#বাসন্তীগন্ধা
| পর্ব ০২ |
লাবিবা ওয়াহিদ
মাহিম এবং মেহের পড়ার টেবিলে মুখোমুখি বসেছে। মাহিম পড়া বাদ দিয়ে কোণা চোখে মেহেরের দিকে তাকাচ্ছে এবং মুখ-ভঙ্গি নানান রকম বিকৃত করে মেহেরকে ভেঙ্গাচ্ছে। যার ফলে মেহের নাক ফুলিয়ে কোণা চোখে মাহিমের দিকে তাকাচ্ছে এবং মুখ চালিয়ে নীরবে গাল-মন্দ করছে তাকে। সারিম একটি বইয়ে ডুবে আছে বিধায় দুই ভাই-বোনের অকাজ খেয়াল করছে না। একসময় মাহিম মেহেরের পায়ে লাথি দিলো। হালকা করে। মেহের এতে রেগে-মেগে আরও জোরে মাহিমের পায়ে দিলো। অতঃপর টেবিলের নিচেই শুরু হয় পায়ে পায়ে যুদ্ধ। এই যুদ্ধের মাঝে হঠাৎ মেহের ভুলবশত সারিমের পায়ে গিয়ে আঘাত করে। আঘাত জোরালো ছিলো না। বেশ হালকা ছিলো। মেহের পা সারিমের পায়ে লাগতেই সে দ্রুত পা সরিয়ে ফেলে। ভয়ে শুকনো ঢোঁকও গিলে। কারণ, মাহিম শর্ট’স পরে ছিলো আর সারিম ফুল টাউজার। এজন্যে মাহিম এবং সারিমের পায়ের পার্থক্যটা মেহের বেশ ভালো করেই ধরতে পারলো। সারিম বই থেকে চোখ তুলে মেহেরের দিকে তাকালো। কঠোর নজরে। সেই চাহনিতে মেহের আরও কয়েকটা শুকনো ঢোঁক গিললো। ঢোঁক গিলতে গিয়ে আবিষ্কার করলো, তাঁর গলা শুকিয়ে পুরো কাঠকাঠ হয়ে গেছে ভয়ে। মৃদু কম্পিত হাত জোড়া মুঠ করে ধরলো।
ওদের দুজনের ভাব-ভঙ্গি দেখে মাহিম বুঝলো শেষ লাথিটা গিয়ে লেগেছে সারিমের পায়ে। যা বুঝতে পেরে মাহিম পৈশাচিক হাসি দিলো। ভাবলো,
–“বুঝবে এবার ঠ্যালা!”
সারিম এবার মাহিমের দিকে তাকালো। রাগাম্বিত চোখে। মাহিমের হাসি সাথে সাথে মিলিয়ে গেলো। সারিম দাঁতে দাঁত চেপে দুজনের উদ্দেশ্যে বললো,
–“পড়তে আসছিস নাকি মা!রা-মা!রি করতে বসছিস?”
মাহিম বিব্রত হয়ে কিছু বলতে নিলে সারিম এক ধমকে তাকে থামিয়ে দিলো। সেই ধমকের ঝংকারে দুই ভাই-বোনই চমকে উঠলো। তবে মেহেরের চমকানোর সাথে কম্পনও সাড়া দিলো। ভীতু চোখে সামনে থাকা খাতাটার দিকে স্থির নজর ফেললো। সারিম মাহিমের উদ্দেশ্যে বলতে লাগে,
–“বাইরে দুনিয়ার মেয়েদের সাথে প্রেমালাপ আর বাসায় পড়ায় ফাঁকি দেয়া তাই না? পড়িস না দেখেই আজ দেড় মিনিটের ছোট বোনের থেকে এক ক্লাস জুনিয়র হয়ে গেছিস। সামান্য শরম-লজ্জা নেই রে তোর? ফেল্টুশ কোথাকার! সারাদিন অফিস করে ক্লান্ত দেহ নিয়ে বিছানায় না শুয়ে এখানে বসে তোদের পড়াচ্ছি। গায়ে লাগে না এই কষ্ট? কাদের জন্যে করি আমি এসব?”
