বঁধুয়া কেমনে বাঁধিবো হিয়া পর্ব-১২+১৩

0
579

#বঁধুয়া_কেমনে_বাঁধিবো_হিয়া
লেখনীতে : তামান্না বিনতে সোবহান
পর্ব — বারো

কার্টেসিসহ কপি করা নিষেধ!

গ্রান্ড সুলতান থেকে লাউয়াছড়া ন্যাশনাল পার্কের দূরত্ব মাত্র চার কিলোমিটার থেকে সামান্য বেশি। ব্যক্তিগত গাড়িতে কিংবা অন্যান্য যেকোনো ধরনের গাড়ি করে সেখানে যাতায়াত করতে সময় লাগবে দশ থেকে পনেরো মিনিট। দিন যেহেতু ফুরিয়ে আসছে, রাত হওয়ার আগে আজকের জন্য শুধু কাছেপিঠে ওই একটা জায়গাতেই ঘুরতে যেতে পারবে। গাড়িতে উঠে অভ্যাসবশত জানালার দিকে মুখ বাড়িয়ে রাখল মাহদিয়া। ড্রাইভিং সিটের দিকে দৃষ্টি ফেলল না। তবে সে সেখানে বসেছে, তার ঠিক কোনাকুনি দিকের ডানপাশে বসে ড্রাইভ করছে শাদাব। রিসোর্টের গাইডরা কীভাবে টুরিস্টদের দর্শনীয় স্থান সম্পর্কে বর্ণনা দেয়, সেটা সে জানে। এই কারণে কোথাও ঘুরতে গেলে, গাইড প্রয়োজন হলে ফিমেইল গাইডই সঙ্গে রাখত সে। এই প্রথমই বোধহয় ঘুরতে যাওয়ার পথে তার একটু অস্বস্তি অনুভব হচ্ছে। ডানে-বামে তাকাচ্ছে না মাহদিয়া। সে এ-ও চাইছে না, কেউ তাকে দেখুক। তাই স্কার্ফ ও ফেইস মাস্কের সাহায্যে মুখটা বেশ যত্ন করেই ঢেকে রেখেছে। তবে একটা ব্যাপার সে খেয়াল করছে, এই টুরিস্ট গাইড দর্শনীয় স্থান সম্পর্কে টুকটাক কথা বলা তো দূর, জানতেও চাইছে না সে নিজ থেকে কোথায় কোথায় ঘুরতে চায়। কারও মুখে কোনো কথা নেই দেখে সে নিজেই জানতে চাইল,

-‘যাচ্ছি কোথায়? ফিরতে কতক্ষণ লাগবে?’

শিহাব ফোন হাতে নিয়ে গুগল ম্যাপে দূরত্ব দেখছে, ফাঁকে ফাঁকে রাস্তার দিকনির্দেশনাও দেখছে। শাদাবকে এসব বলে দিতে হচ্ছে না। সে এই রাস্তা চিনে, তাই সহজেই ড্রাইভ কন্ট্রোল করে এগিয়ে যেতে পারছে। মাহদিয়ার প্রশ্ন শোনে শিহাবই উত্তর দিল,

-‘কাছেই, লাউয়াছড়াতে। ওখানে ঘুরতে ঘুরতেই সন্ধ্যা নামবে বোধহয়। একবার ঢুকলে আর বেরোতে চাইবেন না আপনি। চমৎকার একটা ন্যাশনাল পার্ক।’

দেশের বাইরে থাকা অবস্থায়, অনেক আগে এই জায়গার নাম শুনেছিল মাহদিয়া। কখনও সেভাবে এই শহরের সাথে সখ্যতা গড়ে উঠেনি তার। কোনো দর্শনীয় স্থানেও ঘুরতে যাওয়া হয়নি। তাদের পৈত্রিক বাড়ি হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং উপজেলায় অবস্থিত। দেশ ছাড়ার আগে কোনোদিন ভ্রমণ নিয়ে এতবেশি আগ্রহ ছিল না তার মনে। কয়েকজন পাড়ার ছেলেমেয়েদের নিয়েই বিভিন্ন ধরনের খেলায় মেতে উঠত। দলবেঁধে মেয়েরা সবাই পুতুল পুতুল খেলত। সব পুতুলের বিয়ে ও বরযাত্রী নিয়ে হৈচৈ করত। কানামাছি, গোল্লাছুট, বউচি, কুতকুতসহ আরও নানা ধরনের খেলা খেলেই দিন কাটাত। শৈশব তাকে শুধু জীবনের এতটুকু জ্ঞান ও সৌন্দর্য বুঝতে শিখিয়েছিল। উপলব্ধি করিয়েছিল। এরপর তো এক যুগেরও বেশি সময় কেটে গিয়েছে জীবন থেকে। বন্ধুবান্ধব জীবনে আসলেও কেউ-ই শৈশবের স্মৃতির মতো এতটা পাকাপোক্তভাবে মনে বসতী গড়ে তুলতে পারেনি। শৈশব যেন জীবনের অন্যতম এক অধ্যায়। যখন মানুষ অবুঝ থাকে, তখন দ্রুত বড়ো হতে চায়, আর যখন বড়ো হয়, তখন শৈশবের দিনগুলো ফিরে পেতে চায়। অথচ যে জীবন একবার পিছনে চলে যায়, একবার অতীত হয়ে যায়, তা আর কভু বর্তমান কিংবা ভবিষ্যৎ হয়ে ধরা দেয় না।

ছোটোনের কথা শোনে একগাল হাসল মাহদিয়া। বলল,
-‘তুমি এর আগে এখানে এসেছ?’

-‘না। অনেকবার আসতে চেয়েছি। ভাইয়া নিয়ে আসেনি। এবার তো ফাইনাল এ্যাক্সাম সামনে। তাই আবদার করাতে শেষমেশ ভাইয়া ফাঁদে আটকা পড়লই।’

-‘তাই? তুমি ট্যুর দিতে পছন্দ কোরো?’

-‘ভীষণ! সময় পেলেই দেশের নানান জায়গায় ট্যুরে যাই আমরা। মাঝেমধ্যে আমাদের সঙ্গে কাজিনেরাও থাকে। তবে বেশিরভাগ সময়ই আমি আর ভাইয়া ঘুরতে বের হই।’

ঠোঁটের সামনে যেন কথাগুলো এতক্ষণ ঝুলেছিল। সুযোগ পাওয়াতে গড়গড়িয়ে বেরিয়ে এসেছে। শিহাবের সাথে কথা বলতে গিয়ে বেশ সহজ হতে পেরেছে মাহদিয়া। সে-ও সমানতালে বকবক করে যাচ্ছে। হায়দার সাহেব তাদের কথা শোনেও তৃতীয়পক্ষ হয়ে প্রবেশ করছেন না। দু’জনকেই বকবক করার সুযোগ দিচ্ছেন। শাদাব ওদের কথা শুনতে শুনতেই ড্রাইভ করছিল। একটা সময় গাড়ি ন্যাশনাল পার্কের সামনে এসে থামল। তিনজন নেমে যাওয়ার পর নির্দিষ্ট একটা ফাঁকা জায়গায় গাড়ি পার্কিং করে রেখে পার্কের প্রবেশপথের সামনে এসে দাঁড়াল। টিকিট কনফার্ম করে ভেতরে প্রবেশ করল সবাই। শিহাব চঞ্চল পায়ে হাঁটতে হাঁটতে মাহদিয়াকে বলল,

-‘আমরা এতক্ষণ কথা বললাম, অথচ আপনার নাম জানতে পারলাম না। আপনাকে কী বলে ডাকব, সেটাও জিজ্ঞেস করতে পারলাম না! কী পানসে আলাপ হচ্ছে এসব!’

