বিষন্ন বিকেল পর্ব-০৪ এবং শেষ পর্ব

0
315

#বড় গল্প
#বিষন্ন বিকেল
শেষ পর্ব
মাহবুবা বিথী

চাকুরি ক্ষেত্রে দিনদিন রায়হানের উন্নতি বাড়ে আর সাবেরার কপাল পোড়ে। উঠতে বসতে নানা বিষয়ে রায়হান ওকে খোঁটা দিতে থাকে। যে রায়হান বিয়ের আগে ওর লেখাপড়ার প্রতি এতো সিরিয়াস ছিলো অথচ বিয়ের পর লেখাপড়াটাই বন্ধ করে দিলো। সাবেরা বুঝে পায় না কেন রায়হানের এই পরিবর্তন। এদিকে বাবা মায়ের কাছে রায়হানের সম্পর্কে কিছু বলতে পারে না। কিছু বললেই ওর বাবা বলে,
—-যে তোমাকে খাওয়াচ্ছে পড়াচ্ছে তুমি এখন তার নামেই নিন্দে করছো? তোমাকে কি আমি এই শিক্ষা দিয়েছি? তোমার কপাল অনেক ভালো তাই রায়হানের মতো স্বামী পেয়েছো।
সাবেরা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে মনে মনে বলে “আসলেই বহু কপালগুনে এমন স্বামীর দেখা মেলে।”সাবেরা ভাবে রায়হান আসলে প্রচন্ড স্বার্থপর টাইপের মানুষ। সে কারনে নিজের মাকেও সাথে রাখেনি। গ্রামে পাঠিয়ে দিয়েছে। টাকা দিয়ে দায় সারছে। সাবেরা নিজের কাছে রাখতে চেয়েছিলো। এতে রায়হান খোঁচা দিয়ে বলে,
—মায়ের থেকে মাসীর দরদ বেশী মনে হচ্ছে?
পরে সাবেরা বুঝতে পেরেছে, মায়ের সামনে নিজের অকাম কুকামগুলো করতে পারবে না। সে কারনে রায়হান মাকে সাথে রাখতে চাইছে না। শাশুড়ী মায়ের কানে যে রায়হানের অকাম কুকামের খবর একদম পৌঁছায় না তা নয়। কিন্তু উনি ছেলের দিকে ঝোল টেনে বলেন,” এক হাতে তো তালি বাজে না। সাবেরারও দোষ আছে। আমার ছেলের মতো এতো শিক্ষিত ছেলে ওকে যে কপাল গুনে বিয়ে করেছে বলেই তো গায়ের রংটা বর্তে গেছে। পুরুষ মানুষের এরকম হালকা পাতলা দোষটা কোনো দোষের মধ্যে পড়ে না।”
রায়হান প্রায়শঃ অফিসের মহিলা কলিগদের সাথে অফিস ছুটির পর বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে খেতে যায়। অথচ সাবেরা কবে রায়হানের সাথে রেস্টুরেন্টে গিয়েছে ওর মনেই পড়ে না। ওর সাথে বেড়াতে যেতে চাইলে রায়হান বলতো,
—-,আয়নাতে নিজের চেহারাটা একবার দেখো,নিজেকে তো বানিয়ে ফেলেছো আলকাতরার ড্রাম।
রায়হানের মুখে একথা শোনার পর সাবেরাও তেতে উঠে বলতো,
—+তোমার মহিলা কলিগদের জন্য তোমার ঠিকই সময় হয়। শুধু আমার জন্য কোনো সময় থাকে না।
কথার পিঠে রায়হানও বলতো,
–++আমার মহিলা কলিগদের সাথে তুমি কখনও তোমার তুলনা করো না। মনে রেখো, এ জীবনে তুমি কখনও ওদের নখের সমান হতে পারবে না।
এরপর থেকে সাবেরা আর কখনও রায়হানের সাথে বেড়াতে যেতে চায়নি। তবে আজ বুঝেছে, রায়হান আসলে ওকে কখনও ভালোবাসেনি। তবে ব্যবহার করেছে। সাবেরার বড় ছেলে রায়ানের জন্ম সিজার করে হয়েছে। অনেক মেডিসিন নিতে হয়েছে। আবার রুপাও সিজার করে হয়েছে।সে কারনে শরীরটা সেসময় অনেকটা ফুলে গিয়েছিলো। রায়হান জানতো, তারপরও ওকে মানসিকভাবে দুর্বল করার জন্য ফিগারের প্রসঙ্গটা বারবার টেনে আনতো। সাবেরাকে নাকি ওর সাথে এখন মানায় না। ওর বড় বোনের মতো লাগে।তবে রায়হানের মুখে ওরকম অপমানজনক কথা শোনার পর ও আর কোনোদিন রায়হানের সাথে কোথাও বের হয়নি। সাবেরা আস্তে আস্তে একটা করে দুরত্বের ইট গাঁথতে শুরু করে দিলো।। সবসময় যে তর্ক করে প্রতিবাদ করতে হয় সাবেরা এতে বিশ্বাসী নয়। কখনও কিছু না বলেও বডি ল্যাঙ্গুয়েজের মাধ্যেমে নিরব প্রতিবাদ করা যায়। সাবেরা রায়হানের সাথে সেটাই করেছে।
