#ভালবাসা_বাকি_আছে – ১৬
Hasin Rehana – হাসিন রেহেনা
(কপি করা নিষেধ)
অন্ধকার রুমজুড়ে বিরাজ করছে পিনপতন নিরবতা। পিছমোড়া করে হাত বাধা অবস্থায় ঘরের এক কোনায় পড়ে আছে বুশরা। বেশ কয়েকবার “কেউ আছেন? হে*ল্প! হে*ল্প!” বলে চি*ৎকার করল ও। সম্ভবত জনমানবহীন এলাকা, তাই মুখে কোন স্কচ*টেপ মারার প্রয়োজন মনে করেনি কিড*ন্যাপার।
এতদিন পর দেশে আসতে না আসতেই কেন কেউ ওকে কিড*ন্যাপ করবে বুঝতে পারছে না বুশরা। এই ছোট্ট জীবনে কোন শ*ত্রু তো নেই ওর। তবে কি রায়হানের কোন প্রতি*দ্বন্দ্বির কাজ? কিন্তু এত অল্প সময়ে কিভাবে জানলো যে ও দেশে? ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করতে পারছে না বুশরা। নিস্ফল আ*ক্রোশে আরো কয়েকবার চিৎকার করলো ও। ঠিক তখনই খুট করে ঘরের দরজাটা খুলে গেল। লোকটা ঘরের ভেতরে এসেই জানালাটা খুলে দিল। হঠাৎ এত আলোর ঝলকানিতে চোখ ধাঁধিয়ে গেল বুশরার। একটু সয়ে যাওয়ার পরে খেয়াল করলো লোকটা এগিয়ে এসে একটা চেয়ার টেনে বসলো বুশরার সামনাসামনি। চেহারায় ক্রুর হাসি।
অথচ এই মানুষটাকেই সকালে কি নিরীহ লাগছিল। ভ্যানওয়ালা পরিচয়ে এসেছিল শেখ বাড়িতে। কাচুমাচু হয়ে বলেছিল, “আমার পোয়াতি বউটা ভীষণ অ*সুস্থ ডাক্তার আপা। কেমন জানি করতেছে। একটু যাবেন আমার সাথে?”
এত অনুনয় করেছিল লোকটা যে ফেলতে পারেনি কথা। ভেবেছিল আসেপাশেই তো। ঘন্টাখানেকের মধ্যে চলে আসবে। তারপর কি থেকে কি হয়ে গেল। এখনো চিন্তা করতে পারছেনা ও। চিন্তা করতে গেলেই মাথায় ভেতর তীব্র য*ন্ত্রণা করছে। সামনের মানুষটার কথায় সম্বিত ফিরে পায় বুশরা।
“ডাক্তার আপা। চিল্লা*পাল্লা করে তো লাভ নাই। তারচেয়ে আসেন কথা বলি।”
“কি চান?”
“আপনার হাজব্যান্ডকে ফোন করবো। চুপচাপ বুঝিয়ে বলেন নির্বাচন প্র*ত্যাহার করতে। বিকাল বেলা সসম্মানে আপনাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে আসবো।”
“অসম্ভব।”
কথাটা বলামাত্রই সপাটে একটা চ*ড় পড়*লো বুশরার গালে। মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠলো।
“কোঅপারেট না করলে ঝা*মেলা বাড়বে ডাক্তার মিস।”
এটুকু বলেই মুখের মধ্যে চুকচুক শব্দ করলো লোকটা। তারপর বললো, “না না মিসেস তো। আসলে মিসেস হয়েই ঝামে*লাটা ডেকে আনছেন আপুমনি। আসছিলেন ডাক্তারি করতে, সেটা শুধু করলেইতো হতো। আবার বিদেশ গেছেন তো গেছেন, ঢং করে আসলেন কেন? যাইহোক, আসছেন ভালো করছেন। আমাদেরই উপকার হলো।”
উত্তরে কিছু বলল না বুশরা। ওর জন্য যে রায়হানের নির্বাচন ঘেঁটে যেতে বসেছে ভাবতেই চোখ ফেটে পানি আসলো ওর।
লোকটা পকেট থেকে ফোন বের করে ডায়াল করলো। লাউডস্পিকারে দেওয়ার বুশরার কানে আসলো রায়হানের গলা।
“হ্যালো। আসসালামুআলাইকুম।”
“ওয়ালাইকুম সালাম। চেয়ারম্যানসাহেব, আপনার বউতো আমার জিম্মায়।”
“কে বলছেন আপনি? কি চাই?”
