#বঁধুয়া_কেমনে_বাঁধিবো_হিয়া
লেখনীতে : তামান্না বিনতে সোবহান
পর্ব — বিশ
কার্টেসিসহ কপি করা নিষেধ!
ভোরের শীতল ও স্নিগ্ধ হাওয়া গায়ে মাখতে রিসোর্টের সামনের দিকে এসে দাঁড়িয়েছে মাহদিয়া। হাতে গরম কফি। চুমুক দিচ্ছে আবার প্রকৃতির এই চোখধাঁধানো, মনমাতানো সৌন্দর্য উপভোগ করছে। এই সকাল, এই পরিবেশ যেমন সুন্দর, তেমন গতকাল পুরো রাতটাই ছিল স্বপ্নের চেয়েও আরও বেশি সুন্দর। খেলা শুরু হওয়া, প্রতিদ্বন্দ্বীদের মুখোমুখি হওয়া, হাড্ডাহাড্ডি লড়াই, সবকিছুই যেন একটা চমৎকার মুহূর্তের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে তাকে। বিশেষ করে পুরো গেমজুড়ে শাদাবের সহজ-স্বাভাবিক আচরণ ভীষণভাবে তাকে এ যাত্রায় জিততে সহযোগিতা করেছিল। শেষরাতে যখন বিদায় নিয়ে ঘুমোতে যাবে তখনও শাদাবের আচরণ বেশ স্বাভাবিক ছিল। তবে কয়েকঘণ্টা সময়ে একটা জায়গায়ই শাদাবকে অস্বাভাবিক মনে হচ্ছিল মাহদিয়ার। ছেলেটা একবারও তাকে ‘ভ্রমর’ কিংবা ‘মাহদিয়া’ সম্বোধন করেনি। কিছুই ডাকেনি। প্রয়োজনের সময় ‘তুমি’ শব্দটার ব্যবহার করেছে বেশি। পুরনো সব কথা ও শাদাবের ‘ভ্রমর’ ডাক এড়িয়ে যাওয়ার দৃশ্যটা মনে হতেই মনপাড়ায় অশান্তি শুরু হলো তার। এদিক-ওদিক হাঁটতে হাঁটতে ঠোঁট কামড়ে ভেবে যাচ্ছিল, কীভাবে আট-দশটা সম্পর্কের মতো তাদের সম্পর্কটাকে সে সহজ করবে। শাদাব এগোতে চেয়েও যে কোনো এক অজানা কারণে এগোতে পারছে না, সেটা তার গতকালকের আহাজারিতেই বুঝে গিয়েছিল মাহদিয়া। সময়, সুযোগ না হওয়াতে পাশাপাশি, কাছাকাছি বসে দীর্ঘক্ষণ একে-অন্যের সাথে সম্পর্ক নিয়ে কোনোপ্রকার আলাপ-আলোচনা করতে পারছে না। ফলস্বরূপ, কেউ কাউকে বুঝতেও পারছে না। চিনতেও পারছে না। দেখা হলেও পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরী হচ্ছে না। সম্পর্কটা নামহীন হলেও পবিত্রতার একটা টান এখানে আছে। অদৃশ্য হলেও সেই টানটা মাহদিয়াকে ছুঁয়ে যায়। হয়তো শাদাবকেও ছোঁয়, কিন্তু সে বুঝতে দেয় না এটাই তার সমস্যা!
পবিত্র সম্পর্কের মাঝখানের এই অহেতুক দূরত্বকে দূরে সরানোর জন্য কী কী উপায় ভাবলে সহজেই শাদাবের মনের ভেতরটা সে পড়তে পারবে, জানতে পারবে, তাকে বুঝতে পারবে, এসব নিয়েই শব্দহীন ভাবনায় ডুবে রইল মাহদিয়া। এরমধ্যেই একজন হোটেল কর্তৃপক্ষ তার সামনে এসে ছোট্ট একটা খাম বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
-‘এটা প্রতিযোগিতার গিফট। রাতে প্রস্তুত করা সম্ভব হয়নি দ্যাখে সঙ্গে সঙ্গে দিতে পারিনি।’
মাহদিয়া খামটা খুলে ভেতরের কাগজটা দেখল। দু’জনার নামসমেত ছোট্ট একটা অভিনন্দন পত্র এটা। এই খামের মাধ্যমেই আগামী যেকোনো সময়, যেকোনো দিনে সাতদিনের ট্যুরে আসতে পারবে তারা। কাগজটা দেখে সে সামনে থাকা লোকটাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
-‘শাদাবের কাছে দিলেই হোতো।’
-‘স্যার বললেন আপনার হাতে দেয়ার জন্য। তাই…!’
মুখে হাসি ধরে রাখার চেষ্টা করল মাহদিয়া। লোকটা বিদায় নিলে খামটার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে বুঝতে পারছে, শাদাব কেন এটা নিজের কাছে রাখছে না। এই ছেলে এটা রাখবেও না নিশ্চিত। যেহেতু সে জিতবার আগ্রহ প্রকাশ করেছে, গিফটটা তাকে দিয়েই বুঝিয়ে দিল, এতে তার কোনো অধিকার কিংবা আগ্রহ নেই। সে তো খেলতেই চায়নি, গিফট দিয়ে কী করবে! যার জিত দরকার ছিল, গিফটও তার-ই দরকার হওয়ার কথা। সামান্য এক এড়িয়ে যাওয়া দিয়ে কত না বলা কথা প্রকাশ করতে পারে শাদাব! এই এড়িয়ে যাওয়ার মাঝেও যে সম্পর্ক নিয়ে তারমধ্যে ইতিবাচক ভাবনার ছিঁটেফোঁটাও খুঁজে পাওয়া গেল না, সেটা ভেবেই অস্থির হয়ে গেল সে। কফিতে চুমুক দিয়ে নিজেকে শান্ত রেখে সবুজ-শ্যামল প্রকৃতির মায়ায় ডুবে যেতে চাইল।
রিসোর্টের সামনের দিকের একটা ফাঁকা অংশে সবুজে ঘেরা ঘাসের বুকে বেশ কয়েকজন ছেলেমেয়ে ক্রিকেট খেলছে। সেখানে কান্তা, তারিন ও মুনমুন ছিল। ওদের তিনজনের স্বামীরাই ক্রিকেট খেলার আয়োজন করেছে এখানে। তখন শিহাব ও শাদাব নিচে আসলো নাশতাপর্ব শেষ করার জন্য। যত তাড়াতাড়ি সকালের নাশতা শেষ করে ‘সাতছড়ি’ রওনা দিবে তত তাড়াতাড়ি পৌঁছাবেও সেখানে। ঘুরাঘুরিটা হবে জম্পেশ। শিহাবকে হায়দার সাহেবের সাথে বসিয়ে রেখে চারপাশে চোখ ঘুরিয়ে মাহদিয়াকে খুঁজল। এদিকে না পেয়ে অন্যদিকে এগোতেই দেখল, আনমনা হয়ে কফির কাপে মুখ ডুবিয়ে রেখেছে মাহদিয়া। তার চেহারা দেখে বুঝবার উপায় নেই, মনের গোপন ঘরে কী চলছে!
আচমকাই দূর থেকে চিৎকার দিল মুনমুন। মাহদিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলল,
-‘মাহদিয়া, এইখান থেকে সরে দাঁড়াও, বল উপরে পড়বে।’
এত দ্রুতবেগে বল তার দিকে ছুটে আসলো, মুনমুনের চিৎকার ও সাবধানবাণী শোনে ভরকে গিয়ে সামনের দিকে তাকাতেই হাতে টান অনুভব করল। কী হলো কিছুই বুঝতে পারল না মাহদিয়া এর আগেই মাটিতে চিৎপটাং। হাতের কাপ ছিঁটকে পড়ল দূরে। হুঁশ ফিরতেই দেখল, সে নিজের সমস্ত শরীরের ভর ছেড়ে দিয়েছে শাদাবের ওপর। শক্তপোক্ত পাথরের মেঝেতে পিঠ ঠেকিয়ে দু’হাতের বেষ্টনীতে তাকে আগলে নিয়েছে শাদাব। খামটা যে হাতে ছিল, সেই হাত দিয়ে শক্ত করে বেখেয়ালির মাঝেই শাদাবের শার্টের কলার ধরে দু’চোখ বন্ধ করে ভয় দূর করতে লাগল। এলোমেলো কোঁকড়াচুলগুলো যে কারও বুক ও মুখ ছুঁয়ে যাচ্ছে, সেদিকে তার দৃষ্টি নেই। সে তখনও একমনে দোয়াদরুদ জপছে। তার এই ভীতিগ্রস্ত মুখ ও ঠোঁটের নড়চড় দেখে ডানহাত এগিয়ে এনে সামনের চুলগুলো সরিয়ে মাহদিয়ার বন্ধ দু’চোখের ঢেউ খেলানো পাপড়ির দিকে তাকিয়ে পুরো ব্যাপারটা বুঝতে পেরে ঠোঁটের কোণে হাসি চেপে রেখে বলল,
-‘এখনও ভয় লাগছে? যদি সোজা হয়ে বসতে, তাহলে আমার উঠতে একটু সুবিধা হোতো।’
তড়িঘড়ি নিজেকে স্বাভাবিক করল মাহদিয়া। কলার থেকে হাত সরাল, শাদাবের দৃষ্টি থেকে নিজেকে সরিয়ে নিজের হাতের ওপর ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াল। হাত বাড়িয়ে শাদাবকেও উঠতে সাহায্য করল। বলল,
-‘বেখেয়ালি ছিলাম। ব্যথা পেয়েছ?’
ডানহাত পিছনে নিয়ে আলগোছে নিজের পিঠ চেক করল শাদাব। শার্ট ও ভেতরের টি-শার্ট সামান্য ছিঁড়ে গেছে এটা নিশ্চিত। পিঠেও খানিকটা জ্বলছে। সেসব এড়িয়ে গিয়ে বলল,
-‘যখন-তখন যারতার ওপর যদি এইভাবে পড়ে যাও, নিজেকে সুরক্ষিত রাখবে কী করে? যেকোনো জায়গায়, যেকোনো মুহূর্তে ডানে-বামে চোখ-কান খোলা রেখে দাঁড়াতে পারো না? কী হোতো এখন? উড়ে আসা বলের গতি ও আঘাত সহ্য করতে পারতে? নাক-মুখ চ্যাপ্টা হয়ে যেত। তখন সত্যি সত্যিই তোমার ওই হাত-পা ও চেহারায় সার্জারী করতে হোতো।’
চোখ ছোটো করে তাকাল মাহদিয়া। ক্ষ্যাপে গিয়ে মেজাজ দেখিয়ে বলল,
-‘আশ্চর্য! আমি কি ইচ্ছে করে পড়েছি? খেয়াল করিনি দ্যাখেই তো এমন হলো। পড়ত বল আমার গায়ে, লাগত ব্যথা, হয়ে যেত নাক-মুখ চ্যাপ্টা, তাতে তোমার এত মাথাব্যথা হবে কেন? এখানে কে আসতে বলেছিল তোমাকে? যেচেপড়ে সেইফ করতে এসে এখন আবার কথা শোনাচ্ছ। যত্তসব।’
খামটার জন্যই মেজাজ গরম মাহদিয়ার। নিজের যে বিপদ হতে যাচ্ছিল, সেটা বুঝতে ও মানতে নারাজ। উলটে যে সেইফ করতে আসলো, তাকেই কথা শুনিয়ে দিল। এমন রুক্ষভাষী মাহদিয়াকে দেখে আর কিছু বলার আগ্রহ পেল না শাদাব। নিঃশব্দে সেখান থেকে সরে পড়ল। বল নেয়ার জন্য মুনমুন ছুটে এলো কাছে। চারিদিকে চোখ ঘুরিয়ে বল খুঁজতে লাগল। পাশেই সেটা পড়ে পড়ে বিশ্রাম নিচ্ছিল। নিচ থেকে বল তুলে নিয়ে মাহদিয়াকে বলল,
-‘এ্যাই, তুমি ঠিক আছো? বল লেগেছে গায়ে?’