ওর জীবনটা যেন বৈষয়িক বেড়াজালে আঁটকে গেল। সাবেরা ওর আবেগ ইমোশনগুলো সব বাক্সবন্দী করে রেখে দিলো। সেদিন ছেলের ক্রান্তিকালে অতীতের অনেক হিসাব নিকাশগুলো যেন হুড়মুড় করে সামনে এসে পড়েছিলো। রুপার ডাকে ও ভাবনার জগত থেকে ফিরে এলো।
—-আম্মু একটু পরেই তো ভাইয়ার ঘুম ভেঙ্গে যাবে। তুমি রিহ্যাবে ফোন করে ওকে নিয়ে যেতে বলো।
আসলেই তো ঘুম ভাঙ্গার সাথে সাথে রায়ানের অত্যাচার বেড়ে যাবে। ওকে তো এবার মাদক না দিয়ে উপায় থাকবে না। সাবেরা রিহ্যাবে দ্রুত ফোন করে দেয়। মগবাজারে নিরাময় নামে একটি রিহ্যাব সেন্টার থেকে গাড়ি চলে আসে। রায়ানের শরীরে একটা ইনজেকশন পুশ করে ওকে নিয়ে যায়। শুরু হলো সাবেরার অন্য জীবন। রিহ্যাব সেন্টার আর বাসা এই দুটোর মাঝে সাবেরার জীবনটা তখন আটকে থাকে। আর রাত জেগে আল্লাহপাকের ইবাদতে মশগুল থাকা। বান্দা যখন নিরবে নিভৃতে তার সৃষ্টিকর্তা আল্লাহপাকের কাছে চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে তার দুঃখ কষ্টের প্রতিকার চায় তখন আল্লাহপাক তার জন্য যথেস্ট হয়ে যান। সাবেরার বিশ্বাস রায়ান একদিন ঠিক পথে ফিরে আসবে।
এক অদ্ভূত সময়ের আবর্তে সাবেরার জীবনটা ঘুরপাক খেতে লাগলো। মাঝে মাঝে ও রায়ানকে রিহ্যাব থেকে নিয়ে আসে। দুদিন থাকে তারপর ও আবার রিহ্যাবে ফিরে যায়। সাবেরাও ভাবে,ছেলে বুঝি তার সুস্থ হতে চললো। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। রিহ্যাব থেকে একদিন ফোন আসলো। সাবেরা দেখা করতে যায়। ওরা বলে রায়ান যখন বাসায় তখন মাদক কেনার জন্যই যায়। সুতরাং রিহ্যাব থেকে বের হলে ও কখনও পরিপূর্ণ সুস্থ হবে না। ওকে একদম সুস্থ করতে চাইলে রিহ্যাব থেকে বের হতে দেওয়া যাবে না। সাবেরাও তাই মেনে নিলো। পুরো একবছর রায়ান রিহ্যাবে থাকলো। উন্নতি হচ্ছে তবে চোখে পড়ার মতো নয়। মাঝে মাঝে সাবেরা গিয়ে দেখে আসতো। এর সাথে সাবেরাকে কাপড় সেলাই করে অর্থ সংগ্রহ করতে হতো। সেসময় আত্মীয় স্বজন কেউ ওর পাশে ছিলো না। এমনকি ওর স্বামী যিনি ওর সন্তানের পিতা তিনিও কাছে ছিলেন না। তবে সাবেরা হাল ছেড়ে দেয়নি। আল্লাহপাকের উপর ভরসা রেখে লড়াই চালিয়ে গিয়েছে। এরমাঝে রুপার এসএসসির রেজাল্ট দিয়েছে। ও গোল্ডেন জিপিএ পেয়েছে। এদিকে রায়ানও আস্তে আস্তে সুস্থ হতে চলেছে। প্রায় দুবছরের মাথায় রায়ান সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে আসলো। রুপা এইচএসসি তে আবারো গোল্ডেন জিপিএ পেয়েছে। সাবেরা রায়ানকে কলেজে ভর্তি করে দেয়। রায়ান পড়াশোনা শুরু করেছে।সামনের বছর এইচএসসি পরীক্ষা দিবে। রুপা এখন ঢাকা ভার্সিটিতে সিএসসি পড়ছে।
অতীর কন্টকমুহুর্ত থেকে সাবেরা বাস্তবের পেলব মুহুর্তে এসে দাঁড়ালো। অনেক চড়াই উৎড়াই পথ পাড়ি দিয়ে আজ এতোদিনে সহজসরল পথের দেখা মিলেছে। না, ও মেয়েকে এখন কিছুতেই বিয়ে দিবে না। ও চায় না ওর মেয়ের জীবনটা ওর মতো হোক। সাবেরা ওর দৃষ্টি জানালা দিয়ে বাইরে মেলে ধরলো। গোধুলীর আবির রঙ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। মাগরিবের আযান শুরু হয়েছে। সাবেরা একমনে আযান শুনলো। এরপর আযানের দোয়া পরে ওয়াশরুমে ওজু করতে চলে গেল।
যদিও রায়হানের সাথে ওর স্বামী স্ত্রীর সেই সম্পর্ক আর নেই তবে বাহ্যিকদিক থেকে সাবেরা কিছু নিয়ম মেনে চলে। তা শুধু নিজের ছেলেমেয়েদের মুখের দিকে তাকিয়ে করে। সেই সুত্রে আজও রাত্রে পরিবারের সবাই একসাথে খেতে বসেছে। রায়হান রুপার দিকে তাকিয়ে বলে,
—-তোমার একটা ভালো সমন্ধ এসেছে। তুমি কি এখন বিয়ে করতে চাও নাকি চাও না?
