#বাসন্তীগন্ধা
| পর্ব ০৪ |
লাবিবা ওয়াহিদ
–“আপনার বিয়ের জন্যেই তো আমার সবকিছু আটকে আছে। একেতো আমি সারিমকে ভালোবাসি, বিয়ের জন্যে বাসা থেকে চাপ দিচ্ছে। ওদিকে সারিম হচ্ছে মেজো ছেলে। আপনাকে বিয়ে না দিয়ে কিছুতেই সারিমকে বিয়ে দেবে না আপনার পরিবার। প্লিজ ভাইয়া বিয়ে করুন, সারিমকে ছাড়া আমি টিকতে পারছি না। প্লিজ, ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড!”
ইলিরার মুখে এই ধরণের কথাবার্তা শুনে সাইয়ান ফোস করে নিঃশ্বাস ফেললো। নিজেকে যথেষ্ট সংগত রেখে বলে,
–“আমি তোমার কথায় বিয়ের মতো কোনো সিদ্ধান্ত নিবো না। এছাড়া তুমি সারিমের বন্ধু ইলিরা। বন্ধুত্বকে কেন অন্য সম্পর্কে রূপান্তর করতে চাইছো বলো তো?”
–“হ্যাঁ, আমরা বন্ধু। একসাথে বন্ধু হিসেবে অনেক সময় কাটিয়েছি, ঘুরেছি। কিন্তু ওইযে, একটা মানুষ পাথরের সাথে অনেকদিন থাকলেও সেই পাথরের প্রতি মায়া জম্মায়, সেই পাথরকে নিজের থেকে দূরে রাখে না। সেখানে সারিম তো আস্ত একজন মানুষ। কখন কীভাবে ভালোবেসে ফেললাম, আই ডোন্ট নো। এখন আমার এমন অবস্থা হয়েছে যে সারিমকে ছাড়া আমি কাউকেই ভাবতে পারছি না!”
–“তো এসব সারিমকে গিয়ে বলো। আমায় কেন বিরক্ত করছো?”
ওপাশ থেকে মনে হলো ইলিরা কষ্ট পেলো। সাইয়ান এতে মাথা ঘামালো না। কাজের মনোযোগ ন!ষ্ট হওয়ায় সাইয়ান নিয়ন্ত্রণে নেই। তাই মনে যা এলো তাই বলে দিলো। ইলিরা ধীর কন্ঠে বললো,
–“কী করবো বলুন। সারিম আসক্তিতে পরিণত হয়েছে। এছাড়া আপনার মনে হয় সারিম এ কথা জানলে আমাদের বন্ধুত্ব থাকবে?”
সাইয়ান কল কেটে দিলো। ইচ্ছে করছে না এসব শুনতে। কখনো বাড়ি থেকে বিয়ের চাপ এলো না আর অন্য মেয়ে তাকে বিয়ে করতে বলছে। অদ্ভুত অবস্থা। সাইয়ান এখনই বিয়ে করতে প্রস্তুত নয়। তাঁর ঘাড়ে এখন অনেক দায়িত্ব। সর্বপ্রথম আদরের ছোট বোনটাকে ভালো ঘরে বিয়ে দিতে হবে। অতঃপর এই বিজনেস সামলাতে হবে। পরিবারকে সামলাতে হবে। বিয়ে নিয়ে ভাবার সময় কোথায়? এসব নানান চিন্তা মাথায় আসতেই সাইয়ান শব্দ করে ল্যাপটপটা বন্ধ করে দিলো। কিছুক্ষণ চোখ বুজে লম্বা নিঃশ্বাস ফেললো। চোখ মেলে তাকাতেই দেখলো ঘড়ির কাঁটা ন’টায় ছুঁয়েছে। অফিসেও লোকজন নেই। সাইয়ান বেশি কিছু না ভেবে ফোন এবং গাড়ির চাবিটা নিয়ে অফিস থেকে বেরিয়ে গেলো। গাড়ি নিয়ে বের হতেই দেখলো রোজা রিকশার জন্যে দাঁড়িয়ে আছে। সাইয়ান গাড়ি থামিয়ে আশেপাশে তাকালো। এখানে কোনো রিকশা দেখা যাচ্ছে না। যাও দু’একটা দেখা আচ্ছে, সেগুলো যাত্রীদের দখলে। সাইয়ান চাইলেও রোজাকে ফেলে যেতে পারলো না। সাইয়ান তাঁর প্রতিটি অফিস কর্মীর প্রতি বিনয়ী এবং সদয়। তার ভাষ্যমতে বিজনেস রুলসের শীর্ষে যেটা আছে সেটা হচ্ছে কর্মচারীদের সাথে বন্ধুর মতো মিশতে হবে, মিশলেই কর্মচারীটা একটু ভরসা এবং আনন্দ পাবে। এতে কাজের প্রতিও তাদের মনোযোগ বাড়বে এবং উৎসাহিত হবে। সাইয়ানের আবার মিশতে পারার গুণটি রয়েছে। তাইতো সব দিক ভেবে-চিন্তে আইয়ুব সাহেব ছেলেকে চট্টগ্রামের ভার ছেলেকে একা দিলেন। বড়ো ছেলের প্রতি তাঁর সম্পূর্ণ আস্থা রয়েছে।
সাইয়ান গাড়ি নিয়ে রোজার সামনে চলে গেলো। রোজা প্রথমে চমকালেও পরমুহূর্তে নিজেকে সামলে নিলো। হাসার চেষ্টা করে বললো,
–“স্যার আপনি?”
