#ফেরারি_প্রেম
#পর্ব_২২
#নিশাত_জাহান_নিশি
“তবে কী সত্যিই মেয়েরা ছলনাময়ী হয়? অভিনয় বিদ্যায় তারা এতটাই পারদর্শী হয় যে একটা মানুষকে ভেতর থেকে ভেঙেচূড়ে চুরমার করে দেয়?”
কান্না থামিয়ে সবিতা নিশ্চল দৃষ্টিতে রূপলের দিকে তাকালো। এতক্ষণ যাবত তাকে সন্তপর্ণে সামলাতে থাকা নীহারিকাকে উপেক্ষা করে সে এক পা দু’পা করে হতাশায় কাতর রূপলের দিকে এগিয়ে এলো। আচমকাই সে মাটিতে বসে রূপলের পা দুটো জড়িয়ে ধরল! অপরাধী গলায় সে হেঁচকি তুলে কেঁদে বলল,
“আমার ম/রা বোনটাকে মাফ করে দিও রূপল! আমি জানি আমার বোন খুবই নিকৃৃষ্টতম কাজ করেছে। খুবই জঘন্যতম অন্যায় করেছে। কিন্তু এখন তো সে মা/রা গেছে তাইনা? খুব লানত ভোগ করে মরেছে! ইহকালেই তার কৃতকর্মের সাজা সে পেয়ে গেছে রূপল। দয়া করে তাকে আর বদদোয়া দিও না! তাহলে যে সে পরকালেও শান্তি পাবেনা। একটা মাত্র বোন আমার। আপন বোন হয়ে আমি কী করে চাইব বলো? তোমার অভিশাপ মাথায় নিয়ে সে পরকালেও শাস্তি ভোগ করুক?”
তাড়াহুড়ো করে রূপল তার পা থেকে সবিতার হাত দুটো ছাড়িয়ে নিলো। সবিতার দুই বাহুতে হাত রেখে সবিতাকে নিয়ে সে বসা থেকে সোজা দাড়িয়ে পড়ল। চোখে টইটম্বুর জল নিয়ে রূপল সবিতার গ্লানি ভরা দু’চোখে তাকালো। স্পষ্ট গলায় বলল,
“তোমার বোনের প্রতি আমার কোনো দোয়াও নেই। এমনকি কোনো বদদোয়াও নেই সবিতা! আমি তাকে ভালোও বাসতে পারছিনা এমনকি ঘৃণাও করতে পারছিনা! সে আমার যে পরিমাণ ক্ষতি করেছে এই পরিমাণ ক্ষতি যেন পৃথিবীতে আমার কোনো শত্রুদেরও না হয়। তবে হৃদির দায়িত্ব আমি বা আমরা অস্বীকার করতে পারছিনা! যেহেতু হৃদি আমাদের বংশেরই সন্তান, আমাদের রক্ত তার শরীরে বইছে। তাই তার সমস্ত দায় দায়িত্ব এখন থেকে আমাদের।”
অমনি সবিতার কান্নার ঢল বেড়ে গেল। হারানোর ভয় তাকে গ্রাস করে তুলল। ফুপিয়ে কেঁদে সে বিচলিত গলায় রূপলকে বলল,
“প্লিজ রূপল। তোমরা আমার মেয়েটাকে কেড়ে নিওনা! বেঁচে থাকার জন্য আমার যে আর কোনো সম্বল অবশিষ্ট নেই। কী পোঁড়া কপাল আমার দেখো? একদিনেই নিজের বোনকে হারালাম এমনকি আমার স্বামীকেও। এখন যদি তোমরা আমার মেয়েটাকেও নিয়ে যাও, আমি কী নিয়ে বাঁচব বলো?”
সবিতার কাতর মুখের দিকে তাকিয়ে মায়া জন্মালো রূপলের। দু’হাত দ্বারা চোখের জল মুছে সে সবিতার দিকে স্বাভাবিক দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। সবিতার কাছে প্রস্তাব রেখে বলল,,
“তুমি চাইলে তুমিও হৃদির সাথে আমাদের বাড়িতে থাকতে পারো সবিতা! এক্ষেত্রে আমাদের কোনো আপত্তি নেই।”
রূপলের প্রস্তাবে সবিতা দোমনায় ভুগলেও নীহারিকা বেশ খুশি হয়ে গেল! দ্রুত পায়ে হেঁটে সে সবিতার দিকে এগিয়ে এলো। রূপলের কথায় তাল মিলিয়ে সে সবিতাকে বলল,
“হ্যাঁ আপু। আপনি আপত্তি করবেন না প্লিজ। আপনার বোন বা স্বামী নেই তো কী হয়েছে? আমরা আছি তো। আমরা আপনার দায়িত্ব নিব! আপনি চাইলে সবকিছু নতুন করে শুরু করতে পারেন আপু। এখন তো আপনার আর কোনো পিছুটানও নেই। স্বামী তো থেকেও না থাকার মতই ছিল! সত্যি বলতে গেলে আপনি যেমন সুন্দরী, স্মার্ট, বুদ্ধিমতী তেমনি শিক্ষিতও আপু। আপনার কোথাও কোনো ঠেকা হবেনা।”
রূপল এবং নীহারিকার প্রস্তাবে ইতস্ততবোধ করল সবিতা। অসম্মতি জানাতে সে যেইনা বলল,
“কিন্তু…
সবিতাকে আর কিছু বলার সুযোগ দিলোনা নীহারিকা। সবিতার হাত দুটো চেপে ধরে সে এক প্রকার জোর খাঁটিয়ে বলল,
“আর কোনো কথা নয় আপু। আমরা যা বলেছি তাই হবে। আপনি হৃদির সাথে মিস্টার রূপলদের বাড়িতে থাকবেন মানে থাকবেন। আর কোনো কথা শুনতে চাইছিনা আমরা।”
বলেই নীহারিকা নীরব দর্শক হয়ে দাড়িয়ে থাকা রূপলের দিকে তাকালো। উৎসাহী গলায় রূপলের দিকে প্রশ্ন ছুড়ে বলল,
“কী মিস্টার রূপল? আমি ঠিক বলছি না?”
অবিচল গলায় রূপল বলল,
“হুম। আপনি বরং সবিতাকে নিয়ে আমাদের বাড়িতে যান। মা-বাবা, পিয়াসা খুব ভেঙে পড়েছে। তাদের গিয়ে সামলান। আমি এই দিকটা সামলে বাড়ি ফিরছি।”
“আচ্ছা৷ কিন্তু আপনি পারবেন তো একা এই দিকটা সামলাতে? শরীরের যা অবস্থা আপনার। মনের অবস্থাও তো ভালো নেই। যদি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন তো?”
হেয়ো হাসল রূপল! বিদ্রুপের স্বরে বলল,
“আর শরীর। মনের কথা না হয় বাদই দিলাম। তা তো আরও আগেই মারা গেছে! কিছু হবেনা আমার। যা শক্ত প্রাণ আমার! আপনি ঐ দিকটা সামলান। আমি এদিকটা সামলে নিচ্ছে। অনেক তো হেল্প করলেন আমার।”
নীহারিকা এবং সবিতাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে রূপল বাড়িতে পাঠিয়ে দিলো। রাতুল এবং মিস চারুলতা সেনকে তিনদিন পর কোটে তোলা হবে। পুলিশের সাথে এই নিয়ে প্রয়োজনীয় কথাবার্তা সেরে রূপল যেইনা হাজুতের ভেতর থেকে বের হতে যাবে অমনি মিস চারুলতা সেন ভরাট গলায় পেছন থেকে রূপলকে ডাকলেন। বললেন,
“শেষবারের মত একটা কথা শুনবে রূপল?”
হঠাৎ ডাকে রূপল পিছু ফিরে তাকালো। সঙ্গে সঙ্গেই মিস চারুলতা সেন খোলসা গলায় বললেন,
“এটা সত্যি যে সুহাসিনী শেষের দিকে এসে তোমার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছিল! সত্যিটাও অনেকবার স্বীকার করতে চেয়েছিল। কিন্তু আমি তাকে অনেক হুমকি দিয়েছি! মৃত ব্যক্তিকে নিয়ে আর কোনো মিথ্যে বলতে চাইছিনা আমি।তাই সত্যিটা তোমাকে বললাম। এই সত্যিটা স্বীকার করা আমার জন্য ফরজ ছিল!”
