ভালোবাসতে চাই পর্ব-১৫

0
878

#ভালোবাসতে_চাই
#পর্বঃ১৫
#ফারজানা_আক্তার

শিশির হটাৎ ফট করে রিক্তাকে টানতে টানতে নিয়ে আসে সেখান থেকে,, স্নেহা আর নিবিড় (স্নেহার স্বামী) শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শিশির যাওয়ার আগে নিবিড়ের দিকে তাকিয়ে বলে যায় “জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটা এভাবে পিছুটান হয়ে থেকে যাবে,ভাবনার বাহিরে ছিলো,, দোয়া একটাই যেখানে থাকিস ভালো থাকিস।” স্নেহা হাত বাড়িয়ে রিক্তাকে ধরতে চেয়েও ধরলোনা, শিশিরের চোখে চোখ রাখতে পারছেনা স্নেহা, কিন্তু নিবিড় স্বাভাবিক হলেও স্নেহা বেশ চিন্তিত হয়ে গেলো।

শিশিরের এই কথার আগামাথা কিছুই বুঝেনি রিক্তা,, শুধুই অবাক হচ্ছে।
শিশির রিক্তাকে নিয়ে সোজা রুমে চলে আসে, মুডটাই নষ্ট করে দিলো। ঢকঢক করে ৩গ্লাস পানি একসাথে খেয়ে সোফায় বসে পরে শিশির।

~আপনি আমাকে এভাবে নিয়ে আসলেন কেন?
কোমরে হাত রেখে শিশিরের সামনে দাঁড়িয়ে বলে রিক্তা।
~কেন? কি হয় ওরা তোমার?
রাগে গটগট করে বলে শিশির।
~তা আপনাকে বলবো কেন?
ভাব নিয়ে বলে রিক্তা।
~কেনো? নিবিড় কি তোমার আশিক হয় নাকি?
দাঁতে দাঁত চেপে রাগান্বিত কন্ঠে বলে শিশির।
ভরকে যায় রিক্তা,
~ন নি নিবিড় কে?
কিছুটা থেমে থেমে বলে রিক্তা।
~যার স্ত্রী কে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরেছো সে।
~ও, আরে ওটা তো স্নেহার স্বামী,, আপনিও নাহ, ভয় পাইয়ে দিলেন আমায়।
কিছুটা হাসির অভিনয় করে বলে রিক্তা।

শিশির অবাক হয়, স্নেহাকে রিক্তা চিনলো কিভাবে? কি হয় স্নেহা রিক্তার? তবে কি? নাহ ভাবতে পারছিনা আর আমি, মাথা ব্যাথা করছে প্রচুর, এক কাপ লেবু চা হলে মন্দ হয় না। সাথে সাথেই এক সার্ভেন্টকে কল দিয়ে ২কাপ লেবু চা আনায় শিশির।

এইদিকে রিক্তা বকবক করতেই আছে, নিজের চায়ে চুমুক দিয়ে শিশির বলে “চা খেয়ে নাও, ভালো লাগবে?
~খারাপ কখন লেগেছে?
~ত্যারামি না করে খেয়ে নাও।
~খাবোনা
মুখ গোমড়া করে অভিমানের সুরে বলে রিক্তা। শিশির পাত্তা না দিয়ে চা খেতেই আছে।৷ বিরক্ত হচ্ছে রিক্তা, উনি কথা অর্ধেক রেখে এভাবে বিরতি কেনো নিলেন? চা খেতে খেতেও তো কথা বলা যায়, ধুর ভাল্লাগে না।

শিশির খেয়াল করে রিক্তা যে ছটফট করে, কিন্তু এড়িয়ে যায় শিশির,, মাথা ব্যাথা করছে খুব তাই চুপচাপ চা খেতেই আছে।

রিক্তা বিরক্ত হয়ে বেলকনিতে চলে যায়, লেবু চা বিষের মতো লাগে রিক্তার।

কীভাবে বুঝায় তোমাকে? এই কারণেই আসতে চায়নি এই দেশে, ওদের সাথে দেখা হলে যে পুরোনো ক্ষত কাঁচা হবে, ঠিক জানতাম আমি। কিন্তু স্নেহা আর নিবিড় আমাদের হোটেলের সামনে কেন? ওরা কি আবারো কিছু উল্টাপাল্টা করতে চাই? নাকি এখানে আশেপাশেই থাকে ওরা দুজন, নিবিড়ের কোলে তো একটা দেড়বছরের বাচ্চাও দেখলাম, তবে কি স্নেহা মা হয়ে গেছে? কীভাবে পারে মানুষ এতো ধোঁকাবাজ হতে?
এসব বিড়বিড় করছিলো শিশির, চোখগুলো ঝাপসা হয়ে আসছে শিশিরের, বেলকনি থেকে উঁকি দিয়ে সব দেখে রিক্তা।

রিক্তা আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবতে থাকে ” তবে স্নেহা আমার শিশিরের অতীত? কীভাবে মেনে নিবো এটা?

