বড়োজা পর্ব-০৯

0
879

বড়োজা
পর্ব ৯
Nadia_Afrin

পরদিন সকালে উঠে রান্না করেছি।বাগান থেকে লাকড়ি কুড়িয়ে এনেছি অনেকগুলো।
দশটায় বের হবো ফ‍্যাক্টারির উদ্দেশ্যে।
রান্না শেষ করে খেতে বসেছি এমন সময় এক প্রতিবেশি এলেন।
নতুন মানুষ আমি,একটু পর পর অনেকেই দেখতে আসে।
তিনি আমায় এক হালি ডিম দিয়ে বললেন,”আমার পালন করা মুরগির ডিম এগুলো।ছেলে নিয়ে খেও।”

আমি তাকে বসতে বলি।সে বসেনা।কাজ আছে বলে চলে যায়।
এভাবে আরোকজন এসে লাউ দিয়ে যায়।আবার কেউ বা পুইশাক।
বস্তির মানুষগুলো ভীষণ বিনয়ী।একে-অন‍্যের পাশে থাকে।

খাবার খেয়ে বাচ্চা দুটোকে নিয়ে বের হলাম।
রিক্সাতে করে ফ‍্যাক্টারি পৌঁছালাম।
তখন সবে মাত্র রাশেদ মানে ফ‍্যাক্টারির বস ভেতরে ঢুকছে।
আমায় দেখে তার অফিসে আসতে বললেন।

গেলাম আমি।তিনি আমায় বসতে দিয়ে বললেন,”আপনি কী সত‍্যিই কাজটি করতে ইচ্ছুক?
বেতন তেমন পাবেন না,মাত্র সাতহাজার।এটা দিয়ে আপনার হয়ে যাবে?”

বললাম,”বর্তমানে এই টাকাটাই আমার কাছে লাখ টাকার সমান।
কাজটি খুব প্রয়োজন আমার।অনুগ্রহ করে আমায় কাজটি দিন।কথা দিচ্ছি,পরিশ্রম ও সততা ব‍্যাতিত অন‍্য কিছু পাবেন না আমার মাঝে।”

তিনি কিছুক্ষণ ভেবে জবাব দিলেন,”এসব কাজে সাধারণত আমরা বিশ্বস্ত মানুষ নেই।
কারণ চুরি যায় বেশি।
আপনি এতো করে অনুরোধ করছেন তাই কাজটা আপনায় দেব।
আপনি আপনার বিষয়ে আমায় বিস্তারিত বলুন।
এতে করে আপনার চরিত্র সম্পর্কে কিছুটা হলেও ধারণা পাব আমি।”

আমি বললাম সবটা।আকাশের বিষয়টি থেকে শুরু করে সবটাই বলেছি।

সব শুনে উনি বললেন,”তারমানে আপনার আগে-পিছে কেউ নেই।”

আমি ‘জ্বী’ বলে উত্তর দেই।
তিনি একটা কাগজ এগিয়ে দেয় আমার নিকট।
ওখানে ফ‍্যাক্টারির কাজ সম্পর্কে বর্ণনা দেওয়া এবং নৈতিকতার অনেক বিষয় লেখা।
নিচে একটা ফর্ম মতো আছে।
নাম,ফোন নাম্বার দিয়ে ফর্ম পূরণ করে দিয়ে দেই তাকে।

কাল থেকে কাজে আসতে বলে আমায়।
সামান্য হেসে উঠে দাড়াই আমি।
কৃতজ্ঞতা স্বরুপ তাকাই তার দিকে।তিনি আমার দিকে হাত বারিয়ে দেয় হ‍্যান্ড শেক করতে।
আমার বিব্রত লাগে।
তবুও হাত মেলাই কোনো রকম।এটাই বর্তমান যুগের ভদ্রতা।
ফেরার পথে ফ‍্যাক্টারিটি একটু দেখে নেই।কতো মানুষ কাজ করছে এখানে।
বিভিন্ন কাজে ব‍্যস্ত সকলে।