অট্ট হেসে রূপল পেছন থেকেই মিস চারুলতা সেনকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“সে যদি সত্যিই আমাকে ভালোবাসত না? তাহলে আপনার হুমকিকে উপেক্ষা করে হলেও আমার কাছে সব সত্যিটা স্বীকার করত। সত্যিটা জানার পর আমি নিশ্চয়ই তাকে মে/রে ফেলতাম না? কিংবা আমাদের সম্পর্কটাও শেষ করে দিতাম না। উল্টো এই ভেবে খুশি হতাম যে, আমাকে হারানোর ভয়ে সে সত্যিটা স্বীকার করেছে। আমাকে হয়ত সে সত্যিই ভালোবাসে!”
একরাশ ঘৃণা নিয়ে রূপল মুখটা ঘুরিয়ে নিলো! জেল থেকে বের হয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলো। এই মুহূর্তে বাড়ি ফিরতে যদিও তার ইচ্ছে শক্তিতে কুলুচ্ছেনা তবুও পরিবারের সমসাময়িক অবস্থার কথা ভেবে সে বাধ্য হয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলো। পকেট থেকে আস্ত একটি সিগারেটের প্যাকেট বের করে সে সিগারেট ফুকতে ফুকতে দুঃখ বিলাস করতে লাগল! এতে করে বুকের অসুখটা আরও বাড়তে লাগল। শরীরের দিকে মনোযোগ দেওয়ার সময় আছে না-কী তার? মনটাই যে তার মনের জায়গায় নেই! জীবিত আছে বলেও মনে হচ্ছেনা! জং ধরা অনুভূতি নিয়ে সে খালি রাস্তায় এলোমেলো পায়ে হাঁটতে লাগল। মনে ভরপুর দুঃখ নিয়ে বাড়ির দিকে হাঁটা ধরল।
_______________________________
নীহারিকাকে জড়িয়ে ধরে কান্না জুড়ে দিয়েছেন নাজনীন বেগম! রাতুল তার সৎ ছেলে হলেও আদর, যত্নে, ভালোবাসায় কোনোদিক থেকে তিনি রূপল কিংবা পিয়াসার থেকে কোনো অংশে কমতি রাখেননি। তিনি তার ব্যবহার আচরণে কাউকে কোনোদিনও বুঝতে দেননি রাতুল তার সৎ ছেলে। অসুস্থ শরীর নিয়ে পিয়াসাও তার মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। হাজার হলেও ভাই তো। কষ্ট তো লাগবেই। নিহালও পিয়াসাকে শান্তনা দিয়ে বুঝিয়ে শুনিয়ে রাখতে পারছেনা। নিহালের পুরো পরিবার আজ এই বাড়িতে উপস্থিত। সবার মুখে কষ্টের ছাপ। রাতুলের বাবা আফজাল হকের মুখের দিকে তো তাকানোই যাচ্ছেনা৷ কারো সাথে তিনি টু শব্দটিও করছেন না। পরিশেষে তিনি মুখ খুলে হাপিত্যেশ করে বললেন,
“ভাবতে পারিনি মা ম/রা ছেলেটা আমার এত ডেঞ্জারাস হবে! একটা মেয়ের জীবন নষ্ট করবে এমনকি দুই দুইটা খু/নও করতে পারবে। এমন নিকৃষ্ট ছেলের বাবা আমি? ভাবতেও কেমন যেন ঘিন ঘিন লাগছে। এই দিন দেখার জন্যই কী উপর ওয়ালা আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন? কাল ছেলে বিদেশে চলে যাবে বলে কত খুশি নিয়ে তার মা আর আমি মিলে শপিংমলে গেলাম তার জন্য শপিং করতে! ভাবলাম ছেলেটাকে একটু সারপ্রাইজ দিই। আর সেই সুযোগে আমার ছেলে কী-না ফ্লাইট ধরার প্ল্যানিং করছিল? ভেতরে ভেতরে এত বড়ো ষড়যন্ত্র তার?”
আফজাল হকের দুঃখ ভারাক্রান্ত কথা শুনে সবার মুখ থমথমে হয়ে গেল। নীহারিকার কাঁধ থেকে মাথা তুলে সোজা হয়ে বসলেন নাজনীন বেগম। চোখের জল নাকের জল মুছে তিনি বললেন,
“আমিও ভাবতে পারিনি রাতুলের বাবা, রাতুল এতটা জঘন্য হবে। আমার এখনও বিশ্বাস হচ্ছেনা রাতুল এত নিকৃষ্ট পাপ কাজ করতে পারে। কিন্তু কী আর করব বলো? সত্যিটা তো প্রমাণিত হয়েই গেল।”
সবার থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে সবিতা ওড়নার আঁচল চেপে ধরে কেঁদে মরছিল! বোন এবং স্বামী হারানোর শোক কাটিয়ে উঠতে পারছেনা সে। ছোট্টো হৃদি সবিতার পেছনে লুকিয়ে থেকে সবার হায় হুতাশ দেখছিল! তবে সাহস সঞ্চার করতে পারছিলনা সবার সামনে এসে দাড়ানোর। অমনি নীহারিকার নজর গেল হৃদির দিকে। হৃদির ভয় ভাঙানোর জন্য নীহারিকা মিটিমিটি হাসল। নীহারিকার হাসি দেখে হৃদিও মুচকি হেসে উঠল! হৃদির ভয় কেটে যেতেই নীহারিকা ইশারায় হৃদিকে কাছে ডাকল। অভয় পেয়ে হৃদি হাসতে হাসতে দৌড়ে এলো নীহারিকার দিকে। হৃদির হাত ধরে নীহারিকা উপস্থিত সবার সামনে এসে দাড়ালো। নাজনীন বেগম এবং আফজাল খানকে উদ্দেশ্য করে নীহারিকা খানিকটা জড়তাগ্রস্ত গলায় বলল,
“এই মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে কী সব ভুলে যাওয়া যায়না আঙ্কেল-আন্টি? এই মেয়েটা যে আপনাদের দায়িত্ব! আপনাদের একমাত্র আদরের নাতনী। দেখুন না কত নিষ্পাপ মেয়েটার মুখ! এই মুখের কোথাও কী তার বাবার করা কোনো পাপের ছাপ লেগে আছে?”
হৃদির মায়াবী মুখের দিকে তাকিয়েও কেন যেন নাজনীন বেগম এবং আফজল হকের দয়ামায়া কাজ করছিলনা! তারা সোজা বসা থেকে ওঠে গেলেন। হৃদিকে উপেক্ষা করে নিজেদের ঘরে চলে গেলেন! বিষয়টায় বেশ অবাক হলো উপস্থিত সবাই। পিয়াসা নিজেও কষ্ট পেল তার বাবা-মায়ের আচরণে! অমনি সবিতা দ্রুত পায়ে হেঁটে এসে হৃদিকে জড়িয়ে ধরল। কান্না জড়িত গলায় নীহারিকাকে বলল,
“আমি বুঝে গেছি নীহারিকা। এই বাড়িতে আমার মেয়ের কোনো ঠায় হবেনা। তুমি প্লিজ আমার মেয়েকে নিয়ে এই বাড়ি ছাড়তে আমাকে অনুমতি দাও!”