সাইয়ান সৌজন্যমূলক হাসি দিয়ে বলে,
–“একা দাঁড়িয়ে আছেন?”
–“জি। আসলে রিকশা পাচ্ছি না!”
–“আচ্ছা, কোনো ব্যাপার না। আপনার কোনো আপত্তি না থাকলে আমার সাথে আসতে পারেন৷ একই এপার্টমেন্টে যেহেতু থাকছি!”
–“কিন্তু স্যার..”
–“প্লিজ মিস রোজা। আপনাকে রেখে গেলে চিন্তিত থাকবো। কথা রাখুন!”
রোজা সাইয়ানের মুখে “প্লিজ” শব্দটি শুনে কিছুটা লজ্জিত হলো। সাইয়ানের কথা মেনে নিয়ে রোজা গাড়ির দরজা খুলে উঠে বসলো। সিটবেল্ট লাগালে সাইয়ান আলতো হেসে গাড়ি স্টার্ট দেয়। রোজা হাতে নখ খোঁচাতে খোঁচাতে মিনমিন করে বলে,
–“আপনি আমার বস হন, তাই আমায় প্লিজ বলবেন না কখনো। আপনার কর্মচারী আমি, অর্ডার করবেন!”
রোজার এরূপ কথায় সাইয়ান হাসলো। হাসি বজায় রেখে বলে,
–“ওরকম ভাবাটা মূর্খামি মিস। আপনি কর্মচারী হওয়ার আগে একজন মানুষ। মানুষ মানুষের প্রতি যতটুকু সদয় থাকার দরকার আমি ততটুকুই চেষ্টা করি। আদেশ করার মালিক তো উপরে থাকা আল্লাহ্। আমরা তাঁর আদেশ-নিষেধ কতটুকু মেনে চলি বলুন তো? দুনিয়ার এসব মাহাজন, বস এরা তো পুঁটিমাছ তাঁর কাছে। কিন্তু মানুষ উপরের জনকে ছেড়ে পুঁটিমাছের পিছে প্রতিনিয়ত ছুটছে!”
রোজা হাসলো। হেসে রসিক সুরে বলে,
–“পেট চালাতে পুঁটিমাছের পেছনে ছুটাই স্বাভাবিক। আমাদের মতো কর্মচারী’রা তো বসদের পুঁটিমাছ নয়, বরং হা!ঙ্গর মনে করে।”
রোজার কথায় সাইয়ান না হেসে পারলো না। হাসি থামিয়ে সাইয়ান বলে,
–“আপনার যুক্তিটা ভালো লাগলো!”
——————
সারা ক্লাসে মাহিম মুখে কালো মাস্ক পরে ক্লাস করেছে। বন্ধু’রা টান দিয়ে খুলতে চাইলেও মাহিম অতি কৌশলে তাদের থেকে ছাড়া পেয়ে গেছে। টিচার’রাও সেভানে মাহিমের মুখের মাস্কটা খেয়াল করেনি৷ সব ঠিক থাকলেও শেষ ক্লাসে মাহিমের রক্ষা হলো না। পিছনে গুণগুণ কানে এলে সর্বপ্রথম মাহিমের দিকেই টিচারের সূক্ষ্ম নজর গেলো। সন্দেহ বাড়লো মাহিমের মুখে মাস্ক দেখে। টিচার গলার স্বর বাড়িয়ে বললো,
–“মাস্কটা খোলো মাহিম!”
