#বাসন্তীগন্ধা
|১০|
লাবিবা ওয়াহিদ
হঠাৎ ইলিরার ডাকে মেহেরের ধ্যান ভাঙলো। মেহের পলক ফেলে তাকাতেই দেখলো ইলিরা তারই দিকে এগিয়ে আসছে। ঠোঁটে তাঁর হাসি ঝুলে রয়েছে। মেহের হাসার চেষ্টা করলো। ইলিরা মেহেরের মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,
–“কেমন আছো? ডাকলাম, শুনলে না যে?”
মেহের সৌজন্যমূলক হাসি দিয়ে বলে,
–“ভালো আছি। খেয়াল করিনি। তা তুমি হুট করে আসলে যে?”
ইলিরা অধর জোড়া আরও প্রসারিত করে বললো,
–“তোমার ভাইয়ার সাথে মিট করতে আসলাম। কী মনে হয়, আমার এই রূপ দেখে পটবে তো?”
ইলিরার কথাগুলো মেহেরের মাথার উপর দিয়ে গেলো। মেহের ভ্রু কুচকে বলে,
–“ভাইয়া মানে? কার কথা বলছ আপু?”
–“ওহ, কাম অন মেহের। সারিমের কথা বলছি আমি!”
বুকটা হঠাৎ কেমন কেঁপে উঠলো মেহেরের। পরমুহূর্তে মেহের নিজেকে সামলে বললো,
–“ও..ওহ! তোমার তো বন্ধু-ই হয়!”
ইলিরা এবার লাজুক হেসে বললো,
–“এবার বন্ধুর থেকে বড়ো কিছু হতে যাচ্ছে। তোমার মতো কিউট ননদ পাবো আমি। হাউ লাকি আই এম। এনিওয়ে, তোমার ভাই কোথায় বলো তো? এত সুন্দর করে যার জন্যে সেজে আসলাম, তাকেই তো পেলাম না। কলটাও ধরছে না!”
কেমন যেন অস্থিরতা অনুভব করলো মেহের। বুকের বা পাশটা কেমন চিনচিন করছে তার। নিজেকে ধাতস্থ করে মেহের আটকে গলায় বললো,
–“ওহ। আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি আপু!”
–“ওহ। স্যরি। কথার ব্যস্ততায় তোমার মাত্র ফেরার কথা খেয়ালেই আসেনি। যাও।”
মেহের নিশ্চুপ হয়ে ধীর পায়ে উপরে চলে গেলো। কেমন অস্থির অনুভব করছে মেহের। এর কারণ কী? ইলিরা সারিমকে পছন্দ করে বলে, নাকি সারিমের সাথে ইলিরাকে মানতে পারছে না? এই তিক্ত অনুভূতিটা কিসের? কেন তাঁর চোখ ফেটে অশ্রু বেরিয়ে আসতে চাইছে? মনের মাঝে তাঁর কিসের এত হাহাকার?
এদিকে মেহেরের দাদী গম্ভীর মুখ করে বসে আছে। কোনো এক কারণে তিনি ভীষণ রেগে আছেন। জ্যুতি এর মাঝে দাদীর রুমে প্রবেশ করলো। জ্যুতি আমতা আমতা করে বললো,
–“ইলিরা মেয়েটা আপনার সাথে দেখা করতে চাইছে মা!”
দাদী তেঁতে ওঠেন। গলায় কাঠিন্য এনে বললেন,
–“খবরদার ওই মেয়ে আমার ঘরের ত্রি-সীমানায়ও যাতে না আসে। পোশাক-আশাকের কোনো রূচি নেই তো নেই, আজ আবার কী মতলবে শাড়ী পরে উদয় হয়েছে? এই মেয়েকে দেখলে আমার পাপ হবে!”