“আপনার বুদ্ধিমতি বউও এই প্রশ্নই করছিল। বেশি কিছু চাইনা। শুধু নির্বাচন থেকে সরে দাড়ান।”
এক মুহুর্তের নিরবতার পরে রায়হান কাঁপা গলায় বললো, “আপনি যে আসলেই আমার স্ত্রীকে কিড*ন্যাপ করেছেন তার প্রমা*ণ কি? আমি বুশরার সাথে কথা বলবো।”
“হ্যাঁ, অবশ্যই।”, ” ম্যাডাম ভালোয় ভালোয় কথা বলেন।”
বুশরা চুপ। ও কিছুতেই চাচ্ছেনা রায়হান লোকটার কথা বিশ্বাস করুক। এজন্যই এ নিরবতা।
“কথা বলতে বলছি না? আবার দিবো নাকি?”, হিস*হিস করে বললো লোকটা।
ফোনের ওপাশে রীতিমতো ঘামছে রায়হান। এটুকু সময়ের মধ্যে কিভাবে কি হলো? বুঝে উঠতে পারছেনা।
বুশরা টু শব্দও করছে না দেখে চুলের মুঠি সজো*রে টেনে ধরলো লোকটা। তাতেও কাজ না হওয়ায় শরীরের সমস্ত শ*ক্তি দিয়ে আরেকটা চ*ড় মারলো বুশরার গালে। না চাইতেও অস্ফুটসরে বুশরার গলা থেকে বেরিয়ে এলো, “মা গো।”
ফোনের ওপাশে রাগে ফুঁসে উঠলো যেনো মানুষটা, “আমার স্ত্রীর গায়ে আরেকটা আচ*ড় পড়লে আমি তোর সাথে কোন নেগো*সিয়েশনে যাবোনা। সাহস কি করে হয় তোর, আমার বউকে উঠানোর? সাহস থাকলে সামনে আয় কুত্তার বাচ্চা।”
“এসব আমাকে বলে তো লাভ নাই মিস্টার শেখ। আপনাকে যেটা করতে বলা হচ্ছে সেটা করেন। নাহলে আপনার বউয়ের লা*শ পাবেন সন্ধ্যা বেলায়। ও হ্যাঁ, জীবন্ত লা*শ। আমি আবার খু*ন খারাবি করি না। বুঝেছেন কি বলেছি?”
খুব বি*শ্রি একটা মুখোভঙ্গি করলো লোকটা।
হুমকিটা অনুমান করা খুব একটা কঠিন না।
রায়হান যথাসম্ভব ঠান্ডা গলায় বললো, “আমি একটু ওর সাথে কথা বলবো।”
“অবশ্যই।”
“লাউডস্পিকার অফ করো।”
“দুঃখিত।”
অনুরোধ করে লাভ নেই শুনে রায়হান আর কথা বাড়ালোনা।
“বুশরা ভয় পেওনা লক্ষিটি। বিকালের মধ্যেই তোমাকে ছাড়িয়ে আনবো আমি। এর জন্য যদি নির্বাচন বাদ দিতে হয় তো চুলায় যাক নির্বাচন। একটু ক*ষ্ট করে অপেক্ষা করো।”
ফুপিয়ে উঠলো বুশরা। ব্যাকুল হয়ে বললো, “এই ভয়টাই তো পাচ্ছি আমি। প্লিজ আমার জন্য এই ভুলটা করো না। কত মানুষ তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে বলো। তাদের প্রতি কি তোমার কোন দায়িত্ব নাই? মাত্র একজনের জন্য তুমি এই কাজটা করো না।”
আকুলতা ছড়িয়ে পড়লো রায়হানের কণ্ঠেও, “বুশরা লিসেন, তুমি তো মাত্র নও। আমার অর্ধেক দ্বীন তুমি, আমার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।”
নিজেকে অপরাধীর চুড়ান্ত আসনে বসিয়ে কা*ন্নায় ভেঙে পড়লো বুশরা।
ফো*পাঁনোর চোটে শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছে বুশরা।
“বুশরা। এই বুশরা। এইই বুশরা। স্বপ্ন দেখছিস মা?”
