#বাসন্তীগন্ধা
|১৪|
লাবিবা ওয়াহিদ
———————–
–“আপনি কী আমায় দয়া দেখিয়ে বিয়ে করেছেন স্যার?”
সাইয়ান চোখ তুলে চাইলো রোজার দিকে। শীতল গলায় শুধালো,
–“এটা অফিস নয়, আমিও আপনার স্যার নই। আমাদের দুজনের সম্পর্কের এক আলাদা নাম হয়েছে, যার জন্য এই মুহূর্তে আপনি আমার রুমে অবস্থান করছেন!”
রোজা ঠোঁটে ঠোঁট চেপে রইলো কিছুক্ষণ। অতঃপর বললো,
–“আমার প্রশ্নের উত্তর এটা ছিলো না।”
সাইয়ান রোজার প্রশ্নকে অগ্রাহ্য করে বললো,
–“এটা প্রশ্নের কাতারেই পরে না!”
–“তাহলে কী আমাকে ভালোবেসে বিয়ে করেছেন?”
–“আমি ক্লান্ত। শুয়ে পরুন!”
বলেই রোজাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে লাইট নিভিয়ে বিছানার একপাশে শুয়ে পরলো। রোজা তপ্তশ্বাস ফেলে নিজেও আস্তে-ধীরে শুয়ে পরলো। বুকের মধ্যে ধুকপুক শব্দ হচ্ছে। সাইয়ানের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো। সাইয়ান ওপাশ ফিরে শুয়ে আছে। রোজাও এপাশ ফিরে শুয়ে রইলো। চোখে একদমই ঘুম নেই তাঁর। আজকে তাঁর বিয়ে হয়েছে এবং আজ তাঁর বাসর রাত। বিশ্বাস-ই হচ্ছে না রোজার। বিয়েটা যেই পরিস্থিতিতেই হোক না কেন, সাইয়ানের সাথেই তো বিয়েটা হয়েছে তাই না? রোজা তো মনে-প্রাণে তাই চেয়েছিলো। কিন্তু এরকমটা তো চায়নি। হঠাৎ চোখের সামনে ভেসে ওঠে সকালের সেই ঘটনাগুলো।
সকালে রোজা যখন বাজার করে ফিরবে তখনই রোজার পথ আটকে দাঁড়ায় রোজার সৎ ভাই রোবেল। সি*রেট ফুঁকতে ফুঁকতে বিশ্রী নজরে চেয়ে আছে রোজার দিকে। রোজা দুই ধাপ পিছিয়ে যায় রোবেলকে দেখে। রোজা গলায় কিছুটা কাঠিন্য এনে বললো,
–“পথ কেন আটকালেন? সরে দাঁড়ান!”
রোবেল বিশ্রী হাসি দিয়ে বলে,
–“সরে যেতে তো আসিনি রোজা বাবু। তোমায় বিয়ে করতে এসেছি!”
আত্মা কেঁপে ওঠে রোজার। ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে পিছে ফিরে যেই পালাতে নিবে ওমনি কারো সাথে ধাক্কা খেলো। পিছে দাঁড়িয়ে আছে স্বয়ং রোজার বাবা। বাবাকে দেখে আঁতকে ওঠে রোজা। অস্ফুট স্বরে বলে ওঠে,
–“বাবা তুমি!”
রোজার বাবা ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেললো। ছেলের দিকে একপলক তাকিয়ে বলে,
–“বিয়ে করতে রাজি হয়ে যা রোজা। বিয়ের পর তুই আমার কাছেই থাকবি, তোকে দূরে কোথাও যেতে হবে না।”
ঘেণ্ণায় গা ঘিনঘিন করতে উঠলো রোজার। রোজা বলে ওঠে,
–“এরকম ঘৃণ্য কথা কী করে উচ্চারণ করছো বাবা? লজ্জা করলো না?”
পেছন থেকে রোবেল রোজা হাত টেনে ধরলে। চোখ রাঙিয়ে রোজার দিকে তাকিয়ে বললো,
–“তোরে আমার চাই-ই চাই রোজা। কোনো নিয়ম-নীতির কথা শুনাতে আসবি না। তোরে আমি ভালোবাসি!”