হায়দার সাহেব ও শাদাব কথা বলতে বলতে সামনে এগিয়ে গেছেন। ওরা দু’জন বেশ কয়েক হাত পিছনে দাঁড়িয়ে হাঁটছে। এতক্ষণে মাহদিয়া সামনে থাকা অচেনা পুরুষকে খুব করে লক্ষ্যও করেনি। সে শিহাবের সাথেই যেন সময়টা উপভোগ করতে সাচ্ছন্দ্যবোধ করছে। শিহাব ভীষণ মিশুক ও আদুরে স্বভাবের ছেলে। এই কারণেই বোধহয় অল্প সময়ে খুব বেশি কাছের ও চেনা হয়ে উঠেছে। মিষ্টিমুখের এমন অবুঝপনা কথা শোনে খিলখিলিয়ে হাসল মাহদিয়া। মাস্কের কারণে হাসিটা বাইরে বের না হলেও শিহাব ঠিকই বুঝতে পারল। সে দাঁড়িয়ে থেকে মুখ ভেংচিয়ে বলল,

-‘বারে! সামান্য একটা কথা জিজ্ঞেস করেছি। এতেই আপনার হাসি পেয়ে গেল। এখানে হাসির কী বললাম? কোনো সম্বোধন ছাড়া, আপনি-আজ্ঞে আমার বড্ড বিরক্ত লাগছে এখন।’

মাহদিয়া হাসি থামাল। মাথা নাড়ল। কিশোরটা অবুঝ হলেও যথেষ্ট বুদ্ধিমান। কথার জালে ফেলে যে কাউকে মায়ার বাঁধনে আটকে ফেলতে পারে। সে নির্দ্বিধায় বলল,

-‘আমার নাম মাহদিয়া আজাদ। বাড়িতে সবাই, দিয়া বলে ডাকে। তুমি আমাকে আপু বলে ডাকতে পারো। অথবা অন্যকিছু। যা তোমার মন চায়।’

শিহাব ভাবুক নয়নে ঠোঁটের ওপর আঙুল রাখল। বলল,
-‘আপনার নামটা অনেক লম্বা। তবে আমি আপনাকে দিয়াপি বলে ডাকব। হবে?’

-‘নাম বললাম, সম্বোধন করার অনুমতি দিলাম। তুমি কিন্তু এখনও আপনিতেই পড়ে আছো! আপুকে কেউ আপনি-আজ্ঞে করে? বেমানান লাগে না শুনতে?’

-‘ও’কে, সুইট লেডি। এ্যাজ য়্যু’ওর উইশ।’

পার্কের যত গভীরে প্রবেশ করে ততই চমৎকার পরিবেশের সাক্ষী হয় মাহদিয়া। চারপাশে ঘনসবুজ অরণ্য। পাখপাখালির কিচিরমিচির। বন্য প্রাণীর ছোটাছুটি। কত-শত জন্তু-জানোয়ার ও জীবের বৈচিত্র্যময় জীবনধারণ। সবকিছু তাকে মুগ্ধ করে। সবকিছু ছাড়িয়ে ওরা ভেতরের ছোটো একটা পাহাড়ি ছড়ার সামনে দাঁড়াল। উঁচুনিচু রাস্তা মারিয়ে এখানে আসতে বেশ ঝাক্কি পোহাতে হয়েছে মাহদিয়াকে। স্বচ্ছ পানি ও বালির মিশ্রণে ঘেরা ছোট্ট এই পাহাড়ি ছড়া দেখে প্রাণ ফিরে পেল সে। পায়ের ক্যাডস্ খুলে প্লাজো খানিকটা উপরে তুলে পা ডুবাল পানিতে। শীতল স্রোতে গা ভাসানো না গেলেও হাঁটু অবধি পানিতে নেমে আনন্দ-উল্লাসে মেতে থাকে পর্যটকেরা। আশেপাশে আরও অনেক মানুষই এইভাবে পানিতে পা ডুবিয়ে নাচছে, দৌড়াচ্ছে, হাঁটছে, ছবিও তুলছে। শাদাব দূরে একটা উঁচু জায়গা দেখে দাঁড়িয়ে পড়েছে। বাচ্চাদের মতো এই ছোটাছুটি তার আর ভালো লাগে না। মাঝেমধ্যে প্রকৃতিতে ডুব দিতে ইচ্ছে হলে, ঘুরতে বের হয়। এইভাবে হৈ-হুল্লোড়ের সাথে আনন্দ উৎযাপন করা হয়নি কখনও। যতটুকু আনন্দ-ফুর্তি করে, সবটাই লিমিট মেপে। তাছাড়া সে যদি পানিতে নামেও মাহদিয়া অস্বস্তি অনুভব করবে। তারচেয়ে দূরে থেকেই মনোযোগ অন্যদিকে রাখা ভালো।

অনেকটা সময় নিয়ে পানির সাথে নাচানাচি করে পাড়ে এসে দাঁড়াল মাহদিয়া। শিহাব এতক্ষণ বেশ কয়েকটা ছবি তুলেছে দু’জনার। মাহদিয়া প্রথমে বারন করেছিল, পরবর্তীতে শিহাবের আবদারে মাস্ক পরিহিত অবস্থাতেই ছবি তুলেছে। মুখ খুলেনি। চারপাশে এত মানুষ দেখে তার ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছিল দেখে শিহাবও মাস্ক সরানোর জন্য জোর করেনি। উলটে মুখ ঢাকা অবস্থাতেই বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলে ছবি তুলেছে। সেইসব ছবি নিয়ে আবার আগ্রহ প্রকাশ করছে সে। ‘এটা সুন্দর হয়েছে, এটা বোধহয় এভাবে তুললে ভালো হোতো! এটা কেমন জানি বেঁকে গেছে। দূর ফোনের ক্যামেরা ভালো না।’ এ জাতীয় আরও কতশত কথা। সব শোনে মাহদিয়া একটাই উত্তর দিল,

-‘মোটকথা ক্যামেরাম্যান ভালো না। তা-ই ছবিগুলো সুন্দর আসেনি।’

শিহাব গালমুখ ফুলিয়ে বলল,
-‘ঠিক আছে। এখান থেকে একটা ছবিও আমি তোমার কাছে শেয়ার করব না। সব রেখে দেব।’

***

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের, সবুজ-শ্যামল গাছগাছালির ফাঁক দিয়ে এগিয়ে গেছে ঢাকা-সিলেট রেললাইন। এদিক থেকে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ট্রেন যাতায়াত করে। খাসিয়াপল্লীর লোকজনেরা এখানে যারা বসবাস করে, তারাও এই রেললাইনের পাশ দিয়ে যাতায়াত করে রোজ। উদ্যানের ভিতর রয়েছে এক, দেড় ও তিন ঘন্টার তিনটি ট্রেইল। যেখানে দাঁড়িয়ে পর্যটকরা প্রকৃতিকে খুব কাছ থেকে উপভোগ করতে পারে। তিনটি পথের মধ্যে একটি তিন ঘণ্টার পথ, একটি এক ঘণ্টার পথ আর অপরটি ত্রিশ মিনিটের পথ। এই মুহূর্তে একঘণ্টায় ট্রেইল অতিক্রম করা মানে সন্ধ্যে নামিয়ে ফেলা। এখানে সারাদিন ঘুরাঘুরি করতে হলে বিকেলে নয়, সকালে বের হওয়া উচিত। উপরে উঠতে না পেরে খানিকটা মন খারাপ হলো মাহদিয়ার। তবে শিহাব তাকে মন খারাপের রূপে থাকতে দিল না। ফাঁকা রেললাইনের পাশ ঘেঁষে হেঁটে হেঁটে সবুজের বাকি সৌন্দর্যটুকু উপভোগ করার সুযোগ করে দিল। মাহদিয়াও সেই সুযোগকে কাজে লাগাল। এই প্রথমবারের মতো রেললাইনের ইস্পাতে পা রাখল সে। মিটে রোদ্দুর ও আবছা অন্ধকারকে সঙ্গী করে মুহূর্তটা কাটছিল বড্ড আনন্দে। কবে যে সে বাচ্চা হচ্ছে গেল, টের পায়নি। পায়ে জুতো না থাকায় ইচ্ছেমতো এদিক-ওদিক চঞ্চল প্রজাপতির মতোই ওড়াউড়ি শুরু করল সে। বেখেয়ালিতে পা আটকে গেল! অমনি ব্যথা পেয়ে জোরেশোরে চিৎকার করে উঠল মাহদিয়া। পা টানতে গিয়ে দেখল, জুতো না থাকায় সামান্য একটু ফাঁক পেয়েই ইস্পাতের ধারাল অংশে আটকে গেছে। চোখমুখ কুঁচকে পা টেনে আনার চেষ্টা করল সে। পা তো আসলোই না, উলটে বেশ খানিকটা জায়গা ছিঁলে গেল। চুইয়ে চুইয়ে রক্ত বের হতে লাগল। চিৎকার শোনে ছবি তোলা রেখে দ্রুত ছুটে আসলো শিহাব। মাহদিয়া তাকে দেখে করুণ স্বরে বলল,

-‘একটু হেল্প কোরো ছোটোন। পা তো টেনে আনতে পারছি না। এদিক দিয়ে ট্রেন কখন আসে?’