কোন খারাপ স্বপ্ন দেখছে ভেবে আলতো করে বুশরা মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম ভাঙানোর চেষ্টা করছেন শিউলি বেগম। একটু পরেই চোখ মেলে তাকালো বুশরা। রায়হান বেরিয়ে যাওয়ার পরে হতভম্ব হয়ে বিছানায় বসে পড়েছিল বুশরা। কতক্ষণ ওভাবে বসে ছিল জানেনা ও। জেট ল্যাগের কারনে ঘুমিয়ে পড়েছিল একসময়। আর সেখান থেকেই এইসব অনাসৃষ্টি।
শিউলি বেগমকে দেখে উঠে বসলো বুশরা। অপ*রাধী ভংগীতে বলল, “অনেকক্ষণ ঘুমাইছি?”
“না না, বেশিক্ষণ হইলে তো ডাক দিতাম। খারাপ স্বপ্ন দেখছিস?”
মুখ ছোট করে বুশরা বলল, “হুম। ভোট দিতে যাবা কখন?”
“আমরা তো তৈরি। তোর জন্যই দেরি করছি।”
“আমি যাবো না আম্মা।”
বুশরার এহেন কথায় যারপরনাই বিস্মিত হলেন শেখ গিন্নী।
“ইংল্যান্ড থেকে বাড়ি পর্যন্ত আইস্যা এখন বলো ভো*ট দিতে যাবোনা আম্মা? ঘটনা কি? শরীর খারাপ লাগতেছে?”
মাথা নেড়ে নাবোধক উত্তর দিল বুশরা।
ইতোমধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছে গেছে রুকাইয়াও। বান্ধবীর হাবভাব উদ্ভট লাগছে ওর কাছে।
দুষ্টুমি করে বললো, “এক ভোটের জন্য আমার ভাই যদি হেরে যায়? কি হবে তখন?”
বান্ধবীর কৌতুকে অভিব্যাক্তি একটুও বদলালোনা বুশরার।
মা মেয়ে দুজনেরই কৌতুহলী চোখে তাকিয়ে আছে বুশরার দিকে।
তা দেখে কাচুমাচু করে বুশরা বললো, “খুব বাজে স্বপ্ন দেখছি। আমি ভোট দিতে গেলে যদি স্বপ্ন সত্যি হয়ে যায়?”