মাহিম রাজি হলো মা। টিচার এবার ধমকিয়ে মাহিমকে বাধ্য করলো। মাহিম মুখটা বেজার করে সন্তপর্ণে মাস্কটা খুলে ফেললো। সাথে সাথে দৃশ্যমান হলো মাহিমের গালের তিন আঙুলের ছাপ। যেটা ভালোভাবেই লক্ষ্য করেছে মাহিমের বন্ধুরা। সাথে সাথেই হাসি-তামাশা করতে শুরু করলো, যার ফলে ক্লাসের সকলেই বিষয়টি জেনে গেলো। ক্লাসের মধ্যে হট্টগোলের কারণে টিচারও রেগে-মেগে সবাইকেই বেঞ্চের উপর কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখলো। পুরো ক্লাস আর বসার সুযোগ পেলো না।
এদিকে মেহেরও রয়েছে মহা মুশকিলে। সোহা সবার সামনে বারবার ঠাট্টা করে “মেরু” বলে ডাকছে। যার ফলে আরও কয়েকজন মেয়েও তাকে মেরু ডাকা শুরু হয়েছে। মেরু ডাকের সাথে সোহা সারা ক্লাস সারিমের নাম করে করে মেহেরকে চেতিয়েছে। কাজিন লাভের একশটা গল্প শুনিয়েছে, আরও কত কী। এসবে মেহের অতীষ্ঠ হয়ে খাতার এক পেজ ছিঁড়ে সেটাকে মুড়িয়ে সোহার মুখে ভরে দিলো। এই দৃশ্যটি টিচারের চোখে পরতেই টিচার মেহেরকে ক্লাস থেকে বের করে দেয়। জমজ ভাই-বোনের কারোই আজ কলেজে ভালো দিন কাটলো না। উপরওয়ালা বুঝি দু’জনকে বুঝিয়ে দিলো, একজনের কপাল পু!ড়লে আরেকজনেরও পুড়বে।
কলেজ শেষ হতেই মেহের সোহাকে ফেলেই দ্রুত কলেজের বাইরে চলে গেলো। আজ তাকে কেউ নিতে আসেনি, তাই অপেক্ষা না করেই হাঁটা শুরু করলো সে। বাস ছাড়া বাড়ি পৌঁছানো সম্ভব না। তাড়াহুড়োয় টাকা আনতেও সে ভুলে গিয়েছে। নয়তো একটা সিএনজি রিজার্ভ করে বাড়ী চলে যেতে পারতো। রিকশাতেও যা কড়া দাম। এত টাকা পাবে কই? হাঁটতে হাঁটতে কিছুদূর চলে আসলে মাহিম বাইক নিয়ে তাঁর পথ আটকে দাঁড়ালো। মাহিমকে চোখে পরতেই মেহেরের তখনকার ঘটনা মনে পরলো। মেহের ফিক করে হেসে দিলো। মাহিম ফুঁসতে ফুঁসতে বাইক থেকে নেমে দাঁড়ালে মেহের হাসি আটকে মাহিমের দিকে এগিয়ে গেলো। মাহিমের গাল চেপে টেনে ধরে আঙুলের ছাপ দেখার চেষ্টা করলো। মাহিম তখন নিজের গাল থেকে মেহেরের হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বলে,
–“আমার গাল ছাড় ফইন্নি! নয়তো তোর মাথার সব চুল টেনে ছিঁড়ে ফেলবো!”
মেহের মজা নিয়ে বলে,
–“সাহস থাকলে ছিঁড়। আশেপাশে অনেক মেয়ে চলাফেরা করছে। তোর এই রঙ দেখলে আর পটবে না কিন্তু!”
মাহিম আশেপাশে তাকিয়ে চুপসে রইলো। মিনমিন করে বললো,
–“দেড় মিনিটের বড়ো ভাইকে ভয় দেখাচ্ছিস?”
–“না তো। এক বছরের জুনিয়র ভাইকে ভয় দেখাচ্ছি!”
