#বাসন্তীগন্ধা
|০৬|
লাবিবা ওয়াহিদ
———————-
রোজা লিফটের সামনে বিষণ্ণ মনে দাঁড়িয়ে আছে। মুখটা তাঁর ভার। চোখের সামনে আহত ভাইটার বর্তমান চিত্র ভেসে উঠছে। রোজা তপ্তশ্বাস ফেলে পুণরায় লিফটের বাটন চাপলো। কিছু মুহূর্ত পর হঠাৎ নিস্তব্ধ সিঁড়িতে পরিচিত কন্ঠস্বর শুনতে পেলো। হ্যাঁ, সাইয়ানের-ই কন্ঠ। মনে হচ্ছে কারো সাথে কলে কথা বলতে বলতে নামছে। রোজা উঁকি দিয়ে উপরে তাকালো। ভুল শুনেনি সে। সাইয়ান-ই নামছে। কানে তাঁর ফোন। ফোনে ব্যস্ত থাকায় সাইয়ান রোজা খেয়াল করেনি। সে নেমে গেটের দিকে চলে যাচ্ছে। রোজাও দ্রুত সাইয়ানের পিছু ছুটলো। সাইয়ান রোজাকে খেয়াল করলে কানে ফোন নিয়ে সৌজন্যমূলক হাসি দিলো এবং সামনে এগোতে থাকলো। রোজা তাঁর পেছন পেছন-ই গেলো। গেটের বাহিরে আসলে সাইয়ান কথা শেষ করে রোজাকে জিজ্ঞেস করলো,
–“কোথাও যাচ্ছিলেন মিস রোজা?”
–“উম.. জি স্যার। কিছু কেনাকাটা ছিলো। আপনি এই অসময়ে বের হয়েছেন যে?”
–“একচুয়ালি আজ ফুপ্পি খাবার পাঠাতে পারেনি তাই রেস্টুরেন্টে যেতে হচ্ছে!”
রোজা জিজ্ঞাসু নজরে চাইলো সাইয়ানের দিকে৷ সাইয়ান বুঝলো রোজা তাঁর কথা বুঝতে পারেনি। তাই সাইয়ান আলতো হেসে হাঁটতে হাঁটতে বলে,
–“বাইরের খাবারে আমার ফুড পয়জনিং হয়। এজন্যে ছোট মা আম্মায় পইপই করে বারণ করে দিয়েছে যেন বাইরের খাবার না খাই। আমার ফুপ্পিও চট্টগ্রামে থাকে। তিনি-ই আমায় দুইবেলা খাবার পাঠায়। বাবাও ফুপ্পিকে বেশ জোরালো ভাবে অনুরোধ করেছে তাই ফুপ্পি পাঠায়!”
–“আপনার পরিবার আপনাকে খুব ভালোবাসে তাই না স্যার?”
সাইয়ান খোলা আকাশের দিকে চেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
–“ভালোবাসা আমরা তখনই বুঝি যখন প্রিয় মানুষের থেকে আমাদের দূরত্ব তৈরি হয়। বুঝলেন মিস রোজা?”
রোজা ইতিবাচক মাথা নাড়ায়। সাইয়ান তা দেখে আলতো হাসলো। রোজা কী মনে করে বললো,
–“তাহলে তো আজ বাইরের খাবার খেলে আপনার ফুড পয়জনিং হবে স্যার!”
–“ইট’স ওকে মিস রোজা। আই উইল ম্যানেজ!”
রোজার মন মানলো না। সে আবার বলে ওঠে,
–“আপনি যদি কিছু মনে না করেন আমি রান্না করে দেই আপনাকে?”
সাইয়ান এবার বেশ অবাক হলো। চমকে চাইলো রোজার দিকে। রোজা চোখে-মুখে একরাশ আশা নিয়ে চেয়ে আছে সাইয়ানের দিকে। সাইয়ানের চোখ-মুখ দেখে রোজা মাথা নিচু করে আলতো স্বরে বলে,
–“চিন্তা করবেন না। অখাদ্য, কুখাদ্য রাঁধি না আমি। উপরওয়ালার রহমতে রান্নার হাত আমার ভালোই!”
