ভালোবাসার ফোড়ন ২ পর্ব-১০+১১

0
1007

#ভালোবাসার_ফোড়ন_২
#মিমি_মুসকান
#পর্ব_১০

বেশ কয়কদিন হলো নিতি ওরা এখন আর আমাকে কিছু বলছে না।‌ যাক বাবা বেঁচে গেছি। কিছু না বলাটাই স্বাভাবিক কারন আমি এখন আর তাদের কারো সাথে কথা বলি না। বিশেষ নজর রাখি যেখানে তারা আছে সেখানে আমার ছায়া যাতে না পরে।

মিতু আপু আর মুন্নি আপুর মাঝে ইদানিং বেশ দ্বন্দ্ব চলছে বলে আমার ধারণা। কয়েকদিন ধরেই মিতু আপু বাসায় আগে চলে আসেন। অতঃপর মুন্নি আপু। তাও অনেক দেরি করে আর প্রত্যেকবার এক কথা বাইরে থেকে খেয়ে এসেছি। বেশ বোঝা যাচ্ছে কিছু একটা হয়েছে। কিন্তু বিষয় টা কি হতে পারে কোন ছেলে। জিজ্ঞেস করেছিলাম আপু কে। সে বলল,
“মুন্নি আপু নাকি কোন বাজে ছেলের খপ্পরে পড়েছে। ছেলেটা কে মিতু আপুর কাছে মোটেও সুবিধার মনে হচ্ছে না। কিন্তু মুন্নি আপু সেটা মানতে নারাজ। এই নিয়েই দুই বোনের মাঝে বিরোধিতা।

রিনু’র আম্মু বেতন দিয়েছে আজ। বাসায় গিয়ে পরিক্ষার টাকা আলাদা করে রাখতে হবে।
অর্ণ নামের ছেলেটিকে যতটা দুষ্টু ভেবেছিলাম সে আসলে ততোটা নয় এটা আমার ধারানা, কারন আমার কাছে এমন কিছুই করেনি ও। আমাকে যতটুকু পড়া দেই সেটাই কমপ্লিট করে রাখে সে! এটার কারন কি? জিজ্ঞেস করতে হবে একদিন। হ্যাঁ জিজ্ঞেস না করলে জানবো কিভাবে?

অর্ণ কে আজ পড়িয়ে বের হতে হতে চারদিকে খুটখুটে অন্ধকার লাগছে। আজ যেন একটু বেশিই অন্ধকার চারদিক।
আমি এক পা এক পা করে হাঁটছি। কাঁধের ব্যাগ টা খুব শক্ত করে ধরে রেখেছি। মন বলছে কিছু একটা খারাপ হবে। আবার নাও হতে পারে। কিন্তু হবার সম্ভাবনা বেশি।

মেইন রোড পেরিয়ে এখন সরু গলি টায় ঢুকেছি। এর প্রথমেও কোন আলো নেই আর না আছে শেষে। শুধু মাঝে একটা ল্যাম্পপোস্ট। আশপাশ বিল্ডিং ছাড়া কিছুই নেই। কোনদিন’ই এখানে মানুষের আনাগোনা দেখি না, যদি থাকে তো কুকুর আর বিড়াল। আর সেগুলোও কি ভয়ানক। কি ভয়ংকর ভাবে ডাকে কুকুর। শরীর শিউরে উঠে একদম।
কিন্তু আজ! আজ মনে হচ্ছে এই গলি তে কারা আছে। ৪,৫ জন হবে। দূরে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছে তারা আর বিশ্রি বিশ্রি কথা বলছে। তাদের ক্রশ করেই যেতে হবে আমাকে। আমি তাদের সামনে দিয়ে যেতেই একটা ছেলে সিগারেট’র ধোঁয়া আমার মুখে দিকে মারল। আমি কাশতে কাশতে এসে ল্যাম্পপোস্ট টার সামনে দাঁড়ালাম। অতঃপর হাঁটতে লাগলাম।

হঠাৎ মনে হতে লাগল তারা আমার পিছু পিছু হাঁটছে।‌ভয় লাগতে শুরু হলো আমার। এর সামনে একটা রাস্তা কিন্তু সেই রাস্তায় কখনো মানুষ জন থাকে। দুই পাশে খেলার মাঠ যেন গাছপালার ঝোপঝাড়ে ভর্তি। এসব কথা ভাবতেই বুক টা মোচড় দিয়ে উঠলো। আমি উড়না আর ব্যাগ টা কে শক্ত করে ধরে হাঁটতে লাগলাম। জোরে জোরে হাঁটছি, তারাও জোরে জোরে হাঁটছে। এখন তো সত্যি মনে হচ্ছে তারা আমার পিছু পিছু আসছে। আমি দ্রুত হেঁটে সরু গলি টা থেকে বার হতে যাবো তখন হুট করেই একটা ছেলে দৌড়ে আমার সামনে এসে দাঁড়াল। আমি ভয় পেয়ে গেলাম।

কাঁপা কাঁপা গলায় বলি,
“আমাকে যেতে দিন।

“যাবেন!