বলেই ফিক করে হেসে উঠলো। অতঃপর মাহিমের গালের আঙুলের ছাপের দিকে তাকিয়ে ঠাট্টা করে বললো,
–“কয়ডা লাগে তোমার ভাই?”
–“মেহের!”
বলেই মাহিম শক্ত করে মেহেরের হাতে চিমটি কাটলো। মেহের ব্যথা পেয়ে দ্রুত সরে আসলো! গরম চোখে মাহিমের দিকে তাকিয়ে বলে,
–“অlসভ্য!”
–“তুইও সেই দলের। সর সামনে থেকে!”
বলেই বাইকে উঠলে মেহের দ্রুত মাহিমের দিকে এগিয়ে এলো। মাহিমের কাঁধের অংশ খামচে ধরে বললো,
–“আমারে নিয়ে যা মাহিম৷ একা কেমনে যাবো?”
–“আমি কী করে জানবো? বাসের পিছে দাঁড়িয়ে যা। সেই মুরোদ আছে?”
মেহের গরম কন্ঠে বলে ওঠে,
–“কেমন ভাই তুই? বোনেরে বাসের পিছে দাঁড়ানোর কথা বলে ভাগছিস? সারিম ভাই জানলে কী হবে জানিস?”
–“কচু জানবে। ছাড় আমার শার্ট।”
–“না, ছাড়বো না। আমায় নিয়ে যা। আমার কাছে এক টাকাও নেই। হারিয়ে গেলে সারিম ভাই সর্বপ্রথম তোরেই খুn করবে। কারণ, তুই আমাকে বাড়ি নিয়ে যাসনি!”
মাহিম মুখ বাঁকালো। মেহেরকে কোনোভাবেই শিক্ষা দিতে পারছে না সে। রা!গে মাথা ফেটে যাবার অবস্থা।
–“আমি মূর্খ নই যে তোর কথা শুনে ধৈ ধৈ করে তোকে নিয়ে বাড়ি যাবো। আজ তোর জন্যে আমার অনেক ইজ্জত বিসর্জন দিতে হয়েছে, তাই তোর তো একটা শিক্ষা পাওনা!”
বলেই মাহিম বাইক স্টার্ট দিয়ে যেই টান দিবে ওমনি মেহের বলে ওঠে,
–“তোর থাপ্পর খাওয়ার ভিডিও আমার কাছে আছে। আজ যদি আমায় ফেলে যাস তাহলে আমি তোর থাপ্পড় খাওয়ার ভিডিও সব মেয়ের কাছে ফরওয়ার্ড করে দিবো। নাও ডিসিশন ইজ ইওর’স!”
মাহিম তখনই বাইক বন্ধ করে দিলো। এবার মেহের মাহিমের অনুমতি না নিয়ে-ই বাইকে উঠে শক্ত করে মাহিমকে ধরে বসলো। মাহিম তখন পাথরের মতো বলে,
–“কে ভিডিও করেছে? কার কাছে ভিডিও?”
মেহের ঠোঁট চেপে হেসে মাহিমের কানে ফিসফিস করে বলে, “ভূতের কাছে!”
——————-
সারাদিন দুই ভাই-বোনের মাঝে ঝগড়া-ঝাটি, মা!রপিট চললো। সারিম যখন আসলো তৎক্ষণাৎ দুজনে ভালো মানুষের মতো ব্যবহার শুরু করলো। যেন কিছুই হয়নি, আবহাওয়া ঠিকঠাক। তবে মেহের নিজের রাগ সামলাতে না পেরে সামিরার সাথে তাঁর দাদীর রুমে বসে রইলো। সামিরা ফোনে চ্যাট করার পাশাপাশি মেহেরের কথা শুনে হাসছে। সামিরা এবার অনার্স শেষ বর্ষে পড়ছে। মেহেরের থেকে বেশ বড়োই বলা চলে। তবে সামিরার সাথে মেহেরের সম্পর্কটা বন্ধুত্বপূর্ণ। সামিরাকে মেহের সামি আপু বলে সম্বোধন করে। মাহিমও একই ডাকে সম্বোধন করে। তিনজনের আড্ডার মাঝে জ্যুতি চা, নাশতা নিয়ে রুমে প্রবেশ করলেন। জ্যুতিকে দেখে রোকসানা মুখটাকে ভার করে রাখলেন। কোনো কথা বললেন না। জ্যুতি এতে কিছুটা হতাশ হলেও মেয়েদের সামনে প্রকাশ করলেন না। হাসি-মুখেই তিনি চলে গেলেন। জ্যুতি চলে যেতেই মেহের রোকসানা বেগমের কোলে মাথা দিয়ে বলে,
–“আম্মুকে কেন মেনে নাও না তুমি দাদী? আম্মু কষ্ট পায়!”
