বিরহের নাম তুমি পর্ব-৪২+৪৩

0
556

#বিরহের_নাম_তুমি
#পর্ব_৪২
#মুন্নি_আক্তার_প্রিয়া
___________________
১১৭.
শোহেব বিস্মিত, স্তম্ভিত। সে বুঝতে পারছে না এটা আদৌ সত্যি নাকি স্বপ্ন। তার সম্পূর্ণ শরীর অসাড় লাগছে। সে লেকের পানির দিকে তাকায়। চাঁদের প্রতিচ্ছবি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে লেকের পানিতে। সে পানি থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আকাশপানে তাকায়। ঐতো রূপালী চাঁদ। অগণিত তারা। না, এ স্বপ্ন নয়। এ তার সত্য, বাস্তব। সে আলতোভাবে জড়িয়ে ধরে ভূমিকে। ভূমি তখনও অঝোরে কাঁদছিল। শোহেব আদুরেভাবে হাতটি ভূমির মাথায় রেখে প্রশ্ন করে,’কী হয়েছে ভূমি? আপনি কাঁদছেন কেন?’

শোহেবের প্রশ্নে যেন হুঁশ ফিরে আসে শোহেবের। সে শোহেবকে ছেড়ে দু’পা পিছিয়ে যায়। এতে কিছুটা আশাহত এবং আহত হয় শোহেব। তবুও নির্বিকার, স্বাভাবিক রাখে নিজেকে। ভূমিকেও সময় দেয় কিছুটা স্বাভাবিক হতে। ভূমি হাতের উলটো পিঠে চোখের পানি মুছে। তার কান্নারা যেন আজ পণ করেছে, এতদিন ধরে জমিয়ে রাখার ফলস্বরূপ আজকেই তারা বের হয়ে আসবে। ভূমি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলে,’কেন আমার সাথে এমন হতে হবে শোহেব? কেন এতগুলো সময়বাদে তাকে আবার ফিরে আসতে হবে? কেন? জীবনটাকে কি ছেলেখেলা মনে হয়? মন চাইলে খেলবে, মন না চাইলে নাই। আমি আর এসব নিতে পারছি না!’

শোহেব নিজেই এবার এগিয়ে যায়। কপালের সামনে পড়ে থাকা একগাছি চুলগুলোকে কানের পিছে গুঁজে দিয়ে বলে,’সত্যের সম্মুখীন হতে কখনো ভয় পেতে নেই। আপনি জানেন, আপনি কতটা স্ট্রং একটা মেয়ে? আপনি এতকিছুর পরও যেভাবে হার না মেনে লড়াই করে এসেছেন, নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে দেখিয়েছেন এই সাহসটা কিন্তু সব ভাঙা মেয়ে দেখাতে পারে না। তাদের বেশিরভাগই বেছে নেয় আত্মহননের পথ কিংবা নিজেকে সারাজীবন পরাজিত, ব্যর্থ ব্যক্তি হিসেবে পৃথিবীর কাছে মেনে নেয়। আর সেখানে এতদূর এসে আপনি ভেঙে পড়ছেন?’
‘আমি পারছি না শোহেব! পারছি না। আমি বুঝতে পারছি না, আমার সাথে এমন হচ্ছে কেন।’
‘ঠিক হয়ে যাবে। আপনি শান্ত হোন প্লিজ!’

ভূমি তবুও কিছুক্ষণ কাঁদে। এবার আর শোহেব বাধা দেয় না। কিছুক্ষণ বাদে ভূমি নিজেই শান্ত হয়। শোহেব নির্বাক ছিল এতক্ষণ। এবার সে প্রশ্ন করে,’আপনি কি রাসেলের কাছে ফিরে যেতে চান?’
ভূমি তাকায় না শোহেবের দিকে। তার দৃষ্টি সম্মুখের পথের দিকে। শোহেব বুঝতে পারছে না ভূমির এই নিরব থাকাটাকে কি সে সম্মতির লক্ষণ ধরে নেবে কিনা! আর যদি তাই হয়, তবে শোহেব নিজেও এবার ভেতর থেকে একদম ভেঙেচূড়ে যাবে। তৃতীয় কোনো মেয়েকে ভালোবাসার সাহস তার আর কখনোই হবে না। পৃথিবীর বুকে হয়তো তখন সেও একজন ব্যর্থ প্রেমিক হিসেবে রয়ে যাবে।