জ্যুতি নিচু স্বরে বললো,
–“তাও মা, মেয়ে মানুষ! আর সারিমের…”
–“আমার নাতীর রূচি এত বাজে তা তো জানা ছিলো না। আমার বাড়ির মেয়েদের দেখেছো মাথায় ঘোমটা ছাড়া কোথাও বের হতে? সময় থাকতে বিদায় করো এই মেয়েকে, নয়তো আমাদের বাড়ির মেয়েরা এর ছায়াতলে পরলে সর্বনাশ হয়ে যাবে।”
বলেই “আস্তাগফিরুল্লাহ”, “নাউজুবিল্লাহ” পড়তে শুরু করলেন দাদী। জ্যুতি কিছুতেই বোঝাতে পারলো না শহুরে মেয়েদের চলাফেরার ধরণ। সব পরিবার তাদের মতো না, সেটাও বোঝাতে অক্ষম হলো।
—————-
মেহের নিচে নামলে দেখলো ইলিরা এখনো বসে আছে। বর্তমানে সামিরার সাথে খোশগল্পে মত্ত সে। মাহিম তাকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে কোথায় যেন চলে গেলো। ইদানীং সারিম তাকে দিয়ে আসে এবং আসার সময় মাহিম তাকে নিয়ে আসে। এভাবেই চলছে মেহেরের দিনকাল। সেদিনের পর অবশ্য অভির দেখা পায়নি মেহের। এখন ভুল করেও ভার্সিটিতে পা ফেলে না মেহের। সেদিনের পর তার দারুণ শিক্ষা হয়েছে।
ইলিরা তাকে দেখে মুচকি হেসে কাছে ডাকলো। মেহের ধীর পায়ে ইলিরার দিকেই এগোলো। প্রথমবারের মতো ইলিরাকে তার পছন্দ হচ্ছে না। কেন পছন্দ হচ্ছে না জানা নেই তবে সারিম এবং ইলিরাকে বারবার কল্পনায় গুলাচ্ছে সে। যা তার চিনচিন ব্যথা ক্রমশ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ইলিরা মেহেরের দিকে চেয়ে হেসেই বললো,
–“ছোট্ট মেহের বাবুটা কত বড়ো হয়ে গেছে তাই না সামিরা?”
সামিরা আলতো হেসে বলে,
–“সময় কার জন্যে বসে থাকে বলো, আপু? সময় গড়িয়েছে মেহেরও ধীরে ধীরে আঠারোতে পা দিলো।”
–“হ্যাঁ, ঠিক বলেছো।”
ইলিরা এবং সারিমের বয়সে তিন বছরের ডিফারেন্স। তাও এক বন্ধুর মাধ্যমে তাদের পরিচয় হয়। পরে কীভাবে বন্ধুত্ব হয়ে গেলো কেউ বুঝলো না।
জ্যুতি খেতে ডাকলে ওরা তিনজন একসাথেই লাঞ্চ করলো। ইদানীং শীত কিছুটা কমে এসেছে। শহরে এখন হাড় কাঁপানো শীতের ছোঁয়া নেই। তাই সেরকম শীত এবার অনুভব হয়নি। ইলিরা প্ল্যান করছে ভ্যালেন্টাইন নিয়ে। এদিকে মেহের বিধ্বস্ত সারিমকে নিয়ে ভেবে ভেবে।
ইলিরা যেন আজ পণ করেছে সারিমের সাথে মিট না করে সে ফিরবে না। এদিকে রাস্তায় সারিমের সাথে হুট করে মাহিমের দেখা হয়ে যায়। মাহিম সারিমকে দেখেই সাবধানতার সাথে বললো,
–“ভুল করেও এখন বাড়িতে যেও না ভাইয়া!”
সারিম ভ্রু কুচকে তাকালো মাহিমের দিকে। সারিমের চাহনি বুঝতে পেরে মাহিম আবার বললো,
–“ইলিরা আপু নাকি বাড়িতে এসেছে। তোমায় ইমপ্রেস করতে শাড়িও পরে এসেছে। মেহেরকে নাকি অলরেডি ননদ বানিয়ে ফেলেছে। এ কারণে বেচারীর প্রায় কাঁদা কাঁদা অবস্থা!”
সারিম বেশ চমকালো। হতভম্ব স্বরে আওড়ালো,
–“মেরুর কান্না আসবে কী করে?”