–“তোকে কে বলেছে মেনে নেইনি? মেনে না নিলে তোর মাকে বাড়ি রাখতাম?”
–“তো মাকে কষ্ট দিচ্ছো কেন?”
রোকসানা নাতীর দিকে চেয়ে বলে,
–“মাকে খুব ভালোবাসিস, তাই না রে?”
এবার সামিরাও রোকসানা বেগমের কোলে মাথা দিয়ে বলে,
–“ছোটমা কে আমরা সবাই ভালোবাসি!”
রোকসানা বেগম হাসলেন। এমন সময়-ই হালকা গলা খাঁকারি দিয়ে সারিম দরজায় নক করলো। সারিমের উপস্থিতি টের পেয়ে মেহের দরজার দিকে তাকাতেই দেখলো শীতল চোখে সারিম তাঁর দিকে চেয়ে আছে। মেহের ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে গায়ের জামা এবং ওড়না ঠিক করে পরিপাটি হয়ে বসলো। সারিম এবার ভেতরে এলো। মেহের অন্যদিকে তাকিয়ে আছে। সারিম এসেই মেহেরের উদ্দেশ্যে বললো,
–“পড়ার ইচ্ছা নেই? এখানে বসে আড্ডা দিচ্ছিস! চল আমার সাথে!”
মেহের এবার শান্ত স্বরে বলে,
–“সবসময় আমাকেই কেন পড়তে বসতে বলেন? সামিরা আপুও তো আড্ডা দিচ্ছে, তাকে কিছু বলেন না কেন?”
সারিম একপলক সামিরার দিকে চেয়ে বলে,
–“ওকে তোর মতো কান ধরে পড়তে বসাতে হয় না। ও যথেষ্ট মনোযোগী, এবার আয় আমার সাথে!”
বলেই সারিম বাইরে চলে গেলো। অগত্যা, মেহেরও মুখ ভার করে বেরিয়ে গেলো রুম থেকে৷ সারিম ফোন টিপতে টিপতে সিঁড়ি বেয়ে উঠছে। মেহের সারিমের পিছে পিছে। মেহের আনমনে কী যেন একটা ভেবে বলে,
–“সামিরা আপু মোটেও পড়াশোনায় এত মনোযোগী না। আমি জানি, আপুকে বিয়ে দিবেন বলেই আপুকে জোর করেন না৷ আপুকে ধমক দেন না। আব্বুকে বলবো আমাকেও যেন বিয়ে দিয়ে দেয়, তাহলে আপনিও আমায় আর কথায় কথায় বকবেন না!”
[ক্রমশ]
#বাসন্তীগন্ধা
| পর্ব ০৫ |
লাবিবা ওয়াহিদ
–“সামিরা আপু মোটেও পড়াশোনায় এত মনোযোগী না। আমি জানি, আপুকে বিয়ে দিবেন বলেই আপুকে জোর করেন না৷ আপুকে ধমক দেন না। আব্বুকে বলবো আমাকেও যেন বিয়ে দিয়ে দেয়, তাহলে আপনিও আমায় আর কথায় কথায় বকবেন না!”
———
সারিম হঠাৎ থেমে যায় মেহেরের এরূপ কথায়। সারিমকে দেখে মেহেরও থেমে মাথা উঁচু করে তাকায়। সারিম ঘাড় বাঁকিয়ে মেহেরের দিকে তাকাতেই দুজনের চোখাচোখি হয়ে গেলো। মেহেরের মস্তিষ্কে হঠাৎ-ই তরঙ্গিত হলো সোহার বলা কথাগুলো। পিটপিট নজরে চেয়ে রইলো সারিমের দিকে। খুব খুঁটে খুঁটে পর্যবেক্ষণ করলো সারিমের মুখমন্ডল। আচ্ছা সোহা যা বলছে তা কী আদৌ সম্ভব? পরমুহূর্তে নিজেকে ধিক্কার জানিয়ে নজর ঘুরিয়ে ফেললো মেহের। ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে সারিমের দিকে আবার তাকাতেই মেহেরের ভেতরটা কেঁপে উঠলো৷ সারিমের চেহারার রঙ পরিবর্তন হয়েছে, মেহের তো সেভাবে খেয়াল-ই করেনি। মেহের আমতা আমতা করে বললো,
–“ওভাবে দেখছেন কেন?”