সারিমের বকাঝকায় মাহিমের চেহারাটা দেখার মতো ছিলো। মেহের তো মাহিমের অবস্থা দেখে খুব মজা পেলো। তখন না সে বুক ফুলিয়ে বলছিলো, মাহিমের চাইতে মেহের বেশি বকা খায়? এখন বুঝো ঠ্যালা। মেহের মুখে হাত চেপে হাসছিলো দেখে সারিম এবার মেহেরের দিকে তাকালো। মেহের সাথে সাথে নীরব হয়ে গেলো। সারিম এবার মেহেরের উদ্দেশ্যে বললো,
–“তোর মাথা তো পুরো গোবরে ভর্তি। এত বড়ো মেয়ে হলি অথচ কোথায় কী বলতে হয় তাই জানিস না। পড়ালেখা না করলে তো এমন হবেই। বে!দ্দপের দল। জমজ তোরা, আল্লাহ্ তোদের যথেষ্ট মেধা দিয়েছে। সেগুলা কাজে না লাগিয়ে সারাদিন ঝিমুলে মেধা কাজে দিবে না বরং এক বস্তা গোবর ময়লা হয়ে বেরুবে। তোদের দুটোর অবণতি দেখে আমি অবাক হচ্ছি। কী করে আমার সামনে দুটো বসে মা!রা-মা!রি করছিস!”
সারিম মাহিম এবং মেহের দুজনকেই সমান তালে বকাঝকা করলো। তাও যেন সারিমের রাগ নিয়ন্ত্রণে আসছে না। ইচ্ছে করছে দুটোকে আস্তাবলে দিয়ে আসতে। অন্তত ঘোড়ার কাজ করে দৌড়ালেও এদের লাভ আছে। কিন্তু পরমুহূর্তেই সারিমের মনে হলো, সে ভুলবশত গাধাকে ঘোড়ার সাথে তুলনা করে ফেলেছে। মানে যা-তা অবস্থা দাঁড়ালো।
————————
সাইয়ান ফ্লাটের চাবি নিয়ে দ্রুত ভঙ্গিতে সিঁড়ি বেয়ে উঠছিলো তখনই অবসাবধানবশত হাত থেকে চাবিটা পরে যায়। চাবির জন্যে হন্তদন্ত হয়ে পিছে ফিরে নামতে নিলে কারো সাথে সজোরে ধাক্কা খেলো সে। সাইয়ান যেখানে ছিলো সেখানেই রইলো তবে তাঁর প্রতিপক্ষ সিঁড়ির রেলিং ধরে বেঁচে যায়। সাইয়ান সামনে তাকাতেই দেখলো এক পরিচিত মুখ। তাঁর অফিসের কর্মচারী। নাম তাঁর রোজা। এইতো কয়েক মাস হলো তাঁর অফিসে জয়েন করেছে। রোজা রেলিং ধরে ঘনঘন নিঃশ্বাস ফেলছে। চোখে-মুখে ভয় গ্রাস করেছে তাঁর। আরেকটু দেরী করলে রেলিং ধরার সময় পেত না। সিঁড়ি দিয়ে গড়াতে গড়াতে কী বিধ্বস্ত অবস্থাই না হতো। ভাবলেও রোজার গা শিউরে ওঠছে। সাইয়ান দ্রুত চাবিটা উঠিয়ে ব্যস্ত কন্ঠে বলে,
–“আপনি ঠিকাছেন মিস রোজা?”
রোজা নিজেকে সামলে নিলো। ধীর গলায় বলে,
–“জ..জি স্যার। ঠিকাছি!”
