বাসন্তীগন্ধা পর্ব-১৬+১৭

0
412

#বাসন্তীগন্ধা
|১৬| [কপি সম্পূর্ণ নিষেধ]
লাবিবা ওয়াহিদ

—————————–
প্রতিদিনের মতোই সকলে একসাথে ব্রেকফাস্ট করতে বসলো। গতকাল দুপুরের খাবার সেরেই রোজার মা এবং ভাই চট্টগ্রামে চলে গেছে। সারিম এবং মেহের পাশাপাশি বসে খাচ্ছে। সারিম কিছুক্ষণ পরপর এটা সেটা এগিয়ে দিচ্ছে মেহেরকে। যা মেহেরের খুব ভালো লাগছে। নতুন অনুভূতি হৃদয়ে জম্মালে বুঝি নিত্যদিনকার অভ্যাসও নতুন মনে হয়? সাইয়ান খেতে খেতে সারিমের দিকে তাকালো। কিছুক্ষণ আগেই আইয়ুব সাহেব এবং সোহেল সাহেব খেয়ে উঠে পরেছেন। বর্তমানে তাদের মা রোকসানার সাথে হলরুমে বসেছে। সাইয়ান খাবার মুখে পুরে সারিমের উদ্দেশ্যে বললো,
–“তোর ওই বান্ধুবীটা কী করে যেন আমার বিয়ের খবর জেনে গেছে!”

সারিম খাওয়া বন্ধ করে সাইয়ানের দিকে তাকালো। ভ্রু কুচকে বললো,
–“কোন বান্ধুবী?”

–“ইলিরা!”

“ইলিরা”-র নাম শুনে মেহেরের খাবার গলায় আটকে গেলো। যার ফলে হেঁচকি উঠলে দ্রুত সামনে থাকা পানির গ্লাসটি হাতে নিয়ে ঢকঢক করে খেয়ে নিলো। জ্যুতি এদিক দিয়েই যাচ্ছিলেন। মেয়ের কান্ডে তিনি কঠিন গলায় বললেন,
–” এত বড়ো হয়েছিস তাও তোর স্বভাব বদলালো না মেহের! খাওয়ার মাঝে অন্যদিকে ধ্যান দিস কেন? তোকে নিয়ে আর পারা গেলো না!”

মেহেরকে বকতে বকতেই তিনি হলরুমে চলে গেলেন। মেহের মুখটা ছোট করে বসে রইলো। মেহেরের পাশে বসা রোজা মেহেরের গাল টেনে বলে,
–“মায়েদের কথায় অভিকান করতে নেই। সন্তানের জন্যে মায়ের চিন্তা সবার থেকে ভিন্ন এবং বেশি হয়!”

রোজার কথায় মেহের ম্লান হাসলো। সারিম এবার সাইয়ানকে প্রশ্ন করলো,
–“তাতে কী হয়েছে?”

–“তোকে বিয়ে করতে চায় তোর ওই বান্ধুবী। এতদিন কল কর, করে কান খেয়েছে আমার বিয়ের জন্যে। যাতে তোর লাইন ক্লিয়ার হয়ে যায়। মেয়েটার নাকি বাসা থেকে বিয়ের চাল দিচ্ছে। কী মনে হচ্ছে, করবি নাকি বিয়ে?”

সাইয়ানের কথা শুনে মেহেরের ভেতরটা দুমড়ে – মুচড়ে গেলো। হৃদয় ভেঙে চৌচির হয়ে গেলো মুহূর্তে-ই। গলায় আটকে থাকা কান্নার দলাকে দমিয়ে রইলো মেহের। সারিমের কোনোরূপ উত্তর না শুনে মেহের হঠাৎ উঠে দাঁড়ালো। শব্দ করে উঠে দাঁড়ানোর ফলে সকলেই অবাক নয়নে চেয়ে রইলো মেহেরের দিকে। মেহের কোনো রকমে নিজেকে সামলে মাহিমের উদ্দেশ্যে বললো,
–“কলেজের জন্যে দেরী হয়ে যাচ্ছে মাহিম। চল!”

