বাসন্তীগন্ধা পর্ব-৮+৯

0
429

#বাসন্তীগন্ধা
|০৮|
লাবিবা ওয়াহিদ

————————–
ক্লাস শেষে বের হয়ে বাহিরে গেলো মেহের এবং সোহা। সোহা কিছু সময় চুপ থাকলেও হুট করে প্রশ্ন করে বসলো,

–“আচ্ছা তোর ওই ভাই কী কখনো সন্দেহজনক আচরণ করেছে?”

মেহের থেমে গিয়ে ভ্রু কুচকে তাকায়। বলে,
–“কোন ভাই?”

–“সারিম ভাই?”

মেহেরের হঠাৎ গতকাল রাতের ঘটনা মনে পরে যায়। কিছুটা থমথমে মুখে করে বলে,
–“না!”

সোহা বেশ অবাক হয়ে বলে, “এটা কীরকম কথা?”

–“সন্দেহজনক আচরণ করা বুঝি প্রয়োজন ছিলো?”
–“অবিয়াসলি!”

মেহের সোহা দিক থেকে নজর সরিয়ে পুণরায় হাঁটতে শুরু করে। মেহের ম* গেলেও গতকালকের ঘটনা সোহার সাথে বলতে পারবে না। ভেতরের অস্থিরতা ভেতরে রাখতে-ই সাচ্ছন্দ্যবোধ করছে মেহের। মেহের স্বভাবতই চাপা স্বভাবের। সোহার সাথে প্রথমদিন যেভাবে মিশেছিলো এখন সেভাবে ঠিক মিশতে পারছে না। এর কারণ অস্থিরতাও হতে পারে। সোহা মেহেরের হৃদয় এবং মস্তিষ্কে যে ‘কাজিন লাভ’ নামক ভাইরাস ছড়িয়ে দিয়েছে। সেই ভাইরাস ক্রমশ তাঁর সর্বাঙ্গে মিশে যেতে চাইছে যা কড়াভাবে বাঁধা দিচ্ছে মেহের। সারিম এবং সাইয়ানের আদরে দুনিয়ার খবর সেরকম না পেলেও অনেক কিছুই বুঝে সে। শুধু বুঝতে পারছে না সারিমকে নিয়ে সোহার মাতামাতি।

ওরা বিভিন্ন কথা বলতে বলতে ভার্সিটি এরিয়ায় চলে আসে। আসার কারণ সোহার বড়ো বোন তাদের কলেজের সঙ্গে যুক্ত ভার্সিটিতে পড়ছে। তাকে সোহা কল করে মাঠের থেকে দূরে গাছের ছায়াতলে দাঁড়ালো। মেহের আশেপাশে তাকালে দেখতে পেলো একটা ফ্রেন্ড সার্কেল। যা ওদের থেকে অনেকটা দূরত্বে আড্ডা দিচ্ছে। সেই বন্ধুমহলে থাকা একটা ছেলের দিকে মেহেরের নজর আটকায়। ছেলেটা দেখতে সুদর্শন, চোখে একটি হলুদ সানগ্লাস ঝুলছে তাঁর। টি-শার্ট এবং জ্যাকেটটা কোমড়ে গিট দিয়ে বাঁধা। মেহেরের ছেলেটাকে বেশ পছন্দ হয়েছে। মস্তিষ্কে হঠাৎ খেলে গেলো এক নিষিদ্ধ বার্তা। এই ছেলের সাথে সম্পর্কে জড়ালে কীরকম হবে? ছেলেটাকে পারফেক্ট মনে হচ্ছে মেহেরের। অন্তত মেহেরের মাথা থেকে সারিমের ভূতটা তো নামবে।

মেহের সোহার এক হাত শক্ত করে ধরলো। সোহা চমকে তাকালো মেহেরের দিকে। মেহের ছেলেটার দিকেই তাকিয়ে বললো,
–“ফোন ব্যাগে রাখ।”

–“রেখেছি। কিন্তু..”

সোহা কথা শেষ করার পূর্বেই মেহের বলে ওঠে,
–“তোর আপুর ডিপার্টমেন্ট এবং ক্লাস বল।”

–“দ্বিতীয় বর্ষ। বাংলা বিভাগ। কিন্তু কেন?”