দু’দিকে মাথা নাড়ল মাহদিয়া। সামনের দিকে চোখ পড়তেই দেখল শাদাবের পিঠের কাছে খানিকটা রক্ত। আঁৎকে উঠল মুহূর্তেই। ব্যস্ত হয়ে চোখ রাখল নিচে। এখানে বেশ খানিকটা জায়গায় রঙচঙে পাথর দিয়ে সাজানো। হয়তো এখান থেকেই ব্যথা লেগেছে! এই দৃশ্য দেখে ও বুঝে মুনমুনের সামনে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার মতো ধৈর্য ও মনোবল পেল না মাহদিয়া। হাসিমুখে প্রস্থান করে শাদাবের পিছনে এলো। কিন্তু ততক্ষণে গ্রাউন্ড ফ্লোরের কোথাও তার দেখা মিলল না।
***
রুমে এসে শার্ট ও স্যান্ডো টি’শার্ট খুলে আয়নার সামনে দাঁড়াল শাদাব। ঘাড় ফিরিয়ে পিছনটা দেখার চেষ্টা করল। সম্পূর্ণ দেখা না গেলেও অল্প যা দেখল, তাতেই বুঝতে পারল, খুব বেশি ক্ষতি না হলেও সামান্য ছিঁলে গেছে। হাতের কাছে এইমুহূর্তে কিছুই নেই। উপায় শুধু ভেজা টিস্যু। হাতে টিস্যু নিয়ে পূণরায় আয়নার সামনে দাঁড়াতেই দরজায় নক হলো। বিরক্ত হলো শাদাব। চেঁচিয়ে বলল,
-‘কে ওখানে?’
সঙ্গে সঙ্গে জবাব এলো,
-‘শাদাব আমি, মাহদিয়া। প্লিজ, ওপেন দ্য ডোর।’
মাহদিয়ার আওয়াজ শোনেই বিরক্তি আরও একখাঁটি উপরে উঠে গেল। দাঁড়িয়ে থেকেই বলল,
-‘কেন এসেছ এখানে?’
ধৈর্য্য কমে এলো মাহদিয়ার। তর্ক করতে গিয়েও মেজাজের উঠানামাকে সামলে নিল। বলল,
-‘তুমি দরজাটা খুলো। ভেতরে এসে বলছি।’
-‘দরজা খুলতে পারব না। তুমি এখন যেতে পারো। আমি কিছুক্ষণ একা থাকতে চাই।’
থামবার আগ্রহ কিংবা ইচ্ছা নেই মাহদিয়ার মধ্যে। একাধারে ডাকতে ডাকতে এখন সে দরজায় বেশি করে নক করতে শুরু করল। চরম রাগ ও বিরক্তি নিয়ে খুলে রাখা শার্টটা আবারও গায়ে জড়াল শাদাব। নব ঘুরিয়ে দরজা খুলে বলল,
-‘কী সমস্যা তোমার? যাও এখান থেকে।’
হাতের ভরে শাদাবের বুকের কাছে ধাক্কা মারল মাহদিয়া। হুটহাট এই আক্রমণের জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না শাদাব। সামান্য ব্যথা পেয়েই সে একপাশে সরে দাঁড়াল। তাতেই কাজ হলো। সুযোগ পেয়েই টুপ করে রুমে প্রবেশ করল মাহদিয়া। দরজা বন্ধ করে জোরজবরদস্তির মাধ্যমেই একহাতে তাকে টেনেটুনে বিছানায় এনে বসাল। অন্যহাতে থাকা তুলো, ড্যাটল ও ব্যান্ড-এইড একপাশে রেখে পরনের শার্টে হাত ছোঁয়াতেই বাঁধা দিল শাদাব। বলল,
-‘এক্ষুণি বাইরে যাবে। আর একমিনিটও তোমাকে আমি এখানে সহ্য করব না।’
-‘চুপচাপ বোসো। আমি বেশিক্ষণ থাকব না এখানে। এটা ঠিক করেই চলে যাব।’
মাহদিয়ার সোজাসুজি কথা হলেও কেন যেন এই কথাটা নিতে পারল না শাদাব। মেজাজ ধরে রেখেই বলল,
-‘এটা আমি একাই ম্যানেজ করে নিতে পারব। প্লিজ যাও। ছোটোন চলে আসলে ব্যাপারটা খুব বিচ্ছিরি দ্যাখাবে!’
মাহদিয়া ক্ষীণ হাসল। বলল,
-‘অন্য সবার সামনে যা স্বাভাবিক, তা ছোটোনের সামনে অস্বাভাবিক কেন? গতকাল কিন্তু তোমার অন্য একটা রূপ আমার সামনে এসেছিল। দুটো রূপই ভিন্ন। কখনও কখনও একটাকে খুব চেনা মনে হলেও অন্যটাকে খুব বেশি অচেনা মনে হয়। এইযে, এখনকার এই ‘তুমি’ আমার কাছে বড্ড অচেনা। মনে হচ্ছে, জীবনেও এই তোমাকে দ্যাখিনি আমি। চিনি না। বুঝিও না। কী অদ্ভুত বোলো তো? এমন কেন মনে হচ্ছে শাদাব? কেন আমি তোমাকে এত কাছে থেকেও চিনতে পারছি না?’
-‘কারণ কাল আমি ইচ্ছে করেই ওখানে সহজ হয়েছিলাম। যেন তুমি গেমটা জিততে পারো। অন্য সবার সামনে আমাদের সম্পর্ককে প্রশ্নবিদ্ধ করব না বলেই সহজ, স্বাভাবিক থাকতে বাধ্য হয়েছি।’
মনে ব্যথা পেল মাহদিয়া। করুণ চোখে তাকাল। সামান্য প্রতিযোগিতার কারণে কিছু সময়ের জন্য খোলসের আবরণ থেকে অন্য যে শাদাব বেরিয়ে এসেছিল, সেই শাদাবকেই তো তার চিরকাল লাগবে। এই মুহূর্তে যে শাদাব তার সামনে, সে সম্পূর্ণ ভিন্ন। মানুষ একজন হলেও তার মধ্যে যেন দুটো সত্ত্বার বসবাস। একেক সময় একেক রকম ব্যবহার করে এই ছেলে তাকে দিনরাত শুধু হতাশা ও মরিচীকার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অথচ সে ফিরেছিল, কিছু সঠিক প্রশ্নের উত্তর জানতে। চেনা-জানা ও বুঝাপড়ার মধ্য দিয়ে অস্বাভাবিক এই সম্পর্কটাকে স্বাভাবিক করে নিতে। মাহদিয়া একা একদিক থেকে যতই এগোক, যতই সাপোর্ট দিক, যতই আগ্রহ প্রকাশ করুক, শাদাবের এই এড়িয়ে যাওয়াটাই সম্পর্ককে আরও নড়বড়ে করে দিচ্ছে। একেই তো এই সম্পর্ক মজবুত নয়। এখানে পর্যাপ্ত বিশ্বাস, ভরসা ও ভালোবাসার অভাব। তাইবলে, এইভাবে আর কতদিন! একটা সিদ্ধান্ত তো নেয়া উচিত দু’জনার। কিছু সময় বসে খোলাখুলি আলোচনা করা উচিত! শাদাব শুধু তাকে কেন, এই সম্পর্কটাকেই হয়তো আর সুযোগ দিতে চাইছে না। এই কারণে একেক সময় নিজের একেক রূপ দেখিয়ে বুঝিয়ে দেয়, প্রয়োজনে সে যেমন পাশে এসে ভরসা দিতে জানে, প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে ঠিকই দূরে সরে যেতে জানে। এইজন্য নিজেকে সে দূরে সরিয়েও নিচ্ছে। মাহদিয়া বুঝতে পারলেও কিছু করবার ক্ষমতা তার নেই। নীরবে, গোপনে মনের বিরহ মনের কোণেই লুকিয়ে ফেলল। বলল,
-‘আমরা কি আমাদের সম্পর্ক নিয়ে একটু বেশি সময় ধরে ভেবে-বুঝে আলাপ-আলোচনা করতে পারি না?’
অধৈর্য্য মাহদিয়া ব্যকুল হয়ে তাকিয়ে রইল শাদাবের দিকে। শাদাব ম্লানমুখে বলল,
-‘এখন আর দীর্ঘ-বিস্তারিত আলোচনার কী দরকার? মুক্তি তো তুমি আগেই চেয়ে ফেলেছ। আমি নিজেও এখন খুব করে চাই, শীঘ্রই যেন এই নামহীন সম্পর্ক থেকে তোমায় মুক্তি দিতে পারি।’
অস্ফুটস্বরে ‘প্লিজ’ উচ্চারণ করল মাহদিয়া। আলগোছে হাতের তিনটে আঙুল রাখল শাদাবের ঠোঁটের ওপর। নিজের দিক পরিষ্কার করতে বলল,
-‘তোমার ওপর অনেক রাগ ছিল, অনেক অভিমান ছিল, তাই হুটহাট মেজাজ হারিয়ে যাওয়াতেই ওইভাবে রি’অ্যাক্ট করেছি। ট্রাস্ট মি, আমি এই সম্পর্ক ভাঙতে আসিনি।’
মাহদিয়ার মুখের কথা, চোখের দৃষ্টি সবটাই যেন আজ স্বীকারোক্তি দিচ্ছে, এই সম্পর্কটা দীর্ঘদিন, দীর্ঘবছর বেঁচে থাকুক। ওই চোখেমুখে সম্পর্ক বাঁচানোর এক অত্যাধিক আগ্রহ, ইচ্ছেরা প্রকাশ পাচ্ছে। শুধু পাশে একজন ভরসার মানুষ এসে যুক্ত হোক। একটুবেশি-ই আপন হয়ে সম্পর্কের মূল্য বুঝে, বিশ্বস্ত এক নীড় তৈরী করুক। তার এসব চাওয়া যে অসম্ভব ও অবাস্তব এক কল্পকাহিনীর গল্প, সেটা শুধু শাদাব একাই জানে। বুকপাঁজরে ক্রমাগত এক চিনচিনে ব্যথা হলো তার। লুকানো এই ব্যথা যে প্রতিক্ষণে, প্রতিমুহূর্তে তাকে শেষ দিচ্ছে, সেটাও একাই তাকে সহ্য করতে হয়। যে কথা সহজভাবে বলা যায়, সেই কথা এখন কালবৈশাখী ঝড় হয়ে, বাবা-মায়ের প্রতি গড়ে ওটা এই মেয়েটার সমস্ত বিশ্বাসকে ভেঙে গুড়িয়ে দিবে। এত বছরের বিশ্বাস ভাঙা ও সম্পর্ক আগলে রাখার সিদ্ধান্ত দুটোর চাপে পড়ে, স্থির ও শান্ত স্বভাবের এই মেয়েটা তার প্রতি মুহূর্তেই রূঢ় হয়ে যাবে। বিশ্বাসে ফাটল ধরা যে কত যন্ত্রণার, সেটা আর কে জানে; সে ব্যতীত!