–“আ’ম এক্সট্রেইমলি সরি, মিস রোজা। আমি আপনাকে খেয়াল করিনি!”
–“ইট’স ওকে স্যার। আপনার দোষ নেই, আমিও অসাবধান ছিলাম। তাই সরি বলে আমায় লজ্জিত করবেন না।”
রোজার এরূপ কথা বলার নম্রতা সাইয়ানের পছন্দ হলো। সে ফিচেল হেসে বলে,
–“তা আপনি এখানে যে?”
–“পাঁচ তলায় থাকছি আমি!”
সাইয়ান অবাক হলো বেশ। যতটুকু জানে রোজার আর্থিক অবস্থা ভালো না। তাহলে সে তাদের এত ব্যয়বহুল এপার্টমেন্টে কী করে থাকছে? মাসে মাসে ভাড়ার খরচ তো তাঁর মাসিক আয়ের কাছাকাছি। এ অবস্থায় সংসার চালায় কী করে মেয়েটা? এরূপ নানান প্রশ্ন সাইয়ানের মস্তিষ্কজুড়ে ঘুরপাক খেলো। রোজা সাইয়ানের চিন্তিত মুখ দেখে কিছু একটা আঁচ করতে পারলো। ধারণা অনুসারে রোজা আবার বললো,
–“এখানে বান্ধুবীর ফ্যামিলির সাথে থাকছি। যেহেতু অফিস এখান থেকে কাছে। আমার বাসা চট্টগ্রাম শহরের বাইরে।”
পুরো বিষয়টি সাইয়ান এবার বুঝতে পারলো। ফিচেল হেসে বলে,
–“তাই বলছেন। তা লিফট ছেড়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠছেন যে?”
এবার রোজা আমতা আমতা করতে লাগলো। আমতা আমতা করে বললো,
–“লিফট সময়মতো পাচ্ছিলাম না। এছাড়া একটু তাড়ার মধ্যে ছিলাম, তাই বাধ্য হয়ে সিঁড়ি বেয়েই যাচ্ছি!”
–“ওহ। তাহলে তো আপনাকে আটকে দেরী করে ফেললাম। সো স্যরি!”
–“না, না। ঠিকাছে!!”
–“চলুন একসাথে যাই। আমার তো তিন তলায় ফ্লাট!”
রোজা নীরবে ইতিবাচক মাথা নাড়িয়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠলো লাগলো। পাশাপাশি দুজন। রোজা আড়চোখে সাইয়ানকে দেখতে ভুলছে না। মানুষটা লম্বাটে হলেও এখন আর দেখতে অসুবিধা হয় না। অভ্যাস হয়ে গেছে তাঁর। সাইয়ানের এই মিশুক এবং ভদ্র স্বভাব তাকে ভীষণ মুগ্ধ করে। অফিসের বসেরা বুঝি এত সুন্দর করে কর্মচারীদের সাথে মিশতে পারে? সাইয়ান সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে বলে,
–“বাড়িতে কে কে আছে তোমার?”
রোজা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। শান্ত স্বরে বললো,
–“মা এবং ছোট ভাই!”
সাইয়ান থেমে গেলো। কিছু জিজ্ঞেস করার পূর্বেই হঠাৎ তাঁর মোবাইলের কথা মনে পরলো। হঠাৎ-ই সাইয়ানকে অশান্ত দেখালো। ব্যস্ত হয়ে রোজার উদ্দেশ্যে বলে,
–“আচ্ছা শুভ রাত্রি। আগামীকাল অফিসে দেখা হবে। আসলে ফোনটা ফেলে এসেছি! বাসার সবাই মনে হয় চিন্তা করছে। বাই!”
