#বড় গল্প
#বিষন্ন বিকেল
পর্ব-তিন
মাহবুবা বিথী
রায়হান তখন সাবেরার পড়াশোনার দিকে স্পেশাল কেয়ার নিলো। যার ফলে সাবেরার রেজাল্ট দিনদিন খুব ভালো হতে লাগলো। রায়হানের এতো যত্ন দেখে বয়সন্ধিকালের সাবেরা ওর উপর ক্রমে দুর্বল হতে থাকে। চতুর রায়হান এটা বুঝতে পেরে সাবেরাকে স্বপ্ন দেখাতে শুরু করে। সাবেরাকে সে অনেকদূর লেখাপড়া করাবে। এরপর ওকে বিসিএস দেওয়াবে। সাবেরা তখন অনেক বড় অফিসার হবে। সাবেরাও তখন রায়হানকে নিয়ে স্বপ্নের জাল বুনতে থাকে। ক্লাস টেন এ ও সাবেরা প্রথম হলো। সাবেরার বাবা ভীষণ খুশী। ভাগনার কাছে তার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। রায়হানের মা এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিলো। ভাইয়ের সংসারে নিজের কতৃত্ব পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত করতে নিজের ছেলের সাথে সাবেরার বিয়ের প্রস্তাব দেয়। এতে সাবেরার বাবা যারপরনাই আহ্লাদে আটখানা হয়ে যায়। তার কালোমেয়েকে উনার বোন ছেলের বউ করে নিতে রাজি হয়েছে। এটা বোনের বিরাট উদারতা। সাবেরাও মনে মনে স্বপ্ন বুনতে শুরু করে। এখনি রায়হান যেভাবে ওকে চোখে হারায় বিয়ের পর হয়তো এই ভালোবাসা দ্বিগুন হয়ে যাবে। ওদিকে রায়হান আর রায়হানের মায়ের একটা শক্ত আশ্রয়ের দরকার ছিলো। কেননা রায়হানের বাবা বেঁচে থাকাতে সম্পত্তি তখনও ভাগবাটোয়ারা হয়নি। রায়হানের পড়ালেখার খরচের টাকাও উনি তখন বন্ধ করে দিয়েছিলেন। কেননা উনার শর্ত ছিলো রায়হানকে উনার কাছে গিয়ে থাকতে হবে। এতে রায়হানের মত ছিলো না। সে কারনে উনি টাকা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন। এসব নানাবিধ কারনে রায়হান আর ওর মায়ের একটা আশ্রয়ের খুব প্রয়োজন হয়। সাবেরার এক চাচা গ্রামে থাকেন। উনি প্রাইমারী স্কুলের মাস্টার। স্ত্রী দুই ছেলে এক মেয়ে নিয়ে উনার সংসার। যৎ সামান্য যেটুকু বেতন পান সেটা দিয়ে সংসার চালাতে উনাকে হিমসিম খেতে হয়। তার উপর বোনের সংসারের দায়িত্ব নিতে উনি অপারগতা প্রকাশ করেন। অবশেষে সাবেরার বাবাই তখন রায়হানের মায়ের একমাত্র আস্থার জায়গা। রায়হানের মায়ের নাম সালেহা। সালেহা বাবার বাড়ির সম্পদ যেটুকু পেয়েছেন সেখানে একটা টিনের ঘর তুলে থাকেন। আর ছেলেকে ঢাকায় ভাইয়ের কাছে পাঠিয়ে দেন। ভাইবোনদের মধ্যে সালেহা বেগম মেজ। সাবেরার বাবাই সবার বড়। যদিও সাবেরার মা রায়হানের থাকার ব্যাপারে আপত্তি করেছিলেন। কেননা তখন সাবেরা বড় হতে শুরু করেছে। কিন্তু সাবেরার বাবা ওর মায়ের কথায় গুরুত্ব না দিয়ে উল্টা চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন,
—-তোমার কালোমেয়েকে যদি রায়হান বিয়ে করতে রাজি হয় তাহলে তোমার কাল বর্তে যাবে। কথাটা মনে রেখো।