রোজা রোবেলের হাত থেকে নিজেকে ছাড়াতে ছাড়াতে বেশ রেগে বললো,
–“তুই কোনো মানুষের কাতারেই পরিস না। মনে রাখিস তোর মা আমার বাপের আরেক বউ। তাই তোর সাথে বিয়ে কোনোদিনও সম্ভব না। তুই আমার সৎ ভাই না হয়ে নরমাল পরিচয় হলেও তোরে আমি বিয়ে করব না। কারণ তুই কোনোদিন মেয়েদের সম্মান দিতে শিখিসনি। সম্মান দিতে শিখলে কখনোই নিজের বোনের দিকে কুনজর দিতি না জা***!”
রোজার এইরকম আচরণ দেখে রোজার বাবা ভয়ানক রেগে গেলেন। উচ্চস্বরে চেঁচালেন,”রোজা!”
রোবেল রেগে মেগে যেই রোজাকে চড় দিতে যাবে ওমনি সাইয়ান এসে রোবেলের হাত ধরে ফেলে। রোবেল ঘাড় বাঁকিয়ে তাকায় সাইয়ানের দিকে। রোবেল এবার চেঁচিয়ে বলবো,
–“এই শা* তুই কে? আমাদের মধ্যে আসবি না!”
সাইয়ান রোবেলকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো। রোজাকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে বেশ রেগে বললো,
–“রোজার থেকে দূরে থাক!”
–“আমার মেয়ের থেকে দূরে থাকতে বলার তুমি কে ছেলে?”
সাইয়ান রোজার বাবার দিকে তাকালো। তাচ্ছিল্যের সুরে বললো,
–“বাবা? বাবার দায়িত্ব মেয়ের ঢাল হয়ে পাশে থাকা, সেখানে আপনি মেয়ের তামাশা হতে দেখছেন। ভারী সুন্দর ব্যাপার তো!”
রোবেল উচ্চস্বরে চেঁচিয়ে বললো,
–“তুই নিজের চরকায় তেল দে। আমার বউরে ছাড়! ওয় আমার হবু বউ!”
–“সাহস থাকলে আমার সামনে থেকে নিয়ে যা! আমি অলরেডি পুলিশকে ইনফর্ম করে দিয়েছি!”
রোবেল সাইয়ানকে রেগে মা*তে যাবে ওমনি রোজার বাবা গম্ভীর হয়ে রোবেলের কাঁধ ধরে আটকে বললো,
–“এভাবে রাজি হবে না। আমরা অন্য পদ্ধতি অবলম্বন করবো!”
রোজা ভয়ে সাইয়ানের গায়ের টি-শার্ট খামচে ধরলো। রোবেল চোখ গরম করে রোজার দিকে চেয়ে বললো,
–“তুই আমার হাত থেকে ছাড় পাবি না রোজা। তোরে আমি যেকোনো মূল্যেই হোক বিয়ে করমুই। সুযোগ পেলেই তোকে আমি উঠিয়ে নিয়ে যাবো!”