সাইয়ান হাসলো। হাসি বজায় রেখে বললো,
–“আমি তো সেরকম কিছু বলিনি।”
–“তাহলে আপত্তি কোথায়?”
–“আপনাকে খাটাতে ইচ্ছে করছে না!”
–“এখানে খাটনির কিছু নেই। বাসায় গিয়ে আমার এমনিতেও রান্না করতে হতো। সেখানে আপনার জন্যে রান্না করলে ক্ষতি কী?”
–“ঠিক আছে। আপনার কথাই রইলো!”
রোজার চোখ-মুখ অত্যন্ত জ্বলজ্বল করে উঠলো। নিজের খুশিকে খুব কষ্টে সামলে বলে,
–“বাসায় বাজার আছে?”
সাইয়ান মাথা চুলকে হালকা হেসে বলে,
–“না থাকাটাই স্বাভাবিক!”
রোজা নিঃশব্দে হেসে বলে,
–“বাজার করে আনি চলেন।”
———————-
–“বাবা ডেকেছিলে?”
বলতে বলতেই সোহেল সাহেবের রুমে প্রবেশ করে মেহের। সোহেল সাহেব হাতে একটি খাতা নিয়ে মুচকি হেসে বলে,
–“হ্যাঁ মা। ডেকেছিলাম। আসো!”
মেহের রুমের ভেতর নজর বুলিয়ে দেখলো সিঙ্গেল সোফায় সারিম বসে কফি খাচ্ছে এবং একটি ফাইল দেখছে। সোহেল সাহেবের হাতে খাতার মতো কিছু একটা দেখে মেহেরের ভ্রু কুচকে গেলো। আস্তে আস্তে এগিয়ে গেলো বাবার কাছে। সোহেল সাহেব মেয়েকে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে খাতাটি এগিয়ে দেয় এবং বলে,
–“আমি বিয়ে করতে চাই না।’ এটা এতবার কেউ লিখে বুঝি? পাগলি মা আমার। কেউ তোকে বিয়ে করতে জোর করছে না বুঝলি?
মেহেরের মাথায় যেন পুরো আকাশটা ভেঙে পরলো। সোহেল সাহেবের থেকে খাতাটা কেড়ে নিয়ে পর্যবেক্ষণ করলো। এই খাতা পেলো কই সোহেল সাহেব? এটা তো মেহের জানালা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলো! চোখ বড়ো বড়ো করে সোহেল সাহেবের দিকে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে বলে,
–“এই খাতা কোথায় পেলে তুমি বাবা?”
–“সন্ধ্যার তোর রুমে গিয়েছিলাম। তখন তুই মায়ের রুমে ছিলি বোধহয়। ফিরে আসতে নিলে খাতাটা তোর টেবিলের উপর পাই!”
মেহের আরেক দফা বিষম খেলো। জানালা দিয়ে ফেলে দেওয়া খাতা কী উড়ে উড়ে তার টেবিলের উপর এসেছে? নাকি এখানে কোনো মানুষের হাত? মেহের চটজলদি সারিমের দিকে চাইলো। সারিম একদম স্বাভাবিক। আবার নিবিড় চাহনি দিলে দেখা যাচ্ছে সারিম মুচকি হাসছে। এর মানে কী এসব সারিমের কাজ? জেনেশুনে বাবার চোখের সামনে এটা আনার কী প্রয়োজন ছিলো? মেহেরের চোখ ফেটে কান্না আসতে চাইলো। সারিম কী কোনোদিনও তাকে বিয়ে করতে দিবে না? মেহের মিনমিন করে বললো,
–“আপনি মোটেও ভালো করেননি সারিম ভাইয়া।”
–“আমাকে কিছু বললি?”
