ভালোবাসার ফোড়ন ২ পর্ব-১২+১৩

0
1013

#ভালোবাসার_ফোড়ন_২
#মিমি_মুসকান
#পর্ব_১২

আহিয়ান সবে গাড়ি থেকে বের হয়েছে। আমি দূর থেকে আড়াল হয়ে পর্যবেক্ষণ করছি তাকে। হঠাৎ খেয়াল করলাম উনার ডান হাত টা ব্যান্ডেজ করা। এটা দেখেই কপাল কুঁচকালাম আমি। এর মাঝেই নিতি আহি বলে তার কাছে দৌড়ে গেলেন। উনি ধীরে তার হাত টা জ্যাকেটের পকেট এর ভিতর ঢুকিয়ে রাখলেন। এর কারন কি? নিতি’র থেকে কি গোপন রাখতে এই কথা। তা না হলে এমন’ই বা করবে কেন?

নিতি আহিয়ান’র খুব কাছে এসে কথা বলতে লাগল। বেশ মানিয়েছে দু’জন কে। দূর থেকে ভালোই লাগছে তাদের।‌
খানিকক্ষণ কথা বলার পর আহিয়ান কি বলে জানি উপরে চলে গেল।‌ আর নিতি বাইরে গেল। পেলাম একটা সুযোগ। এই সুযোগে তার সাথে কথা বলাটা খুব দরকার। আমি দৌড় লাগলাম তার পিছু। ইতি কিছু না বুঝে সেখানেই দাঁড়িয়ে আমাকে দেখতে লাগল।‌

আহিয়ান সবে সিঁড়িতে পা রেখেছে আমি তখন’ই পেছন থেকে দৌড়ে তার সামনে গেলাম। উনি আমাকে দেখে অবাক হলেন না। স্বাভাবিক ভাবেই আমার দিকে তাকালেন। উনার চাহনি দেখে খানিকটা দ্বিধায় পড়ে গেলাম। পিছিয়ে গেলাম এক পা। শক্ত করে ব্যাগ টা কে আঁকড়ে ধরলাম। কেন করছি এসব জানি না কিন্তু করছি।

“কিছু বলবে!

( মাথা নাড়লাম )

“বলো!

“আআপনি! আপনি..

“আপনি আপনি ছেড়ে আসল কথা বলো।

আমি এবার একটা বড় শ্বাস নিয়ে উনার দিকে তাকালাম। বলি,

“আপনি কাল ওই ছেলে গুলো কে মেরেছিলেন।

আমি প্রশ্নের জবাবে উওর দিতে মোটেও দেরি করলেন না উনি। উনি “হ্যাঁ” বলেই হাঁটতে লাগলেন। বেশ অবাক হয়ে কৌতুহল বসত উনার পিছু পিছু হাঁটতে হাঁটতে বলি,

“কেন মারলেন এভাবে ওদের।

“তোমাকে বলতে আমি বাধ্য নই।

আমি আবারো উনার সামনে দাঁড়িয়ে বলি,
“কিন্তু আমি শুনতে চাই

আমার দিকে তাকিয়ে বলে,
“তেমন কিছু না ওদের মারার কোন ইচ্ছা ছিল না। আমি শুধু ওখানে গেছিলাম তখন পুরো রাস্তাই অন্ধকার ছিলো। ভেবেছিলাম ওদের সাথে একটা বোঝাপড়া করবো কিন্তু ওরা তার যোগ্য ছিল না।

বলেই আমার পাশ দিয়ে আবারো হাঁটা ধরলেন। আমি পিছন থেকে বলে উঠে,

“এই শুনুন!

আমার কথায় থমকে গেলেন উনি। পিছনে ফিরে বললেন,
“কি বললে তুমি!

আমি থতমত খেয়ে বলি,
“কেন মারলেন ওদের এটা বললেন না কেন? আমার জন্য মেরেছেন!

