বড়োজা পর্ব-১৯

0
297

#বড়োজা
#Nadia_Afrin

১৯
ভাবির কাছ থেকে ফিরে লম্বা ঘুম দিয়েছি।বাড়ি ফিরে কেন যেন ভীষণ শান্তি লেগেছে।
জানি’না কেন!
আমার অপরাধীদের করুণ পরিণতিতে কী আমার শান্তি লাগছে?
নাকি কাজটা ছেড়ে দেওয়ায়!

উত্তর নেই আমার কাছে।

পরদিন ঘুম ভেঙে চিন্তিত মুখে ঘরের দোয়ারে বসে আছি।
চাচি এলো।আমার কাছে বসে কাধে হাত রেখে বলল,”যে কদিন কাজ না পাও আমার সঙ্গে খাও।
নুন-ভাত যা পারি সামনে দেওয়ার চেষ্টা করবো।
জানি ছেলে নিয়ে কষ্ট হবে।তবে খালি পেটে তো থাকতে হবেনা।
পেটের জ্বালা তো মিটবে।পেটের জ্বালা বড়ো জ্বালারে মা।
এই পেটের দায়ে মানুষ চু*রি অব্দি করে।”

আমি চাচির দিকে তাকিয়ে বলি,”তা কী করে হয় চাচি!
দুজন মানুষকে বসিয়ে খাওয়ানো কম কথা নয়।
আপনার ছোট্ট একটা দোকান।
সারাদিনে দু-তিনশ যা বিক্রি-বাত্রা হয় তাতে কোনো মতে আপনার আর অসুস্থ নাতির পেট চলে যায়।
মেয়েটার ঔষধ ও লাগে।সবই ঐ সামান্য আয় থেকেই।
এর মাঝে আমি আবার আপনাদের ঘারে চেপে খেতে পারিনা।হোক না সে দু’দিন।তবুও আমার বিবেকে বাধবে।”

এরপরও চাচি অনেক ভাবে বোঝায় আমায়।
আমি আমার সিদ্ধান্তে স্থির।বয়স্ক এই মানুষটাকে আর কষ্ট দিতে চাইনা।

বেলা বাড়তে লাগে।ছেলে-মেয়ে ঘুম থেকে ওঠে।
উঠেই ছেলের বায়না,ওটা খাবো,এটা কিনে দাও।
আমি শুধু কোনো মতে বুঝিয়ে সুঝিয়ে রাখছি।
বাচ্চা তো।মানছে না কিছুতেই।
আজ আমার কাজ ও নেই।সারাটাদিন ছেলে জ্বালিয়েছে ভীষণ।
রাগে ক’বার ধমক ও দিয়েছি।
এই বাচ্চাকে নিয়ে আমি পড়েছি মহা বিপদে।আগের মতো শান্তশিষ্ট আর নেই।প্রচন্ড জেদি ও একরোখা হয়েছে।
কিছু আবদার করলে না দিলে জেদ দেখায়।শত বুঝিয়েও কাজ হয়না।
ইদানীং দেখছি তুই-তুকারি করছে আমার সঙ্গে।
সারাদিন বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায়।
কথা বললে শোনেনা।একদিন গায়ে হাত তুলেছিলাম।তবুও মানাতে পারছিনা।
এখানে আর ক’মাস থাকলে ছেলে একপ্রকার উচ্ছন্নে চলে যাবে।একে আর মানুষ করা সম্ভব হবেনা হয়ত।
চিন্তায় আর ভালো লাগেনা আমার।

দুপুর পযর্ন্ত এভাবেই চলে।
বেলা তিনটে নাগাদ লতা আপা আসে।তিনি সবটাই জানে আমার বিষয়ে।
এসে বলেন,”কিছু ভাবলে তন্নি?
কাজ তো ছেড়ে দিলে,এবার চলবে কী করে?”

আমি চুপ থাকি।জবাব দেওয়ার মতো কিছু নেই।
আমার এই নিশ্চুপ অবস্থা দেখে আপা বুঝতে পারে সবটাই।

বলেন,”তুমি তন্নি বস্তির মাঝেই কিছু করো।বাইরে গিয়ে তো অনেক রকম কাজই করলে।প্রতারিত হলে প্রতিনিয়ত।
যার কেউ নেই,বাইরেও তার মূল্য নেই।
সবাই হয় সুযোগ সন্ধানী।
শোনো আমার কথা।
আমাদের বস্তিতে অনেক বাচ্চা আছে।
পড়াশোনা করেনা।শিক্ষা-দিক্ষা কিচ্ছু নেই।তুমি মোটামুটি পড়ালেখা জানো।তাই ওদের পড়াও তুমি।
সাধারণ জ্ঞান টুকু দিতেই পারো।
মাস না,সপ্তাহ বাদে কিছু কিছু করে টাকা দেব সবাই মিলে।মাস শেষে দিলে তোমার চলতে অসুবিধা হবে।তাই সপ্তাহ শেষে অল্প অল্প করে কিছু টাকা দেব।
আমি এ বিষয়ে বস্তির লোকের সঙ্গে কথা বলেছি।সবাই রাজি আছে।
এবার তুমি রাজি হলে হয়।”

আমি আপার দিকে কৃতজ্ঞতা স্বরুপ তাকালাম।
সত‍্যি বলতে এই মূহুর্তে এই কাজটাই আমার জন্য লাখ টাকার চাকরি সমান।
ছোট থেকে ইচ্ছে ছিল পড়াশোনা করে শিক্ষক হবো।বাচ্চাদের আদর্শ শিক্ষা দেব।
মানুষ করে তুলবো সমাজের প্রতিটি শিশুকে।
সুযোগ ও যথেষ্ট শিক্ষার অভাবে ইচ্ছে থাকা স্বত্ত্বেও হয়ে ওঠেনি।
আজ একটা সুযোগ পেয়েছি।এই বস্তির বাচ্চাগুলো নিয়ে নতুন সমাজ গড়তে হবে আমার।
নতুন করে শুরু করতে হবে সবটা।