আবারো রিক্সা নিয়ে বাড়ি ফিরে আসি।মনটা ভীষণ খুশি আমার।
কাল থেকে আমার কর্মজীবন শুরু হবে।
আমার প্রথম পথচলা শুরু হবে।
সম্পূর্ণ গল্পটি আমার পেইজে দেওয়া আছে।নাদিয়া আফরিন ইংরেজিতে লিখে সার্চ দিলেই পেয়ে যাবেন আমার পেইজ।
ফলো দিয়ে সম্পূর্ণ গল্পটি পড়ুন।
ফলো না করলে হারিয়ে ফেলতে পারেন।

বাড়ি ফিরে চাচিকে বলি আমার খুশির কথা।তিনিও ভীষণ খুশি হন।
আজকে আমার আনন্দের দিন।মনের সুখে ঘুরে বেড়াই পুরো বস্তি জুড়ে।এর ওর সঙ্গে পরিচিত হই।মজা করি।
এই প্রথম দুপুরে চিন্তা মুক্ত হয়ে গলা দিয়ে খাবার নামে আমার।
বিকেলে লতা আপা আসে আমার ঘরে।সারাদিন কাজে ছিল সে।
কাজ শেষ করে মাত্র এসেছে।

এসেই আমায় জড়িয়ে ধরে বলে,”কী শুনলাম তন্নি?
তুমি নাকি কাজ পেয়েছ?
বেতন সাতহাজার।”

“হ‍্যা আপা।পেয়েছি কাজ।
আমার আর কোনো দুঃখ রইবেনা।
ছেলে-মেয়ে দুটোকে মানুষের মতো মানুষ করব।”

লতা আপা বিছানায় বসে বলেন,”তোমার জীবনটা বেশ অদ্ভুত লাগে আমার।
তোমার স্বামী বড়ো গাড়ি চরে বেড়ায়।নামিদামি পোষাক পড়ে,এদিকে তুমি ভাত পাওনা।
তোমার জীবন কাহিনী শোনার খুব ইচ্ছে আমার তন্নি।
জানি অতীত কষ্টের।তবুও একবার শুনতে চাই।
আকাশ ছেলেটা কী তোমায় বাধ‍্য হয়ে বিয়ে করেছিল?
বিয়ের পর থেকেই কী মেনে নিতে পারেনি?
গ্রামের এতিম মেয়ে তুমি।ওতো বড়ো ঘরে গেলে কীভাবে?”

এরই মাঝে চাচি ঢোকে ঘরে।
বলে,”আজ আকাশটা মেঘলা ভীষণ।দোকান বন্ধ করেছি।কাষ্টমার নেই।
বাকি বেলা তন্নির সঙ্গে গল্প করে কাঁটাব।
আমিও তোমার ব‍্যাপারে জানতে চাই তন্নি।চাচি বলে ডেকেছ,মা তূল‍্য।
মা তার মেয়ের দুঃখী জীবনী শুনতে চায়।
আমাদের সবটা বলো তুমি।”
পুরো গল্পটি নাদিয়া আফরিন পেইজে দেওয়া আছে।ফলো দিয়ে পড়েনিন।
নাহলে হারিয়ে ফেলতে পারেন।
এছাড়াও আমার লেখা সব গল্প পাবেন আমার পেইজে।

আমি কিঞ্চিৎ হেসে বলি,”তবে শুনুন,,,,

‘ছোট থেকে ভীষণ অভাবের মাঝে বড়ো হয়েছি।দুঃখ কষ্ট ছিল আমার নিত‍্যদিনের সঙ্গী।মা-বাপ মরা মেয়ে আমি।অন‍্যের তরে মানুষ হয়েছি।
আকাশ আমার মুক্তি ঘটিয়েছিল জানেন?
আমার দুঃখ দূর্দশা থেকে বের করে এক স্বাধীন পৃথিবী দেখিয়েছিল।
আমার দুনিয়া রঙিন করেছিল আকাশ ও তার ভালোবাসা।