-‘সেটা তো আমি জানি না। দ্যাখি, তুমি বোসো। আমি চেষ্টা করছি।’

আনাড়ি হাতে মাহদিয়ার পা টেনে আনার চেষ্টা করল শিহাব। ব্যর্থ হয়ে গলা উঁচিয়ে শাদাব ও হায়দার সাহেবকে ডাকল। খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে সায়রা করীমের সাথে ফোনে কথা বলছিল শাদাব। শিহাবের দুষ্টামি ও মাহদিয়ার সাথে তার পরিচয়, আলাপচারিতা, তাদের দুষ্টুমিষ্টি সম্পর্ক গড়ে ওটা সবটাই এক এক করে বলে যাচ্ছিল। হায়দার সাহেব গিয়েছিলেন, কিছু স্ন্যাকস্ কিনতে। গলা শুকিয়ে গিয়েছিল তাঁর। ফিরে এসে এই দৃশ্য দেখে ভীষণ ভয় পেলেন তিনি। শাদাবও ভাইয়ের চিৎকার শোনে ফোন পকেটে রেখে এগিয়ে আসলো। ততক্ষণে মাহদিয়ার রক্তাক্ত পা আঘাতের হাত থেকে বেশ খেসারত করেই টানাটানি করে বের করে এনেছে শিহাব। ছোটো বড়ো অসংখ্য পাথর ও ট্রেনের লাইনের ইস্পাতের ফাঁকে আটকে গিয়েছিল পা। টানাটানিতে আরও আঘাত পেয়েছে বেশি। অসহায় অবস্থায় রেললাইনের ওপরেই দুর্বল শরীর নিয়ে বসে পড়ল মাহদিয়া। রক্তাক্ত পায়ের দিকে তাকিয়ে শিহাবকে উদ্দেশ্য করে বলল,

-‘থ্যাংক য়্যু ছোটোন।’

শাদাব যখন আসলো, তখনও মাহদিয়া নীরবে বসে আছে সেখানে। পা দিয়ে রক্ত পড়ছে খেয়াল নেই। এদিকে বহুদূরে ট্রেনের হুইসেল শোনা যাচ্ছে। সে কাছে এসে কোনোদিকেই তাকাল না। মাহদিয়ার গলায় ঝুলে থাকা স্কার্ফ এনে ঝটপট হাতে পা বেঁধে দিল। রেললাইনের দিকে দৃষ্টি দিয়ে দেখল, ইস্পাতের নিচের দিকে অনেকটা জায়গা ফাঁকা হয়ে আছে। মূলত পাথর সরে যাওয়াতেই পা আটকে গেছে। নয়তো এই লাইনে পা আটকানোর না। সঙ্গে ফার্স্টএইড বক্স নেই, কোনো ধরনের ঔষধ নেই, এইমুহূর্তে তারচেয়ে অসহায়ও বোধহয় আর কেউ নেই। আচমকাই হুঁশে ফিরল মাহদিয়া। মাথার স্কার্ফ পায়ে দেখে, অচেনা এই পুরুষকে পাশে বসে থাকতে দেখে রেগে গেল। গলায় জোর এনে বলল,

-‘সামান্য একটা অজুহাত পেয়ে একেবারে গায়ের সাথে লেপটে যাচ্ছেন দ্যাখছি। সরুন এখান থেকে। আমি একা পারব।’

শাদাবকে কথা শুনিয়ে হায়দার সাহেবকে উদ্দেশ্য করে বলল,
-‘ছোটো মামা, আমি কিন্তু আগেই বলেছিলাম। এমন গা ঘেঁষাঘেঁষি স্বভাবের টুরিস্ট গাইড আমার মোটেও পছন্দ না।’

কী হলো কিছুই বুঝতে পারল না শাদাব! সাহায্য করতে এসে এইভাবে খারাপ কথা শুনল! সে কি লেপটে থাকতে এসেছিল না-কি? এসেছিল তো বিপদ দেখে সাহায্যের হাত বাড়াতে। এই মেয়ের মাথামুণ্ডুর সব তার বোধহয় খসে পড়েছে, নয়তো কিছু তার ঢিলে হয়ে গেছে। এরকম একটা সিচুয়েশনে রাগ, বকা, গালি আসে কোত্থেকে ভাই! তবে মাহদিয়ার এই কথাও সে হজম করতে পারল না। চেহারায় কাঠিন্যতা বজায় রেখে বলল,

-‘যান একা। দ্যাখব কেমন পারেন।’

ট্রেন বোধহয় সামনে আসলো। হুইসেল ক্রমাগত তীক্ষ্ণ শোনাচ্ছে। মাহদিয়া অসহায় চোখে দূরে দৃষ্টি দিল। ধীরগতিতে ট্রেন এদিকেই আসছে। সে রেললাইনে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল। হায়দার সাহেব হাত বাড়িয়ে দিলে মাহদিয়া তাঁর হাত ধরল ঠিকই, তবে পা দিয়ে ভর ফেলতে পারল না। পাথরের সাথে পা লাগলেই, স্কার্ফটা বসে যাচ্ছে সেখানে। সঙ্গে সঙ্গে ছিঁলে যাওয়া অংশ জ্বলে উঠছে। ব্যথায় আর্তনাদ করে আবারও রেললাইনে বসে পড়ল মাহদিয়া। বিড়বিড় করল,

-‘আর বের হব না কোথাও! বাইরে বের হলেই বিপদ হচ্ছে।’

তাকে এভাবে বসতে দেখে শিহাবও ভয় পেল। সে-ও হাত বাড়িয়ে তাকে টেনে তুলে রেললাইন থেকে সরানোর চেষ্টা করল। হাত ধরে যতই সাহায্য করুক, পা ফেলা তো মুশকিল হয়ে যাচ্ছে তার। কীভাবে চার-পাঁচ পা হেঁটে রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াবে! ভয়ে, দুঃশ্চিন্তায় শরীরের শক্তি ও মনের জোর হারিয়ে যাচ্ছে তার। সে বিড়বিড় করেই যাচ্ছে। উপায়ন্তর না পেয়ে এক’পা এগিয়েই আবার বসে পড়ছে। যত সময় যাচ্ছে, ট্রেন তত কাছে আসছে। মাহদিয়া নিজের জায়গাতেই আটকে আছে। বার বার তাকে এইভাবে হাল ছেড়ে দিতে দেখে শাদাব যথেষ্ট বিরক্ত হলো। সামান্য সাহায্যও নিবে না। একাও যাবে না। এভাবে বিপদের মুখে বসে থাকবে। এ কেমন মানুষ ভেবে পেল না সে। তার এই ছেলেমানুষী কথাবার্তা ও আচরণ সহ্য করতে না পেরে কিছুটা ধমকের সুরে বলল,

-‘আপনি কি এখানেই থাকবেন বলে স্থির করেছেন? কাঁথা-বালিশ এনে দেব? হাঁটতে যেহেতু পারছেন না, এখানেই পড়ে পড়ে ঘুমান। আমরা চলে যাচ্ছি, ঠিক আছে?’