রাজি হয়েছি আমি।
আমার ঘরটাই একটু ভালো করে পরিষ্কার করে চটের ব‍্যবস্থা করেছি।ওখানেই বাচ্চা পড়াবো ভেবেছি।
লতা আপার থেকে কিছু টাকা ধার নিয়েছি।
বাজারে গিয়ে সেই টাকায় চক-বোর্ড কিনে আনবো ভেবেছি।
ওগুলোতে বাচ্চাদের লেখা শেখাবো।সেই সঙ্গে আমার ছেলেকেও পড়াশোনা শেখাবো।
ছেলেটার বয়স হয়ে গেছে স্কুলে যাওয়ার।কিন্তু পরিস্থিতি ও পরিবেশের অভাবে ছেলেটাকে স্কুলে দেওয়া হচ্ছেনা।
এভাবেই বসে থাকলে আর মানুষ করা হবেনা ছেলেটাকে।অনেক হেরেছি আমি।আর হারতে পারবোনা।ছেলে-মেয়েদের মানুষ করে ওদের দিয়েই নিজের পরিচয় তৈরী করবো।
প্রাথমিক শিক্ষা তো দেই।মায়ের শিক্ষা বড়ো শিক্ষা।সারাটাজীবন এই শিক্ষা কাজে লাগে।

ছেলে নিয়ে একটা দোকানে গেছি।চক-বোর্ড কিনে বাড়ি ফেরার পথে।
অনেকটা এসেছিও।হঠাৎ ছেলে আমার দাদুমণি বলে চেচিয়ে উঠেছে।
সেদিক পানে তাকাই আমি।আমার প্রাক্তন শাশুড়ি অর্থাৎ আলিফের দাদুমণি দাড়িয়ে আছে রাস্তার এক পাশে।
কেমন জীর্ণশীর্ণ চেহারা।মাথার এলোমেলো চুল।চেহারায় কেমন রুক্ষতা।
পরণে আধপুরানো শাড়ি।
হাতে বিরাট বাজারের ব‍্যাগ।টলমলে চোখে আমাদের দিকেই তাকিয়ে আছেন তিনি।
চোখে গভীর ভালোবাসা।

ছেলেও দেখছি দাদুমণির দিকে তাকিয়ে আছে এক দৃষ্টিতে।হয়ত দাদুমণির এমন অবস্থা মেলানোর চেষ্টা করছে।

কেন যেন মানুষটার প্রতি বড্ড মায়া হলো আমার।
আমি ছেলের দিকে তাকিয়ে বলি,”যাবে দাদুমণির কাছে?
কথা বলবে?”

ছেলে মাথা নাড়ে।
বাধা দেইনা আমি।ছেলের হাত ধরে রাস্তার ওপাশে যাই।যতোই হোক,উনার নাতি আলিফ।একটা অধিকার আছে।
যদিও এই মানুষগুলো কম মিথ‍্যাচার করেনি আমার ও আমার সন্তানদের প্রতি।তবুও তাদের প্রতি সদয় হয়েছি আমি।
উনার কর্মফল উনি একসময় অবশ্যই ভোগ করবে।শাস্তি দেওয়ার মালিক সৃষ্টিকর্তা।
মানুষ হিসেবে আমি পারি ক্ষমা করতে,ছাড় দিতে।
ক্ষমা একটি মহৎ গুণ।

ছেলে গিয়ে তার সামনে দাড়িয়েছে।
সে কিছুক্ষণ ফ‍্যালফ‍্যাল করে তাকিয়ে রইলো আমার বাচ্চার দিকে।
এরপর হুহু করে কেঁদে উঠলো।
ছেলেকে শক্ত করে বুকে চেপে ধরলো।

আমি এতোটাও আশা করিনি।হঠাৎ এমন ব‍্যবহারে ঘাবড়ে গিয়েছি আমি।
অহংকারী,রাগী স্বভাবের মহিলাটার আজ এ দষা কেন?
যদিও রাগ,জেদ সারাজীবন থাকেনা।একটা বয়স এসে সবই মাটি হয়।
তবুও এতোদ্রুত কী এমন পরিবর্তন সম্ভব?
আমায় যখন বাড়ি ছাড়া করে তখনও এ মানুষটার চোখে মুখে ছিল চরম কঠোরতা।মানবিকতার বিন্দুমাত্র ছাপ ছিল না।
আজ সেই মানুষটাই রাস্তায় দাড়িয়ে আমার ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে!
অথচ এই মানুষটাই কোনোদিন আমার বাচ্চাদের প্রতি সামান্য দয়াও করেনি।
জন্মের পর থেকে আমার মেয়েকে কোলে অব্দি দেয়নি।মুখটা অব্দি ঠিক মতো দেখেনি।
জানেন,লোকে বলতো আমার মেয়ে নাকি হুবহু ওর দাদির মতো দেখতে।তেমনি সরু খোচা নাক,পাতলা ঠোঁট,টানা চোখ।
সবচেয়ে আকর্ষণের ব‍্যাপার হলো দুজনেরই গলার নিচে একই স্থানে লাল তিল।
এতো মিল থাকা পরেও এই মানুষটা কখনো মমতার চোখে তাকায়নি মেয়েটার দিকে।
শেষ পর্যন্ত কলঙ্ক দিয়ে,অন‍্যের সন্তান বলে তাড়িয়ে দিয়েছে।
আমার ছেলেটা তার দাদুমণির হাতে ভাত খাওয়ার জন্য কতো কেঁদেছে।
তবুও পাষণ্ড মানুষটার মন গলেনি।এক লোকমা ভাত মুখে দেয়নি নিজ হাতে।’বড়োজার’ ছেলে মেয়েকে ঠিকই খাইয়ে দিয়েছে।আদর করেছে।
আমার ছেলেটা শুধু ওসব দেখে কেঁদেছে।
বুকের মাঝে হাহাকার লেগেছে আমারো।