মাহিম খাওয়া ভুলে বিস্ময়ভরা চাহনিতে চেয়ে আছে মেহেরের দিকে। সারিম মুখ খুলে মেহেরকে কিছু বলার প্রস্তুতি নিলো। কিন্তু মেহের সারিমকে কোনরকম সুযোগ না দিয়ে হতভম্ভ মাহিমের হাত ধরে টেনে উঠিয়ে দাঁড় করালো। অতঃপর কারো দিকে ফিরে না তাকিয়ে হনহন করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো। সাইয়ান মেহেরের যাওয়ার দিকে অবাক নয়নে চেয়ে বললো,

–“ব্যাপারটা কী হলো? কিছুক্ষণ আগেও ঠিক ছিলো। এখন হঠাৎ কী এমন হলো যে এভাবে হনহনিয়ে চলে গেলো? আশ্চর্য!”

রোজাও সাইয়ানের কথা গুলো মনোযোগ দিয়ে ভাবলো। অতঃপর কী মনে করে একপলক সারিমের দিকে চাইলো। সারিমও বেশ চমকে গেছে মেহেরের এমন অপ্রত্যাশিত ব্যবহারে। তবে রোজা কিছু একটা আঁচ করতে পারলো। পরমুহূর্তে কী ভেবে নিজেকে গাল-মন্দ করে ভাবলো,

–“ধুর। কীসব ভাবছি? এটা তো সম্ভব না।”

—————–
মাহিমের পিঠের শার্ট খামচে নাক টেনে ফুঁপিয়ে কাঁদছে মেহের। মাহিম বাইক চালানোর পাশাপাশি গোমড়া মুখ করে লুকিং গ্লাসে মেহেরকে দেখছে। মেহেরের নাক লাল হয়ে গেছে। চোখের আশেপাশে রক্তিম আভা। মাহিমের একদমই ভালো লাগছে না মেহেরের এরকম কান্না। সারাজীবন ঝগড়া, মা*পিট যাই হোক না কেন, অন্যের জন্যে বোনের এমন কান্না মাহিমের সহ্য হচ্ছে না। বেশ কয়েকবার জানত চেয়েছে মেহেরের কান্নার কারণ। কিন্তু মেহের তো মাহিমের কোনো প্রশ্নের জবাব-ই দিচ্ছে না। এজন্যে মাহিম একপ্রকার বাধ্য হয়ে চুপ মেরে গেলো।

মেহের ফোঁপাতে ফোপাঁতে বললো,
–“মাহিম, সারিম ভাইয়া যদি ওই ইলিরা আপুকে বিয়ে করে তাহলে আমি সেদিনই বাড়ী ছেড়ে বেরিয়ে যাব। আমার কথা তুই মিলিয়ে নিস!”

মেহেরকে স্বাভাবিক করতে মাহিম রসিক সুরে বললো,
–“মজা নিস না। তুই বাড়ী থেকে বেরিয়ে যাবি কই? শ্বশুরবাড়ি?”
–“দরকার পরলে তাও জুটিয়ে নেব। তবুও আমি ওই বাড়িতে থাকবো না!”

–“এর মানে এতক্ষণ সারিম ভাইয়ের জন্যে কান্না করা হচ্ছিলো?”