শক্ত গলায় বলি,
“রাস্তা থেকে সরে দাঁড়ান!

পেছন থেকে একটা ছেলে এসে আমার সামনের ছেলেটা কে সরিয়ে বলে,
“এই এই যেতে দে আফা কে। আফা যান আপনি!

ছেলেটার দিকে একবার তাকিয়ে সামনে হাঁটা ধরতে যাবো তখন মনে হলো একটা ছেলে আমার উড়না ধরে টানল। আমি ভয়ে স্থির হয়ে গেলাম। পিছনে ঘুরে বলি,

“উড়না ছাড়ুন।

“ধরতেই তো পারলাম না ছাড়বো কিভাবে বলো?

“দেখুন আমি কিন্তু চিৎকার করবো।

“করো! আমি তো মানা করি না।

“মাইক লাগলে বলো এনে দেবো।

বলেই সবগুলো ছেলে জোর জোরে হাসতে লাগলো। হঠাৎ মনে হলো ছেলেটা আমার উড়না ধরে টানছে। আমি উড়নাটাকে শক্ত করে ধরে টান দিলাম। অতঃপর ছুটতে লাগলাম। তারাও দৌড়াচ্ছে আমার পিছু পিছু। সামনে তাকিয়ে দেখি যা ভেবেছি তাই, পুরো রাস্তা খালি। আমি তবুও নিজের সর্বস্ব দিয়ে দৌড়াতে থাকি।

হুট করেই সামনে কিছু দেখতে পাই। একটা আইসক্রিম’র দোকান খোলা। তার সামনে একটা গাড়ি ও আছে। আমি দৌড়াতে দৌড়াতে পিছনে তাকিয়ে দেখি ছেলে গুলো কে আর দেখা যাচ্ছে না। থেমে যাই সেই আইসক্রিম দোকানের সামনে। দোকানের বাহিরে আলো দিয়ে ডেকোরেট করা, আলো জ্বলছে। দোকান টা হয়তো নতুন। আমি কারো আসার শব্দ পেলাম। ভাবলাম সামনে এখন দৌড়িয়ে লাভ নেই। সরু গলি আবার পড়বে তখন ছেলে গুলো ধরে ফেললে। এখন’ই কিছু করতে হবে।

আমি এসে চট করে গাড়ির এপাশে দাঁড়িয়ে পড়লাম। আর উঁকি দিয়ে দেখতে লাগলাম। ছেলে গুলো এসে পড়েছে।‌ আমার ধারনা ছিল তারা ভাববে হয়তো আমি আইসক্রিম’র দোকানের ভিতর চলে যাবো। একজন সেটা বলেও উঠল। কিন্তু আরেকজন বলল,
“দোকানের ভিতর গেলে এতোক্ষণে মানুষ এসে বাইরে ভীড় জমিয়ে দেবার কথা। তেমন কিছু হয় নি। তার মানে সে এখানেই আছে। খুঁজো তাকে।

তার কথা মতো কিছু ছেলে সামনে আগাতে লাগল। বাকি ছেলে গুলো এপাশে ওপাশে খুঁজছে। ছেলে গুলো গাড়ির চারপাশে আসছে। আমি গাড়িটার এপাশ থেকে ওপাশে যেতে লাগলাম। হঠাৎ মনে হলো আমার পিছনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে।‌ আমি ভয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম। বড় বড় শ্বাস নিতে লাগলাম। শুকনো ঢোক গিলে পেছনে ফিরলাম। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছি।

মাথা উঁচু করে উপরের দিকে তাকাতেই থমকে গেলাম। এ তো আহিয়ান! সে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আমি তার থেকে একটু ঝুঁকে পেছনে তাকালাম। দেখি ছেলে গুলো দাঁড়িয়ে আমার দিকেই তাকিয়ে আছে। তাদের দেখে ভয়ে আমি এক পা পিছিয়ে গেলাম। আহিয়ান ভ্রু কুঁচকে আমার দিকে তাকাল। অতঃপর পেছনে তাকাল। ছেলে গুলো তাকে দেখে জড়ো হলো।

হঠাৎ উনি আমার হাত ধরল। অতঃপর গাড়ির দরজা টা খুলে বলল,

“গাড়িতে বসো!