মাহদিয়া কিছু বলল না। শিহাব ভাইয়ের কথা শোনে রেগে গেল। বলল,
-‘এমন একটা কাজ তুমি করতে পারবে? কেউ বিপদে আছে জেনেও তাকে সাহায্য না করে চলে যাবে? মানতে পারছি না ভাইয়া।’

-‘তোমার আদরের দিয়াপিকে বলো, তিনি যদি আমার সাহায্য নিয়ে এক্ষুণি এখান থেকে না যান, আর তিন সেকেন্ড পর আমাকে এখানে পাবেন না। সোজা রিসোর্টের দিকে রওনা দিব। কেউ মরুক কি বাঁচুক, তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না। মানবিকতার খাতিরে এগিয়ে এসেছি, কিন্তু উনি সেটাকে গা ঘেঁষাঘেঁষি ভাবছেন! দুনিয়ার জ্ঞান নিয়ে বসে আছেন উনি। মানুষ দ্যাখলেই বুঝে যান, কে কোন স্বভাবের!’

ট্রেনের হুইসেল এগোতে এগোতে এবার পুরোটাই কাছে চলে এসেছে। মাহদিয়া সাহস নিয়ে উঠে দাঁড়াল। ব্যথাতুর পা পাথরে পড়ার আগেই কারও হাতের তালুতে স্পর্শ করল। উলটে পড়ার আগেই হাতের কাছে থাকা কারও কাঁধ খামচে ধরে পরমুহূর্তে নিচের দিকে চোখ ফেলে চমকে উঠল মাহদিয়া। একবার রেললাইনের দিকে তাকাল, আরেকবার টুরিস্ট গাইডের হাতের দিকে। শাদাবের শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গুটানো ছিল। যার কারণে হাতের বেশ খানিকটা অংশ বাইরে বেরিয়ে এসেছে। লোমশ হাতের কনুইয়ের কাছাকাছি অংশে একটা বড়োসড়ো কালো রঙের স্পট দেখে পুরো শরীরের শিরা-উপশিরাসহ কেঁপে উঠল তার। একনিমিষেই চোখমুখে হাজারও বিস্ময়, ব্যথাবেদনা ফুটে উঠল মাহদিয়ার। সে অসহায় কণ্ঠে বলল,

-‘কে আপনি?’

শাদাব চোখ তাকাল। নিজের পরিচয় না দিয়ে শুধু বলল,
-‘যাবেন কি না?’

-‘আমি একা যেতে পারব।’

-‘জুতো কোথায়? জুতো পায়ে থাকলে ব্যথা কম লাগত।’

তখন পানিতে নাচানাচি করতে গিয়ে জুতো সেখানেই ফেলে এসেছিল মাহদিয়া। এতক্ষণ সেটা খেয়ালও ছিল না। যখন খেয়াল হলো, তখন সব রাস্তা বন্ধ। সন্ধ্যে হচ্ছে। ওদিকের রাস্তা অনেক দূর। এখন ওদিকে গেলেও জুতো পাওয়া যাবে কি-না সন্দেহ! তারচেয়ে এইভাবেই খালি পায়ে হেঁটে যেতে হবে। আপাতত জুতার চিন্তা দূরে। এই ছেলেটা কে, সেটাই তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শাদাবের মতো একই কালো দাগ তার হাতে। শিহাবের চেহারা ও শরীরের গঠন শাদাবের কৈশোরের মতোন। শিহাব আজ হায়দার সাহেবকে চাচ্চু বলে ডেকেছে। সব ভাবনা, সব দৃশ্য চোখের সামনে একটার পর একটা ধাঁধা তৈরী করে দিচ্ছে। যে ধাঁধার উত্তর কেবল, সামনে থাকা অচেনা পুরুষটার মাঝেই আছে। সে যখন উত্তর খুঁজতে মরিয়া, শাদাবকে চিনতে জানতে মরিয়া, তখনই নিজেকে শূণ্যে আবিষ্কার করে আরেকদফা চমকাল। যতক্ষণে তার ভাবনা থামল, ততক্ষণে আগন্তুক তাকে পাঁজাকোলে তুলে রেললাইন থেকে বেশ খানিকটা দূরে সরে এসেছে। হুইসেল বাজিয়ে, পু ঝিকঝিক শব্দে পিছন দিয়ে ধীরগতিতে ছুটে যাচ্ছে সিলেটগামী পারাবাত এ্যাক্সপ্রেস! স্বজ্ঞানে ফিরতেই পা নাচানো শুরু করল মাহদিয়া। অস্থির কণ্ঠে বলল,

-‘আপনার সাহস তো কম না! এইভাবে কারও অনুমতি ছাড়া তাকে ছুঁতে পারেন না আপনি। এটা কিন্তু মারাত্মক অভদ্রতা।’

এবার শিহাব ও হায়দার সাহেব সামনে হাঁটছেন। মাহদিয়া ও শাদাব পিছনে। কাছেপিঠে কেউ নেই দেখে শাদাবও নিজেকে লুকোল না আর। মাহদিয়ার পা নাচানো থামাতে চোখের দিকে তাকিয়ে তাকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দিল। রাগে অন্যদিকে চোখ সরিয়ে নিল মাহদিয়া। বিড়বিড় করে কতকিছু গালি দিল। শাদাব মুচকি হেসে বলল,

-‘কাজটা অভদ্রতার পর্যায়ে তখনই পড়ত, যখন আমরা দু’জন অচেনা থাকতাম। এখন তো আমরা চেনা। তাই এখানে ভদ্রতা-অভদ্রতার সংজ্ঞা টেনে না এনে এটা ভাবুন যে, বিপদে কেউ আপনাকে সাহায্য করছে।’

-‘এমন গা ঘেঁষা পুরুষের সাহায্যের কোনো দরকার নেই আমার। নিচে নামান আমাকে।’

-‘এইমুহূর্তে আমার পরিচয়, আমি আপনার টুরিস্ট গাইড। আপনাকে সেইফ রাখা, সুস্থ রাখা, সুস্থ শরীরে রিসোর্টে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া আমার দায়িত্ব ও কর্তব্য। একজন গাইড হিসেবে, টুরিস্টকে বিপদের মুখে ফেলে চলে যাওয়াটা আমার নীতিবিরুদ্ধ কাজ। তাই যেচেপড়ে, অসংখ্য গালি-বকা শোনেও আপনার সাহায্য করতে চাইছি। আশাকরি, আপনি আমাকে আমার কাজটা করতে দিবেন।’

মাহদিয়া পা নাচানো বন্ধ করে দিল। এই ছেলে কী করে শাদাব হয়! কণ্ঠস্বর, চেহারা, ফিটনেস, কিছুই তো মিলছে না। শুধু একটা দিক দেখে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। সে যৌক্তিক ভাবনা ভাবতে গিয়েও এলোমেলো করে ফেলল সবকিছু। মনে করার চেষ্টা করল, কালো রঙের সেই দাগটা শাদাবের কোন হাতে ছিল! যখন স্মৃতি তাকে সবকিছু স্মরণ করাল, তখনও সে নিশ্চিত হতে পারল না। হতাশা ঘিরে ধরল তাকে। জেদ চাপল। এই ছেলের পরিচয় জানার জন্য আগ্রহ জন্মাল। তাই কিছুটা নরম স্বরে বলল,

-‘ঠিক আছে। আমি আপনার সাহায্য নেব। আগে আপনার পরিচয় দিন। নাম-ঠিকানা সবটা সত্যি সত্যি বলবেন! এ-ও বলবেন, আপনার হাতের ওই কালো দাগটা কীসের! কবে থেকে ওই দাগ আপনার হাতে! সব সত্যি না বললে, আমি চিৎকার করে মানুষ জড়ো করে বলব, আপনি আমাকে কিডন্যাপ করছেন! তখন কিন্তু গণধোলাই খাবেন। একবার এই ধোলাই শরীরে পড়লে, একমাস হসপিটালে থাকবেন।’

শাদাব মনে মনে হাসলেও অনেক কষ্টে ঠোঁটের ভাবভঙ্গি স্বাভাবিক রাখল। মাহদিয়া তাকে সন্দেহ করছে। তারমানে দাগটা তার চোখে পড়েছে। তার মাথায়ও দুষ্টামি চাপল। সে-ও ঠিক একইভাবে বলল,

-‘কাউকে সাহায্য করার বিনিময়ে একমাস হসপিটালে থাকতে হবে! এরপর যদি আমি তাকে আমার পরিচয় দেই, তাহলে সে নির্ঘাত আমাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিবে।’

-‘কেন?’