মেহের কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো,
–“যার জন্য-ই কাঁদি না কেন, তাতে তোর কী?”
–“আমার অনেক কিছু। সাহস কত বড়ো আমাকে চোখ রাঙাস? আমি তোর দেড় মিনিটের বড়ো মেহের।”

মেহের মাহিমের পিঠে চিমটি কাটলে মাহিম চেঁচালো। বললো,
–“খবরদার যদি আমাকে এই চিমটি আর খামচি দিস তো! নইলে তোকে চলন্ত বাইক থেকে ফেলে দিবো বেদ্দপ!”
–“তুই বেদ্দপ! জলদি বাইক চালা।”
–“কলেজে কী তোর বর বসে আছে?”
–“তোর বউ বসে আছে। যা ফুট!”
মাহিম যখন বুঝলো মেহেরের কান্না থেমে গেছে তখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো মাহিম। এর হেস্তনেস্ত তো আজ বাড়ী গিয়ে করাই লাগবে! মাহিমের সকল আশায় পানি ঢেলে মেহের বলে ওঠে,
–“মাহিম, আমি যে এতক্ষণ কেঁদেছি তা যদি কারো কানে যায় তাহলে তোর সকল ফ্লার্টিং কাজ – কারবার আমি আব্বুর কানে পৌঁছে দিবো। বি কেয়ারফুল!”

—————-
রোজা রান্নাঘরের এক কোণায় দাঁড়িয়ে জ্যুতির ব্যস্ততস দেখছে। জ্যুতি রোজাকে খেয়াল করতেই মুচকি হাসলো। উত্তরে রোজাও মুচকি হাসলো। জ্যুতি বললো,
–“কী ব্যাপার রোজা? এই গরমে এখানে কী করছো?”
রোজা আলতো হেসে বললো,
–“আপনাকে দেখছি। এখনো কারো সাথে সেভাবে পরিচিত হলাম না!”
–“এ বাবা তা কেন বলছো? সকলেই কম-বেশি ব্যস্ত বুঝলে? তবে চিন্তা করো না, ধীরে ধীরে সবার সাথে মিশে যাবে। শুধু একটু সময়ের ব্যাপার!”

রোজা মুচকি হেসে মাথা নাড়ালো। রোজা বললো,
–“একটা প্রশ্ন ছিলো।”
–“কী প্রশ্ন বলো!!”
–“প্রশ্নটা আসলে আপনার ছেলের কাছেই করা যেত তবে সে ভুল বুঝবে কী না এজন্যে আমি প্রশ্নটা করার সাহস পাইনি!”
–“আচ্ছা, আমাকে নাহয় বলো। আমি তোমার মায়ের মতোই!”
–“না মানে, আপনাকে সকলে ছোট মা বলে ডাকে..”

জ্যুতি ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে ম্লান হেসে বলে,
–“সাইয়ানের মা মা* যায় আজ থেকে বেশ কয়েক বছর আগে। সেই থেকে আমি ওদের মা হয়ে গেলাম!”

রোজা ব্যথিত নয়নে চাইলো জ্যুতির দিকে। জ্যুতি রান্নাঘরে থাকা কাজের মেয়েটাকে অন্য কাজের বাহানায় রান্নাঘর থেকে বের করে দিয়ে ধীর, সুস্থে সবকিছু খুলে বললো রোজাকে। রোজা সব শুনে কিছুটা স্তব্ধ। এতদিন সাইয়ানের ব্যবহারে বোঝাই যায়নি সাইয়ান মা হারা। কতটা প্রাণচঞ্চল সাইয়ান। সারিম এবং সামিরার বেলাতেও একই ব্যাপার খেয়াল করেছে। মাকে ছাড়া এতটা স্বাভাবিক থাকা আদৌ সম্ভব? হয়তো মায়ের মতো কাউকে পেয়ে ওরা ওদের বেদনা কিছুটা ভুলতে পেরেছে। এই পরিবারটা অদ্ভুত সুন্দর। দারুণ তাদের মোলায়েম নিবিড় সম্পর্ক।

জ্যুতি হঠাৎ প্রশ্ন করলো রোজাকে। রোজার ধ্যান ভাঙলে জ্যতি প্রশ্ন করে,
–“তুমি কী মানসিক চাপ সহ্য করতে পারো না?”