আলিফকে জড়িয়ে ধরে সমান তালে কাঁদছে ওর দাদুমণি।
রাস্তার লোকেরা দেখছি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে।
বিষয়টি দৃষ্টিকটু লাগছে।

কিছু বলতে নিলে সর্বপ্রথম ‘মা’ ডাকটাই মুখ দিয়ে বেড়িয়ে আসতে নিল আমার।এতোদিনের অভ‍্যাস কী আর একদিনে পরিবর্তন হয়?
তবুও নিজেকে সংযত রেখে বলি,”ওপাশে চলুন আপনারা।ওপাশে গিয়ে কথা বলুন।মানুষজন দেখছে।”

আমি সামনের দিকে হাঁটা ধরি।
মা পেছন থেকে বলে,”মা বলতে ঘৃণা হচ্ছে তন্নি?”

আমি জবাব দেইনা কোনো।
মা ও আমার ছেলে পিছু পিছু আসে।ছেলেকে একহাতে আগলে নিয়ে অন‍্যহাতে বাজারের ব‍্যাগ নিয়ে আসেন তিনি।
ব‍্যাগটা দেওয়ালে ঠেস দিয়ে দাড় করায়।
ছেলেকে নিয়ে একটা ব্রেঞ্চে বসে।আমি একটু দূরেই দাড়িয়ে আছি।

মা তার ব‍্যাগ থেকে এক প‍্যাকেট বিস্কুট বের করে ছেলের হাতে দিলেন।নিজ হাতে খাইয়ে দিলেন।
খাওয়া শেষে পানিও খাওয়ালেন।আমি শুধু দেখছি দাড়িয়ে দাড়িয়ে।

মেয়ের কথা জিজ্ঞেস করলেন।
কোথায় থাকছি তা জানতে চাইলেন।

আমি উত্তর দিলাম,”মেয়ে ভালোই আছে।
সবাই আমাদের ছেড়ে দিলেও সৃষ্টিকর্তা ছাড়েনি আমাদের।তিনিই আমাদের আগলে রেখেছেন।
এক বস্তিতে ঘর নিয়ে থাকছি আমি।
খেয়ে না খেয়ে চলছে জীবন।তবে সুখেই আছি সন্তান নিয়ে।”

মা থমথমে মুখে বলেন,”রাজপ্রাসাদে যাদের বড়ো হওয়ার কথা তারা আজ কুড়ে ঘরেতেও ঠাই পাচ্ছেনা।যাদের বাবার লাখ লাখ টাকার সম্পত্তি,প্রতিষ্ঠিত ব‍্যবসা তার ছেলে-মেয়ে আজ না খেয়ে দিন পার করছে।
রাজার হালে মানুষ হওয়ার কথা যার,তারা আজ পথে পথে ঘুরে বেড়ায় শূন্য হাতে।
সবই আমার জন্য।
আমি তোদের থেকে তোদের পিতার পরিচয়,তোদের ভবিষ্যৎ,তোদের সকল সুখ সাচ্ছ‍্যন্দ কেড়ে নিয়েছি।আমি পাপি।”

ছেলে আমার ফ‍্যালফ‍্যাল করে দাদুমণির দিকে তাকিয়ে আছে।
কিছুই বুঝছেনা সে।

আমি বলি,”অনুগ্রহ করে ছেলের সামনে এসব বলবেন না মা।ও এখনো অবুঝ।সঠিক সময় এলে আমি নিজেই জানিয়ে দেব সবটা।
এখন কিছু বলে ওর বাচ্চা মনে চাপ প্রয়োগ করবেন না।
আমি চাইনা ওর ছোট্ট মস্তিষ্কে এসব জেনে মনের ওপর প্রভাব পড়ুক।”

মা চোখের পানি মুছে বলেন,”ঠিকই বলেছো তন্নি।
অনেক অন‍্যায় করেছি আমি।
আর করতে চাইনা।
যা অন‍্যায় করেছি তার পাপের শাস্তিই ভোগ করতে করতে ক্লান্ত আমি।
নতুন করে আর অন‍্যায় করে পাপের বোঝা বাড়াতে চাইনা।
তুমি ঠিক বলেছিলে তন্নি।
মরিচীকার পেছনে ছুটেছি আমি।
হিরেকে কাঁচ ভেবে দূরে ঠেলে কাঁচ আপন করেছি।এবার এই কাঁচের আঘাতে ঘায়েল হচ্ছি প্রতিনিয়ত।”

“এ কথা কেন বলছেন মা?
আপনার বড়োবউমা আছে তো আপনার সঙ্গে।
মেজো ছেলের বউ না’হয় এদিক-সেদিক হয়েছে।
একজন তো আছে।এতোটা হতাশ হওয়ারও কিছু নেই।
আমি সবটাই জেনেছি মা।
খবর ওরে বাতাসের আগে।”