মাহিম গালে হাত গুঁজে কিছুক্ষণ ভাবনা চিন্তা করে বললো,
–“ওর ভেতরে তো মনে হচ্ছে তোমাকে নিয়ে কিছু চলছে। পড়তে বসলে লক্ষ্য করি তোমায় দিকে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে থাকে। কিন্তু… তোমার সাথে মেহেরের…”
মাহিম আঙুল তুলে একবার সারিমের দিকে তো একবার শূণ্যে ইশারা করে আবার আকাশ পাতাল ভাবনায় মত্ত রইলো। সারিমও কিছুক্ষণ ধ্যানে থাকার পর হঠাৎ-ই মিনমিন করে বলে ওঠে,
–“ইলিরা আমার বউ হতে চাইলে তোর এত ফাটছে কেন রে মেরু?”
–“কিছু বললে?”
সারিম চমকে চাইলো মাহিমের দিকে। পরমুহূর্তে হেসে দিয়ে বললো,
–“না কিছু না। তবে মনে হচ্ছে বাসায় যাওয়া উচিত!”
———————
প্রায় নয়দিন কেটে গেলো রোজার কোনো দেখা পায়নি সাইয়ান। সেদিন রোজার বলা কথাটার পর কেমন এক অদ্ভুত অনুভূতি, শূণ্যতা সাইয়ানকে গ্রাস করেছে। সে ঘুমাতে গেলে অস্থির অনুভব করে। আঁখিদ্বয়ে বারংবার রোজার মলিন মুখশ্রীটা ভেসে ওঠে। কানে পিয়ানোর মতো প্রতিনিয়ত বাজতে থাকে রোজার বলা কথাগুলো।
মাঝে দিয়ে একদিন তাকে বাইরের খাবার খেতে হয়েছিলো, এ নিয়ে অসুস্থতায় তাঁর দুটো দিন কেটে যায়। অফিস গেলেও দু’বেলা রোজার শূণ্য ডেস্কের দিকে তাকাতে সে ভুলে না। এই শূণ্যতায় সাইয়ানের অনুভব হয়, সে তার নিত্যদিনের অভ্যাসের গুরুত্বপূর্ণ কাউকে হারিয়ে ফেলেছে, যে তাকে তার একাকিত্বে সঙ্গ দিয়েছে, নিজ উদ্যোগে সাইয়ানের সবকিছুতে খেয়াল রেখেছে। এসবের চাইতেও বেশি বিষাক্ত হচ্ছে রোজার বলা শেষ কথাটা। সাইয়ান যেন মানতেই পারছে না রোজার বিয়ের কথাটা। রোজার বিয়ে মানে তো এই অদেখা রোজা অদেখাই থেকে যাবে। বিয়ের পরপর তার হাসবেন্ড তো কখনোই তাকে চাকরি করতে দিবে না। এছাড়া রোজা অন্যকারো হবে এটাই তার মাথা ব্যথা বাড়িয়ে তুলছে। বিবাহিত রোজার সাথে আগের মতো মিশতেও পারবে না সে। আচ্ছা, যদি রোজা কখনোই ফিরে না আসে?
হাতে কলম ঘুরাতে ঘুরাতে সাইয়ান আকাশ-পাতাল ভাবতে ব্যস্ত নিজ কেবিনে। এর মাঝে সাইয়ানের পার্সোনাল এসিস্ট্যান্ট এসে জানালো,
–“মিস রোজা এসেছে স্যার। তাকে কী ডেকে দিবো?”
~চলবে, ইন-শা-আল্লাহ্।
#বাসন্তীগন্ধা
|১১|
লাবিবা ওয়াহিদ
———————-
–“মিস রোজা এসেছে স্যার। তাকে কী ডেকে দিবো?”
সাইয়ান হেলান দেওয়া থেকে সোজা হয়ে বসলো। মেয়েটির দিকে চাইলো। চমকে গিয়ে বললো,
–“আর ইয়্যু শিওর?”
–“ইয়েস স্যার!”
এরকম এক খবর শুনে সাইয়ান কীরকম পতিক্রিয়া দেখাবে ঠাওর করতে পারলো না। সাইয়ান আলতো স্বরে বলে,
–“কেবিনে আসতে বলুন!”