আমি হা হয়ে উনার দিকে তাকিয়ে আছি। উনি আবারো বলল,

“এতো দেরি হলো কেন তোমার,‌কখন থেকে অপেক্ষা করছি তোমার জানো! দ্রুত বসো বাসায় যেতে হবে।

বলেই আমাকে জোর করে গাড়িতে বসানোর চেষ্টা করল। আমি পেছনে তাকিয়ে দেখছি ছেলে গুলো চলে যাচ্ছে। আমি উনার দিকে তাকালাম। উনি চোঁখের ইশারায় আমাকে ভিতরে বসতে বলল।

আমি ভিতরে চুপচাপ বসে পড়লাম। খুব শক্ত করে সিট আঁকড়ে ধরে বসে আছি।‌ পুরো শরীর কাঁপছে আমার, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে। উনি এসে আমার পাশের সিট মানে ড্রাইভিং সিট এ বসলেন। অতঃপর নিজের সিটবেল বেঁধে দিল আমার দিকে পানির বোতল দিলেন। আমি উনার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে বোতল টা নিতে গেলাম। হুট করে উনি বোতল টা নিজের কাছে নিয়ে পানি খেয়ে আমার দিকে ধরলেন। আমি কিছুটা অবাক হলাম। অতঃপর পানি নিয়ে খেতে লাগলাম।

হঠাৎ উনি বলে উঠলেন,
“এরা কারা চিনো তুমি!

একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম। তার আওয়াজে লাফিয়ে উঠে জিজ্ঞেস করি,
“কককি?

উনি আমার হাত থেকে বোতল টা নিয়ে বললেন,
“বললাম এই ছেলে গুলো কে চিনো

“না

“এতো রাতে এই নির্জন গলিতে কি করছো তাও একা একা!

“ককিছু না!

উনি আমার দিক থেকে চোখ সরিয়ে সামনের দিকে তাকালেন। অতঃপর বললেন,
“সিট বেল বাঁধ!

“হুম!

“বলছি সিট বেল্ট বাঁধ,‌সিট বেল্ট।

আমি সিটের দু পাশে খোঁজা খুঁজি করতে থাকি। উনি আমাকে ডেকে নিজের সিট বেল্ট খুলে দেখিয়ে বলেন,
“তোমার সিটের দু পাশে এমন বেল্ট আছে, এগুলো এভাবে আটকিয়ে দেও বুঝলে।

আমি উনার টা দেখে নিজের সিট বেল্ট বাঁধলাম। উনি গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বললেন,
“সামনে তোমার বাসা তো

( আমি মাথা নাড়লাম)

উনি গাড়ি চালাতে শুরু করলেন। আমি এখনো নিশ্চুপ, গম্ভীর। ভয় এখনো কাটে নি আমার। সবকিছু দুঃস্বপ্ন’র মতো লাগছে আমার কাছে। শুধু ভাবছি যদি আজ কিছু হয়ে যেত। তারা যদি উল্টোপাল্টা কিছু করে আমাকে মেরে ফেলে রেখে যেত তখন কি হতো। আমাকে তো এখানকার কেউই চিনে না। পুলিশের কাছে বেওয়ারিশ লাশ নামে পড়ে থাকতো। একটা কেস হতো, ভাগ্য ভালো হলো খোঁজ পাওয়া যেত নাহলে তারা ফাইল বন্ধ করে দিত। ক্লোজ হয়ে যেত আমার চাপ্টার!

এসব ভাবতে ভাবতে বার বার আমার শরীর শিউরে উঠছে,‌ কি না কি হতে পারতো। হঠাৎ উনার গলায় আওয়াজ পেলাম। হ্যাঁ উনি ডেকেছেন আমায়। আমি উনার দিকে ফিরলাম। চোখ সামনে রেখেই উনি বললেন,

“নিহা!

“হুম।

“তোমার নাম নিহা তো ঠিক বললাম।

“হুম।

“আইসক্রিম খাবে।

“না।

উনি একহাত দিয়ে পেছনের সিট থেকে একটা আইসক্রিম বের করে আমার হাতে দিয়ে বললেন,
“খাও আজ এই আইসক্রিম’র জন্য’ই বেঁচে গেছো তুমি। আমি তো শুধু ইয়ান’র জন্য আইসক্রিম কিনতে এসেছিলাম। হঠাৎ করেই ফোন করে বলল আইসক্রিম নিয়ে যেতে। আর দোকানটাও সামনে পরে গেল তাই গাড়ি থামিয়ে আইসক্রিম কিনতে নামলাম। না হলে কি হতো!