মা’কে দেখলাম হাসছে।এই হাসিতে নেই কোনো আনন্দ।রয়েছে একরাস দুঃখ,কষ্ট ও উপহাস।
বললেন,”ভুল মানুষকে বিশ্বাস করেছি আমি।ও আমার বিশ্বাসের যোগ্য ছিল না।
দোষটা অবশ‍্য আমারই।লোভের পরিণাম সবই।
অতি লোভ আমায় শেষ করে দিচ্ছে মা।
তোমার সঙ্গে এতো অন‍্যায় করেছি তবুও তুমি আজ আমায় মা বলে ডাকলে।
ঐ জাত খারাপ মেয়ের জন্য কতো করেছি আমি।
এক ছেলের সংসার ভেঙে ওর বোনকে এনেছি।
ঐ মেয়ে আজ আমায় তুই-তুকারি করে।বুড়ি,পাগল বলে ডাকে।কটু কথা শোনায়।
মারধর করে।উঠতে বসতে গা*লাগা*লি করে।
সারাটাদিন চাকরানির মতো খাটায় আমায়।

সাত সাতটা বছর আমার সঙ্গে ছিলে তুমি।একই ঘরে,একই ছাদের নিচে।
কতো যত্ন করতে আমায়।গ্লাসটা অব্দি ধুয়ে পানি খেতে হতোনা।
অথচ আজ!

তুমি ছিলে লক্ষ‍্যি মন্ত সংসারী মেয়ে।
মাস কাবারির অর্ধেক টাকা বাঁচিয়ে দিতে।হেসে খেলে সংসার চলতো আমার।
একমাসের চাল,বাজার দেড় মাস অব্দি নিয়ে যেতে।
এখন!
মাস শেষ হওয়ার আগে টাকা শেষ।বড়ো বউমা মাস কাবারির অর্ধেক টাকা ওরা দু-বোনে নিয়ে নেয়।রেস্টুরেন্টে খায়।বাড়িতে অর্ডার করে খায়।
বাঁচলে ফেলে দেয়।তবুও আমায় দেয়না।
বাকিদিন আমি পানিভাত,আলু সেদ্ধ দিয়ে কোনোরকম পেট চালাই।

আকাশ ও হয়েছে এক।বউকে কিচ্ছু বলতে পারেনা।ভয় পায়।মেয়েটা সাংঘাতিক।
আমায় মা*রধ*র করে পর্যন্ত।
বাড়িতে দু-দুটো ছেলে আমার।
বড়োজন সব দেখেও না দেখার ভান করে থাকে।
আর আকাশ তো একটা বলতে গেলে দুটো শুনে আসে।
ব‍্যবসায় টাকা লাভ নিতে নিতে আমাদের সব শেষ।যখন তখন কম্পানি নিলামে চলে যায়।
বাড়ি-ঘর,জায়গা-জমি সবই তো শেষ।”

আমি মা’য়ের দিকে তাকিয়ে বলি,”আপনারা শিক্ষিত,বিচক্ষণ মানুষ হয়ে কীভাবে এই ভুল করলেন?
জমিজমা মানুষ সাধারণত ছেলের নামে দেয়।
আপনারা কেন বউমার নামে দিলেন?
এতো বোকা কেউ হয়?”

“বেশি পাওয়ার আশায় আমার সকল বিচক্ষণতা বিসর্জন দিয়েছিলাম।
মিতালি মানে বড়ো বউমা আমায় বলেছিল,
ওর বাবা নাকি ওর নামে জায়গা লিখে দিতে চাচ্ছে।
সেই জায়গার দাম নাকি এক কোটি।
আমার জায়গার দাম বিশ লাখ।
তিনি জায়গা দেবেন তবে আগে মিতালির নামে আমাদের কিছু অংশ দিতে হবে।
না’হলে কোন ভরসায় সে এতো টাকার জমি দেবে।
তখন আমি মিতালির হাতের পুতুল ছিলাম।
ভেবেছিলাম বউমা পেলে তো আমাদেরই থাকবে।
দশ টাকা ব‍্যায় করে দশ হাজার পেতাম।
তাই লিখে দিয়েছিলাম।
আর বাড়িতো রিঙ্কি নিয়েছে আকাশের থেকে।
এ’কথা আমি জানতাম না।
মা-ছেলে দুজনই ওদের বলির পাঠা হয়েছি।
আমরা খুব বোকা তন্নি।প্রচন্ড বোকা।
ঐ মিতালির আসল রুপ দেখছি রিঙ্কির সঙ্গে আকাশের বিয়ের পর।
দু-বোনে আমাদের ছাড়খাড় করে দিচ্ছে।
ইচ্ছে হয় ম*রে যাই।
আমার সাজানো সংসার পুরো ধুলিৎসাত হয়ে গেছে।ঘরের জিনিস অব্দি বিক্রি করে ওরা আমোদ করে।
শাশুড়ি হিসেবে ও বাড়িতে আমার বিন্দুমাত্র সম্মান নেই।
অথচ তুমি আমায় মাথায় তুলে রাখতে।রাজার হালে থেকেছি।
আমার মন পাওয়ার জন্য সাতটা বছর শ্রম দিয়ে গেলে তুমি বিনামুল্যে।
দু-দিনের মিতালি এসে আমার মনটা এমন বিষিয়েছে যে অতীতের সাতবছর আমি ভুলে গেছি।

কতশত পিঠা-পুলি,মিষ্টি বানিয়ে খাওয়াতে শুধু মন জয় করতে।
আজ আমার দু-মুঠো ভাতই দায়গ্রস্থ।
জানো তন্নি আমার না খুব দুধ-চিতই পিঠা খাওয়ার ইচ্ছে হয়েছে তোমার হাতে।
খাওয়াবে একদিন?
দেবে বানিয়ে?”