মেহের নজর ঘুরিয়ে নিলো। সোহেল সাহেব হেসে বলে,
–“যাহ। খাতাটা নিয়ে যা কেমন?”
মেহের কোনোদিকে না তাকিয়ে খাতাটা নিয়ে বেরিয়ে গেলো। রুমে গেলো না বরং কিচেনে গেলো। কিচেনে গিয়ে দেখলো তাঁর মা জ্যুতি এবং কাজের মেয়েটা আছে। এর মানে এখন রান্নাঘর খালি পাওয়া যাবে না। আর দেশলাইও পাওয়া যাবে না। মেহের হাল ছাড়লো না। ধপাধপ পা ফেলে সে বাইরে চলে গেলো। বাইরে গিয়ে সর্বপ্রথম দারোয়ানকে গিয়ে ধরলো। দারোয়ান মেহেরকে দেখে আলতো হেসে বললো,
–“কী বলবা মা?”
–“চাচা আপনার দেশলাইটা ধার দিবেন?”
দারোয়ান হতভম্ব হয়ে বলে, “মানে? আমি পাবো কই?”
–“মিথ্যে বলবেন না চাচা। আমি আপনাকে একবার সিগারেট খেতে দেখেছিলাম। যারা স্মোক লাভার তাঁরা কখনোই দেশলাই ছাড়া থাকে না।”
দারোয়ান থতমত খেলো। হালকা শুকনো ঢোঁক গিলে আশেপাশে তাকালো। আস্তে করে প্যান্টের পকেট থেকে দেশলাইয়ের বাক্সটা বের করে মেহেরের হাতে ধরিয়ে দিলো! মেহের এতে হাসলো। দারোয়ান এবার বললো,
–“কী করবা তুমি দেশলাই দিয়া?”
মেহের আলতো হেসে খাতাটা দেখিয়ে বলে,
–“বি**ষ পোড়াবো চাচা। গলা অবধি দেবে আছে কী না!”
——————-
রোজা ধীরে ধীরে সব সবজি বের করছে। সাইয়ান কিচেনের পাশের ডাইনিং এর একটি চেয়ারে বসে রোজার দিকে চেয়ে মুচকি হেসে বলে,
–“পারবেন তো?”
রোজা হেসে বলে, “না পারলে পালাতাম!”
সাইয়ান হাসলো, সঙ্গে রোজাও। রোজা সবজি গুলো পানিতে ভেঁজাতে ভেঁজাতে বলে,
–“এত কষ্ট করার চাইতে একটা বিয়ে করে নিলেই তো পারেন!”
স্বভাবসুলভ সাইয়ান হেসে বলে,
–“বিয়ে করার জন্যে পাত্রীর প্রয়োজন। সৎ, মিষ্টিভাষী পাত্রীর। তাকে না পেলে বিয়ে কী করে হবে?”
–“আপনার কোনো পছন্দ নেই?”
–“নাহ!”
রোজা মুচকি মুচকি হাসলো।
–“আপনি চাইলে পাত্রীর অভাব হবে না।”
–“তা জানা নেই। তবে মনমতো না পেলে আমি বিয়ে করছি না। বিয়ে না করা অবধি আমার আশেপাশের মানুষ-ই নাহয় আমার যত্ন নিক!”
রোজা এবার কেন যেন লজ্জা পেলো। লাজুক হেসে কাজ করতে করতে মিনমিন করে বললো,
–“আমি আপনার অর্ধাঙ্গিনী হলে ক্ষতি কী?”
পরমুহূর্তেই রোজার মাথায় চাড়া দিয়ে উঠলো সাইয়ান এবং তাঁর স্ট্যাটাসের কথা। তাদের আলাদা জীবন-যাপনের কথা। রোজা মুখ ভার করে চুলো জ্বালালো। সাইয়ান প্রশ্ন করলো,
–“আপনি সেদিন বললেন না আপনাদের বাড়িতে কে কে আছে?”