রোজা বেশ চমকালো জ্যুতির প্রশ্ন শুনে। আমতা আমতা করে বললো,
–“এমন কে..কেন হলো ছোট মা?”

–“নাহ। প্রথমদিন যেভাবে জ্ঞান হারালে তাই প্রশ্ন করলাম!”
রোজা মাথা নিচু করে লাজুক স্বরে বললো,
–“বিয়ের পরিস্থিতিটা খুব অস্বাভাবিক ছিলো। আপনাদের হঠাৎ এরকম আচরণে খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। মনে হচ্ছিলো আপনারা মেনে নিবেন না, কঠোর মানুষজন।”

জ্যুতি হেসে বলে,
–“এমনটা ভাবা স্বাভাবিক। তবে এই তুচ্ছ বিষয়ে কেউ এত ভয় পায়? ভয়কে জয় করতে শিখো। তোমার জীবনের গল্প কীরকম তা আমার জানা নেই। তবে এইটুকু বলতে চাই, আমরা হাজার বার ভাঙি হাজার বার নতুন করে গড়ে ওঠার জন্যে। পা পিছলে গেলেও কিন্তু উঠে দাঁড়াতে হয়। পা পিছলে সেখানে কারো অপেক্ষায় বসে থাকাটা বোকামী বৈ কিছু নয়।”

–“কিন্তু ছোট মা। আমার জীবনে আমি খুব খারাপ পরিস্থিতির স্বীকার হয়েছি যার প্রভাব এখনো কাটেনি!”

–“মনোবল শক্ত করো। তবেই তুমি সেই প্রভাব থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসতে পারবে। বুঝেছো?”

রোজা ম্লান হেসে ইতিবাচক মাথা নাড়ালো।

———————
~চলবে, ইন-শা-আল্লাহ্।

#বাসন্তীগন্ধা
|১৭|[কপি সম্পূর্ণ নিষেধ]
লাবিবা ওয়াহিদ

————————
–“এখানে একা দাঁড়িয়ে কী করছো প্রিটি গার্ল? তোমার পার্টনার কোথায়?”

মেহের চমকে পাশ ফিরে তাকায়। অভিকে দেখে মেহের যেন আকাশ থেকে করলো। বিস্ময়ে হতভম্ভ হয়ে আমতা আমতা করে মেহের বললো,
–“আ..আপনি?”
–“চিনেছো? এর মানে নিশ্চয়ই আমাকে নিয়ে ভেবেছো, তাই না?”

মেহের আশেপাশে তাকিয়ে বললো, “কই? না তো!”
অভি হেসে বললো,
–“ভের‍্যি গুড। আচ্ছা, একা দাঁড়িয়ে কেন? মন খারাপ?”

মেহের কোনো উত্তর না দিয়ে অভির পাশ কেটে চলে যেতে নিলে অভি মেহেরের পথ আগলে দাঁড়ালো। ফিচেল হাসি দিয়ে বললো,
–“পালাচ্ছো কোথায়? আমার প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যাও।”

মেহের চারপাশে এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে বলে,
–“একা দাঁড়ানো মানেই মন খারাপ হবে তা কে বলেছে?”

–“ওহ। এর মানে মন খারাপ না। তাহলে এখানেই দাঁড়াও। কত খোঁজার পর তোমায় পেয়েছি জানো?”

মেহের চমকে অভির দিকে তাকায়। অভি এক গাল হেসে বলে,
–“খুব সুইট তুমি জানো?”

মেহের আটকে গলায় বললো,
–“আ..আমার থেকে দূরে থাকুন।”

–“কেন?”

মেহের কোনো রকম উত্তর না দিয়ে দ্রুত পালালো। অভি মেহেরের যাওয়ার দিকে চেয়ে অবাক সুরে বললো,
–“আমাকে ভয় পাচ্ছে কেন বাচ্চা মেয়েটা?”