ইতোমধ্যেই রূপলের আবির্ভাব ঘটল বাড়ির ড্রয়িং রুমে। উপস্থিত সবাইকে চমকে দিয়ে রূপল দায়িত্ব পরায়ণ গলায় সবিতাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আজ থেকে হৃদির সব দায়িত্ব আমার সবিতা। বাড়ির কে হৃদির দায়িত্ব নিলো বা না নিলো তাকে কে গ্রহণ করল বা না করল এসব দিকে আমার মাথা ঘামানোর কোনো প্রয়োজন নেই। শুধু হৃদি নয় তুমিও আজ থেকে এই বাড়িতে থাকবে সবিতা। হোপ সো, তুমি এই বিষয় নিয়ে আর কোনো কথা বাড়াবেনা। আমার মতামতকে গুরুত্ব দিবে।”
কথা শেষ হতেই নিজের রুমের দিকে হাঁটা ধরল রূপল। নীহারিকা খুশি হয়ে মনে মনে রূপলকে ধন্যবাদ দিলো! তবে তা মুখে প্রকাশ করলনা। রূপল তার রুমে যেতেই নাজনীন বেগম তার রুম থেকে বের হয়ে এলেন! পরিস্থিতি শিথিল করার জন্য তিনি সবাইকে খাবার টেবিলে বসতে বললেন। বাড়ির মেহমানদেরকে তো আর অভুক্ত রাখা যাবেন! মাঝরাতে সবাই বাধ্য হলো খাওয়াদাওয়া করতে। তবে রূপল বাদে বাড়ির সবাই খাবার খেলো! রূপলের মনের অবস্থা ভালো নয় বিধায় কেউ তাকে জোর করে ডাকল না। বরং খাবার খেয়ে সবাই ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘুমুতে চলে গেল।
পরদিন দিনের এগারোটা পর্যন্ত সবাই নাক টেনে ঘুমোলো! অনেক রাত করে ঘুমিয়েছে বিধায় কারোর তেমন কোনো হুশ নেই। তবে নীহারিকার ঘুমটা একটু জলদিই ভেঙে গেল। পাশ ফিরে তাকাতেই দেখল সবিতাকে জড়িয়ে ধরে হৃদি বেঘোরে ঘুমু্চ্ছে! সবিতাও গভীর ঘুমে মগ্ন। তাই তাদের আর না ডেকে নীহারিকা ওয়াশরুমে গেল ফ্রেশ হতে। মিনিট কয়েকের মধ্যে ভেজা মুখেই সে রুম থেকে বের হয়ে রান্নাঘরের দিকে রওনা হলো গরম চা করতে। ভোর থেকেই মাথাটা কেমন যেন ধরে আছে তার। ধোঁয়া ওঠা গরম গরম চা খেলে ব্যথাটা হয়ত কিছুটা কমতে পারে।
রূপলের ঘর পেরিয়ে নীহারিকা যেইনা সামনের দিকে পা বাড়ালো অমনি মনে হলো রূপলের ঘর থেকে কারো বমি করার শব্দ তার কানে বাজছে! আঁতকে ওঠে নীহারিকা এক ছুটে রুমের অর্ধখোলা দরজা খুলে রূপলের রুমে ঢুকে পড়ল। রুমের বেসিনের দিকে নজর দিতেই দেখল রূপল গাঁ ভাসিয়ে বমি করছে! অস্থির হয়ে নীহারিকা দ্রুত পা চালিয়ে হেঁটে গেল রূপলের দিকে। চিন্তিত গলায় বলল,
“কী হয়েছে মিস্টার রূপল? আপনি বমি করছেন?”
নিজের সীমা ভুলে নীহারিকা যেইনা পেছন থেকে অসুস্থ এবং দুর্বল রূপলকে আঁকড়ে ধরতে গেল অমনি রূপল রোগা শরীর নিয়ে ষাঁড়ের মত চ্যাঁচিয়ে উঠল! নীহারিকাকে থামিয়ে বলল,
“এই ডোন্ট টাচ মি! একদম ছোঁবেন না আমায়।”
সঙ্গে সঙ্গেই নীহারিকা থেমে গেল। নিজের অধিকারের জায়গাটুকুন বুঝে সে নিজেকে সামলে নিলো। অস্থিরতা ভাব নিয়ে সে ধীর গলায় রূপলকে বলল,
“আচ্ছা ঠিক আছে টাচ করব না। আপনি বরং আপনার ডান হাতটা দিয়ে আপনার পিঠটাতে মাসাজ করুন। দেখবেন রিলাক্স লাগবে।”
#চলবে…?
#ফেরারি_প্রেম
#পর্ব_২৩
#নিশাত_জাহান_নিশি
“আচ্ছা ঠিক আছে টাচ করব না। আপনি বরং আপনার ডান হাতটা দিয়ে আপনার পিঠটাতে হালকা মাসাজ করুন। দেখবেন রিলাক্স লাগবে।”
এই মুহূর্তে নীহারিকার ছোঁয়া সহ্য করতে না পারলেও নীহারিকার উপদেশ ঠিকই মেনে নিলো রূপল! গড়গড়িয়ে বমি করার এক পর্যায়ে এসে সে তার ডান হাত দ্বারা আলতোভাবে পিঠটিতে বেসেব ভাবে মাসাজ করতে লাগল। এতে যেন তার বমির বেগ আরও বেড়ে গেল! ভেতর থেকে সব বের হয়ে আসতে লাগল! ব্যাপারটায় রীতিমত শঙ্কিত হয়ে উঠল রূপল। মুখে বমি রেখেই সে মাথা ঘুরিয়ে তার পেছনে উতলা ভঙ্গিতে দাড়িয়ে থাকা নীহারিকার দিকে তাকালো। খিটখিটে মেজাজে সে অস্ফুটে সুরে বলল,
“এটা কী এডভাইজ দিলেন হুম? বমি তো আরও বেড়ে গেল।”
বলেই রূপল আবারও মুখ ভরে বমি করতে লাগল। বমির সেই ছটা এসে নীহারিকার গাঁ ভিজিয়ে দিলো! নীহারিকার গাঁ থেকেও এবার বমির বিদঘুটে গন্ধ ভেসে আসছিল। ঘিন ঘিন পেয়ে বসল নীহারিকার! নাক টিপে ধরে সে ঘিঞ্জি গলায় বলল,
“আরে রে রে এটা কী করলেন? আমাকেও নোংরা করে দিলেন? এই হলো উপকারের পরিণাম হুম? এখন আমার কী হবে? এই নোংরা ড্রেস আমি কীভাবে চেঞ্জ করব? আর চেঞ্জ করেই বা কী পড়ব? এই হবে জানলে তো কারো হেল্পই করতে আসতাম না আমি।”
বলেই নীহারিকা ছিচকাঁদুনে মেয়েদের মত কান্না জুড়ে দিলো! একই সাথে কপালও চাপড়াতে লাগল। অমনি রূপল খেয়াল করল তার বমির বেগ হুট করেই কমে গেছে। এতক্ষণ ভেতরে যে অস্বস্তি হচ্ছিল সেই অস্বস্তিটাও স্বাভাবিকভাবে দমে গেছে! রিলাক্স লাগছে তার! শরীরের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠে সে এবার সূক্ষ্ম দৃষ্টি মেলে নীহারিকার দিকে তাকালো। নীহারিকার লাফালাফি এবং কান্নাকাটি দেখে কেন যেন হঠাৎ তার হাসি পেয়ে গেল! জনাজীর্ণ শরীর নিয়েও সে নীহারিকার অগোচরে ফিক করে হেসে দিলো! মাথা নুইয়েই শ্লেষাত্মক গলায় নীহারিকাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“দেখো কীভাবে বাঁদরের মত লাফাচ্ছে! অথচ এখানে আমি লাফানোর মত কিছুই দেখলাম না। সামান্য বমি-ই তো ভাই। পটি তো করে দিইনি!”
অমনি তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল নীহারিকা। রূপলের থেকে দূরত্ব বজায় রেখেই সে রূঢ় গলায় বলল,
“লাফানোর মত কিছু দেখলেন না মানে? বমি করলেন কেন আমার গাঁয়ে? এখন যদি আমি কোনোভাবে আপনার গাঁয়ে বমি করে ভাসিয়ে দিতাম তাহলে নিশ্চয়ই আজ আপনি আমাকে আস্ত রাখতেন না? বারোটা বাজিয়ে দিতেন আমার! সেই জায়গায় তো আমি আপনাকে কিছুই করলাম না। এখন আমি লাফালেই যত দোষ না? বাঁদর হয়ে গেলাম আমি?”