রোজা নিজেকে সামলে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। নরম গলায় বললো,
–“মা এবং ছোট ভাই।”
–“আপনার বাবা কী…”
রোজা বুঝলো সাইয়ান কী ইঙ্গিত করছে। রোজা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলে,
–“না আমার বাবা জীবিত। তবে তার সাথে আমাদের কোনো যোগাযোগ নেই।”
সাইয়ান অবাক হয়ে বললো, “মানে?”
রোজার চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই বি*ভৎস অতীত। রোজার সর্বাঙ্গ হঠাৎ অস্থিরতা শুরু হয়। রোজা হঠাৎ অস্থিরতায় কয়েক পা পিছিয়ে যায়। পা জোড়াও যেমন অবশ হয়ে আছে। সাইয়ান দ্রুত রোজাকে গিয়ে ধরে। রোজা চমকে সাইয়ানের দিকে তাকায়। মুহূর্তে-ই সে স্বাভাবিক হয়ে যায়। পা জোড়াও সচল হয়। অস্থির ভাব দূর হয়। অপলক চাহনিতে চেয়ে থাকে সাইয়ানের অস্থির মুখটায়৷ সাইয়ান ব্যস্ত কন্ঠে বললো,
–“কী হলো মিস রোজা? আপনি ঠিকাছেন? কিছু বলছেন না যে? হ্যালো!?”
রোজা অন্তরে আওড়ায়, “আপনি পাশে থাকলে অস্থিরতা কাজ করে না স্যার। সেই দুর্ঘটনার প্রভাব পরে না। কেন এমন হয়? আপনাকে আপন ভেবেছি বলে?”
–“কী হলো মিস রোজা? উত্তর দিন!”
–“ঠিক আছি!”
সাইয়ান দূরে সরে আসে রোজার থেকে। সাইয়ান কপালে এক আঙুলের বিচরণ চালিয়ে বলে,
–“ভয় পাইয়ে দিয়েছিলেন।”
–“স্যরি স্যার!”
–“হঠাৎ কী হলো যে এরকম অস্বাভাবিক হয়ে পরলেন?”
রোজা হাসার চেষ্টা করে বলে, “হঠাৎ ঘোরের মধ্যে চলে গিয়েছিলাম। এমন হয় আমার!”
সাইয়ান আর রোজার বাবাকে নিয়ে ঘাটলো না। কোনো মেয়ে এভাবে বাবার কথা শুনে অস্বাভাবিক হতে পারে তা সাইয়ানের জানা ছিলো না। তবে সাইয়ান ধারণা করছে রোজা মানসিকভাবে কিছুটা বিপর্যস্ত। তাই সরাসরি সাইক্রিয়াট্রিস্টের কথা বললো না সে।
রোজা ঘটনাকে স্বাভাবিক করে বললো,
–“আপনি ভেতরে চলে যান স্যার। আlগুনের তাপ আপনার সহ্য নাও হতে পারে।”
–“ঠিকাছে। বি কেয়ারফুল।”
বলেই সাইয়ান ভেতরের রুমে চলে গেলো। রোজা সাইয়ানের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আলতো হাসলো। চোখ জোড়া অশ্রুসিক্ত করে বললো,
–“এটলিস্ট আপনি আমাকে বলেননি আমি মানসিক রোগী, আমার চিকিৎসার প্রয়োজন। আপনি কেন এত ভালো সাইয়ান স্যার? আপনি কী কোনো ওষুধী প্রাণ? যার সংস্পর্শে আসলে অস্থির, অস্বাভাবিক আমি স্বস্তি অনুভব করি!”