———————
রাতে সারিম বাসায় ফিরে সর্বপ্রথম মেহেরের রুমে চলে গেলো। সেখানে গিয়ে দেখলো মেহের সামনে বই নিয়ে বসে আছে। আর তাঁর পাশে রোজা তাকে পড়াচ্ছে। মাঝেমধ্যে গল্পও করছে। রোজাকে দেখে সারিম ভেতরে ঢুকলো না। উলটো দিকে ফিরে নিজের রুমে চলে গেলো। মেহের সারিমের উপস্থিতি টের পেলেও পিছে ফিরে তাকায় না। সে রোজার সাথেই গল্প শুরু করে। মেহের বললো,
–“এর মানে তুমি ভাইয়ার অফিসে জব করতে?”
রোজা লাজুক স্বরে বলে,
–“হু!”

–“ওয়াও। ইন্টারেস্টিং তো। আমিও এভাবে পড়ালেখা করে অফিসে চাকরি করবো। আর বসকে পটাবো!”

রোজা হুঁ হাঁ করব হাসলো মেহেরের কথা শুনে। মেহের আড়চোখে দরজার দিকে তাকিয়ে দেখলো কেউ নেই। মন খারাপ হলো তাঁর। যাকে শোনানোর জন্যে বললো সেই তো নেই।
রোজা হাসি থামিয়ে বলে,
–“হয়েছে। এখন পড়ো। গল্প অনেক হয়েছে।

সারিম ফ্রেশ হয়ে মাহিমের রুমে প্রবেশ করলো। মাহিম হন্তদন্ত হয়ে উঠে বসলো। আমতা আমতা করে বললো,
–“সত্যি বলছি ভাইয়া। আমি পড়ছিলাম, একটু খারাপ লাগছিলো বলে শুয়ে পরেছি!”

সারিম কোনো কথা ছাড়াই মাহিমের সামনে বসে গম্ভীর স্বরে বললো,
–“সত্যি করে বল। মেহের কলেজ যাওয়ার সময় তোকে কিছু বলেছে?”

সারিমের কথা শুনে মেহেরের দেওয়া হুমকির কথা মনে পরে গেলো মাহিমের। সে বুঝেও না বোঝার ভান ধরে বললো,
–“কী বলবে?”

সারিম মাহিমকে চোখ রাঙিয়ে বলে,
–“অবুঝ সাজার চেষ্টা করিস না। আমার তোদের দুটোকে হারে হারে চেনা আছে। সত্যি বল, নয়তো তোকে উলটো করে বেঁধে পি*টাবো। যার লাইভ টেলিকাস্ট তোর সকল গার্লফ্রেন্ড দেখবে!”

মাহিম অসহায় ভঙ্গিতে বললো,
–“সকলে আমাকে আমার গার্লফ্রেন্ডের নিয়েই কেন ভয় দেখায়? আজব তোহ!”

–“কারণ এই একটা জিনিসেই তুই সোজা হস!”

মাহিম মুখ বাঁকিয়ে বললো,
–“শুধু এইটুকুই বলেছে ইলিরা আপুকে তুমি বিয়ে করলে মেহের বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে!”

মাহিমের কথায় সারিম হাসবে নাকি কাঁদবে বুঝতে পারলো না। মাহিম কোণা চোখে সারিমের দিকে চেয়ে আছে। বোঝার চেষ্টা করছে সারিমের ভাব-ভঙ্গি। সারিম মাহিমের আশায় পানি ঢেলে দিয়ে বললো,
–“ঠিকাছে। পড়তে বস!”

বলেই সারিম রুম থেকে বেরিয়ে গেলো। মাহিম তো সারিমের কান্ডে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো। অবাক নয়নে সারিমের যাওয়ার পানে চেয়ে অস্ফুট স্বরে বললো,
–“ভাইয়ার মনে চলছে কী?”

