বিস্বাদপূর্ণ জীবনে তুমি পর্ব-১১

0
501

#বিস্বাদপূর্ণ জীবনে তুমি
#পর্বঃ১১
#লেখিকাঃশুভ্রতা_শুভ্রা

হঠাৎ কারো ঠান্ডা হাতের স্পর্শ আমার পেটে পেতেই আমি চমকে উঠি। আয়নায় তাকিয়ে ভয়ে আমার আত্মা কেঁপে উঠে। কারণ নূর ভাইয়ার চোখে কেমন যেন এক নেশা দেখতে পারছিলাম। আমি নিজেকে অনেক ছাড়ানোর চেষ্টা করি কিন্তু আমি পারিনি। চিল্লাচিল্লি ও করেছি কিন্তু গানবাজনার শব্দে কেউ আসে নি ওইদিন। নিজেকে তখন খুব অসহায় লাগছিলো। অনেক চেষ্টার পরেও ওইদিন নিজের সম্মান বাঁচাতে পারিনি। অনেক আকুতি মিনুতি করি তার কাছে। কিন্তু সে সেই দিন পশুর মতো আচরণ করে আমার সঙ্গে। একটু পর ও নিজেই সরে যায়। নিজেকে তখন শেষ করে দিতে মন চাচ্ছিলো। হঠাৎ করে দরজা খুলে যায়। দরজার দিকে তাকাতেই বুক ফেটে কান্না চলে আসে আমার। দরজায় আমার পরিবারের প্রায় সবাই উপস্থিত ছিলো।

আমাকে এই অবস্থায় দেখে বাবা দরজা ঘেঁষে বসে পরে। মা এসে কেন যেন আমার গালে এসে থাপ্পড় মারেন। ওই পশুটা সব দোষ আমার উপর দিয়ে দেয়। আমাদের নাকি সম্পর্ক ছিলো আর আমি নাকি ওর সঙ্গে সইচ্ছায় এগুলো করতে চেয়েছি। সবাই আমাকে অবিশ্বাস করে ওই জানোয়ারটাকে বিশ্বাস করে। আমি সবাইকে বলেছিলাম যে ও মিথ্যা বলছে। আমার বিয়ে ভেঙে দেয় তিয়াসের মা। ওনারা ওইদিন হিয়াকে তিয়াসের বউ করে নিয়ে যায়। আমার বুকে রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছিল। নিজে নিজে মরে যেতে মন চাচ্ছিলো। তখন সিদ্ধান্ত নেই আমি সুইসাইড করবো। ফ‍্যানের সঙ্গে ওরনাও লাগিয়েছিলাম তখন দাদু দৌড়ে এসে আমাকে আটকিয়ে যা বলেন তা শোনার জন‍্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। বাবার নাকি বুকে ব‍্যাথা উঠেছে। অবস্থা ভালো না আমাকে ডাকছে আমি দৌড়ে যাই বাবার কাছে। বাবা আমার হাত ধরে বলেছিলো “জীবনে উন্নতি করতে, কে কি বলল তাতে কান না দিতে। আমি জানি আমার মেয়ে কেমন। আমার মেয়ে যে কখনই এমন করতে পারে না আমি বিশ্বাস রাখি। তুই কিন্তু কোনো ভুল ডিসিশন নিবি না। নিজের জন‍্য বাঁচতে হবে তোকে।”

হঠাৎ করে বাবা বুকে হাত দিয়ে আহ করে উঠে। আমি ওনার হাত ধরে কান্না করতে থাকি। আমার মা এসে আমাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেন বাবার কাছ থেকে। আমি ছলছল নয়নে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম মায়ের দিকে কিন্তু মা একবারও আমার দিকে তাকায় নি। খুব কষ্ট হয়েছিল মনে হচ্ছিলো নিজেকে শেষ করে দেই। কিন্তু বাবার শেষ কথা মনে করে চোখে পানি মুছে নিলাম। ওখান থেকে উঠে চলে আসি আমি। রুমে এসে দরজা লাগিয়ে দেই। বাবা নেই কথাটা মানতে পারছিলাম না। চিৎকার করে কান্না করতে থাকি আমি। অনেকক্ষণ কান্না করি বাহিরে বর্ষণ হচ্ছে। তুমুল বর্ষণ। আমার কান্নার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বর্ষণ হচ্ছে। এই বর্ষণ ওর জন‍্য কোনো সময় ভালো কিছু আবার কোনো খারাপ কিছু নিয়ে আসে।