“মোটেও না। তবে পুরোপুরি তোমার জন্য না হলেও খানিকটা। কারন যখন ওদের কাছে গিয়েছিলাম তখন ওদের কথাবার্তা শুনলাম। আজ তোমাকে পেলে খুব খারাপ কিছু করবে বলে ভেবে রাখলো ওরা। এখন কথা হলো তোমার সাথে করার পর যদি ওদের কেউ ধরতে না পারে তাহলে অন্য দের সাথেও এমন টা করত ওরা। নাহলে এমন কাজ আগেও করেছে কিন্তু কখনো ধরা পরে নি।

বলেই উনি থামলেন। আমি বলে উঠি,
“অতঃপর!

“অতঃপর! অতঃপর আর কি? যা হয়েছে দেখো নি তুমি। আমি তো দেখলাম তুমি সব দেখেছো আর তাও বেশ কৌতূহল নিয়ে।

“আপনি কি এই কাজ টা ঠিক করেছেন। তারা সুস্থ হবার পর কি আপনাকে আবার ধরবে না।

“যা মেরেছি তাতে ৬ মাসের বিছানা ছেড়ে উঠবে না। শিক্ষা হবে! আর যদি মানুষের রক্ত না হয়ে ওদের দেহে অন্য কারো রক্ত বয়ে থাকে তাহলে নিশ্চিত এই কাজ করবে। আর আমাকে ধরা এতো সহজ হবে না।

“কিন্তু আপনার হাতে তো আঘাত লেগেছে!

“কোন আঘাত!

আমি হাত দিয়ে উনার পকেটে থাকা হাত টার দিকে ইশারা করলাম। উনি পকেট থেকে হাত টা বের করে আমার দিকে তাকিয়ে বলেন,
“তোমায় কে বললো এটা সেই আঘাত।

“না হলে নিতি আপুর কাছ থেকে লুকাতেন না।

আমার কথা শুনে উনি খানিকক্ষন আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। অতঃপর আচমকা একটা মুচকি হাসি দিলেন। আমি তাকিয়ে আছি উনার হাসির দিকে। বলতে পারছি না যে বিশ্ব সেরা হাসি এটা তবে আমার দেখা সেরা হাসি ছিল। একটা ছেলে যে এতো সুন্দর করে হাসতে পারে তা জানা ছিল না। আর সেটা যদি উনার কথা হয় তো আমি ভাবিনি উনি হাসতে পারেন। সারাক্ষণ গম্ভীর ভাবেই থাকতে দেখেছি উনাকে। উনি হালকা স্বরে বলে উঠেন,

“তুমি আমার উপর নজর রাখছিলে নাকি!

উনার কথায় লজ্জায় পরে গেলাম। না একথা বলা একদম’ই ঠিক হয় নি। যাই হোক আমি মাথা নিচু করে নিলাম। উনি আবারো বললেন,

“এটার তেমন কোন কারন ছিল না। শুধু একটু কেঁটে গেছে এটাই। নিতি জানলে অনেক কথা বলতো তাই আর কিছুই বললাম না। তবে হ্যাঁ তুমি একটা কাজ ভালো করেছিলে গতকাল কাউকে সাথে নিয়ে গেছিলে।‌

উনার কথায় তার দিকে তাকিয়ে শুধু একটু হাসলাম। অতঃপর উনি চলে গেল।‌ আমিও চলে এলাম।
.
ক্লাস করছিলাম তখন হঠাৎ করেই আনিকা আর টিনা এলো ক্লাসে।‌ স্যারের সাথে কি যেন কথা বললো। তাদের দেখেই আমার ভয় করতে লাগলো। কপাল ঘামছে আমি ওড়না দিয়ে তা বুঝতে যাবো তখন স্যার আমি নাম নিলেন। আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে গেলাম। স্যার বললো আমাকে নাকি প্রিন্সিপাল স্যার ডাকছে।

স্যারের কথা শুনে খানিকক্ষণ তার মুখের দিকেই তাকিয়ে রইলাম। স্যার কেন ডাকবে আমায় এটাই আমার মাথায় ঢুকল না। স্যার বললেন আমাকে সিনিয়র আপু দের সাথে যেতে। একথা শোনার পর ভয় আরো বেড়ে গেল। সত্যি কি স্যার ডাকছে আমায় নাকি এই নিতি!