“( আমি চুপ )

“তুমি শুনছো তো আমার কথা।

“উহু!

“এভাবে কখনো একা বের হয়ো না। এসব এলাকায় অনেক কিছু হয়ে যেতে পারে।

“হুম

“আইসক্রিম খাও, তোমার মাথা ঠান্ডা হবে তাহলে। নাকি আইসক্রিম খেয়ে দেখিয়ে দিতে হবে। তুমি তো আবার চেক করা ছাড়া খাও না। কিন্তু দেখ এটা প্যাকেট করা তাই এতো চিন্তা করো না খেয়ে নাও!

আমি তার কথায় শুধু ঢোক গিলছি। এখন কিছু আমার গলা দিয়ে কিছু নামবে বলে মনে হচ্ছে না। ভয় যেন আঁকড়ে ধরে আছে আমায়। হঠাৎ আবার আহিয়ান বলে উঠে,

“‌ওহ তোমাকে তো বলা হলো না ইয়ান কে? সে হলো আমার বড় বোনের ছেলে। অনেক ছোট আর কিউট বুঝলে তো।

“হুম!

“তুমি কিন্তু আইসক্রিম টা খাচ্ছ না। এটা পড়ে গলে যাবে তখন খেতে ভালো লাগবে না। এটা আমি না ইয়ান বলে!

“হুম

“খাও এখন!

আমি আইসক্রিম টা খুলে দু বার মুখে দিলাম। বাটি আইসক্রিম এটা। উনি কিছুক্ষণ পর পর কিছু বলছে। ভিন্ন ভিন্ন কথা, যা এইরকম পরিস্থিতে মানায় না। খানিকটা অস্বাভাবিক। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে উনি বেশি কথা বলছে। হ্যাঁ তাই! কখনো এতো কথা বলতে উনাকে শুনি নি আমি। উনি কি তাহলে আমার ভয় কমানোর জন্য এতো কথা বলছে। আমার মন ঘুরানোর চেষ্টা করছে। আমাকে স্বাভাবিক করার জন্য’ই হয়তো বলছে এসব।

হুট করেই আমি বলে উঠি,
“গাড়ি থামান।

উনি গাড়ি থামিয়ে আমাকে বললেন,
“এখানে তোমার বাসা!

“হ্যাঁ আরেকটু ভিতরে। সরু গলিটার পরে কিন্তু সেখানে আপনার গাড়ি যাবে না। আপনি এখানেই থামান।

“সরু গলিটার পর পর’ই কি তোমার বাসা।

“না কিছুক্ষণ হাঁটতে হবে।

“ওহ!

“হুম।

অতঃপর আমি নেমে গেলাম। উনাকে ধন্যবাদ দিয়ে গাড়ির দরজা আটকিয়ে সামনের দিকে হাঁটতে লাগলাম। তখন হঠাৎ উনি আমাকে নাম ধরে ডাকলেন,
“নিহা।

“হুম।

“দাঁড়াও!

বলেই গাড়ি থেকে নামলেন। অতঃপর আমার সাথে দাঁড়িয়ে বললেন,
“চলো!

“আমি যেতে পারবো।

উনি আমার কথার অপেক্ষা না করে হাঁটতে লাগলেন। আমি হাঁটছি উনার পাশে। খুটখুটে অন্ধকার চারদিকে। উনি ফোনের আলো জ্বালিয়ে হাঁটতে লাগলেন। আমি উনার থেকে দূরে তবে সাথে সাথে হাঁটছি। উনি বলে উঠে,

“তুমি কি প্রতিদিন এখান দিয়ে যাও

“হুম।

“তোমার শশুড় বাড়ি বুঝি।

“নাহ!

“তাহলে কি লিভ ইন এ থাকো। বিয়ের আগে দু’জনে একসাথে!

উনার কথায় আমি চুপসে গেলাম। কি বলছেন উনি এসব। লিভ ইন তাও আমি। কিন্তু উনার এই ভাবনার জন্য দায়ী তো আমি নিজে। তাই বলে এমন ভাবনা।‌ কিন্তু আজকালকার দিনের জন্য এটা খুব স্বাভাবিক। বেশিরভাগ মানুষই এখন এভাবে থাকে বলে আমি শুনেছি ইতি’র কাছ থেকে। কিন্তু এর প্রভাব বিদেশে বেশি,‌বাংলাদেশে এসব প্রথার বিদ্যমান নেই। তাহলে উনি একথা কেন বললেন। আমাকে উনি এমনটাই কি ভাবেন!