সাইয়ান রোজার কোনো কথার অপেক্ষা না করে দরজার লক খুলে ভেতরে চলে গেলো। রোজা দীর্ঘশ্বাস ফেলে লিফটের দিকে গেলো। লিফটের বাটন চেপে উঠে পরলো লিফটে। এতক্ষণ তো সাইয়ানের সাথে থাকার ছোটখাটো বাহানা দিয়েছে মাত্র।
———————-
মেহের এবং মাহিম পাশাপাশি কান ধরে দাঁড়িয়ে আছে। আর সারিম মেহেরের বিছানায় আরাম করে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। চোখ তাঁর বন্ধ। মাহিম একবার কান ছাড়ছে আর কানে হাত দিচ্ছে। চোখে মুখে ফ্যাকাসে ভাব ফুটে এসেছে তাঁর। মেহের মনে মনে আবারও গাল-মন্দ করছে সারিমকে। একেতো কান ধরিয়ে রেখেছে তাঁর উপর মেহেরের বিছানায় সারিম চোখ বুজে শুয়ে আছে। মেহেরের চেহারা দেখার মতো। মাহিম মেহেরকে কনুই দিয়ে খোঁচালে মেহের গরম চোখে চাইলো মাহিমের দিকে। মাহিম চোখ-মুখ কুচকে ফিসফিস করে বলে,
–“আজাইরা ঢং বাদ দে, চল আমরা পালাই।”
তখনই সারিম চোখ মেলে চাইলো। মাহিম প্রথমে ঘাবড়ালেও পরবর্তীতে দাঁত কপাট বের করে বলে,
–“আসলে, খুদা পেয়েছে ভাইয়া। খেতে যাই?”
সারিম কী ভেবে উঠে বসলো। অতঃপর মেহেরের দিকে চেয়ে বলে,
–“গর্ধ!বটার জন্যে খাবার নিয়ে আয় তো!”
মেহের চুপচাপ চলে গেলো। মা জ্যুতিকে খাবার দিতে বলে দ্রুত মায়ের ফোন থেকে সাইয়ানকে কল দিলো। কারণ, এই কান ধরা থেকে একমাত্র সাইয়ান-ই বাঁচাতে পারবে। কয়েকবার রিং হতেই সাইয়ান কল রিসিভ করলো। সাইয়ানের গলা শুনতেই মেহের আবেগী হয়ে গেলো। অভিযোগের সুরে বলে,
–“তোমার ভাইটা একদম ভালো না সাইয়ান ভাই। কয়েক ঘন্টা যাবৎ বকেছে। এখন আবার কান ধরিয়ে রেখেছে। আমি পা এবং হাত ব্যথায় টিকতে পারছি না ভাইয়া। বিচার চাই তোমার কাছে!”
সাইয়ান স্মিত হাসলো। হাসি বজায় রেখেই বলে,
–“নির্ঘাত তোর দেড় মিনিটের বড়ো ভাইটা কিছু করেছে?”
–“ও করলে ওকে শাস্তি দিক, আমায় কেন এর মধ্যে টানছে। আমি কী কিছু করতে পারি?”
সাইয়ান ফিক করে হেসে দিয়ে বলে,
–“আপাতত আমার ডার্লিং দাদীর রুমে গিয়ে বসে থাক। সারিমকে আমি কল করছি!”
মেহেরের মুখে হাসি ফুটে উঠলো। লহু কন্ঠে আওড়ালো,
–“আমার লক্ষী ভাইয়া!”
———————-
সকাল বেলা সকলে রাস্তা সেরে যে যার কাজে বেরিয়ে গেছে। এদিকে মাহিম তো নোট’স এর ছুঁতোয় তাড়াতাড়ি পালিয়েছে। কারণ, গতকাল রাতে কান ধরার শা!স্তি মাফ করলেও সারিম সোজা বলে দিয়েছে যেন আজ মেহেরকে মাহিম নিয়ে যায়। আর এ কাজ করতে মাহিম কখনোই রাজি হয় না। হবেও না। দুজনকে একসাথে দেখলে মাহিমের মুখ ফুটো হয়ে যাবে। কারণ, একই কলেজে বিধায় সকলেই প্রশ্ন ছুঁড়ে কেন তাঁরা এক ক্লাস আগে পিছে? মাহিম এমনিতেই অনেক কষ্টে কয়েকবার বেঁচেছে। বারবার বাঁচা সম্ভব না। ফেল্টুশ শব্দে তাঁর বড্ড এলার্জি!
