বিস্বাদপূর্ণ জীবনে তুমি পর্ব-১৩

0
553

#বিস্বাদপূর্ণ জীবনে তুমি
#পর্বঃ১৩
#লেখিকাঃশুভ্রতা_শুভ্রা

রেহান আর রিয়া মজাই করছিলো ওরা। হঠাৎ আজিজুল সাহেবের ফোন পেয়ে রেহান ওদের থেকে একটু দূরে সরে গেলো। রিয়া ও একবার রেহানের দিকে তাকিয়ে আবার ওনাদের সঙ্গে গল্প করতে থাকে।

আজিজুল সাহেব ওই পাশ থেকে যা বলল তা শোনার জন‍্য রেহান মোটেও প্রস্তুত ছিলো না। রেহানের হাত থেকে ফোনটা পরে যায়।

রিয়া দৌড়ে যায় রেহানের কাছে অস্থির হয়ে বলতে থাকে “কি হয়েছে আপনার বলেন আমাকে কি হলো।”

রেহান চুপ করে দাড়িয়ে আছে। কোনো নড়াচড়া নেই। রিয়া রেহানের হাত ঝাকাতে লাগলো। রেহান জরানো কন্ঠ বলতে লাগলো

“আমি এখন যা বলবো তাতে কিন্তু তুমি ভেঙে পরবে না।”

রিয়া তাচ্ছিল্যের একটা হাসি দিয়ে বলল “এখন আমি আর এত সহজে ভেঙে পরি না বলেন আপনি।”

রেহান জোরে একটা নিশ্বাস নিয়ে চোখ বন্ধ করে বলতে লাগলো

“তিয়াস ভাই আর নেই। ওনার ব্লাড ক‍্যান্সার ছিলো। কিন্তু ওনি কাউকে বলে নি। কাল রাতে অনেক অসুস্থ হয়ে পরে ওনি। তখন সবাই হাসপাতালে নিয়ে যায়। তারপর কিছুক্ষণ পর ওনি গাড়িতেই….”

রিয়া থমকে গেলো রেহানের কথা শুনে। রেহানের হাত থেকে ওর হাত ছুটে গেলো। কেন জানি বুকের ভেতরে দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে ওর।

রেহান ঝট করে রিয়ার হাত ধরে ওকে বাইকের কাছে নিয়ে গেলো। রেহান আর রিয়া তাড়াতাড়ি করে তিয়াসদের বাসায় চলে গেলো। বাসার সামনে এসে বাইক থামতেই। রিয়া দৌড়ে গিয়ে মেইন দরজার ভেতরে গেলেই ওর পা আটকে যায়। তার প্রথম ভালোবাসা,তার হৃদস্পন্দন,তার অল্প বয়সের আবেগ অনুভূতি এখন সাদা কাফনে মোড়ানো। রিয়া ছলছল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তিয়াসের নিথর দেহের দিকে। রেহান রিয়ার কাধে হাত রাখতেই রিয়া রেহানকে শক্ত করে জরিয়ে ধরলো। বুকে উষ্ণ তরল জাতীয় কিছুর অনুভব হতেই রেহান বুঝতে পারলো রিয়া কান্না করছে। রেহান কিছু বলল না। রেহান রিয়াকে নিয়ে তিয়াসের রুমে চলে গেলো।

তিহান ওর দাদিকে জিঙ্গাসা করছে “যে ওর বাবাই কেন কথা বলছে না?”

তিহানের দাদি নিরবে শুধু চোখের পানি ফেলে যাচ্ছেন। কিভাবে তিনি বলবেন যে তিয়াস আর কোনোদিনও কথা বলবে না। তিহানের এমন অবস্থা দেখে রেহানের চোখেও পানি টলমল করছে। রেহান আলতো করে রিয়াকে ওর বুক থেকে তুলে বলল

“দেখো তিয়াস ভাই নেই এটা মেনে নিতে সবারই কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু একবার কি তিহানের কথা ভেবে দেখেছো ওর কি অবস্থা। ওকে একমাএ তুমিই সামলে রাখতে পারবে। আচ্ছা ও তো তোমাকে মামুনি বলে ডাকে। তুমি যাও এখন ওর মামুনির কাজটা করো। আমি বাকিটা দেখছি।”

রিয়া ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকিয়ে মাথা নাড়িয়ে “হ‍ুম” বলল। রেহান রিয়াকে রুমে রেখে বাহিরে চলে গেলো। তিয়াসের মাও চলে গেলেন। তিহান এখনো রিয়াকে দেখেনি একটা টেডি নিয়ে কি যেন বিরবির করছে।