এবার হেসে ফেললেন শিউলি বেগম। তারপর কপট রাগ দেখিয়ে বললেন, “শিক্ষিত মাইয়া যদি স্বপ্ন দেখে ভয় পাইয়া ঘরের৷ কোনে পড়ে থাকে কেমোনডা লাগে? আমি আমার ঘরে যাইতেছি। দশ মিনিট সময় দিলাম কইলাম। দুই জন রে এর মধ্যে আমার সামনে দেখবার চাই।”
মা চলে যেতেই বুশরাকে চেপে ধরলো রুকু। স্বপ্নের আদ্যোপান্ত শুনে গম্ভীরমুখে রায় দিলো, “ভোট নেওয়া শুরু হয়ে গেছে আরো অনেকক্ষন আগে। এখন আর প্রত্যাহার করার কোন উপায় নাই। কাজেই বুশরা রাণীকে কিড*ন্যাপ করে কেউ হবু রাজার মুকুট নিয়ে টানা*টানি করবে না মাই ডিয়ার।”
দশ থেকে পনের মিনিটের মধ্যে বান্ধবী ওরফে ভাবীকে নিয়ে নিচতলায় নেমে আসলো রুকু। তারপর সবাই মিলে রওয়ানা দিল ভোটকেন্দ্রের উদ্দেশ্যে।
চলবে…
#ডাক্তার_মিস – সিকুয়েল
#ভালবাসা_বাকি
#ভালবাসা_বাকি_আছে – ১৭
হাসিন রেহেনা
(কপি করা নিষেধ)
নাহ, বিপুল ভোটে জয়ী হয়নি রায়হান। তবে ব্যবধানটা নিতান্তই কমও নয়। সে যাই হোক, রায়হান বিজয়ী, এটাই এই মুহুর্তের বড় খবর। শেখ বাড়ি শুধু না, পুরো স্বাধীনপুর গ্রামেই খুশির আমেজ। প্রথমবারের মত এই গ্রামের কেউ এমপি নির্বাচিত হয়েছে। তাও আবার এত কম বয়সে। খুশির খবর তো বটেই।
তবে যাকে নিয়ে এত খুশির আমেজ বাড়িতে সেই মানুষটাই ভীষণ ব্যাস্ত। এতটাই যে এখনো বাড়িতে আসার ফুরসত মেলেনি তার। অন্যদিন এসময় বাড়ির সবাই খাওয়াদাওয়া করে ঘুমিয়েও পরে। মাঝে মাঝে অবশ্য শিউলি বেগম খাবার নিয়ে ছেলের জন্য অপেক্ষাও করেন। তবে সেটা রায়হানের ভীষণ অপছন্দ। রায়হানের মতে, এই বয়সে অযথা রাত জেগে শরীর খারাপ করায় মানেই হয়না।
তবে আজকের বিষয়টা আলাদা। রুস্তম শেখ পর্যন্ত ছেলের সাথে খাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন। অন্যরাও অপেক্ষা করছে বাড়ির ছেলের ঘরে ফিরে আসার।
অবশেষে অপেক্ষার সমাপ্তি ঘটল রায়হানের হাঁকডাকে,
“মা… ও… মা…। ঘুমিয়ে পড়ছো?”
দুইহাত ভরা মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে উঠানে দেখা দিল রায়হান। পেছন পেছন এসেছে চাচাতো ভাই শাহেদ আর সুজন। ওদেরও হাতভর্তি মিষ্টির প্যাকেট।
ছেলের ডাকাডাকিতে ঘর ছেড়ে উঠানে বেরিয়ে এসেছেন শিউলি বেগম। তার পিছুপিছু বুশরা আর রুকাইয়াও।
রায়হান মিষ্টির প্যাকেটগুলো বুশরা আর রুকুর হাতে দিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরলো। আনন্দে চোখে জল রায়হান জননীর।
“বেঁচে থাক, বাবা।“
রায়হানের হাতের মিষ্টির প্যাকেট তো তিনি আগেই দেখেছিলেন। কিন্তু শাহেদ আর সুজনের হাতের প্যাকেটগুলো দেখে তার মাথায় হাত।
“এত মিষ্টি? কে খাবে শুনি?”