অনেকক্ষণ চুপ থেকে ঠোঁটের ওপর থেকে আঙুল সরাল শাদাব। শান্ত মেজাজ অথচ ভারিক্কি স্বর তুলে বলল,
-‘তোমার সামনে দুটো অপশন রাখছি। সম্পর্ক যদি আগলে রাখতেই চাও, দুটোর মধ্য থেকে একটা অপশন বেছে নিবে। বলো পারবে?’
ভয়ে নিশ্চুপ হয়ে গেল মাহদিয়া। আদৌ সে নিশ্চিত নয়, শাদাবের অপশন দুটো কী কী হতে পারে। তাই আগ বাড়িয়ে কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারল না। শুধু জানতে চাইল,
-‘কী সেগুলো?’
স্থির, অবিচল ও দৃঢ়তার সাথে শাদাব বলল,
-‘প্রথম অপশন তোমার মা, দ্বিতীয় অপশন আমি। কাকে চাও তুমি? এক্ষুণি উত্তর দিতে হবে না। ভেবে সিদ্ধান্ত জানাতে পারো। আমি চাইব, সিদ্ধান্তটা তুমি কারও সাহায্য-সহযোগিতা ছাড়া একা-ই নিবে।’
থমকে গেল মাহদিয়ার দৃষ্টি। টের পেল এরচেয়ে কঠিন ও জটিল অপশন দুনিয়াতে আর একটাও নেই। এমন উদ্ভট অপশন কেন দিল শাদাব, সেটাই তো বুঝতে পারল না। অবিশ্বাস্য লাগল তার। সম্পর্ক বাঁচাতে এমন অহেতুক অপশন টেনে আনার মানে খুঁজতে গিয়েও ব্যর্থ হলো। ব্যতীত চোখে বলল,
-‘তুমি বলতে চাইছ, তোমাদের দু’জনের মধ্যে যেকোনো একজনকে চিরদিনের জন্য বেছে নিতে হবে আমাকে?’
হাসিমুখে ইতিবাচক ভঙ্গিমায় কাঁধ নাচাল শাদাব। বিস্ময়ে চোখের পলক ফেলতে ভুলে গেল মাহদিয়া। বলল,
-‘মা’কে কী করে ছাড়ব? কেন ছাড়ব? উনি আমার মা। আমার জন্মদাত্রী। কী দোষে ওনার সাথে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করব আমি? কী করে নাড়িরটানকে অস্বীকার করব? মা ছাড়া কোনো সন্তান থাকতে পারে? তুমি এমন একটা ইলজিক্যাল অপশন দিলে কী করে? আমার তো ভাবতেই খারাপ লাগছে শাদাব, তুমি মা ও মেয়েকে চিরদিনের জন্য আলাদা করে দিতে চাইছ। ছিঃ ছিঃ। এমনটা কী করে হয়! মা ছাড়া আমি…! অসম্ভব। তুমি যে এত নীচু মানসিকতার মানুষ হতে পারো, ভাবতেই পারিনি। ভালোই হয়েছে, নিজের স্বরূপ দ্যাখিয়ে দিয়েছ। এবার সিদ্ধান্ত নেয়াটা সহজ হয়ে যাবে আমার জন্য।’
চমৎকার করে হাসল শাদাব। সেই হাসি হৃদয়ে ঝড় তুলল। এত খারাপ মানুষ পৃথিবীতে আছে? এত খারাপ? মায়ের থেকে সন্তানকে দূরে রাখতে চায় যে মানুষ, সে আর যাই হোক ভালো হতে পারে না। কখনওই না। সে তো এতদিন যাবৎ কায়ছার সাহেবকে খারাপ ভেবে এসেছে। এখন দেখা যাচ্ছে, তার ঔরসজাত সন্তানও ওই একই পথের পথিক। দুর্ভাগ্য, এমন ভুল মানুষের সাথে সম্পর্কে বাঁধা পড়েছিল। এমন ভুল মানুষের জন্য সাত সমুদ্র তেরো নদী পাড়ি দিয়ে এতদূর ছুটে এসেছিল। ঘৃণায়, রাগে, ক্ষোভে সমস্ত শরীর জ্বলে উঠল মাহদিয়ার। চোখমুখ শক্ত করে বলল,
-‘তাহলে অপশনটা এক্ষুণি বেছে নিই? আমি আমার মাকেই চাই। এমন কোনো সম্পর্ক কিংবা মানুষের সংস্পর্শ আমার দরকার নেই, যার জন্য নিজের জন্মদাত্রী মা’কে অস্বীকার করতে হয়। থ্যাংক য়্যু সো মাচ্ মি. শাদাব। তুমিও যে তোমার বাবারই সন্তান, সেটা আজ প্রমাণ করে দিলে।’
***
নীরবে শাদাবের রক্তাক্ত পিঠের দিকে নজর দিল মাহদিয়া। ছেলেটা তার জন্য ব্যথা পেয়েছে। তখন এই রক্ত দেখে বুকে কাঁপন ধরালেও এখন তা তার অন্তর অবধি ছুঁয়ে যাচ্ছে না। কেমন দমবন্ধ করা এক অনুভূতি হচ্ছে। অসহ্য মনে হচ্ছে সবকিছু। এতকিছুর পরও শাদাব তখনও শান্ত, নীরব। যেন তার আর কিছু বলার নেই। এমন অহেতুক অপশন দিয়ে সে নিমিষেই সম্পর্কের ইতি অবধি পৌঁছে গিয়েছে। অথচ সে একাকী দহনের অনলে পুড়ছে। কী অদ্ভুত! পাশে থাকা সত্ত্বেও কেউ কারও মনের যন্ত্রণা টের পাচ্ছে না। উপলব্ধি করতে পারছে না। মনের লেনদেন যেখানে গড়ে উঠে না, সেখানে সম্পর্ক এমন প্রাণহীন হয়ই। শাদাবের এই নির্বিকার ভাব ও নিষ্প্রাণ চাহনি তাকে ভেতর থেকে একেবারেই ভেঙেচুরে দিয়েছে। সামান্য একটু তুলোয় ড্যাটল নিয়ে নিঃশব্দেই শার্টটা সরাতে গেল মাহদিয়া। শাদাব পূণরায় তাকে আটকাল। বলল,
-‘এটা খুব সামান্য একটা আঘাত মাহদিয়া! কয়েক ঘণ্টায় ঠিক হয়ে যাবে। দীর্ঘবছর যে যন্ত্রণার বোঝা আমি একাকী বয়ে চলেছি, তার তুলনায় এই আঘাতটা একদম সীমিত।’
মাহদিয়া সবসময় চাইত, শাদাব তাকে নাম ধরে ডাকুক। ‘ভ্রমর’ না বলে ‘মাহদিয়া’ বলুক। আজ শোনেও মনে কোনো আনন্দ হচ্ছে না। মন উপলব্ধি করছে, এই মানুষটার মুখে শুধু ‘ভ্রমর’ ডাকটাই মানায়। ‘মাহদিয়া’ নয়। কেন সে ‘মাহদিয়া’ ডাকবে? একবার ‘ভ্রমর’ বলে ডাকুক। সব রাগ-অভিমান দূরে ঠেলে দিবে সে! সম্পর্কের মধ্যে থাকা সবটুকু দূরত্ব সরিয়ে দিবে। যদি একবার বলে, ‘ভ্রমর, তুমি আমার কাছেই থেকে যাও। সবসময়ের জন্য।’ এসব তো বলবে না। বলবে অপশন বেছে নাও। প্রচণ্ড রাগ থেকে প্রায় জোরপূর্বকই পরনের শার্টটা খুলে ফেলল মাহদিয়া। হাতে থাকা ড্যাটলমাখা তুলো চেপে ধরল পিঠে। ইচ্ছে করেই ব্যথা দিল। রক্তাক্ত জায়গাটাকে আরও রক্তাক্ত করার নেশায় তুলো দিয়ে সর্বোচ্চ শক্তিতে ঘঁষে দিল। মাহদিয়ার এই আক্রমণে পিঠের জ্বলুনি বেড়ে গেল। কপালে হাত চেপে ব্যথা সহ্য করে নিল শাদাব। বলল,
-‘শান্তি পাচ্ছ?’
-‘খুব পাচ্ছি।’
দাঁত কটমট করে জবাব দিল মাহদিয়া। শাদাব শব্দ করেই হাসল। বলল,
-‘তাহলে আরও ব্যথা দাও। আমাকে ব্যথা দিয়ে যদি তুমি শান্তি খুঁজে পাও, তবে দ্বিগুণ শান্তি অনুভব কোরো। আমি বাঁধা দেব না।’
আশ্চর্যের শেষ সীমানায় পৌঁছে গেল মাহদিয়া, তবুও শাদাবের মতিগতি বোধগম্য হলো না। ব্যথার জায়গায় এত ব্যথা নিয়েও কেউ এত নির্বিকার থাকে কী করে! সে হলে এতক্ষণে কেঁদেকেটে অস্থির হয়ে যেত। অধৈর্য্য হয়ে বলল,
-‘তুমি কি মানুষ? এত ব্যথা সহ্য করছ কী করে?’