বলেই রোজার বাবার সাথে রোবেল চলে গেলো। সেই ঘটনার মুখোমুখি হয়ে রোজার মানসিক অবস্থা হঠাৎ খারাপ হতে শুরু করলো। সাইয়ান রোজাকে সামলানোর জন্যে বারংবার চেষ্টা করছিলো কিন্তু রোজা বিরবির করে বলছিলো,
–“আমি ওকে বিয়ে করবো না। ও বাজে, আমার জীবন তছনছ করে দিয়েছে। আমি ওর স্পর্শ সহ্য করতে পারি না। আমি আপনাকে ভালোবাসি স্যার। প্লিজ আপনি আমাকে ছেড়ে যাবেন না। আমি আপনাকে বিয়ে করে আপনার কাছেই থাকতে চাই। আপনি আমাকে ছেড়ে দিবেন না প্লিজ স্যার।”
রোজার মুখে এই ধরণের কথা শুনে সাইয়ানের সর্বাঙ্গ জুড়ে শিহরণ বয়ে গেলো। রোজা তাকে ভালোবাসে, তাকে বিয়ে করতে চায় তা ভীষণ অবিশ্বাস্য লাগলো সাইয়ানের। তাঁর চেয়েও বড়ো কথা রোজা মানসিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পরছে। এমতাবস্থায় তাকে কোনো খারাপ হাতে তুলে দিতে পারবে না সে।
এছাড়াও রোজার কথাগুলো সাইয়ানের মন পালটে গিয়েছিলো। যার জন্যে সেই মুহূর্তে সাইয়ান তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড়ো সিদ্ধান্ত করে বসে। বিয়ে করে ফেলে রোজাকে। রোজা তো সাইয়ানের এই পদক্ষেপে হতবাক হয়ে যায়। বিয়ের কাজ সম্পন্ন হয়ে বাসায় ফিরার ঘন্টাখানেকের মাঝে সাইয়ানের ফুপি এসে হাজির হয়। সাইয়ানের রুমে সাইয়ান এবং রোজা পাশাপাশি বসে ছিলো।
সেই দৃশ্য ফুপি দেখে ফেললে তার মনে সন্দেহের বীজ দানা বাঁধে। সাইয়ান যখন বললো রোজা তাঁর বউ এবং তাঁরা বিয়ে করেছে, তখনই সেই মুহূর্তে ফুপি সাইয়ানকে শাসিয়েছে। ঘন্টাখানেক শাসানোর পর ওই এক কাপড়েই সাইয়ানের কান ধরে টেনে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়।
———————–
ঘুম ভাঙতেই পিটপিট করে চাইলো সাইয়ান। চোখ কচলে পাশে তাকাতেই দেখলো রোজা আড়মোড়া ভেঙে উম্মুক্ত চুলে খোঁপ করছে৷ এই দৃশ্যটি সাইয়ানের চোখ জুড়িয়ে যাওয়ার মতো লাগলো। ড্যাবড্যাব করে চেয়ে রইলো রোজার দিকে। রোজা চুল খোঁপা করে পিছে ফিরে আরেক পলক ঘুমন্ত সাইয়ানকে দেখতে পিছে ঘুরে চাইতে চমকে গেলো।
সাইয়ান এক নজরে তাঁর দিকেই তাকিয়ে আছে। এতে রোজা কিছুটা লজ্জা পেলো। চোখ নামিয়ে সরে আসতে নিতেই শাড়ির আঁচলে টান পরলো। রোজা পিছে ফিরে তাকাতেই দেখলো সাইয়ানের নিচে তাঁর আঁচলটি। সাইয়ানেরও ততক্ষণে ধ্যান ভাঙে। সে বিষয়টি লক্ষ্য করতেই অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে উঠে বসে। রোজা তৎক্ষণাৎ তড়িঘড়ি করে ওয়াশরুমে ঢুকে পরলো। সাইয়ানও বিছানা থেকে নেমে দাঁড়িয়ে বিছানা গুছিয়ে নেয়। অতঃপর রুম থেকে বেরিয়ে গিয়ে সারিমের রুমের দরজায় নক করে।
সারিম দরজা খুলতেই সাইয়ান সারিমকে সরিয়ে দিয়ে সারিমের রুমে ঢুকে পরলো। অতঃপর সারিমের কোনো কথার উত্তর না দিয়েই সারিমের ওয়াশরুমে ঢুকে পরলো। সারিম চেঁচালো সাইয়ানের উদ্দেশ্যে।
–“রাতে ওয়াশরুম ইউজ করেছো ইট’স ওকে। এখন ইউজ করার মানে কী ভাইয়া?”
ওয়াশরুমের ভেতর থেকে পানির শব্দ ছাড়া আর কিছুই শুনতে পেলো না সারিম। ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে সেও রুম থেকে বেরিয়ে যায়। মেহেরের রুমে উঁকি দিতেই দেখলো মেহের বিছানায় বসে আড়মোড়া ভাঙছে। সারিম তখনই মেহেরের রুমে প্রবেশ করে ওয়াশরুমে ঢুকলো। মেহের হতবুদ্ধি হারিয়ে ওয়াশরুমের দিকে তাকিয়ে রইলো। ধ্যান ভাঙতেই মেহের চেঁচিয়ে বললো,
–“এটা কী হলো সারিম ভাই? আপনি নিজের রুমের ওয়াশরুম ছেড়ে আমার রুমেরটাতে কেন ঢুকেছেন? আর কারো রুম ছিলো না? আমার তো ফ্রেশ হতে হবে!”
