রুমমেটের কাছে ফাঁস করে দিবে। হীতে আমারই ক্ষতি হবে। দেশে-বিদেশে দুদিকেই আমার বদনাম ছড়াবে। সেই ভয়ে আমি আবারও তার সাথে যোগাযোগ করি। তখনি সুহাসিনী আমার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে আমার কাছ থেকে প্রতিমাসে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিতে শুরু করে! এভাবে তিনমাস কেটে যাওয়ার পর আমি যখন অস্বীকার করি যে, আমি আর তাকে টাকা দিতে পারব না তখনি সে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে তোকে প্রেমের জালে ফাঁসিয়ে তোর সাথে সম্পর্কে জড়ায়! তোর কাছাকাছি যেতে শুরু করে আমাকে আবারও ব্ল্যাকমেইল করার জন্য। আমাকে হুমকি দিতে থাকে টাকা না পাঠালে সে আমার সব গোমর তোর কাছে ফাঁস করে দিবে। এতে ভয় আমার দ্বিগুন বেড়ে গেল। আবারও আমি তার ফাঁদে পা দিই। এভাবে দুই দুইটা বছর আমি তাকে মাসে মাসে টাকা পাঠাতে থাকি। আমার পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছিলনা তার কাছে টাকা পাঠানো! ভিখিরী হয়ে যাচ্ছিলাম আমি। জমিয়ে রাখা সব সঞ্চয় আমি তার পেছনে ঢালছিলাম। বাড়িতেও টাকা পাঠাতে পারছিলাম না। অফিসের কাজেও মন বসাতে পারছিলনা। জীবনটা আমার প্রায় ধ্বংস হয়ে যাচ্ছিল। পাপের শাস্তি পাচ্ছিলাম আমি। তখনি আমি কোনোভাবে সাফোয়ানের খোঁজ পাই। তাকে আমার প্ল্যানে কাজে লাগাই। কিন্তু তখনও সে জানত না হৃদি তার নয় বরং আমার সন্তান! টাকার লোভ দেখিয়ে আমি তাকে সুহাসিনীকে হ/ত্যা করার প্ল্যানিং করি! গ্যাস সিলিন্ডারে তাকে পুড়িয়ে মা/রার প্ল্যান করি! কিন্তু তার তো কই মাছের প্রাণ! প্রথম যাত্রায় সে বেঁচে যায়! সাফোয়ান তার উদ্দেশ্য সফল করতে পারেনি বলে আমি চুক্তি অনুযায়ী তাকে পুরো টাকা দিইনি! এবার সেও আমাকে ব্ল্যাকমেইল করতে শুরু করে! দিন দিন যেন আমি তাদের কাছে মুরগী হয়ে যাচ্ছিলাম। তখনি আমি সিদ্ধান্ত নিলাম বাইরে থেকে কিছু হবেনা। দেশে ফিরেই আমাকে যা করার করতে হবে। সব অসম্পূর্ণ কাজ সম্পূর্ণ করতে হবে। যেই ভাব সেই কাজ। অনেক কাঠ-খড় পুড়িয়ে আমি সুহাসিনীকে হত্যা করার তিনদিন আগে দেশে ফিরি! একটি আবাসিক হোটেলে থেকে প্ল্যানিং করি কীভাবে সুহাসিনীকে হ/ত্যা করা যায়। সুহাসিনীকে হ/ত্যার ঠিা একদিন আগে আমি পরিকল্পিতভাবে সাফোয়ানকে আমার হোটেলে নিয়ে আসি! যেন সুহাসিনীকে হ/ত্যা করার পর আমি সুযোগ বুঝে তার খেলাটাও শেষ করতে পারি! সাফোয়ানের থেকে খবর নিয়ে জানতে পারি সুহাসিনীকে কখন একা পাওয়া যাবে! কখন তার আশেপাশে কেউ থাকেনা। ঠিক সেই সময় ধরে আমি এনজিওতে যাই! শ্বাসরুদ্ধ করে তাকে হ/ত্যা করে ফেরার পথেই এই নীহারিকা আমাকে দেখে নেয়! কোনোভাবে সেখান থেকে পালিয়ে বের হই আমি। সুহাসিনীকে ট্রিটমেন্ট করা ডক্টরকেও টাকা খাওয়াই! খু/নটাকে আকস্মিক মৃত্যু বলে চালিয়ে দিই। সাফোয়ানকে খু/ন করার মাধ্যম খুঁজি। রাতে সুহাসিনীকে দাফন করে আসার পর মাঝরাতে আমি তাকে সাভারের ঐ নির্জন বস্তি এলাকায় থাকতে বলি। সেও আমার কথা শুনে বস্তিতে চলে যায়। ভোররাতে আমি ঐ বস্তিতে যাই। এবং সাফোয়ানকে খু/ন করে ভোরেই আবারও ফিরে আসি!”