মুহূর্তেই রূপলের শরীরটা আবারও খারাপ হয়ে গেল। শরীরটা ম্যাচম্যাচিয়ে উঠল। মাথাটাও কেমন যেন ঝিম ধরে এলো। শরীরে শক্তি নেই তার দেখেই বুঝা যাচ্ছে। এই কয়েকদিনের খাওয়াদাওয়া এবং ঘুম নিদ্রার অনিয়মের কারণে তার শরীরের ওজন প্রায় ৩ থেকে ৪ কেজি কমে গেছে! দেখতেও রোগা সোগা হয়ে গেছে। না খেতে খেতে যেন খাবার জিনিসটাই এখন তার কাছে অসহ্য হয়ে উঠেছে। শেষ মুহূর্তে এসে মাথাটা অতিরিক্ত ঘুরে যেতেই রূপল দুর্বল গলায় নীহারিকাকে বলল,
“দেখি সরুন। মাথাটা ঘুরছে আমার। বাই দ্যা ওয়ে, আমি এতক্ষণ আপনার সাথে দুষ্টুমি করছিলাম। প্লিজ ডোন্ট টেক ইট সিরিয়াসলি। পারলে ড্রেসটা চেঞ্জ করে নিবেন।”
নীহারিকাকে উপেক্ষা করে রূপল যেইনা খাটের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালো অমনি রূপল দিশাহারা হয়ে মাথা ঘুরে পরে যাওয়ার ঠিক পূর্ব মুহূর্তেই শঙ্কিত হয়ে নীহারিকা শক্ত করে রূপলের দু-বাহু চেপে ধরল! নিমিষেই শরীরের সমস্ত শক্তি ছেড়ে দিলো রূপল। বেশিক্ষণ রূপলের সুঠাম দেহের ভার বইতে পারলনা নীহারিকা। অপ্রত্যাশিতভাবেই ধপাস করে দুজন মেঝেতে পড়ে গেল! বুকে আংশিক ব্যথা পেয়ে রূপল সাথে সাথেই অজ্ঞান হয়ে গেল! ভাগ্যিস নীহারিকার শুকনো দেহের উপর রূপলের শক্তিশালী দেহ এসে পরেনি! যদি পরত তবে আজ নীহারিকার মাজা কোমড়ের বারোটা বেজে যেত! এমনিতেও নীহারিকার পিঠটা প্রচণ্ড ব্যথা করছে।
ঘটনার আকস্মিকতায় তাজ্জব হয়ে গেল নীহারিকা। মুখ থেকে কথা বের হচ্ছিলনা তার। কেবল গোল গোল চোখ দ্বারা তার পাশেই ছিটকে পরা রূপলের দিকে তাকিয়ে রইল! কী থেকে কী হয়ে গেল? এই অসময়ে কী এটাও হওয়ার ছিল? রূপলের না আবার খারাপ কিছু হয়ে গেল সেই ভয়ে মুর্ছে উঠল নীহারিকা। হুট করে মাথা ঘুরিয়ে পরে যাওয়াটা তো ভালো লক্ষ্মণ নয়! ব্যাকুল হয়ে নীহারিকা রূপলকে মেঝে থেকে উঠানোর চেষ্টা করল। তবে কিছুতেই যেন কিছু হচ্ছিলনা। দেহের ওজন কমে গেলে কী হবে দেহের শক্তি মোটেও কমেনি রূপলের! উপায় বুদ্ধি খুঁজে না পেয়ে নীহারিকা বেসিন থেকে পানি এনে রূপলের চোখে-মুখে পানি ছিটাতে লাগল। নির্জীব গলায় রূপলকে ডেকে বলল,
“রূপল উঠুন। চোখ খুলুন।”
অনেকক্ষণ পানি ছিটানোর পরেও রূপলের কোনো রেসপন্স না পেয়ে নীহারিকার গলা শুকিয়ে গেল। আর এক মুহূর্তও সময় অপচয় করা যাবেনা ভেবে সে দৌড়ে রুম থেকে বের হয়ে চিৎকার চ্যাচাম্যাচি জুড়ে দিলো। গলা উঁচিয়ে সবাইকে ডেকে বলল,
“আরে কোথায় তোমরা? মিস্টার রূপলের যেন কী হয়েছে। প্লিজ তোমরা এবার ওঠে এসো। দেখে যাও কী হলো।”
নীহারিকার চিৎকারের আওয়াজ শুনে বাড়ি শুদ্ধ সবাই ঘুম থেকে ওঠে গেল। পেরেশান হয়ে সবাই নীহারিকার চিৎকারের উৎস খুঁজে রূপলের রুমের দিকে এগিয়ে এলো। আঙুল দিয়ে ইশারা করে নীহারিকা সবাইকে রূপলের রুমে যেতে বলল। ভীতসন্ত্রস্ত মুখে একত্রিত হয়ে সবাই রূপলের রুমে ঢুকে পড়ল। জ্ঞানশূণ্য অবস্থায় রূপলকে মেঝেতে পরে থাকতে দেখে অমনি নাজনীন বেগম এবং পিয়াসা চিৎকার করে উঠল! নীহারিকা রুমের ভেতর ঢুকতেই আফজাল হক এবং নিহাল উদ্বিগ্ন গলায় নীহারিকার দিকে সমস্বরে প্রশ্ন ছুড়ল,
“কী হয়েছে রূপলের?”
অস্থির গলায় নীহারিকা বলল,
“জানিনা কী হয়েছে। হঠাৎ মাথা ঘুরে পরে গেছে। এর আগে গড়গড়িয়ে বমিও করেছে। চোখেমুখে অনেক পানি ছিটালাম কোনো কাজ হলোনা এতে। আমার মনে হয় এবার ডক্টরকে ডাকা উচিৎ।”
আফজাল হক ব্যস্ত হয়ে পড়লেন ডক্টরকে কল করতে। নিহাল এসে রূপলকে কষে ধরে মেঝে থেকে তুলে সোজা করে তাকে খাটের উপর শুইয়ে দিলো। পার্লস রেট চেক করে দেখল সব ঠিক আছে। চিন্তার কোনো কারণ নেই এতে। শরীরের দুর্বলতার কারণে মাথা ঘুরে পরে গেছে। পিয়াসার ম/রা কান্নাকাটি দেখে নিহালের মাথায় যেন রক্ত ওঠে গেল। ধমকের স্বরে সে পিয়াসাকে শাসিয়ে বলল,
“আরে থামো তো তুমি। কিছু হতে না হতেই শুধু কান্নাকাটি শুরু করো! এত নাককাঁদুনে কেন তুমি হ্যাঁ? সামান্য সেন্সলেসই তো হয়েছে। শরীরের দুর্বলতার জন্য হয়েছে। এতে এত ভেঙে পরার কী আছে?”
উপস্থিত সবার সামনে লজ্জা পেয়ে পিয়াসা রাগী দৃষ্টিতে নিহালের দিকে তাকালো! এমনিতেই নিহালকে সে তেমন সহ্য করতে পারেনা! তার উপর এমন অপমানজনক কথাবার্তা! পিয়াসার রাগী চাহনি দেখে অমনি নিহাল ধরাশায়ী গলায় বলল,
“হইছে হইছে ভয় পাইছি! এবার চোখ নিচে নামাও!”
উপস্থিত সবার নজর নিহাল এবং পিয়াসার দিকে না থাকলেও নীহারিকার নজর ছিল তাদের দিকে। দুঃখের মাঝেও মুখ চেপে হেসে দিলো নীহারিকা! পিয়াসার রাগী মুখের দিকে তাকাতেই তার হাসির বেগ যেন আরও বেড়ে গেল! সঙ্গে সঙ্গেই সে রুম থেকে বের হয়ে গেল। রুমের ভেতরে থাকলেই কেন যেন অতিরিক্ত হাসি পেয়ে বসছিল। একটু আগে রূপল এবং তার ধপাস করে মেঝেতে পরে যাওয়ার চিত্রটিও চোখে ভেসে উঠছিল! সব মিলিয়ে তার পেটে খিল ধরানোর মত হাসি আসছিল।
রুম থেকে বের হতেই নীহারিকা দেখল সবিতা আর হৃদি ছুটে আসছে রূপলের রুমের দিকে। তাদের দেখে নীহারিকা মুখ খুলে হাসল! হৃদিকে জড়িয়ে ধরে সে হেসে কুটিকুটি। হৃদি কিছু না বুঝেই অবুঝ গলায় হেসে হেসে বলল,
“কী হলো আন্টি? তুমি হাসছ কেন?”