সাবেরার বাবার এমন কথায় ওর মা খুব আহত হলেন। কেউ নিজের মেয়েকে নিয়ে এমন কথা বলতে পারে তা উনার ধারনার বাইরে। সাবেরার মায়ের এই আপত্তি রায়হান আর ওর মা স্বাভাবিকভাবে নেয়নি। এর শোধ সালেহাবেগম ঢাকায় আসলে তুলে নেন।
সালেহা বেগম ঢাকায় যখন সাবেরাদের বাড়িতে বেড়াতে আসেন তখন একটানা তিন চারমাস থেকে যান। আর সাবেরার মায়ের জীবনটাকে তেজপাতা বানিয়ে ছাড়তেন। সাবেরা তখন ছোটো ছিলো বলে ফুফুর এসব কুটবুদ্ধি বুঝতো না। তবে এখন ভালোই বুঝতে পারে। উনি যতদিন থাকতেন সাবেরার বাবাকে বগলদাবা করে রাখতেন। আর সাবেরার মায়ের পিছনে লেগে থাকতেন। তরকারীতে ঝাল নুন কেন কম হলো,সাবেরার বাবার শার্ট প্যান্টগুলো ভালোমতো পরিস্কার হয়নি কেন, পটলটা এভাবে কেন কাটলে,মাছ কেন এভাবে কাটলে,রুটি কেন মোটা হলো এসব নানাবিধ বিষয় নিয়ে সাবেরার মাকে উত্যাক্ত করতেন। এদিকে সাবেরাকে প্রচন্ড আদর করতেন। মাথায় তেল দিয়ে দুবেনী করে দিতেন কখনও পরীক্ষার সময় চা বানিয়ে দিতেন, কখনও না গ্রাম থেকে আসার সময় আচার, আমসত্ত বানিয়ে আনতেন। সাবেরা এতেই মোমের মতো গলে যেত। তখন তো সাবেরা বুঝেনি ওকে নিয়ে উনি কি দূরভিসন্ধি এঁটেছেন?
এদিকে সাবেরার এসএসসি পরীক্ষা শেষ হলো। পরীক্ষা বেশ ভালোই হলো। ও আশা করে গোল্ডেন এপ্লাস তো অবশ্যই পাবে। সাবেরাদের বাসা ছিলো কল্যানপুরের নতুন বাজারের কাছে। ও কল্যানপুর গালস হাইস্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। ওর খুব ইচ্ছা হলিক্রস কিংবা ভিকারুন্নেছা কলেজে ভর্তি হবে। পরীক্ষার পর সাবেরার হাতে অফুরন্ত সময়। সাবেরা তখন কৈশর পেরিয়ে যৌবনের দরজায় কড়া নাড়ছে। সদ্য যৌবনা সাবেরা মনে মনে রায়হানের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে। রায়হানকে নিয়ে ওর দুচোখ নতুন স্বপ্নে বিভোর। এটা রায়হানও বুঝতে পারে। সেটাকে আরোও জাগিয়ে তুলতে রায়হান প্রেমের মধুর বচনে চিঠি লিখে সাবেরাকে দেয়। সাবেরা একবার দুবার বহুবার সেই চিঠিগুলো পড়তে থাকে। আর রায়হানকে ওর স্বপ্নের পুরুষ ভাবতে থাকে। ওর মনে হয় রায়হানকে ছাড়া ও বাঁচবে না। ওদের প্রেমের পাঠ আপাতত চিঠির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলো। আজ সাবেরার মনে হয় রায়হানের প্রতি ওর সেই অনুভূতীগুলো ভালোবাসা ছিলো না। ওটা ছিলো বয়ঃসন্ধিকালের আবেগ। তবে আবেগটা হয়তো বিয়ের পরে ভালোবাসায় পরিনত হতে পারতো। কিন্তু বিয়ের পর থেকে ওর প্রতি রায়হানের আচরণগুলো ওকে দূরে সরিয়ে দেয়। যারফলে ভালোবাসার ফুলগুলো কলি অবস্থাতেই ঝরে পড়ে।
এরমাঝে সাবেরার এসএসসি পরীক্ষার ফল বের হলো। সাবেরা গোল্ডেন জিপিএ ফাইভ পেয়ে এসএসসি পাশ করেছে। রেজাল্ট পেয়ে সাবেরা খুব অবাক হলো। ওর বাবা ওকে অ্যাপ্রিশিয়েট না করে রায়হানকে করছে। এমনকি ওর ফুফুও ওর বাপের সুরে সুর মিলিয়ে বলছে,
—ভাগ্যিস তুই সাবেরাকে পড়িয়েছিলি তাইতো ও এতো ভালো রেজাল্ট করেছে।