যা ভয় করেছিলাম তাই হলো, বের হতেই তারা আমাকে ক্যাম্পাসের পেছনের দিকটাই নিয়ে গেল। আমি মাথা নিচু করে ভয়ে দাঁড়িয়ে আছি। আমার সামনে দাঁড়ানো নিতি। সে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। খুব ভয় করছে আমার। কি না কি করে তারা আমার সাথে।

হঠাৎ নিতি বলে উঠে,
“আহিয়ানের থেকে দূরে থাকতে বলেছিলাম তোমায়, কিন্তু তুমি দেখছি ওর কাছেই ততো যাচ্ছো!

“আপু আমি তো উনার কাছে যায় নি

“মিথ্যে ও বলছো দেখছি। তুমি কি ভাবছো বারান্দার তোমাকে আর আহি কে দেখেনি আমি।

( চুপ হয়ে গেলাম )

নিতি হেসে বলল,
“রেডিও দেখি অফ হয়ে গেল রে।

“কি করবি এখন এটাকে নিয়ে!

“ভেঙ্গে দিলে কেমন হয়!

“আপু আমি তেমন কোন কথাই বলে নি

“হুম আপু তুমি তেমন কোন কথা তো বলতেই পারো না। খুব ভালো যে তুমি।‌ আচ্ছা আমি শুনলাম তুমি নাকি বিয়ের থেকে পালিয়ে তোমার কোন প্রেমিকের সাথে এখানে এসেছো। তা প্রেমিক কি তোমায় ছেড়ে দিল নাকি যে এখন অন্য ছেলে খুঁজছো টাকার জন্য!

আমি চমকে উঠে নিতির দিকে তাকালাম। কি রকম কথা বলল সে এটা। আমার চোখের কোনে অশ্রু গড়িয়ে পরল। নিতি হেসে বলল,

“বাহ! চোখের পানি দেখছি খুব স্বচ্ছ! তা এটা দিয়েই কি ছেলেদের বশ কর নাকি তুমি।‌ কারন চেহারা তো তোমার নেই, কিছু যদি থাকে তাও এই চোখের পানি। বেস্ট আইডিয়া কিন্তু!

আমি তার কথা শোনার জন্য ওখানে আর দাঁড়ালাম না। দ্রুত পালিয়ে আসতে চাইলাম সেখান থেকে। আমাকে চলে যেতে দেখে তারা অট্টহাসি দিল। পেছন থেকে নিতি বলে উঠে,

“এটাই শেষবার। আহির ধারে কাছে যেন তোমাকে না দেখি!

আমি দৌড়ে চলে এলাম সেখান থেকে।‌ একটা খালি ক্লাস রুমে এক কোনে বসে কাঁদতে লাগলাম। ব্যাপার টা খুব জঘন্য। কি রকম অভিযোগ আনলো নিতি আমার উপর। খুব ইচ্ছে করছিল জোরে জোরে কাঁদতে। আমি নিঃশব্দে কাঁদতে লাগলাম। চোখ যে আজ মানছে না। এ যে খুব বড় অপমান।

হঠাৎ মনে হলো কেউ এসেছে। আমি চোখ মেলে ভালো ভাবে তাকিয়ে দেখি বেঞ্চ’র উপর একটা রুমাল। কিন্তু কেউ নেই! এই রুমাল টা এলো কোথা থেকে,‌ তবে কি কেউ সত্যি এসেছিল। কিন্তু কে সে যে এসে রুমাল দিয়ে গেল।
রুমাল টা উড়ে যেতে নিল। আমি সেটা ধরে ফেললাম। রুমাল টায় কোন কিছু দেখতে পেলাম না যাতে বোঝা যায় এটা কার। আমি সেটা দিয়ে চোখের কোনে জমে থাকা পানি মুছে নিলাম।