——————-
দেশলাই প্রথমবার জ্বালাতে গিয়ে মেহেরের হাতে হালকা ছ্যাঁকা লাগলেও মেহের দাঁতে দাঁত চেপে তা সহ্য করে নিলো। তাঁর সামনে রয়েছে কতগুলো কাগজ। সবগুলো একসাথে আছে। মেহের দ্রুত সেটায় জ্বলা দেশলাইটা ফেলে দিলো। মুহূর্তে-ই দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে। সেই আগুন দেখে মেহের স্বস্তি অনুভব করলো। যাক, এই খাতা এখন কারো হাতেই পরবে না।
–“জ্বালিয়ে দিয়ে কী লাভ? বিয়ের কথা বললে আবারও তোকে দিয়ে লেখাবো নো প্রব্লেম!”
মেহের চমকে পিছে ফিরে তাকালো। সারিম বুকে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে মেহেরের পিছে। সারিমকে দেখে মেহের মুখ ঘুরিয়ে বললো,
–“আপনি-ই আমার রুমে খাতাটা রেখেছেন তাই না?”
–“না পুড়ে ফেলে দিলে আবারও রেখে আসতাম তোর ঘরে। সবাই জানুক, তুই বিয়ে করতে চাস না!”
মেহের এবার উঠে সারিমের দিকে ফিরে তাকিয়ে বললো,
–“আপনি এমন কেন সারিম ভাইয়া? বিয়ের কথা বললে আপনি আমার সাথে এরকম করছেন কেন? আমি কী এমন বলেছি?”
সারিম মেহেরের দিকে গম্ভীর নজরে চেয়ে বলে,
–“পড়াশোনার বয়সে বিয়ের কথা উঠাবি কেন? হাঁটুর বয়সী মেয়ে কী না বিয়ে করবে। হাহ্!”
–“আপনি বিয়ে করেন না আপনার দোষ। আগে আগে বিয়ে করা উত্তম!”
সারিম জোরে গাল টেনে ধরলো মেহেরের। মেহের হালকা আর্তনাদ করে সারিমের হাত থেকে নিজের গাল ছাড়াতে ছাড়াতে বললো,
–“লাগছে ভাইয়া, ছাড়ুন!”
–“লাগুক। আর বিয়ের গীত গাইবি?”
–“কক্ষনো না। ছাড়ুন!”
সারিম ছাড়লো না। বরং নিজের গায়ে থাকা শালটার ভেতরে মেহেরকে ঢুকিয়ে নিজের সাথে জড়িয়ে বললো,
–“চুপচাপ ভেতরে চল!”
——————-
মাহিম মেহেরের লাল হয়ে যাওয়া ডান গালটার দিকে চেয়ে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। মেহের নাক ফুলিয়ে বললো,
–“এত হাসির কী হলো বুঝি না!”
–“গালে কী হয়েছে রে? মশার কামড় খেয়েছিস নাকি পিঁপড়ে কামড়িয়েছে?”
বলতে না বলতেই আবার হেসে উঠলো। এবার মেহেরের রাগ হলো। মাহিম আবার বলে ওঠে,
–“যাক, আমার মতোন তোর গালেও সাইন পরেছে। এবার বুঝবি লজ্জা কারে কয়। আল্লাহ্ বিচার করেছে তোর!”
মাহিমের দিকে ধাওয়া করার পূর্বেই সারিম রুমে প্রবেশ করলো। সারিমকে দেখে মাহিমের হাসি থেমে গেলো। মেহেরও চুপসে গেলো। সারিমের হাতে একটা মলম। সারিম মেহেরের পাশে এসে বসে বললো,
–“খবরদার যদি তোরে কখনো দেখেছি আগুনের ধারে-কাছে গিয়েছিস। আগুনের সামনে নিজেকে সামলে রাখতে জানে না সে আবার দেশলাই জ্বালায়। ইচ্ছে তো করছে তোর সারা গায়ে আগুন জ্বালিয়ে দেই! ইডিয়েট কোথাকার!”