সব শুনে হুট করে রূপলের হৃদস্পন্দন কাঁপতে শুরু করল। শ্বাস নিতে এবং ফেলতে বড়ই কষ্ট হতে লাগল তার। মাথাটাও কেমন যেন ঘুরে এলো। তবুও সে শরীরে এবং মনে জোর এনে অবিশ্বাস্য গলায় রাতুলকে বলল,
“তুমি সব মিথ্যা বলছ ভাইয়া। আমি এসব বিশ্বাস করিনা। তুমি নিজে বেঁচে যাওয়ার জন্য আমার সুহাসিনীকে কালার করছ।”
“আমি জানতাম আমার একটা কথাও তুই বিশ্বাস করবিনা। তুই চাইলে আমার ফোন ঘেঁটে দেখতে পারিস। আমাদের মধ্যে হওয়া একটা কনভারসেশনও আমি ডিলিট করিনি। চাইলে আমার কল হিস্ট্রিও তুই চেক করতে পারিস। যদি এতেও সন্দেহ হয়, তাহলে দ্যা গ্রেট মিস চারুলতা সেনকে রি/মান্ডে নিতে পারিস! এই মহিলাই হলো সব নাটের গুরু!”
মাথায় হাত দিয়ে ধপ করে মাটিতে বসে পড়ল রূপল। ভেতরটা চিঁড়ে কান্না আসছে তার। বুকে এক অসহ্য ব্যথা। হিতাহিতজ্ঞান হারিয়ে ফেলল সে। সুহাসিনী তাকে এভাবে ঠকালো? সামান্য কয়েকটা টাকার জন্য সুহাসিনী তার সাথে প্রেমের অভিনয় করল? তবুও এর কিছুই যেন বিশ্বাস করতে পারছেনা রূপল। হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা নীহারিকার দিকে তাকিয়ে সে রুদ্ধকর গলায় বলল,
“প্লিজ নীহারিকা আমার আর একটা হেল্প করুন। মিস চারুলতা সেনের কাছ থেকে সত্যিটা জানার চেষ্টা করুন প্লিজ।”
ধরাশায়ী অবস্থা থেকে বের হয়ে নীহারিকা বলল,
“আগে তো পুলিশ আসুক। খু/নিটাকে আটক করুক। এরপর না হয় বাকী কাজ সাড়া যাবে।”
পুলিশের কথা শুনে ভয় পেয়ে গেল রাতুল! সবাইকে উপেক্ষা করে সে দৌঁড়ে সদর দরজার কাছাকাছি পৌঁছাতেই পুলিশ তার দলবল নিয়ে হাজির হয়ে গেল ঘটনাস্থলে! ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে রাতুল নীহারিকার দিকে তাকাতেই নীহারিকা অট্ট হেসে বলল,
“আমি এখানে আসার আগেই সব পরিকল্পনা করে এসেছি! সুহাসিনীকে আপনি খু/ন করেছেন সেটা আমি পুরোপুরি না জানলেও সেদিন ভোরে আমি আপনার হাতের কাটাছিড়া অংশ দেখেই বুঝতে পেরেছিলাম সাফোয়ান ভাইকে আপনিই খু/ন করেছেন! ভোরে হঠাৎ আপনার শাওয়ার নেওয়া। এর কিছুক্ষণ বাদেই সাফোয়ান ভাইয়ার মৃত্যুর খবর পাওয়া। সব মিলিয়ে আমি পুরোপুরিভাবে নিশ্চিত ছিলাম যে আপনিই আসল দোষী!”