“হইছে হইছে ভয় পাইছি। এবার চোখ নিচে নামাও!”
বলেই নীহারিকা আরও বেশী হাসতে লাগল! নির্বোধ দৃষ্টিতে হৃদি নীহারিকার দিকে তাকিয়ে রইল। নীহারিকার হাসি দেখে সবিতা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাড়িয়ে রইল। উজবুক গলায় নীহারিকার দিকে প্রশ্ন ছুড়ল,
“এই তুমি হাসছ কেন? আর ভিতরেই বা হচ্ছেটা কী? একটু আগে না তুমি খুব চ্যাচাম্যাচি করছিলে?”
“ওহ্ হ্যাঁ। মিস্টার রূপল সেন্সলেস হয়ে পরে গেছেন। গিয়ে দেখে আসুন।”
“এটা কী কোনো খুশির খবর হলো নীহারিকা? তুমি এভাবে হেসে হেসে খবরটা দিচ্ছ কেন?”
“আরে আমার এমন হয়! সিরিয়াস মোমেন্টেও কেমন হাসি পেয়ে যায়! আপনি ভেতরে যান আপু। দেখে আসুন মিস্টার রূপলকে।”
বেকুব হয়ে সবিতা রূপলের রুমে ঢুকল। ভেতরে সবার দুঃখী দুঃখী ভাব। রূপলের নেই হুশ জ্ঞান। সবার চিন্তা এখন রূপলকে ঘিরে। রূপলের এই করুন দশা দেখে সবিতার মনটাও খারাপ হয়ে গেল। সেও মনমরা হয়ে দাড়িয়ে রইল। হাসি থামার মিনিট কয়েক পরে নীহারিকা অপরাধীর মত মুখ করে হৃদিকে নিয়ে রূপলের রুমে ঢুকল। এর কিছুক্ষণ পরই ডক্টর চলে এলেন। ডক্টর এসে রূপলকে চেক আপ করে ঔষধপাতি দিয়ে গেলেন। সাথে একটা স্যালাইনও লাগিয়ে দিয়ে গেলেন।
_________________________________
সন্ধ্যার দিকে রূপলের শরীরের অবস্থা কিছুটা উন্নতির দিকে এলো। পর্যাপ্ত ঘুম হওয়ার দরুন তার শরীরের দুর্বলতাও খানিকটা কমে গেল। শরীরটা পূর্বের তুলনায় অনেকটাই ফুরফুরা হলো। চাঙা মন নিয়ে রূপল কাঁধে টাওয়াল ঝুলিয়ে ওয়াশরুমে গেল শাওয়ার নিতে। রূপলের রুমে বসে হৃদি অনেকক্ষণ যাবত খেলা করছিল। পিয়াসার রুম থেকে দুটো পুতুল এনে সে বউ বউ খেলছিল! নানান দুষ্টুমি ভরা কথা বলছিল। রূপলও হৃদির সাথে এতক্ষণ ধরে টুকিটাকি কথা বলছিল এমনকি হৃদির পাকা পাকা কথা শুনে একটু আধটু হাসছিলও!
ঘণ্টাখানিক পর হৃদিকে খুঁজতে খুঁজতে নীহারিকা রূপলের রুমের দিকে হেঁটে এলো। রুমের দরজায় দাড়াতেই সে রূপলের বিছানার উপর হৃদিকে দেখতে পেল। স্বস্তির শ্বাস ফেলে সে ব্যস্ত গলায় হৃদিকে ডেকে বলল,
“এই হৃদি এদিকে ওঠে এসো। তোমার মা তোমাকে ডাকছে।”
নীহারিকার গলার আওয়াজ পাওয়া মাত্রই রূপল বেলকনি থেকে দ্রুত পায়ে হেঁটে রুমের ভেতর ঢুকে গেল! রূপলের দিকে একবার তাকাতেই লজ্জায় নীহারিকার মাথা নুইয়ে এলো। এ কী অবস্থা তার? পরনে একটি টাওয়াল ছাড়া বাদ বাকী আর কোনো কাপড়ই তার শরীরে অবশিষ্ট নেই! চুল এবং সমস্ত গাঁ থেকে টপটপ করে জল গড়িয়ে পরছে। বেশ সতেজ এবং পরিচ্ছন্ন দেখাচ্ছে তাকে। চোখ সরানো মুশকিল হয়ে পরেছে। অমনি রূপল রাগে ফোঁস ফোঁস করে এগিয়ে এলো নীহারিকার দিকে। খরতর গলায় বলল,
“এই এদিকে আসুন। আপনার সাথে আমার কথা আছে।”
অমনি টাশকি খেয়ে গেল নীহারিকা। রূপলের অর্ধ উলুঙ্গ দেহের দিকে আর তাকিয়ে থাকার সাহস পেলো না সে! মাথাটা নুইয়ে সে হটকারি গলায় শুধালো,
“কী কথা?”
“আমি সেন্সলেস হয়ে যাওয়াতে আপনি না-কী খুব হাসছিলেন?”
অমনি নীহারিকা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে চোখ তুলে রূপলের দিকে তাকালো। অপ্রস্তুত গলায় বলল,
“আপনাকে এসব কে বলল?”
রেগেমেগে নীহারিকার দিকে আরও দু’পা এগিয়ে এলো রূপল! নীহারিকার মুখোমুখি দাড়িয়ে সে আঙুল উঁচিয়ে তটস্থ গলায় বলল,
“যেই বলুক। ঘটনা তো সত্যি না-কী?”
মুখের উপর সত্যিটা অস্বীকার করা ছাড়া আর কোনো উপায় খুঁজে পেলনা নীহারিকা! গলায় বল এনে সে বলল,
“কই না তো! আমিতো হাসিনি। আমিতো হেসেছি অন্য কারণে!”
তৎক্ষণাৎ হৃদি পুতুল কোলে নিয়ে বিছানা ছেড়ে নিচে নেমে এলো। তেড়ে এসে সে ঝাঁজালো গলায় নীহারিকাকে বলল,
“এই আন্টি তুমি মিথ্যা বলছ কেন? আমিতো দেখেছি তুমি হাসছিলে!”
চোখ লাল করে নীহারিকা এবার হৃদির দিকে তাকালো। তাহলে এখানেই সর্ষের ভূত লুকিয়ে ছিল? এই পিচ্চি মেয়ে এত পাঁজি? যখন তখন মানুষকে কেইস খাইয়ে দিতে পারে? কোমরে হাত গুজে নীহারিকা খরখরে গলায় বলল,
“তবে রে দুষ্টু। তুমিই তাহলে প্যাঁচটা লাগিয়েছ তাইনা?”
নীহারিকার তর্জনে গর্জনে বিচলিত হয়ে হৃদি রূপলের পেছনে এসে লুকালো! রূপলের উপর ভরসা রেখে সে সাহসী গলায় বলল,
“তুমি আমার কিচ্ছু করতে পারবেনা বুঝছ? যতক্ষণ রূপল বাবা আমার পাশে আছে তুমি আমার কিচ্ছু করতে পারবেনা!”
মুখ ভেঙিয়ে নীহারিকা বলল,
“এহ্ আইছে। আমি তোমার রূপল বাবাকে ভয় পাই না-কী?”
বলেই নীহারিকা যেইনা রাগে গজগজ করে হৃদিকে ধরার জন্য এগিয়ে এলো অমনি রূপল তেজী শ্বাস ফেলে নীহারিকার দিকে তাকালো! চোখ দুটিতে জংলী বাঘের ন্যায় হিংস্রতা ফুটিয়ে সে নীহারিকার পথ রুদ্ধ করে দাড়ালো। চোয়াল উঁচিয়ে বলল,
“হোয়াট ডিড ইউ সে? ইউ ডোন্ট বি এফ্রেইড অফ মি?”