-‘যারা নীচু মানসিকতার হয়, তাদেরকে তুমি মানুষ মনে কোরো? যদি মানুষ ভাবতে পারো, তবে আমি তা-ই।’
কিছুক্ষণ আগে, মাহদিয়ার বলা কথাটাই তারদিকে ফিরিয়ে দিল শাদাব। তার মনোভাব বুঝার জন্য স্থির চোখে তাকাল। একটা মানুষের দুটো রূপ কোনোভাবেই মিলাতে পারছে না মাহদিয়া। কেমন যেন সবকিছু ওলট-পালট মনে হচ্ছে তার। কোনো যুক্তি ছাড়া, কেন শাদাব মা-মেয়েকে আলাদা হয়ে যেতে বলবে? কী বলতে গিয়েও চেপে যাচ্ছে এই ছেলে? কেন তাকে এই কঠিন অপশন বেছে নিতে বলছে? একটা মানুষ চেনা এত কেন কষ্ট? দীর্ঘ বিচ্ছেদের কারণেই কি সম্পর্ক নিয়ে কোনোপ্রকার ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না কেউ? কেউ কাউকে চিনতে পারেনি দেখেই কি এত দূরত্ব দু’জনের মাঝে? সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে গেলে একটা অপশনই কেন বেছে নিতে হবে তাকে? সবটাই কেমন ধোঁয়াশা লাগছে তার কাছে! ব্যথার বদলে এবার নিজেই যত্ন করে ব্যান্ড-এইড বসিয়ে দিল মাহদিয়া। কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সেদিক। শাদাব তখনও মুখ নামিয়ে রেখেছে। নিজের অহেতুক রাগ ও আচরণে খানিকটা লজ্জিত হলো মাহদিয়া। হুঁশজ্ঞান হারিয়ে আলতো করে আঙুল রাখল পিঠে। কাঁপা কাঁপা হাতে ব্যথাতুর জায়গা স্পর্শ করে নিজেই যেন সেই ব্যথা উপলব্ধি করল, এইভেবে চোখ বন্ধ করে নিল। অবচেতন মন ও মস্তিষ্ক নিয়ে আবেগের দোলাচলে ভাসতে ভাসতে আলগোছে সেখানে অধর ছুঁলো একবার। স্পর্শ পেয়েই পাথরের মতো অনড় হয়ে গেল শাদাব। কী ঘটল সেটা বুঝতেই আয়নার দিকে তাকাল। মাত্র তিন সেকেন্ড পরই স্বাভাবিক হয়ে বসল মাহদিয়া। নিজেকে লুকোতে অপরাধীর ন্যায় মাথানিচু করে ফেলল। শাদাব তার মনোভাব বুঝতে পারল না। এই বলছে, নীচু মানসিকতার মানুষ। এই আবার ঝুঁকের বশে চুমু খেয়ে বসেছে। এটা নেহাৎ আবেগ ও সাময়িক মোহ কি-না সেটা বুঝে উঠা দায় হয়ে পড়ল তার। বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে কাভার্ড থেকে অন্য আরেকটা টি-শার্ট বের করে ঝটপট সেটা গায়ে জড়াল। ঝাঁজাল কণ্ঠে বলল,
-‘যাও এখান থেকে।’
মাহদিয়া কেঁপে উঠল। চোখের পানি মুছল। ভয়-ডর ছাড়াই বিছানা থেকে নেমে শাদাবের মুখোমুখি দাঁড়াল। চোখে চোখ রেখে বলল,
-‘একটা অপশন বেছে নেয়া অনেক কঠিন শাদাব। তুমি এত রুড কেন হচ্ছ আমার সাথে?’
-‘চাইলে এরচেয়েও কঠিন আমি হতে পারতাম। কিন্তু আমি পারছি না। আমার যা বলার আমি বলেছি। সিদ্ধান্ত তোমার হাতে।’
-‘এটা খুব বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে। তুমি অন্যায় করছ আমার সাথে। যদি তুমি এটাই চাও, তাহলে সারাজীবন তোমার প্রতি ঘৃণা নিয়েই বাঁচতে হবে আমাকে। আমাদের সম্পর্কটাকে তখন জঘন্য মনে হবে আমার। আমি চাই না, আমি তোমাকে ঘৃণা করে বাঁচি।’
সম্পর্ক বাঁচাতে এই সহজসরল স্বীকারোক্তিটাই তো জরুরী। অপশন তো সে কোনোকালেই দিত না। শুধু চায় শায়লা সুলতানাকে একটা কঠিন শিক্ষা দিতে। দীর্ঘবছর যে-ই মানুষটা তার সাথে অন্যায় করেছে, তাকে শায়েস্তা করতে মাহদিয়ার একটা পজেটিভ সিদ্ধান্তই যথেষ্ট। এই সিদ্ধান্ত কতটা শক্ত, মজবুত ও পাকাপোক্ত, সেটা নিশ্চিত না হয়ে এত সহজে অতীতের কথা টেনে আনার সাহস সে পাচ্ছে না। মনে হচ্ছে, সব শোনা মাত্রই অপরাধীর আঙুলটা তার দিকেই তুলে রাখবে মাহদিয়া। তখন তাকে সম্পর্ক বাঁচাতে কত-শত প্রমাণ জোগাড় করতে হবে। মাহদিয়া যদি নিজে থেকে জানবার চেষ্টা করে, আগ্রহ নিয়ে সামান্য কথার ইঙ্গিত ধরে নিজের মাকে চিনবার চেষ্টা করে, তাহলে নিশ্চিত শাদাবের আজকের এই রূঢ় আচরণের উত্তর সে পেয়ে যাবে।
মাহদিয়ার চোখেমুখে যে টান, মায়া ও ভালোবাসা জড়ানো, তাতে যেকোনো পুরুষ মুহূর্তেই দুর্বল হয়ে যাবে। বহু কষ্টে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করল শাদাব। বলল,
-‘আমি তো চাই-ই, তুমি আমাকে ঘৃণা করে বাঁচো।’
-‘কিন্তু কেন?’
-‘তোমাকে অপশন দিয়েছি। এরবেশি একটা শব্দও আমি উচ্চারণ করব না। যাও এখন। ভুল করেও এত কাছে আসবে না আর।’
-‘তুমি কি সত্যিই চাও, আমি তোমাকে ঘৃণা করে বাঁচি? নিশ্চিত হয়ে বোলো!’
কথা এড়িয়ে গেল শাদাব। ইচ্ছে করেই রুমের এদিক-ওদিক গোছাতে লাগল। শার্ট-টি’শার্ট ওয়াশরুমে রেখে এসে তখনও মাহদিয়াকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হাসল। বলল,
-‘আশ্চর্য! এখনও দাঁড়িয়ে আছো কেন? অপশন নিয়ে ভাবো। ভাবতে ভাবতে সিদ্ধান্ত নিয়ে তারপর কাছে এসো। এভাবে হুটহাট কাছে এসে আমাকে দুর্বল কোরো না। ঠিক আছে?’
সম্পর্ক বাঁচাতে শাদাবের এই অযৌক্তিক অপশনটা দুঃশ্চিন্তায় ফেলে দিল মাহদিয়াকে। কিছুক্ষণ ভেবেচিন্তে চলে যাওয়ার আগে ঠোঁটে চমৎকার হাসি ফুটাল সে। শাদাবকে ভরকে দিতে তার চোখের সামনে শব্দ করে তুড়ি বাজিয়ে বলল,
-‘তুমি আমাকে বোকা ভাবছ তাই না? অপশন টেনে এনে নিজেকে খারাপ সাজাতে চাইছ? চিন্তা কোরো না। অপশনটা আমি খুব শীঘ্রই তোমাকে জানাব। তখন কিন্তু একটা ছোট্ট চুমু যথেষ্ট হবে না। কথাটা যত্ন করে মাথায় ঢুকিয়ে নাও, তোমার জন্যই ভালো।’
-‘মানে?’
-‘মানুষ চেনা অনেক কঠিন শাদাব। তবে কখনও কখনও সেই কঠিন কাজটাও সহজ হয়ে যায়। পরিস্থিতি-ই সেটা সহজ করে দেয়। তোমাকে চেনার জন্য, আর বেশি সময় নষ্ট করার প্রয়োজন নেই বোধহয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘ বছরের চেনা-জানা সম্পর্কও ক্ষণস্থায়ী হয়ে যায়। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে অল্পদিনের চেনা-জানাও দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক তৈরী করতে পারে। শুধু উপযুক্ত সময়ে সঠিক মানুষটাকে বাছাই করে নিতে হয়। আমার বিশ্বাস, আমি সেটা পারব।’
মাহদিয়া চলে যাওয়ার পর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল শাদাব। ফোন, ক্রেডিট কার্ড ও প্রয়োজনীয় জিনিস পকেটে ঢুকিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল। চুলে দু’চারবার ব্যাকব্রাশ করে ডানহাত দিয়ে পিঠ ছুঁয়ে মুচকি হাসল। আজ যে নিশ্চিত, মাহদিয়া তাকেই ভালোবাসে। সম্পর্ক ও তার প্রতি একপাক্ষিক অনুভূতির টানেই ফিরে এসেছে মেয়েটা। এবার শায়লা সুলতানাকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরাতে তার দু’দিনও সময় লাগবে না। কিন্তু ভয় মাহদিয়াকে নিয়ে। ভুল বুঝলেই সমস্যা তৈরী হবে। এই মেয়েটার কারণেই অভদ্র মহিলার মুখোমুখি হতে ভয় পাচ্ছে সে। নিজের বাবাকেও শায়েস্তা করতে পারছে না। আবার শিহাবকেও সবকিছু বলতে পারছে না। শুধু মাহদিয়ার মন বুঝার জন্যই এতদিন চুপ ছিল শাদাব। শিহাবের অসুস্থতা একটা বাঁধা হলেও আজ যখন মাহদিয়ার মনের নিশ্চয়তা পেয়ে গেছে, তখন সম্পর্কের মাঝখানে থাকা এমন দু’চারজন তৃতীয়পক্ষকে সে দু’হাতে চড়-থাপ্পড় মেরে তাড়িয়ে দিতে পারবে। অনেকদিনের জ্বালাময়ী যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেল শাদাব। ঠোঁটেমুখে প্রশান্তির হাসি ছড়িয়ে পড়ল। বিড়বিড় করল,
-‘একজন সন্তানের কাছে যে মানুষ সবচেয়ে বেশি শ্রদ্ধার, সম্মানের ও ভালোবাসার তাকে ঘৃণা করে বাঁচা যে কত কষ্ট সেটা যদি বুঝতে, তাহলে আজ আমার ভেতরের যন্ত্রণাটুকু নিমিষেই বুঝে ফেলতে তুমি। আমি-ই খারাপ ভ্রমর। খুব খারাপ। এই কারণে কখনও চাইনি, আমার জন্য তোমাদের মা-মেয়ের মধ্যে কোনোপ্রকার দূরত্ব তৈরী হোক। মাকে ঘিরে কোনোপ্রকার ঘৃণা তোমার অন্তরে জমা না হোক কভু। সবটুকু ঘৃণা তুমি আমার জন্যই বাঁচিয়ে রাখো। আমাকেই ঘৃণা কোরো। খুব বেশি ঘৃণা কোরো। যতটা ঘৃণা করলে এই মুখ তুমি আর কোনোদিনও দ্যাখতে চাইবে না। অথচ এতগুলো বছর পর আজ তুমি যা করলে, সম্পর্কের প্রতি আমার যে বিশ্বাস ছিল, সেই বিশ্বাসকে এক নিমিষেই বহুগুণ শক্তিশালী করে দিয়েছ তুমি। আমাদের মাঝখানে থাকা তৃতীয় ব্যক্তি নামক জঘন্যতম কাঁটাকে এবার আমি গোড়া থেকেই উপড়ে ফেলব। তুমি শুধু নিজের সিদ্ধান্তে স্থির থাকো, তাতেই চলবে।’
***
চলবে…
#বঁধুয়া_কেমনে_বাঁধিবো_হিয়া
লেখনীতে : তামান্না বিনতে সোবহান
পর্ব — একুশ
কার্টেসিসহ কপি করা নিষেধ!
