#বিরহের_নাম_তুমি
#পর্ব_২২
#মুন্নি_আক্তার_প্রিয়া
__________________
৫৮.
হাসপাতালের বেডে শুয়ে রয়েছে সুমি। গতকাল এক্সিডেন্টের দরুণ এখন তাকে হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকতে হচ্ছে। সে নিভু নিভু চোখে তাকিয়ে দেখতে পায় রাসেলকে। রাসেল পরম যত্নে সুমির হাতে আলতো করে হাত বুলিয়ে দেয়। প্রত্যুত্তরে মৃদু হাসি উপহার দেয় সুমি।
‘এখন কেমন আছো?’ জিজ্ঞেস করে রাসেল।
সুমি মৃদুস্বরে বলল,’ভালো।’
‘কাল রাতে কেন বেরিয়েছে বলো তো?’
‘রুমে খাবার ছিল না।’
‘আমায় ফোন করতে পারতে।’
‘সারাদিন কাজ করে কত ব্যস্ত থাকো তুমি! তাই বিরক্ত করতে চাইনি।’
‘একদম উদ্ধার করেছ আমায়!’
‘তুমি কি রাগ করেছ?’
‘না তো! অনেক খুশি হয়েছি। খুশিতে এখন আমার নাচতে ইচ্ছে করছে।’
সুমি হেসে ফেলে। বলে,’তাই? তাহলে নাচো একটু।’
‘তুমি কখনো আমার কষ্ট বুঝবে না।’
‘ভালোবাসা তো বুঝি।’
রাসেল চুপ করে থাকে। কিছুক্ষণ পর সুমি জিজ্ঞেস করে,’আমায় হাসপাতাল থেকে কবে রিলিজ করবে?’
‘কেন?’
‘কেন মানে? তুমি জানো না আমি এখানে পার্ট টাইম জব করি? কাজে না গেলে চাকরী থাকবে না আমার।’
‘দরকার নেই তোমার কোনো চাকরী করার। আমি আগেও তোমায় বারণ করেছিলাম। তুমি শোনোনি। এখন তো এক্সিডেন্ট করেছ। এবার আর আমি তোমার কোনো কথাই শুনব না।’
‘পাগলামি করছ কেন? বাড়ি থেকে যে টাকা পাঠানো হয়, তাতে আমার থাকা-খাওয়া, পড়াশোনার খরচ চালানো সম্ভব নয়। কতগুলো করে টাকা সেমিস্টার ফি দিতে হয়। আমাকে আমার জন্য হলেও জবটা করতে হবে।’
রাসেল এবার সুমির চুলের মাঝে আলতো করে হাত বুলাতে বুলাতে বলল,’কেন সুমি? আমাকে কি ভরসা করা যায় না?’
‘যাকে ভালোবাসি তাকে ভরসা কেন করতে পারব না? এত বড়ো আমেরিকা শহরে আমার বেষ্টফ্রেন্ডের পর তুমিই দ্বিতীয় ব্যক্তি যাকে আমি ভরসা করতে পারি।’
‘তাহলে চিন্তা করছ কেন? আমি তোমার সব খরচ চালাব।’
‘না। তুমি নিজে এখানে থাকো সেই খরচ তো আছেই। আবার বাড়িতেও টাকা পাঠাও। এখন আবার আমার খরচ? কোনো দরকার নেই।’
‘চুপ! আমি যখন বলেছি দরকার আছে, মানে দরকার আছে। আর কোনো কথা শুনতে চাই না। তোমার বান্ধবী রিয়াকে ওদের ফোন করে জানিয়ে দিতে বলব যে, তুমি আর ঐ কাজটা করছ না।’
‘তাহলে আমি কী করব শুনি?’
‘আপাতত নিজের খেয়াল রাখতে হবে। সুস্থ হয়ে উঠতে হবে। আর পড়াশোনা করবে ব্যস!’
‘তাহলে আমি তোমার বাসায় গিয়েই উঠি, কী বলো?’
রাসেল একটু থমকায়। তৎপর মুখে হাসি টেনে বলে,’হ্যাঁ, অবশ্যই। সময় হোক। এখন তুমি একটু রেস্ট নাও তো। ঘুমাও।’
‘তুমি যাবে না কিন্তু।’
‘আচ্ছা আমি যাব না।’
সুমি ঘুমানোর পর রাসেল কেবিন থেকে বেরিয়ে আসে। ঘুম পরিপূর্ণ হয়নি বলে মাথা ব্যথা করছে। ভূমির কথাও তার হঠাৎ করে মনে পড়ে যায়। এদিকে সে সুমিকে অনেক বেশি ভালোবেসে ফেলেছে। সুমিকে ছেড়ে দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। বাড়িতে গেলেই ভূমির মুখোমুখি হতে হবে। তাই সে বাড়িতে না গিয়ে অফিসে চলে যায়। অফিসেও তার মন ঠিক টিকছিল না। একদিকে ভূমি তো অন্যদিকে সুমি। যদি সুমি সব জানতে পেরে যায়! তাহলে হয়তো ওদের দুজনের সম্পর্কটা আর থাকবে না। আর সে তো চায় না সুমিকে হারাতে। অন্যদিকে ভূমি যদি বাংলাদেশে খবরটা জানায় তাহলে বিষয়টা আত্মীয়স্বজনের মাঝেও ছড়িয়ে পড়বে। সে চেয়েছিল ধীরে-সুস্থে, সময়, সুযোগ বুঝে ভূমিকে ছেড়ে দেবে। আর আগে যদি সে সুমিকে, তার ভালোবাসাকে পেয়ে যেত তাহলে তো ভুলেও সে ভূমিকে এখানে আনতো না। সবকিছু কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছে। হাতের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে না তো সবকিছু?