সারিম কোনো সাড়া দিলো না। মেহের দাঁতে দাঁত চেপে উঠে দাঁড়ালো। এমন সময়ই রুমে প্রবেশ করলো জ্যুতি। হাতে তাঁর শাড়ী। মেহেরের হাতে সেই শাড়ী ধরিয়ে দিয়ে বললো,
–“রোজার তো পরণের জামা-কাপড় নেই। তাই তুই বরং এই শাড়িটা দিয়ে আয়।”
বলেই মেহেরকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে জ্যুতি চলে গেল। মেহের একবার ওয়াশরুমের দিকে চেয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো। বিরবির করে বলতে লাগলো,
–“মাহিমের রুমের ওয়াশরুম ছেড়ে কেন যে বারবার সারিম ভাই আমার ওয়াশরুম ইউজ করে, ধুর!”
সাইয়ানের রুমে পৌঁছেই দেখলো সাইয়ান রুমে নেই। ওয়াশরুম থেকে পানির শব্দ আসছে। মেহের চুপ করে বিছানায় গিয়ে বসলো। ওয়াশরুমে কে আছে তা জানতে উচ্চস্বরে বললো,
–“ওয়াশরুমে কী ভাবী আছো?”
রোজা সম্মতি জানালো। মেহের এবার উঠে গিয়ে রুমের দরজা লাগিয়ে দিয়ে বললো,
–“বাহিরে আসতে পারো ভাবী, আমি শাড়ি এনেছি।”
রোজা দরজা ফাঁক করে শাড়িটা দেখার চেষ্টা করলো। শাড়িটা দেখতে পেতেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। রোজাকে রেডি করিয়ে মেহের বললো,
–“থাকো, আমি সামিরা আপুর ওয়াশরুমে ফ্রেশ হতে যাই। আমার রুমের ওয়াশরুম আরেকজনের দখলে!”
মেহের চলে যেতে নিলে রোজা পিছু ডাক দিলো। বললো,
–“আমাদের ওয়াশরুম ইউজ করতে পারো!”
মেহের হেসে পিছে ফিরে বলে,
–“নাহ, ওটা তোমার এবং সাইয়ান ভাইয়া ব্যক্তিগত ওয়াশরুম। তাই তোমাদের-ই থাক!”
———————–
~চলবে, ইন-শা-আল্লাহ্।
#বাসন্তীগন্ধা
|১৫|
লাবিবা ওয়াহিদ
———————–
বেলা এগারোটার মাঝেই রোজার সকল জরুরি জিনিসপত্র এবং রোজার মা, ভাই পৌঁছালো সাইয়ানদের বাড়িতে। আজ সারিম এবং সোহেল সাহেব অফিস যায়নি। মেহের’রাও আজকে কলেজ যায়নি। সামিরাও বাড়িতে। রোজার মা নিজেও বিশ্বাস করতে পারছে না তাঁর মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে।
যেই মেয়ের বিয়ের প্রতি অনীহা ছিলো সেই মেয়ে কী করে পারলো না জানিয়ে বিয়ে করতে? এরকম নানান প্রশ্ন তাকে বিরক্ত করলেও যখন প্রাক্তন স্বামীর সম্পর্কে শুনলো, তখন রোজার মা বাকরুদ্ধ হয়ে গেলো। তার উপর এত বড়োলোক মেয়ে জামাই, বিষয়টা বদহজম হচ্ছে তাঁর।
রোকসানা তো ফজর থেকেই মুখ গোমড়া করে বসে আছেন। তাঁর ঘুমের মাঝে এতকিছু ঘটে গেলো আর তিনি কী না জানতে পারলেন ফজরের সময়? তাঁর বড়ো নাতি বিয়ে করে বউ নিয়ে এসেছে। ভাবা যায়? নাস্তার সময় রোজাকে তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে ভুলেনি।
মাহিম রোকসানাকে লক্ষ্য করে তাঁর কানে ফিসফিস করে বলেছিলো,
–“ভাবী অনেক সুন্দরী, ঠিক তোমার মতো!”