ভূমি প্রলম্বিত একটা শ্বাস ত্যাগ করে জিজ্ঞেস করে,’একদিন কথায় কথায় আপনার প্রাক্তনের কথা বলেছিলেন। ভালোবাসেন এখনো তাকে?’
শোহেব নিশ্চুপ হয়ে যায় এ প্রশ্নটি শুনে। অনেকক্ষণ সে কোনো কথা বলতে পারে না। ওভারব্রিজে দাঁড়িয়ে বিরতিহীনভাবে গাড়ির চলাচল দেখছে দুটি ভেঙে যাওয়া মানুষ। বুকের ভেতর অতীতের সেই ব্যথাটা ফিরে এসেছে শোহেবের। সেও বোধ হয় ভূমির মতো গোপনে দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলল,’অন্যের স্ত্রীকে ভালোবাসা আমার শোভা পায় না।’
‘বিয়ে হয়ে গেছে?’ ভূমিকে কিছুটা বিস্মিত দেখাল। শোহেব হাসার চেষ্টা করে বলল,’হ্যাঁ। এজন্যই এখন সে আমার প্রাক্তন।’
‘চিট করেছিল?’
‘না।’
‘তবে অন্য কাউকে কেন বিয়ে করেছে?’
‘দোষটা আমারই। আমি আসলে নিজের দোষেই ওকে হারিয়েছি। সম্পর্কের মাঝে রাগ-অভিমান হয়-ই। কিন্তু আমাদের মনে হয় ঝগড়াঝাঁটি একটু বেশিই হতো। কিন্তু আমি জানতাম, ও আমায় অনেক বেশি ভালোবাসে। একদিন আমাদের ঝগড়ার পরিমাণ এতই বেশি আর বিষাক্ত ছিল যে আমরা কথা বলাই বন্ধ করে দিয়েছিলাম। কিছুদিন পর ও আমায় ফোন দিয়ে বলল ওর বাড়ি থেকে বিয়ে দিতে চাচ্ছে। কান্নাকাটি করে অনেকবার আমায় বলেছিল মাকে নিয়ে ওদের বাসায় যেতে। কিন্তু আমার ইগোর কারণে আমি ফিরে যাইনি। ওকে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। তখনো বুঝিনি ঐ মেয়েটা আমার মনের কতটা জায়গাজুড়ে ছিল। ওর বিয়েটা যেদিন হয়েই গেল সেদিন রাত থেকেই আমার অস্থিরতা শুরু। বারবার মনে হচ্ছিল, কাজটা আমি ঠিক করিনি। ওকে ফিরিয়ে দেওয়াটা আমার উচিত হয়নি। ইগোকে জেতাতে গিয়ে আমি ভালোবাসাকে হারিয়েছিলাম। দিন যেতে থাকে। আমি ওর খবর নিতাম লুকিয়ে। ও স্বামী-সংসার নিয়ে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে পারলেও আমি আর স্বাভাবিক হতে পারিনি। অন্য কোনো মেয়ের প্রতি আমার অনুভূতি জন্মায়নি। বহুবার চেষ্টা করেছিলাম, কাউকে নতুন করে ভালোবাসার। জীবনটাকে নতুন করে সাজাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ঐযে পারিনি! হয়তো ওকে এভাবে কষ্ট দেওয়ার জন্যই বিধাতাও আমায় তিলে তিলে কষ্ট দিয়ে এর শোধ নিয়েছে। কিন্তু জানেন, এখন না ও অনেক ভালো আছে। ওর ফুটফুটে একটা মেয়ে হয়েছে। কী দারুণ মিষ্টি দেখতে!’
শোহেব থামে। ভূমি মুগ্ধ হয়ে শুনছিল অনুতাপের আগুনে পুড়তে থাকা শোহেবের কথাগুলো। সে বলে,’বারবার ‘ও’ বলে সম্বোধন করছেন কেন? নাম কী ছিল?’
শোহেব একটুখানি হেসে বলে,’নামটা না হয় না-ই জানলেন।’
‘কেন?’
‘কারণ আমি চাই না, ভবিষ্যতে কখনো আমাদের মাঝে ঝগড়াঝাঁটি হলে ওকে নিয়ে কোনো প্রসঙ্গ আসুক। ওর নামে কোনো তিক্ত কথা শুনতে আমি রাজি না।’
‘স্যরি? আমাদের ভবিষ্যৎ মানে?’
‘আপনার আর আমার কথা বলছি।’
‘আমাদের কীসের ভবিষ্যৎ? আর আমি কেন ওকে নিয়ে তিক্ত কথা বলতে যাব?’
‘মেয়েরা যে হিংসুটে হয় আমি জানি।’
‘আপনি ঘোড়ার ডিম জানেন। আচ্ছা এরপর আর কখনো ওর সাথে কথা হয়নি?’
‘হয়েছিল একবার। ওর মেয়ে হওয়ার পর।’
‘সেদিন ও কী বলেছিল?’
‘আর কী বলবে! সেদিনও ঝগড়া হয়েছে। কী কান্না! কেঁদে কেঁদে বলেছিল, ‘তুমি আমার সাথে এমনটা না করলেও পারতে। অবশ্য যা হয়েছে ভালোই হয়েছে। আমার স্বামীও অনেক ভালো মানুষ। আর যাই হোক, তার তোমার মতো এত ইগো নেই।’ তারপর বলল আমায়ও বিয়ে-শাদী করতে। আরও কিছু কথাবার্তা হয়েছিল।’
‘তো আপনি এখনো বিয়ে করেননি কেন?’
‘আপনাকে আগে পাইনি তাই। এখন পেয়ে গেছি আর আপনি চাইলে যখন-তখন বিয়ে করতে পারি।’
‘কেন এমন পাগলামি করেন বলেন তো?’
‘পাগলামি কোথায় করলাম? আমি সিরিয়াস।’
‘আপনার প্রাক্তনের পর আপনি অন্য কোনো মেয়েকে মনে জায়গা দিতে পারেননি। অথচ এমন একটা মেয়েকে ভালোবেসে বসে আছেন যার জঘন্য একটা অতীত রয়েছে। যে সমাজে ডিভোর্সি নামে পরিচিত।’
‘ভূমি, সমাজে চলতে গেলে সমাজের কিছু নিয়ম-কানুন অবশ্যই আমাদের মেনে চলতে হয়। এছাড়া আদিকাল থেকেই একটা জিনিস প্রমাণিত যে, পৃথিবীতে কোনো মানুষই একা বাঁচতে পারে না। একা চলতে পারে না। এজন্যই সমাজ আমাদের প্রয়োজন। কিন্তু সমাজের প্রতিটা মানুষ আলাদা আলাদা করে কী কী মন্তব্য করল সেগুলো আমাদের আমলে নেওয়া উচিত না। সমাজে শুধু হাতে গোনা মানুষ বাস করে না; অসংখ্য মানুষ বাস করে। এদের প্রত্যেকের মন রেখে আপনি কখনোই পারবেন না আপনার জীবন পরিচালনা করতে। বাকি সবার কথা বাদই দিলাম। আপনি নির্দিষ্ট দশজন মানুষের মনমতো এক সপ্তাহ্ নিজের জীবন পরিচালনা করার চেষ্টা করে দেখেন, আপনি বেঁচে থাকার আগ্রহই হারিয়ে ফেলবেন। আমি বলব না সমাজকে উপেক্ষা করুন। কারণ এটা আমি, আপনি কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। সমাজকে নয় বরং সমাজের ঐ সকল মানুষ এবং তাদের কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যগুলোকে আমাদের উপেক্ষা করতে হবে। কোনো মেয়ে ইচ্ছে করে চাইবে না তার সংসার নষ্ট হোক। সবাই এক সেটাও বলব না। রাসেলের মতো অনেক মেয়েও আছে আমাদের আশেপাশে। এখন সমাজবর্গ যদি সকলকে এক পাল্লায় মাপতে চায় তবে সেটা তাদের জ্ঞানহীন ও মূর্খতার পরিচয়। আমার মাঝে অন্তত এতটুকু জ্ঞান অবশিষ্ট রয়েছে; যে জ্ঞান দ্বারা আমি ডিভোর্সি মেয়েদের আলাদা নজরে দেখতে পারি না। তাই আপনি ডিভোর্সি জানার পরও আপনাকে কেন ভালোবাসি, কেন বিয়ে করতে চাই এই প্রশ্ন করে আমার মনে এবং ব্যক্তিত্বে আঘাত না করার অনুরোধ রইল।’
‘সবই বুঝলাম। সমাজের সেসব মানুষকে না হয় উপেক্ষা করলেন। কিন্তু আপনার পরিবার? আপনার পরিবারকে কী করে উপেক্ষা করবেন? তারা মেনে নেবে আমাকে?’
‘আপনি যদি আমাকে অভয় দেন, সারাজীবন আমার সাথে থাকবেন তাহলে পরিবারকে বোঝানোর দায়িত্ব আমার।’
ভূমি নিশ্চুপ। শোহেব শান্তকণ্ঠে ডাকে,’ভূমি।’
‘হুম?’
‘ভালোবাসেন আমায়?’
‘আমার কিছু সময় লাগবে শোহেব।’
‘সময় নিন। আমি অপেক্ষায় থাকব, আপনি আমায় গ্রহণ করে নেবেন এই আশায়।’
‘বাড়ি ফেরা দরকার এখন। সবাই চিন্তা করছে মনে হয়।’
‘চলুন।’

ভূমিকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে শোহেব নিজের বাড়িতে আসে। সুলতানা বেগম ড্রয়িংরুমে বসে টিভি দেখছিলেন। শোহেবকে দেখে প্রশ্ন করেন,’কিরে হঠাৎ করে কোথায় চলে গেছিলি?’
‘একটু দরকার ছিল।’
‘খাবি আয়।’
‘ভাত বাড়ো। আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।’
সুলতানা বেগম ডাইনিংরুমে খাবার নিয়ে অপেক্ষা করেন। শোহেব ফ্রেশ হয়ে আসার পর দুজনে একসাথে খেতে বসে। শিশির বইমেলা থেকে ফিরে এসেই খেয়ে নিয়েছে। খেতে খেতে শোহেব বলে,’মা, একটা কথা বলি?’
‘বল। জিজ্ঞেস করার কী আছে?’
‘ভূমির ব্যাপারে।’
‘ভূমি যেন কে? ঐযে ঐ মেয়েটা না, যার ছবি দেখিয়েছিলি?’
‘হ্যাঁ।’
‘কী হয়েছে? ঝগড়া করেছিস নাকি?’
‘না। আসলে মা, আমি তো অনেক স্ট্রেইড ফরওয়ার্ড জানোই। তাই সরাসরি বলছি, আমি ওকে বিয়ে করতে চাই।’
সুলতানা বেগম মুচকি হেসে বললেন,’করবি। সমস্যা কী? বিয়ের প্রস্তাব কবে নিয়ে যাব বল।’
‘ওর ব্যাপারে একটা কথা বলার ছিল।’
‘বল।’
‘ওর আগে একটা বিয়ে হয়েছিল। ডিভোর্স হয়ে গেছে।’

সুলতানা বেগমের খাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। তার হাসি হাসি মুখটাও কেমন যেন অন্ধকার হয়ে যায়। শোহেবের কথা ঠিক যেন শোনেননি এমনভাবে বললেন,’কী বললি? মেয়ে ডিভোর্সি?’
শোহেব গোপনে দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে বলল,’হুম।’
‘এত মেয়ে থাকতে তুই ডিভোর্সি মেয়ে কেন বিয়ে করতে চাচ্ছিস?’
‘কারণ আমি ওকে ভালোবাসি।’
‘আমার বড়ো ছেলে তুই। আর তুই কিনা একটা ডিভোর্সি মেয়েকে বিয়ে করবি। মানুষ শুনলে কী বলবে? আত্মীয়-স্বজন সব ছি ছি করবে।’
‘মা, তোমার কাছে তোমার ছেলের চাওয়া বড়ো নাকি মানুষ কে কী বলবে এসব চিন্তা বড়ো?’
সুলতানা বেগম এ কথার কোনো উত্তর না দিয়ে খাওয়া ছেড়ে উঠে গেলেন। যাওয়ার সময় বলে গেলেন,’তোর যা ইচ্ছে তুই কর। আমি কিছুই বলব না।’

শোহেব মায়ের যাওয়ার পথে তাকিয়ে থাকে। এরপর নিজেও খাওয়া ছেড়ে উঠে পড়ে। হাত ধুয়ে মায়ের রুমে যায়। দরজা চাপিয়ে, লাইট নিভিয়ে শুয়ে পড়েছিলেন তিনি। শোহেব লাইট জ্বালানোর পর তিনি অন্যপাশ ফিয়ে শুয়ে বলেন,’চোখে আলো লাগছে। লাইট বন্ধ কর। আমি ঘুমাব।’
‘তোমার সাথে আমার কথা আছে।’
‘কাল সকালে বলিস।’
‘না, এখনই বলব।’
‘আমার ঘুম পাচ্ছে।’
‘তবুও শুনতে হবে। উঠো।’ শোহেব মায়ের হাত টেনে উঠিয়ে বসায়। মা অন্যদিকে তাকিয়ে বলেন,’কী হয়েছে? বল।’
‘তুমি রাগ কেন করছ মা?’
‘রাগ করার কী আছে? তোর লাইফ তুই যা ইচ্ছে করবি। আমার কী?’
‘তোমার অনেক কিছু। কারণ তুমি আমার মা।’
‘এতই যখন আমার কথা ভাবিস তাহলে জেনেশুনে এমন একটা মেয়েকে কেন ভালোবাসলি?’

শোহেব মায়ের একটা হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বলে,’ভালোবাসা কি বলে আসে বলো? আর একটা মেয়ে ডিভোর্সি বলে কি তার নতুন করে সংসার করার স্বপ্ন দেখতে নেই?’
‘থাকবে না কেন? অবশ্যই থাকবে। কিন্তু তারও উচিত অমন দেখে একটা ছেলেকে বিয়ে করা। তুই বিয়ে করিসনি। অবিবাহিত একটা ছেলে। তাও বাড়ির বড়ো ছেলে। অনেক সমস্যা আছে বাবা।’
‘আমার কথা শোনো মা। এখানে কোনো সমস্যাই নেই। সমস্যা আমরা মানুষেরা ইচ্ছে করে তৈরি করি। ভূমি অনেক ভালো একটা মেয়ে। তুমি মেনে না নিলে ও কখনোই বিয়েতে রাজি হবে না। ওর আগের সংসারটা ভাঙত না। ওর স্বামী ওর সাথে চিট করেছে। ও ইচ্ছে করে নিজের গায়ে ডিভোর্সি তকমাটা লাগায়নি।’
‘আমি এতকিছু বুঝি না বাবা। সময় থাকতে তুই ঐ মেয়ের থেকে সরে আয়।’
‘তুমি বুঝতে চাইছ না কেন? আমি ভালোবাসি ভূমিকে। আমি একবার নিজের ভালোবাসাকে হারিয়েছি। দ্বিতীয়বার আর একই ভুল করতে চাই না।’