মায়ের কন্ঠে চরম আকুতি।
মায়া লাগে ভীষণ।কী করবো আমি?
মানুষ তো।পাথর তো নই।

বললাম,”একদিন করে খাওয়াবো।যদি সুযোগ পাই।
আপনার কথা শুনে ভীষণ খারাপ লাগলো।
সঠিক সময়ে না হলেও বুঝেছেন সত‍্যটা।দেখে ভালো লাগলো।
আসলে কী জানেন মা,সময় সারাজীবন মানুষের এক রকম থাকেনা।
দেখুন না,দুদিন আগেও আপনারা ছিলেন দান করার উপযোগি।
আজ আপনারা নিজেরাই খেতে পারছেন না ঠিক মতো।
যেই মহিলাকে আপন করে নিলেন,তার কাছে চরম ভাবে প্রতারিত হলেন।
একটা সময় ছিল মা,কতো বুঝিয়েছি আপনাদের।
চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছি পর্যন্ত।
আপনাদের চোখে পট্টি বাধা ছিল।
সত‍্য চোখের সামনে থাকলেও মিথ‍্যাকে সত‍্য ভেবেছেন।
প্রকৃত অর্থে আপনারা ছিলেন অর্থলোভি।অর্থের জন্য নিজেদের বিবেক পর্যন্ত বিসর্জন দিয়েছেন।
অথচ আপনাদের যা ছিল,তা খেয়ে ফুরোতে পারতেন না।
আপনাদের চাহিদা ছিল আরো বেশি।পরের সম্পদের প্রতি লোভ লেগে গিয়েছিল।
এই তীব্র কুৎসিত চাহিদা আপনাদের গিলে খেয়েছে।

নিজের নামে প্রশংসা করছিনা।তবে এটা চুড়ান্ত সত‍্য।
আমি কখনো আপনাকে শাশুড়ি মনে করিনি।
করেছি আমার নিজের মা।
তাই তো আপনার শতো অবহেলার পরও থেকেছি আপনার পদতলে।
অন‍্যায় হয়েছে আমার প্রতি,অত‍্যাচারিত হয়েছি,তবুও ছেড়ে যাইনি আপনাদের।
দিন শেষে আমার সকল পরিশ্রম,সুখ ছিল আপনাদের কেন্দ্র করে।
সময় এমনও গিয়েছে,আপনারা মিথ‍্যাচার করেছেন আমার প্রতি,কটু কথা শুনিয়ে নিজেরাই রাগ করে থাকতেন।
সেই আমিই না খেয়ে আপনাদের জন্য বসে থেকেছি।

মনে পড়ে সেদিনের কথা মা?
আপনি জ্বরে কাপছিলেন সারাটারাত।
আমি ও ‘বড়োজা’ বাড়ি ছিলাম।তটিনীর বিয়ে হয়নি তখন।
আমার ভরা মাস চলছে।মেয়ে পেটে।বাড়িতে আপনার কোনো ছেলে ছিল না।সবাই সে-রাতে কাজে বাইরে।শুধু ছোটজন বাড়িতে।
জ্বরে সে’রাতে কাপছিলেন আপনি।
জ্বরের ঘোরে বিছানা পর্যন্ত নষ্ট করেছেন।
তা দেখে আপনার বড়ো বউমা নাক ছিটকে ঘর থেকে বেড়িয়ে নিজের ঘরে গেছে।
সারারাত আর বাহির হয়নি। খোঁজ পর্যন্ত নেয়নি আপনার।
ভয় পেয়েছে।যদি তাকে পরিষ্কার করতে হয়!

আমার নিজেরই চলাফেরা জুলুম তখন।
তবুও একা হাতে সেসব পরিষ্কার করেছি।সারাটারাত জলপট্টি করেছি মাথায়।
পেট নিয়ে বালতি ভর্তি পানি এনে মাথায় ঢেলেছি।
আপনার সেবা করেছি।
আমি খারাপ বউ ছিলাম আপনার চোখে।প্রয়োজনে সেই খারাপ বউ ই কাজে লাগলো।আপনার ভালো বউ,শখের বড়োবউ একটাবার আসেনি।
আমি পরের মেয়ে হয়ে সারারাত সেবাযত্ন করে আপনায় সুস্থ করে তুললাম।
আপনার নিজের পেটের ছেলে পর্যন্ত এগিয়ে আসেনি।
সেই আমিই দিন শেষে অপরাধি হলাম।
সকালে আপনার বড়ো বউমা এসে বলল তিনিই আপনায় সেবা করে সারিয়ে তুলেছে।
আপনার চেতনা ছিল না।বড়ো বউমার মুখের মিথ্যা কথা বিশ্বাস করলেন।
আমার ক্লান্ত চেহারা দেখেও সত‍্যটা মানলেন না আপনি।উল্টে তর্ক করায় আমায় থাপ্পড় দিলেন।
কম মা*র খাইনি আপনার হাতে।আমি নির্দোষ ছিলাম।
সামান্য দু-টুকরো মাংসকে অযুহাত করে রটনা রটিয়ে আমায় তাড়িয়ে দিলেন।
আমার ছেলে-মেয়েদের অনাথ করলেন।
আমার স্বামী আকাশ,তাকেও কেড়ে নিয়েছেন।
আপনারা ছিলেন আমার শেষ এবং একমাত্র অবলম্বন।আমার বেঁচে থাকার কারণ।
সেই আপনারাই আমায় দিন শেষে ছুড়ে ফেললেন রাস্তায়।
ঝড় বাদলের দিনে দু-মাসের মেয়েকে নিয়ে
এ-দোয়ার, ও-দোয়ার ঘুরেছি শুধু একটু আশ্রয়ের জন্য।
আপনারা ভোগ বিলাসিতায় ব‍্যস্ত ছিলেন।
ওদিকে আমি ছেলে নিয়ে পেটের জ্বালায় ম*রি।
বৃষ্টিতে ভিজেছি।কুকুর ঘরে নিয়ে রাত্রি পার করেছি।অন‍্যের এঠো-বাসি খেয়ে দিন কাঁটিয়েছি।
যেই বয়সটা আমার বাচ্চার হেসে-খেলে পার করার কথা ছিল।সেই বয়সে সে অভাবের সঙ্গে যুদ্ধ করেছে।
যাদের বড়ো হওয়ার কথা ছিল রাজপ্রাসাদে তারা অন‍্যের আশ্রয়ে বেঁচে আছে।
মেয়ে বড়ো হবে।বলতে পারবেনা বাবার চেহারা কেমন।
ছেলে বড়ো হবে।ছোট বেলার কাহিনী মনে থাকলে বাবার প্রতি ঘৃণা নিয়ে বেড়ে উঠবে।
আমি পারিনা নতুন করে কিছু ভাবতে।সংসার বাধতে।আপনাদের সঙ্গে থেকে তৃক্ততা চলে এসেছে সংসার জীবনের প্রতি।