সাবেরার ভীষণ মন খারাপ হয়। তবে রায়হানের কথায় ওর রাগগুলো পানি হয়ে যায়। রেজাল্ট আউট হবার পরপরই রায়হান অনলাইনে সাবেরার রেজাল্ট দেখে নেয়। সেদিন ভার্সিটি থেকে ফেরার পথে মিষ্টি কিনে বাড়ি ফিরে আসে। রায়হান সাবেরার রুমে এসে ওকে বলে,
—-মুখটা হা কর। আমি নিজের হাতে তোকে মিষ্টি খাইয়ে দিবো। আমার সম্মানটা রেখেছিস বলে তোকে অনেক ধন্যবাদ।
—থাক তোমাকে আর আদিখ্যাতা দেখিয়ে মিষ্টি খাওয়াতে হবে না। কষ্ট করে লেখাপড়া করলাম আমি আর এখন তোমাকে সবাই প্রশংসায় ভাসাচ্ছে।
রায়হান সাবেরার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বলে,
—-তুই যে আমার হৃদয়ের অংশ। এটা তুই বুঝিস না? নাকি বুঝেও না বোঝার ভাণ করিস? সেকারণে আমি চেয়েছিলাম সবার আগে তোকে আমি উইশ করবো।
অষ্টাদশী সাবেরা রায়হানের মিষ্টি কথায় মুহুর্তে পটে গেল। মুখ হা করে রায়হানের হাত থেকে মিষ্টি নিজের মুখে পুড়ে নিলো। রায়হান হয়তো আরো কিছু বলতে যাচ্ছিলো। তবে কারো পায়ের শব্দে নিজেকে সামলে নিলো। সাবেরার বাবা মা দুজনেই সাবেরার ঘরে আসলো। রায়হানকে দেখে সাবেরার বাবা বললো,
—-তুমি তোমার ছাত্রীকে মিষ্টিমুখ করিয়েছো?
—-হা মামা,তবে আপনাদের উপর ওর খুব অভিমান হয়েছে। কষ্ট করে পড়াশোনা করে রেজাল্ট ভালো করলো ও আর আপনারা আমাকে প্রশংসায় ভাসিয়ে দিচ্ছেন।
—-ওযে কষ্ট করেছে তাতো আমরা জানি। তবে তোমার অবদানকে খাটো করে দেখার উপায় নেই।
সাবেরার মা মনে মনে নিজের স্বামীর উপর খুব বিরক্ত হলেন। সে কারনে গলায় একটু ঝাঁঝ মিশিয়ে বললেন,
—-মেয়েটা এতো কষ্ট করে রেজাল্ট ভালো করলো আগে ওকে মিষ্টিমুখ করান। রায়হানের সাথে পরেও কথাগুলো বলতে পারবেন।
সাবেরার মায়ের কথায় ওর বাবা ওর মুখে মিষ্টি তুলে দেন। আমিরা,তাহেরা আর সাব্বিরও ততক্ষণে সাবেরার রুমে চলে এসেছে। রায়হান ওদেরকে স্পেস দিয়ে এঘর থেকে বের হয়ে গেল।
সাবেরার এমন রেজাল্টে রায়হানও যারপরনাই অবাক হয়েছে। এরমাঝে সালেহা বেগম ভাইকে সাবেরার সাথে রায়হানের বিয়ের কথা মনে করিয়ে দিলেন। রায়হান তখনও পাশ করে বের হয়নি। সে কারনে সাবেরার মা বলেন,
—-বিয়েটা পরে দিলে হয় না? রায়হানের এখন ফাইনাল পরীক্ষা হয়নি আর সাবেরাও কেবল এসএসসি পাশ করলো। ও কলেজে ভর্তি হোক লেখাপড়াটা শেষ করুক। তারপর না হয় বিয়ের কথা ভাবা যাবে।
সাবেরার মায়ের মুখের কথা কেড়ে সালেহা বললো,
—তোমার মেয়ের পড়াশোনা নিয়ে তোমাদের চিন্তা করতে হবে না। ঐ বিষয়টা আমার ছেলের উপর ছেড়ে দাও।
আজ ওর মনে হয় সেদিনই ওর ফুফু তার উদ্দেশ্য হাসিল করতে সাবেরার লেখাপড়ার ভার তার ছেলের উপর ছেড়ে দিতে বলেন। কারণ বিয়ের পর সাবেরা শুধু এইচএসসি পাশ করেছে। এরপর ও লেখাপড়া আর এগোয়নি। কারন বিয়ের পরের মাসেই ও কনসিভ করে। রায়ানের জন্ম হয়। যারফলে এসএসসির রেজাল্ট খুব একটা ভালো হয়নি। রায়হান যেন এটার অপেক্ষাতেই ছিলো। কারণ রেজাল্ট খারাপ করার অপরাধে সাবেরার লেখাপড়া চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।
চলবে