নিজেরা ভালোবেসে বিয়ে করি আমরা।
সকলের অমতে পালিয়ে সম্পর্ক বাধি।
আকাশ আমায় ভীষণ ভালোবাসত।
আমি ছাড়া কিচ্ছু বুঝতো না।
স্বামীর ঘরে যখন পা রাখি সবে মাত্র সতেরোতে পা দিয়েছি।আকাশের বয়সও কম।বাইশ তেইশ হবে হয়ত।
দুজনেরই চাওয়া পাওয়া অনেক।
একে-অন‍্যের প্রতি ছিল আমাদের অগাধ ভালোবাসা ও বিশ্বাস।আমি এতিম বলে কখনো ছোট করেনি আকাশ।আগলে রেখেছে আরো।
ওর ভালোবাসা পেয়ে অতীতের সব দুঃখ ভুলেছিলাম আমি।নতুন করে শুধু করেছিলাম সবটা।

বিয়ের প্রথম থেকেই আমার শাশুড়ি রজনী বেগম আমায় মেনে নিতে পারে।
অবশ‍্য না পারাটাই স্বাভাবিক।উনাদের না জানিয়ে উনার ছেলেকে বিয়ে করেছি আমি।
উনি কষ্ট করে ছেলে জন্ম দিয়েছে,লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করেছে নিশ্চয় এদিন দেখতে নয়।

আমার বিয়ের চারমাসের মাথায় আমার শশুর মারা যায়।
সেই দোষটাও পড়ে আমার ঘাড়ে।আমি অপয়া।
আমি এ বাড়ি আসার পর থেকে নাকি অমঙ্গল হচ্ছে সব।
সে কথাও মেনে নিয়েছি।স্বামী শোকে মানুষ অনেক কিছুই বলতে পারে।সব কী আর ধরতে আছে!

শশুরের মৃত্যুর দু-মাস পরেই আকাশ ব‍্যবসায় হাত দেয়।
তখন আমাদের পারিবারিক অবস্থা বেশ খারাপ।
ব‍্যবসা সব শশুরই সামলাতেন।
আমার দেবর পড়াশোনা ও আমোদে ব‍্যস্ত তখন।বয়স কম।
ভাসুর বউ বাচ্চা নিয়ে শহরে থাকে।বাধ‍্য হয়ে আকাশকেই হাল ধরতে হয়।
ব‍্যবসায় রাতারাতি উন্নতি করে আকাশ।পরিবারে সুখ-সম্মৃদ্ধি ফিরে আসে।
আমি কম শিক্ষিত হলেও বুদ্ধিমতি ছিলাম।
ওদের কয়েকরকম ব‍্যবসার মাঝে অন‍্যতম ছিল কাপরের ব‍্যবসা।
ওখানে আমি অনেক পরিকল্পনা দিতাম আকাশকে।
ড্রেসের শো-রুম ছিল তাদের।
সেখানে আমি নিজে বেশ কয়েকটি ড্রেস ডিজাইন করে দিয়েছি।
রাতারাতি সেগুলো সাড়া পেয়েছে।
এ সবই করেছি আমি আমার সংসারের জন্য।
আকাশ আমায় তার ভাগ‍্যলক্ষি মনে করত।
প্রতিটি সকলতা শেষে আমায় জড়িয়ে ধরে বলত,তুমি তন্নি আমার লাকি চার্ম।তুমি আমার জীবনে আসার পর থেকে শুধু উন্নতি আর উন্নতি!

আমি হেসে উড়িয়ে দিতাম ওর কথা।
আসলে আমি সবটাই করেছি আমার সংসার -স্বামীর জন্য।

আকাশের সঙ্গে যখন বিয়ে হয়,আকাশ আমায় কথা দিয়েছিল পড়াশোনা করাবে।
আমিও চেয়েছিলাম।
তবে পড়তে পারিনি শাশুড়ি মায়ের জন্য।
তিনি কোনোভাবেই আমাকে কলেজে যেতে দেবেন না।
অগত‍্যা আমিও নিজের স্বপ্ন বাদ করে সংসারে মনোযোগী হই।
বরাবরই চেয়েছি শাশুড়ি মায়ের মন পেতে।অনেক চেষ্টাও করেছি বটে।পাই নি।এতো বছরেও আমি তার মন পাইনি।
আসলে কেউ যদি নির্ধারণ করেই রাখে সে আমায় মানবে না,তাহলে দুনিয়া উল্টে গেলেও হয়ত তার মন পাওয়া যাবেনা।