এসব ভাবতে ভাবতে তার আরও মাথা ব্যথা বেড়ে যায়। এই মুহূর্তে না ঘুমালে কিছুতেই চলবে না। তাই সে বাধ্য হয়েই বাড়িতে ফিরে যায়। কলিংবেল না বাজিয়ে নিজের কাছে থাকা চাবি দিয়েই দরজা খুলে ভেতরে যায়। ড্রয়িংরুমের সবকিছু এদিক-সেদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। কাচের জিনিসগুলো ভেঙে কাচের টুকরা চারদিকে ছড়িয়ে রয়েছে। বোঝা যাচ্ছে রাসেল বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর ভূমি সব কিছু ভাঙচুর করেছে। সে সাবধানে পা ফেলে বেডরুমে যায়। ভূমিকা উপুর হয়ে শুয়ে রয়েছে। মুখের এক সাইড দেখা যাচ্ছে। কৃষ্ণবর্ণ মুখটির গালে আঠালো হয়ে রয়েছে চোখের পানি। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে পিঠময় ছড়িয়ে রয়েছে। মেয়েটার মুখের ঐ এক সাইডেই যেন তার সমস্ত দুঃখ প্রকাশ পেয়েছে। একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে পরখ করে সে ভূমিকে। শাড়ির আঁচল গড়িয়ে পড়েছে ফ্লোরে। শাড়ির আঁচল লক্ষ্য করে নিচে তাকাতেই দেখতে পায় রক্ত জমাট বেঁধে আছে ফ্লোরে। রাসেল চমকে এগিয়ে যায়। শাড়ির আঁচলটি তুলতেই ভূমির রক্তমাখা হাতটি দেখতে পায়। তিনটা গভীর দাগ হাতে স্পষ্ট। বিছানার ওপরেই রাখা ধারালো ব্লেড। ভূমির বাহু ঝাঁকিয়ে রাসেল ডাকতে থাকে,’ভূমি? এই ভূমি?’
ভূমির কোনো সাড়াশব্দ নেই। রাসেল হাতের পালস্ চেক করে। নাকের কাছে হাত নিয়ে নিঃশ্বাস চেক করে। নিঃশ্বাস নিচ্ছে। অতিরিক্ত ব্লিডিং এর কারণে সেন্সলেস হয়ে গেছে। রাসেল কী করবে কিছু বুঝতে পারছে না। চোখে-মুখে পানির ছিটা দেওয়ার পরও জ্ঞান ফিরছে না। রাসেল ঘাবড়ে যায়। বেশি বেশি পানি নিয়ে মুখে ছিটায়। অবশেষে ভূমির জ্ঞান ফিরে। সে রাসেলকে দেখে অনেক বেশি খুশি হয়ে যায়। কিন্তু যখনই সব মনে পড়ে যায় তখনই তার হাসিটা মিলিয়ে যায়। রাসেল ফাস্টএইড বক্স নিয়ে আসে। ভূমির পাশে বসে হাতের রক্ত পরিস্কার করে ব্যান্ডেজ করে দেয়। ব্যান্ডেজ করতে করতে জিজ্ঞেস করে,’এগুলো কী ধরণের পাগলামি ভূমি? তুমি একটা ম্যাচিউরড মেয়ে। এসব পাগলামি কি তোমায় মানায়?’
‘ঘরে বউকে রেখেও যদি বাইরে তুমি পরকিয়া করতে পারো এবং এটায় যদি তোমায় মানায় তাহলে আমায় এইটুকু পাগলামিতে মানাবে না?’
রাসেল এক পলক ভূমির দিকে তাকিয়ে বলে,’বারবার পরকিয়া কেন বলছ? আমি ভালোবাসি ওকে।’
‘আর আমাকে?’
রাসেল চুপ করে থাকে। ভূমি পূণরায় জিজ্ঞেস করে,’আর আমাকে?’
‘ভালোবাসতাম!’
তীরের ফলা যেন ভূমির বুকটাকে এফোঁড়ওফোঁড় করে দিলো চোখের পলকেই। হাত ছিটকে সরিয়ে নেয় রাসেলের হাত থেকে। চোখে পানি টলমল করছে। মুহূর্তে চোখ থেকে টপটপ করে পানি পড়তেও শুরু করে। সে বলে,’ভালোবাসতাম বলে কোনো শব্দ হয় না রাসেল। হয়তো ভালোবাসি হবে নয়তো কখনোই ভালোবাসিনি হবে।’
রাসেল ফাস্টএইড বক্স নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। ভূমি পেছন থেকে হাত টেনে ধরে। শীতলকণ্ঠে বলে,’তুমি আমায় ভালোবাসো না বললেই পারতে। আমি নিজেই সরে যেতাম। বিয়ের মতো একটা পবিত্র সম্পর্ককে অবহেলায় পায়ে ঠেলে দিয়ে কেন পরকিয়ার মতো জঘন্য সম্পর্কে জড়ালে?’