–“ওকে স্যার।”
————————-
সারিমকে এই সময়ে বাড়িতে একদমই আশা করেনি মেহের। ইলিরা সারিমকে দেখে খুব খুশি হলো। যখন হাত উঠিয়ে সারিমকে হাই জানালো তখন মেহের নিজ হৃদয়ে তীর বিঁধে যাওয়ার মতো কষ্ট অনুভব করলো। কম্পিত হলো তাঁর অধর জোড়া। কারণ, ইলিরা যখন হাত উঠালো তখন তাঁর পাতলা শাড়িটা সরে গিয়ে পেট এবং কোমড়ের কিছু অংশ উম্মুক্ত হলো। যা দেখে মেহেরের মাথা ভনভন করছে। মিনমিন করে মেহের বললো,
–“সারিম ভাই, ইলিরা আপুর দিকে তাকাবেন না প্লিজ!”
মেহের সারিমের দিকে তাকালো। সারিম ইলিরার দিকে চেয়ে আছে। মেহের গভীর ভাবে লক্ষ্য করলো সারিমের চাহনি। একবার ইলিরার দিকে তাকিয়েও পরখ করে নিলো। নাহ, সারিম ইলিরার চেহারার দিকেই তাকিয়ে আছে। নিচের দিকে তাকায়নি। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। কিন্তু সেই স্বস্তি বেশিক্ষণ রইলো না। ইলিরা লম্বা লম্বা পায়ে সারিমের দিকে গিয়ে সারিমকে জড়িয়ে ধরলো। যা দেখে মেহেরের ভেতরে কালবৈশাখীর ঝড় হানা দিলো। শূণ্য চোখে চেয়ে রইলো ওদের দিকে।
সারিম অবশ্য ইলিরাকে জড়িয়ে ধরেনি। সে এক নজরে মেহেরের মুখ-ভঙ্গি বোঝার চেষ্টা করছে। মেহের হাতের তালুতে নখের আলতো আচড় কাটছে। সারিম ইলিরাকে নিজে থেকে ছাড়িয়ে বলে,
–“তুই কখন এলি?”
–“অনেকক্ষণ হলো। তোমায় কতবার কল করেছি জানো?”
ইলিরার হঠাৎ “তুই” সম্বোধন থেকে “তুমি” সম্বোধনটা কিছুটা অদ্ভুত লাগলো সারিমের। তাও সে নিজেকে সামলে বললো,
–“স্যরি, মিটিং এ ছিলাম!”
–“ইট’স ওকে। আসো আমরা কিছুক্ষণ আড্ডা দিই!”
মেহের চুপ করে সোফার এক কোণায় গিয়ে বসলো। সামিরার কল আসায় সে উপরে চলে গেলো। ইলিরা সারিমকে নিয়ে সোফায় বসতেই মেহের সারিমকে ধরে টান দিয়ে ইলিরার থেকে কিছুটা দূরত্বে বসিয়ে ধীর কন্ঠে বললো,
–“আপুর সাথে লেগে বসবেন না প্লিজ!”
সারিম মেহেরের দিকে চেয়ে ফিসফিস করে বললো,
–“কেন? কী হয়েছে?”
মেহের ভীষণ লজ্জা অনুভব করলো ইলিরার কথাটা বলার জন্যে। অনেক চেয়েও বলতে পারলো না। পরে নিজের এই অদ্ভুত অনুভূতির কাছে হার মেনে মেহের হঠাৎ উঠে দাঁড়ালো। ধৈর্যেরও একটক সীমা আছে। কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে সে উপরে চলে গেলো। অতঃপর দরজা বন্ধ করে বালিশে মুখ গুঁজে হুঁ হুঁ করে কেঁদে উঠলো। মিনিট পাঁচেক কাঁদার পর সে নিজেই হতভম্ভ। এভাবে কাঁদছে কেন মেহের? চট করে উঠে বসলো সে! এতদিন তো সে নিজেই চাইতো সারিমের একটা বউ হোক, যে মেহেরকে সারিমের বকাঝকা থেকে বাঁচাবে। কিন্তু মেহের হঠাৎ বিপরীতমুখী আচরণ করছে কেন? আবারও চোখের সামনে ভেসে উঠলো সারিম এবং ইলিরার জড়িয়ে ধরার দৃশ্য। আচ্ছা, আগেও তো তাঁরা মোটামুটি ক্লোজ ছিলো, তখন তো মেহেরের কষ্ট হয়নি। এখন তাহলে কেন কষ্ট পাচ্ছে? ইলিরা সারিমকে ভালোবাসে বলে? কিন্তু তাতে মেহেরের কী? মেহের কেন স্বাভাবিকভাবে নিতে পারছে না?