শিশুদের হাসি সবসময়ই পবিত্র। তারা যখন খিলখিল শব্দ তুলে পবিত্র হাসিতে মুখখানি ভরিয়ে তুলে, তখন সেই হাসিতে চারপাশটাও আনন্দে হেসে উঠে। গোলগাল আদুরে চেহারা নিয়ে অনবরত হেসে যাচ্ছে শিহাব। তার মুখের কিছু ঝুনঝুন শব্দ ও খিলখিল হাসি দেখে মুগ্ধ হয়ে ভাতিজাকে গভীরচিত্তে দেখছেন হায়দার সাহেব। এমন পবিত্র হাসিকে কেউ কী করে তৃতীয় ব্যক্তির কারণে অস্বীকার করে চিরদিনের জন্য ‘বাবা’ নামক শীতলছায়া ও সুরক্ষিত আশ্রয় থেকে বঞ্চিত করতে পারে! মানুষ কতটা পাষণ্ড হলে নিজের ঔরসজাত সন্তানদের সাথে অন্যায় করতে পারে, কায়ছার সাহেব যেন সমাজের অন্য একটা ভয়ানক কীট হয়ে চোখে আঙুল দিয়ে দৃশ্যটা বাস্তবায়ন করে দেখালেন। যিনি নিজে সুখী থাকতে পারেননি বলে অন্যকেও সুখী হতে দেননি। অবুঝ বাচ্চাদের মাথার ওপর থেকে ‘বাবা’ নামক মজবুত খুঁটিকে চিরদিনের জন্য দূরে সরিয়ে নিয়েছেন। এমন আদুরে বাচ্চার হাসি ও কথাতে ভাইয়ের কলুষিত রূপ যেন তাঁকে অশান্ত করে দেয়। তিনি মায়াভরা চোখে শিহাবকে দেখতে থাকেন। মনে মনে ভাবেন,
-‘তুমি যদি আমার সন্তান হতে, আমি তোমাকে মাথায় তুলে রাখতাম। নর্দমার কিছু কীটপতঙ্গের কথায়, তোমার ওপর অবিচার করতাম না। ভাইজান আজও বুঝতে পারেননি, তিনি কী হারিয়েছেন! যেদিন পুরোটা নিঃস্ব হবেন, সেদিন বুঝবেন, অবুঝ বাচ্চাদের হক্ব কেঁড়ে নিয়ে মিথ্যে অহমিকা ও সম্মান ধরে রাখতে গিয়ে নিজের বিবাহিতা স্ত্রীর সাথে যে সমস্ত অন্যায় করে পাপের বোঝা বাড়িয়েছেন, একদিন এই পাপ-ই তাঁকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।’
হাসি, আনন্দ ও খুঁনসুটির মাঝেই লিফটের দিকে চোখ রাখল শিহাব। দু’জনার মধ্যে কাউকেই দেখতে না পেয়ে বলল,
-‘ভাইয়া এখনও রুমে কী করছে? ‘সাতছড়ি’ কতদূরে! এক্ষুণি রওনা না দিলে দিনে দিনে ঘুরে শেষ করতে পারব?’
তার অস্থিরতা ও বিরক্তি দেখে মুচকি হাসলেন হায়দার সাহেব। বাচ্চারা তো এমনই। কোথাও যাওয়ার নাম শুনলে সময় গুনতে শুরু করে। দেরী তারা সহ্যই করতে পারে না। শিহাবও পারছে না। তিনি তার বিরক্তিকর ভাব দূর করতে বললেন,
-‘প্রয়োজনে আজ সারাদিন ‘সাতছড়ি’ থাকবে। একদম সন্ধ্যার আগে আগে ফিরবে।’
থুতনিতে আঙুল রেখে কী যেন ভাবল শিহাব। মন খারাপের সুরে বলল,
-‘সারাদিন যদি ওখানেই থাকি, বাকি জায়গায় কীভাবে ঘুরব? আমরা তো কাল বিকেলেই সুনামগঞ্জ চলে যাব। তিনদিন সময় এত দ্রুত শেষ হয়ে গেল! এখনও কত জায়গা দ্যাখতেই পারলাম না।’
তার কণ্ঠে একরাশ আফসোস, বেদনা, হাজারও মন খারাপের ঢল নেমে এলো মুহূর্তেই। এই তিনদিনের ঘুরাঘুরিতে তার মন ভরেনি। তৃপ্তি আসেনি। তাই এত তাড়াতাড়ি ফেরার দিন ঘনিয়ে এসেছে, এটা মানতেই কষ্ট হচ্ছে তার। তিনি তাকে বুঝাতে ফের বললেন,
-‘অসুবিধা নেই। এ্যাক্সাম শেষ করে আবার এখানে আসবে।’
কোনো আওয়াজ করল না শিহাব। শাদাব এখানে আবারও তাকে নিয়ে ঘুরতে আসবে এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। নিজের কাজের জন্য এই শহরে আসলেও ঘুরাঘুরির জন্য কখনওই এখানে আসতে চায় না শাদাব। কেন আসতে চায় না, সেটা সে জানে না। তা-ই ভাইকে অকারণ জোর করতেও পারে না। এইবার কীভাবে যেন শাদাব রাজি হয়ে গেল, এখানে আসার জন্য। সময় বের করে ভাইকে নিয়ে চলেও আসলো। এই শহর, এই জায়গা, এখানকার মানুষের প্রতি দুইদিনে যে মায়া ও ভালোবাসা জন্মেছে, সেই মায়া ও ভালোবাসাকে এত সহজেই উপেক্ষা করতে পারছে না শিহাব। তার মনে হচ্ছে, এখানে আরও কয়েকটা দিন থাকতে পারলে মনে শান্তি পাবে। ঠিক কেন, কী কারণে এই জায়গা ছেড়ে এত তাড়াতাড়ি যেতে ইচ্ছে করছে না, তার অবুঝ মন বুঝতে পারছে না। এরমধ্যেই মাহদিয়ার আগমন ঘটল সেখানে। শিহাবকে নীরবে বসে থাকতে দেখে বলল,
-‘মন খারাপ ছোটোন?’
ইতিবাচক ভঙ্গিমায় মাথা নাড়ল শিহাব। ভাবলেশহীন হয়ে জুসে চুমুক বসাল। মাহদিয়া তাকে মনোযোগ দিয়ে দেখে, ঠোঁটে হাসি টেনে বলল,
-‘কী কারণে মন খারাপ, আমাকে কি বলা যায়?’
-‘আগামীকাল তো চলে যাব। তোমাদের দু’জনকে অনেক মিস করব। আমার এক্ষুণি এখান থেকে যেতে ইচ্ছে করছে না। মন চাইছে, এখানেই থেকে যাই। সবসময়ের জন্য।’
প্রকৃতির সৌন্দর্য ও রূপ মানুষকে কখন, কীভাবে টানে সেটা মানুষ প্রকৃতির সাথে না মিশলে টের পায় না। একটা চমৎকার পরিবেশ যেভাবে মানুষকে আনন্দ দেয়, সুখ দেয়, প্রকৃতিও সেই পরিবেশে মানুষের সমাগমে নিজের সৌন্দর্য দিগুণ বাড়িয়ে তুলতে সক্ষম হয়। বলাবাহুল্য, প্রকৃতি ও মানুষ একে-অন্যের পরিপূরক। এই কারণেই হয়তো মানুষ প্রকৃতির মায়ায় ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হয়। খোলা আকাশ ও সবুজের প্রান্তরে হারিয়ে গিয়ে খুঁজে নেয় অন্তরের প্রশান্তি। স্রষ্টার সৌন্দর্য ও সৃষ্টির মাঝে ডুবে গিয়ে উপভোগ করে, পৃথিবীর নানা রূপ নানা বৈচিত্র্যময় জীবনকে। এজন্য মানুষ বার বার প্রকৃতির প্রেমে পড়ে। তাকে ভালোবাসে। নিজের আত্মিক সুখ-শান্তির জন্যই মানুষ প্রকৃতির মাঝে ছুটে এসে চঞ্চল হয়ে উঠে। শিহাবের ক্ষেত্রেও সেটাই হচ্ছে। এই চঞ্চলতাকে সে আঁকড়ে ধরে থাকতে চাইছে। অথচ নীড়ে ফিরতে হয়। দিকহারা, পথভোলা ক্লান্ত পথিক যেমন দিনশেষে নীড়ে ফিরে আসে, তেমনি প্রকৃতিপ্রেমী মানুষকেও সৌন্দর্যের মায়া ত্যাগ করে আপন নীড়ে ফিরতে হয়।
অবুঝ শিহাবের মনের দুঃখ এক নিমিষেই ছুঁয়ে গেল মাহদিয়াকে। সে হাত বাড়িয়ে শিহাবের মাথার চুলগুলো নেড়ে তাকে খানিকটা নিজের দিকে টেনে আনল। আলতো করে হাতে হাত রেখে বলল,
-‘মন খারাপের কিচ্ছু নেই। যদি চাও, তাহলে আরও দুটোদিন এখানে থাকতে পারো।’
-‘কিন্তু ভাইয়ার তো সময় নেই।’
ম্লানমুখে জবাব দিল শিহাব। মাহদিয়া বুঝতে পারল তার দুঃখ। বলল,
-‘ঠিক আছে। তোমার ভাইয়াকে আমি ম্যানেজ করব। বলব যে, ছোটোন আরও দুটোদিন তার দিয়াপিকে কাছে চাইছে। হবে না?’
ভাবুক নয়নে তাকাল শিহাব। চোখমুখে আনন্দের ভাব ফুটিয়ে তুলে বলল,
-‘সত্যিই? তুমি পারবে ভাইয়াকে ম্যানেজ করতে?’
-‘খুব পারব।’
আহ্লাদী বাচ্চা আরও আহ্লাদী হয়ে গেল। সে প্রচণ্ড উৎসাহর সাথে উৎফুল্ল মেজাজ নিয়ে জানতে চাইল,
-‘তোমার অ্যালার্জি কমেছে? আমাদের সাথে যাবে না আজ? তুমি না গেলে ভালো-ই লাগবে না।’
পায়ের ব্যথা আগের চেয়ে যথেষ্ট কম। হাঁটতে গেলে সামান্য ব্যথা হলেও জ্বালাপোড়া ভাব নেই। ব্যান্ডেজ খুলে পরিচ্ছন্ন টিস্যু পায়ে প্যাঁচিয়ে ক্যাডস্ পরে নিয়েছে মাহদিয়া। আবহাওয়া এখনও গরমই। শীত আসেনি। এই গরমে মোজা পায়ে পরে থাকা যাবে না। এটা আবার তার পায়ের জন্যও রিস্ক হয়ে যাবে। ধুলোবালির হাত থেকে নিজের পা’কে সুরক্ষিত রাখতেই পাতলা টিস্যু প্যাঁচানো। চোখে লালচে ভাব থাকলেও চুলকানি কমেছে। হাতেও ফোলা ফোলা ভাবটা কমে এসেছে। সে নিজের শারিরীক সুস্থতার দিক নিশ্চিত করে বলল,
-‘অবশ্যই যাব। তুমি আর আমি একসাথে ঘুরব। তোমার ওই কাটখোট্টা ভাইকে একদমই দলে নিব না। রসকষহীন এমন মানুষ নিয়ে ঘুরতে বের হলে আনন্দ পাওয়া যায় না।’
মাহদিয়ার কথায় সায় জানাল শিহাব। ঠোঁটে দুষ্টুমিষ্টি হাসি ঝুলিয়ে বলল,
-‘যা বলেছ। ভাইয়া আসলেই কাটখোট্টা! কিন্তু সেটা সে স্বীকার করতে চায় না। হা হা।’
শাদাব যে চেয়ারের পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে খেয়াল করেনি শিহাব। তাই সুযোগ পাওয়াতে মাহদিয়াকে সঙ্গ দিতে গিয়ে ভাইকে কাটখোট্টা উপাধি দিতেও দু’বার ভাবেনি। হুঁশ ফিরল তখনই, যখন বড়ো ভাইয়ের শক্তপোক্ত হাতের কানমলা খেল। ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠল। শাদাব বলল,
-‘দিনদিন বেয়াদব হয়ে যাচ্ছ তুমি। বাড়ি যাই, একগাদা হোমওয়ার্ক দেব।’
শিহাবও নাছোড়বান্দা। ব্যথা পেয়েও দমে গেল না। উল্টে জেদ ধরে বলল,
-‘বললেই হোলো! আমি কালই বাড়ি যাচ্ছি না। আরও কয়েকটাদিন এখানে থাকব।’
-‘হ্যাঁ, এটা তোমার শ্বশুরবাড়ি তো। খুব বেশি জামাই আদর পাচ্ছ, তাই যেতে চাইছ না। পিঠে দু’চারটা পড়লে সুড়সুড় করে যাবে।’
ব্যথা সহ্য করতে না পেরে জোরজবরদস্তি করে শাদাবের হাত সরাল শিহাব। হাতে দু’চারটে কিল বসাল। মাহদিয়া কাছে ছিল বিধায়, তাকেই আলতো করে জড়িয়ে ধরল। বলল,
-‘বলো না দিয়াপি, আরও দুটোদিন থেকে যাই। কী এমন ক্ষতি হবে এতে!’