পেটে কারো ঠান্ডা হাতের স্পর্শ পেয়ে চমকে উঠে রিক্তা,
~আরে রিলাক্স, আমিই তো
~চা খাওয়া শেষ আপনার?
অভিমানের সুরে বলে রিক্তা, শিশির রিক্তার ঘারে থুতনি রেখে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে নেই রিক্তাকে, রিক্তা ছটপট করতে থাকে, বেশ অভিমান হচ্ছে শিশিরের উপর।

~এভাবে ছটপট করছো কেনো?
~ছাড়ুন আমায়,, কোনো কথা নেই আর আপনার সাথে।
~হঠাৎ রাগের কারণটা কি?
~কিছুনা?
~বেশি করতেছো কিন্তু
~তো?

তো আমার মিষ্টি খেতে বড় ইচ্ছে করছে,, রিক্তার ঠোঁটে আঙ্গুল রেখে বলে শিশির, রিক্তার মুখটা রাগ ভুলে লজ্জায় লাল হয়ে যায়। রিক্তা সামনে তাকাতেই দেখে সামনের বিল্ডিংয়ের বেলকনিতে তাদের মুখোমুখি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে স্নেহা আর নিবিড়, কোলে সেই ছোট্ট বাচ্চাটি।

রিক্তাকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে শিশিরও তাকায়,, লাল হয়ে যায় শিশিরের চোখদুটো। রিক্তাকে রুমে ঢুকিয়ে ঠাস করে দরজা বন্ধ করে দেয় বেলকনির, রিক্তা কিছু বুঝে উঠতে পারেনা,
নিবিড় স্নেহাকে বলে “দেখো তিন বছরেও চেঞ্জ হয়নি শিশির, আর তুমি বলছো এই পাষানের কাছে ক্ষমা চাইতাম আমি, কখনোই নাহ।

~পাষান শিশির নয়, পাষান তুমি।
ঝাঁঝালো গলায় বলে স্নেহা।
~কী? শিশিরের জন্য আবারো তুমি আমার সাথে উঁচু গলায় কথা বলছো কিন্তু।
~একবার নয় হাজারবার বলবো, তোমার পাপের শাস্তি কেন আমি আর আমার ছেলে পাবো?
~কিসের পাপ হ্যাঁ,? কোনো পাপ করিনি আমি। এতই যখন দরদ উতলায় পরতেছে তো যাওনা পুরোনো সেই আশিকের কাছে।
~ধুর তোমার সাথে কথা বলাটাই বেকার।
এটা বলেই স্নেহা চলে যায় গটগট করে,, নিবিড় চিল্লিয়ে বলে ” কেনো আসলি তুই আবারো আমার সামনে? কেনো? শিশির নামটা ভুলতে চাই আমি, জাস্ট ভুলতে চাই।।
কানে হাত দিয়ে চিল্লিয়ে চিল্লিয়ে বলে নিবিড় কথাগুলো।



আরে আপনি এভাবে কাপড় গুছাচ্ছেন কেন? মাত্র কালকেই তো আসলাম আর আজকেই চলে যাবো,
কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বলে রিক্তা।
শিশির কিছু না বলে নিজের আর রিক্তার কাপড় সব গুছিয়ে নেই,,
~আপনাকে কিছু বলছি আমি আপনার কানে কি যাচ্ছেনা?
কিছুটা চিল্লিয়ে বলে রিক্তা কথাটি,, শিশির ফট করে রিক্তাকে দেওয়ালের সাথে চেপে ধরে আর বলে “আর একটা কথা যদি বলো তবে এখানে একা রেখেই চলে যাবো।। ভরকে যায় রিক্তা।
হোটেলের ম্যানেজার শিশির কে কি যেন হিসেব দিচ্ছিলো যাওয়ার আগে,, আর কিছু টাকাও দিলো শিশিরের হাতে। রিক্তা চুপচাপ শিশিরের পেঁছনে দাঁড়িয়ে সব শুনতে লাগে আর ভাবে টাকা তো আমাদের দেওয়ার কথা তবে ম্যানেজার উনাকে টাকা দিচ্ছেন কেন? কোনো তো রহস্য আছে, প্রথমে স্নেহা আর নিবিড় ভাইয়ার কাহিনী আর এখন এই চমক। কিছু তো লুকাচ্ছে উনি আমার কাছে,, তবে কি? আর কেনই বা উনি বলছেন না আমায়, আমার মন খারাপ হয়ে যাবে বলে? নাকি অন্যকিছু…..