অমনি নীহারিকা শুকনো ঢোঁক গিলে রূপলের দিকে তাকালো। চোখ দুটিতে ভয়ার্ত ভাব এনে ধরাশায়ী গলায় বলল,
“আরে হইছে হইছে ভয় পাইছি। এবার তো চোখ দুইটা নিচে নামান!”
#চলবে…?
#ফেরারি_প্রেম
#পর্ব_২৪
#নিশাত_জাহান_নিশি
“আরে হইছে হইছে ভয় পাইছি। এবার তো চোখ দুইটা নিচে নামান!”
নীহারিকার ভীতসন্ত্রস্ত ভাবভঙ্গি এবং টলমল কথাবার্তা শুনে রূপলের মধ্যে আলাদা একটা ভাবসাব চলে এলো! সে যে চাইলেই যে কারো মনে তাকে নিয়ে ভয় ঢুকাতে পারে সেই আত্মবিশ্বাস তার মধ্যে তৈরী হতে লাগল! রূপলের সেই আত্নবিশ্বাসকে ক্ষণিকের মধ্যে ভুল প্রমাণ করে দিলো নীহারিকা! রূপলের ভাবপূর্ণ চোখ দুটিতে সে ভাবলেস দৃষ্টি নিক্ষেপ করে আচমকা ফিক করে হেসে দিলো! ব্যাপারটায় রূপল রীতিমত চমকে গেল। হটকারি দৃষ্টি ফেলল সে নীহারিকার দিকে। আগ্রাসী গলায় শুধালো,
“এই আপনি আবারও হাসছেন?”
“হাসির কারণটা জানতে পারলে আপনি নিজেও হাসবেন।”
“হোয়াট? কী কারণ?”
“এটা সিক্রেট। হৃদির সামনে বলা যাবেনা!”
“কী এমন সিক্রেট এটা যে হৃদির সামনে বলা যাবেনা?”
দুষ্টু হৃদি চোখ পাকিয়ে নীহারিকার দিকে তাকিয়ে রইল! চুপিসারে দাড়িয়ে দাড়িয়ে সে সব কথা গিলছিল। হৃদির ভাবমূর্তি বুঝতে পেরে অমনি নীহারিকা গলার আওয়াজটা কিঞ্চিৎ কমিয়ে আনল। মিনমিনে সুরে রূপলকে বলল,
“আসুন কানে কানে বলি! হৃদি শুনতে পারলে আমাদের পঁচাবে!”
জানার আগ্রহ থেকে রূপলও তার কঠোরতা ভুলে নীহারিকার কথামত তার কানটা নীহারিকার দিকে এগিয়ে দিলো! তারও কেমন যেন কৌতূহল হচ্ছিল! নীহারিকার মত সেও বাচ্চামো করল! রূপলের কানের কাছে ফিসফিসিয়ে নীহারিকা বলল,
“ঐসময় আপনার যখন মাথাটা ঘুরে আসছিল না? তখন তো আপনার তেমন হুশ জ্ঞান ছিলনা। তখনি আমরা দুজনে ধপাস করে মেঝেতে পরে গিয়েছিলাম!”
অমনি রূপল চ্যাচিয়ে ওঠে বলল,
“হোয়াট? আপনার গাঁয়ে পরেছিলাম?’
হৃদি কান খাঁড়া করে সব শুনে রূপলের দিকে প্রবল দৃষ্টিতে তাকালো। পুরোপুরি বিষয়টা সে বুঝতে পারেনি বিধায় রূপলের রিয়েকশন সে বুঝতে পারছিলনা। হৃদির আগ্রহ দেখে নীহারিকা বিরক্তিকর গলায় রূপলকে বলল,
“ইশ! দেখো, কীভাবে ষাঁড়ের মত চ্যাচাচ্ছে! মেয়েটা সব বুঝে ফেলবে তো। তখন তো আরও পঁচানি খেতে হবে। দেখি কাছে আসুন আবারও বলছি।”
বিমর্ষ হয়ে রূপল আবারও নীহারিকার কথামত নীহারিকার দিকে এগিয়ে গেল। পূর্বের তুলনায় নীহারিকা আরও মিনমিনিয়ে বলল,
“হিউজ কেজি ওজনের একটা হাতি মানব যদি আমার গাঁয়ের ওপর পরত তাহলে কী আমি আর আস্ত থাকতাম? পিষে যেতাম না? আল্লাহ্ হাতে ধরে আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন! হ্যাঁ সত্যি বলছি। আপনি আমার গাঁয়ের উপর পরেননি। বরং আমার পাশেই ছিটকে পরেছিলেন।”
অমনি রূপল তেতে উঠল! চোখ লাল করে সে নীহারিকার দিকে তাকালো। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“কী বললেন আপনি? আমি হাতি মানব?”
“না মানে ঐ সময়ে আমার ঐটাই মনে হয়েছিল আর কী! টেনে তুলতে পারছিলাম না তো, তাই!”
বলেই নীহারিকা অট্ট হেসে হৃদির হাত ধরে এক ছুটে রূপলের রুম থেকে পালালো। রাগে রি রি করে উঠল রূপল। নীহারিকার যাওয়ার পথে তাকিয়ে সে ফোঁস করে শ্বাস ফেলল। ঝাঁজালো গলায় বলল,
“ইউ ইডিয়ট গার্ল। আমাকে ইনসাল্ট করা তাইনা? সুযোগে পাই একবার আমিও আমার আসল রূপ দেখাব!”
হৃদিকে নিয়ে নীহারিকা বাড়ির ড্রয়িংরুমে চলে এলো। কৌতূহল যেন কিছুতেই কমছেনা হৃদির। সে ঘ্যান ঘ্যান করে নীহারিকাকে জিজ্ঞেস করল,
“এই আন্টি বলো না? তোমরা কী বলছিলে গো?”
“না বলব না। কারণ তুমি অনেক দুষ্টু। জায়গায় জায়গায় প্রচার করে বেড়াবে এই খবর। তাই তোমাকে কিছু বলা যাবেনা।”
জোর করে হৃদিকে সবিতার রুমে রেখে এসে নীহারিকা ড্রয়িংরুমে পিয়াসার পাশে এসে বসল। প্লেট থেকে একটি আপেল হাতে নিয়ে নীহারিকা আপেলটিতে কামড় বসালো। পিয়াসার দিকে তাকিয়ে বলল,
“ভাবি আমরা কখন রওনা হব? রাত তো বাড়তে চলল।”
শ্বশুড় বাড়িতে যাওয়ার জন্য কোনো হেলদুল নেই নীহারিকার। আপেল চিবুতে চিবুতে সে ভাবশূণ্য গলায় বলল,
“আমি আজ যাবনা বাপু! আগে থেকেই বলে দিলাম তোমাকে।”
“মানে কী ভাবি? তুমিতো আম্মু আব্বুকে এই বলে বিদায় দিয়েছিলে যে, সন্ধ্যার পর তুমি আর আমি বাড়ি ফিরে যাব। ভাইয়াকেও তাই বলেছিলে। এখন হঠাৎ মত পাল্টাচ্ছ কেন?”
“বলেছিলাম কিন্তু এখন আর ভালো লাগছেনা! তুমিও আমার সাথে থেকে যাও। কিচ্ছু হবেনা।”
“আরে না ভাবি। কী বলো এসব? আম্মু আব্বু বাড়িতে একা থাকবে না-কী?”
“তোমার ভাইয়া আছে তো! কিছু হবেনা।”
“না না ভাবি। ভাইয়া খুব রাগ করবে। তুমি প্লিজ বাড়ি চলো। আমারও এইখানে আর মন টিকছেনা।”
পিয়াসা বেশ খরতর গলায় বলে উঠল,
“করলে করুক। আমার কী? এই লোকের সাথে আমার কোনো কথা নেই। জোচ্চোর লোক একটা! এই লোকটাকে বিয়ে করাটাই আমার জীবনের মস্ত বড়ো ভুল হয়েছে!”