সারিম ভ্রু কুচকে গলার স্বর পালটে বললো,
–“বিয়ের খুব সখ?”
ভয়ে জর্জরিত মেহের এক সিঁড়ি নিচে নেমে গেলো। মেহেরকে ওভাবে পেছাতে দেখে সারিম আবার বললো,
–“নিচে নামছিস কেন? আমার কাছে আয়!”
মেহের ডানে-বামে মাথা নাড়িয়ে বলে,
–“আ..আমার বিয়ের কোনো সখ নেই!”
–“তাই? আচ্ছা যা, বুঝলাম! আয় আমার সাথে।”
বলেই সারিম ধুপধাপ পা ফেলে উপরে চলে গেলো। মেহের প্রথমে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেও পরমুহূর্তে মাথায় এলো, শেষ কথাতেও সারিমের মুখের রঙ একই দেখা গিয়েছিলো। এর মানে কী বিপদ এখনো চৌকাঠে? মেহের ভয়ে ভয়ে পা ফেলে উপরে গেলো। কী হচ্ছে আজ?
মেহেরের ভয় সত্যি হলো। সারিম তাকে পানি*মেন্ট দিলো। পানি*মেন্ট হলো দুইশোবার লিখতে হবে,
“আমি বিয়ে করতে চাই না।”
এরকম পানি*মেন্ট পেয়ে মেহেরের কাঁদো কাঁদো অবস্থা। পরীক্ষা ব্যতীত মেহের একদমই লিখতে চায় না। সেখানে অযৌক্তিক লেখা তাকে লিখতে হবে? মেহের বাধ্য হয়ে নিজের সব দুঃখ বুকে চেপে লিখছে। সারিম একটা ম্যাগাজিন পড়তে পড়তে বললো,
–“আজ শুনেছি মাহিমের সাথে বাইক রাইড দিতে গিয়ে তোর মাথা ঘুরিয়েছে, বমি-টমি করেছিস, তাই দুইশো লিখতে দিলাম। কিন্তু নেক্সট টাইম এক ভুল করলে কানে ধরিয়ে ছবি তুলবো তোর। খুব বিয়ের সখ না, ফাঁকিবাজির বুদ্ধি। আমি বেঁচে থাকতে তুই বিয়ে কী করে করিস আমিও তা দেখে ছাড়বো!”
–“তাহলে কী আমি কোনোদিনও বিয়ে করবো না?”
মনে মনেই আওড়ালো মেহের। সামান্য বিয়ের কথা বলায় এত রাগ কেন করলো সারিম? কী সমস্যা তাঁর? সবই মাথার উপর দিয়ে গেলো মেহেরের।
মাহিম নিজের রুমে বইয়ের পৃষ্ঠা উলটে – পালটে দেখছে এবং কিছুক্ষণ পরপর মোবাইলের দিকে তাকাচ্ছে৷ মোবাইলটা সুইচড অফ করে রেখেছে সে। আজকে গালে যা চড় পরেছে, কোনো মেয়ের সাথেই কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। রাগে, ক্ষো* ভে সবই বিষাদ লাগছে মাহিমের। হঠাৎ দরজা খোলার শব্দ শুনে পিছে ফিরে তাকালো মাহিম। মেহের এসেছে। হাতে তোয়ালে জড়ানো কিছু একটা। মেহেরকে দেখে মাহিম রাগান্বিত স্বরে বলে ওঠে,
–“এই রাতে আমার রুমে তোর কী?”
মেহের হাই তুলতে তুলতে বললো,
–“তোমার গালটার খোঁজ নিতে এসেছি!”
–“কাঁটা ঘায়ে নুনের ছিটা দেওয়া হলে আসতে পারিস!”
–“ফ্যাচফ্যাচ না করে বিছানায় আসো!”