মাহিমের প্রসংশা শুনে রোকসানা বেগম কিছুটা গলেছিলো। তবে রোজার সাথে তিনি একটা কথাও বলেনি। আইয়ুব সাহেব মুখ গম্ভীর করে খেয়ে লিভিংরুমে চলে যায়। সোহেলও তাঁর পিছে চলে যায়। ওরা যেতেই রোকসানা গলা খাঁকারি দিয়ে সাইয়ানের উদ্দেশ্যে বলে অভিমানী কন্ঠে বলে ওঠে,
–“আগে তো খুব গীত গেয়ে বলতা আমারে ছাড়া বিয়ে করবা না। এখন তুমি বিয়ে করার পর বুঝলাম তোমার ওই কথা মুখের ছিলো নাকি মনের!”
সাইয়ান খাওয়া বন্ধ করে রোকসানার দিকে মায়াভরা চোখে চেয়ে বললো,
–“স্যরি দাদী। তবে বিশ্বাস করো, বিয়ের আগে তোমার কথা খুব মনে পরেছিলো। তোমার দোয়া ছাড়া দম্পত্তি জীবন শুরু করতে কেমন বেরঙিন লাগছিলো!”
–“থাক। আর মন রাখার কথা বলতে হবে না!”
–“এটা তুমি বলতে পারলে দাদী? আমি মন রাখার কথা কখনো বলেছি?”
মেহের সাইয়ানের কথায় ফোড়ন কেটে বললো,
–“সেটাই তো দাদী। আমার হিরো ভাইয়া কখনো মন রাখার কথা বলতেই পারে না। দেখো না, কীভাবে আমার আবদার পূরণ করে আর সারিম ভাইয়ের ধমকের থেকে আমাকে বাঁচায়!”
বলেই মেহের আড়চোখে সারিমের দিকে চাইলে দেখলো সারিম চিবুতে চিবুতে গরম চোখে মেহেরের দিকে তাকিয়ে আছে। মেহের তৎক্ষনাৎ নজর ঘুরিয়ে ফেললো। এরকম খেতে খেতে নানান কথা চললো, যা রোজা ভীষণ উপভোগ করলো।
রোজার মা রোজার পাশে বসে আছে। রাতুল মাহিমের সাথে বাগানে ঘুরতে বেরিয়েছে। রাতুল মাহিমের থেকে এক বছরের ছোট হলেও তাদের মধ্যে ভালোই জমে ওঠেছে। বাড়ির বড়ো’রা সকলে একসাথে বসেছে আলোচনা সভায়। আইয়ুব সাহেব বেশ কিছুক্ষণ চুপ থাকার পরপর বলে,
–“যাক, ছেলে-মেয়ে একে অপরকে পছন্দ করতো বিধায় তাঁরা বিয়ে করে ফেলেছে। সেটা একটু মেনে নেওয়া জটিল হলেও আপনাদের মেয়েকে আমাদের ভীষণ পছন্দ হয়েছে। আশা রাখছি বাড়ির বড়ো বউ হিসেবে চাপ না নিয়ে সকলকে ভালোবেসে দিন কাটাবে। এখন আত্নীয়-স্বজন, পরিচিত অনেকেই বিয়ের কথা জানে না। তাই আমি চাইছি একটা বড়ো রিসিপশনাল অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ওদের বিয়েটার কথা জানিয়ে দিই। এখন তোমার মতামত কী বেয়াইন সাহেবা?”
রোজার মা ভীষণ মুগ্ধ হলো মেয়ের শ্বশুরবাড়ির বিনয়ী ব্যবহার দেখে। তিনি হাসি-মাখা মুখে বললেন,
–“আমার আর আপত্তি কোথায়? তবে আমার অনুরোধ, আপনারা যেই অনুষ্ঠান করবেন সেখানে আমিও কিছু খরচ দিবো!”