বাকিটা সময় সেখানেই বসে ছিলাম। অতঃপর ছুটি হবার পর বেরিয়ে এলাম। ইতি’র সাথে দেখা হয় নি। আমি ইচ্ছে করেই করি নি। সোজা চলে এলাম পার্কে। কেউ নেই এখন পার্কে। এসময় টা কেউ থাকে না এখানে। আমি ব্যাগ থেকে পানির বোতল টা বের করে কিছুটা পানি মুখে চোখে দিলাম। একটু পানি খেয়ে নিলাম। ভেবে নিলাম আজকের পর আর দেখা করবো না আহিয়ানের সাথে আর না করবো আকাশ ভাইয়া’র সাথে। সবসময় এড়িয়ে চলবো তাদের।

খোলা আকাশের নিচে এভাবে বসে থাকতে বেশ ভালো লাগছিল। হালকা বাতাস এসে ছুঁইয়ে দিচ্ছিল আমায়। অতঃপর আমার চোখ গেল জবা ফুলটার দিকে। এই হালকা বাতাসে দোল খাচ্ছে সে। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম জবা ফুলটার দিকে। ফুলটা দেখতে বেশ সুন্দর!

আরো অনেক ফুল গাছ আছে এখানে তবে জবা ফুল টা যেন আমার মন কেড়ে নিয়েছে। আমি উঠে গাছটার দিকে গেলাম। গাছের সামনে বড় বড় করে লেখা,

“ফুল ছেঁড়া নিষেধ! দূর থেকে এটার সৌন্দর্য উপভোগ করুন”

কিন্তু আজ আমার বেশ লোভ হলো ফুলটার উপর। চারপাশে কেউ নেই বিধায় এই সুযোগ হাত ছাড়া না করে চট করে ফুল টা নিয়ে নিলাম। অতঃপর কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম এটার উপর। সব ক্লান্তি যেন দূর হয়ে গেল আমার। মন টা অনেক হালকা হলো এখন। মনে হলো দিনটা নতুন করে আরো একবার শুরু হলো। আমি ফুলটা কানে গুঁজে রওনা দিলাম।

সারাদিন টিউশনি করে এবার বাসার দিকে হাঁটা ধরলাম। এখন সন্ধ্যা নেমেছে আকাশে কিছুক্ষণ’র মধ্যেই তা কালো হয়ে যাবে। এখন তুহিন কে পড়িয়ে বাসায় যাচ্ছিলাম। তার বাসা ওতোটা দূরে না তবুও বেশ দূর। কিন্তু মেইন রাস্তা বলে কোন অসুবিধা হলো না। আমি নিজ মনে হেঁটে যাচ্ছি। আজ বেশ মজার একটা ঘটনা ঘটেছে। অর্ণ অংক পরীক্ষায় ভালো করেছে। তার মা খুব খুশি যদিও সেটা ক্লাস টেস্ট ছিল তবুও তিনি খুব খুশি। এই খুশিতে মিষ্টি খেতে দিলেন আমায়। অর্ণ নিজ হাতে মিষ্টি খাইয়ে দিলো আমায়। তার মা’র ধারনা আমার জন্য’ই এমন হয়েছে। অর্ণ ভালো মতো পড়ছে।

প্রতিদিন ভাবি ওকে জিজ্ঞেস করবো কেন ও এতো ভালো করে পড়ে কিন্তু ভুলে যাই। না কাল এটা জিজ্ঞেস করতেই হবে। রহস্য উন্মোচন হবে কাল। আকাশের দিকে তাক দেখি অন্ধকার হয়ে গেছে। কখন হলো টের পেলাম না। তুহিন আজ আমার জবা ফুলটা দেখে বেশ প্রশংসা করেছে এটার। ফুল টা নাকি ওর খুব পছন্দ। এমন ভাবে বলল ইচ্ছে করল দিতে কিন্তু মন দিতে চাইলো না। কারন এই ফুলটার উপর বেশ একটা ভালো লাগা ছিল।