মেহের কিছু না বলে সোহাকে নিয়ে টানতে টানতে সেই ফ্রেন্ড সার্কেলের কাছে চলে গেলো। ফ্রেন্ড সার্কেলে থাকা একটা মেয়েকে পিছু ডাকলে মেয়েটা ঘুরে তাকালো মেহেরের দিকে। মেহের আলতো স্বরে বলে,

–“আপু, দ্বিতীয় বর্ষের বাংলা বিভাগের ক্লাসটা কোন ফ্লোরে বলতে পারবেন প্লিজ?”

মেয়েটা কিছু বলার আগে একটা ছেলে বলে ওঠে,
–“আরেহ। কলেজের নাকি?”

মেহের চোখ নামিয়ে বলে, “জি!”

–“কোন ক্লাস তুমি? কাকে খুঁজতে এসেছো?”

অন্য কন্ঠ শুনে মেহের মাথা তুলে তাকালো। সেই ছেলেটাই মেহেরের দিকে তাকিয়ে আছে। মুখ-ভঙ্গি দেখে-ই বোঝা যাচ্ছে এই ছেলেটাই তাকে প্রশ্ন করেছে। মেহেরের এবার বুক ধড়ফড় করে উঠলো। ক্ষীণ কন্ঠে বললো,
–“সেকেন্ড ইয়ার!”

ছেলেটা হঠাৎ ফিক করে হেসে দিলো। হাসি থামিয়ে বললো, “আরে বোকা ভয় পাচ্ছো কেন? রিল্যাক্স!”

সোহা এসবের আগা-মাথা কিছুই বুঝতে পারছে না। মেহের করছে টা কী? সোহা মুখও খুলতে পারছে না। ওরা নতুন মানুষ, নতুন মানুষের সামনে উলটো পালটা প্রশ্ন করা বেমানান! ছেলেটা দুই কদম এগিয়ে এলো মেহেরের দিকে। মেহের চোখ বড়ো বড়ো করে চাইলো সেই ছেলের দিকে। হঠাৎ মেয়েলি কন্ঠস্বরে কেউ বলে ওঠে,

–“মেয়েটাকে ভয় দেখাস না অভি। যা প্রশ্ন করেছে তাঁর উত্তর দিয়ে দিলেই তো হয়!”

অভি মুচকি হেসে বলে,
–“প্রশ্ন করার জন্যে তো অনেকেই ছিলো দোস্ত। আমাদের কাছেই আসলো কেন? খটকা লাগে না বিষয়টা? কী কিউটি? কী দরকার, আমাকে বলো!”

মেহের এবার অস্বস্তিতে পরলো। লম্বা কয়েকবার নিঃশ্বাস ফেলে সোহার হাত ধরে বলে,
–“স্যরি আপনাদের ডিস্টার্ব করার জন্যে। সোহা চল!”

বলেই মেহের সোহাকে নিয়ে চলে যেতে নিচ্ছিলো তখনই অভি পিছুডাক দিয়ে বললো,
–“এটলিস্ট নামটা তো বলে যাও। নাম না বললে কলেজ গিয়ে নিরাশ হয়ে ফিরতে হবে!”

মেহেরের গলা শুকিয়ে গেলো। সে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। মেহেরকে চুপ থাকতে দেখে অভি আবার বললো,
–“এইযে কিউটির পার্টনার। তুমি এটলিস্ট ওর নামটা বলো!”

সোহা ভীষণ ভয় পেয়ে যায়। বড়ো আপুর থেকে শুনেছে এই ধরণের ছেলে-মেয়েরা র‍্যাগিং না করে ছাড়ে না। বয়স কম হলে তো কথাই নেই। সোহা আমতা আমতা করে বললো, “মেহের!”

–“মেহের! নাইস নেম!”

মেহের এবার গলায় নিঃশ্বাস আটকে সোহাকে টানতে টানতে ভেতরে নিয়ে যায়। পাকনামো করার ফল হারে হারে ভুগছে মেহের। কী দরকার ছিলো এখানে আসার? অভি হাসি-মুখেই চেয়ে আছে ওদের যাওয়ার পানে। অভির এক বন্ধু বলে ওঠে,
–“শুধু শুধু ভয় দেখালি!”