কথার অর্থ না বুঝেই কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন করল মাহদিয়া। শাদাব এবার শব্দ করেই হেসে ফেলল। হাঁটতে হাঁটতে গাড়ির কাছাকাছি চলে এসেছে তারা। মাহদিয়াকে সিটে বসিয়ে দিয়ে নিজের জায়গায় ফিরে গেল শাদাব। শিহাবকে পাশে দেখে আর কথা বাড়াল না। গাড়ি স্টার্ট দিয়ে রওনা দিল রিসোর্টের দিকে। মাহদিয়া তখন স্থিরচোখে সামনে থাকা পুরুষকে দেখছে। দেখছে তার হাতের কালো দাগ। দূর থেকে ওই দাগটা ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছে করছে! জানতে ইচ্ছে করছে, যার জন্য সাত সমুদ্র, তেরো নদী পাড়ি দিয়ে ছুটে আসা, এই কী সেই ছেলে! না-কি অন্যকেউ! কে সে? কেন নিজেকে প্রকাশ করছে না? বার বার পরিচয়ের দিক এড়িয়ে যাচ্ছে কেন! যদি একবার জানতে পারে, এটাই শাদাব। তাহলে এই ছেলের মাথায় আর চুল থাকবে না। সব চুল টেনে ছিঁড়ে ফেলবে মাহদিয়া।

***

চলবে…

#বঁধুয়া_কেমনে_বাঁধিবো_হিয়া
লেখনীতে : তামান্না বিনতে সোবহান
পর্ব — তেরো

দেশ ছেড়ে যাওয়ার পর ইতালির মিলান শহরে বাবা-মায়ের সাথে মাহদিয়ার জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। অচেনা শহরে খাপ খাইয়ে নিতে প্রথম প্রথম বড্ড কষ্ট হচ্ছিল ছোট্ট মাহদিয়ার। চেনা-পরিচিত মুখ নেই, সহপাঠীরা নেই, গ্রাম্য পরিবেশ নেই, নেই শখের খেলাধুলাগুলোও। অবুঝ মন সারাক্ষণ চেনামুখ খুঁজে ফিরত। স্কুলে অ্যাডমিশন নেয়ার পর মন খারাপের ক্ষণটুকু মিইয়ে যেতে লাগল। সেখানে নতুন করে বন্ধুবান্ধব গড়ে উঠলেও বাড়ি ফিরলে পূণরায় সে একা হয়ে যেত। পুতুল, টেডিবিয়ার ও কম্পিউটার হয়ে যায় তার নিত্যদিনের সঙ্গী। এসবের মধ্যে যখন দেশ থেকে সপ্তাহে একবার সায়রা করীমের ফোন পেত, আনন্দে আটখানা হয়ে যেত সে। খিলখিল হাসিতে কত-শত বাচ্চামো আলাপ করত ভদ্রমহিলার সাথে। শাদাবের সাথেও কথা হতো তার। ফেলে যাওয়া দিনগুলো সে মিস করছে, এসব গান শোনাত বেশি। শাদাব শুনত। তাকে মানিয়ে নেয়ার জন্য ইমপ্রেস করত। তার কৈশোর মাথায় যত সহজসরল বুদ্ধি খেলা করত, তা দিয়েই একটু একটু করে মাহদিয়াকে সেখানে থাকবার জন্য অবুঝ মনের ভেতর আগ্রহ বাড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করত। ওরা যখন ফোনে কথা বলত, দু’মিনিট যদি শাদাব মোটিভেশনাল কথা শোনাত, পাঁচ মিনিট মাহদিয়া ঝগড়া করত। কোনো একটা টপিক পেলেই ঝগড়ার মুড তৈরী হয়ে যেত তার। বেশিরভাগ সময় ঝগড়া হতো ভ্রমর ডাক নিয়ে, তার কোঁকড়াচুল ও চুলের স্টাইল নিয়ে। মাহদিয়া বুঝত না, কেন শাদাব তার চুল ও চুলের স্টাইল পছন্দ করে না। কোনো সময়ই এই ছেলে তাকে বলেনি, তোমাকে এই চুলে সুন্দর লাগছে। উলটে ফোন ধরেই বলত,

-‘কেমন আছো জংলী ভূত? চুল কি স্ট্রেইট কোরোনি? যদি সেটা না কোরো, তাহলে সবচুল ফেলে ন্যাড়া হয়ে যাও। এমন ফুলে থাকা চুল দ্যাখলে ইচ্ছে করে তোমার মাথায় অনেকগুলো পাখির বাসা তৈরী করে রাখি।’

মাহদিয়া খুব রাগ করত সে কথা শোনে। অভিমান দেখাত। গাল ফুলিয়ে কথার উত্তর না দিয়ে চুপ করে থাকত। তার এই নীরবতা দেখে শাদাব পূণরায় বলত,

-‘আচ্ছা বাদ দাও। চুল ন্যাড়া করতে হবে না। থাকো তুমি ওইভাবে। ভূতের মতো। এখন তোমার পড়াশোনার খবর বলো। নতুন বন্ধুবান্ধব জুটিয়েছ?’

-‘হ্যাঁ। কিন্তু কেউ আমাদের মতো না।’

-‘ওটা ভিনদেশ। মনে রাখতে হবে তোমাকে। ওখানে তুমি বাঙালী হয়তো পাবে, কিন্তু একশোভাগ গ্রাম্যজীবনের কোনো দৃশ্য পাবে না। ওখানে সবকিছু একটুবেশি-ই আধুনিক।’

-‘মাঝেমাঝে মা-বাবার ওপর আমার খুব রাগ হয়। এখানে না আসলেই ভালো হোতো, তাই না? বাড়ির মতো ছোটাছুটি করতে পারি না।’

-‘কিন্তু তোমাকে মানিয়ে নিতে হবে। জীবনে বড়ো হতে গেলে, পরিপূর্ণ মানুষ হতে গেলে অনেককিছু পিছনে ফেলে যেতে হবে। অনেককিছু ভুলে যেতে হবে। অনেক স্মৃতিকে মেরে ফেলতে হবে। আবেগকে দূরে ঠেলতে হবে।’

এসব শোনে মাহদিয়ার মন আরও খারাপ হতো। স্মৃতি তো কতকিছুই আছে। সব স্মৃতি কি মেরে ফেলা যাবে? অবুঝ মনে ক্ষণে ক্ষণে একটা প্রশ্ন জেগে উঠত। গলার কাছে সেসব কথা আটকে রাখতে না পেরে বাচ্চামো গলায় বলত,

-‘একটা কথা বলি তোমায়?’

-‘একশোটা বোলো। শুনব।’

-‘আমি কি সত্যিই তোমার বিয়ে করা বউ? ওটা পুতুলখেলা ছিল না তো!’

শাদাব উচ্চস্বরে হেসে উঠত। তার হাসি থামত না। সে হাসতে হাসতে বলত,
-‘ভ্রমর আগে বড়ো হও, মানুষের মতো মানুষ হও, তারপর ফিরে এসে জানতে চেও, এই বিয়েটা কী ছিল!’

-‘দুচ্ছাই। এজন্যই তোমাকে ভালো লাগে না! মোটকু কোথাকার।’

-‘ভালো না লাগার মতো কী করলাম আবার?’

শোনে আরও রাগ বাড়ত মাহদিয়ার। অভিমানের সুরে বলত,
-‘তুমি বার বার আমাকে ভ্রমর বলে ডাকছ। আমার নাম ভ্রমর না। আমি উড়তেও পারি না। কতবার বলেছি আমি মানুষ। আমাকে নাম ধরে ডাকো।’

-‘তুমি মানুষ হও কি অন্যকিছু, সবসময় আমার কাছে ভ্রমর হয়েই থাকবে! আমি তোমাকে অন্য কোনো নামে ডাকব না।’

-‘কেন? এত সুন্দর নাম থাকতে ভ্রমর বলে ডাকবে কেন? এই ডাক শুনলে নিজেকে কেমন পোকামাকড় মনে হয়!’