মেহের রেডি হয়ে নিচে নামতেই দেখলো সারিম ফর্মাল স্যুটে সোফায় বসে ফোনে কথা বলছে। তাঁর অপর সোফাতে দাদী রোকসানা বসে আছে। তাঁর পাশেই বসেছে রোকসানার বড়ো ছেলে। অর্থাৎ সারিমের বাবা। মেহের সারিমকে দেখে পা টিপে টিপে সদর দরজার দিকে যেতে নিলে মেহেরের মা তাকে পিছুডাক দিলো।
–“মেহের, একা কোথায় যাচ্ছিস?”
যাহ্! ধরা খেয়ে গেলো। চো!রের মতোন মেহের পিছে ফিরে দাঁড়ালে দেখলো সারিম কানে ফোন নিয়ে ঘাড় কাত করে তাঁর দিকেই তাকিয়ে। সারিম তৎক্ষনাৎ ওপ্রান্তের মানুষটির থেকে বিদায় নিয়ে কল কাটলো৷ অতঃপর ভ্রু কুচকে তাকালো মেহেরের পানে। যেন মেহেরের উত্তরের অপেক্ষায় আছে। মেহের তখন আমতা আমতা করে বললো,
–“আ..আসলে আম্মু, মাহিমের সাথে কলেজ যাবো..”
মেহেরের পুরো কথা শেষ হবার আগেই সারিম বলে ওঠে,
–“ওটা আগেই তোকে নিয়ে যাওয়ার ভয়ে পালিয়েছে। এখন তুই আমার সাথে যাবি! চল, দেরী হয়ে যাচ্ছে।”
সারিম উঠে দাঁড়ালো। মেহেরের চেহারা তখন ভার। অস্ফুট স্বরে মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো,
–“সর্ব’ নাশ!”
[ক্রমশ]
#বাসন্তীগন্ধা
| পর্ব ০৩ |
লাবিবা ওয়াহিদ
জ্যুতিকে রোকসানা বেগম খুব একটা পছন্দ করেন না। পছন্দ না করার কারণ হয়তো ছোট ছেলে তাঁর পছন্দে জ্যুতিকে বিয়ে করে এনেছে। জ্যুতি বিয়ে হয়ে আসার পরপর রোকসানা জ্যুতির সাথে একদম-ই কথা বলেননি। অথচ মাহিম এবং মেহের রোকসানার প্রাণ। তাদের সাথে ঠিকই হেসে খেলে বেড়ান। ওরা জম্ম নেয়ার পরপর রোকসানার রাগ কিছুটা কমে আসে। দুই একটা প্রয়োজনীয় কথাবার্তা ছাড়া তিনি অতিরিক্ত কোনো কথা বলেন না। জ্যুতি সেই বিয়ের পর থেকে শ্বাশুড়ির মন জয় করার প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন। এখনো তাঁর চেষ্টা চলছে। কে জানে কবে রোকসানার মন জুড়ে জ্যুতি জায়গা করতে পারবে? কিংবা রোকসানা জায়গা দিয়েছেন কী না কে জানেন? বড্ড চাপা স্বভাবের কী না। এদিকে রোকসানার খুবই আদরের ছিলো সারিম এবং সাইয়ানের মা রুমানা। কিন্তু তিনি প্রায় সাত বছর আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মূর্ছা যায়। সারিমরা তিন ভাই-বোন। সাইয়ান, সারিম এবং তাদের ছোট বোন সামিরা। মা হারানোর পর দিনগুলো ভাই-বোনদের জন্যে বেশ কঠিন ছিলো। আইয়ুব সাহেব অর্থাৎ সারিমদের