–“আই লাইক হার!” মুচকি হেসেই বললো অভি।

——————
আজ অফিসের কনফারেন্স শেষ করে রোজা ক্লান্ত। নিজের ডেস্কে বসে বেশ কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলো। এর মাঝে তাঁর ল্যান্ডলাইনে কল আসলে রোজা তা রিসিভ করলো। সাইয়ানের কল ছিলো। রোজা বললো,
–“জি স্যার বলুন।”
–“আমার কেবিনে আসুন।”

রোজা নিজের ঘর্মাক্ত কপাল রুমাল দ্বারা মুছে নিলো। সিঁড়ি দিয়ে অতিরিক্ত ওঠা-নামার ফল। রোজা হাতের ঘড়িটা দেখতে দেখতে দ্রুত ভঙ্গিতে সাইয়ানের কেবিনে চলে গেলো।

–“মে আই কাম ইন স্যার?”
–“ইয়েস।”

রোজা ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখলো সাইয়ান তাঁর আরাম দায়ক চেয়ারে মাথা এলিয়ে চোখ বুজে রেখেছে। সাইয়ানের এ অবস্থা দেখে রোজা কিছুটা উত্তেজিত হলো। মিনমিন করে বললো,

–“আর ইয়্যু ওকে স্যার?”

সাইয়ান চোখ মেলে চেয়ে ক্লান্তিময় হাসি দিলো। অতঃপর সোজা হয়ে বসে চেয়ার ঘুরিয়ে টেবিলের সামনে আসলো। সামনের চেয়ারে হাত দেখিয়ে বলে,

–“আ’ম অলরাইট। প্লিজ!”

রোজা সপ্তর্পণে বসলো। সাইয়ান হাসি-মুখে জিজ্ঞেস করলো,
–“কী খাবেন? চা না কফি?”

–“নাথিং স্যার। থ্যাঙ্কিউ ফর আস্কিং!”

–“বারণ তো শুনবো না। এত সুন্দর প্রেজেন্টেশন দিলেন। পুরস্কার তো অবশ্যই প্রাপ্ত!”

রোজা হালকা হেসে বলে, “চা!”

সাইয়ান তখনই ল্যান্ডলাইন থেকে এক কাপ চা এবং কফির অর্ডার করলো। কথা বলা শেষে সাইয়ান বললো,
–“সত্যি, আজকের প্রোজেক্টটি খুব ইউনিক ছিলো। ইয়্যু আর সো ব্রিলিয়ান্ট।”

–“ধন্যবাদ স্যার। আপনার মতো সাপোর্টিভ বস ডিজার্ভ করে এই ধরণের প্রোজেক্ট!”

সাইয়ান হাসলো। রোজা সাইয়ানের দিকে গোল চোখে পর্যবেক্ষণ করে বললো,
–“আপনি ঠিক আছেন স্যার?”
–“না থাকার কারণ?”

রোজা আলতো স্বরে বলে, “জানা নেই!”

সাইয়ান শুধু সৌজন্যমূলক হাসি দেয়। আর কিছু বলে না। রোজাও আর সাইয়ানকে প্রশ্ন করলো না। তবে কিছুটা বিব্রত হয়ে বললো,
–“লাঞ্চ করেছেন স্যার?”
–“নাহ! করে নিবো।”

রোজা কিছু বললো না। রোজা আজ ভালোভাবে নজর রেখেছে সাইয়ানের কেবিনের দিকে। খাবার দিয়ে গেছে এমন কাউকে রোজা দেখেনি। এর মানে কী আজও সাইয়ানের ফুপির বাসা থেকে খাবার পৌঁছায়নি। রোজা ঠোঁট কামড়ে বসে রইলো। ওদিকে লাঞ্চের টাইমও হয়ে গিয়েছে। চা আসার পূর্বেই রোজা সাইয়ানের উদ্দেশ্যে বললো,

–“আমাকে ওঠার পারমিশন দিবেন স্যার?”
–“হঠাৎ? চা তো এখনো আসেনি।”
–“আমি আবার ফিরে আসবো!”
–“ওকে। গো!”