মেহের আবার ধপ করে শুয়ে পরলো। কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুমিয়েও গেলো। বিকালে দরজায় কড়াঘাত পরলে মেহেরের ঘুম ভেঙে যায়। এলোমেলো ভাবে উঠে বসে সে। চোখ কচলাতে কচলাতে উঠে গিয়ে দরজা খুলতেই দেখতে পেলো সামিরা দাঁড়িয়ে আছে। মেহের ঘুম কন্ঠে শুধালো,
–“বলো!”
–“সারিম ভাইয়া ঘুরতে নিয়ে যাবে। রেডি হয়ে নে দ্রুত!”
মেহের এতে সেরকম পতিক্রিয়া দেখালো না। সারিমের নাম শুনে আবারও সেই দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠলো। মেহের দায় সাড়া ভাব নিয়ে বলে,
–“তুমি যাও। আমি আসছি!”
বলেই সামিরার মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দিলো। দরজার সাথে পিঠ লেপ্টে দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকালো। বিকাল হয়ে সন্ধ্যা নামার সময় হয়েছে। এর মানে ইলিরা চলে গেছে৷ আর নিশ্চয়ই সারিম-ই ইলিরাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে এসেছে। মনঃক্ষুণ্ন হলো মেহেরের। সারিম আসার আগে ইলিরা তাকে এবং সামিরাকে বলেছিলো ইলিরা ইচ্ছাকৃত গাড়ি ছাড়া এসেছে। যাতে ইলিরা সারিমের সাথে বাড়ি যেতে পারে। এতে করে তারা আরও কিছুটা সময় টাইম স্পেন্ড করতে পারবে।
মেহের বিষণ্ণ মনে ওয়াশরুমে ঢুকলো। মনের মাঝে অভিমানের সাথে জেদেরও আলো দেখা গিয়েছে। মেহের একেবারে রেডি হয়ে রুম থেকে বের হলো। বের হতেই দেখলো মাহিম ঘর্মাক্ত হয়ে কোথাও থেকে ফিরছে। মাহিম মেহেরের এই বেশ দেখে কিছুটা ভ্রু কুচকালো। ভ্রু কুচকে বললো,
–“এই কালু আন্টি? কে তুমি? আমার বাড়িতে কী করছো?”
মেহের ধাম করে মাহিমের পিঠে একটা বসিয়ে দিলো। মাহিম আর্তনাদ করে পিঠে হাত বুলানোর চেষ্টা করতে করতে মিনমিন করে বললো,
–“জংলী!”
মেহের হেসে বলে,
–“এবার চিনেছিস?”
–“তোর সাহস তো কম না দেড় মিনিটের বড়ো ভাইয়ের গায়ে এভাবে হাত তুলিস! যখন আমি তোরে ধরবো না, তখন তোর হাল বেহাল করে ছাড়বো!”
মেহের তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলে,
–“এসব ঢং আমার সাথে দেখানো লাগবে না। এত ঘেমে কই থেকে আসছিস? মনে হচ্ছে জমিতে হাল চাষ করে এসেছিস!”
মুখটা গোমড়া করে ফেললো মাহিম। থমথমে সুরে বললো,
–“এমনিতেই আজ জম্মের খেলা খেলেছি, তার উপর এই বাড়িতে আসতে না আসতেই সারিম ভাইয়া হুকুম করলো ওই ইলিরা আপুকে বাড়িতে দিয়ে আসতে। এমতাবস্থায় আবার আপুকে বাড়ি দিয়ে এসে ফিরলাম।”
হঠাৎ মেহেরের চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে গেলো। এর মানে কী মাহিম ইলিরাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছে? সারিম ইলিরার সাথে যায়নি? খুশিতে মেহেরের চঞ্চল হতে ইচ্ছে করলো। চঞ্চলতার প্রমাণস্বরূপ জোরে চিৎকার দিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে চাইলো। কিন্তু পরক্ষণে নিজেকে সামলে মেহের মুচকি হেসে বললো,
–“তাহলে তুই বিশ্রাম কর!”