“এত কোথায় আম্মা? মিষ্টির দোকানই তো খোলা পাইলাম না। কাল সকালে ভালো মিষ্টি আনবো।“
রুকু হেসে বললো, “ভাইয়া তুমি কি এমপি হইছো? নাকি মিষ্টির ডিলার বলো তো।“
“তবে রে?”, রায়হান তেড়ে আসবে তার আগেই সেখানে হাজির হলেন ওদের বাবা রুস্তম শেখ।
ছেলের অপেক্ষা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন তিনি। সবার হইহই শুনে চোখ ডলতে ডলতে উঠে এসেছেন। আর এসেই পড়েছেন ভাই বোনের ঝগড়া বিবাদের মাহেন্দ্রক্ষণে।
বাবাকে দেখে যুদ্ধে নামার আগেই বিরতি নিল রায়হান। রুকু ইশারায় চোখ পাকালো। তবে সেপর্যন্তই। বাবার সামনে ভাল ছেলে/মেয়ের তকমা হারানোর ইচ্ছা নাই দুজনের কারোরই।
বাবার পা ছুঁয়ে দোয়া নিতে সচেষ্ট হতেই হাত তুলে ছেলেকে থামিয়ে দিলেন রুস্তম শেখ।
“পায়ে হাত দিয়ে সালাম করা যে শরীয়তসম্মত নয় তা কি তোমাকে শিখাইনি, আব্বা?”
অতিরিক্ত উদ্দীপণায় এত গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় ভুলে যাওয়ায় লজ্জায় মাথা নিচু করলো রায়হান।
ঠিক স্কুলে থাকতে কোন ভুল করলে যেমন করতো। সন্তান যত বড়ই হোক, বাবা মায়ের সামনে বোধহয় সারাজীবন সেই বাচ্চাটাই রয়ে যায়।
শাসনের খোলস ছেড়ে ছেলেকে বুকে টেনে নিলেন বয়োবৃদ্ধ মানুষটা।
“তোমাকে নিয়ে গর্বে আমার বুক ভরে যায়, আব্বা। আর সেই গর্ব আইজকে শতগুন বেড়ে গেছে। অনেক বড় হও জীবনে, এই দোয়া করি। আর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সৎ থাইকো। আব্বা হিসাবে বলো বা তোমার এলাকার এক সাধারন মানুষ হিসাবেই বলো, এইটা আমার একান্ত চাওয়া তোমার কাছে।“
বাবা মানুষটা এজন্যই বোধহয় রায়হানের কাছে আদর্শ। ভোটের ফল প্রকাশের পর থেকে অগণিত শুভকামনা পেয়েছে রায়হান। হোক সেটা ফোনে, বা সামনাসামনি। কিন্তু যে গুরুদায়িত্ব নিতে চলেছে তার ভার স্বরণ করে দেয়নি কেউই। আর এখানেই এই মানুষটা অন্যদের চেয়ে আলাদা।
*************************************************************************
রাতে খাওয়া শেষে নিজেদের ঘরে আসলো রায়হান আর বুশরা। অবশেষে স্বামীকে একান্তে পেয়ে বুশরা বললো,
“কনগ্র্যাচুলেশন্স, ডিয়ার হাজব্যান্ড।“
“যেটুকু ভোটের ব্যাবধানে জিতেছি তা কি সবার এত এপ্রিশিয়েশন পাওয়ার যোগ্য?”
কিছুটা সিরিয়াসভাবেই সহধর্মীনিকে প্রশ্নটা করলো রায়হান। অনেক অনেক শুভকামনা পেলেও রায়হানের মনের মধ্যে প্রশ্নটা খচখচ করছিল। অন্য সবার কাছে যত খুশিই দেখাক জীবনসঙ্গীর কাছে বোধহয় কেউ মনের আড়াল রাখতে চায়না। আর এখানেই বুঝি স্বামীস্ত্রীর সম্পর্কের বিশেষত্ব।
মৃদু হেসে বুশরা বললো, “ব্যাবধান যাই হোক, মেজরিটি কিন্তু তোমাকেই চেয়েছে। আর যারা চায়নি তারা হয়ত ইয়ং কারো হাতে দায়িত্ব দেওয়ার ভরসা করতে পারে নি। তাই না?”