কী এমন বয়স আমার?
আমার বয়সি বহু মেয়ে এখনো পড়াশোনা করছে,চাকরি করছে।
সেখানে আমি গায়ে ডিভোর্সি দাগ লাগিয়ে জীবন যুদ্ধে খেটে মরছি।
একবারো ভেবেছিলেন আমার কথা?
এতিম মেয়ে আমি।কার কাছে যেতাম?কী খেয়ে বাঁচতাম?

ভাবেন নি।ঘাড় ধরে তাড়িয়ে দিলেন।
আমার পেছনে গুন্ডা পর্যন্ত লেলিয়ে দিয়েছেন।
যাকে ভাই বলে মনে করতাম তার সম্পর্কে আমায় নিয়ে জঘন্য কথা বললেন।
দিনশেষে আমি টিকে গেলাম ঠিকই।
ধ্বংস হলেন আপনি ও আপনার ছেলে।
সৃষ্টিকর্তা ছাড় দেয়,কিন্তু ছেড়ে দেয়না।

মা দেখি আচলে মুখ চেপে কাঁদছে লজ্জায়।
আমি কিছুক্ষণ থেমে রইলাম।
কথাগুলো বলা এনাকে প্রয়োজন ছিল।তাই বলেছি।
পুরো গল্পটি নাদিয়া আফরিন পেইজে দেওয়া আছে।ফলো দিয়ে পড়েনিন।
নাহলে হারিয়ে ফেলতে পারেন।
এছাড়াও আমার লেখা সব গল্প পাবেন আমার পেইজে।

আমার ছেলেটা তখনও আমার মুখপানে তাকিয়ে আছে অবলা দৃষ্টিতে।
ওর হাত ধরে টেনে নিয়ে শাশুড়ি মার সামনে দাড় করালাম।
প‍্যান্ট উঠিয়ে পায়ের সেই পোড়া দাগটা দেখিয়ে বললাম,”দাগটার কথা মনে আছে মা?
সেই পোড়া দাগ।আপনার বড়ো ছেলের মেয়ে গরম নুডলস ফেলে করেছিল এই দাগ।
চিহ্নটা আজো আছে।
ছেলে আমার আজো বলে, আপু ইচ্ছে করে আমার গায়ে নুডলস ফেলেছে।
সেদিন মা-ছেলে মিলে কেঁদে কেঁদে পযর্ন্ত বলেছিলাম।আপনারা বিশ্বাস করেননি।
বড়ো বউমার তালে তাল মিলিয়েছেন।
আমার বাচ্চাটা কষ্ট পেয়ে কেঁদে বুক ভাসিয়েছে।
আপনারা একটিবারো এগিয়ে আসেননি।আমার ছেলেটাকে আদর করে শান্ত করার চেষ্টা করেননি।
পরের থেকে সাহায্য নিতে হয়েছিল আমায়।তাও কথা শুনেছিলাম।
অথচ ওরাও আপনার নাতি।’বড়োজার’ ছেলে মেয়ের মতো ওদের ও সমান প্রাপ‍্য ছিল।”

“ঠিক বলেছো তুমি তন্নি।সময় থাকতে বুঝিনি।
চোখের সামনে সেদিনও সত‍্য ছিল।
আমি বিশ্বাস করিনি।
পাপের ফল ভোগ করছি আমি।
পাপ আমার পিছু ছাড়ছে না কোনোমতেই।”
সম্পূর্ণ গল্পটি আমার পেইজে দেওয়া আছে।নাদিয়া আফরিন ইংরেজিতে লিখে সার্চ দিলেই পেয়ে যাবেন আমার পেইজ।
ফলো দিয়ে সম্পূর্ণ গল্পটি পড়ুন।
ফলো না করলে হারিয়ে ফেলতে পারেন।

আমি কিঞ্চিৎ হেসে বলি,”ওসব বলে আর কী হবে মা?
যা শেষ হয়ে গেছে তা নিয়ে আলোচনা করা বৃথা।
সত‍্যি বলতে আপনায় স্বান্তনা দেওয়ার মতো ভাষা নেই।তবুও বলবো ভালো থাকার চেষ্টা করুন।
বউমা যেমনই হোক।নাতি-নাতনি আপনার।
ওদের নিয়ে বাকিটা জীবন কাঁটিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করুন।”

“হাসালে তুমি তন্নি।যাদের মা ই ঠিক নেই,তারা ঠিক হয় কখনো?
মায়ের শিক্ষা হলো বড়ো শিক্ষা।মায়ের থেকে দেখে দেখে বাচ্চারা শেখে।
মা ই যদি বাচ্চার সামনে শাশুড়িকে মা*রধ*র গা*লমন্দ করে,তাহলে বাচ্চারা কী শিখবে?
ভালো কিছু শিখবে?