আমি আর কোন কথাই বললাম না,চুপ থাকলাম। উনিও চুপ হয়ে হেঁটে যাচ্ছে। বাসার সামনে অবদি এগিয়ে গেলেন আমায়। আমি উনাকে আবারো ধন্যবাদ দিলাম। জানি উনি আসবেন না তবুও বললাম ঘরে আসতে, একটু বসে চা খাওয়ার জন্য। বরাবরের মতো আমার ভাবনাই ঠিক হলো। উনি না বললেন আর বলে গেলেন,

“কখনো একা বের হয়ো না বুঝলে। সাথে কাউকে নিয়ে বের হবে।

বলেই উনি চলে গেলেন। আমি দাঁড়িয়ে উনার চলে যাওয়া দেখতে লাগলাম। উনি ফোন টা হাতে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে অন্ধকারে মিলিয়ে গেলেন। আর কোন ছিটেফোঁটা দেখা যাচ্ছে না উনার! মনে হচ্ছে অদৃশ্য কেউ একজন এলো আর চলে গেল। আমাকে বুঝি এই বিপদের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য’ই তার আসা।

#চলবে….

#ভালোবাসার_ফোড়ন_২
#মিমি_মুসকান
#পর্ব_১১

সকালে ফুটপাতের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি আর আশপাশের মানুষজন কে দেখছি। কেউ হয়তো অনেকটা অসহায় অন্যদিকে অনেকের হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে বেশ বড়লোক! এটাই তাদের মাঝে ভিন্নতা। আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখি পাখি গুলো মুক্ত ডানা মেলে আকাশে ঘুরছে। ইশ যদি তাদের মতো মুক্ত আকাশে উড়ার স্বাধীনতা টা পেতাম। কিন্তু মূহুর্তে’ই হতাশ হয়ে গেলাম, কারন ছিল গতকালের ঘটনা। এখনো তা ভাবলে শরীর শিউরে উঠছে আমার। শুধু ভাবছি আহিয়ান না থাকলে কি হতো আমার!

এই যুগে মেয়েদের একা থাকার অনুমতি তো আছে তবে এই একা থেকে বেঁচে থাকাটাই যে কষ্টসাধ্য। একা একটা মেয়েকে পেলে কেউই এই সুযোগ হাত ছাড়া করতে চায় না, মনুষ্যত্ব বোধ কমে যাচ্ছে সবার মাঝে।
আচ্ছা আজ কি হবে, ছেলে গুলো তো আবার আসবে আজ। গতকাল আহিয়ান বাঁচিয়েছিল কিন্তু আজ কে বাঁচাবে আমায়। ভাবতে গিয়ে শরীর আবারো শিউরে উঠছে। ভয় করছে খুব। এখানে এই খোলামেলা আকাশের নিচে হাঁটতেও এখন ভয় করছে আমার।

ভার্সিটির ক্যাম্পাসে একটা গাছের তলায় বসে আছি আমি। গাছটির চারপাশে ইট আর সিমেন্ট দিয়ে ঘেরাও করা। অনেকটা উঁচু সেটা। আমি সেখানেই এক কোনে হাত পা গুটিয়ে বসে আছি আমি। ইতি এখনো আসি নি, আজ কি আসবে না সে। একা একা এখানে কি করবো আমি। ব্যাগ টা শক্ত করে ধরে মাথা নিচু করে বসে আছি। হঠাৎ মনে হলো কেউ এসে দাঁড়িয়ে আছে আমার সামনে। আমি মাথা উঁচু করে তাকিয়ে দেখি আকাশ ভাইয়া। একটা মৃদু হাসি দিয়ে আমাকে স্বাগত জানাল সে।

আমি তাকে দেখে হাসার চেষ্টা করলাম। তিনি হেসে বললেন,
“একা বসে আছো যে!

“এভাবেই!