সোহেল সাহেব নড়েচড়ে বসে বললো,
–“এটা কী বলছেন বেয়াইন? আপনার থেকে খরচ নিবো কেন? দয়া করে এসব বলে লজ্জা দিবেন না। আলাহ্’র রহমতে আমাদের ভালোই সামর্থ্য আছে!”
রোজার মা হেসে বলে,
–“তা কী করে হয় বলুন? আমারও তো কত স্বপ্ন, মেয়ের বিয়ের সকল খরচ আমি বহন করবো। হাতে হাতে কাজ করবো, দয়া করে একা অনুষ্ঠানের খরচ করবেন না! আমাকেও সুযোগ দিন!”
আইয়ুব সাহেবের সোফার পেছনে দাঁড়ানো সাইয়ান এবার মুখ খুললো,
–“বিয়েটা হয়ে গেছে আন্টি। নিয়ম মোতাবেক রিসিপশনের খরচ আমরাই বহন করবো। আর আপনি অলরেডি এক অমূল্য সম্পদ আমাদের উপহার দিয়েছেন। এ-ই বা কম কিসের? আর আপনি-ই বলুন, এরকম রত্ন টাকা দিয়ে কেনা যায়? আমি ভাগ্যবান বিধায় উপরওয়ালা আমায় আপনার মেয়েকে দিয়েছে।”
রোজা মুগ্ধ হয়ে চাইলো সাইয়ানের দিকে। সাইয়ান তাকে এতটা মূল্য দিবে সেটা রোজা কখনো কল্পনাও করতে পারেনি। মানুষটার হৃদয় কতটা স্বচ্ছ হলে এত সুন্দর কথাগুলো বলতে পারে? অথচ রোজা প্রতিনিয়ত এই মানুষটির সাথে নিজেকে তুচ্ছ ভেবে এসেছে। রোজা অনুতপ্ত হলো নিজের ভাবনায়। নতুন রূপে প্রেমে পরলো তাঁর স্বামী নামক ব্যক্তিটির।
অবশেষে সকলে মিলে সিদ্ধান্ত নিলো আগামী মাসে মেহেরের নির্বাচনী পরীক্ষার পরপরই রিসিপশন রাখবে। এতদিন পর্যন্ত রোজা তাদের বাড়িতেই থাকুক। রোজার মা সম্মতি জানায় তাদের সিদ্ধান্তে। অতঃপর রোজার মা পরিবারের সকলের সাথে ভাব বিনিময় করে, পরিচিত হয়। জ্যুতির সাথে সে ভালোভাবেই মিশে যায়।
রাতুল, মাহিম এবং মেহের একসাথে বাগানের এক কোণে দাঁড়িয়ে। মাহিমের হাত রাতুলের কাঁধে। মাহিম রাতুলের উদ্দেশ্যে বললো,
–“কী বলছো রাতুল? তুমি কখনো প্রেম করোনি? এটা আমাকে বিশ্বাস করতে হবে?”
পাশ থেকে মেহের তাচ্ছিল্যের সুরে বলে,
–“হ্যাঁ, তাইতো। সব তো তোর ক্যারেক্টারের হবে না ভাই! তোমার কত রেকর্ড!”
মেহেরের এহেম কথায় মাহিম চোখ রাঙালো। পরমুহূর্তে হেসে মেহেরকে পচানোর উদ্দেশ্যে বলতে শুরু করে,
–“জানো রাতুল! আমি মেহেরের দেড় মিনিটের বড়ো ভাই হওয়া সত্ত্বেও আমাকে সম্মান দেয় না। উলটো গলাবাজি করে সারাক্ষণ! কেমন চিপ মেয়ে!”
মেহের রেগে মাহিমের পায়ে পারা দিয়ে হাসি-মুখে বললো,
–“ভাই আমার। তোমার রেকর্ডের কথা আমার মুখ থেকে বের করতে বাধ্য করো না। কারণ, মুখের কথা একবার উচ্চারিত হয়ে গেলে তা ফিরিয়ে নেওয়া মুশকিল!”
রাতুল উৎসাহিত হয়ে বললো,
–“এমন কী কথা মেহের আপু?”
–“প্লিজ রাতুল আপু বলো না। আমরা অনলি এক বছরের বড়ো-ছোট। বেশি এজ ডিফারেন্স না!”