বলেই মেহেরের হালকা পোড়া জায়গাটায় মলম লাগাতে শুরু করে সারিম। যখন মেহেরকে সারিম শালে জড়িয়েছে তখন পোড়া স্থানে হালকা চাপ লাগে মেহেরের। যার করে সে সামান্য কুঁকড়ে উঠেছিলো। নয়তো সারিমও খেয়াল করেনি এই পোড়া হাতের দিকে।
~চলবে, ইন-শা-আল্লাহ্।
#বাসন্তীগন্ধা
| ০৭ |
লাবিবা ওয়াহিদ
——————-
অস্থিরতায় কিছুটা ঘেমে গেছে মেহের। বিছানায় বারবার এপাশ ওপাশ করতে ব্যস্ত সে। কিছুতেই চোখে ঘুম ধরা দিচ্ছে না। চোখে সামনে এক নাগাড়ে ভেসে চলেছে সেই দৃশ্যটুকু। সারিমের বক্ষের উষ্ণতা তাকে বড্ড উদগ্রীব করে তুলেছে। এভাবে কেন তখন সারিম তাকে জড়িয়ে নিয়েছিলো তা মেহেরের অজানা। সেই সাথে এই উষ্কখুষ্ক ভাবটাও তাকে ভীষণ জ্বালাতন করছে। এক নাম না জানা অনুভূতি তাকে প্রতিনিয়ত তাড়া করে বেড়াচ্ছে। মস্তিষ্কে তরঙ্গিত হচ্ছে তাঁর সেই সহপাঠীর ভালোবাসার গল্প। মেয়েটার মামাতো ভাইয়ের সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছে। বেশ কিছু গল্প করেছে সেই ছেলেকে নিয়ে। যা মেহেরের কানে ভালো ভাবেই প্রবেশ করেছে। সবকিছু মিলিয়ে মেহের ভীষণ অস্থিরতায় ভুগছে। নাহ, তাকে শান্ত হতে হবে। শান্ত হওয়ার জন্যে এখন কী জরুরি? অন্য ছেলেকে নিয়ে ভাবা? কিন্তু মেহের তো কখনোই প্রেম অথবা সম্পর্কে জড়ায়নি।
এসব নানান ভাবনায় তাঁর অর্ধেক রাত পার হয়ে গেলো। ফজরের আযানের কিছু সময় আগে মেহের ঘুমের কোলে ঢলে পরে। সকালে সামিরা তাকে ঘুম থেকে ওঠায়। মেহের চোখ কচলাতে কচলাতে ওয়াশরুমে চলে যায়। নিচে গিয়ে দেখে শুধু সারিম, মাহিম এবং সাইরা খাবার টেবিলে বসে আছে। মেহের বিনা-বাক্যে সামিরার পাশে গিয়ে বসলো। অথচ সারিম তাঁর পাশের চেয়ারটা খালি রেখেছিলো মেহেরের জন্যে। মেহের ওদিকে বসতেই সারিম গম্ভীর গলায় বললো,
–“কোনোরকম ত্যাড়ামি শুনছি না। দ্রুত আমার পাশে এসে বোস! কাম!”
মেহের ভীত চোখে সামিরার দিকে তাকালে সামিরা ইশারায় সারিমের পাশে গিয়ে বসতে বলে। মেহের হালকা শুকনো ঢোঁক গিলে বাধ্য মেয়ের মতো সারিমের পাশের চেয়ারটায় বসে। এমনিতেই গতকাল রাত থেকে সারিমের গতিবিধি ভালো নেই। মূলত মেহের হাত পোড়ানোর পর থেকেই খিটখিটে আচরণ করছে সে। এজন্যে মেহেরও আজ সারিমের মুখের ওপর কিছু বলার সাহস পাচ্ছে না। মেহের বসতেই সারিম মেহেরের মুখের সামনে ব্রেড তুলে দিয়ে বললো,
–“হা কর!”
মেহের সাহস সঞ্চার করে আমতা আমতা করে বললো,
–“আ..আমি খেতে পারবো!”