মাহিম শুনলো না। মেহের পেছন থেকে মাহিমের কলার ধরে টেনে উঠিয়ে বিছানায় বসালো। ওড়না দিয়ে মেহেরের গাল ঘঁষতে ঘঁষতে বললো,
–“ফাউন্ডেশন মা*লে দাগ যাবে কিন্তু ব্যথা সারবে না!”
–“তোর এত দরদের আমার দরকার নেই। বিদায় হ!”
মেহের শুনলো না মাহিমের কথা। তোয়ালে জড়ানো বরফের বোতলটা মাহিমের গালে লাগিয়ে রাখলো। মাহিম নড়াচড়া করলে মেহের উঁচু গলায় বলে,
–“চুপ করে বসে থাকো। নয়তো বরফের জায়গায় আম্মুর ব্যবহৃত গরম খুন্তি এনে গালে লাগিয়ে দিবো!”
–“সাহস বেড়েছে?”
–“খুব। কেন, তুমি জানো না?”
মাহিম আর কিছু বললো না। মেহের মাহিমের গালে হালকা করে ধরে রেখেছে বোতলটা। আহারে বেচারা মাহিম, এখন যদি এই মেয়েবাজি থেকে কিছুটা বেরিয়ে আসতে পারে।
মাহিম কিছু সময় চুপ থেকে বললো,
–“হঠাৎ আমার উপর দরদ দেখাতে আসলি যে?”
মেহের ত্যাড়া গলায় বললো,
–“দরদটা লিমিট ক্রস করে গিয়েছে তো!”
মাহিম মেহেরের দিকে ফিরতে নিলে মেহের মাহিমের গলায় চিমটি কেটে দিলো। মাহিম পালটা মেহেরের চুল টেনে দিলো। ভাই-বোনের কার্যকলাপ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে নীরবে দেখে গেলো সারিম। কিছু মুহূর্ত পর নৈঃশব্দে হাসলো। ভাই-বোনের ভালোবাসাই আলাদা। কখনো কারো জন্যে মুখে প্রকাশ পায় না।
—————-
–“মেরু~~, কাল ওভাবে পালালি কেন?”
সোহার এরূপ ব্যঙ্গতে মেহের সোহার থেকে দূরে সরে হাঁটতে লাগলো। সোহা হেসে মেহেরের কাছে এসে পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে বললো,
–“সত্যি বলছি মেরু, কাজিন লাভ গুলো খুব সুন্দর হয়। সুন্দর না হলে কী আগে পারিবারিক বিয়ে হতো? বেশিরভাগ পরিবারেই পারিবারিক বিয়ে হয়। এক বাসায় বাবা-মায়ের সাথে মিলেমিশে থাকবি। কী মজা।”
–“সোহা প্লিজ। ভালো লাগছে না।”
–“কেন বিশ্বাস হচ্ছে না? ইতিহাস ঘেটে দেখ, উত্তর পেয়ে যাবি!”
মেহের অন্যমনষ্ক হয়ে হাঁটতে শুরু করলো। সোহার কথাবার্তা তাঁর এক কান দিয়ে ঢুকছে আর আরেক কান দিয়ে বের হচ্ছে। ক্লাসে এসে মেহের জানতে পারলো তাদের সাথে এক সহপাঠীর এঙ্গেজমেন্ট হয়েছে। সেই সহপাঠীর হাতের রিং দেখতে তাকে বেশ কিছু মেয়ে ঘিরে রেখেছে৷ তাদের আগ্রহ এঙ্গেজমেন্ট রিং এবং মেয়েটির লাভ স্টোরি শোনার। সোহাও তাদের মাঝে গিয়ে সামিল হলো। মেহের সেই সহপাঠীর পিছের বেঞ্চেই একা বসে আছে। সোহা আগ্রহী হয়ে মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করলো,
–“এরেঞ্জ ম্যারেজ? আই মিন আগে কখনো দেখা হয়েছে?”
মেয়েটি চোখে-মুখে লজ্জা ফুটিয়ে বললো,
–“আমার মামাতো ভাই আমার উড বি!”
সোহা মারাত্মক খুশি হয়ে শুধায়,
–“ওয়াও! কাজিন লাভ! আমেইজিং ইয়ার!”