কী ক্ষতি হবে, সেটা শিহাব না বুঝলেও মাহদিয়া একটু-আধটু বুঝতে পারছে। শাদাবকে জোর করার ইচ্ছে নেই। আবার শিহাবের আবদার ফেলে দেয়ার মতো দুঃসাহস নেই। এমন টানাপোড়নের মাঝে পড়ে, কী বলবে ভেবে পেল না মাহদিয়া। ভেবেচিন্তে, মনে ভয়-ভীতি নিয়েই মুখ খুলল,
-‘ও যখন চাইছে, আরও দুটোদিন ম্যানেজ করে নাও। আর কী এদিকে আসবে? যে জায়গাগুলো দ্যাখা হয়নি, সেগুলো দ্যাখেই যাক। বাচ্চা মানুষ। ওর মনটা বোঝা উচিত তোমার।’
পূণরায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া নিয়ে ভয় পাচ্ছে মাহদিয়া। যা এক অপশন দিয়েছে, তা মেনে নিয়ে একটা অপশন ধরে রেখে জীবন অতিবাহিত করা অনেক কঠিন ও ধৈর্যের কাজ। খুব বেশি মনের জোর না আসলে এখান থেকে একটা অপশন বাছাই করা অনেক কঠিন ও অসম্ভব হয়ে যাবে। দেখা গেল, দিনশেষে তখন তার মাকেই বেছে নিতে হলো। হওয়ার কথা। কোন সন্তান স্বেচ্ছায় নিজের মা’কে ত্যাগ করবে? যে মা লালন-পালন করেছে, বুকে আগলে মানুষ করেছে, তাকে ত্যাগ করা যায় না-কি! এমন অযৌক্তিক অপশন যে শাদাব ইচ্ছে করেই এনেছে, সেটা সে দিব্যি বুঝে গেল। এ-ও বুঝল, শাদাব চাইছে না মাহদিয়া তাকে বেছে নিক। কিংবা তার সঙ্গে থাকুক। এই কারণেই কঠিন অপশন দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে, ‘তুমি দূরে চলে যাও। আর ফিরে এসো না।’ অথচ মাহদিয়ার দু’জনকেই চাই। মা’কেও, শাদাবকেও। এই অহেতুক অপশন বেছে নিয়ে যেকোনো একজনকে জীবনে চাইলে, তাদের এই নামহীন সম্পর্কের সুতোটা চিরদিনের জন্য কেঁটে যাবে। মনের ভয় ও ইচ্ছে থেকেই চাইল, শাদাব আরও দুটোদিন এখানে থাকুক। কিন্তু কাউকে তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করতেও দ্বিধা হচ্ছে। কোনোমতে প্রশ্ন করেই চুপ হয়ে গেল মাহদিয়া। শাদাব তার অস্থির দুটো চোখ দেখল। মন পড়তে না পারলেও চোখের ভাষা দেখে বুঝে গেল, মেয়েটা কী চায়! কিন্তু শিহাবের দিক ভেবেই তাকে তাড়াতাড়ি এই শহর ছাড়তে হবে। দুটোদিনে হয়তো খুব বেশি ক্ষতি হবে না। তবুও ভয়! কী থেকে কী হয়! দু’জনার চাওয়া-পাওয়া ও ইচ্ছেকে প্রাধান্য দিতেই বলল,
-‘অসুবিধা নেই। আরও দু’দিন ম্যানেজ করে নেব। তবে সাবধান, ঘুরতে গিয়ে নিজেদের অসুস্থ কোরো না কেউ। সব আনন্দ মাটি হয়ে যাবে।’
***
‘সাতছড়ি’ রওনা দেয়ার আগে চুপিচুপি একটা কাজ সেরে নিল শাদাব। নূরুন্ নাহারকে ফোন করে শায়লা সুলতানার নম্বরটা টুকে নিয়েছে ফোনে। হায়দার সাহেব এটা খেয়াল করলেও মাহদিয়া ও শিহাব কেউ-ই দেখেনি। দু’জনে গাড়িতে বসে বকবক করছে। জানালা থেকে বেশ খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে দুই ভ্রমণপিয়াসুর একটা ছবি তুলে নিল। ভাতিজার এই কাজ দেখে মিটিমিটি হাসলেন ভদ্রলোক। কাঁধে চাপড় মেরে বললেন,
-‘ছবি তুলতে হলে কাছে গিয়েই তোল। দূরে থেকে কেন?’
হায়দার সাহেবের মনোভাব বুঝতে পারল শাদাব। তিনি যা ভাবছেন, বিষয়টা তা নয়! অন্যকিছু। শায়লা সুলতানার মতো নারীদের কারণে প্রতিনিয়ত এই সমাজের অসংখ্য সুখী পরিবারে আগুন লাগে। ওই ধরনের মানুষ শুধু সুখী সংসার ভেঙে দিতে জানে। গড়তে জানে না। যে আগুন ওই মহিলা দীর্ঘ পনেরো বছর আগে তাদের হাসিখুশী পরিবারে লাগিয়েছিলেন, সেই একই আগুনে ভদ্রমহিলাকে যেদিন পুড়তে দেখবে, সেদিনই শান্ত হবে শাদাব। তার আগ পর্যন্ত ইচ্ছেমতো নাকানিচুাবানী খাওয়াবে। তবে সবটাই হবে মাহদিয়ার অগোচরে। এই কারণেই আড়াল থেকে ছবি তোলা। হায়দার সাহেবকে এত কথার ব্যাখ্যা দিল না। শুধু বলল,
-‘অকারণে তুলিনি চাচ্চু। কাজে লাগবে। চলো, এগোই।’
নিজের ভাইজান এই ছেলেকে না চিনলে, না বুঝলেও দীর্ঘ বছর পর, এই দু’দিনের কাছে আসাতে তিনি তাকে যতটা বুঝেছেন, তাতে একটা বিষয় নিশ্চিত হতে পেরেছেন, এক অহংকারী বাবার ঔরসে জন্ম নিলেও শাদাব অন্যসব সাধারণ মানুষের মতো নয়। সে ব্যতিক্রম হলেও প্রচণ্ড আত্মসম্মানী। নিরহংকারী ও সুন্দর মনের অধিকারী। তার চিন্তাভাবনা ও কাজকর্ম সবটাই যৌক্তিক। যেকোনো বিষয়-আশয় নিয়ে ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নেয়। চলতে পথে সব ধরনের পেশা ও মানুষকে সম্মান দিয়ে বাঁচে। যার মাঝে বাবার মতো অহংকার নেই, কলুষিত মন নেই, পরিবারের মানুষের প্রতি অবহেলা নেই, আছে শুধু নিরেট সততা, সাহসিকতা ও অদম্য ইচ্ছাশক্তি। সেসবের গুণেই হয়তো ভাগ্য তাকে এই অবধি আসতে সাহায্য করেছে। নয়তো ভেঙে গুড়িয়ে যাওয়া, নিঃস্ব, বসতবাড়িহীন একটা মানুষের উঠে দাঁড়ানোর মনোবল আসত কোথা থেকে! ভাগ্যিস সে মানুষ হতে পেরেছে! তার এই সৎ সাহসিকতার গুণ, সম্পর্কের প্রতি শ্রদ্ধা ও মা-ভাইয়ের প্রতি অধিক ভালোবাসার এই বিমোহিত রূপ মাহদিয়ার চোখেও চমৎকার একটা পজেটিভ উদাহরণ হয়ে থাকবে। তার ছুটে আসা যে ভুল নয়, ছলনা ও মোহ নয়, এটা সে-ও একদিন বুঝতে পারবে। শাদাব যে অকারণ কোনোকিছু নিয়ে বাড়াবাড়ি করবে না এটা তিনি নিশ্চিত ছিলেন। তবুও বললেন,
-‘তুই কি করতে চাইছিস বলত?’
নির্ভার কাঁধ নাচাল শাদাব। বলল,
-‘চিন্তা কোরো না। ভ্রমরের কোনো ক্ষতি হবে না। নাহার খালা বললেন, বাড়িতে ছোট্ট একটা ঝামেলা হচ্ছে। জমিজমা বিষয়ক। তুমি বাড়ি নেই, সেই সুযোগে তোমার ভাইজান নিজের জায়গা-সম্পত্তি অন্যকে দান-খয়রাত করছেন। এটা তিনি করতেই পারেন, আমার আপত্তি নেই। ওই সম্পত্তির দিকে আমার নজরও নেই। আমি যতটুকু আয় করছি, যতটুকু মেধা ও শক্তি শরীরে আছে, মা-ভাই ও অর্ধাঙ্গিনীর দায়িত্ব নেয়ার মতো পর্যাপ্ত সাহস ও ধৈর্য্যশক্তি আমার আছে। সমস্যা হচ্ছে, শায়লা আন্টি। তিনি যে কী চিজ, সেটা তোমার গুণধর ভাইজান এখনও টের পাননি। ওনার জন্য বিরাট একটা ধাক্কা অপেক্ষা করছে। আমার কাজ হচ্ছে, ওই অভদ্র মহিলার আড়ালের মুখোশটা টেনে খুলে ফেলে, শীঘ্রই সব হিসাব-নিকাশ চুকিয়ে নেয়া। এজন্য একটু একটু করে এগোতে হবে আমাকে। একদিনেই পারব না। ধীরে ধীরে ওনাকে ধাক্কাটা দিব। বুঝিয়ে দিব, উনি এতদিন কার সাথে ধোঁকাবাজি করেছেন। আমার ওপর অবিচার করতে গিয়ে নিজের মেয়েকেই সুস্থ ও সুন্দর জীবন থেকে বঞ্চিত করে দিয়েছেন।’
শাদাবের কথা ও হিসাব-নিকাশের গভীরতা দেখে প্রশান্তির হাসি ফুটালেন তিনি। তবে ভয় পেলেন মাহদিয়ার সিদ্ধান্ত ও ইতালিতে ফিরে যাওয়া নিয়ে। বললেন,
-‘দিয়া কি তোকে চাইবে? বুঝবে?’