খুব ক্ষিদে পেয়েছে। কপালে সেই সকালে একটু ভাত জুটেছিল এখন অবদি আর কিছু জুটে নি। বাসায় গিয়ে’ই ভাত খেতে হবে। ভাত গুলোতে পানি দিয়ে এসেছিলাম ভালো করেছি নষ্ট হবে না। পানি ভাত দিয়ে আলু সিদ্ধ বেশ লাগে। ইদানিং একটা নতুন রুটিন হয়েছে সকালে ডাল ভর্তা আর তাতে আলু ভর্তা। এর কারন হলো গরম ভাতের সাথে ডাল ভর্তা খেতে বেশ লাগে আর রাতে পানি ভাত দিয়ে আলু ভর্তা ভালো লাগে। কিন্তু এসব খেতে আর ইচ্ছে করে না এখন।

ছোটবেলায় পুকুর থেকে মাছ ধরে আনতাম। বেশির ভাগ সময়ই কুঁচো চিংড়ি পেতাম। সেগুলো শাক দিয়ে রান্না করতো আম্মু। আম্মুর হাতের রান্না খুব মজা ছিল। ইশ কতোদিন হলো আজ তার হাতের রান্না খাই না। সেই চিংড়ি মাছ টাও জুটে না কপালে। কি সুন্দর ছিল আমার আগের দিন গুলো! অতীত যে কেন এতো সুন্দর হয় বুঝি না। তা ভেবে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম।
.
ঘরের পরিবেশ কয়েকদিন ধরেই ভালো না। মিতু আর মুন্নি আপু আগে মনে মনে রাগ পুষে রাখতেন। এখন দেখি তারা ঝগড়াও শুরু করে দিয়েছে। তাদের আমাকেই থামাতে হয়। সারাদিন এতো কিছুর রাতের এই সব দেখে হাঁফিয়ে উঠি আমি। অতঃপর চলে আসি ছাদে! ছাদে সেই দোলনায় বসে আকাশ দেখতে থাকে অনেক রাত অবদি। আজ হাতের ফুলটার দিকে তাকিয়ে আছি। ফুল টা শুকিয়ে যাচ্ছে আর ততো’ই সৌন্দর্য কমে যাচ্ছে। আচ্ছা সুন্দর জিনিসগুলো সবসময় এতো ক্ষণস্থায়ী হয় কেন! এতো সুন্দর ফুল টা শুকিয়ে যাচ্ছে এখন’ই। শুধু কি তাই! সুন্দর সময় গুলোও স্মৃতি হয়ে যায়। মন তো চায় মধুর সেই সময়টাকে ধরে রাখতে কিন্তু সেই সাহস যে আমার নেই। নাহলে ধরে রাখতাম অবশ্যই!

ফুল টাকে রেখে দিলাম আমার কাছে। অতঃপর চোখ বন্ধ উপভোগ করতে লাগলাম আরেকটা সুন্দর সময়। জানি এটাও ক্ষণস্থায়ী হবে তবে এই ক্ষণস্থায়ী সময় টা যে কতো মধুময় হয় তা বলে বোঝানো যাবে না!
.
কেটে গেল কয়েকদিন, যথা সম্ভব দূরত্ব রেখেছি সবার থেকে। শুরু হলো আজ আরেকটা দিনের। এই দিনটা প্রত্যেক সকালের মতোই অসাধারণ। প্রত্যেকটা সকাল ভিন্ন ভিন্ন রূপে হাজির হয় আমার কাছে। আজ তার ব্যতীক্রম হয় নি। আমি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি হঠাৎ দেখলাম দূরে বেশ ভীড়। কিছু হয়েছে মনে হচ্ছে।

সব কিছুতেই আমার আগ্রহ বেশি, তাই আর কৌতূহল ধরে রাখতে পারলাম না। উঁকি মেরে দেখতে চাইলাম কি হয়েছে, অতঃপর যা দেখলাম তাতে আমার হাত পা সব ঠান্ডা হয়ে গেল। আমি চোখ স্থির হয়ে গেল। মনে হলো জমে যাচ্ছি আমি..

#চলবে….