——————
রোজা রুমে ঢুকতেই দেখলো সাইয়ান ল্যাপটপে কাজ করছে। রোজা সাইয়ানের থেকে চোখ সরিয়ে জানালার কাছে চলে গেলো। রাতের স্নিগ্ধ হাওয়ার ঘ্রাণ নিতে আগ্রহী রোজা। সাইয়ান আড়চোখে রোজাকে লক্ষ্য করলো। রোজা জানালার সামনে দাঁড়াতেই সাইয়ান হালকা গলা খাঁকারি দিলো। রোজা পাশ ফিরে চাইলো সাইয়ানের দিকে। সাইয়ানের দৃষ্টি তখনো ল্যাপটপে নিবদ্ধ। সাইয়ান বললো,
–“কাল ডক্টরের কাছে এপোয়েন্ট আছে। আমার সাথে যাবে তুমি!”

ডাক্তারের কথা শুনে রোজার ভ্রু কুচকে যায়। ডাক্তার কেন? সাইয়ান কী অসুস্থ? সাইয়ানের কথা মাথায় আসতেই রোজার বুক কেঁপে ওঠে। জানালা থেকে সরে সাইয়ানের দিকে এগিয়ে যায়। সাইয়ানের পাশে বসে তাঁর কপালে, গালে হাত দিয়ে বলে,
–“আপনি ঠিকাছেন? কী হয়েছে আমায় বলুন!”

সাইয়ান রোজার হাত নিজের গাল থেকে সরিয়ে হাতে মুঠিবদ্ধ করে রোজার চোখে চোখ রাখলো। রোজা নির্বিকার চাহনিতে সাইয়ানের চোখ জোড়া দেখছে। সাইয়ান আলতো স্বরে বলে,
–“আমার জন্যে নয়। তোমার জন্য। সাইক্রিয়াট্রিস্টের কাছে যাবো আমরা!”

রোজা স্তব্ধ হয়ে যায়। সে কখনো কল্পনাও করতে পারেনি যে সাইয়ান তাকে মানসিক ভারসম্যহীন ভাববে। রোজার চোখ উপচে জল বেরিয়ে এলো। সাইয়ান রোজার এরকম অবস্থা দেখে চমকে গেলো। অবাক স্বরে বলল,
–“আরেহ। কী হলো? কাঁদছো কেন?”

রোজা সরে যেতে চাইলো। কিন্তু সাইয়ান তার হাত ছাড়লো না। বরং শক্ত করে চেপে ধরলো। সাইয়ান লহু কন্ঠে আওড়ায়,
–“কিছু জিজ্ঞেস করেছি রোজা!”

রোজা চারপাশে এলোমেলো নজর ফেলে বলে,
–“আপনিও আমাকে পাগল ভাবছেন?”

সাইয়ান বেশ চমকালো রোজার এরকম ভাবনা দেখে। ল্যাপটপ বন্ধ করে পাশে রাখলো। অতঃপর কোনো কথা ছাড়াই রোজাকে বুকে টেনে নিলো। সাইয়ানের এরূপ কান্ডে রোজা স্তব্ধ, বিমূঢ়। কাঁদতে ভুলে গেলো সে। মস্তিষ্কের কার্যক্রম যেন থমকে গেলো। পাথরের মতো সেভাবেই সাইয়ানের বুকে পরে রইলো। সাইয়ান রোজার মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,

–“এই বোকা! কীসব বলছো তুমি বলো তো? আমি কেন এসব ভাবতে যাবো? সাইক্রিয়াট্রিস্টের কাছে কী শুধু পাগল’রাই যায়? আমি তোমার চিকিৎসা করাবো এজন্যই যাতে অতীতের কোনো কালো দাগ তোমায় স্পর্শ করতে না পারে। তুমি এখনো অতীতের ঘোরে পরে রয়েছ, সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে তো তাই না? আমি চাই না তুমি মানসিক ব্যাধিতে ভুগো। বুঝেছো?”