ফোনের আওয়াজে চোখের পানি মুছে ফোন রিসিভ করি। ওপাশ থেকে তিয়াসের চিরোচেনা কন্ঠ ভেসে এলো। তিয়াস বলতে লাগলো

“তুমি আমার সঙ্গে এমন বেইমানি করবে আমি কল্পণাও করতে পারিনি। তুমি কিভাবে পারলে আমার সঙ্গে এমন করতে। তুমি আগেই তো আমাকে বলতে পারতে যে তুমি অন‍্য কাউকে”

আমি কল কেটে দেই। তাচ্ছিল্যের একটা হাসি ফুটে ওঠে আমার মুখে। শেষমেষ ভালোবাসার মানুষটাও বেইমান উপাধি দিলো। সেও আমাকে বিশ্বাস করলো না। থাক না সে আমার হিয়া পিচ্চিটার সঙ্গে সুখী। আমি দূরে সরে যাবো ওদের থেকে। এখন থেকে আমি একাই বাঁচবো। নিজে নিজেই বাঁচবো। নিজের জন‍্য বাঁচবো। একাকিত্বকে সঙ্গী করে নিবো।

তারপরেই আমি দাদুকে বলে লন্ডন চলে যাই। অনেক দিন লেগেছে নিজেকে স্বাভাবিক করতে। অনেক কষ্ট করে নিজেকে পাথর করে ফেলেছি। ভালোই ছিলাম। কিন্তু আবার এখানে এসে সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেলে।

——————————————

অতীত ছেড়ে বর্তমানে ফিরে আসলো রিয়া। আকাশের দিক থেকে চোখ সরিয়ে পাশে থাকা রেহানের দিকে তাকালো রিয়া। রেহান নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। ওকে দেখে কিছু বুঝতে পারছেনা রিয়া। কি চলছে ওর মনে। হয় তো রেহান ও ওকে ভুল বুঝে ছেড়ে দিবে। অজান্তেই একটা তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠলো রিয়ার মুখে।

হুট করে রেহান উঠে গেলো। রেহানের উঠে যাওয়ায় রিয়ার ভেতর থেকে আপনাআপনি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। ও আবার আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলো।

রিয়াকে হুট করে জরিয়ে ধরে ওর পিঠে থুতনি রেখে রেহান বলতে লাগলো

“জানো তো আমার মামাতো বোন আখিঁকে গুন্ডারা তুলে নিয়ে গিয়েছিল। রেপ করে ফেলে রেখে গেছিলো। ওর ভালোবাসার মানুষ কিন্তু ওকে ছেড়ে যায় নি। এরপরেও ওকে বিয়ে করেছিলো। ও কোনো দিন মাও হতে পারবেনা। জানে সে তবুও কিন্তু ওনি আখিঁকে ছেড়ে যায়নি। আর তুমি কি ভেবেছো আমি এগুলো জেনে তোমাকে ছেড়ে দিবো।”) রিয়ার কানে একটা কামুড় দিয়ে রেহান আবার বলল “বউ গো এ জীবনে তোমাকে ছাড়ছিনা গোও।”

রিয়া কেঁপে উঠলো রেহানের কাজে। রিয়ার চোখ বেয়ে পানি পরতে লাগলো। রেহান রিয়াকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে বলতে লাগলো “তুমি কি ভাবছো আমি এগুলো জানিনা। আমি সব জানি। তোমাকে আমি দেখি সেই এয়ারপোর্টে। দেখেই আমি শেষ। পরে দেখি তুমি আমার বাসার সামনের বাসায় ঢুকো। খুব খুশি হয়েছিল। পরে নিশি আপুর কাছে তোমার ব‍্যাপারে সবকিছু জেনে নেই। আমি এগুলো সব জানি রেএ পাগলি।”