সুলতানা বেগম নির্বাক ভঙ্গিতে তাকিয়ে রয়েছেন। শোহেব আগের চেয়েও নরম ভঙ্গিতে বলে,’তুমি বলো তো, আজ যদি আমার একটা বোন থাকত। যদি ওর সাথেও এমনকিছু হতো তখন কি তুমি একই কথা বলতে?’
‘অযথা বিষয় টেনে আনার কোনো দরকার আছে কি?’
‘বেশ! তুমি যদি ভূমিকে মেনে না নাও তাহলেও কোনো সমস্যা নেই। শুধু এতটুকু জেনে রাখো, এরপর আর বড়ো ছেলের বউ দেখার কথাও ভেবো না কখনো।’
শোহেব চলে যায় নিজের রুমে। যাওয়ার আগে রুমের লাইট নিভিয়ে, দরজা চাপিয়ে দিয়ে যায়। দ্বিধান্বিত মন নিয়ে অন্ধকার রুমে বসে থাকেন সুলতানা বেগম। একদিকে ছেলের ভবিষ্যৎ আর অন্যদিকে লোকে কী বলবে এসব চিন্তা। সে কোনটাকে প্রায়োরিটি দেবে? এ সময়ে তিনি তার স্বামীকে অনেক বেশি মিস করছেন। আজ যদি তিনি বেঁচে থাকতেন তাহলে নিশ্চয়ই এভাবে সিদ্ধান্তহীনতায় তাকে ভুগতে হতো না। অতিরিক্ত টেনশনে তার মাথা ব্যথা শুরু হয়ে যায়। আপাতত তিনি একটা ঘুমের ওষুধ খেয়ে শুয়ে পড়েন।
_______
১১৮.
ভূমিকা আর ফাতেমা সকালে রেডি হয়ে বের হয় অফিসে যাওয়ার জন্য। বাড়ির বাইরে এসে রাসেলকে দেখতে পেয়ে ভূমি থমকে যায়। এগিয়ে আসে রাসেল। পথ আটকে অনুনয়বিনয় করে বলে,’আমার সাথে কথা কেন বলো না ভূমি? আমাকে কি মাফ করা যায় না?’
ভূমি কঠোরস্বরে বলে,’আমার যা বলার গতকাল রাতেই বলে দিয়েছি। এরপরও কেন আমায় বিরক্ত করছ?’
‘আমি জানি, ঐগুলো তোমার মনের কথা নয়।’
‘তুমি ভুল জানো। এখনো তুমি বোকার স্বর্গে বসবাস করছ। তোমায় আমি কী বলেছিলাম মনে নেই? অতীতের সবকিছু ভুলে গেছ?’
‘আমি তো অনুতপ্ত। কেন আমায় তুমি ক্ষমা করতে পারছ না?’
‘কারণ তুমি ক্ষমার অযোগ্য।’
‘আচ্ছা আমি মানছি আমি অযোগ্য। কিন্তু তুমি চাইলেই তো পারো একটা সুযোগ দিতে।’
‘না, পারি না। চাইও না তোমায় কোনো সুযোগ দিতে। কারণ আমি অন্য একজনকে ভালোবাসি। এখন আমার পথ ছাড়ো। দেরি হয়ে যাচ্ছে।’

রাসেল এ কথার পর আর কিছু বলতে পারে না। ভূমি ফাতেমাকে নিয়ে একটা রিকশায় উঠে বসে। রাগে, কষ্টে তার দম বন্ধ হয়ে আসছে। ফাতেমা ওর এক শক্ত করে ধরে বলে,’এসব নিয়ে ভাবিস না।’
অফিসে গিয়েও শান্তিমতো কাজ করতে পারছিল না ভূমি। বারবার এসব কথা মনে পড়ছিল। মনের মাঝে আরও একটি প্রশ্ন বারবার উঁকি দিচ্ছিল। সে তো রাসেলকে বলল সে অন্য একজনকে ভালোবাসে। আর নিঃসন্দেহে এ কথাটা সে শোহেবের কথা ভেবেই বলেছে। তাহলে কি সত্যিই সেও শোহেবকে ভালোবাসতে শুরু করেছে? তার বিবেক তাকে সতর্ক করে বলে,’এত তাড়াতাড়ি মানুষকে বিশ্বাস কোরো না। সময় নাও আরও। মানুষটাকে জানো, চেনো।’

লাঞ্চ টাইমে ফাতেমাকে নিয়ে সে বাইরের ঐ রেস্টুরেন্ট যাওয়ার জন্য বের হয়। তখন আবারও সে শোহেবকে গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। তার অবচেতন মন কেন জানি আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠে। শোহেব ভূমিকে দেখে এক হাত উঠিয়ে হাই দেয়। ভূমি হাসিমুখে এগিয়ে এসে প্রশ্ন করে,’কী ব্যাপার? হঠাৎ এখানে?’
‘শিশিরের আপু বমিকে খুব মিস করছিলাম তো তাই।’
‘আবার!’
শোহেব কিছুটা শব্দ করে হেসে বলে,’সারপ্রাইজ আছে।’
‘কী সারপ্রাইজ?’
শোহেব এবার গাড়ির দরজা খুলে দেয়। ভেতর থেকে সুলতানা বেগম বেরিয়ে আসেন। শোহেব পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলে,’আমার মা।
আর মা, এই হচ্ছে ভূমিকা। আর উনি হচ্ছে ফাতেমা খালামনি।’
ভূমি অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। সালাম দিয়ে বলে,’ভালো আছেন আন্টি?’
‘আলহামদুলিল্লাহ্‌ ভালো। কেমন আছো?’
‘আলহামদুলিল্লাহ্‌, আমিও ভালো আছি।’
‘চলো বাকি কথা রেস্টুরেন্টে বসে বলি।’ বলল শোহেব।