-‘কে বলেছে তোমার নাম সুন্দর? ওই নাম তোমার সাথে যায় না-কি! মাথাভরা কোঁকড়া চুল, চুলের ওপর মাকড়সার মতো ক্লিপ। দূর। তোমাকে দ্যাখলেই আমার কেমন কীটপতঙ্গের কথাই মনে পড়ে।’

-‘আর কথা বলব না তোমার সাথে। আড়ি দিলাম আজকে।’

মাহদিয়া আড়ি দিত। শাদাব অপেক্ষায় থাকত। এক সপ্তাহ ঘুরবে, আবারও ফোনে যোগাযোগ হবে। মাহদিয়া যতই গাল ফুলিয়ে থাকুক না কেন, দেশ থেকে ফোন গেলে তার সব অভিমান ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যেত। তখন আড়ি ভুলে পূণরায় বকবক শুরু করত। শাদাব হাসত। দুষ্টুমি, খুঁনসুটি আরও কত শব্দের ঝুনঝুনানিতে দু’পাশের দুটো মানুষ অসংখ্য বার রাগ-অভিমান ও ঝগড়ার খেলায় মেতে উঠত। শত রাগ-অভিমানের মাঝেও কথা বলা বন্ধ হতো না দু’জনার। সম্পর্কটাকে দু’জনে তখন অন্য দৃষ্টিতে দেখেনি, দেখেছিল বন্ধুত্বের চোখ দিয়ে। যার কারণে বেশিরভাগ সময়ই ঝগড়াঝাটি ও দুষ্টুমিকে ঘিরে কথা চলত তাদের।

স্মৃতি তাকে এখন আর এত বেশি পোড়ায় না। খুব বেশি মনে পড়লে, তখন মন একটা কথাই বলে, শাদাব কথা রাখেনি। কেন রাখেনি? এমনটা তো হওয়ার কথা ছিল না। শেষবার যখন দু’জনার কথা হয়, তখনও তো যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যাবে, এমন কোনো ইঙ্গিত শাদাব দেয়নি। তবে হুট করে কেন এই দীর্ঘ বিচ্ছেদের গন্ধ লাগল সম্পর্কে? দু’জন মাত্র ভালো বন্ধু হয়ে উঠেছিল, তারমধ্যেই কালবৈশাখী ঝড় চলে এলো জীবনে! কোথা থেকে সবকিছু এলোমেলো হয়ে গিয়ে দু’জনেই পৃথিবীর দু’প্রান্তে ছিঁটকে পড়ে রইল। দেখা হওয়া, কথা হওয়া, যোগাযোগ হওয়ার সব পথ বন্ধ হয়ে গেল! স্মৃতিকে ঘিরে এমনসব মুহূর্ত যখন সামনে এসে দাঁড়ায়, তখন না চাইতেও আনমনা হয়ে যায় মাহদিয়া। গাড়ি যে রিসোর্টের ভেতরে প্রবেশ করেছে সেটা সে খেয়ালই করেনি। শিহাবের ডাক শোনেই চমকে তাকাল সে। গাড়ি থেকে নেমে তাকে নামতে সাহায্য করার জন্যই এগিয়ে এসেছিল শিহাব। তাকে অন্যমনস্ক হয়ে থাকতে দেখে হাতে সামান্য ধাক্কা মেরে বলেছিল,

-‘দিয়াপি, এসে গেছি আমরা। নামো। তোমার ড্রেসিং দরকার। বিশ্রাম দরকার।’

আদুরে বাচ্চাদের চেহারা দেখলেই মন ভালো হয়ে যায়। এতক্ষণ ধরে মন খারাপের যে রেশটুকু মনকে অস্থির করে রেখেছিল, শিহাবের ডাক ও আদুরে গলার আওয়াজে সব মন খারাপ অতলে তলিয়ে গিয়েছে। আদর আদর এই চেহারা দেখলে, মন আর খারাপ থাকে কী করে! তারমধ্যে কী যুক্তিবাদী কথা! কী মায়াময় চোখের ভাষা! যেন কত আপন। কত কাছের। অথচ পরিচয়টা ক্ষণিকের। এত অল্প সময়েও যে জীবনে কিছু ভালো মানুষের সংস্পর্শ উপভোগ করা যায়, তার একটা দৃষ্টান্ত ছিলেন সায়রা করীম। আর আজ আরও একটা দৃষ্টান্ত হলো শিহাব। মন কতকিছু ভেবে বসল, কত নিশ্চয়তা চাইল, কিন্তু মুখফুটে সব কথা বাইরে বেরিয়ে আসলো না। শুধু মনে হলো, কেউ কথা রাখেনি। কেউ কথা রাখতে জানে না। শিহাবের মুখের হাসি ও তার কথা শোনে নিজেকে স্বাভাবিক রেখে হাসবার চেষ্টা করল মাহদিয়া। বলল,

-‘তুমি এগোও। আমি আসছি।’

-‘পারবে আসতে? পায়ে ব্যথা পাবে না?’

-‘চেষ্টা করে দ্যাখি! বার বার অন্যের কাঁধে ভর দিয়ে চলা উচিত হবে না। নিজেকে কেমন যেন বোঝা মনে হয়। ভয় পেও না তুমি। আমি একা পথ চলতে জানি।’

খুব বেশি খারাপ পরিস্থিতি না হলে, যেচেপড়ে কারও সাহায্য নিত না মাহদিয়া। আগন্তুকের সাহায্য নেয়ার অজুহাতে তাকে একটা কথা বলেছিল, ছেলেটা যেন আগে নিজের পরিচয় দেয়। কিন্তু আগন্তুক তাকে পরিচয় দেয়া তো দূর, যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের কথা বলে ধোঁয়াশার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। তখন থেকেই মন একটা সূত্র মেলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। যখন সে উত্তর পেয়েছে, তখন সময়, ভাগ্য ও চেনা-পরিচিত সবার ওপর তার অভিমান বেড়ে গেল। শিহাব এমন জটিল কথা বুঝল না, তবে দূরেও গেল না। গাড়ি থেকে নেমে মাহদিয়ার দাঁড়ানোর জন্য খানিকটা জায়গা রেখে একপাশে সরে গেল। ধীরপায়েই নিচে পা ফেলল মাহদিয়া। প্রথমে ডান’পা ফেলল, পরবর্তীতে বাম’পা। এরমধ্যেই ব্যথায় অস্ফুটস্বরে ‘মাগো’ বলে উঠল। শিহাব ঝটপট হাত বাড়িয়ে তাকে ধরতেই অন্যদিক থেকে ‘ভ্রমর’ শব্দটা ভেসে এলো। পরক্ষণেই অন্য হাতটা শক্ত করে ধরে রাখল শাদাব। মাহদিয়া চোখ তুলে শাদাবের দিকে তাকাল। ধরে রাখা হাতের দিকেও তাকাল। ঠোঁট চেপে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো। এত বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটল কেবল একটা শব্দ ও একটা নামে। কিন্তু মনের ভেতরটা ক্রমান্বয়ে দুমড়েমুচড়ে যেতে লাগল। আলগোছে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিল অভিমানী মেয়েটা। জল টলমল চোখে তাকিয়ে বলল,

-‘অনেক উপকার করেছেন আমার। আর কোনো উপকারের প্রয়োজন নেই। এতটুকু রাস্তা আমি একা-ই চলে যেতে পারব। আপনি বরং নিজের কথা ভাবুন।’

হায়দার সাহেব দু’জনার কথার মাঝখানে না এসে, তিনি শিহাবকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে সেখান থেকে নিয়ে গেলেন। নিজের পায়ের শুধু গোড়ালিতে ভর দিয়ে কষ্ট করে কয়েক’পা এগিয়ে গেল মাহদিয়া। শাদাব পাশাপাশি দাঁড়িয়ে বলল,

-‘এক্ষুণি ড্রেসিং না করলে ইনফেকশন হয়ে যাবে।’

সব চেষ্টা ব্যর্থ হলো মাহদিয়ার। গড়গড়িয়ে চোখ বেয়ে পানি নেমে আসলো। শাদাবের এই কথা তার এত বছরের রাগ, অভিমানের আগুনে একফোঁটা ঘিয়ের কাজ করল। দাউদাউ করে আগুন জ্বলার মতো জ্বলে উঠল সে। বলল,

-‘লাগবে না ড্রেসিং। এসব ছোটোখাটো কাটাছেঁড়া এমনিতেই সেরে যাবে। কারও দয়াদাক্ষিণ্যের প্রয়োজন নেই আমার।’

-‘ভ্রমর, বোঝার চেষ্টা কোরো। সামান্য জায়গা থেকেই অনেক বড়ো ক্ষতি হয়ে যায়।’

-‘হোক। তাতে আপনার কী?’