রিয়া হুট করে শক্ত করে জরিয়ে ধরে রেহানকে। রেহানও রিয়াকে নিজের বুকে আকড়ে ধরে রইলো। বর্ষাকাল বিধায় কিছুক্ষণ পরপর বর্ষণ হচ্ছে। এখন আবার বৃষ্টি এসেছে। একদিন এই বৃষ্টিতেই রিয়া তার ভরসার হাত হারিয়েছিল। হয় তো সেই বৃষ্টিতেই আবার একটা ভরসার হাত পেলো। রিয়া রেহানের বুকে মাথা রেখে বসে আছে। রেহান ওর মাথায় হাতবুলিয়ে দিচ্ছে। রেহান কিছুক্ষণ পর খেয়াল করলো রিয়া গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে গেছে রেহানের বুকে। রেহান মুচকি হাসলো। রিয়াকে কোলে তুলে নিয়ে এলো রুমে। রিয়াকে বেডে শুয়ে দিয়ে নিজেও ওর পাশে শুয়ে পরলো।

———————-

পরেরদিন সকালে উঠতে উঠতে অনেক দেড়ি হয়ে গেলো ওদের। রিয়ার ঘুম ভাঙতেই দেখলো রেহান আয়নার সামনে দাড়িয়ে ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। ওকে উঠতে দেখে রেহান মুচকি একটা হাসি দিলো। রিয়া উঠে ওয়াশরুমে চলে গেলো ফ্রেশ হতে।

ওরা দুইজন মিলে খাবার টেবিলে চলে গেলো। বাড়ির সবার খাওয়া শেষ। রেহানের ভাবি ওদের খাবার বেড়ে দিচ্ছে আর মিটমিটিয়ে হাসছে। ভাবির এমন হাসি দেখে রেহান কপাল কুচকে বলল

“কি হয়েছে ভাবি এরকম করে হাসছো কেন?”

ভাবি দুষ্টামি হাসি দিয়ে বলল “না মানে এমনি”

রেহান ভাবিকে পাত্তা না দিয়ে খাবার খেয়ে নিলো। আজ রেহান অফিস যাবে না। রিয়া রুমে আসলেই রেহান ওকে পিছন থেকে জরিয়ে ধরলো। রিয়া প্রথমে চমকে উঠলেও পরে নিজেকে স্বাভাবিক করে নেয়। রেহান রিয়ার চুলে মুখ ডুবিয়ে দিয়ে নেশা ভরা কন্ঠে বলতে থাকে

“তোমার বিস্বাদময় জীবনে জায়গা দেবে আমায়। আমি তোমার সবকিছু আনন্দে ভরিয়ে দিবো। তোমার বিস্বাদময় জীবনে ভালোবাসা দিয়ে ভরে দিবো বউ।”

রেহানে কথা রিয়া কেঁপে উঠে। রেহান রিয়াকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে রিয়ার মুখের কাছে মুখ নিয়ে বলল

“ভালোবাসতে পারবে না আমায়। পারো আর না পারো আমার ভালোবাসা দিয়েই হবে।” রেহান রিয়ার কপালে একটা গভীর ভালোবাসার পরশ এঁকে দেয়। রিয়াও আবেশে চোখ বন্ধ করে ফেলে।

রেহান রিয়াকে ছেড়ে দিয়ে কার্বাট থেকে একটা ব‍্যাগ বের করে রিয়ার হাতে দেয়। রিয়া জিঙ্গাসু দৃষ্টিতে রেহানের দিকে তাকাতেই রেহান মুচকি একটা হাসি দিয়ে বলল

“এটাতে একটা শাড়ি আর কিছু জুয়েলারি আছে পরে আসো আমরা বের হবো। আজ সারাদিন ঘুরবো আমরা।”

রিয়াও বাধ‍্য মেয়ের মতো চলে গেলো রেডি হতে। রেহান সোফায় বসে ফোন টিপতে লাগলো। কিছুক্ষণ পর…..

#চলবে