‘পরকিয়া হতে যাবে কেন? বললাম তো আমি ভালোবাসি ওকে।’
রাসেলের আবারও অকপটে বলা ‘আমি ভালোবাসি ওকে’ কথাটি একদম তীরের মতো বিঁধে ভূমিকার বক্ষে। নিজের ভালোবাসার মানুষ, নিজের স্বামীর মুখে শুনতে হচ্ছে সে অন্য একটি মেয়েকে ভালোবাসে। ভূমিকা শ্লেষোক্তি করে বলে,’বিয়ের পরে অন্য মেয়ের সাথে সম্পর্কে জড়ানোকে তুমি পরকিয়া বলতে চাচ্ছ না?’
‘না, চাচ্ছি না। আমাদের মধ্যে ভালোবাসা ব্যতীত খারাপ কোনো সম্পর্ক নেই।’
‘রাসেল, তুমি কি জানো; তুমি একজন নিঁখুত অভিনেতা?’
রাসেল নিশ্চুপ। ভূমি বলল,’সেই মেয়ে যদি তোমার ভালোবাসা হয়ে থাকে তাহলে আমি কে তোমার? মোহ? ক্ষণিকের ভালোলাগা?’
রাসেল এবার অতি সহজেই বলে ফেলল,’অনেকটা সেরকমই। ওকে দেখার পর আমি বুঝেছি ভালোবাসার সত্যিকারের অনুভূতিটা কেমন হয়। যেটা তোমায় দেখে আমি কখনো মনে হয়নি।’
এ কথা শোনার পর রাসেলের হাতটি ছেড়ে দেয়। ভূমিকা হাসে। কষ্টের হাসি!
_________
৫৯.
‘কেন মেঘ আসে হৃদয়-আকাশে
কেন মেঘ আসে হৃদয়-আকাশে
তোমারে দেখিতে দেয় না
মোহমেঘে তোমারে দেখিতে দেয় না
মোহমেঘে তোমারে
অন্ধ করে রাখে
তোমারে দেখিতে দেয় না
মাঝে মাঝে তব দেখা পাই
চিরদিন কেন পাইনা?
মাঝে মাঝে তব দেখা পাই
চিরদিন কেন পাইনা?’
ফাতেমার কণ্ঠে মুগ্ধ হয়ে গানটি শুনছে সূচনা। সমস্ত আবেগ, সুর যেন ফাতেমা গানটিতে ঠেলে দিয়েছে। গান শেষ হলে সূচনা হাত তালি দেয়। ফাতেমা লজ্জা পেয়ে বলে,’কী যে করিস না!’
সূচনা হাতের ইশারায় বলে,’অনেক সুন্দর হয়েছে।’
ফাতেমা সলজ্জিত হাসে। একটুপর আবার মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে বলে, ‘সুখী আর সাথীকে খুব মিস করছি। তোর ইন্টার শেষ হলে তুইও তো চলে যাবি। শুধু আমিই রয়ে যাব। তোরা চলেই যদি যাবি তাহলে এসেছিলি কেন বল তো?’
সূচনা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে। এর প্রত্যুত্তরে তার সত্যিই কিছু বলার নেই। তবে এ কথাও সত্য ইন্টার শেষ হলে সে গ্রামে ফিরে যাবে। বাবা-মায়ের সাথে থাকবে। নামি-দামি কলেজ, ভার্সিটিতে না পড়লেও ভালো স্টুডেন্ট হওয়া যায়। ভালো রেজাল্ট করা যায়। ঢাকা-শহরে এসে সে ভিন্নরূপী মানুষ দেখেছে; যা তার ভালো মানুষ দেখার তুলনায় খুবই বেশি। মানুষ চিনেছে, অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে সে। ঢাকা শহরের যান-জট, অলিগলিও এখন আর তাকে টানে সে। তার গ্রামের মেঠো পথ, বৃষ্টির দিনে পিছলে যাওয়ার ভয়ে থাকা সেই পিচ্ছিল রাস্তাটিকেও সে এখন মিস করে। প্রয়োজনে দু’বেলা ডাল-ভাত খাবে তবুও সে বাবা-মায়ের সাথেই থাকবে। আর সে দূরে থাকবে না। এখন শুধু অপেক্ষা ফাইনাল পরীক্ষার।
সূচনাকে ভাবুক হয়ে বসে থাকতে দেখে মৃদু ধাক্কা মারে ফাতেমা। জিজ্ঞেস করে,’কী ভাবছিস?’
সূচনা মৃদু হেসে দু’দিকে মাথা নাড়ায়। যার অর্থ, ‘কিছু না।’
সে সময়ে সাথী ফোন করে ফাতেমাকে। কী কথা বলল তা সূচনা শুনতে পায়নি। ফোন রাখার পর ফাতেমা বলল,’তোর বড়ো বোন সাথীর হোয়াটসএপে ফোন দিয়ে তোকে চেয়েছে। কিন্তু ও তো এখন এখানে নেই। তাই ফোন দিয়ে আমায় জানালো। তুই আমার ফোন দিয়ে কথা বল। নাম্বার সেভ করে নে ধর।’
সূচনা ফোনটি হাতে তুলে নেয়। অনেকদিনই হবে ভূমির সাথে ওর তেমন কথা হয় না। আজ কেমন যেন একটু ভয় ভয় হচ্ছিল। আপু ভালো আছে তো?