শাদাব জবাব দিতে পারল না। হাত বাড়িয়ে মাহদিয়াকে ধরতে গেলেই সে আঙুল তুলে বলল,

-‘একদম ছোঁবেন না আমায়।’

ঠিকমতো হাঁটতেও পারছে না মাহদিয়া। তা-ও গোড়ালির সাহায্যে কয়েকপা এগিয়ে গিয়েছে। শাদাবের ওপর রাগ থেকেই নিজের ওপর চাবুক চালাচ্ছে বেশি। এই ছেলেটা কথা দিয়ে, কথা রাখেনি! বলেছিল, যোগাযোগ থাকবে। সবসময় কথা হবে। কিন্তু কিছুই হয়নি। সম্পর্কটাকে অস্বীকার করতে সে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে! এই সম্পর্ক তো তার কাছেও ভুল মনে হয়েছিল। এখনও হয়। যখন কেউ কথা রাখতে পারে না, তখন আরও বেশি করে মনে হয়, এই সম্পর্কতে বাঁধা পড়া ঠিক হয়নি। যে কথা রাখতে পারে না মানুষ, এমন কথা দেয়ার কী দরকার! রাগে সমস্ত শরীর থরথর করে কাঁপছে তার। এইবুঝি দপাস করে পড়ে গেল কোথাও, এমন অনুভূতি হচ্ছে। তবুও সে আরও তাড়াহুড়ো করে গ্রাউন্ড ফ্লোরে পা ফেলে লিফটের দিকে এগিয়ে যেতে চাইল। এরমধ্যেই পায়ে ভর পড়ায় কাটাছেঁড়া জায়গাটায় জ্বলে উঠল। শাদাব দেখল, নাকমুখ কুঁচকে ব্যথা সহ্য করেও এই মেয়ে ধ্যাইধ্যাই করে হেঁটে যাচ্ছে। তার মনে হলো, সে অযথাই মাহদিয়ার কথাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। এভাবে নিজেকে কষ্ট দেয়ার কী দরকার! পাশে থেকে এই মেয়ের আনাড়িপনা সহ্য হলো না তার। সে পিছন থেকে তাকে পূণরায় কোলে তুলে নিয়ে টানটান মেজাজে বলল,

-‘বড্ড বাড়াবাড়ি করছ। কীসের রাগ তোমার আমার ওপর? কেন তুমি আমার ওপরেই রাগ দ্যাখাবে?’

মাহদিয়া ফের আগের মতো পা নাচানো শুরু করল। বলল,
-‘মিথ্যুক! ধোঁকাবাজ! স্বার্থপর! ভালো অভিনেতাও বটে। আর কী সাজা বাকি আছে আপনার, বলবেন? এক যুগেরও বেশি সময় আগে, কী বলেছিলেন আমায় মনে পড়ে না?’

শাদাব তার চোখে চোখ রেখে শুধু উপরনিচ মাথা নাড়াল। তবে মাহদিয়াকে ছাড়ল না। নামবার সুযোগও দিল না। চেপে ধরে লিফটের কাছে গিয়ে বলল,
-‘রুম নম্বর বোলো।’

-‘বলব না। নামান আমায়। নয়তো চিৎকার করব!’

-‘এই হোটেলের ম্যানেজার কিন্তু জানে, তুমি আমার বিবাহিতা স্ত্রী! তাই তুমি গলা ফাটিয়ে চিৎকার করলেও ওরা সবাই কানে তুলো দিয়ে রাখবে। নিজের রুম নম্বর না বললে সোজা আমার রুমে নিয়ে যাব। তখন কি ব্যাপারটা খুব বেশি ভালো দ্যাখাবে?’

মান-ইজ্জতের ভয়ে রুম নম্বর বলে ফেলল মাহদিয়া। লিফটে পা রেখে নির্দিষ্ট রুমের কাছে এসে দাঁড়াল শাদাব। মাহদিয়া নিজের হাতে থাকা পার্স থেকে চাবি বের করে খানিকটা ঝুঁকে নিজেই লক খুলে দিল। ভেতরে প্রবেশ করে আগে তাকে বিছানায় বসিয়ে রেখে ইন্টারকমের সাহায্যে রিসেপশনে কল করে একটা ইমার্জেন্সি ফার্স্টএইড বক্স চাইল শাদাব। মাহদিয়া শুধু দাঁতে দাঁত চেপে দেখল। বকতেও পারল না, গালি দিতেও পারল না, আবার এমন পরিস্থিতি সহজে হজম করতেও পারল না। নীরব থেকে ভেতরে ভেতরে রাগে ফুঁসতে শুরু করল সে। শাদাব তাকে পর্যবেক্ষণ করল ঠিকই, বাড়তি কোনো আওয়াজ করল না। ফ্লোরে বসে পায়ের স্কার্ফ সরাল। এরমধ্যেই জায়গায়, জায়গায় রক্ত বসে গেছে। রক্তাক্ত স্কার্ফ আলাদা রাখল। মাহদিয়া তারদিকে তাকালও না। মুখ ঘুরিয়ে নিল অন্যদিকে। এতদিন এই চেহারা দেখার বড্ড আগ্রহ ছিল মনে। আজ সামনে দেখেও, চিনেও, তাকাতে ইচ্ছে করছে না। শুধু বার বার মনে হচ্ছে, এই নামহীন সম্পর্কের ইতি টানা উচিত শীঘ্রই। দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত তার। একটা প্রশ্ন, একটা উত্তরের আশায় ছুটে এসে, কারও ইচ্ছের বিরুদ্ধে তার মুখোমুখি হওয়াটা বড্ড লজ্জার হয়ে দাঁড়িয়েছে এখন। এতক্ষণে সে এটা নিশ্চিত হতে পেরেছে, শাদাব ইচ্ছে করেই আড়াল করে রেখেছে নিজেকে। চাইলেই সে যোগাযোগ কর‍তে পারত, কিন্তু করেনি। অনুভূতিহীন, মূল্যহীন এই সম্পর্ককে সে-ও হয়তো টেনে নিয়ে যেতে চাইছে না। এই কারণেই দূরে দূরে থাকা।

পায়ে ড্যাটলের স্পর্শ পেয়েই মৃদুস্বরে আর্তনাদ করে উঠল মাহদিয়া। দু’হাতে খামচে ধরল বিছানার চাদর। ব্যথাতুর চোখে তাকাল শাদাবের দিকে। ছেলেটা একমনে নিজের কাজ করছে। মাহদিয়ার ইচ্ছে করছে, একবার জিজ্ঞেস করুক এত পাল্টাল কেন সে! কিন্তু অভিমানে মুখ দিয়ে কথা আসলো না। ব্যান্ডেজ বাঁধার কাজ শেষ হলে ছোট্ট টেবিলটার দিকে নজর গেল মাহদিয়ার। সামান্য নাশতা-পানি রাখা সেখানে। এসব কখন অর্ডার করল? সে কি এতটাই বেখেয়ালি ছিল! জানার আগ্রহ থাকলেও ইচ্ছে করেই চুপ করে রইল। সবকিছু গুছিয়ে প্লেটে খাবার সাজিয়ে তার সামনেই রেখে দিল শাদাব। বলল,

-‘খাবারটা শেষ করে ঔষধ খেয়ে নাও। রাতে সামান্য জ্বর আসতে পারে। খুব বেশি অসুবিধা দ্যাখলে আমাকে ফোন কোরো।’

মাহদিয়া তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল,
-‘কাউকে প্রয়োজন হবে না আর। আপনি এখন যেতে পারেন। অনেক দয়া দ্যাখিয়েছেন। অনেক সাহায্য করেছেন। অচেনা একটা মেয়ের প্রতি এতটাও দায়িত্ব-কর্তব্য পালন করা উচিত হচ্ছে না আপনার।’

-‘ভ্রমর…।’

-‘ওই নামে ডাকবেন না প্লিজ। আমার ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছে। আপনি বরং এখান থেকে যান। আমাকে একটু একা থাকতে দিন।’

-‘খাবারটা শেষ কোরো, তারপর যাচ্ছি।’

-‘না খেলে কী করবেন? জোর করে খাওয়াবেন?’