অমনি নীহারিকা ছ্যাত করে উঠল! অবশ্য করাটাই স্বাভাবিক। হাজার হোক বোনের সামনে ভাইকে কেউ অপমান করতে পারে? হোক সে ভাইয়ের বউ কিংবা কাছের কেউ এক্ষেত্রে কাউকেই ছাড় দেওয়া যায়না। তবুও নীহারিকা ভদ্রতার খাতিরে নিজের রাগকে শান্ত করল! গলায় গম্ভীরতা এনে বলল,
“স্বামীকে এভাবে বলা ঠিকনা ভাবি! ভুল সঠিক যদি তুমি বুঝতে তাহলে আমার সামনে আমার ভাইকে এভাবে অপমান করতে পারতেনা! আমি জানি, হয়ত আমার ভাইয়াকে মেনে নিতে তোমার অনেকটা-ই সমস্যা হচ্ছে। তবে আস্তে ধীরে ভাইয়াকে তোমার মানিয়ে নেওয়া উচিৎ! বিয়ে মানুষের জীবনে একটাই হয় ভাবি। নিজের ইচ্ছেতে হোক বা অনিচ্ছেতে। সবারই উচিৎ তাদের জীবনসঙ্গীকে প্রাধান্য দেওয়া, গুরুত্ব দেওয়া, সম্মান দেওয়া। ঝগড়াঝাঁটি হলেও একসাথে নিজেদের মানিয়ে নেওয়া। আগে যা হয়েছে সব ভুলে যাও ভাবি। যে এখন তোমার জীবনে আছে তাকে আঁকড়ে ধরো বাঁচতে শিখো। সময় থাকতে মূল্য দিতে শিখো। তুমি যদি আমার ভাইকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করো, তবে আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি আর কিছু না হলেও জীবনভর তোমার ভালোবাসার কোনো কমতি হবেনা। অথচ এই ভালোবাসার জন্যই মানুষ কত কাতর।”
কথাগুলো বলেই নীহারিকা পিয়াসার পাশ থেকে ওঠে গেল। মুখ ফুলিয়ে পিয়াসা মাথাটা নুইয়ে রইল। নীহারিকার কথাগুলো তার ঘুনাক্ষরেও পছন্দ হলোনা। গাঁয়ের জামাটা ঠিক করে নীহারিকা ভারী গলায় পিয়াসাকে বলল,
“ভাবি তুমি হয়ত বয়সে আমার সমবয়সী হবে নয়ত জোরে গেলে আমার থেকে এক বছরের বড়ো হবে। তবে তোমার মধ্যে এখনও ঐ পরিমাণ ম্যাচিউরিটি আসেনি, যে পরিমাণ ম্যাচিউরিটি আসা দরকার ছিল। বোকাসোকা স্বভাবটা এখনও তোমার রয়ে গেছে। পরিস্থিতি পরিবেশ বুঝে কথা বলার অভিজ্ঞতাও এখনও হয়নি তোমার! হয়ত ছোটো মুখে অনেক বড়ো কথা বলে ফেলেছি। তবে এটাই সত্যি! আমি আশা করব তুমি খুব শীঘ্রই নিজের স্বভাব পাল্টে নিবে!”
নীহারিকার প্রতিটি কথা পিয়াসার বেশ গাঁয়ে লাগল! চোখ রাঙিয়ে সে নীহারিকাকে বলল,
“মুখ ফসকে না হয় দুই একটা কথা বলেই ফেলেছি তোমার ভাইয়াকে। এই নিয়ে এত কথা শুনানো লাগে?”
হেয়ো হাসল নীহারিকা! পুনরায় পিয়াসাকে বুঝিয়ে বলল,
“এইযে বললাম তোমার মধ্যে এখনও ম্যাচিউরিটি আসেনি! আবারও তুমি এটা প্রমাণ করে দিলে। তোমার যেতে ইচ্ছে করছেনা সেটা তুমি আমাকে বুঝিয়ে বলতে পারতে। আমার ভাইয়াকে এর মধ্যে টেনে না আনলেই পারতে! যাই হোক, তোমার যেহেতু আজ যেতে ইচ্ছে করছেনা তুমি বরং থেকে যাও ভাবি। কাল বা পরশু চলে যেও। আমি একা বাড়ি চলে যেতে পারব। নিজের যত্ন নিও।”
সঙ্গে সঙ্গেই পিয়াসা জায়গা থেকে ওঠে দাড়ালো। আপত্তি থাকা সত্ত্বেও সে ফর্মালিটি রক্ষা করার জন্য মনে ক্ষোভ রেখেই নীহারিকাকে বলল,
“এত রাতে তুমি একা বাড়ি যেতে পারবে? পরে তো তোমার ভাই আমাকে দোষাবে!”
“এত রাত কোথায় ভাবি? মাত্র তো আটটা বাজল। আমি ঠিক চলে যেতে পারব তুমি এই নিয়ে কোনে টেনশন করো না। আর ভাইয়া অযথা কাউকে দোষায় না! আগে শুনবে, বুঝবে তারপর প্রয়োজন হলে দোষাবে!”
রাশভারি গলায় পিয়াসা বলল,
“মাকে বলে যাও।”
রান্নাঘরে গেল নীহারিকা নাজনীন বেগমের কাছ থেকে বিদায় নিতে। তবে তিনি উল্টো ঝেড়ে দিলেন নীহারিকাকে! জোর করে তাকে রেখে দিলেন। বললেন, একসাথে কাল সকালে বাড়ি যাওয়ার জন্য। গুরুজনের নির্দেশ অমান্য করতে চায়নি নীহারিকা। তাই সে বাধ্য হয়ে রাজি হলো আজ রাতটা এই বাড়িতে থেকে যেতে। ভাবি এবং ননদের মধ্যে হওয়া কথা কাটাকাটির কিছুই জানতে পারলেন না তিনি! নিজেদের মধ্যেই রাগ চেপে রাখল তারা। নিহালকে ফোন করে নীহারিকা জানিয়ে দিলো আজ রাতে তারা বাড়ি ফিরতে পারবেনা। সকালের দিকে একসাথে বাড়ি ফিরবে তারা! কথা কাটাকাটির কথা নিহালকেও জানাল না নীহারিকা। শুধু বলল আজ রাতটা পিয়াসাকে ফোন করে বিরক্ত না করতে! নিহাল কারণ জানতে চাইলে নীহারিকা বলল, রাতুলের জন্য তার মন খারাপ! কান্নাকাটি করছে। পিয়াসার মনের অবস্থা খারাপ বলে নিহালও ফোন করে বিরক্ত করতে চাইল না পিয়াসাকে!
ডিনারের সময় হয়ে এলো। রাতে খাবার টেবিলে রূপল ও এলো। যদিও সবিতা এবং হৃদিকে নাজনীন বেগম পছন্দ করছেন না তবে তাদের খাওয়া দাওয়ায় তিনি কোনো কৃপণতা করছেন না! সমান ভাবে সবাইকে খেতে দিচ্ছেন। সবিতা ইলিশ মাছের কাটা বেছে হৃদিকে খাইয়ে দিচ্ছে। ইলিশ মাছটা হৃদির খুব পছন্দের। সে বেশ মজা করে খাবারটা খাচ্ছে। মাছটা শেষ হতেই হৃদি আবারও বসা থেকে ওঠে নাজনীন বেগমের কাছে দৌড়ে গেল। নাজনীন বেগমের কাপড়ের আঁচল টেনে ধরে সে আবদার সূচক গলায় বলল,
“দাদু দাদু। আমাকে আরও এক পিস মাছ দিবে?”