সারিম এবার অগ্নিময় চাহনি নিক্ষেপ করলো। মেহের মুখ ভোঁতা করে বললো,
–“কবজির নিচে পুড়েছে, হাত তো পুড়েনি!”
সারিম মেহেরের কথার তোয়াক্কা না করে কাঠ কাঠ গলায় বললো,
–“হা করবি নাকি গাল লাল করবো?”
মেহের সঙ্গে সঙ্গে হা করলো। সারিম জোর করে পুরোটা মুখে পুরে ফেললো। হঠাৎ এরকম হওয়ায় মেহের কাশতে শুরু করলো। সারিম সেদিকে লক্ষ্য না করে মাহিমের দিকে তাকিয়ে বললো,
–“তোর দেড় মিনিটের ছোট বোনকে পানি খাইয়ে উদ্ধার কর। আর খবরদার যদি মেহেরকে ফেলে কলেজ গিয়েছিস তো! মেহেরকে নিয়ে যাবি, নয়তো তোর অহংকারের বাইক আমি রড দিয়ে পিটিয়ে ভেঙে ফেলব!”
বলেই সারিম এক মুহূর্ত না বসে বেরিয়ে গেলো। সামিরা দ্রুত মেহেরকে পানি দিলে মেহের ঢকঢক করে পুরো পানিটা খেয়ে নিলো। খেয়ে কিছুটা শান্ত হতেই মেহের সামিরার উদ্দেশ্যে বলে ওঠে,
–“তোমার ভাই এত পা!ষাণ কেন আপু? এখন যদি আমি দম আটকে মা* যেতাম?”
সামিরা হেসে বললো,
–“খুব সম্ভবত গলায় পাউরুটি আটকাতো, কিন্তু ম*বি না। আমার ভাইয়ের তোকে মে* জেলে যাওয়ার কী দরকার?”
মেহের মুখ বাঁকালো সামিরার কথা শুনে। মাহিম এবার মুখটা কাঁদো কাঁদো করে বললো,
–“এই মেয়েটার জন্যে ভাইয়া আমাকে এত বড়ো হুমকি দিয়ে চলে গেলো? আল্লাহ্, আমার গার্লফ্রেন্ডদের জায়গায় কেন এই পাগলটা বসবে? তুমি কেন এই পাগলটারে ছেলে না বানিয়ে মেয়ে বানালা!? অন্তত ঘাড়ে বসে ঝুলতো না!”
মেহের টেবিলের নিচে দিয়ে জোরে পারা দিলো মাহিমের পায়ে। মাহিম আর্তনাদ করে উঠলে মেহের দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
–“এখন থেকে ভাইয়া না বললেও আমি তোর বাইকে গিয়ে বসে থাকবো। তোকে রেগুলার বিভিন্ন মেয়ের হাতে থাlপ্পড় খাওয়াবো! তখন ঘুরিস ভালোমতোন, গালে আঙুলের সাইন নিয়ে!”
মেহেরের কথা শুনে সামিরা হেসে দিলো। হাসতে হাসত্র বললো,
–“সিরিয়াসলি মেহের, মাহিম চড় খেয়েছে? কিন্তু কবে?”
মেহের এবার সামনের কপাট দাঁত বের করে বললো,
–“তোমার ফাউন্ডেশন উধাও হয়ে গেছিলো না?”
–“আরে হ্যাঁ। আবার ঘন্টাখানেক পর একই জায়গায় পেয়েছিলাম। এর মানে কী….?? মাহিম, তুই!”
এবার হাসি যেন থামতেই চাইলো না সামিরার। মাহিম এবার চোখ-মুখ লাল করে চাইলো মেহেরের দিকে। মেহের চোখ টিপ মে* হেসে দিয়ে বলে,
–“রিভেঞ্জ!”