ওরাও হয়েছে মায়েরই মতন।
আমায় যা-তা বলে।
দাদি বলে ডাকা তো দূরে থাক।বুড়ি ছাড়া ডাকেনা।
ঐ ছোট বাচ্চাও আমায় ভাষা খারাপ করে।
সারাটাদিন ওদের পেছনে খাটি আমি।একটা কাজে এদিক সেদিন হলে কিল-ঘুসি দেয়।
ভীষণ ব‍্যাথা পাই আমি।বয়স হয়েছে কিনা!
মা’কে বললে বলে মজা করে মেরেছে।ইয়ার্কি করে আমায় নিয়ে।
গুরুজনদের সঙ্গে কেউ এমন মজা করে?
রাস্তাঘাটে ওভাবেই ডাকে।খুব লজ্জা পাই আমি।

বড়ো মেয়েটা যথেষ্ট বড়ো।বোঝার মতো বয়স হয়েছে।তবুও জুলুম করে আমার প্রতি।ঐ তো সেদিনের কথা।
ডায়রিয়া সঙ্গে জ্বর এসে অবস্থা খারাপ আমার।বিছানাগত অবস্থা।সারাদিন বিছানায় শুয়ে শুয়ে হায়-হুতাশ করেছি।রান্না করতে পারিনি দেখে বড়ো বউমা ধাক্কা দিয়ে দিয়ে বিছানা থেকে উঠেয়েছে আমায়।
চিৎকার করে করে রান্না করিয়েছে।একা হাতে সব করেছি।রান্না করি আর দেওয়ালে মাথা ঠুকে কাঁদি।পূরণও দিনের কথা মনে পড়ে।
সব শেষ করে ঘরে গিয়ে শুয়েছি সবে এর মাঝে বড়ো মেয়েটা বলে ওর ড্রেস ধুয়ে দিতে এক্ষুনি।সকালে নাকি কোথায় ঘুরতে যাবে।

অন‍্যজামা পড়ে যেতে বলেছি।কতো জামা ওর।আলমারি ভর্তি।
তবুও ওটাই পড়ে যাবে।এদিকে শরীর আমার পারেনা।মেয়েটার চিৎকারে বাধ‍্য হয়ে কাপড় ধুতে গিয়েছি ঐ সন্ধ‍্যাতেই।বাথরুমে পড়ে গিয়ে পায়ে-কোমরে ব‍্যাথা পেয়েছি।ওরা দাড়িয়ে দাড়িয়ে দেখে,তাও তোলেনা আমায়।
চোখে অন্ধকার হয়ে এসেছে আমার।
ব‍্যাথা সহ‍্য করতে না পেরে কেমন জানি হয়ে গেছি।
চিৎকার শুনে সামনের বাড়ির এক মহিলা এসে উঠিয়েছে আমায়।
ঐ মেয়ে তবুও নিস্তার দেয়না।কাপড় ওর ধুয়ে দিতেই হবে।
ওর মা শেষে ধুয়ে দিয়েছে।
একটা ব‍্যাথার বড়ি অব্দি দেয়নি আমায়।সামনের বাড়ির সেই মহিলা একটা বড়ি দেয় তারপর খাই।
খেয়ে ঘুমিয়েছি।মাঝরাতে ডেকে ডেকে মেয়েটা বলে নুডলস রান্না করে দিতে।
পা ফুলে একাকার ছিল আমার।তবুও মায়া হয়না ওদের।
রাজি হইনি বলে মেয়েটা জেদ করে আমার গায়ে পানি ঢেলে বেড়িয়ে গেছে।
আমার আলিফ কখনো আমার দিকে চোখ তুলে তাকায়নি পর্যন্ত।সম্মান দিয়ে গেছে একাধারে।কখনো যদি একটু জেদ ও দেখাতো আমার সঙ্গে,তুমি ততক্ষণাৎ শাষন করতে।ক্ষমা চাওয়াতে।

আর ওরা এতো অন‍্যায় করে মায়ের শাষন নেই একদমই।বাবাটাও হয়েছে এক।
দেখেও না দেখার ভান ধরে বসে থাকে।ছেলেটা আমার কেমন একটা অবলা প্রাণী হয়ে গেছে যেন।আগে যাও দু-একটা কথা বলতো।এখন তার একটাও বলেনা।ঠিক মতো বাড়ি আসেনা।
বড়ো বউমা এই নিয়ে প্রায় প্রায় ঝগড়া-ঝামেলা করে।কোথায় যায়,কোনো উত্তর নেই।
কেউই শান্তিতে নেই ও বাড়িতে।তোমরাও চলে এসেছো,পিছে পিছে সুখ ও বিদায় নিয়েছে।”

আমি বলতে চাইলাম ভাসুরের বিষয়টি।ওরা হয়ত জানেনা কেউ।অন্তত ‘বড়োজা’ তো জানেনা নিশ্চয়।
জানলে এতোদিনে মা*র্ডার টা*র্ডা*র হয়ে যেত।
বেচারারা এমনিতেই ঝামেলা আছে।এসব বলে আর ঝামেলা বাড়াতে চাইনা।
সময় হলে সবটা আপনাআপনিই জানবে।

অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে আমার।মেয়েকে রেখে এসেছি লতা আপার কাছে।
কাঁদছে নিশ্চয়।বাড়ি ফিরতে হবে দ্রুত।
শাশুড়ি মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিতে চাইলাম।
তখনই একটা বিষয় আমার নজরে এলো।