মেহের ফোনের মধ্যে ম্নজর স্থির রাখলেও তার কান খাড়া ছিলো। কাজিন লাভ শুনতেই তার ভেতরের ধুকপুকানি বেড়ে গেলো। গতকাল থেকে এমন অদ্ভুত লাগছে কেন? সোহার কথায় কী ছিলো যা তাকে এত বেশি ভাবাচ্ছে? নাহ, সবকিছুই অযৌক্তিক। সারিম ভাইয়াকে নিয়ে বেশি ভাবাটা উচিত হচ্ছে না। সোহার কোনো কথায় তার কান দিলে চলবে না।
—————–
রোজা একমনে আহত রাতুলের দিকে শীতল নয়নে চেয়ে আছে। রাতুল মাথা নিচু করে বসে আছে। রাতুলের হাতে, মাথায় এবং পায়ে ব্যান্ডেজ। রাতুলের পাশে বসেই রোজার মা তাকে বাতাস করছে। এদিকে লোডশেডিং এর মাত্রা খুব বেশি। এমনিতেই গরম তার উপর ছেলেটার এই অবস্থা। রোজা ভাইয়ের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে বলে,
–“কী দরকার ছিলো বাজি ধরে খেলার? তোকে মানা করেছিলাম এসব বাজি টাজি না ধরতে। খেলতে যাবি ভালো কথা, তোর চাইতে বড়ো ছেলেগুলোর সাথে লাগতে যাস কেন তুই? কবে বুঝবি এসব করলে পরিণাম খারাপ বৈ ভালো হবে না!”
রাতুল মাথা নিচু করে বলে,
–“ভুল হয়ে গেছে বুবু। আর হবে না!”
–“বিছানায় লটকানোর পর মনে পরে ভুল হয়েছে নাকি ঠিক? আঠারো বছর বয়স হওয়ার পরেও বুদ্ধি নিয়ে চলতে পারিস না? তুই এভাবে বিছানায় পরে থাকলে মাকে আমি কার ভরসায় রেখে যাবো? তোর তো কলেজও আছে রাতুল!”
রোজার রাগা-রাগি থামাতে রোজার মা বলে ওঠে,
–“এত বকিস না তো। ওদের বয়স-ই তো খেলাধুলা এবং চোট পাবার। ছেলেটার ভুল হয়েছে, ক্ষমা করে দে!”
রোজা এবার মায়ের দিকে চেয়ে বলে,
–“তোমাদের জন্যে তোমাদের ছেড়ে দূরে চাকরি করছি। তোমাদের ভরণপোষণ তুলছি, যাতে রাতুল এবং তোমার কোনো সমস্যা না হয়৷ প্রতি মুহূর্তে চিন্তা করছি রাতুলের এবং ওর ভবিষ্যতের। এমতাবস্থায় যদি ও হাত-পা ভেঙে বিছানায় পরে থাকে তখন আমার কেমন লাগতে পারে মা?”
রোজার এরূপ কথায় রোজার মা চুপসে গেলেন। মেয়েকে সামলানো সহজ না। বেশ রেগে আছে সে। রোজাও বুঝলো সে বেগতিক কথা-বার্তা বলে ফেলছে। তাই রাগ নিয়ন্ত্রণ করে রোজা তাঁর ব্যাগ উঠিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো। রোজার মা মেয়ের পিছু ডাকতে ডাকতে গেলো। কিন্তু রোজা ত্রি-সীমানার বাইরে চলে গেছে। রোজার মা তপ্ত-শ্বাস ফেলে ভেতরে আসলেন। রাতুল মায়ের মুখ দেখে বুঝে গেলো তার বোন চলে গেছে। রাতুল ভাঙা গলায় বললো,
–“বুবু খুব রেগে আছে আমার উপর?”
রোজার মা ম্লান হাসলেন। হেসে বললেন,
–“তোর বুবুকে তো চিনিস বাবা। যখন তখন চটে যায় আবার সময় পেরুতে না পেরুতেই স্বাভাবিক। মনে দুঃখ নিস না। একদমই রেগে নেই রোজা!”
রাতুল কিছুক্ষণ চুপ থেকে মায়ের উদ্দেশ্যে বললো,
–“আমি আর এমন কিছুই করবো না যাতে বুবু কষ্ট পায়।”
~চলবে, ইন-শা-আল্লাহ্।