–“শিখ শিখ! এই হচ্ছে সম্মান, যা তুই আমাকে দিতে শিখিসনি?”
মেহের মাহিমকে চিমটি কেটে বলে,
–“তুই থামবি নাকি মুখ খুলবো?”
এর মাঝেই মেহেরের পিছুডাক পরলো। এই কন্ঠস্বর মেহেরের অপরিচিত নয়। ভীষণ চেনা। মএহের পিছে ফিরে তাকাতেই সারিম বললো,
–“আমার জন্যে কড়া চা করে আন। জলদি!”
বলেই সারিম হনহন করে চলে গেলো। সারিমের যাওয়ার দিকে চেয়ে গতকালকের সারিমকে মনে করলো মেহের। কী ভয়া!নক। ভাবতেই গা জুড়ে শিহরণ বয়ে যায়! রাতুল বেশ উৎসাহিত হয়ে বলে,
–“তুমি ভালো চা করতে জানো বুঝি?”
মেহের অধর জোড়া প্রসারিত করে বলে,
–“শিখেছি। বলা বাহুল্য শিখতে বাধ্য হয়েছি!”
–“শিখলেও এর চায়ের টেস্ট পুরোই বিশ্রী! যেন কেউ মাছের রক্ত ঢেলে দিছে। এত গন্ধ!”
মেহের মাহিমের চুল টেনে দিলে মাহিমও মেহেরের চুল টেনে দিলো। মেহের চোখ রাঙিয়ে বলে,
–“অ!সভ্য।”
–“তুই!”
———————-
সারাদিন দুজন দুজনের সম্মুখীন না হলেও রাতে দুজন নিজেদের রুমে মুখোমুখি ছিলো। এছাড়া আর তো কোনো উপায় ছিলো না। একজন লজ্জায় মুখ ঢেকেছে আরেকজন কাজের বাহানায় ব্যস্ত থেকেছে।
রোজা মুখ ঘুরিয়ে বিছানার এক কোণে বসে আঙুলে আঁচল নিয়ে খেলা করছে আর সাইয়ান বিছানার অপরপ্রান্তে বসে আছে। কেউ-ই কারো সাথে কথা বলতে পারছে না। কই, বিয়ের আগে তো এত বিব্রতবোধ ছিলো না।
তাহলে বিয়ের পরপর কেন মাঝে দিয়ে এই অদৃশ্য দেয়াল এলো? সাইয়ান নীরবতা ভেঙে বললো,
–“তোমার যদি অসুবিধা হয় তাহলে শাড়ি পরে থাকার দরকার নেই?”
রোজা আলতো স্বরে বললো,
–“আমার সমস্যা হচ্ছে না। আমি উপভোগ করি!”
সাইয়ান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বিব্রত স্বরে বলে,
–“শাড়িতে তোমায় সুন্দর দেখায়!”
মুহূর্তে-ই রোজার গাল জোড়া রক্তিম বর্ণ ধারণ করে। লাজুক স্বরে বলে, “ধন্যবাদ!”
–“ঘুমাবে না?”
রোজা বিনা-বাক্যে শুয়ে পরলো। সাইয়ানও লাইট নিভিয়ে দিয়ে আস্তে-ধীরে শুয়ে পরলো। পুরো ঘর মুহূর্তে-ই নিস্তব্ধ, ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে গেলো। কারো মুখে কোনো কথা নেই।
কারো চোখে ঘুমও নেই। সাইয়ান শূণ্য চোখে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে বললো,
–“তুমি কী আমার থেকে দূরে সরে থাকছো কেন?”
রোজা আমতা আমতা করে বললো,
–“কেন দূরে থাকতে যাবো?”
–“সেটাই তোমার কাছে প্রশ্ন। বিয়েটা কী মানতে পারছো না?”
হৃদয়টা হুঁ হুঁ করে ওঠে রোজার। তাও নিজেকে সামলে বললো,
–“তা কেন মনে হলো আপনার?”
সাইয়ান কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললো,
–“না, তেমন কিছু না। ঘুমিয়ে পরো। শুভ রাত্রি!”
———————–
~চলবে, ইন-শা-আল্লাহ্।