সাফোয়ানের খু/নের ইনভেস্টিগেশনে থাকা পুলিশ এসে রাতুলকে ধরে নিয়ে গেল। সেই সাথে মিস চারুলতা সেনকেও তারা বাড়ি থেকে আটক করল! মিস চারুলতা সেন ও বুঝতে পারেননি রাতুল এত সহজে ধরা পড়ে যাবে! তাই তিনি নিশ্চিন্তেই আরাম আয়েসে দিন কাটাচ্ছিলেন। এনজিও ছাড়ার দুঃসাহস করেননি।
এই রাতেই দুজনকে একসাথে জিজ্ঞাসাবাদ করার পর তারা দুজনই সত্যিটা স্বীকার করল! মিস চারুলতা সেনই সুহাসিনীকে উসকিয়েছিলেন রাতুলকে ব্ল্যাকমেইল করার জন্য। ভয় দেখিয়ে রাতুলের থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার জন্য! যার ফিফটি ফিফটি ভাগ দুজনই পাবে। দুজনের টাকাটাই একত্র করে তারা ঢাকা বসুন্ধরায় একটি ফ্ল্যাট কিনেছে! কিন্তু সেই ফ্ল্যাটে থাকার সুযোগ হয়নি তাদের। এর আগেই রাতুল তার চাল চেলে সুহাসিনীকে প্রথমে হাফ মা/র্ডার এবং পরে পুরোপুরি মা/র্ডার করে দিলো। রূপলের সাথে প্রেমের অভিনয় করার বুদ্ধিটাও সুহাসিনীকে মিস চারুলতা সেনই দিয়েছিলেন। তবে ধীরে ধীরে সুহাসিনী যখন সত্যিকার অর্থে রূপলের প্রেমে পড়ে যায় তখনি তিনি সুহাসিনীকে সাবধান করেন রূপলের প্রতি দুর্বল না হতে। রূপলের থেকে দূরে থাকতে। বেশী ঘনিষ্ঠ হয়ে গেলে সত্যিটা সামনে আসতে সময় লাগবেনা। সেজন্য সুহাসিনী রূপলের থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিল! তার শরীর ঝলসে যাওয়ার পর তো আরও বেশী রূপলকে ইগনোর করতে শুরু করল। সুহাসিনী জানত তাকে আগুনে পুড়িয়ে মা/রার ষড়যন্ত্র করার পেছনে রাতুল এবং সাফোয়ানের হাত ছিল। তবে সবটা জেনে ও সে চুপ ছিল! কারণ, সে জানত কেঁচো খুড়তে গেলে কেউটে বের হয়ে আসবে! এতে তার চিকিৎসারই ক্ষতি হবে। তবে হৃদির প্রতি তার ভালোবাসা ছিল খাঁটি। তাই হৃদিকে সে রূপলের হাতে তুলে দিয়ে গিয়েছিল।
গারোদের অপর প্রান্ত থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রূপল, নীহারিকা এবং সবিতা সব শুনছিল! সাফোয়ানের মৃত্যুতেও সবিতা এতটা কষ্ট পায়নি যতটা কষ্ট পেয়েছে তার মৃত বোনের কুকীর্তি শুনে! কান্নায় ভেঙে পড়ল সে। কাঁদতে কাঁদতে এক প্রকার হেঁচকি তুলে ফেলল। রূপল নিঃশব্দে দাড়িয়ে রয়েছে। পাথরের মূর্তির ন্যায়৷ বিধ্বস্ত অবস্থা তার। চোখের পলকও যেন পরছেনা।
এতক্ষণ যদিও তার মনে শান্তনা ছিল মিস চারুলতা সেন সব অস্বীকার করবেন। রাতুলের সব অভিযোগকে মিথ্যা প্রমাণিত করবেন। তবে এখন তো সেই শান্তনাটাও অবশিষ্ট নেই! সব জলের মত পরিষ্কার হয়ে গেল। ভেতর থেকে ভেঙে পড়ল রূপল। অতীত ঘাটতে লাগল সে। সুহাসিনীর হাসি মাখা মুখটা কেবল তার দু-চোখে ভাসতে লাগল! সুহাসিনীর কথা, সুহাসিনীর চোখ, চুল, ঠোঁট সব তার চোখের সামনে জ্বল জ্বল করতে লাগল। বুকে চিনচিনে ব্যথা নিয়ে সে বেঞ্চিতে ধপ করে বসে পড়ল। নিঃশব্দে কেঁদে আত্নচিৎকার করে বলল,
“তবে কী সত্যিই মেয়েরা ছলনাময়ী হয়? অভিনয় বিদ্যায় তারা এতটাই পারদর্শী হয় যে একটা মানুষকে ভেতর থেকে ভেঙেচূড়ে চুরমার করে দেয়?”
#চলবে…?