লজ্জায় সবিতার মাথা কাটা গেল! মেয়েটার এই অভ্যাস আর গেলনা। জিভ কেটে সে হৃদির দিতে তাকিয়ে রইল। হৃদির মুখে দাদু ডাকটি শুনে নাজনীন বেগম আবেগ আপ্লুত হয়ে উঠলেন! ক্ষণিকের জন্য তিনি থমকে গেলেন। চোখ তুলে তিনি রূপলের দিকে তাকালেন। মৃদু হেসে রূপল তার মাকে বলল,
“নাতনী আবদার করেছে মা। দিয়ে দাও।”
অনুভূতিশূণ্য হয়ে নাজনীন বেগম আরও একটি ইলিশ মাছ হৃদির পাতে তুলে দিলেন! অমনি হৃদি খুশি হয়ে নাজনীন বেগমকে জড়িয়ে ধরল। উচ্ছাস ভরা গলায় বলল,
“থ্যাংক ইউ দাদু।”
হৃদির হাসোজ্জল মুখের দিকে তাকালেন নাজনীন বেগম। কম্পিত গলায় তার দিকে প্রশ্ন ছুড়লেন,
“তোমাকে এই দাদু ডাকটা কে শিখিয়ে দিলো?”
“রূপল বাবা শিখিয়েছে।”
বলেই হৃদি আবারও খাবার খেতে লাগল। নাজনীন বেগম হৃদিকে বকেননি এই ভেবে সবিতা বেশ খুশি হলো। মিটিমিটি হেসে রূপল খাবার খাচ্ছে। উল্টোদিকে ফিরে নাজনীন বেগমও বিস্তর হাসলেন। তবে নিঃশব্দে। কাউকে না দেখিয়ে না শুনিয়ে! নীহারিকা নিজের মত করে অল্প একটু খেয়ে খাবার টেবিল ছেড়ে ওঠে গেল। ঘুমানোর জন্য তার রুমে চলে গেল। ব্যাপারটায় রূপলসহ নাজনীন বেগমও বেশ অবাক হলেন! পিয়াসা কোনো দিকে না তাকিয়ে শুধু খেয়েই যাচ্ছিল। নীহারিকার যাওয়ার পথে তাকিয়ে নাজনীন বেগম বললেন,
“মেয়েটা বাড়িতে যেতে পারলনা বলে কী এতটাই মন খারাপ করল যে খাবারটা ভালোভাবে না খেয়েই চলে গেল?”
পিয়াসা চুপ হয়ে রইল। জানে সত্যিটা বললে আজ তার বারোটা বাজবে! মা এবং ভাই মিলে তাকে একশ ঝারি দিবে। বকে ঝকে তুলকালাম কাণ্ড বাঁধিয়ে ফেলবে! নীহারিকার বিষয়টা নিয়ে রূপল কথা বাড়াতে চাইলনা! এমনিতেই সে রেগে আছে নীহারিকার উপর। প্রসঙ্গ পাল্টে রূপল ব্যস্ত গলায় তার মাকে বলল,
“কাল একটু থানায় যেতে হবে আমার। দুইদিন পর তো তাদের কোটে তোলা হবে। সেই বিষয়ে উকিল ও পুলিশের সাথে কথা বলতে হবে।”
দীর্ঘশ্বাস ফেললেন নাজনীন বেগম। হাসফাস গলায় বললেন,
“ঠিক আছে। পারলে তোর বাবাকেও সাথে নিয়ে যাস। একা আর কতদিক সামলাবি?”
“বাবাকে কিছুতেই সাথে নেওয়া যাবেনা মা। রাতুল ভাইয়াকে দেখলে বাবা ইমোশনাল হয়ে যাবে! এসবের আর কোনো দরকার নেই। যা সামলানোর আমি একাই সামলাতে পারব।
___________________________________
রাতটা কোনোভাবে কাটিয়ে পরদিন সকালের নাশতা সেরেই নীহারিকা রওনা হয়ে গেলো তার বাড়ির উদ্দেশ্যে। পিয়াসা জেদ ধরে রইল আরও দুইদিন বেড়ানোর পর সে ঐ বাড়িতে যাবে! কেউ তাকে কিছু বুঝাতেই পারছিলনা। এমনকি তার মা নাজনিন বেগমও না। নীহারিকাও এই বিষয়ে তেমন মাথা ঘামালো না! পিয়াসাকে নিজের মত করে ছেড়ে দিলো। নাজনীন বেগম নত হয়ে নীহারিকাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে বাড়ি চলে যেতে বললেন! রূপলও এই সময় রেডি হয়ে থানার উদ্দেশ্যে রওনা হচ্ছিলো। নীহারিকাকে রাস্তায় গাড়ির জন্য দাড়িয়ে থাকতে দেখে সে স্লো মোশনে বাইকটা থামালো। ভাবলেস হয়ে সে সামনের দিকে তাকিয়ে নীহারিকাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“উঠুন। বাসার সামনে নামিয়ে দিচ্ছি।”
নীহারিকা শুনেও না শোনার ভান ধরল! সে এদিক ঐদিক তাকিয়ে গাড়ি খুঁজতে লাগল। কেউ একজন যে তার সামনে দাড়িয়ে তাকে ডাকছে সেদিকে যেন তার কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই! বিষয়টায় রূপল বেশ বিরক্তবোধ করল। ভ্রু যুগল কুঁচকে সে রাগান্বিত দৃষ্টিতে নীহারিকার দিকে তাকালো। উগ্র মেজাজে বলল,
“ও হ্যালো? আমি এদিকে। আপনি এদিক ওদিক তাকিয়ে কী খুঁজছেন? আমাকে দেখেও না দেখার ভান করছেন?”
অমনি নীহারিকা আকস্মিক দৃষ্টি ফেলল রূপলের দিকে। এমন একটা ভাব ধরল মনে হলো এইমাত্র সে রূপলকে দেখেছে! রীতিমত অপরিচিত ভাব নিয়ে নীহারিকা কিঞ্চিৎ নাটুকে সুরে বলল,
“হ্যা বলুন? আমাকেই বলছেন?”
নির্বোধ দৃষ্টি ফেলে রূপল নীহারিকার দিকে তাকালো! উজবুক গলায় প্রশ্ন ছুড়ল,
“এমন একটা ভাব ধরছেন মনে হচ্ছে আমাকে চিনেন না? লাইফে ফার্স্ট টাইম দেখেছেন আমাকে?”
“ওহ্ হ্যা হ্যা মনে পরেছে! আমিতো আপনাকে চিনি! তা কেন ডাকছিলেন আমায়? অ্যানি প্রবলেম ভাইয়া?”
চোখ দুটো ছানাবড়া হয়ে গেল রূপলের! তাজ্জব দৃষ্টিতে সে নীহারিকার দিকে তাকালো! মিনিট কয়েক সে একই দৃষ্টিতে নীহারিকাকে পর্যবেক্ষণ করল। অতঃপর ভ্রম কাটিয়ে ওঠে হটকারি গলায় শুধালো,
“এই আপনার হয়েছেটা কী? ভাইয়া ভাইয়া করছেন কাকে? এর আগে তো কখনও আমাকে ভাইয়া ডাকেননি!”
“ডাকিনি তো কী হয়েছে? এখন থেকে ডাকব! বয়সে যেহেতু আপনি আমার বড়ো, সো রেসপেক্ট ফুললি আমি আপনাকে ভাইয়া ডাকতেই পারি!”
মাথা ঠাণ্ডা করল রূপল। শান্ত গলায় নীহারিকাকে বলল,
“ওকে ফাইন। ভাইয়া ডাকুন কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু কথা হলো আপনার মাথায় হঠাৎ এসব রেসপেক্টের টেস্পেক্টের ভূতটা চাপল কীভাবে?”
বেশ ভেবেচিন্তে নীহারিকা বলল,
“কাল রাতে ইউটিউবে একটা বাংলা নাটক দেখলাম।”
“হ্যা তো?”
“নাটকটা ছিল বেয়াই বেয়াইনের প্রেম সম্পর্কিত নাটক! তাই ভাবলাম আপনিও যদি চান্স নিতে আসেন! তাই আগে থেকেই সতর্ক হয়ে গেলাম!”
অমনি রূপল তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল! বাইক স্টার্ট করে সে ফোঁস করে শ্বাস ফেলল। নীহারিকার দিকে তেজী দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“তারছেঁড়া মেয়ে কোথাকার!”
#চলবে…?