গ্রামের মেয়ে আমি,খুব সহজে গ্রাম‍্য স্বভাব ছাড়তে পারিনি।
বাড়ির ফাঁকা জায়গায় কতো রকম সবজি গাছ লাগাতাম।
আমার হাতের ফলন ছিল বেশ।যাই লাগাতাম,হয়ে যেত।
বাড়িতে হাঁস-মুরগি পালন করতাম।ডিম পেতাম অনেক।
সে সবই সংসারে ঢেলেছি।সবাইকে খাইয়ে বাঁচলে বিক্রি করে আবার সেই টাকা সংসারেতেই খরচ করতাম।
আমার নিজস্ব কোন সেভিংস ছিল না।
আমার সংসারই ছিল আমার ভবিষ্যৎ।
ভাবতাম,বর্তমানে সংসারে যতো দেব,ভবিষ‍্যৎ এ সংসার ততো উন্নতি হবে।বলতে পারেন সংসারময় জীবন।
মাসের অর্ধেক আমার হাতের বোনা সবজি,ডিম,হাঁস-মুরগি দিয়েই হয়ে যেত।
এসবই করেছি শাশুড়ির মন পেতে।পাইনি তবুও।

আকাশ পুরো সংসার চালাতো।এ নিয়ে কখনো অহংকার বা মনে হিংসা আনিনি।ভেবেছি সবই আমার।
আমি দেব না তো কে দেবে!

আমার এতো বছরের বিবাহিত জীবনে কখনো ভাসুরকে টাকা পাঠাতে শুনিনি।
শাশুড়িমাই উল্টে তাকে ঘরের কতো জিনিস দিয়েছে।
দিতেই পারে মা ছেলেকে।এ নিয়ে আপত্তি করার আমি কে।

আমার ভাসুর এবং জায়ের নাকি লাভ ম‍্যারেজ ছিল।
জা বড়ো লোকের মেয়ে।তার বাবার ঢাকা শহরে কখান বাড়ি,প্রতিষ্ঠিত ব‍্যবসা ও হোটেল ছিল।
ভাসুরকে তারা একেবারে নিয়েই নিয়েছিল।
ভাসুর তাদের আন্ডারেই কাজ করত।বছর বাদে দু-তিন দিনের জন্য নিজ বাড়ি আসত।
তবে ভাবি আসেনি কোনোদিন।
আমার বিয়ের পর তাকে আমি দেখিনি একবারো।
শুনেছি আকাশ না জানিয়ে আমায় বিয়ে করায় সেই রাগে তিনি আসেনা।
অথচ আমার বিয়ের আগ থেকেই তিনি আসতেন না।
এক চাচিশাশুড়ি বলেছিলেন,ভাবির নাকি এ বাড়ি পছন্দ নয়।একটু গ্রামাঞ্চল দেখে তার ভালো লাগত না।
মানিয়ে নিতে কষ্ট হতো।
তাই কখনো আসেনি।বিয়ের পর তিনমাস মতো এখানে থেকে স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে বাপের বাড়ি পাড়ি জমায় তিনি।
আমি এ বিষয়ে খুব একটা আগ্রহ দেখাই নি।যেটা যার ব‍্যক্তিগত ব‍্যাপার।
পুরো গল্পটি নাদিয়া আফরিন পেজে দেওয়া আছে।ফলো দিয়ে পড়েনিন।
নাহলে হারিয়ে ফেলতে পারেন।

হাসি-খেলাতেই কেঁটে যাচ্ছিল আমার আর আকাশের সংসার।
একে-অন‍্যের প্রতি তীব্র টান অনুভব করতাম।দুজন দুজনকে চোখে হারিয়েছি।
লুকিয়ে-বাঁচিতে আকাশ আমায় কতো জিনিস এনে দিয়েছে।সর্ণের গহনা গড়িয়ে দিত।
দামি পোষাক এনে দিত।আমার মন মতো ঘর সাজিয়ে দিয়েছিল ফার্নিচারে।
নিজেকে ভীষণ সুখি মনে হতো।
আমায় ছাড়া খেত না আকাশ।আমার অসুস্থতায় পাগল হয়ে যেত।
তাই তো এখনও ঐ মানুষটাকে ঘৃণা করতে পারিনা আমি।ওকে ঘৃণা করতে গেলেই ওর ভালোবাসা,কেয়ার গুলো চোখে ভেসে ওঠে।