রোজা চুপচাপ সব শুনলো। কিছুক্ষণ দু’জনই নীরবতা পাগল করলো। রোজা হঠাৎ বলে ওঠে,
–“এটা কথা রাখবেন?”
–“বলো।”

রোজা বিব্রত হয়ে বললো,
–“সারা রাত এই বুকে ঠাঁই দিবেন? এখানে ঠাঁই পেলে আমি আপনার সাথে সব জায়গায় যেতে প্রস্তুত!”

রোজার এরূপ আবদার শুনে সাইয়ান নিঃশব্দে হাসলো। মুহূর্তে-ই রোজার সেদিনের কথাগুলো মস্তিষ্কে তরঙ্গিত হলো। এর মানে রোজা ঘোরে ভুলভাল বলেনি, সত্যি সত্যি রোজার হৃদয়ে সাইয়ানের প্রতি অনুভূতি আছে? মুহূর্তে-ই হৃদয়জুড়ে প্রশান্তি খেলে গেলো। আদুরে স্বরে বললো,

–“ঠিকাছে। শুয়ে পরো। আমি লাইট নিভিয়ে দিচ্ছি!”

রোজা সাইয়ানের কাছ থেকে সরে এসে বললো,
–“কিন্তু আপনার কাজ?”

সাইয়ান রোজার গাল টেনে হেসে বললো,
–“কাজের আগে বউ!”

সাইয়ানের মুখে এই তিন শব্দে বাক্যটি শুনে রোজার সর্বাঙ্গে লাজে’রা ভীড় জমালো। রোজা লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেললো।

——————
আজ ১৪ই ফেব্রুয়ারি। একই দিনে ভালোবাসা দিবস এবং পহেলা বসন্ত। যার যেই দিবস পছন্দ সে সেই দিবস-ই পালন করে। আজকে এই দিনে মাহিম বা মেহেরকে সারিম কলেজ যেতে দেয়নি। এমনকি এক মিনিটের জন্যে বাহিরেও যাওয়া নিষেধ। এ কারণে মাহিম মুখ ফুলিয়ে চলাফেরা করছে পুরো বাড়ী জুড়ে। আজকের মতো এত গুরুত্বপূর্ণ দিনে কী না কলেজে যেতে পারলো না। আজকে তো কলেজ বাংক দিয়ে কোনো এক মেয়েকে নিয়ে ঘুরতে যেতে পারতো। কিন্তু মাহিমের সব প্ল্যানিং এ অঢেল পানি ঢাকলো সারিম। এখন বিকাল। সাইয়ান প্রস্তাব করেছে সকলে মিলে তাঁরা বসন্ত পালন করবে। অর্থাৎ ঘুরতে বেরুবে।

সাইয়ানের এই কথা শুনে রোজা এবং মেহের তো দারুণ খুশি। রোজা কখনোই বসন্ত পালন করতে পারেনি। তবে আজ সুযোগ পেয়ে তার খুশির অন্ত নেই। মেহেরকে রোজা শাড়ি পরতে বলে নিজেও রুমে চলে গেলো রেডি হতে। নিজের জন্যে শাড়ি খুঁজতে যখন ব্যস্ত তখনই সাইয়ান হঠাৎ রুমে প্রবেশ করলো। তার হাতে একটি প্যাকেট। রোজার দিকে সেই প্যাকেট এগিয়ে দিয়ে সাইয়ান বললো,

–“এই শাড়িটা পরতে পারো। স্পেশালি তোমার জন্যে কিনেছি। আমার পছন্দে।”

একই সময়ে সামিরাও মেহেরের রুমে একটা শাড়ি নিয়ে এসে বললো,
–“নে এটা পর!”

মেহের অবাক হয়ে বলে,
–“কই পেলে?”
–“সাইয়ান ভাইয়া সকলের জন্যে শপিং করেছে।”

——————————-
~চলবে, ইন-শা-আল্লাহ্।