মাহিম কলেজের সামনে বাইক থামাতেই মেহের দেখলো গেটের সামনে সোহা দাঁড়িয়ে। নিশ্চয়ই মেহেরের জন্যে দাঁড়িয়ে আছে। মেহের বাইক থেকে নামলে সোহা এগিয়ে এসে অবাক হয়ে দুই ভাই-বোনের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলে,
–“ও মাই গড! চেহারার কত মিল! মেহের এটাই তোর জমজ ভাই?”
মেহের কোণা চোখে একপলক মাহিমের দিকে তাকিয়ে ইতিবাচক মাথা নাড়ায়। মাহিমও হেসে বলে,
–“ইয়েস। ইয়্যু আর রাইট সুইটি! বাই দ্য ওয়ে তোমার নাম?”
–“সোহা। তোমার?”
সোহার মুখে “তুমি” সম্বোধন শুনে মাহিম অমায়িক হাসি দিলো। হেসে বললো, “মাহিম!”
পরমুহূর্তে মাহিম আবার বলে ওঠে,
–“আজকের এই সুন্দর ওয়েদারটা কী তোমার জন্যে উৎসর্গ করা সুইটি?”
সোহা হেসে বলে,
–“আমার জন্যে হবে কেন?”
–“আমার তো তাই মনে হচ্ছে। দেখছো না, কি সুন্দর নীল আকাশ। নীল আকাশের মাঝে খন্ড খন্ড মেঘের বিচরণ…”
মাহিম পুরোটা শেষ করার আগে বললো,
–“তোমার গায়ে তো আমাদের কলেজের শার্ট। এর মানে তুমি আমাদের কলেজেই ফাস্ট ইয়ারে পড়ছো? কিন্তু কেন?”
মাহিম ঠোঁট কামড়ে হেসে বলে,
–“ইচ্ছে করে এক বছর গ্যাপ দিয়েছি বুঝলে? একচুয়ালি আমার ফ্যামিলিতে একটা ইন্সিডেন্ট হয় যার জন্যে আমি সেবার ফাইনাল ইক্সাম দিতে পারিনি!”
সোহা আবার হেসে বলে,
–“মেহের তো ঠিকই দিয়েছে!”
–“মেহের এন্ড আমি ডিফারেন্ট! আন্ডার্স্টেন্ড?”
মেহের এবার মাহিমের পিঠে এক ঘা বসিয়ে দিয়ে বলে,
–“তোর ফ্লার্ট শেষ হলে বিদায় হ!”
মাহিম মেহেরের দিকে গরম চোখে চেয়ে বললো,
–“কাবাবের হাড্ডি একটা!”
–“গেট আউট!”
–“তোর ঘাড়ে বসে আছি? নাকি এই রাস্তা তোর রুম মনে হয়?”
মেহের জু* দেখিয়ে সোহাকে নিয়ে হনহন করে ভেতরে চলে গেলো। সোহার তো হাসি-ই থামছে না। মেহের সোহার দিকে সেভাবে খেয়াল করছে না। সোহা হাসতে হাসতে মেহেরকে বলে,
–“তোর ভাই তো পুরাই আগুন! কেমনে এই বয়সে ফ্লার্টের ডিগ্রী করে বসে আছে?”
মেহের ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে বলে,
–“ওটা ও আর আল্লাহ্ ভালো জানেন!”
–“তোর ভাইয়ের তো তাহলে অনেকগুলো গার্লফ্রেন্ড।”
মেহের এবার সত্যিটা বলে,
–“ওর কাজ শুধু মেয়েদের সাথে ফ্লার্ট করা আর পটানো। কখনো কোনো মেয়ের সাথে সম্পর্কে জড়ায়নি।”
–“শিওর হয়ে কীভাবে বলছিস?”
মেহের হেসে বলে,
–“আমার জমজ ভাই বলে কথা। ওর কর্মকান্ড আমার জানা আছে।”
~চলবে, ইন-শা-আল্লাহ্।