বলেই মেহের গুণগুণিয়ে গাইতে গাইতে মাহিমকে পাশ কাটিয়ে চলে গেলো। মেহের চলে যেতেই মাহিম মুচকি হেসে বললো,
–“ইলিরা আপুর খুব সমস্যা ছিলো আমার সাথে বাইকে বসার। এজন্য-ই তো আপু নিজেই টেক্সি ভাড়া করে চলে গেলো। মাহিম তুই তো বড়োই কুল!”
বলেই শিষ বাজিয়ে ভেতরে চলে গেলো। ইলিরার সমস্যা ছিলো মাহিম অতিরিক্ত ঘেমেছে বলে। ঘামের গন্ধে ইলিরার বমি আসে। এজন্যে বাড়ির বাইরে এসেই ইলিরা মাহিমকে বলেছিলো,
–“থ্যাঙ্কস মাহিম বাট আমি একাই যেতে পারবো!”
মাহিম হেসে বলে,
–“ইট’স ওকে আপু!”
———————–
–“মিস রোজা, আপনি তো দশ দিনের ছুটি নিয়েছিলেন। তাহলে নয় দিনের মাথায় চলে আসলেন যে?”
রোজা অধরে কৃত্রিম হাসি ঝুলিয়ে বলে,
–“এইতো স্যার, বাসায় বসে বোর হচ্ছিলাম তাই চলে এসেছি!”
–“ওহ। ভালো করেছেন। তা আপনার বিয়ে…”
রোজা হাসলো। হেসেই জবাব দিলো,
–“পাত্রপক্ষ দেখতে এসেছিলো। বয়স কিছুটা বেশি বলে রিজেক্টেড!”
সাইয়ান ভারি অবাক হলো রোজার কথা শুনে। বয়স বেশি বলতে কী বুঝালো রোজা? রোজার কোয়ালিফিকেশন অনুযায়ী বয়স হয়তো চব্বিশ, পঁচিশের কোঠায় হবে। সাইয়ান বললো,
–“এত বেশিও বয়স হয়নি আপনার রোজা!”
–“সাধারণ ঘরে বয়স বিশ মানে মেয়ে বুড়ি!”
তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়েই বললো রোজা।
সাইয়ান আবার জিজ্ঞেস করলো,
–“তা বিয়ের করার পরিকল্পনা নেই আপনার?”
রোজা সাইয়ানের চোখ-মুখ গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করে আলতো হেসে বললো,
–“আমার জন্যে আমার পরিবার আগে স্যার। রঙিন দুনিয়ায় পা দিলেই কী তাদের পেটে দানা পরবে স্যার? আমিই আমার পরিবারের একমাত্র সম্বল!”
–“তাহলে পাত্রপক্ষ?”
–“মায়ের কঠোর জেদের কাছে হার মেনে রাজি হয়েছিলাম। মা চায় আমি সংসারী হই।”
–“মায়ের এমন ভাবাটা স্বাভাবিক। আপনি মেয়ে মানুষ, আপনার পুরুষ নামক এক ছায়ার প্রয়োজন। নয়তো এই সমাজের কিছু জ্ঞানহীন, নিচু মানসিকতার মানুষ আপনাকে খুবলে খাবে!”
রোজা কিছুক্ষণ চুপ থেকে থমথমে সুরে বললো,
–“অনেকটা সেরকম-ই বলতে পারেন!”
আবার থমকালো সাইয়ান। অবাক সুরে বললো,
–“মানেহ?”
রোজা ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেললো। নিজের আবেগ, অস্থিরতাকে সন্তর্পণে সামলে নিয়ে ম্লান হেসে বলে,
–“আমার উপর আমার সৎ ভাইয়ের কুনজর পরেছে স্যার। আজ থেকে নয়, এই ক্ষত আমি অনেকদিন ধরে সহ্য করছি!”
—————
~চলবে, ইন-শা-আল্লাহ্।