চলবে…
#বিরহের_নাম_তুমি
#পর্ব_২৩
#মুন্নি_আক্তার_প্রিয়া
_________________
৬০.
ব্যথায় বাঁ হাতটি নাড়াতে পারছে না ভূমিকা। সোফার ওপর হাত ছড়িয়ে নিচে ফ্লোরে বসেছে সে। ফোনটিও সোফার ওপর রেখে অপেক্ষা করছিল সূচনার জন্য। অশান্তির মধ্যে বাড়ি কিংবা সূচনা; কারোর সাথেই কথা হওয়ার সুযোগ হয়নি। বাড়িতে ফোন করলে মা কণ্ঠ শুনে এবং ভিডিয়ো কলে মুখ দেখে কিছু না কিছু ঠিকই আন্দাজ করে ফেলবে। যেটা ভূমিকা এখন চাচ্ছে না। সূচনা যেহেতু কথা বলতে পারে না, তাই ভিডিয়ো কলে কথা বলার প্রয়োজন নেই। টেক্সটেই সকল খোঁজ-খবর নিতে পারবে।
তার চিন্তার মাঝেই হোয়াটসএপের ম্যাসেজ টোন বেজে ওঠে। ফোনের লক খুলে দেখতে পায় ম্যাসেজে লেখা,’আপু, আমি সূচনা।’
ভূমিকা একটু নড়েচড়ে বসে রিপ্লাই করে,’কেমন আছিস?’
‘আলহামদুলিল্লাহ্ আপু। তুই কেমন আছিস?’
ম্যাসেজটির দিকে অনেকক্ষণ যাবৎ তাকিয়ে থাকে ভূমিকা। আসলেই তো, কেমন আছে সে? ভালো? না, ভালো থাকাটা তো এখন তার জন্য হারাম হয়ে গেছে। তার সুখের জীবনে দুঃখের প্লাবন এসেছে। সে তো ভালো নেই। সে জানে না, আর কখনো তার ভালো থাকা হয়ে উঠবে কিনা। তবে সে, ছোটো বোনকে বলতেও পারবে না সে ভালো নেই। তার মনের দুঃখ প্রকাশ করার জন্য পারবে না একটু বোনকে জড়িয়ে ধরতে। পারবে না একটু মায়ের কোলে মাথা রেখে কাঁদতে। আর না পারবে একটু বাবার কাঁধে মাথা রাখতে। সে কতটা অসহায় এই মুহূর্তে, তা বোধ করি কারো অজানা নয়। এই বিদেশের মাটিতে সে বড়ো-ই একা, নিঃস্ব। তার চাতকপাখির মতো প্রিয় মানুষটির পথ চেয়ে বসে থাকা, তৃষাতুর দৃষ্টিতে অপেক্ষার মূল্যায়ন করার জন্য যে মানুষটি কেবল ছিল, সে এখন বড্ড অচেনা। পরিবর্তন মানুষকে সম্পূর্ণ আলাদা রূপে গুণান্বিত করে, যেটি রাসেল পরিবর্তন না হলে ভূমিকা বুঝতেই পারত না।
‘এই আপু? কোথায় গেলি?’ সূচনার ফিরতি ম্যাসেজে অশ্রুশিক্ত টলমল নয়নে সে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকায়। সবকিছু ঝাপসা দেখছে সে। ডান হাতে চোখের পানি মুছে। প্রস্তুত হয় বোনকে সাজিয়ে-গুছিয়ে মিথ্যা বলার জন্য। সে লিখে,’স্যরি রে সোনা, পানি খেতে গেছিলাম।’
সাথে সাথে রিপ্লাই আসে সূচনার,’আচ্ছা এখন বল,কেমন আছিস?’
‘আলহামদুলিল্লাহ্ ভালো। কী করছিস তুই?’
‘পড়ছিলাম। তুই কী করিস?’
‘আমি বসে আছি। খেয়েছিস তুই?’
‘হ্যাঁ। তুই?’
ভূমিকা কিছুই খায়নি পানি ব্যতীত। তাও সে লিখল,’হ্যাঁ।’
এবার সূচনা লিখল,’আপু ভিডিয়ো কল দে।’ এই ম্যাসেজটার জন্য ভূমিকা একদমই প্রস্তুত ছিল না। সে এখনই সূচনাকে কিছু জানাতে চাচ্ছে না। এমনিতেই তার বোনটা কথা বলতে পারে না। এসব শুনে ভেতরে কষ্ট জমিয়ে দম আটকে মরে যাবে। নিজের কষ্টের জন্য সে তার আদরের বোনকে কষ্ট পেতে দেবে না। তাই এবারও সে একটা মিথ্যা কথা বলল,’এখন তো আমি রান্না করব রে। তোর ভাইয়া চলে আসবে একটু পর-ই। আমি তোকে পরে কল করব।’ ম্যাসেজটা পাঠিয়ে সঙ্গে সঙ্গে সে অফলাইন হয়ে যায়। ফোনের পাওয়ার অফ করে সোফার ওপর মাথা রাখে। ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে সে। তার যে কতটা কষ্ট হচ্ছে, সেটি সে কাউকে বলতে পারছে না। সে পারবে না কাউকে বোঝাতে। সবচেয়ে প্রিয় মানুষটির এভাবে বদলে যাওয়াটাকে সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না।
______
৬১.