বাবার জন্যেও দিনগুলো সহজ ছিলো না। এমন এক দুর্দিনে পরিবারকে পাশে না পেলে তাঁরা হয়তো আজীবন ঘোরের মাঝেই থেকে যেত। পুরো পরিবার প্রিয়জন হারানোর দুঃখে জর্জরিত হলেও তাঁরা বাহিক্য দিক দিয়ে শক্ত থেকে তাদের সঙ্গ দিয়েছে, পাশে থেকেছে। সবচেয়ে কঠিন ছিলো সামিরাকে সামলানো। সামিরা বেশ কয়েকবার হাসপাতালে ভর্তি পর্যন্ত হয়েছিলো।
জ্যুতি নিজ হাতে শ্বাশুড়ি এবং ভাশুরকে চা দিয়ে এলেন। জ্যুতির স্বামী অফিসে গিয়েছে। সারিম বছরখানেক হলো অফিস যাচ্ছে। তবে পুরোপুরি সব বিষয়ে অভিজ্ঞ নয়। অভিজ্ঞতা না থাকায় পুরো শাখা সামলানো সারিমের পক্ষে সম্ভব না। এ কারণে তাঁর চাচা সোহেল সাহেবও অফিস আসা-যাওয়া করছে। আইয়ুব সাহেব স্ত্রী হারানোর পর অফিস যাওয়া ছেড়ে দিয়েছিলো। ভেবেছিলো এখন তাকে সন্তানদের সাথে সময় কাটাতে হবে। কিন্তু সারিম এবং সাইয়ান নিজেদের সামলে নিয়েছিলো। তাই বছর দুয়েক ছোট মেয়েটাকে সামলে দিয়ে সকলের জোরাজুরিতে আবারও ছোট ভাইয়ের সাথে অফিসের হাল ধরে।
জ্যুতি চা দিলে রোকসানা থমথমে মুখে চাটা হাতে তুলে নিলো। রুমানা মা! রা যাওয়ার পর সংসারের সমস্ত ভার এসে পরেছে জ্যুতির কাঁধে। একা হাতে এতগুলা দিন ধরে সকলের খেয়াল রাখছে। নিশ্চয়ই এই দিকটি প্রসংশনীয়। রোকসানা চায়ে চুমুক দিতেই জ্যুতি বলে ওঠে,
–“দুপুরের জন্যে কী রান্না করবো মা?”
রোকসানা আড়চোখে তাকালেন ছোট বউয়ের দিকে। জ্যুতি উৎসুক হয়ে চেয়ে আছে রোকসানার দিকে। এটা প্রতিদিনের অভ্যাস জ্যুতির। শ্বাশুড়িকে জিজ্ঞেস করে খাবার রান্না করতে যায় সে। রোকসানা হালকা গলা খাঁকারি দিয়ে কয়েক পদের তরকারির কথা বললেন। এছাড়া অতিরিক্ত কোনো কথা বললেন না। জ্যুতি তপ্তশ্বাস ফেলে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ালো। জ্যুতি চলে যেতেই পাশ থেকে আইয়ুব সাহেব মায়ের উদ্দেশ্যে বলে ওঠে,
–“এভাবে আর কতদিন মা? ছেলে-মেয়েরা বড়ো হয়ে গেলো অথচ আপনি আজও জ্যুতির সাথে ঠিক ভাবে কথা বলেন না। বিষয়টি বড্ড দৃষ্টিকটু লাগে!”
রোকসানা বেগম চুপ করে চায়ে চুমুক দিচ্ছে। আইয়ুব সাহেবের কোনো কথাই যেন কানে তুললেন না। নীরব থেকে কিছুক্ষণ পর বললো,
–“সব কথা কইতে হয় না বাজান। বেশি কইতাম দেখে বড়ো বউরে হারাইছি। এহন ছোট বউরে হারানোর মতো সাহস এই কলিজায় নাই!”