রোজা হেসে কেবিন থেকে বেরিয়ে নিজের ডেস্কে চলে গেলো। নিজের ডেস্ক থেকে লাঞ্চ বক্সটি নিয়ে সাইয়ানের কেবিনের দিকে চলে গেলো। আজ ভাগ্যিস সে মুরগির তরকারি রেঁধেছিলো।

সাইয়ান রোজার হাতে লাঞ্চ বক্স দেখে অবাক হয়ে বললো,
–“লাঞ্চ বক্স?”

রোজা ইতঃস্তত হয়ে এগিয়ে দিলো লাঞ্চ বক্সটি। আমতা আমতা করে বললো,
–“আপনার জন্যে লাঞ্চ স্যার!”

সাইয়ান অবাক হয়ে চেয়ে রইলো রোজার দিকে। নিজের লাঞ্চ সাইয়ানকে দিচ্ছে, অবাক-ই হওয়ার কথা। সাইয়ান অবাক হয়ে বলে,
–“নিজের লাঞ্চ আমাকে কেন দিচ্ছেন মিস রোজা?”

রোজা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো,
–“আপনার জন্যে কাউকে খাবার আনতে দেখিনি স্যার। এছাড়াও আপনার বাইরের খাবার খেলে ফুড পয়জনিং হয়। তাই আমার লাঞ্চটা আপনাকে দিলাম। নিজেই রেঁধে এনেছি। আমার চিন্তা করবেন না, আমার বাইরের খাবারে ফুড পয়জনিং হয় না!”

শেষোক্ত বাক্যটি হেসেই বললো রোজা। রোজার এরূপ কর্মকান্ডে সাইয়ান থতমত খেয়ে যায়। মুহূর্তের মাঝে তা মুগ্ধতায় পরিণত হয়। সাইয়ান অমায়িক হেসে বলে,
–“থ্যাঙ্কিউ মিস রোজা, বাট আমাদের মিটিং চলাকালীন সময়েই আমার লাঞ্চ কেবিনে চলে এসেছে। তাই আপনার লাঞ্চ আপনার-ই থাকলো!”

রোজা কিছুটা হাসার চেষ্টা করে লাঞ্চটা ফিরিয়ে নিলো। কিছুটা লজ্জিতও হলো বটে। সাইয়ান এখন তাকে কী মনে করবে? সে একটু বেশি-ই বুঝে নিলো। রোজা গাল জোড়া লাল করে মিনমিন করে বলে,

–“স্যরি স্যার!”

সাইয়ান নিজের হাসি চেপে বলে,
–“চা টা আপনার ডেস্কেই পাঠিয়ে দিবো। চায়ের সাথে লাঞ্চটাও করে নিবেন। ওকে?”

রোজা বাধ্য মেয়ের মতো মাথা নাড়িয়ে চলে যায়। রোজা চলে যেতেই সাইয়ান কিছুক্ষণ হাসলো। হাসতে হাসতে আপনমনেই বললো,
–“মেয়েটা কী পাগল? আমার এত খেয়াল রাখছে কেন?”

———————–
~চলবে, ইন-শা-আল্লাহ্।

#বাসন্তীগন্ধা
|০৯|
লাবিবা ওয়াহিদ

–“আপুর থেকে শুনেছি ওই অভির বিষয়ে। বেশিরভাগ সময় বন্ধুদের সাথে আড্ডাই দিয়েছে। এছাড়া নারী কেলেঙ্কারির কোনো রেকর্ড পাওয়া যায়নি। তবে শুনেছে অভি নাকি জীবনে দুটোই প্রেম করেছে!”

–“আমাকে এসব কেন বলছিস সোহা? আমি ওই ছেলের সম্পর্কে জেনে কী করবো?”

–“সেটা তো তুই ভালো জানিস। তোর হয়তো মনে ধরেছে তাই আমি ভাবলাম ইনফরমেশন নিই। নয়তো তোর-ই বা কী প্রয়োজন ছিলো আপুর ক্লাস রুম ওদের থেকে জানার?”