রিয়া হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখের পানি মুছে গুটিগুটি পায়ে তিহানের দিকে এগিয়ে গেলো। তিহানের বিরবির করা কথাগুলো শুনে রিয়া দৌড়ে গিয়ে তিহানকে জরিয়ে ধরলো। তিহান আবার বলতে লাগলো

“আম্মু আমার বাবাইকেও নিয়ে গেলো। আমাকে একা রেখে গেলো। কেউ ভালো না আমাকে রেখে চলে গেলো। আমি ও আর কথা বলবো না ওদের সঙ্গে।”

রিয়া তিহানকে শক্ত করে বুকে জরিয়ে ধরলো। তিহান ও ফুপিয়ে ফুপিয়ে কান্না করছে। রিয়া পরম স্নেহে তিহানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। তিহান ও কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুমিয়ে গেলো। ঘুমানোরই কথা রাতে হাসপাতালে যাওয়া আসা আবার এতো বড় একটা ধাক্কা নিতে হয়েছে তাকে। রিয়া আলতো করে নিজের কোল থেকে নামিয়ে বেডে শুয়ে দিলো তিহানকে।

রিয়া ঘুরে ঘুরে রুমটা দেখছে। হঠাৎ কারো কন্ঠে রিয়া পিছনে ফিরে তাকায় তিথি দাড়িয়ে আছে। তিয়াসের ছোট বোন হচ্ছে তিথি। মেয়েটার চোখ মুখ ফুলে আছে। থাকারই কথা মেয়েটি দৌড়ে এসে একটা চিঠি দিয়ে আবার দৌড়ে চলে গেলো।