#ভালোবাসার_ফোড়ন_২
#মিমি_মুসকান
#পর্ব_১৩

আমি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছি, সময় মনে হল থমকে গেছে।‌‌ আমি কি ঠিক দেখছি! এটা কি বাস্তব না কোন দুঃস্বপ্ন! স্বপ্ন হলেই বেশি খুশি হবো আমি। আমার চোখের সামনে রক্তাক্ত অবস্থায় আহিয়ান পড়ে আছে গাড়ির ভেতর। আশপাশ মানুষের ভীড়ে দাঁড়ানোর জায়গা নেই কিন্তু কেউই তার কাছে যেতে চাইছে না। পুলিশ কেস হলে ফেঁসে যাবে তাই বলে কি একটা মানুষ কে এভাবে রেখে দেবে তারা। যদি কিছু হয়ে যায় তখন!

আমি আর না দাঁড়িয়ে সবাইকে সরিয়ে তার কাছে গেলাম। মাথা দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে। হুশ নেই কোন! সামনেই একটা গাছ, মনে হচ্ছে গাছের সাথে গাড়ি টা খুব জোরে ধাক্কা খেয়েছে। তার শরীরে কিছু কাঁচ ও ঢুকে গেছে। আমি তাকে কয়েকবার ডাকলাম। কিন্তু তিনি সাড়া দিলেন না।

ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে তার মুখে ছিটে দিলাম। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না। উনার জ্ঞান ফিরছে না। আশপাশের মানুষজন তাকিয়ে আছে আমার দিকে। হয়তো সবাই অবাক আমাকে এমন ভাবে ডেকে। আমি আরো কয়েকবার তাকে ডাকলাম।

“আহিয়ান! আহিয়ান!

একজন লোক বলে উঠে,
“আপনি চিনেন একে।

“জ্বি আমি চিনি উনাকে। একটু সাহায্য করুন না আমায় উনাকে হসপিটালে নিয়ে যাবো।

“অ্যাম্বুলেন্স কে কল করা হয়েছে। ওরা আসছে! আমি উনার জ্ঞান ফিরানোর চেষ্টা করুন!

আমি মাথা নেড়ে উনার মুখে পানি ছিটাতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পর’ই অ্যাম্বুলেন্স চলে এলো। তাকে অ্যাম্বুলেন্স এ ঢোকানো হলো। আমিও তার সাথে গেলাম। মনে হলো একবার উনার জ্ঞান ফিরেছে। উনি আমার দিকে তাকালেন। আমি উনার হাত শক্ত করে ধরে বলি,

“কিছু হবে না ঠিক হয়ে যাবেন আপনি। জ্ঞান হারাবেন না আহিয়ান। আহিয়ান!

অতঃপর উনি আবারো জ্ঞান হারালেন। উনার হাত পা সব ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। খুব ভয় লাগছে এখন আমার। উনি অনেকবার আমাকে সাহায্য করেছেন! আর যখন আমার সময় এলো তখন কি আমি পারবো না।

উনার মুখে অক্সিজেন মাস্ক! গাড়ি চলছে দ্রুত গতিতে,আমি উনার হাত শক্ত করে ধরে বসে আছি। অতঃপর খানিকক্ষণ পরেই চলে এলাম হসপিটালে!

উনাকে অপারেশন থিয়েটারে রাখা হয়েছে‌। আমি বাইরে দাঁড়ানো। ভয়ে হাত পা সব ঠান্ডা হয়ে গেছে আমার। একবার ভাবলাম আকাশ ভাইয়া কে জানানো দরকার কিন্তু জানাবো কিভাবে? আমার কাছে না আছে ফোন আর না আছে তার নাম্বার।

ডাক্তার বের হলেন। বললেন,
“এখন ঠিক আছে তবে এক্সিডেন্ট টা ভয়ানক ছিল। অনেক রক্ত বের হয়ে গেছে। কপাল কেটে গেছে আর শরীরে কাঁচ ও ঢুকে গেছে। আপাতত এখন ঠিক আছে। ঘুমের ঔষধ দেওয়া হয়েছে আজকের দিনটা পুরোপুরি বেড রেস্ট এ থাকবেন তিনি।

“আপনাকে অনেক ধন্যবাদ! একবার দেখা করতে পারি উনার সঙ্গে!