সুমিকে আজ হাসপাতাল থেকে রিলিজ করবে তাই হাসপাতালের সব বিল রাসেল মিটিয়ে দিচ্ছে। সবকিছু কমপ্লিট হলে রাসেল সুমির কেবিনে আসে। রিয়া আর সুমি তখন গল্প করছিল। রাসেলকে দেখে সুমি মিষ্টি করে হাসে। রিয়া বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলে,’এইতো আপনি এসে পড়েছেন। এবার আমায় উঠতে হবে।’
‘কোথায় যাবে?’ জিজ্ঞেস করে রাসেল।
‘আমার তো ক্লাস আছে ভাইয়া। তারপর আবার জব। ফিরতে সন্ধ্যা নয়তো রাত হবে।’
‘আচ্ছা সাবধানে যেও। আর ক্লাসে যা পড়ায় নোট করে রাখবে। সুমিকে কিন্তু তোমারই সাহায্য করতে হবে এখন।’
রিয়া সহাস্যে বলল,’অবশ্যই ভাইয়া। আমি তাহলে আসি।’
‘আমাদের সাথে নাস্তাটা করে যেতে?’
‘না ভাইয়া। আমি নাস্তা করেই এখানে এসেছি। বাড়িতে আপনাদের জন্যও নাস্তা বানানো আছে। খেলে খুব খুশি হব।’
রাসেলও এবার হেসে বলল,’অবশ্যই।’
পুরো সময়ে সুমি রাসেলের সাথে কোনো কথা বলেনি। রিয়া চলে যেতেই রাসেল প্রশ্ন করল,’ওমন গোমড়া মুখ করে বসে আছো কেন?’
‘তুমি সত্যি সত্যিই আমার জবটা ছাড়ালে তাহলে?’
‘হ্যাঁ। এতে কোনো সন্দেহ নেই। রাগ করলেও আমি শুনব না।’
সুমি আর কিছু বলল না। ওপরে ওপরে রাগ দেখালেও মনে মনে সে খুশি। প্রিয় মানুষ এতটা টেক কেয়ার করলে কার না ভালো লাগে? রাসেল সুমিকে নিয়ে ওদের ফ্ল্যাটে যায়। এক রুমের ফ্ল্যাট। পাশে ছোট্ট একটা কিচেন, আর ছোট্ট ড্রয়িংরুম। সুমি এবং রিয়ার জন্য একদম পার্ফেক্ট। সুমিকে বেডে বসিয়ে দিয়ে রাসেল কিচেনে যায় রিয়ার বানানো নাস্তা আনতে। খুব বেশি কিছু নয়। স্যান্ডউইচ এবং আপেল জুস। রাসেল আগে সুমিকে খাইয়ে দিয়ে তারপর নিজে খায়। ওষুধ খাওয়ানোর সময়ে সুমি জিজ্ঞেস করে,’তুমি কি চলে যাবে এখন?’
সুমিকে আগে ওষুধ খাইয়ে দেয় রাসেল। কোনো কথা বলে না। ওষুধ এবং পানি সরিয়ে রেখে সে সুমির পাশে বসে। সুমির হাতটি নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলে,’চলে গেলে খুশি হবে?’
‘একদম না। খুব একা লাগবে।’
‘যাব না।’
সুমি উৎসাহিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,’সত্যি?’
‘৩ সত্যি।’
সুমি খুশি হয়ে রাসেলের হাত চেপে ধরে কাঁধে মাথা রাখে। আহ্লাদী কণ্ঠে বলে,’এখন একটা গল্প শোনাও।’
‘গল্প? গল্প তো আমি পারি না।’
‘যা পারো তাই শোনাও।’
রাসেল কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে,’আচ্ছা ঠিক আছে। শোনো তাহলে। এক ছিল রাজকুমার আর এক ছিল রাজকন্যা। রাজকন্যা ছিল অনেক বেশি সুন্দরী। কত ছেলে তার আশেপাশে ঘোরে। কিন্তু সে কাউকে পাত্তা দেয় না। সে ছিল পরিবারের বাধ্য মেয়ে। বাবা-মায়ের সুখ, দুঃখ সব বুঝত। একদিন তাদের রাজ্যে স্নো ফলস্ হয়। সেদিন রাজকন্যা একা একা ঘুরতে গিয়েছিল। রাতের বেলায় স্নো ফলস্-এর জন্য সে প্রাসাদে ফিরতে পারছিল না। ডাকাতের ভয় তো ছিলই, তার ওপর আবার বরফ! শীতে প্রাণ যাওয়ার উপক্রম। ঠিক সেই সময়ে রাজকুমারের সাথে রাজকন্যার দেখা হয়ে যায়। একটা কাজ সেরে রাজকুমার বাড়ি ফিরছিল। কিন্তু পথে রাজকন্যাকে বিপদে পড়তে দেখে, সে আর প্রাসাদে ফিরে যায় না। বাড়িতে খবর পাঠিয়ে দেয়, স্নো ফলস্-এর জন্য রাস্তা-ঘাট বন্ধ থাকায় সে ফিরতে পারবে না।’
এতটুকু বলার পর সুমি রাসেলকে থামিয়ে দিয়ে বলে,’এটা তো তুমি আমার আর তোমার ঘটনা বলছ।’
রাসেল হেসে বলে,’ধরে ফেলেছ দেখছি।’
সুমি মুচকি হেসে বলে,’মাঝে মাঝে বিপদও ভালো হয় বলো?’