চারজন মুখোমুখি বসে আছে রেস্টুরেন্টে। ফাতেমার এক হাত শক্ত করে ধরে রেখেছে ভূমি। এত অপ্রস্তুত সে ইতিপূর্বে হয়তো কখনোই হয়নি। শোহেব খাবার অর্ডার দিয়ে বলে,’তারপর? কী খবর?’
ভূমি ছোটো করে বলল,’ভালো।’
সুলতানা বেগম এতক্ষণ ভূমিকেই দেখছিলেন। ছবির চেয়ে বাস্তবে দেখে আরও বেশি ভালো লাগছে। অনেক ভেবে-চিন্তে তিনি ছেলের ইচ্ছেকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। তাই তো সকাল হতেই ছেলেকে বলে দিয়েছেন, আজই সে ভূমির সাথে দেখা করবে। এমন প্রস্তাবে শোহেবের একটা লাইনই মাথায় এসেছিল,’মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি।’

সুলতানা বেগম ভূমিকে বললেন,’এত আনইজি ফিল করছ কেন? স্বাভাবিক হও।’
‘আমি ঠিক আছি আন্টি।’
‘তোমার বাসায় কবে যাব বলো?’
‘জি আন্টি? মানে বুঝলাম না।’
‘বললাম তোমার বাসায় কবে যাব? নাকি যেতে বারণ?’
‘না, না। তা কেন হবে? আপনার যখন ইচ্ছা তখনই আসবেন। কোনো সমস্যা নেই।’
‘সমস্যা আছে। শুধু আমি চাইলেই তো হবে না। এখানে তোমার চাওয়াটা সবচেয়ে বেশি জরুরী। আমি তো আর এমনি এমনি যাব না। যাব বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে।’
ভূমি এখনই চাচ্ছিল না কোনো সিদ্ধান্তে যেতে। আবার সুলতানা বেগমের মুখের ওপর না করাটাও সম্ভব না। সে তো আর তাকে অপমান করতে পারবে না। তাই অনিচ্ছাতেই বলল,’যেদিন সময় হবে আসবেন। আমার কোনো সমস্যা নেই।’

কথার মাঝে ওয়েটার খাবার নিয়ে আসে। খেতে কথা বলছেন সুলতানা বেগম এবং ফাতেমা। ভূমি এবং শোহেব চুপচাপ খেয়ে যাচ্ছে। কিন্তু শোহেব কি আর চুপচাপ থাকার মানুষ? সে সিনিয়র দুজনের দৃষ্টির আড়ালে ভূমিকে ঠোঁট চোখা করে ফ্লাই কিস করে, চোখ টিপ দেয়। ভূমি কিছু বলতে গিয়েও দমে যায়। রাগী দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তাকিয়ে থাকে; যার অর্থ,’শুধু সুযোগ পাই একবার। খুন করে ফেলব।’
শোহেব বাঁকা হেসে চোখ দিয়েই যেন প্রতিউত্তর দিলো,’সুযোগ পেলে আমি বসে থাকব নাকি?’
_________
১১৯.
সূচনা এখন আগের চেয়ে ভালোই হাঁটাচলা করতে পারে। সে বাড়িতে এভাবে শুয়ে-বসে থাকতে থাকতে বিরক্ত হয়ে যাচ্ছে। তাই সে ঠিক করেছে এখন থেকে আবার কলেজে যাওয়া শুরু করবে। একটু কষ্ট আর অসুবিধা হয়তো হবে। তবে ঘরবন্দি হয়ে থাকার চেয়ে বাইরে প্রকৃতির মাঝে কষ্ট হলেও শ্বাস নিতে পারা অনেক বেশি শান্তির, আনন্দের।

বারান্দায় একটা চেয়ার নিয়ে বসে আছে সে। বাড়িতে এখন সে আর বাবা-মা। বাকিরা সবাই যে যার কাজে। সে ফোন নিয়ে বসে আছে। আদিলকে টেক্সট করতে গিয়েও করতে পারছে না। কেমন যেন অস্বস্তি লাগছে। কখনো সে নিজ থেকে আদিলকে নক করেনি। আজ ম্যাসেজ করলে আদিল কী ভাববে?

দোনোমনা করতে করতেই সূচনা আদিলকে ম্যাসেজ করে,’কী করছেন?’
এরপর অপেক্ষা করতে থাকে রিপ্লাইয়ের। একটু পরপর চেক করে। কিন্তু না, কোনো রিপ্লাই আসছে না। এভাবে এক মিনিট, দুই মিনিট, তিন মিনিট এভাবে নয় মিনিট পার হয়ে যায়। এই প্রথম সে নিজ থেকে একটা ম্যাসেজ করল। অথচ ঐপাশ থেকে কোনো রেসপন্সই নেই! সূচনার একটু যেন কেমন খারাপ লাগল। বোধ করি একটু কষ্টও হলো তার। এভাবে অনেকক্ষণ কেটে যায়। সূচনা মনমরা হয়ে বসে থাকে।

‘তুমি আমায় মিস করেছ। এই দেখো আমি এসে পড়েছি।’

কণ্ঠস্বরটা খুব কাছ থেকে শুনতে পাচ্ছে সূচনা। সে চকিতে ঘাড় বাঁকিয়ে তাকায়। বারান্দার দরজায় হেলান দিয়ে দু’হাত বগলদাবা করে দাঁড়িয়ে আছে আদিল। মুখে তার মুচকি হাসি। সে এগিয়ে এসে নিচে বসে। তার দু’হাত সূচনার কোলের ওপর রেখে বলে,’খুশি হওনি?’
সূচনা উত্তর দেওয়ার জন্য ফোনের নোটপ্যাডে লিখল,’আপনাকে কে বলেছে, আমি আপনাকে মিস করেছি?’
লেখা পড়ে আদিল উত্তর দিলো,’তোমার ম্যাসেজ বলেছে। মিস না করলে তুমি আমায় নিজে থেকে ম্যাসেজ করতে না। তুমি মিস করেছ এই খুশিতে আমি শরীর খারাপের অজুহাত দেখিয়ে অফিস থেকে ছুটি নিয়ে চলে এসেছি।’
‘আপনি কি পাগল? এজন্য এভাবে চলে আসতে হবে? আমার আরও মন খারাপ হচ্ছিল, আপনি কেন রিপ্লাই করছিলেন না।’
‘পাগল তোর জন্য রে, পাগল এ মন পাগল!’
সূচনা হাসে। আদিল বলে,’ঘুরতে যাবে? চলো ঘুরে আসি।’
সূচনা রাজি হয়। মায়ের থেকে অনুমতি নিয়ে তৈরি হয়ে আদিলের সঙ্গে বেরিয়ে পড়ে। নীল রঙের থ্রি-পিসের সাথে সে নীল হিজাব পরেছে। মনে মনে সে শুধু আফসোস করে। কবে যে তার চুলগুলো আবার বড়ো হবে!