–“অন্য কারণে গিয়েছিলাম ওই ছেলের কাছে। তাতে…”

মেহের সবটা বলার পূর্বেই পুরুষালি কন্ঠে কেউ বলে ওঠে,
–“কোন ছেলের কাছে গিয়েছিলি?”

মেহের তৎক্ষণাৎ কল কেটে দিয়ে পাথরের মতো বসে রইলো। এই কন্ঠটা তাঁর ভীষণ পরিচিত। ভয়ে মেহেরের আত্মা শুকিয়ে যাচ্ছে। ভয়ার্ত নজরে চেয়ে রইলো দরজার দিকে। সারিম ভ্রু কুচকে মেহেরের দিকে তাকিয়ে আছে। মেহেরকে চুপ থাকতে দেখে সারিম রুমে প্রবেশ করলো। এগোতে এগোতে বললো,

–“ভয় পাচ্ছিস কেন? আমার প্রশ্নের জবাব দে। কার সাথে কথা বলছিলি? কোন ছেলেকে নিয়ে কথা হচ্ছে?”

মেহের আমতা আমতা করে বললো,
–“কাউকে নিয়ে কথা হচ্ছে না!”
–“তাহলে তুই ভয় পাচ্ছিস কেন? কিছু লুকাচ্ছিস আমার কাছে?”

মেহের দ্রুত নেতিবাচক মাথা নাড়ালো। তাও সারিমের সন্দেহ কাটলো না। সে মেহেরের কাছে এসে মেহেরের ফোনটা কেড়ে নিলো। ফোন চেক করে দেখলো মেহের এতক্ষণ কার সাথে কথা বলছিলো! সারিম কোনো কিছু না ভেবেই সোহাকে কল দিলো। সে কন্ঠ শুনে মেয়েটার গলা শুনতে চায়। ফোন সাথে সাথেই রিসিভ হলো। এদিকে ভয়ে মেহেরের গলা শুকিয়ে কাঠকাঠ। মেহের মনে মনে দোয়া-দরূদ পড়ছে যাতে সোহা উলটো পালটা কিছু না বলে ফেলে। সারিম যখন মেয়েলী কন্ঠস্বর শুনলো তখন কল কেটে দিলো। মেহেরের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করলো,

–“এটা তোর কোন বান্ধুবী, আমায় কালকে ওর সাথে মিট করিয়ে দিবি। আর হ্যাঁ, আমার সাথেই আগামীকাল কলেজ যাবি!”

বলেই সারিম থমথমে মুখ নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো। আজকে সারিম আর পড়ালো না মেহেরকে। সারিম চলে যেতেই মেহের হাপ ছেড়ে বাঁচলো। কত বড়ো ভুল যে সে করেছে তা মেহের হারে হারে টের পাচ্ছে। সে কেন ভুলে গেলো, সারিম ভাই থাকতে তাঁর প্রেম করা একদম অসম্ভব। তাঁর সারিম ভাই কী অভির থেকে কম সুন্দর নাকি?

পরমুহূর্তে নিজের মাথায় চড় মা*লো মেহের। আবারও ভুলভাল ভাবনা মস্তিষ্কে নাড়া দিচ্ছে। সবই মেহেরের কাছে ধোঁয়াশা লাগছে।

মাহিম ফোনে কোনো এক মেয়ের সাথে চ্যাট করছিলো এমন সময়-ই সারিম এসে মাহিমের কান টেনে ধরলো। সব কিছু এত দ্রুত ঘটলো যে মাহিম আগা-মাথা কিছুই বুঝে উঠতে পারলো না। সারিম দাঁতে দাঁত চেপে বললো,

–“বোন কলেজে কী করছে না করছে সেসব দেখার জন্যে তোকে একই কলেজে ভর্তি করালাম। আর তুই বোনের দিকে ধ্যান না দিয়ে নিজের কু-কীর্তি চালাতে ব্যস্ত? ইডিয়েট কোথাকার! মাহিম, যদি শুনি মেহের কোনো ছেলের প্রতি দুর্বল হয়েছে তাহলে সর্বপ্রথম আমি তোকে পিটাবো। পিটাতে পিটাতে তোরে হসপিটালে যদি না পাঠাতে পারি তাহলে আমার নামও সারিম আরজাইম নয়। মাথায় ছিদ্র করে কথাগুলো ঢুকিয়ে নিস!”