‘কী রকম?’
‘সে রাতে যদি স্নো ফলস্ না হতো আর তোমার সাথে আমার দেখা না তো তাহলে কি এখন আমরা এক সাথে থাকতাম?’
‘একদম তাই। আমি তো কখনো ভাবতেই পারিনি, সুন্দরী রাজকন্যা আমাকে ভালোবেসে ফেলবে।’
‘তোমার ভালোবাসাকে উপেক্ষা করার মতো ক্ষমতা যে আমার ছিল না।’
রাসেল আলতো করে সুমির কপালে চুমু খায়। দুজনে কিছুক্ষণ গল্পগুজব করে। দুপুরে রাসেল এখানেই রান্নাবান্না করে। সুমি গোসল করে আসার পর ভেজা চুল মুছে দেয়। চুল আচড়ে দেয়। ড্রয়িংরুমে বসে দুজনে গল্প করে। দুপুরে দুজনে একসাথে খায়, ফোনে মুভি দেখে, সিরিজ দেখে সময় পার করে ফেলে। সন্ধ্যার দিকেই রিয়া ফিরে আসে। রিয়া চলে আসার পর রাসেলও বাড়ি ফিরে আসতে চাইলে রিয়া বাঁধ সেধে বলে,’আজ আমরা তিনজন একসাথে ডিনার করব প্লিজ ভাইয়া!’
রাসেল বুঝতে পারে সুমি নিজেও এটা চাচ্ছে। তাই সেও রাজি হয়ে যায়। ডিনারের আয়োজন করে রাসেল এবং রিয়া। রান্নাবান্না করে ডিনার করতে করতে রাত দশটা পার হয়ে যায়। ওদের থেকে বিদায় নিয়ে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দেয় রাসেল। পথে গাড়ি থামিয়ে রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার পার্সেল করে নেয় ভূমির জন্য।
__________
৬২.
এক হাতের সাহায্যেই পুরো বাড়িটা গোছগাছ করে নিয়েছিল ভূমিকা। অনেকদিন বাদে গার্ডেনে যাওয়ার দরুণ মিসেস চৌধুরীর সাথে দেখা হয়েছিল। তিনি জানিয়েছিলেন বিকেলে বাসায় আসবেন। তিনি যেন কোনো কিছু সন্দেহ না করতে পারে তাই সে কষ্ট করে হলেও বাড়িটা গুছিয়ে ফেলে। মিসেস চৌধুরীর সামনে বাঁ হাত শাড়ির আঁচল দিয়ে ঠেকে রেখেছিল। হেসে হেসে কথা বলতে, ভালো থাকার অভিনয় করতে তার অনেক বেশি কষ্ট হচ্ছিল তবুও সে ভালো থাকার অভিনয় করতে কোনো ত্রুটি রাখেনি। কিন্তু তার সকল চেষ্টা বৃথা গেল মিসেস চৌধুরী ফিরে যাওয়ার সময়ে। তাকে বিদায় দিতে যাওয়ার সময়ে ভুলবশত শাড়ির আঁচল হাতের ওপর থেকে সরে যায় এবং সাদা ব্যান্ডেজ চোখের সামনে ভেসে ওঠে। মিসেস চৌধুরী আৎকে উঠে জিজ্ঞেস করেন,’এসব কী? হাতে কী হয়েছিল?’
ভূমি অস্বস্তিতে পড়ে যায়। উপস্থিত কোনো বুদ্ধিই সে খাটাতে পারছিল না। আবার সে চাচ্ছিলও না তিনি কিছু বুঝে ফেলুক। ভূমি কিছু বলার পূর্বেই তিনি বললেন,’রাসেলের সাথে রাগ করে হাত কেটেছ?’
ভূমি মৃদু হাসার চেষ্টা করে বলে,’না, তেমন কিছু না। কীভাবে যেন কেটে গেল!’
‘মিথ্যেও তো গুছিয়ে বলতে পারো না। তোমাদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কী হয়েছে আমি জানিনা। তবে এতটুকু বলব, এগুলো পাগলামি একদম করবে না। সবার আগে নিজেকে ভালবাসতে হবে বুঝেছ? আর রাগ-অভিমান বেশিদিন মনের মাঝে পুষে রেখো না কেমন? নিজের যত্ন নাও। চোখের নিচে তো ডার্ক সার্কেল পড়ে গেছে। আমি কাল আসব, যাই এখন। সন্ধ্যা হয়ে গেছে।’
‘জি আপু।’
মিসেস চৌধুরী চলে যাওয়ার পর ভূমি মনে মনে বলে,’আমাদের মাঝে তো কোনো রাগ-অভিমানই নেই আপু। যা আছে, তা হচ্ছে সম্পর্কের ফারাক। দুজনের মধ্যকার মনের দূরত্ব। তবে একটা কথা সঠিক বলেছেন, নিজেকে সবার আগে ভালোবাসা উচিত।’
.