সারা বিকেল সূচনাকে নিয়ে রিকশায় ঘোরে আদিল। যেহেতু এখনো হাঁটতে সূচনার কিছুটা কষ্ট হয় তাই সে রিকশায় করে ঘোরাটাই বেটার মনে করেছে। দুজনে চা খেয়েছে রিকশায় বসে। ফুসকা খেয়েছে রিকশায় বসে। হাওয়াই মিঠাই, আচার সব সূচনাকে নিয়ে সে রিকশায় বসেই খেয়েছে। সারা শহর ঘুরেছে রিকশায় করে। বিকেল গড়িয়ে যখন সন্ধ্যা হয় তখন সময়টা আরও বেশি সুন্দর হয়ে ওঠে। এখন সূচনার আরও বেশি ভালো লাগছে। সে একটু শক্ত করে আদিলের হাত পেঁচিয়ে ধরে কাঁধে মাথা রাখে। অতীতকে এক সাইডে রেখে সে আদিলকে নিয়ে ভাবতে চাচ্ছে। সে দেখতে পায় অপরদিক থেকে আসা একটা রিকশায় কাপল বসে আছে। চোখের পলকেই তারা চুমু খেয়ে বসে। সূচনার কী হলো কে জানে! সেও ঘোরের বশে নিস্তব্ধ রাতকে সাক্ষী রেখে আদিলের ঠোঁটে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়ায়।

চলবে…
[কার্টেসী ছাড়া কপি করা নিষেধ।]

#বিরহের_নাম_তুমি
#পর্ব_৪৩
#মুন্নি_আক্তার_প্রিয়া
__________________
১২০.
ছাদের মৃদুমন্দ বাতাসে ভূমির কপালের ওপর পড়ে থাকা চুলগুলো ঈষৎ নড়ছে। গায়ের ওড়নাটিও একটু উড়ো উড়ো ভাব। পাশে নির্বাক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে শোহেব। সে আজ এ বাড়িতে একা আসেনি। সুলতানা বেগমকে নিয়ে এসেছে বিয়ের প্রপোজাল দিতে। নিচে দুজনের বিয়ে নিয়েই কথাবার্তা চলছে। ভূমি নিজেই শোহেবকে ছাদে ডেকেছে কিছু বলার জন্য। প্রায় দশ মিনিট হবে দুজনে ছাদে। কিন্তু তাদের মাঝে বাক্য বিনিময় হয়নি একটিও।

প্রলম্বিত শ্বাস ত্যাগ করে ভূমি বলে,’সবকিছু খুব দ্রুত হয়ে যাচ্ছে না?’
শোহেব না তাকিয়েই উত্তর দিলো,’বোধ হয় না।’
‘আমার কাছে কিন্তু তা-ই মনে হচ্ছে। আরেকটু সময় নেওয়ার প্রয়োজন ছিল আপনার।’
‘কীজন্য?’
‘এই সম্পর্কটার জন্য।’
‘এত ভেবে-চিন্তে বিজনেস হয়। ভালোবাসা না।’
‘বিষয়টা শুধু ভালোবাসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সারাজীবনের কথা।’
‘ভালোবাসি বলেই সারাজীবনের জন্য চাই। এখানে তো এত ভাবার কিছু নেই।’
‘যদি পরে আফসোস হয়?’

শোহেব এবার ভূমির দিকে তাকায়। ভ্রুঁ কিঞ্চিৎ বাঁকা করে বলে,’আফসোস? কোন কারণে?’
‘এভাবে আপনার হুট করে ডিসিশন নেওয়ায়। পরে তো মনে হতেই পারে আমায় বিয়ে করে আপনি ভুল করেছেন।’
‘আমার এ দিন কখনো আসবে না। আচ্ছা একটা কথা পরিষ্কারভাবে বলুন তো। আপনার নিজের কি আরও সময় চাই?’
কোনোরকম ভনিতা করা ছাড়াই ভূমি বলল,’হ্যাঁ। আসলে আমি এত বড়ো একটা ট্রাজেডি থেকে বের হয়েছি যে বিশ্বাস জিনিসটা এত সহজে আমার মাঝে কাজ করে না। আমি ভয় পাই বিশ্বাস করতে, ভালোবাসতে। শুধু তাই নয়, বারবার এটাও মনে হয় যে রাসেলের মতো যদি আপনারও এই ভালোবাসার নাম মোহ হয়ে থাকে?’
‘দয়া করে রাসেলের সাথে আমায় গুলিয়ে ফেলবেন না। আপনি সময় চান, আমি দেবো। এক বছর হোক, দু’বছর হোক কিংবা হাজার বছর! তখনো আমি একই কথা বলব; আপনাকে আমি ভালোবাসি।’
ভূমি ঈষৎ হাসে। হাসিমুখে বলে,’এত সময় লাগবে না। আগে সূচনার বিয়েটা হয়ে যাক। তারপর না হয় আমরা বিয়ে করব?’
‘কোনো আপত্তি নেই বমিরানী।’
ভূমি শব্দ করে একটা কিল বসায় শোহেবের পিঠে। তারপর বলে,’নাম ভেঙালে বিয়ে ক্যান্সেল করে দেবো।’
‘মাফ চাই বইন।’
‘মাফ নাই ভাই।’
‘ছি, অসভ্য।’
‘অসভ্যের কী হলো?’
‘হবু বরকে কেউ ভাই বলে?’
‘আমাকে বইন ডাকার আগে মনে ছিল না?’
‘বুঝেছি।’
‘কী?’
‘আমাদের ঝগড়া আমরণ চলবে।’
‘এতে সমস্যা বুঝি?’
‘উঁহু! আমি অনেক খুশি।’

কথায় আছে অতিরিক্ত অবহেলা আর অতিরিক্ত ভালোবাসা কোনোটাই মানুষ উপেক্ষা করতে পারে না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভূমিরও হয়েছে একই দশা। সে শোহেবের অতিরিক্ত ভালোবাসা উপেক্ষা করতে পারেনি। মন কেন এই মানুষটাকে একটা সুযোগ দিতে বারবার অনুরোধ করেছে, তার জানা নেই। তবে আল্লাহর ওপর তার পরিপূর্ণ বিশ্বাস রয়েছে। সে বিশ্বাস করে, যা হবে ভালো হবে, ইন-শা-আল্লাহ্। আর এ ভরসা নিয়েই সে শোহেবের সঙ্গে একসাথে সারাজীবন পথ চলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
______
১২১.
রেশমা বেগম রাসেলের ওপর ভীষণ রেগে আছে। এলাকার মানুষজন ছি ছি করছে। একেকজন এসে একেক কথা বলে যাচ্ছেন। লজ্জায় তিনি মুখ দেখাতে পারছেন না কোথাও। ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি রাসেলের রুমে এসে দেখেন রুমের যা তা অবস্থা। সিগারেটের অবশিষ্ট অংশ এদিক-ওদিক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। এমনকি বিছানারও শেষ রক্ষা হয়নি। বিয়ারের খালি বোতলও জমা হয়েছে বেশ কয়েকটা।