-‘প্রয়োজন পড়লে সেটাও করব।’

মাহদিয়া সোজা হয়ে দাঁড়াল। শাদাব কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার হাত ধরে টানতে টানতে তাকে সোজা রুমের বাইরে নিয়ে গেল। এইটুকু রাস্তা এগোতে বড্ড হিমশিম খাচ্ছিল সে। তবুও পড়তে পড়তে নিজেকে সামলে নিয়ে তাকে দরজার বাইরে রেখে বলল,

-‘আমি দেশে কেন ফিরেছি জানেন? শুধু আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করতে! অনেকগুলো বছর আগে একদিন আপনি বলেছিলেন, ‘আমাদের সম্পর্ক নিয়ে এখন এত মাথা ঘামাবে না তুমি। ঠিকমতো পড়াশোনা করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত কোরো। যখন আমরা বড়ো হব, দায়িত্ব নিতে শিখব, তখন সম্পর্কটা যদি দামী মনে হয়, তবে তাকে গুরুত্ব দিব। আর যদি তা ভুল মনে হয়, তবে বিচ্ছেদের দিকে এগোব।’ আপনার সেই কথা মনে রেখে রাখতে বাধ্য হয়েছি, যদি না আপনি এতগুলো বছর নিজেকে আড়াল করে রাখতেন। আজ খুব জানতে ইচ্ছে করছে, একটা সম্পর্ককে কী ভাবেন আপনি? কতটা গুরুত্বহীন ভাবেন? কোনো কারণ ছাড়া, কথা ছাড়া, এইভাবে আমাকে মরিচীকার পিছনে কেন ছুটিয়েছেন আপনি? আমি তো বলিনি সম্পর্কটাকে আমি গ্রহণ করতে চাই! এ-ও বলিনি, বিচ্ছেদ চাই। তবে কীসের ভিত্তিতে আমার প্রতি এই অন্যায় করেছেন আপনি? নিজে তো স্বাধীনভাবে জীবন কাটিয়েছেন। মাঝপথে বলির পাঠা হয়েছি আমি। একটা নামহীন সম্পর্কের বোঝা নিয়ে এতগুলো বছর কাটিয়েছি। না সামনে এগোতে পারছি আর না পিছনে ফিরতে পারছি! এমন দোটানা পরিস্থিতিকে ফেইস করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে! মুক্তি দিন প্লিজ। এমন অসহ্যকর সম্পর্কের বন্ধন থেকে মুক্তি দিন আমায়।’

শাদাব এবার নিশ্চুপ রইল। কোনো কথা বলল না। শুধু শোনে গেল। মাহদিয়ার কথাগুলো মিথ্যে নয়। এই নামহীন সম্পর্ক একটা পুরুষ মানুষের জন্য সহজ হলেও নারীর জন্য তা কঠিনই। নারী না ছাড়তে পারে, না ধরে রাখতে পারে। ছাড়তে গেলেও পিছনের সুতো কাটতে হবে। ধরতে গেলেও দুটো মানুষের সম্মতিতে সম্পর্ককে মূল্যায়ন করতে হবে। অথচ তারা দু’জন ছিল পৃথিবীর দু’প্রান্তে। সম্পর্ক নিয়ে কোনোপ্রকার বোধবুদ্ধি মনে জাগ্রত হওয়ার আগেই নিয়তি তাদের আলাদা করে দিয়েছিল। এই সম্পর্কটাকে এখন জোড়া লাগানোর সাধ্য কার আছে! সেতো কথা না রাখার দলের কেউ হতে চায়নি। তবে নিয়তি তাকে এই পরিস্থিতির সামনে কেন দাঁড় করাল আজ? মাহদিয়া তো তাকে কিছু বলার সুযোগ দিচ্ছে না। নিজের দিকটাই একতরফাভাবে হিসাব করে যাচ্ছে সে। এইমুহূর্তে তার কাছে নিজের কষ্ট ও না পাওয়াটাই মূল্যবান। অন্যকারো কথা ভাববার সময় কোথায় তার! কেনই-বা ভাববে? সম্পর্কটা কি আর আট-দশটা স্বাভাবিক সম্পর্কের মতো? এমন অস্বাভাবিক সম্পর্ককে কয়জন গুরুত্ব দিয়ে জীবনের প্রতিটা পদক্ষেপকে এগিয়ে নিয়ে যায়! ভিত্তিহীন, বিশ্বাসহীন এই সম্পর্ক শুধু কাগজেই গড়ে উঠেছে। কাগজেই শেষ হবে। মাহদিয়া যখন মুক্তি চেয়েই নিল, তখন সে আর পিছনে ফিরবে না। মুক্তি দিবে তাকে। কী দরকার এত কাদা ছোড়াছুড়ির? দরকার নেই। কেউ মুক্তি নিয়ে সুখী থাকলে সমাধান তো এখানেই! নর্দমার পানি বেশি ঘাটাঘাটি করে দুর্গন্ধ ছড়াতে নেই। সে-ও অতীতের দুর্গন্ধ বর্তমানের ওপর আছড়ে পড়তে দিবে না। আড়ালে যে গল্প তার একার মনে লুকায়িত ছিল এতদিন, আড়ালেই তা শেষ করে দিবে। কোনোদিন প্রকাশ করবে না। মাহদিয়ার কথা ও সিদ্ধান্তকে হাসিমুখেই গ্রহণ করল শাদাব। বলল,

-‘আ’ম এ্যাক্সট্রিমলি স্যরি। আমার কারণে এতগুলো বছর নামহীন সম্পর্কের বোঝা মাথায় নিয়ে দিন অতিবাহিত করেছ জেনে খারাপ লাগল। আমি ভেবেছি, এতদিনে নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছ। এখনও যে তুমি পিছনে পড়ে থাকতে পারো, এটা ভাবতেও পারিনি। সমাধান যখন নিজেই ভেবে রেখেছ, তখন আমাদের সম্পর্ককে আমি কী ভাবি, কতটা গুরুত্বপূর্ণ কিংবা গুরুত্বহীন ভাবি, সেটা আর জিজ্ঞেস কোরো না। আমার পক্ষে এই কঠিন ও দীর্ঘ বিস্তৃত প্রশ্নের উত্তর দেয়া সম্ভব নয়।’

আর কোনো কথা শোনার অপেক্ষায় রইল না শাদাব। মাহদিয়ার দেশে ফিরার উদ্দেশ্য পরিষ্কার হয়ে গেছে তার কাছে। এবার শুধু সমাধানের পথে হাঁটা বাকি। ট্যুরের এই দিনগুলো কেটে যাক। তারপরই সে নামহীন সম্পর্কের ইতি টেনে দিবে। কোনোপ্রকার জোরজবরদস্তির প্রয়োজন নেই। আর কোনো সত্য প্রকাশেরও দরকার নেই। যে সত্য আজ মাহদিয়া মুখ দিয়ে বের করেছে, সেই সত্যটাকেই বাস্তবায়ন করতে হবে শীঘ্রই। নয়তো চিরদিন এই একটা অপরাধের বোঝা তাকে তুষের আগুনে পোড়াবে।

***

চলবে…