রাসেল আজও কলিংবেল না বাজিয়েই ভেতরে প্রবেশ করে। ঘরের পরিবেশ দেখে কিছুটা অবাকও হয়। বেডরুমে উঁকি দিয়ে দেখে ভূমি ফোনে কিছু লিখছে। সে দরজায় দাঁড়িয়েই বলে,’খাবার এনেছি। খেয়ে নাও।’
কথাটা বলে রাসেল চলে যায়। ভূমি দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে প্রায় এগারোটা বাজে। সে ফোন রেখে ডাইনিংরুমে আসে। খাবার সার্ভ করছিল রাসেল। সবকিছু এগিয়ে দিয়ে বলল,’খেয়ে মেডিসিন খেয়ে নিও।’
ভূমি জিজ্ঞেস করল,’মেডিসিন কেন?’
রাসেল না তাকিয়েই বলল,’হাতের ব্যথার জন্য।’
‘ওহ। তুমি খাবে না? নাকি গার্লফ্রেন্ডের বাড়ি থেকে খেয়ে এসেছ?’
ভূমির ত্যাড়া প্রশ্নে রাসেল এবার মুখ তুলে তাকায়। চেয়ার টেনে বসে বলে,’খাব।’
ভূমিকে অতি মাত্রায় স্বাভাবিক দেখে রাসেল ভীষণ অবাক হচ্ছে। হুট করে সবকিছু এত স্বাভাবিক কেন? অন্যদিকে শুধু ভূমিই জানে, সে কোন দহনে পুড়ছে। খেতে খেতে ভূমি শীতল কণ্ঠে বলে,’আজ তুমি অফিসে যাওনি।’
‘অদ্ভুত। আজকাল কি লিন্ডাকে আমার পেছনে গোয়েন্দাগিরি করতে কাজে লাগিয়েছ?’
ভূমি তাচ্ছিল্য করে হাসে। বলে,’না। আমার এত টাকা-পয়সা নেই যে তোমার পেছনে গোয়েন্দা লাগাব। তাছাড়া যেখানে তুমি নিজেই স্পষ্টভাবে সব স্বীকার করেছ, সেখানে তো গোয়েন্দাগিরি করার কোনো প্রশ্নই আসে না। লিন্ডা আমাকে কিছুই বলেনি। তোমার মুখ দেখেই আন্দাজ করলাম, তুমি অনেক খুশি। গার্লফ্রেন্ডের সাথে ছিলে বলেই হয়তো এতটা খুশি! এছাড়া তোমার গায়ে পারফিউমের ঘ্রাণ তো আছেই। তোমার গার্লফ্রেন্ডের পারফিউমের ঘ্রাণটা সুন্দর। মারাত্মক! হাসপাতালেও কি সে পারফিউম ইউজ করে? নাকি তার বাসায় গিয়েছিলে তুমি?’
‘তুমি কি মজা করছ?’
ভূমি এবার শব্দ করে হেসে বলে,’না তো!’
‘পাগল হয়ে গেছ তুমি।’
হাসতে হাসতে এবার ভূমি কেঁদে ফেলে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলে,’শুধু পাগল? জীবন্ত লাশ হয়ে আছি আমি রাসেল! তোমার মতো ছেলেরা কখনো এই কষ্ট বুঝবে না।’
রাসেল মাথা মত করে খাবারের প্লেটে চামচ দিয়ে নাড়াচাড়া করতে থাকে। তার পেট তো এমনিতেই ভরা ছিল। ভূমি বাম হাতে চোখে পানি মুছে ফেলে বলে,’যতই মানুষ বলুক, সৌন্দর্যে আসলে কিছু আসে যায় না কিন্তু দিনশেষে মানুষ সৌন্দর্যকেই প্রাধান্য দেয়। সবাই-ই একজন সুন্দর জীবনসঙ্গী প্রত্যাশা করে।’
‘তুমি বলতে চাচ্ছ সুমির সৌন্দর্যের প্রেমে পড়েছি আমি?’
‘বলতে চাচ্ছি না; সরাসরিই বলছি। অস্বীকার করেও লাভ নেই।’
‘তবে তোমার ধারণা ভুল।’
‘তাই? আমার ধারণা কতটুকু ভুল আর কতটুকু সঠিক তা বোধ করি, আমার থেকে তুমিই বেশ ভালো জানো।’
রাসেল কথা বাড়ায় না। চুপ করে থাকে। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ভূমি বলে,’সেদিন ভুল করে তোমায় না ভালোবেসে যদি ফুল ভালোবাসতাম, তাহলে আজ আর তুমি নামক কোনো কষ্ট আমার থাকতো না।’
রাসেলের মনে পড়ে যায় সেদিনটির কথা। বিয়ের আগে ভূমিকার সাথে রাসেলের টুকটাক কথা হতো। ভূমি যে ফুল খুব পছন্দ করত তাও রাসেল জানত। তাই সে ফুল নিয়ে একদিন ভূমির ভার্সিটির সামনে যায়। সেদিন সে ভূমিকে জিজ্ঞেস করেছিল,’বলো তুমি আমায় গ্রহণ করবে নাকি ফুল?’