তিনি চেঁচিয়ে বলেন,’তোর সমস্যা কী রাসেল? তুই এসব কী শুরু করছিস? জানিস সবাই আমায় কত কথা শোনায়?’
রাসেল কিছু বলে না। উন্মাদের মতো সিগারেটে টান দেয়। রেশমা বেগমের রাগ ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। তিনি ফের বলেন,’নেশাখোরের খাতায় নাম লেখাবি তুই? নেশাখোর হইতেছিস? তোর সমস্যা কী আমারে বল। তুই এমন করতাছোস ক্যান?’

রাসেল বিরক্ত হয়ে বলে,’মা ঘর থেকে যাও তো। ভাল্লাগে না আমার।’
‘তোর কী হইছে আমায় বল।’
‘কিছু হয় নাই। তুমি যাও।’ রাসেলের কণ্ঠ জড়িয়ে আসে। বোঝা যায়, ধীরে ধীরে সে নেশায় বুদ হয়ে যাচ্ছে।

প্রতিনিয়ত এলাকার মানুষ এসে রাসেলের নামে বিচার দিয়ে যায়। ক্লাবে গিয়ে খারাপ ছেলেদের সঙ্গে মিশে মিশে বিয়ার, মদ খেয়ে মাতলামি করে। টাল হয়ে এখানে,ওখানে পড়ে থাকে। দিনে কয় প্যাকেট করে সিগারেট খায় তার কোনো হিসাব নেই। এভাবে একাউন্টে যতগুলো টাকা ছিল শেষ করেছে। এবার অত্যাচার শুরু হয়েছে বাড়িতে। প্রতিদিন নেশার জন্য রেশমা বেগমের কাছে টাকা চায়। টাকা না দিলেই বাড়িতে ভাঙচুর করে। অকথ্য ভাষায় গালি-গালাজও করে। রেশমা বেগমের এখন আর রাগ হয় না বরং কষ্ট লাগে। একমাত্র ছেলের এমন করুণ পরিণতি তিনি মা হয়ে কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না। আল্লাহ্ যে তাকে কোন পাপের শাস্তি দিচ্ছেন তিনি ভেবে পান না।
_______
১২২.
সূচনা নিয়মিত কলেজে যাওয়া শুরু করেছে এক মাস হবে। সে এখন পুরো দমে পড়াশোনা শুরু করেছে। কিছুদিন বাদেই তার ফাইনাল পরীক্ষা। তাই হেলাফেলায় সময় কাটানো যাবে না। তবে এত পড়াশোনার মাঝেও তার কিছু সময় নির্ধারণ করা থাকে আদিলের জন্য। সে এখন আগের তুলনায় আদিলের সাথে অনেক বেশি স্বাভাবিক। তার এই পরিবর্তনে আদিলের সাথে সাথে প্রত্যেকে অনেক বেশি খুশি। খারাপ সময়ের পরে যে একটা সময়ে ভালো দিনও আসে তা এখন ভূমিকা এবং সূচনার বর্তমান পরিস্থিতি দেখলেই আন্দাজ করা যায়।

প্রতি সপ্তাহে সূচনা,আদিল এবং ভূমিকা, শোহেব সময় করে ঘুরতে বের হয়। কখনো কখনো আবার পুরো গ্যাং একসাথে ঘুরতে যায়। সময়গুলো তাদের প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশি ভালো কাটছিল। এর মাঝে নুসরাতের সাথে আসলামের এবং শিশিরের সাথে সুখীরও প্রণয়ের সম্পর্ক হয়ে গেছে। যদিও বিষয়টা গুটি কয়েক মানুষজন ছাড়া অন্য কেউ আর জানে না।

কোচিং থেকে ফেরার পথে নুসরাত মনমরা হয়ে বলে,’সূচনা ভাইয়ার সাথে কি তোমার ঝগড়া হয় না?’
সূচনা মুচকি হেসে দু’দিকে মাথা নাড়ায়। এতে আরও বেশি মনমরা দেখায় নুসরাতকে। সে বলে,’তাহলে আমার সাথে আসলামের এত ঝগড়া লাগে কেন বলো তো? সপ্তাহে দুইটা দিনও মনে হয় ভালোমতো কথা হয় না জানো? আমার আর ভালো লাগে না। তবে আমি জানি,আসলাম আমাকে অনেক ভালোবাসে।’
সূচনা ইশারায় প্রশ্ন করে,’আর তুমি?’

নুসরাত লজ্জা পেয়ে বলে,’আমিও! আচ্ছা একটা কথাই তো তোমায় বলা হয়নি।’
সূচনা সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকায়। নুসরাত বলে,’পরীক্ষার তো আর মাত্র পাঁচদিন বাকি। তো আব্বু আর আম্মু জানতে চেয়েছিল বিয়ের শপিং কি পরীক্ষার আগেই করবে নাকি পরে?’
সূচনা ইশারায় জানালো বিয়ের শপিং পরীক্ষার পর করবে। আপাতত সে পরীক্ষার আগে কোনো চাপ নিতে চাচ্ছে না।
.
সূচনার প্রথম পরীক্ষার পর দু’দিন গ্যাপ ছিল। কাল জারিফ বিদেশে যাবে পায়ের চিকিৎসার জন্য। সে একা নয়। চাচা-চাচি আর প্রীতিও সাথে যাবে। চাচির আত্মীয় লন্ডনে থাকায় কোনো সমস্যা হবে না তাদের। তাই বাসায় ছোটোখাটো একটা আয়োজন করা হয়েছে আজ রাতে। এখানে আদিল এবং শোহেবও আমন্ত্রিত ছিল। সন্ধ্যায় সকলে মিলে তৈরি হয়ে চাচার বাসার দিকে রওনা হয়। সূচনা আদিলের কাঁধে মাথা রেখে পাশে বসে রয়েছে। রিকশা চলছে আপন গতিতে। অন্য রিকশায় শোহেব এবং ভূমিকা। শোহেব ভূমির হাত ধরতে গিয়ে অজানা আশঙ্কায় ধরতে পারছে না। বিষয়টা ভূমি বুঝতে পেরে সে নিজেই শোহেবের হাতটি নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নেয়। শোহেব তাকিয়ে দেখে ভূমিকা মুচকি মুচকি হাসছে।