বিয়ের পর থেকে দেখেছি উনার গলায় একটা চেইন ছিল।লকেটে আমার শশুরের নামের অক্ষর ছিল।বেশ মোটা ও সুন্দর ডিজাইনের চেইন ছিল।কখনো খুলতে দেখিনি।খুললেও সঙ্গে সঙ্গে পড়ে ফেলতো।হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে কালো সুতোর মালা গলায় দিয়ে সেটার সঙ্গে অব্দি বেধে রাখতো।মানে খুব প্রিয় ছিল সেটি।শশুরের হাতের শেষ স্মৃতি।
আজ সেটা গলায় নেই।শুধু কালো সুতোটা ঝুলছে গলায়।
এজন্যই হয়ত এতোক্ষণ মানুষটাকে বড্ড খালি খালি লাগছিল।দীর্ঘদিন একটা জিনিস পরলে সেটা হুট করে খুলে ফেললে সবারই নজরে আসে।তাই আমারো এসেছে।
খেয়াল করিনি এতোক্ষণ।এবার করেছি।
একটু ইতস্তত বোধ হওয়া স্বত্ত্বেও প্রশ্ন করি,”আপনার গলার চেইন কোথায় মা?খুলে রেখেছেন?”

মায়ের চোখে জল জমলো।
হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে পানি মুছে নাক টেনে বলে,”রিঙ্কি নিয়ে নিয়েছে।গলা থেকে খুলে নিয়েছে জোর করে।বিক্রি করে দিয়েছে।
আমি পারিনি আমার স্বামীর শেষ স্মৃতি ধরে রাখতে।
মানুষটাকে কথা দিয়েছিলাম,মৃত‍্যুর আগ পর্যন্ত এই চেইন আমার গলায় থাকবে।
আমি পারলাম না কথা রাখতে।”

আমি তাকে শান্ত হতে বলে বলি,”সব জিনিস সারাজীবন ধরে রাখা যায়না।হয়ত ভাগ‍্যে নেই আপনার।
ভালোবাসাটাই আসল।”
পুরো গল্পটি নাদিয়া আফরিন পেইজে দেওয়া আছে।ফলো দিয়ে পড়েনিন।
নাহলে হারিয়ে ফেলতে পারেন।
এছাড়াও আমার লেখা সব গল্প পাবেন আমার পেইজে।

মা চুপ গেলেন।
আমি ছেলেকে কোলে তুলে নিয়ে বললাম,”আজ তাহলে আসি মা।
আপনাদের মতো ধনী তো আমি নই।খেটে খেতে হয় আমাদের।
কাজ আছে আমার।
কখনো নাতি-নাতনিদের দেখতে মন চাইলে অথবা মিস করলে চলে আসবেন।
আমার ঘরের দরজা আপনাদের জন্য সবসময় খোলা থাকবে।
আমি স্বার্থপর নই।”

মা ছেলেকে চুমু খেলেন।আদর করলেন।প্রথমবার ছেলে দাদুমণির প্রাণখোলা আদর পেয়ে হাসি আটছে না আর মুখে।
অনেকক্ষণ তারা এভাবেই পার করলো।
এরপর ছেলে নিয়ে ফিরে আসার পালা আমার।
হাসিমুখে বিদায় জানিয়ে সামনে হাঁটবো এমন সময় মা পেছন ডেকে বলে,”তন্নি আমায় কী ক্ষমা করে দেওয়া যায়না শেষ বারের মতো?
অন্তত ছেলে-মেয়ে দুটোর মুখের দিকে তাকিয়ে আবার কী ফিরে আসা যায়না?
আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করতাম তোমার অধিকার ফিরিয়ে দেবার।
আমার কেন যেন মনে হয়,তুমি গেলেই সবটা আবার আগের মতো হয়ে যাবে।আমার মেয়ে হয়েই না’হয় থেকে যেও।কথা দিচ্ছি এবার আর তোমায় কষ্ট দেব না।আদরে রাখবো।”

“কারো প্রতি রাগ-জেদ চেপে রাখা আমার স্বভাব নয়।ক্ষমা করতে ভালোবাসি আমি।ছাড় দিয়ে চলতে পারি।যার যা কর্মফল সৃষ্টিকর্তা তাকে তা সঠিক সময়ে দিয়ে দেবেন।তিনি সব দেখেন,জানেন।আমার কিছু করতে হবেনা।
তাই আপনাকে আমি ক্ষমা করেই দিয়েছি মনে করুন।
যখন সময় ছিল তখনই আপনি আমায় বোঝেননি।বাচ্চাদের কথা ভাবেন নি।পরিবারের মাথা হয়ে আপনি যদি আমার পাশে থাকতেন,এ অবস্থা আমার হতোনা।
এবার আর কিছু ঠিক হওয়া সম্ভব নয়।যা হওয়ার হয়েই গেছে।ভেতর থেকে মরে গেছি আমি।মরা আর জীবিত হয়না।
অন্তত নিজের সম্মান বিসর্জন দিয়ে আমি আর ফিরছিনা।
আমার কিচ্ছু নেই মা।আত্মসম্মান টুকু ছাড়া।
।যখন মেয়ে হতে চেয়েছি তখন হতে পারিনি।এখন হয়ে লাভ কী?
আর চাইনা কারো মেয়ে হতে।চাইনা কারো স্ত্রী হতে।চাইনা কারো বউমা হতে।
এবার একজন যোগ্য মা হতে চাই আমি।
একজন আদর্শ মা।একজন প্রতিষ্ঠিত তন্নি হতে চাই।হাজারো তন্নির অনুপ্রেরণা হতে চাই।”

চলে আসি ছেলে নিয়ে।
পিছেতে মা অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকিয়ে থাকে।
শুরু হয় আমার জীবনের নতুন মোর।

(এই পর্ব যথেষ্ট বড়ো এবং সাজিয়ে দেওয়া হয়েছে।এখন থেকে শুরু হবে গল্পের নতুন মোর।ধীরে ধীরে শুরু হবে। অধৈর্য‍্য হবেননা কেউ )

চলবে।