–“না হারাতে চাইলে কথা বলুন মা, মিশুন। জ্যুতি এখনো হতাশায় ভুগছে এই ভেবে যে আপনি জ্যুতিকে মেনে নেননি।”
এবার রোকসানা একদম চুপ হয়ে গেলো। কোনো কথাই বললো না।
—————-
সারিমের গাড়ি কলেজের গেট অবধি পৌঁছাতেই দেখা গেলো সোহা গেটের সামনে দাঁড়িয়ে মেহেরের অপেক্ষা করছে। সোহাকে দেখে মেহেরের অধরে এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে। সে দ্রুত ভঙ্গিতে সিটবেল্ট খুলতে নিলে সারিম তাকে আটকে দেয়। মেহের হাসতে ভুলে পিটপিট করে চাইলো সারিমের দিকে। সারিম গম্ভীর গলায় বলে,
–“তোর হাঁ-দারাম ভাইটাকে বলিস বেশি উড়লে সে বাইক হারা হবে!”
মেহেরের তখন বলতে ইচ্ছে করলো, “হাঁ-দারাম ভাই তো আপনিও হতে পারেন সারিম ভাই!”
কিন্তু সেই সাহস মেহেরের হলো না। মেহেরকে অন্যমনস্ক দেখে সারিম মেহেরের চোখের সামনে চুটকি বাজালো! ভ্রু কিঞ্চিৎ কুচকে বললো,
–“শুনেছিস?”
মেহের দ্রুত মাথা নিচে উপরে নাড়িয়ে বললো, “হ্যাঁ!”
সারিম সিটবেল্ট ছেড়ে দিলো। গলার টাই ঠিক করতে করতে বলে,
–“সাইয়ান ভাইয়ের কারণে দুটো বেঁচে গেছিস। নয়তো তোদের বাঁকা থেকে সোজা করার সুযোগ ছিলো হাতে!”
মেহের কোনো কথা না বলে সিটবেল্ট খুলে দরজা খুলে বেরোলো। সোহা মেহেরকে দেখতে পেতেই হাসি-মুখে এগিয়ে এলো। সারিম জানালার কাঁচ নামিয়ে মেহেরকে ডাকলো, “মেরু” সম্বোধন করে। মেহের ঘুরে তাকালে সারিম বললো,
–“সাবধানে থাকবি। কেউ বিরক্ত করলে অবশ্যই জানাবি!”
বলেই সারিম জানালার কাঁচ উঠিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে চলে যায়। সোহা সারিমের চলে যাওয়া দেখলো। হা করে। মেহের সোহাকে নিয়ে গেট দিয়ে কলেজে প্রবেশ করলো। হাঁটতে হাঁটতে সোহা অস্ফুট স্বরে বললো,
–“মেরু?”
মেহের চমকে সোহার দিকে চাইলো। সোহা মেহেরের দিকে জিজ্ঞাসু চোখে চাইলো। মেহেরের চমকানো দেখে সোহা ভ্রু কুচকে বলে,
–“মেরু বলে ডাকা মালিকটি কে শুনি?”
মেহের হালকা ঢোঁক গিলে এগোতে নিলে সোহা হাত ধরে আটকালো। হালকা হেসে ব্যঙ্গ করে বললো,
–“কোথায় পালাচ্ছো মেরু?”
–“খবরদার আমায় এই নামে ডাকবি না?”
–“কেন? এই নামে ডাকা আইনত অ\ পরাধ নাকি?”
মেহের কিছু বললো না। চলে যেতে নিলে সোহা আবার আটকালো। এক গাল হেসে বলে,
–“বললি না তো মেরু সম্বোধন করা মালিকের নাম?”
–“কাজিন হয় ভাইয়া!” মেহেরের সহজ স্বীকারোক্তি!