-‘ওর সাথে আমার পরিচয় খুব অল্পদিনের চাচ্চু। এই অল্পদিনের পরিচয় ও নামহীন সম্পর্কের জন্য দীর্ঘদিনের বিশ্বাস, ভরসা, মায়া-মমতা ও ভালোবাসাকে উপেক্ষা করা কঠিন হয়ে যাবে ওর জন্য। ও যদি আমাকে চায়, ওই মহিলার ছায়াও আমি কারও জীবনে পড়তে দিব না আর। এজন্য সিদ্ধান্তটা ওর ওপর চাপিয়েছি। জানি না ও বুঝবে কি-না। তবে আমি যে অতীতের সবকিছু বলতে পারব না, এটা নিশ্চিত। মাত্র কয়েকদিনের পরিচয়ে কেউ আপন হয়ে যায় না চাচ্চু। স্বল্প সময়ের পরিচয়ে কাউকে এতটা বিশ্বাস করাও উচিত হবে না। এজন্যই কঠিন এক অপশন দিতে বাধ্য হয়েছি। যদি ও সত্যিই দুটো সম্পর্কের মূল্য বুঝতে পারে, এবং নিজের মাকে ঠিকঠাক চিনতে পারে, মায়ের ভেতরে থাকা এক জঘন্য মন-মানসিকতার মানুষকে খুঁজে বের করতে পারে, তবে ও দ্বিতীয় অপশনটাই বেছে নিবে। আর যদি তা না পারে, তবে এই নামহীন সম্পর্কটাকে শেষ করে চেনা ঠিকানায় ফিরে যাবে।’
জোর করে কোনো সম্পর্কই বাঁচিয়ে রাখা যায় না, আবার ভেঙে ফেলাও যায় না। একজন সন্তানকে কোনোদিন তার মায়ের থেকে দূরে রাখা সম্ভবও নয়। কিন্তু যদি, সেই সন্তান জানতে পারে, সম্পর্কের এই দূরত্ব তৈরীর জন্য একমাত্র তার মা দায়ী, তখন একজন সন্তানের মনের ওপর দিয়ে যে ঝড় যাবে, সেই ঝড় ও ঝড়ের তাণ্ডব তাকে ভেতর থেকে পুরোটাই লণ্ডভণ্ড করে দিবে। তাদের সম্পর্কে এখনও পুরোপুরিভাবে আত্মিক ও হৃদয়ঘটিত লেনদেন গড়ে উঠেনি। এই কারণে, কাগজের ওই সম্পর্কটা এত সহজেই প্রাধান্য পাবে না। তবে নিজের মাকে চিনলে, এই কাজটা মাহদিয়ার জন্য সহজ হয়ে যাবে। পনেরো বছর আগে বাবার স্বরূপ দেখে যে ধাক্কা ও আঘাত শাদাব পেয়েছে, সেই একই আঘাত মাহদিয়ার জীবনে আসলে শায়লা সুলতানা ঠিক কীভাবে মেয়েকে বুঝিয়ে নিজের কাছে আটকে রাখেন, এটাই দেখতে চায় শাদাব। মাহদিয়াকে সরাসরি আঘাত দিতে পারবে না বলেই, তার মায়ের এই রূপটা মুখফুটে বলতে পারছে না, আবার এক মুখোশধারী নারীর কারণে নিজের মায়ের সংসার ভাঙা, দুই ভাইয়ের জীবনের সবটুকু হাসি-আনন্দ হারিয়ে যাওয়া, এতসব কথা ও গল্প তাকে বলার মতো পরিস্থিতি নেই দেখেই, অপশনের মাধ্যমে মাহদিয়ার মনে নিজের প্রতি খারাপ ধারণার জন্ম দিতে বাধ্য হয়েছিল শাদাব। তার মনে ঢুকিয়ে দিতে চেয়েছিল, মা ও মেয়েকে সে চিরদিনের জন্য দূরে সরিয়ে দিতে চায়। অথচ বুদ্ধিমতী মাহদিয়া, প্রথমে সেই অপশন পেয়ে রেগে গেলেও পরক্ষণে ঠিকই বুঝে নিয়েছে, কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে নিজেকে খারাপ সাজাতে চাইলেও সে খারাপ হয়ে যায় না। যে খারাপ, সে খারাপ। তাকে ভালোমানুষীর মুখোশ পরে নিজের খারাপ সত্ত্বাটাকে দূরে সরিয়ে রাখতে হয়। আর যে ভালো, সে সবসময়ই ভালো। তাকে কোনোপ্রকার মুখোশ পরে নিজের মধ্যে ভালোমানুষীর রূপ জাহির করতে হয় না।
সম্পর্ক ও মায়ের প্রতি আগেভাগে ভুল ধারণা বাড়িয়ে দেয়ার প্রয়োজন নেই, নয়তো সে সেটাও করত। মা ও মেয়েকে চিরদিনের জন্য আলাদা করে দিত। সেটা পারবে না বলেই, অযৌক্তিক অপশন দিতে বাধ্য হয়েছে। সে শুধু চায় তার মা ও ভাইয়ের জীবনটা তছনছ করে দেয়া ব্যক্তিদেরকে শাস্তি দিতে। এমন শাস্তি, যা ওই মহিলা ও পুরুষ আগে দেখেনি কোনোদিন। কিন্তু এবার দেখবে। ভালোমতোই দেখিয়ে দিবে সে। এ-ও বুঝিয়ে দিবে, দুটো অবুঝ মনকে দূরে সরিয়ে রাখলেই সম্পর্ক ভেঙে দেয়া যায় না। তাদের মধ্যকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিলেই, আত্মিক টান সরানো যায় না। পবিত্র সম্পর্কের মধ্যে ভালোবাসা আপনা-আপনি-ই তৈরী হয়। মানুষ দূরে থাকুক, কী কাছে। কেউ কাউকে দেখুক বা না দেখুক, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে অদৃশ্য টানের কারণেই ভালোবাসার জন্ম হয়। অলরেডি মাহদিয়া সেটা প্রমাণ করে দিয়েছে। আর এটাই শাদাবের এতদিনের অপেক্ষা ও বিশ্বাসকে মজবুত করে দিয়েছে। এখন সে শুধু মনে-প্রাণে চায়, মাহদিয়া একটা সঠিক সিদ্ধান্ত নিক। যে সিদ্ধান্ত দুটো মনের মধ্যবর্তী সমস্ত দূরত্ব সরিয়ে দিবে।
মাহদিয়ার ধৈর্য্য, সাহস, মনোবল সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই তার। এটা তার মনে কতটুকু প্রভাব ফেলবে এ-ও জানে না। শুধু জানে, শায়লা সুলতানার মুখোশটা সামনে আনতে হবে। তার মায়ের বিশ্বাসকে ভেঙে দেয়া এক জঘন্য নারীকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। এতে মাহদিয়া যদি তাকে ভুল বুঝলে বুঝুক, চলে গেলে যাক। তার কোনো মাথাব্যথা নেই। সে যদি সঠিক বুদ্ধিমত্তার মানুষ ও বিচক্ষণ ক্ষমতার অধিকারী হয়, সৎ চিন্তাভাবনা নিয়ে জীবন সাজাতে চায়, তবে নিশ্চয়ই সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। নয়তো, তাদের এই সম্পর্ক চিরদিন এইভাবেই থেকে যাবে। জোড়া তো লাগবেই না, ওতে বিশ্বাসও জন্ম নিবে না, বন্ধনও পাকাপোক্ত হবে না আর। সবদিক সামলে দিন অতিবাহিত করা, বুকের ভেতর তীব্র অনুভূতিকে দিনদিন লুকিয়ে রাখা যে কত কষ্ট, কত যন্ত্রণার, তা তার অন্তর্যামী ব্যতীত কেউ জানে না। পূণরায় একটা ইতিহাস যেন রচনা না হয়, বিশ্বাস-অবিশ্বাসের খেলায় যেন ভালোবাসা হেরে না যায়, এজন্য যতটুকু প্রয়োজন সে লড়বে। বাকিটা ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দিবে! মাহদিয়া না জানলেও সে তো জানে, সম্পর্ককে ঘিরে পবিত্র এক অনুভূতি খুব গোপনে হৃদয়কোণে বাঁচিয়ে রেখেছে আজও। যতবারই মায়াবী মুখটার দিকে তাকায়, ততবারই হৃৎপিণ্ড কেঁপে উঠে অনুভূতির গভীরতা তাকে পুরোটাই অস্থির, অশান্ত করে দেয়। নিজেকে লুকোতে, আড়াল করতে, অনুভূতিকে চেপে রাখতে গিয়ে তখন দিশেহারা অবস্থা হয় তার। এইযে ক্ষণে ক্ষণে এই মায়াবী মুখখানি তাকে পাওয়া না পাওয়ার হিসাবটা অতি সুক্ষ্মভাবে বুঝিয়ে দেয়, তখনই মন বলে উঠে, ‘তুমি দূরে থাকো। খুব দূরে। একেবারে দৃষ্টিসীমার বাইরে।’ অধরা মুখখানি ছুঁয়ে দেয়ার যে নেশা জেগে উঠে সেই নেশাকে দিনরাত হৃদকুঠুরিতে আটকে রাখতে রাখতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে শাদাব। সম্পর্ক ও অনুভূতি পবিত্র হওয়া সত্ত্বেও, ওই মায়াভরা মুখখানি সে ছুঁয়ে দিতে পারছে না। তার সমস্ত ব্যর্থতা তো এখানেই!
***
গাড়ি যখন মূল সড়ক ধরে ‘সাতছড়ি’র পথে এগিয়েছে তখনই মাহদিয়ার ফোনটা ধুমধাম আওয়াজ তুলে বেজে উঠল। স্ক্রিনে শায়লা সুলতানার নম্বর দেখে মুখে হাসি ফুটাল। মা’কে সে সময় দিতে পারছে না একদমই। এখানে এসে শাদাবকে পেয়ে যাওয়ায় আরও বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। ফলস্বরূপ মা তার মেয়ের প্রতি একগাদা অভিমান জমিয়ে রেখেছেন। দেরী না করে ঝটপট কল রিসিভ করল মাহদিয়া। ওপাশ থেকে শায়লা সুলতানার গম্ভীরস্বর ভেসে এলো। ভালোমন্দ কিছু জিজ্ঞেস না করেই তিনি বেশ শক্ত মেজাজে বললেন,
-‘কোথায় যাচ্ছিস এখন? কার সাথে যাচ্ছিস?’
মায়ের এমন গম্ভীরমুখের আওয়াজ শোনে কিছুটা অবাক হলো মাহদিয়া। হায়দার সাহেবের সাথে তার কথা হলো কি-না বুঝল না। সে কিছুটা বিস্ময় নিয়ে বলল,
-‘এত রেগে কথা বলছ কেন? আমি যে রিসোর্টের বাইরে, তুমি কী করে জানলে? হ্যাঁ আমি বাইরে, ‘সাতছড়ি’ যাচ্ছি। ছোটো মামা আছেন সাথে। কেন? কী সমস্যা আবার?’
সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন না শায়লা সুলতানা। ফোনে আসা বাড়তি ম্যাসেজটার দিকে তাকালেন। তাতে একটা ছবি। ঠিক শাদাবের মতো একটা গোলগাল আদুরে বাচ্চা। এটা যে শিহাব তিনি খুব ভালো করেই জানেন। চিনেনও। তার পাশেই বসে আছে মাহদিয়া। হাসছে। গল্প করছে। ছবির সাথে পাঠানো ম্যাসেজে লেখা, ‘এই ছবিটা অনেক সুন্দর, তাই না শাশুড়ি আম্মা? আপনি না বলেছিলেন, ভ্রমর কোনোদিন বাংলাদেশের নাম মুখে নিবে না? আর আমাকে তো চিনবেই না। শাদাব নামক মানুষ ও তাকে ঘিরে সমস্ত স্মৃতি তো তার মন থেকে মুছেই গেছে। কী করে চিনবে? সে অন্য কাউকে নিয়ে জীবন সাজিয়েও নিয়েছে। আহ্, কত্তবড়ো মিথ্যা! অবুঝ দুটো মনকে নিয়ে আপনি যে নোংরা খেলায় মেতে উঠেছেন, শীঘ্রই তার ইতি টানব আমি। আপনি এতটা মিথ্যেবাদী, ভাবতেই খারাপ লাগছে আমার। ভেবে দ্যাখুন তো একবার, এইসব সত্যি যখন আপনার মেয়ের সামনে আসবে, তখন আপনাকে ঘিরে তার এতদিনের সমস্ত বিশ্বাস ও ভালোবাসা তো মুহূর্তেই গায়েব হয়ে যাবে। নিজেকে তখন মেয়ের সামনে কীভাবে প্রকাশ করবেন? কীভাবে সৎ দাবী করবেন? আপনি চেয়েছিলেন, ওর সামনে আমার ও মায়ের ইমেজ নষ্ট করে দিতে, এইজন্য উল্টোপাল্টা বুঝিয়ে আটকে রেখেছিলেন এতদিন। কিন্তু আফসোস, আপনার সেই সাজানো-গোছানো প্লানে জল ঢেলে দিয়েছে আপনারই মেয়ে। এখন আমি নিশ্চিত ‘ভ্রমর’ সবসময় আমার ছিল, আছে, আগামীতেও থাকবে। আপনি কিচ্ছু করতে পারবেন না। সব যুক্তি পিছনে ফেলে দিলাম, কিছুক্ষণ আগে আপনার মেয়ে কী বলেছে জানেন? ‘কিছু কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘ বছরের চেনা-জানা সম্পর্কও ক্ষণস্থায়ী হয়ে যায়। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে অল্পদিনের চেনা-জানাও দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক তৈরী করতে পারে।’ সম্পর্ক ও অনুভূতি নিয়ে ওর এই ছোট্ট কথাটাই তো যথেষ্ট আমার কাছে। এবার আপনি টের পাবেন, আপনার চোখের সামনে কী করে আমি আমার স্ত্রীকে পরিপূর্ণ মর্যাদা দিই। পারলে আটকে দ্যাখাবেন। ওকে?’
তিনি যে ভেতরে ভেতরে কতটা টালমাটাল অবস্থায় পড়েছেন সেটা মেয়েকে বুঝতে দিলেন না। হাসিমুখে বললেন,
-‘চিন্তা হচ্ছে তো মা। কবে ফিরবি?’
-‘মাত্র দু’দিনেই অস্থির হয়ে গেলে? এত চিন্তা কোরো না। খুব শীঘ্রই ফিরব এবং তোমার জন্য একটা চমৎকার সারপ্রাইজ নিয়ে ফিরব। জানলে তুমি এত খুশি হবে…!’
আনন্দে আত্মহারা মাহদিয়া। শাদাব ও সায়রা করীমকে পূণরায় ফিরে পাবে, এই আশা সে ছেড়ে দিয়েছিল। অথচ কীভাবে যেন তাদের দেখা হয়ে গেল। যদিও হায়দার সাহেব বলেছিলেন, ‘শাদাব চেয়েছিল বলেই দ্যাখা হয়েছে’ এই কথাটা কোনোভাবেই বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না তার কাছে, আবার ফেলেও দিতে পারছে না। শাদাব জানবে কী করে সে দেশে ফিরেছে? গণ্ডগোলটা যে কোথায়, সেটা এখনও ধরতে পারছে না সে। তাই বুঝতেও পারছে না, আড়ালে কে বা কারা লুকিয়ে আছে! সম্পর্কের মাঝখানে আসা সেই অজ্ঞাত তৃতীয় ব্যক্তির হদীস এখনও পায়নি মাহদিয়া। বুঝে উঠতে পারছে না, এমন কে আছে; যে তাদের ক্ষতি চায়! কেনই-বা ক্ষতি চায়! তবে আনন্দের এই খবর এক্ষুণি শায়লা সুলতানাকে দিতে পারল না সে। কিছু সারপ্রাইজ সামনে গিয়ে দিতে হয়। দূর থেকে দিলে তার পরিপূর্ণ সুখ উপলব্ধি করা যায় না। মাকে হুট করে চমকে দিবে ভেবেই তিনজন মানুষের খোঁজ পাওয়ার খবর চেপে গেল। শায়লা সুলতানা মেয়ের আনন্দমাখা কণ্ঠস্বর শোনেই বুঝলেন, কী সারপ্রাইজ! কেবল তিনি জানেন, এটা আনন্দের খবর না-কি বড়োসড়ো কোনো সুনামির। টেনশনে বুক ধড়ফড় করছে তাঁর। তিনি বুঝেও এড়িয়ে যাওয়ার ভান ধরে বললেন,
-‘আচ্ছা, আগে ফিরে আয়। তারপর সারপ্রাইজ সম্পর্কে জানব। এখন বল, তোর সঙ্গে আর কে?’
হঠাৎ মা তাকে এত সন্দেহ কেন করছেন? সঙ্গে কেউ আছে কি নেই, এটাই-বা এত নিশ্চিত করে জানলেন কীভাবে! শায়লা সুলতানার প্রত্যেকটা কথায় চমকে চমকে উঠছে মাহদিয়া। মায়ের মতিগতি ও কথার প্যাঁচ কোনোকালেই সে বুঝেনি। আজও বুঝল না। বলল,
-‘বললাম তো, ছোটো মামা।’
-‘আর কেউ নেই? কোনো টুরিস্ট গাইড? ওই শহর তো অচেনা তোর কাছে, একা-একা ঘুরতে পারবি? ভয় হবে না?’
এবার কিছুটা স্বস্তি ও সুখ অনুভব করল মাহদিয়া। মা তার নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত, এইজন্যই বার বার জানতে চাইছেন সঙ্গে কে! সন্তানের জন্য মায়ের এই টান তাকে ভীষণ শান্তি দিল। মা ছাড়া থাকা যায় না-কি? কীভাবে শাদাবের দেয়া অযাচিত অপশনটাকে গ্রহণ করবে সে? মা’কে ছাড়া থাকার কথা দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারবে না মাহদিয়া। হারানোর ভয়ে তার বুক কেঁপে উঠল। আড়চোখে শাদাবকেও দেখল। ছেলেটা হাসছে। আশ্চর্য! এমন মুহূর্তে কেউ হাসে কী করে? তার টেনশনে গলা শুকিয়ে যাচ্ছে আর কেউ কি-না ঘায়েল করা হাসি হাসছে! এসব নিয়ে অকারণ মাথা ঘামাল না সে। মাকে দুঃশ্চিন্তামুক্ত রাখতে বলল,
-‘টুরিস্ট গাইড সঙ্গে আছে মা। তুমি একদম টেনশন নিও না।’
-‘গাইডটা কি ছেলে না মেয়ে? তোর তো আবার অচেনা কোনো পুরুষ মানুষ দ্যাখলে নাক সিটকানোর গুণ বেড়ে যায়।’
এই প্রশ্নের উত্তরে মুখভরে চমৎকার এক তৃপ্তিময় হাসি হাসল মাহদিয়া। আনন্দ ও সুখকে মনের কোণে লালন করে বলল,
-‘এই টুরিস্ট গাইড ভীষণ ফ্রেন্ডলি মা। নাক সিটকানোর মতো স্বভাব তার মধ্যে নেই। অন্যসব পুরুষ থেকে সে একদমই আলাদা। তাকে নির্দ্বিধায় বিশ্বাস করা যায়।’
শায়লা সুলতানা বোধহয় মারাত্মকভাবে চমকালেন। গলার স্বর থেমে গেল তার। তিনি অবিশ্বাস্য কণ্ঠে বললেন,
-‘মাত্র দু’দিনেই অচেনা পুরুষকে এত বিশ্বাস করা ঠিক হয়নি তোর। সবাই কি আর ভালো হয়? পরে কিন্তু পস্তাবি।’
-‘ভালো ও খারাপের মধ্যে পার্থক্য বুঝার মতো জ্ঞান আমার হয়েছে মা। তাকে আমি আগে থেকেই চিনি। তবে এই দু’দিনে নতুনভাবে চিনেছি, বুঝেছি। এরপর একটা কঠিন সত্য আবিষ্কার করেছি, পৃথিবীতে বিশ্বস্ত সম্পর্ক কখনওই ভাঙে না। সম্পর্কে যদি পর্যাপ্ত বিশ্বাস বেঁচে থাকে, শত ঝড়তুফানের মাঝেও ওই সম্পর্ক মাথাউঁচু করে টিকে থাকে। তুমি একদম চিন্তা কোরো না। এত বছর পর ফিরে এসে আমি সম্পর্ক নিয়ে কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নিব না। এখন রাখছি, পরে কথা বলব।’
শাদাব পারলে দমফাটা হাসিতে ফেটে পড়ে তখনই। কিন্তু মাহদিয়ার সামনে হাসতে চেয়েও বহুকষ্টে নিজেকে সামলে রাখছে। হায়দার সাহেব ক্ষণে ক্ষণে তাকাচ্ছেন ভাতিজার দিকে। তার হাসির মধ্যে থাকা রহস্য উদঘাটন করতে চাইছেন। চোখাচোখি হতেই ইশারা করলেন তিনি। শাদাব নিজের ফোনে থাকা ম্যাসেজ দেখাল। কিছুক্ষণ আগেই যা শায়লা সুলতানার নম্বরে পাঠিয়েছে সে। ম্যাসেজ দেখে তিনি শায়লা সুলতানার ভীতিগ্রস্ত চোখমুখ কল্পনা করেই হাসতে শুরু করলেন। শাদাব তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
-‘বোলতার বাসায় ঢিল ছুঁড়েছেন উনি, এবার কামড় তো ওনাকে খেতেই হবে। ‘নো চিন্তা ডু ফূর্তি’ মেজাজে থাকো। যে তুফানটা ওনার সামনে পাঠিয়েছি, সেটার মোকাবেলা করতেই দিনে দশ-বারোটা হোঁচট খাবেন।’
***
চলবে…