“হয়ত।“
“তো যারা তোমাকে ভরসা করে ভোট দিয়েছে, বা ভরসা করতে পারেনি দেখে ভোট দেয়নি, অনাগত সময়ে দুটো গ্রুপকেই দেখিয়ে দাও যে তুমি ভরসার যোগ্য। আর এখানেই তোমার নিজেকে প্রমাণ করার চ্যালেঞ্জ।“
“হুম।“, এভাবেও যে চিন্তা করা যায় ভাবে নি রায়হান। আর এজন্যই বোধহয় স্বামী স্ত্রী একে অপরের পরিপূরক।
“এন্ড আই বিলিভ ইন ইওর প্যাশন ফর পিপল। এজন্যই তো ভোট দিলাম। বুঝছো?“
এই বলে মিষ্টি হাসলো বুশরা। স্ত্রীর কথায় রায়হানের মনের অযাচিত গুমোট ভাবটা কেটে গেল।
দুষ্টুমির মুড ফিরে এসেছে রায়হানের। হাসি হাসি মুখ করে বলল, “ও তাই? কিন্তু আমি যে গোপন সূত্রে খবর পেলাম, আমার বউকে নাকি ধরে বেঁধে ভোট দিতে নেওয়া লেগেছে?”
সলজ্জ কন্ঠে বুশরা বললো, “তা সেটা আপনার কানেও চলে এসেছে?”
আর বিড়বিড় করে বললো, “ঘসেটি বেগম, সকাল হোক তোমার দেখাচ্ছি মজা!“
কপট সিরিয়াস মুডে রায়হান বলল, “আমি কিন্ত শুনতে পাচ্ছি। শুধু শুধু আমার নিষ্পাপ বোনটাকে বকছো। আম্মার কাছে শুনলাম। পাগলী…”, এই বলে হাসলো রায়হান।
“আম্মা?”
“আচ্ছা বাদ দাওনা। আসো ঘুমাই। আমার আবার সকালে বের হওয়া লাগবে।“
বালিশে মাথা রেখে মৃদুস্বরে বুশরা বললো, “আচ্ছা, তুমি কি অনেক ব্যস্ত হয়ে যাবে?
ছোট্ট এটুকুন কথার মাঝে আটকে থাকা অনুভূতির জলোচ্ছাস ছুঁয়ে গেল রায়হানকেও। আলতো করে বুশরার মাথাটা বুকের কাছে টেনে নিয়ে বললো, “আমাকে কি কখনো কম ব্যস্ত পেয়েছ? সব সময়ই তো মেনে নিয়েছো। তোমার যায়গায় অন্য কেউ বউ হলে তো…”
কথাটা শেষ করতে পারল না রায়হান। অভিমানেরা উপচে পড়লো বুশরার চোখের কোলে, “অন্য কারো কথা আসছে কেন শুনি? সোজাসাপটা উত্তর দিলেই হয়।”
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে রায়হান বললো, “ব্যস্ততা তো একটু বাড়বে, বউ। কিন্তু পরিবারের জন্য, প্রিয় মানুষের জন্য সময় থাকবে না এমন দিন কখনো আসবে না, ইনশাআল্লাহ।“
রায়হানের কন্ঠে বউ শব্দটা শুনতে বড় ভালো লাগে বুশরার। নিজেকে সামলে বললো, “কখনো বদলে যেও না কেমন?”
**************************************************************************
এর পরের কয়েকটা দিন কেটে গেল রায়হানের, ভীষণ ব্যাস্ততায়। সকাল থেকে সন্ধ্যা, বা কখনো বেশ রাত পর্যন্ত বাহিরে থেকেছে ও। তবে ব্যস্ততার মধ্যেও মনের কোনে সবসময় ডানা ঝাপটেছে অন্য রকম এক অনুভূতি। পরিচিত গৃহকোনে কেউ একজন অধীর অপেক্ষায় বসে আছে তার। যে কিনা মাত্র কয়েকটা দিন বাকি আছে দেখেও ধৈর্যচ্যুত হয়না। আজকের দিনে এমন স্ত্রীভাগ্য হয় কয় জনের?