“ইতি’র জন্য অপেক্ষা করছো নাকি।

“হুম। আমার বান্ধবী বলতে তো একমাত্র সেইই।

“বসবো এখানে।

“হ্যাঁ বসুন।

তিনি বসলেন আমার পাশে। অতঃপর দুজনেই মিলেই কিছুক্ষণ গল্প করলাম। গল্প গুলো আমাদের কারোর ব্যাপারে ছিল না। ছিল কিছুটা সামাজিক কথাবার্তা। বলতে হবে একজন চমৎকার মানুষ কিন্তু তিনি। খুব সহজেই মিশে যান সবার সাথে। আমার সাথেও ব্যতীক্রম হলো না। প্রায় অনেকক্ষণ কথা বললাম তখন ইতি চলে এলো। অতঃপর তিন মিলে খানিকক্ষণ আড্ডা দিলাম। এর মাঝেই ভার্সিটিতে একসাথে ৩ টা গাড়ি ঢুকল। একটা নিতি’র , আরেকটা আহিয়ান’র বন্ধু নাহানের আরেকটা আহিয়ানের! এই টা কালকের সেই গাড়ি। তাদের দেখে আকাশ ভাইয়া উঠে গেলেন তাদের কাছে। আমি হেসে তার থেকে মুখ সরিয়ে ইতি’র দিকে তাকিয়ে বলি,

“আকাশ ভাইয়া খুব ভালো একজন মানুষ নাহ বল।

“( নিশ্চুপ )

আমি ওর মুখের দিকে ভালো মতো তাকালাম। দেখি ওর চোখ আহিয়ান’র দের সব বন্ধুদের উপর। তারা সবাই গাড়ির উপর বসে আড্ডা দিচ্ছে। কিন্তু ইতি এক ধ্যানে কি দেখছে তাদের দিকে। আমি আরো ভালো মতো তাকালাম। দেখি ইতি’র চোখ সবার উপর না আকাশ ভাইয়া’র উপর। হঠাৎ চোখে চোখ পড়ল আমার আর আহিয়ানের। আহিয়ান চোখ সরিয়ে নিল। আমি চোখ সরিয়ে নিতে যাবো তখন’ই নিতির চোখে চোখ পড়ল। দেখেই মনে হচ্ছে বেশ রেগে আছে সে। আমি মূহুর্তে’ই সেখান থেকে মুখ ঘুরিয়ে ইতি’র কে খোঁচা দিলাম।

“আহ! কি হইছে?

“আমি তো এটাই জিজ্ঞেস করছি। কি হইছে!

“মানে

“কি ওখানে। এতো মনোযোগ দিয়ে কি দেখছিস ওখানে।

“কককই কিছু না।

“আচ্ছা

“হুম। চল ক্লাসে যাই!

বলেই আমাকে ধরে নিয়ে গেল। বেশ বুঝলাম সে কিছু লুকাচ্ছে আমার কাছ থেকে। বিষয়টা কি নিয়ে হতে পারে,আকাশ ভাইয়া! হ্যাঁ ইদানিং দেখছি আকাশ ভাইয়া’র সামনে ওর হাবভাব পরিবর্তন হচ্ছে। ব্যাপারটা কি জানতে হবে।
.
রিনু,‌ তোহা আর তুহিন কে পড়িয়ে রওনা হলাম অর্ণ কে পড়াতে। যত’ই আগাচ্ছি তত’ই গতকালের কালো অতীত আমাকে তাড়া করতে লাগলো। হাত পা রীতিমতো এখন’ই কাঁপছে আমার। বেশ ভুল করেছি আমি এখানে এসে কেবল এটাই মনে হচ্ছে। আসা টা একদম উচিত হয় নি। কিন্তু না এসে’ই বা উপায় কি? এটা নতুন টিউশনি, এখন ঠিকমতো না পড়ালে যে হাতছাড়া হয়ে যাবে। সহজে আর টিউশনি পাবো বলে মনে হচ্ছে না আমার।

অর্ণ বাসায় আসবার সময় সেই ছেলে গুলো কে দেখতে পেলাম না। মন টা শান্ত হলো কিন্তু ভয় কাটলো না। এমন’ও তো হতে পারে ওরা রাতে আসবে। হয়তো জানে না আমি কখন আসবো এখনে। গতকাল যেই সময়ে আমাকে দেখেছে আজও ঠিক সেই সময়ে আমাকে পাবে, এমনটাই হয়তো ভেবে রেখেছে তারা। কিন্তু সব কথার আগে হয়তো কথাটা জুড়ে দিয়ে নিজেকে বিপাকে ফেলে দিলাম। আমি যা ভাবছি তা যে হবে এমন না আবার এর চেয়ে ভয়ানক কিছুও হতে পারে। মানুষের ভাবনা বোঝা বড় মুশকিল।

অর্ণ কে পড়িয়ে বের হবার আগে তার মা কে বললাম আমাকে যেন একটু এগিয়ে দিয়ে যায়। এখানকার রাস্তা বেশ অন্ধকার। আমার খুব ভয় করে।

আমি ভেবেছিলাম হয়তো তিনি না করবেন। কিন্তু তা না! তিনি মুচকি হেসে বললেন,
“তুমি বসো আমি বোরকা টা পড়ে আসছি!