—+অবশ্যই চাই না। বাবা, মায়ের জীবনটাকে দেখার পর থেকে আমি অনেক আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে তবেই বিয়ে করবো।
—+বিয়ে করবে কি করবে না সেটা শুনতে চেয়েছি। এতো লম্বা চওড়া কথা বলার দরকার ছিলো না। জানি তো দিনরাত্রি কে তোমাদের ব্রেনটা ওয়াশ করে।
একথা বলেই খাওয়া অসমাপ্ত রেখে রায়হান উঠে চলে যায়। রায়হান চলে যাওয়ার সাথে সাথে রুপা টিপ্পনি কেটে বলে,
—+সত্যি কথা বললে সবাইর তেতো লাগে।
সাবেরা অবাক হয়ে রুপার দিকে তাকিয়ে থাকে। মেয়েটা তার কবে এতো বড় হলো। কবে এভাবে কথা বলতে শিখলো। রায়হান শুধু শুধু ওকে দোষারোপ করলো। একটা প্রবাদ আছে কিছু পেতে হলে কিছু দিতে হয়।আজ অবধি রায়হান বাচ্চাদের নিয়ে কোনো টাইম স্পেন্ড করেনি। সুতরাং ওর প্রতি আজকে বাচ্চাদের যা আচরণ তা ওর নিজের অর্জন করা।পরদিন শুক্রবার থাকায় কলেজ কিংবা ভার্সিটি যাওয়ার কোনো চাপ নেই। সেকারনেই রায়ান রুপাকে বললো,
–++রুপা আজ পূর্ণিমা। চল, চা বানিয়ে নিয়ে আমরা সবাই বারান্দায় বসি। পূর্ণিমার আলোতে আমরা সবাই আজ গোসল করবো।
রুপা চা বানাতে চলে গেল। রায়ান সাবেরার হাত দুটো ধরে বললো,
—-আম্মু আমি তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি তাই না? তুমি আমার উপর কোনো রাগ রেখো না।
সাবেরার চোখ দুটো ভিজে উঠলো। আজ ওর ভীষণ ভালো লাগছে। রায়ান এখন অনেকটা স্বাভাবিক। ওরা তিনজন বসে এখন প্রায় একসাথে অনেকটা সময় কাটায়। বাইরে রেস্টুরেন্টে খেতে যায়। রুপাও এখন টিউশনি করে ভালাে টাকা উপার্জন করে। কখনও বা কক্সবাজারে ঘুরতে যায়। অনলাইনে সাবেরার কাপড়ের বিজনেসটা জমে উঠেছে। আসলে রায়ানকে আনন্দে রাখতে ওরা তিনজন মাঝে মাঝেই বেড়াতে বের হয়। এরমধ্যে সাবেরা নিজেকে স্বাবলম্বি করে গড়ে তুলে। ওর এখন নিজের একটা পরিচয় আছে। ও একজন সফল উদ্যেক্তা। এবছর সেরা উদ্যেক্তা হিসাবে পুরুস্কার পেয়েছে।ও ভাবে ওর কষ্টগুলো বিফলে যায়নি। বরং মাঝে মাঝে মনে হয় রায়হান অনেকটা লুজার হয়েছে। ও বুঝে রায়হান এখন ওদের মাঝে ফিরতে চায়। কিন্তু অনেক দেরী করে ফেলেছে। আজ ওর সুখের মাছিরা ওর আশে পাশে নেই। ওদের তিনজনের হাসি আনন্দেতে রায়হান যুক্ত হতে চায়। কিন্তু এখন আর সেই সময় নেই। সাবেরা রুপা আর রায়ান রায়হান ছাড়াই বাঁচতে শিখে গিয়েছে।

সমাপ্ত