রাসেলের ওমন পাগলামিতে ভূমি বিস্ময়ের শেষ পর্যায়ে পৌঁছে যায়। তবে সত্য তো এটাও যে, মনে মনে রাসেলকে পছন্দ করত। কিন্তু পারিবারিক ঝামেলার দরুণ সে রাসেলকে বিয়ে করতে চায়নি। তবে রাসেলের করা সেদিনের পাগলামির প্রেমে পড়ে গিয়েছিল। তাই সে ফুলকে নয় রাসেলকে-ই বেছে নিয়েছিল। অতীতের ঘটনাটি রাসেলের সাথে সাথে ভূমিরও মনে পড়ে যায়। টপটপ করে চোখ থেকে পানি ঝড়তে থাকে। কাঁদতে কাঁদতে বলে,’তুমি করেছিলে নিঁখুত অভিনয়, আর আমি তোমায় নিঁখুতভাবে ভালোবেসে ছিলাম। আমার ভালোবাসায় তো কোনো খাদ ছিল না। তাহলে কেন তুমি আমার সাথে প্রতারণা করলে বলতে পারো?’
‘আমি বুঝতে পারিনি আসলে কী থেকে কী হয়ে গেছে।’
ভূমি আশার আলো দেখতে পায়। চেয়ার থেকে উঠে রাসেলের কাছে যায়। খপ করে হাত ধরে বলে,’রাসেল, যা হওয়ার হয়ে গেছে। আমি সব ভুলে যাব। তুমি ঐ মেয়েকে ছেড়ে দাও প্লিজ! আমরা আবার একসাথে ভালো থাকব। সুখে থাকব।’
রাসেল মাথা মত করেই বলল,’আমি ওকে ছাড়তে পারব না।’
হাত ছেড়ে দেয় ভূমি। বাঁকা হেসে বলে,’ও। তাহলে তুমি আমাকেই ছাড়তে পারবে।’ এরপর সে পূণরায় শব্দ করে হাসে। পাগলের মতো আচরণ করতে থাকে। চিৎকার করে বলতে থাকে,’আমি ভালোবাসি তোমায়। তুমি আমার সাথে প্রতারণা করেছ। এরপরও আমি তোমায় একটা সুযোগ দিতে চেয়েছিলাম। সব ভুলে গিয়ে আবারও তোমায় বিশ্বাস করতে চেয়েছিলাম, একসাথে থাকতে চেয়ে ছিলাম। তবে তুমি আমার চোখে এবারও আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলে, তুমি আসলে বিশ্বাসের যোগ্যই নও। তবে একটা কথা মনে রেখো, এটাই ছিল তোমার জন্য প্রথম এবং শেষ সুযোগ। ভূমি ফ্যালনা নয় রাসেল, ভূমি ফ্যালনা নয়। ভূমি তোমায় ভালোবাসে তাই সুযোগ দিয়েছিল। এজন্য তুমি ভূমিকে সস্তা ভেবো না। বরং আফসোস হচ্ছে আমার তোমার জন্য, তুমি সত্যিকারের ভালোবাসাকে মূল্যায়ন করতে পারলে না।’
কাঁদতে কাঁদতে ভূমির হেঁচকি উঠে গেছে। সে টেবিল থেকে কাচের গ্লাসটি ছুঁড়ে ফেলে ফ্লোরে। বিকট শব্দে রাতের নিস্তব্ধতায় যেন বাজ পড়ার মতো মনে হলো। রাসেল ভূমিকে কিছুই বলল না। কী বলবে সে? তার কি আদৌ কিছু বলার আছে? ভূমি কান্না থামিয়ে কাঠ কাঠ গলায় বলল,’প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই তো করতে পারোনি। তবে তোমায় ভালোবাসা-স্বরূপ আমি তোমায় একটা উপহার দেবো। নিঃসন্দেহে এই উপহার তোমার জীবনের সেরা উপহার হবে। তোমায় আমি সারাজীবনের জন্য মুক্ত করে দেবো। তোমার পথের কাঁটা হয়ে আমি থাকব না। তুমি সুখে থাকতে পারবে তোমার ভালোবাসাকে নিয়ে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমার বাংলাদেশে যাওয়ার ব্যবস্থা করো।’
এতক্ষণে রাসেল কথা বলে। জিজ্ঞেস করে,’তুমি শিওর বাংলাদেশে ফিরে যাবে?’
ভূমি তাচ্ছিল্য করে হাসে। কষ্ট লাগে খুব। তবুও সে মুচকি হেসে বলে,’যেখানে ভালোবাসা থাকে না সেখানে হয়তো থাকা যায়। কিন্তু যেখানে সম্মান থাকে না, সেখানে কখনো থাকা যায় না।’
‘আমি তোমায় অসম্মান করি?’
‘আমার ভালোবাসাকে তুমি অসম্মান করেছ। আমার বিশ্বাসকে তুমি অপমান করেছ।’
রাসেলকে আর কিছু বলতে না দিয়ে ভূমিকা রুমে চলে যায়। শব্দ করে দরজা লাগিয়ে দিয়ে ফ্লোরে বসে পড়ে। দু’হাতে মুখ চেপে অঝোরে কাঁদতে থাকে সে।
চলবে…
[কার্টেসী ছাড়া কপি করা নিষেধ।]