গাড়িতে দুজন বসে আছে পাশাপাশি, কারো মুখে কোনো কথা নেই। হঠাৎ রিক্তা বলে উঠলো “কাহিনি কি?
~কিসের কাহিনি?
ভ্রু কুঁচকে বলে শিশির।
~ম্যানেজার আপনাকে এতকিছু কিসের হিসেব দিলো, আর টাকাও দিলো দেখলাম?
শিশির ভ্রু কুঁচকে তাকায় রিক্তার দিকে, রিক্তা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে শিশিরের দিকে।
~তুমি এতোকিছু জেনে কি করবে?
~কেন? এইটুকু জানার অধিকার নেই বুঝি আমার?
আদুরে সুরে বলে রিক্তা, কারণ সে জানে এভাবে বললে শিশির আর না বলে পারবেনা।
~কারণ হোটেলটা আমাদের।।
বলেই শিশির অন্যদিকে তাকালো। রিক্তা অবাক হয়ে ভাবতে লাগলো, তবে এই কারণেই এতোকিছু এতো আয়োজন,, বাহ্ তবে তো আমরা প্রতিমাসে আসবো হিসেবও নিয়ে যাবো আর ঘুরতেও পারবো।

~এই কারণেই তোমাকে বলতে চায়নি,, হিসেব নিতে এই যুগে আর এখানে আসা লাগেনা, ফোনে সব হিসেব নিয়ে নি আমি। আর হোটেলটা আমার নামে।
~আসলে কি হবে?
করুণ সুরে বলে রিক্তা।
~সব বলবো, আগে দেশে চলো।

~একটা কথা বলি?
আমতাআমতা করে বলে রিক্তা।
~হুম বলো।
বলেই গাড়ির সিটের সাথে গা ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে শিশির।
~স্নেহা আর নিবিড় ভাইয়া কি আপনার পূর্ব পরিচিত?
শিশির ফট করে চোখ খুলে রিক্তার দিকে রাগান্বিত নজরে তাকায়
~বলছি তো দেশে ফিরে বলবো।
~এভাবে রেগে যাচ্ছেন কেন? সব কথা কি চিল্লিয়ে বলতে হয়? আজব।।। ড্রাইভার কি বলবে?
~তো তুমি কথা বাড়াও কেন? সারাক্ষণ পেনপেন

রিক্তার চোখে পানি চলে আসে, সে অন্যদিকে তাকিয়ে চুপিচুপি কাঁদতে থাকে, চোখ এড়ালো না শিশিরের।



প্লেনে আর কেউ কারো সাথে কথা বলল না, প্লেন থেকে নেমে অবাক রিক্তা, এটা তো বাংলাদেশ না, তবে কোথায় এসেছি আমরা? কিন্তু রাগের ঠেলায় শিশিরকেও কিছু জিজ্ঞেস করতে পারছেনা রিক্তা।
~এতো চিন্তার কিছু নেই, আমরা এখন প্যারিসে আছি।
চমকে উঠে রিক্তা শিশিরের কথা শুনে, উনি আমার মনের কথা কিভাবে বুঝলো।
শিশির হাঁটতে লাগলো কিন্তু রিক্তা শিশিরের পেঁছনে না গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, শিশির ডাক দেয়
~রিক্তা আসো।
~যাবোনা আমি আপনার সাথে আর কোথাও।
এটা বলেই রিক্তা উল্টোদিকে হাঁটতে লাগলো। শিশির চিন্তায় পরে গেলো, এই অচেনা দেশে মেয়েটা যাবে কোথায় এখন।।।।

#চলবে।