অতঃপর সেই আমাকে নিয়ে বের হলো। যাক হাফ ছেড়ে কিছুটা হলেও বাঁচলাম। গতকালের মতো আজও রাস্তা বেশ অন্ধকার। খুব ভয় করছে, যদিও অর্ণ’র মা আজ আমার সাথে তবুও ভয় করছে। কারনটা কি হতে পারে গতকালের ঘটনার জন্য। হ্যাঁ সেটাই, গতকালের ঘটনা খুব প্রভাব ফেলেছে আমার উপর।

“নিহা রাস্তাটা বেশ অন্ধকার নাহ ‌

“জ্বি!

“তোমার বুঝি অনেক ভয় করে এভাবে রাতের বেলা একা একা আসতে।

“আপনার কি করছে

“হ্যাঁ তা তো করছে। আসলে কি বলোতো বাসা থেকে তেমন একটা বের হই না তো আর এই রাস্তাটাও তেমন একটা আসা হয় না তাই।

“ওহ আচ্ছা।

“তুমি বরং একটা কাজ করো, কাল থেকে দুপুরে এসে ওকে পড়িয়ে যেও। একা মেয়ে এতো রাতে করে আসাটা ঠিক না।

“আচ্ছা!

যাক একটা কাজ তো ভালো হলো। তাকে নিয়ে আসা টা বোধহয় আমার’ই লাভ হয়েছে। আমি তাকে আনবার সময় এতো কিছু ভাবে নি তবুও যা হয় ভালোর জন্যই হয়।
আজকে আর ওই ছেলে গুলো দেখতে পাচ্ছি না তবে দূরে কিছু লোক দেখতে পাচ্ছি। তারা ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ কেউ বলাবলি করছে, “একজন এসে নাকি কয়েকটা ছেলে কে উরাধুরা মেরেছে। ছেলে গুলোর অবস্থা বেহাল। রক্তারক্তি কান্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে পুরো। মেরে এখানেই ফেলে রেখে গেছে। একজন নাকি অ্যাম্বুলেন্স কে কল করেছে এসে পড়বে।”

বলতে বলতে অ্যাম্বুলেন্স এসেও পড়ল। বাকি জনগনের মতো আমি আর অর্ণ’র মাও আগ্রহ নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ি তাদের অবস্থা দেখার জন্য। অনেক ভিড় তবুও আমি একটু উঁকি মেরে দেখার চেষ্টা করছি। আর যা দেখলাম তাতে আমার চক্ষু চড়কগাছ! এই তো গতকালের সেই ছেলেটার মাঝে একজন। যদি সে এখানে থাকে তার মানে তার সাথে থাকা ছেলে গুলোও এখানে আর তাদের অবস্থা এই ছেলেটার মতোই।

ছেলেটার অবস্থা আসলেই অনেক খারাপ। হাত পা বিভিন্ন অংশ থেকে রক্ত পড়ছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। লোকজন বলাবলি করছে, “ছেলে গুলো নাকি সবসময় এখানে মেয়েদের উত্ত্যক্ত করে বেড়ায়। হয়তো এদের মাঝেই কেউই এই অবস্থা করেছে। একটা লোকের কথা তখন আমার কানে এলো। কথাটা এমন ছিল,

“ব্যাটাদের সাথে যা হয়েছে একদম ঠিক হয়েছে। আল্লাহ উচিত বিচার করেছে। ওদের জন্য এখানে বউ বাচ্চা নিয়ে থাকাই মুশকিল। শালারা রাত বেরাতে মদ খেয়ে মাতলামি করতে থাকে। বেশ হয়েছে এখন বুঝুক। দুদিন হাসপাতালে পড়ে থাকলে সব তেজ বের হয়ে যাবে। অতঃপর একটা বিচ্ছিরি গালি দিল তাদের উদ্দেশ্যে। লোকটার কথা বার্তা দ্বারা মনে হচ্ছে ছেলেগুলোর এই অবস্থা হওয়ায় সেই ই বেশি খুশি। যে এই কাজটা করেছে তাকে পেলে হয়তো অনেক কিছু বলতেন।

আমরা আর দাঁড়ালাম না। দুজনেই হাঁটতে শুরু করলাম। অর্ণ’র মা এসব ঘটনা দেখার পর আমাকে মসজিদ অবদি এগিয়ে দিয়ে গেলেন আর আবারো বলে গেলেন কাল থেকে যেন দুপুরে পড়াতে যাই।
আমি মসজিদ থেকে একা একা আসছি আর হাসছি। যদিও ওদের এই অবস্থা দেখে বেশ মায়া লাগছিল কিন্তু সেই লোকটার কথা মনে পড়তেই হাসি চলে আসছে। কিন্তু ছেলে গুলোর এই হাল করলো কে?