আমার আলোময় জীবনকে আরো আলোকিত করতে চলে আসে আমার সন্তান।
আকাশ এ কথা জানতে পেরে পুরো এলাকা মিষ্টি বিলিয়েছে।
ওর পাগলামিতে আমি মুগ্ধ হয়েছি বারংবার।

এ সংবাদে সবচেয়ে খুশি ছিল আকাশ।
শাশুড়ি মা তখনও খুশি হতে পারেনি।আমার ভালো উনি কখনোই চায়নি।হিংসা করেছে।
কটু কথা শোনাতো আমায়।
জন্ম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।প্রতিটা কাজে খুত ধরেছে।
প্রেগনেন্সিতেও আমায় কঠোর খাটিয়েছে তিনি।
এক কাজ বার বার করিয়ে নিত।কাজের লোক রাখতে দিত না।
এক কথায় চরম জুলুম করেছে।
আকাশ ব‍্যবসায়িক কাজে বেশিরভাগ বাইরে থাকত।আকাশ ফেরার আগে শাশুড়ি মা আমায় ঘরে পাঠিয়ে দিত।
তাই ও এসব সম্পর্কে তেমন জানত না।আমিও বলিনি অশান্তি হবে ভেবে।
একদিন আকাশ কোনো কাজে বাড়ি আসে দুপুরে।
তখন আমি ঘর মুছছি উচু পেট নিয়ে।
এটা দেখে আকাশ প্রচন্ড খেপেছে।
আমি ঘরে নিয়ে যাই ওকে।বুঝিয়ে বলি,মাকে কিছু না বলতে।
আমরা অন‍্যায় করেছি তাই শাস্তি পাচ্ছি।
মাকে কিছু বললে সে আরো নিষ্ঠুর হবে।
অতএব তিনি করছে করুক,বলছে বলুক।একসময় উনি নিজেই শান্ত হয়ে যাবে।

আকাশ শোনেনা আমার কথা।
মায়ের সঙ্গে প্রচন্ড চিৎকার চেচামেচি করে।
ওর ছোট ভাই,যে পুরুষ মানুষ হয়েও সারাদিন মহিলাদের মতো কুটনৈতিক কথা বলত শাশুড়ির কানে,সেও আকাশের সঙ্গে ঝগড়া করে।
ছেলেটা ভীষণ বেয়াদব ছিল।মুখের ভাষা ছিল জঘন্য।ছোট-বড়ো দেখত না।

একপর্যায়ে আকাশ রেগে গিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়।
শাশুড়ি মা আমায় অভিশাপ দেয়,আমার যেন মৃত সন্তান হয়।তখন আমার ছয়মাসের পেট।
এ কথা শুনে সকলের অগচরে ভীষণ কাঁদি আমি।
পেটে আমার প্রথম বাচ্চা।ভীষণ ভালোবাসার সন্তান আমার।

সময় চলে তার আপন গতিতে।
সুখ-দুঃখ মিলেই সংসার।
একধারে আমি যেমন শাশুড়ির থেকে লাঞ্চিত হয়েছে,অন‍্যদিকে স্বামীর কাছে অমূল্য ভালোবাসা পেয়েছি।