চাচার বাসায় রাতটা বেশ ভালোই কাটে। সকলে মিলে একত্রে গল্পগুজব করে। ব্যাগপত্র চাচি গতকালই গুছিয়ে রেখেছিল। তাই আজ আড্ডা ব্যতীত অন্য কোনো তাড়া নেই। সকালে এয়ারপোর্ট অব্দি ওদেরকে পৌঁছে দিয়ে আদিল,সূচনা, ভূমিকা আর শোহেব বাড়ি ফিরবে। মাঝরাতে সবাই একটুখানি ঘুমিয়ে নেয়। চাইলে রাত জাগতে পারত; কিন্তু এতটা পথ জার্নি করে যাবে তাই জারিফদের একটু ঘুমানো অবশ্যই জরুরী। সকাল সাতটার দিকে সূচনা আর ভূমিকা উঠে পড়েছে। দু’বোন মিলে সকালের জন্য হালকা-পাতলা নাস্তা বানাচ্ছে। চাচি আর প্রীতি যদিও ওদের কাজ করতে দিতে চাচ্ছিল না; তবে দু’বোন ওদের বারণ শোনোনি। উলটো ওদেরকে ঘুমাতে পাঠিয়ে দিয়েছে। চাচা অবশ্য রোজকার নিয়মানুযায়ী আগেই উঠে পড়েছেন। ভূমিকা চায়ের কাপটা সূচনাকে দিয়ে বলল,’চাচাকে চা’টা দিয়ে আয়।’

সূচনা চায়ের কাপ নিয়ে চাচার ঘরে যায়। চাচি ঘুমায়নি। বসে রয়েছেন। চাচা পাশে বসে ফোনে নিউজ দেখছিলেন। চায়ের কাপটা চাচাকে দিয়ে চাচির উদ্দশ্যে ইশারায় জানতে চাইল,’চা খাবেন?’
চাচি স্মিত হেসে ‘না’ বলে সূচনাকে টেনে পাশে বসালেন। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,’তোর সাথে চাচি অনেক খারাপ ব্যবহার করেছি তাই না রে? চাচি খুব খারাপ, বাজে। চাচিকে মাফ করে দিস কেমন?’
সূচনা আহত দৃষ্টিতে তাকায়। এত ভালো ব্যবহার, আদরমাখা কথা সে ইতিপূর্বে কখনো চাচির কাছে পায়নি। আবেগে, আনন্দে তার চক্ষুদ্বয়ে অশ্রু এসে জমা হয়। সে নিজেকে সংবরণ করে রাখতে পারে না। চোখের কোটর থেকে টপটপ করে পানি পড়তে শুরু করে। চাচি এবার আরও একটি অবাককর কাজ করে বসেন। সূচনাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেন,’পাগলি মেয়ে! কাঁদছিস কেন? চাচির ওপর তোর অনেক ক্ষোভ, অভিমান আমি জানি। কত অত্যাচার করেছি, মেরেছি, অপমান করেছি। এসব ভাবলে এখন নিজেরই ঘেন্না লাগে। তবুও বলব চাচিকে ক্ষমা করে দিস কেমন?’

সূচনা নিশ্চুপে ফুঁপিয়ে কাঁদে। চাচাও বিস্ময় নিয়ে কিন্তু মন ভরে দৃশ্যটি দেখে। এমন মনোরম দৃশ্য দেখে তার সকালটা আরও বেশি যেন সুন্দর হয়ে উঠল। অবশেষে যে স্ত্রীর মাঝে মনুষ্যত্ব, সহানুভূতি, ভালোবাসা এসেছে তিনি এতেই খুশি। চাচি নিজের গলার চেইনটা খুলে সূচনার গলায় পরিয়ে দিয়ে বলেন,’সারাজীবন কটাক্ষ ছাড়া আর তো কিছু দিতে পারিনি। তাই এখন আমার সবচেয়ে প্রিয় চেইনটি তোকে দিলাম। তোর বিয়ের সময় আমরা লন্ডনে থাকব। তবে মন খারাপ করিস না, উপহার পাঠিয়ে দেবো।’

বিয়ের সময় চাচা-চাচি কেউ থাকতে পারবে না ভেবে আসলেই এবার সূচনার মন খারাপ হয়ে গেল। ভূমিকার ডাকে সে চোখ মুছে চাচার ঘর থেকে বের হয়। ড্রয়িংরুম থেকে তখন জারিফ ডেকে বলে,’সূচনা শুনে যা তো।’
সূচনা রান্নাঘরে না গিয়ে আগে জারিফের কাছে যায়। গালে চোখের পানির চিটচিটে একটা ভাব ছিল।
‘তুই কাঁদছিস কেন? মা কি তোকে কিছু বলেছে?’ জিজ্ঞেস করে জারিফ।
সূচনা দু’দিকে মাথা নাড়িয়ে গলার চেইনটা দেখায়। জারিফও বুঝে নেয়, এই কান্না কষ্টের নয়; বরং আনন্দের। তার ঠোঁটের কোণেও এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে তখন। সে সূচনার মাথায় হাত রেখে বলে,’তোর বিয়েতে থাকতে পারব না বলে মন খারাপ করিস না। তোর জন্য আমার দোয়া আর ভালোবাসা দুটোই থাকবে। আমি তো ভূমি আপুকে বলে রেখেছি, যতখুশি ব্যস্ত থাকো আর যাই করো না কেন গায়ে হলুদের দিন,বিয়ের দিন সারাক্ষণ আমার সাথে ভিডিয়ো কলে থাকতে হবে। আমি দূর থেকেই আমার সূচনার বিয়েতে এটেন্ট করব। তোর ভাবিও কিন্তু আমার সাথে একমত। বল আইডিয়াটা কেমন?’

সূচনা হাসতে হাসতে কেঁদে ফেলে। জড়িয়ে ধরে জারিফকে। একইসাথে হাসি এবং কান্না এই অনুভূতিটা আসলে কেমন? সবকিছু আজ এত ভালো হচ্ছে কেন?

চলবে…