ওদিকে বুশরার সময় কাটে শিউলি বেগমের সাথে গল্পগুজব করে। রুকুটাও দুই দিনের জন্য ঢাকায় গেছে। কি নাকি ইম্পরট্যান্ট কাজ আছে। অলস দিনগুলোতে অবশ্য ভিন্ন মাত্রা আনছে বুশরার আশেপাশের পাড়া কিংবা গ্রাম থেকে আসা শুভাকাঙ্খিরা। এই মানুষগুলোর কাছে বুশরা মানে চেয়ারম্যানের বউ না এমপির বউ না। তাদের কাছে বুশরা মানে ডাক্তার আপা, অন্যরকম এক ভালবাসার নাম।
তাইতো ডাক্তার আপা এসেছে জানতে পেরে সাথে নিয়ে এসেছে নিজেদের গাছের পেয়ারা, আমলকি, লাউশাক, পুইশাক থেকে শুরু করে নিজেদের পুকুরের ছোট বড় মাছও। এক জীবনে ভালবাসার এইসব বস্তুগত রূপ দেখতে দেখতে সময় খারাপ কাটছে না বুশরার। তবু মনের গহীনে এক নিরন্তর অপেক্ষার জাল বোনা, আর ছুটি শেষ হয়ে আসার দীর্ঘশ্বাস।
তবু দিনশেষে রায়হান এই অনাকাঙ্খিত দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে বুশরা। মানুষটা এমনিতেই ভীষণ ব্যাস্ত। আর এমনটা হবে জেনেই তো এসেছিল ও। তবে কেন বৃথা অভিমানে মুহুর্তগুলো নষ্ট করা?
এই তো সন্ধ্যার পরে মানুষটা যখন ফোন করে জিজ্ঞাসা করলো, “বুশরা আমাকে একটা ঘুমের ওষুধ প্রেসক্রাইব করতে পারো? যাতে রাতে ঘুমটা ভাল হয়, আর সকালে ঝরঝরে লাগে।“
শুনে এত মায়া লাগলো বুশরার। আর মাত্র দুইটা দিন। তার পর আর দিনশেষে ক্লান্ত মানুষটা ঘরে ফেরার অপেক্ষায় থাকতে পারবে না বহুদিন।
************************************************************************
নাম না জানা পাখির কিচিরমিচিরে ঘুম ভাংলো বুশরার। জানালার শিফন কাপড়ের পাতলা পর্দা তিরতির করে কাঁপছে মৃদুমন্দ বাতাসে। পর্দার ফাঁক গলে সকালের মিষ্টি রোদ ছুঁয়ে যাচ্ছে বুশরার কপাল, গাল, চোখ, শরীরের বাঁক। দমকা হাওয়ায় পর্দা সরে যেতেই ওর চোখে পড়লো সবুজ পাহাড় আর আদিগন্ত বিস্তৃত পানি আর পানি। আর পাহাড়গুলো স্থির না বরং, হালকা দুলছে বলে মনে হচ্ছে বুশরার কাছে। একটু কি সরে সরে যাচ্ছে? এমন অদ্ভুত সুন্দর পরিবেশ কি বাস্তব? নাকি স্বপ্ন? বুঝতে পারছে না বুশরা।
কাঠরঙ্গা ঘরটার দেয়াল বেয়ে আঁকড়ে থাকা মানিপ্ল্যান্ট আর জানালার বাহিরে সবুজ পাহাড়ের রাজত্ব বলছে এটা বাস্তব। স্বপ্ন তো এত রঙ্গিন হয়না। উঠে বসার চেষ্টা করতেই টের পেল পেছন থেকে কোমর জড়িয়ে থাকা একটা শক্ত পুরুষালি হাত। যে হাত ভালবাসার, ভরসার। চিন্তা ভাবনা দূরে ঠেলে শুয়ে থাকা অবস্থাতেই এক হাতে জানালার পর্দা সরিয়ে দিল বুশরা। মুহুর্তটা যদি স্বপ্নও হয় ক্ষতি কি?
#ডাক্তার_মিস – সিকুয়েল
#ভালবাসা_বাকি
চলবে?