আমার পুরো প্রেগনেন্সিতে আকাশ ভীষণ সাপোর্ট করেছে আমায়।
এরপর এই ফুটফুটে পুত্র সন্তানের জন্ম দেই আমি।
আকাশের খুশি এবার দেখে কে।পারলে নেচে গেয়ে বেড়ায় সে।
ছেলের প্রথম মুখ দেখে আমায় একটি সুন্দর হাতের আংটি দেয়।ছেলেকে মোটা চেইন দেয়।
হাসপাতালে শাশুড়িমা আসেনি আমায় দেখতে।
বাড়ি গিয়ে জোর করে আমি তার কোলে আমার ছেলেকে দেই।
দেখলাম মিটি মিটি হাসছে তিনি।
বাচ্চা হওয়ার পর আকাশের ভালোবাসা বেড়ে দ্বিগুণ।
অফিসে খুব কম যেত।বাড়িতে বসেই কাজ করত।
সারাক্ষণ ছেলেকে নিয়ে থাকত।
খাইয়ে দেওয়া,ঘুম পারিয়ে দেওয়া সবই ও করত।
আমার বেশি প্রেশার নিতে হয়নি বাচ্চা পালতে।
দশটার আগে বিছানা ছাড়তে দিত না আমায়।
বাচ্চার ঠান্ডা লাগবে নাকি এতে।দুজন কাজের লোক শুধু আমার আর বাচ্চার জন্যই রেখেছিল। সৃষ্টিকর্তা অর্থের দিক দিয়ে আমাদের অনেক দিয়েছিলেন।

মাঝ রাত পর্যন্ত ছেলেকে নিয়ে বসে থাকত আকাশ।কখনো ছেলেকে কোলে নিয়েই ঘুমিয়ে যেত।
আমি ভীষণ বকতাম ওকে।
সারাদিন কাজ করে রাতে না ঘুমিয়ে বাচ্চা নিয়ে বসে থাকে।এভাবে ওর শরীর নষ্ট হবে।অসুস্থ হয়ে পড়বে।
আকাশ জবাবে বলত,এখনি তো সময় বাচ্চাকে নিয়ে টাইম পাস করার।শৈশব আর কতোদিন।
একবার শেষ হয়ে গেলে আর ফিরে পাব না।
তখন মিছ করব খুব।
তাই আমি আমার বাচ্চার শৈশব ইনজয় করতে চাই।
ছেলের নামও রাখা হয়েছিল ওর অক্ষরে।

দিন আমার ভালোই যাচ্ছিল।
আলিফ হওয়ার পর শাশুড়ি মায়ের অত‍্যাচার কমে এসেছিল অনেকটা।আগের মতো আর গালমন্দ,কটুকথা বলত না।
আবার ভালোও বাসত না।প্রয়োজন ছাড়া কথা বলত না।
মাঝে মধ্যে অবশ‍্য মুখ ঝামটা দিত।
ছেলেকে ঠিক মতো কোলে না নিলেও দেখতাম আমার অগচরে আদর করত।
তবে তিনি আমায় তখনো মেনে নেননি।

ভেবেছিলাম এই বুঝি আমার সব সুখ ফিরবে।স্বামী,শাশুড়ির মন পেয়ে সুখেতে সকলকে নিয়ে থাকত।
কিন্তু তা আর হলো কই!
বৈশাখের কাল বৈশাখী ঝড় এলোমেলো করে দেয় আমার জীবন।

সেদিনটা ছিল পহেলা বৈশাখ।
প্রকৃত ইমানদারেরা এ দিনে নতুন কিছু করেনা।তেমন আমিও।

বড়োজার ছোট বোন রিঙ্কি আসে বেড়াতে আমাদের বাড়ি।
সেও শহরে থাকত।
ঘুরতে নাকি এসেছিল আমাদের এখানে।

মেয়েটার দুধে আলতা গায়ের রঙ।
পরণে লাল টকটকে শাড়ি।হাতা কাঁটা ব্লাউজ।
চুলে খোপা ও কানে ফুল।মুখে ভারী মেকআপ
ভাঝ করা শাড়ির আচল দিয়ে অনেকটুকু ফর্সা পেট দেখা যায়।
আমি মেয়ে হয়েই ওর দিক থেকে চোখ ফেরাতে পারিনা।

আমার সঙ্গে কুশল বিনিময় করে রিঙ্কি।
সংসারী মেয়ে আমি।ছুটি রান্না ঘরে।অথিতি এসেছে।ভালোমন্দ রান্না করতে হবে।
একা হাতে অনেক পদ রান্না করি আমি।
সেদিন ছিল আকাশের ছুটির দিন।
বছর পাঁচেকের আলিফকে কোলে নিয়ে রান্না ঘরের দিকে আসছিল আকাশ।
মাঝপথে দেখা রিঙ্কির সঙ্গে।
দুজনে কথা বলে।রিঙ্কি প্রশ্ন করে একের পর এক।
কী করছো?কেমন আছো?
আরো কতো কী!