আমি কিছুদূর এগুতেই দেখি আহিয়ান’র গাড়ি। উনার গাড়ি থেকে খানিকটা চমকে উঠি। এখানে উনার গাড়ি কি করছে। আমি গাড়িটার কাছে আসতেই গাড়ি টা চলতে শুরু করল। হঠাৎ এমনটা হওয়ায় বেশ ভয় পেয়ে গেলাম। দ্রুত দূরে সরে গেলাম। দেখছি গাড়ি টা নিজ গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। তার মানে গাড়িতে কেউ আছে,‌নিশ্চয়ই আহিয়ান। কিন্তু উনি এখানে কি করছে। গাড়িটা ওই রাস্তা দিয়ে এই এলাকায় এসেছে। কারন আমি সেখান থেকে এসেছি সেখান দিয়ে গাড়ি আসা সম্ভব না তাহলে ওই রাস্তা দিয়েই এসেছে। কিন্তু এসেছিল কেন? আমার জন্য! কিন্তু তা কি করে হয়। আমার জন্য এতোটা কেন করবেন উনি। আর যদি আসেও তাহলে বলতে হবে উনার স্মৃতি শক্তি বেশ ভালো নাহলে এক দেখাতেই এখানে আসতে পারতেন না তাও গাড়ি নিয়ে।

সিঁড়ি দিয়ে চড়ছি আর ভাবছি উনার এখানে আসবার কারন কি? আচ্ছা আমার ভাবনা টা ঠিক, আমার জন্য এসেছে এখানে। এটা তো নাও হতে পারে হয়তো অন্য কারনে এসেছেন। কিন্তু ছেলে গুলোকে মারল কে। দুইয়ে দুইয়ে চার করছি তবে পুরোটাই আন্দাজে। আমার জন্য তাদের মোটেও মারতে যাবেন না উনি। এতোটা ভালো সম্পর্ক নেই তার সাথে আমার। তাহলে… নাহ কাল’ই ভার্সিটিতে গিয়ে উনাকে জিজ্ঞেস করতে হবে।

ভাবতে ভাবতে সিঁড়ি বেয়ে উঠছি তখন হঠাৎ বাইকের আওয়াজ পেলাম। বাড়ির সামনেই থামল বলে মনে হলো। আমি সিঁড়ি ওখান থেকে উঁকি মেরে দেখলাম। দেখি মুন্নি আপু আর একটা ছেলে। সে ছেলের বাইক থেকে নামছে। সে আসতে নিলেই হুট করে ছেলেটা তার হাত ধরে টেনে তার কাছে টানল। এতো টুকু দেখার পর’ই আমি চোখ বন্ধ করে ঘুরে গেলাম। ব্যাপারটা বেশ লজ্জা জনক! খোলা রাস্তায় এসব একদম ঠিক না। মানুষ জন দেখলে কি বলবে। যদিও এই রাস্তাটা খুব নিরব তবুও কথাটা এতো জোর দিয়ে বলা চলে না। এই এলাকা টা বেশ ভদ্র এলাকা।
.
ভার্সিটিতে আসার পর পর’ই অপেক্ষা করছি আহিয়ানের। গতকাল সারা রাত আমার ঘুম হয় নি। সারারাত শুধু তার কথাই ভেবে গেলাম। ওখানে যা কিছু হলো এখানে হাত টা কি তার কি না জানার জন্য আমি বেশ অস্থির হয়ে গেছি।
খানিকক্ষণ পরেই আহিয়ান আসলো। আমি আর ইতি দূরে গাছের আড়াল থেকে তাকে দেখছি। ইতি বেশ কিছুক্ষণ পর পর”ই আমাকে খোঁচা দিচ্ছে, কি করছি এখানে আমরা,এভাবে কেন দাঁড়িয়ে আছি ইত্যাদি ইত্যাদি অনেক প্রশ্ন। আমি ওকে একটা ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে দিলাম। অতঃপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আহিয়ান’র দিকে তাকালাম। পর্যবেক্ষন করতে লাগলাম তাকে। অতঃপর…

#চলবে….