বলেই মাহিমের কান ছেড়ে দিয়ে সারিম হনহন করে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো। এদিকে মাহিম কানের ব্যথায় কতক্ষণ এপাশ, ওপাশ করলো। পরমুহূর্তে কী ভেবে চটজলদি উঠে বসে ভাবে,
–“মেহের আবার প্রেম করছে নাকি? সর্বনাশ!”

—————-
রাতে খাবারের সময় মেহেরকে ডাকা হলো। নিচে গিয়ে বাবা বা বড়ো চাচ্চু কাউকেই দেখলো না মেহের। তাদের না পেয়ে মেহের ঢোঁক গিলে নিচে নামলো। টেবিলে সারিম, মাহিম এবং সামিরা বসে আছে। নিচে নামলে লিভিংরুমে চাচ্চু এবং বাবাকে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো মেহের। যাক, আজ ভাগ্য তাঁর অনুকূলে। মেহের সারিমের পাশে বসতে নিলে সারিম মাহিমের দিকে চেয়ে বলে,

–“তোর পাশের চেয়ারটায় তোর আহাম্মক বোনকে বসা!”

মেহের গরম চোখে সারিমের দিকে তাকালে সারিম সেই মুহূর্তে মেহেরের দিকে তাকালো। সঙ্গে সঙ্গে মেহেরের চাহনির রঙ বদল হলো। পানসে চোখে চাইলো সারিমের দিকে। সারিম কিছুই বললো না। মেহের নজর সরিয়ে মাহিমের পাশে গিয়ে বসলো। জ্যুতি অর্থাৎ মেহেরের মা ওদের খাবার সার্ভ করে দিচ্ছে। মাহিম মেহেরের কানে ফিসফিস করে বললো,

–“তুই নাকি প্রেম করছিস মেহের? তা নির্বোধ ছেলেটা কে? যে তোর মতো বোকার প্রেমে পরলো?”

মেহের মাহিমের দিকে কটমট চোখে চেয়ে বললো,
–“তোকে কে বলেছে এসব আজেবাজে কথা?”

–“তোর জমজ ভাই হই আমি। তোর মাথায় কী চলে তা আমি ঠিক-ই বুঝে যাই!”

মেহের মুখ বাঁকিয়ে বললো,
–“উলটো পালটা লজিক!”

–“প্রেম করলে তোরে সারিম ভাই গুলি মা*বে মনে রাখিস!”
মাহিমের কথা শুনে এবার মেহের দমে রইলো।

সকালে সারিম-ই মেহেরকে কলেজে নিয়ে গেলো। কলেজে গিয়ে মেহের সোহার সাথে একপ্রকার বাধ্য হয়ে সারিমের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো। সারিম সোহাকে বেশকিছু প্রশ্ন করে সরে এলো।

আশেপাশের কিছু ছেলেকেও মেহেরকে চিনিয়ে দিয়ে তাঁর উপর নজর রাখতে বললো। এত-সবের মাঝে মেহের প্রেম করতেই ভুলে গেছে।

————–
রাত আটটা বাজে। হঠাৎ কলিংবেল বেজে ওঠলে সাইয়ান দরজা খুলে দেখলো রোজা দাঁড়িয়ে। রোজাকে দেখে সাইয়ান হাসার চেষ্টা করে বললো,
–“আরে মিস রোজা যে?”

রোজা আলতো হেসে হাতের টিফিন বাক্সটা এগিয়ে দিয়ে বললো,
–“রান্না করলাম। ভাবলাম আপনাকেও দিয়ে আসি!”

–“আরেহ। আপনি-ই খেতেন! আমার জন্যে আনার কী প্রয়োজন ছিলো?”

রোজা এবার নজর নামিয়ে অল্প অল্প স্বরে বললো,
–“ইচ্ছে করলো স্যার। আপনি চাইলেই আপনাকে আমি রান্না করে দিতে পারি। রোজ রোজ শুধু শুধু আপনার ফুপি কষ্ট করছেন!”