রিয়া কাপাকাপা হাতে চিঠিটা খুলল চিঠিতে লেখা আছে

প্রিয় রিয়ামণি

প্রিয় বলে বলার অধিকার আমি হারিয়েছি অনেক আগে। আর এখন তো তুমি অন‍্য কারো প্রিয় হয়ে গিয়েছ। সে যাইহোক আশা করছি ভালো আছো। তুমি যখন এই চিঠিটা পাবে তখন হয় তো আমি চলে যাবো তোমাদের থেকে অনেক দূরে চলে যাবো। আমাকে ক্ষমা করে দিও। বিশ্বাস করো আমি যখন জানতে পারলাম ওইদিন দোষ তোমার ছিলো না দোষ ছিলো ওই জানোয়ারটার। তখন থেকে আমি নিজে দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছিলাম। আমি কিভাবে তোমাকে অবিশ্বাস করলাম কিভাবে কিভাবে। জানো তো আমি হিয়াকে মেনে নিতে পারছিলাম না। কিন্তু মেয়েটা সবসময় আমাকে বোঝার চেষ্টা করতো। আমি ওর সঙ্গে অনেক খারাপ ব‍্যবহার করেছি। কিন্তু ও সবসময় মুখ বুজে সব সহ‍্য করে যেতো। একদিন ভুলক্রমে আমার দ্বারা ভুল হয়ে যায়। আমি যখন তিহান আসার খবর শুনি তখন খুব রাগারাগি করি। মেয়েটা অনেক কান্নাকাটিও করেছিলো। পরে আম্মুর কথা শুনে ওর সঙ্গে একটু একটু ভালো ব‍্যবহার করতে থাকি। মেয়েটা আস্তে আস্তে অনেক অসুস্থ হতে থাকে। ওর দিকে তাকানো যাচ্ছিলো। নিজের অজান্তেই ভালোবেসে ফেলি ওকে। যেইদিন ওর পেইন ওঠে ও খুব কান্নাকাটি শুরু করে। আমার চোখ দিয়েও পানি পরছিলো। আমার হাত ধরে বলেছিলো “ভালোবাসি অনেক বেশি ভালোবাসি আমি মারা গেলে আমার বাচ্চাটাকে দেখে রেখ আর সুন্দর দেখে একটা মেয়েকে বিয়ে করো।” আমার বুকের ভিতরে কেমন যেন একটা ব‍্যথা অনুভব হয়েছিল। কাউকে হারিয়ে ফেলার ব‍্যথা। ওইদিনের পর আর হিয়ার সাথে কথা হয় নি। তিহানকে জন্ম দেওয়ার পর হিয়ার অবস্থা আরো খারাপ হয়ে গিয়েছিল। আমি অনেক চেষ্টা করেছিলাম ওকে বাঁচানোর কিন্তু আমি পারিনি। সেই ও আমাকে ছেড়ে চলে যায়। আমি প্রায় পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। সবকিছু শূন্য শূন্য হয়ে গিয়েছিল। আমি কি করবো কিছু বুঝতে পারছিলাম না। সবাই আমাকে আবার বিয়ে করতে বলে কিন্তু না আমি করতে চাইনি। কিছুদিন পর হঠাৎ আমার ব্লাড ক‍্যান্সার ধরা পরে। রিপোর্ট দেখে আমার মুখে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠৈ। কিন্তু আমার চিন্তা হতে লাগলো আমার ছোট ছেলেটাকে নিয়ে। চিন্তায় চিন্তায় শেষ হয়ে যাচ্ছিলাম আমি। আমার মা হয় তো আমি না থাকলে আমার ছেলেটাকে দেখে রাখবে কিন্তু কতোদিন। ওনার ও বয়স হয়েছে। আর বাকি রইলো তিথির কথা ওর তো নিজের একটা জীবন আছে। আর যেইদিন আমি শুনতে পাই নূর ওই কাজ করেছে আমি ওইদিনই ওর বাসায় চলে যায়। কিন্তু আমি অবাক করা বিষয় হচ্ছে ছেলেটি পা ভেঙে বসে আছে তিনমাস যাবত। ওর পা নাকি আর ঠিক হবে না। ওইদিন তোমাকে চিঠি দিয়েছিলাম ছাদে আসার জন‍্য। ওইদিন তোমার কাছে ক্ষমা চাইতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তুমি আমাকে সেই সুযোগ ও দেও নি। সে যাইহোক তুমি রেহানের সাথে সুখে থেকো। ছেলেটা অনেক ভালো। আমি যখন তোমাদের বাসায় যেতাম তখন ওই ছেলেটা আমাকে সঙ্গ দিতো। আমি দেখেছি তোমাদের একসঙ্গে হাসতে। জানো তো আগে তোমাকে অন‍্য কারো সঙ্গে দেখলে আমার প্রচণ্ড রাগ হতো। কিন্তু এবার তা একদমই হয় নি। অনেক সুন্দর মানিয়েছে তোমাদের একসঙ্গে। জানো তো এখন আমি মরেও শান্তি পাবো। কারণ তোমার কষ্ট আনন্দে ভরিয়ে দিতে এখন অন‍্যকেউ চলে এসেছে। যাইহোক আমার শেষ একটা অনুরোধ রাখবে প্লীজ প্লীজ। আমার ছেলেটাকে একটু নিজের কাছে রাখবে। ওকে মা বাবার আদর দিয়ে বড় করে তুলবে প্লীজ। আমার শেষ ইচ্ছাটা রাখবে প্লীজ। আমি আমার পরিবারকে মানিয়ে নিয়েছি। ভালো থেকো। দোয়া রইলো তোমাদের জন‍্য। খোদা হাফেজ।

ইতি
অপ্রিয় তিয়াস

তিয়াসের চিঠিটা পরে রিয়ার চোখ গড়িয়ে পানি পরতে লাগলো। হঠাৎ রেহান রুমে এসে রিয়ার কাধে হাত রাখলো। রেহানের ছোয়া পেতেই রিয়া শক্ত করে রেহানকে জরিয়ে ধরে কান্না করতে লাগলো। রেহান বুঝতে পারলো না রিয়া এতো জোরে জোরে কান্না করছে না কেন। পাশের চিঠিটা রেহান হাতে নিয়ে পরতে থাকে। পড়া শেষে রেহানের চোখ বেয়ে পানি গরিয়ে পরলো। রেহান নিজেকে স্বাভাবিক করে চোখের পানি মুছে রিয়াকে ছেড়ে ঘুমন্ত তিহানের দিকে এগিয়ে যায়।

তিহানের মাথায় হাত বুলিয়ে বলতে থাকে “আচ্ছা রিয়া আমরা কি ওকে নিজের বাচ্চা হিসেবে বড় করে তুলতে পারিনা।”

রিয়া ছলছল নয়নে রেহানের দিকে তাকালো। রেহানের প্রতি ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা শতগুণ বেড়ে গেলো রিয়ার।

রেহান বলল “কি হলো করা যায় না?”

রিয়া ছলছল নয়নে রেহানের দিকে……

#চলবে