আকাশ দু-একটার উত্তর দিয়ে অযুহাত দেখিয়ে চলে আসে।

এরপরও রিঙ্কি ওর পেছন পেছন আসে।আড় চোখে তাকিয়ে থাকে।মিটিমিটি হাসে।যদিও এসব আকাশ দেখেইনি।সে তার মতো বাচ্চা নিয়ে ব‍্যস্ত।
চোখ এড়ায়নি আমার।
স্বামীর আশেপাশে কী ঘটছে সবটাই আমার দেখা চাই।
প্রথমে ভেবেছিলাম অনেক বছর পর দেখা হয়েছে তাই এমন করছে মেয়েটা।
সম্পর্কে আবার বেয়াই হয়।মজা-তামাশার সম্পর্ক।

আমি রান্না শেষে ফ্রেশ হয়ে রিঙ্কিকে খেতে দেই।
খাবার টেবিলে বসে মেয়েটা খাচ্ছিল।
ফোনে বারবার টেক্সট আসে।মিসড কল আসে।
ডাল দিতে গিয়ে ওর ফোনের স্কিনে আমার চোখ যায়।পরপর জান লেখা কতোগুলো মেসেজ।
বুজলাম না,একটা মেয়েরা কতোগুলো জান হয়।

আমি ফোনের স্কিনে তাকিয়েছি দেখি রিঙ্কি ফোন উল্টে দেয়।আমিও সরে আসি।
কারো ব‍্যক্তিগত ব‍্যাপারে নাক গলানো আমার স্বভাব নয়।

খাওয়া শেষ করে রিঙ্কি আকাশকে খোঁজে।
আকাশ সবসময় একটা সুন্দর ড্রেসআপে থাকত।
যেকোনো সময় অফিসে যেতে হতো তাই পরিপাটি হয়ে থাকত।
ওকে দেখে মনেই হতোনা এক বাচ্চার বাবা।

মাঝে মাঝে আমিও মজা করে বলতাম,তুমি যা হ‍্যান্ডসাম তাতে তোমায় আর একটা বিয়ে দেওয়া যাবে।

আকাশ হেসে উড়িয়ে দিত আমার কথা।বুকের মাঝে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলত,তুমি থাকলেই চলবে তন্নি।
তুমি একাই দশজনের সমান।
আমি সারাজীবন তোমার সঙ্গে থাকতে চাই।

রিঙ্কি ইনিয়ে বিনিয়ে আকাশের সঙ্গে কথা বলতে চাইতো।
আকাশ পাত্তা দিতনা তেমন।
ওর মন,প্রেম ছিল সব আমি কেন্দ্রীয়।

থেমে যায় তন্নি।
লম্বা শ্বাস নেয়।একগ্লাস পানি নিয়ে সাবার করে দেয় এক নিমিষেই।
বাকিটা শুনতে অস্থির লতা আপা ও চাচি।

লতা আপা প্রশ্ন করে,”এটাতো তোমার সুখ গেল।দুঃখ কই?”

আমি কিঞ্চিৎ হেসে বলি,”সব একেবারেই শুনবেন নাকি?
ধৈর্য্য ধরুন এবার।
মাগরিবের আজান হয়েছে।বাড়ি ফিরে যান এবার।বাকিটা পড়ে শোনাব।”

আপা ও চাচি দুজনের মুখেই অসন্তোষ ভাব।
চলে যায় তারা।
আমি বিছানায় শুয়ে পড়ি।
অতীতের সুখের স্মৃতি মনে করে সুখ সুখ অনুভব হচ্ছে আমার।
আজ বরং একটু সুখিই থাকি।
চলবে,,,,,