সাইয়ান অবাক হয়ে চাইলো রোজার দিকে। রোজার সবকিছুতে এত বেশি নজর এবং যত্ন করা সাইয়ানকে ইদানীং বেশ ভাবাচ্ছে।

প্রায় সময়-ই সাইয়ানকে এটা সেটা রান্না করে দিয়ে যায়। যা সাইয়ানের বোধগম্য হয় না। এত সেবা পাবার মতোও তো মিশেনি রোজার সাথে। তাহলে রোজা কেন তাকে নিয়ে এতটা চিন্তিত থাকে? তার যত্ন করে?

কী লাভ এই মেয়েটার এসবে? এটা কী তাঁর সরলতা নাকি তার কোনো কু-বুদ্ধি সাইয়ানের সাথে মেশার জন্যে? তবে রোজাকে সাইয়ানের মোটেও সন্দেহজনক লাগে না। মেয়েটা সত্যি-ই সরল।

সাইয়ান বেশি কিছু না ভেবে সৌজন্যমূলক হাসি দিয়ে রোজার হাত থেকে টিফিনটা নিয়ে বলে,
–“থ্যাঙ্কিউ সো মাচ্ মিস রোজা!”

রোজা আলতো হাসলেও পরমুহূর্তে আমতা আমতা করে বললো,
–“স্যার আমি কিছু বলতে চাই!”

সাইয়ান ভ্রু কুচকে তাকায় রোজার দিকে। জিজ্ঞাসু নজরে চেয়ে বললো, “জি, বলুন!”

রোজা আমতা আমতা করে বললো,
–“আমার দশদিনের জন্যে ছুটির প্রয়োজন!”

সাইয়ান ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে বলে,
–“ওহ এই ব্যাপার। তাহলে বিশ্রাম করুন। সমস্যা নেই!”

রোজা মাথা তুলে চেয়ে বলে,
–“জিজ্ঞেস করবেন না কেন নিচ্ছি?”

সাইয়ান ভ্রু কুচকে বললো, “কেন নিচ্ছেন?”

–“আমি বিয়ে হবে স্যার। আপনার দাওয়াত রইলো।”

———————
মেহের বাড়িতে ফিরতেই লিভিংরুমে দেখতে পেলো ইলিরা কে। ইলিরা হচ্ছে সারিমের সেই বান্ধুবী। ইলিরাকে দেখে মেহের ভালো করেই চিনে ফেললো। তবে ইলিরার আজকের রূপ দেখে মেহের বেশ অবাক হলো।

ইলিরা আজ শাড়ি পরে এসেছে তাদের বাসায়। অথচ মেহেরের মনে পরে না সে কোনোদিনও শাড়ি পরেছিলো কী না। ইলিরা ওড়না ছাড়া ড্রেস পরতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। খুব স্টাইলিশ জামা-কাপড় পরিধান করে।

মেহেরের মনে আছে, একসময় সে ইলিরার মতো হতে চাইতো। ইলিরার ড্রেসআপ মেহেরের খুব পছন্দ ছিলো। তাই মেহের শপিং-এ গিয়ে ইলিরার মতো ড্রেস চুজ করেছিলো কিনবে বলে। কিন্তু সেই ফলাফল স্বরূপ মেহের শপিংমলের শত মানুষের সামনে চড় খেয়েছিলো সারিমের হাতে।

সেদিন লজ্জায়, রাগে মেহের টানা তিন দিন কেঁদে ভাসিয়েছে। খাওয়া-দাওয়াও ঠিক মতো করেনি। সারিম একবারও চাইতেও আসেনি মেহেরকে। এত অভিমান, দুঃখ কাকে বুঝাতে চাইলো আর তার সাথে কী হলো? সেদিনের পর থেকে মেহের অভিমান করাই ছেড়ে দিয়েছে। তবে সেই তিনদিন ঘুমের মাঝে ঠান্ডা হাতের স্পর্শ পেত সে।

অতীত ঘাটতে গিয়ে হঠাৎ-ই সারিমের প্রতি আলাদা অনুভূতি তাঁর সর্বাঙ্গ জুড়ে নাড়া দিলো মেহেরের। সে বুকের বা পাশে হাত চেপে লম্বা নিঃশ্বাস ফেললো।

~চলবে, ইন-শা-আল্লাহ্।