–“ও আচ্ছা। এজন্যে বুঝি মুখটা পেঁচার মতো করে রেখেছিস?”
–“আমি স্বাভাবিক আছি।”
–“আমিও তা ভালোভাবে দেখতে পাচ্ছি। কেমন ভাই রে এটা? এতো সুইট করে ডাকলো। আর আমার কাজিন গুলাকে দেখ, পেত্নি, বিলাই, গাভী ছাড়া ভালো নামে ডাকে না। যদিও সবগুলা ম্যারিড। তা তোর এই ভাই কী সিঙ্গেল নাকি? না তোর সাথে কোনো প্রেমঘটিত কিছু..?”
–“চুপ কর তো। কিসের সাথে কী মিলাচ্ছিস? সারিম ভাইয়ের সাথে আবার কিসের প্রেম?”
–“বাহ, কী কিউট নাম। তবে আমার কাছে ঘাপলা লাগছে জানিস। যেভাবে সুইট করে তোকে ডাকলো না, এখনো কানে এসে বাজছে। আর…”
মেহেরের কোনো কথা বলার ইচ্ছে হলো না। সোহার হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে কলেজের ভেতরে চলে গেলো। গিয়ে দেখলো সিঁড়ির দিকে মাহিম একা দাঁড়িয়ে একটি মেয়ের সাথে ভাব জমাচ্ছে। মেয়েটির চেহারা দেখে মনে হচ্ছে পটবে পটবে ভাব। এমতাবস্থায় মেহেরের মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি খেলে গেলো। নীরবে হেসে মুখে মাস্ক পরে মাথায় ওড়না পেচালো। অতঃপর গলাটা পরিষ্কার করে সেদিকে এগিয়ে গেলো। হঠাৎ করে আগমন ঘটিয়ে মাহিমের বুকে জোরে কিল দিয়ে বলে,
–“শ* তান, লু**চ্চা ছেলে। তোর সাহস তো কম না আমার সাথে সম্পর্কে জড়ানোর পরে আরেকজনকে পটাচ্ছিস? এই বেশরম? কয়ডা লাগে তোর?”
এরকম কথা শুনে তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠে মেয়েটি। সবকিছু এত দ্রুত-ই ঘটলো যে মাহিমের মস্তিষ্কে সবকিছু গোলমাল পাকিয়ে গেলো। হঠাৎ যখনই কন্ঠটি চিনতে পারলো তখনই বাম গালটায় চ! ড় পরলো। সেই মেয়েটাই দিয়েছে। মেয়েটি মাহিমকে মে*রেই চলে গেছে। মাহিম গালে হাত দিয়ে বেক্কলের মতো চেয়ে রইলো মেয়েটির যাওয়ার পানে। হঠাৎ মেহের ফিক করে হেসে উঠলো। হাসির শব্দ শুনে গরম চোখে চাইলো মাহিম। চিৎকার করে বলে ওঠে,
–“মেহেরের বাচ্চা!”
———————–
–“সাইয়ান ভাইয়া? আপনি কবে বিয়ে করছেন?”
ইলিরার এরকম বাক্য শুনে সাইয়ান ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেললো। থমথমে সুরে বললো,
–“আমার বিয়ে নিয়ে কাজ কী?”
–“আপনার বিয়ের জন্যেই তো আমার সবকিছু আটকে আছে। একেতো আমি সারিমকে ভালোবাসি, বিয়ের জন্যে বাসা থেকে চাপ দিচ্ছে। ওদিকে সারিম হচ্ছে মেজো ছেলে। আপনাকে বিয়ে না দিয়ে কিছুতেই সারিমকে বিয়ে দেবে না আপনার পরিবার। প্লিজ ভাইয়া বিয়ে করুন, সারিমকে ছাড়া আমি আর টিকতে পারছি না। প্লিজ, ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড!”
[ক্রমশ]