“হুম পারেন।‌ কিন্তু আপনি কে? আহিয়ানের সাথে আপনার কিসের সম্পর্ক!

“আপনি চিনেন তাকে।

“হ্যাঁ চিনি।

“আমি উনার পরিচিত একজন তবে এতোটা না। আপনি যদি উনাকে চিনে থাকেন তাহলে দয়া করে উনার বাবা কে একটু ফোন করে উনার অবস্থা টা জানান। আমার কাছে তার নাম্বার নেই।

“আচ্ছা জানাচ্ছি। আহিয়ান কে শিফট করা হবে তারপর আপনি দেখা করতে পারেন তবে বেশিক্ষণ না।

“জ্বি ধন্যবাদ!

অতঃপর আহিয়ান কে কেবিনে শিফট করা হলো। আমি উনার কেবিনে গেলাম। ঘুমিয়ে আছেন তিনি, শরীরে বিভিন্ন জায়গায় ব্যান্ডেজ করা। অক্সিজেন মাস্ক টা এখন আর নেই। যাই হোক আমি কিছুক্ষণ উনার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম।‌ একটা নার্স এসে আমাকে উনার ফোন আর মানিব্যাগ টা দিয়ে গেলেন। ভাবলাম আকাশ ভাইয়া কে কল করবো।

কিন্তু উনার ফোন টা লক করা। এখন কি করবো? হুট করেই ফোনে রিং হলো। ফোনের স্ক্রিনে আকাশ নামটা ভেসে উঠলো। আমি চট করে রিসিভ করে নিলাম কলটা,

“হ্যালো আকাশ ভাইয়া!

“কে?

“ভাইয়া আমি নিহা!

“নিহা তুমি! তোমার কাছে আহিয়ান’র ফোন কিভাবে?

“ভাইয়া আপনি আমার কথা শুনুন!

অতঃপর ভাইয়া কে সব বললাম। এটাও বললাম এক্ষুনি হসপিটালে চলে আসার জন্য। ভাইয়া বলল সে আসছে। অতঃপর তার ফোন আমি রেখে দিলাম।

ফোনটা রাখার পর’ই আবারো রিং হলো। এবার দেখি স্ক্রিনে আপু নামটা ভেসে উঠলো। আমি প্রথম ভাবলাম ধরবো না কিন্তু পরে ভাবলাম হয়তো তারা আহিয়ানের এক্সিডেন্ট’র খবর পেয়ে ফোন করছে। তাই রিসিভ করে নিলাম কল টা,

“হ্যালো!

“হ্যালো! কে তুমি! আহি কোথায় ওকে দাও। আর তুমি কে?

“আপু আহিয়ান এখন ঠিক আছে। ডাক্তার তাকে ঘুমের ঔষধ দিয়ে দিয়েছেন তিনি ঘুমাচ্ছে। তোমরা চলে এসো হসপিটালে।

“আচ্ছা আসছি এক্ষুনি!

অতঃপর সেখান থেকে কল টা কেটে গেল। মনে হলো সে গাড়িতে, আশপাশ থেকে অনেক আওয়াজ আসছে। নাকি নিজেই গাড়ি চালাচ্ছে যার কারনে চট করেই কল টা কেটে দিল।

আমি উনার ফোনটা উনার পাশে টেবিলে রেখে দিলাম। অতঃপর বাইরে এসে দাঁড়ালাম। চলে যাবো কি না তাদের জন্য দাঁড়াব বুঝতে পারছি না। যদিও তার ফ্যামিলির কাউকে চিনবো না কিন্তু আকাশ ভাইয়া কে তো চিনবো। একা একটা রোগী কে এভাবে রেখে যাওয়া ঠিক হবে না। তাই বাইরে এসে বসে পড়লাম।
.
কিছুক্ষণ বসে থাকার পর সামনে তাকিয়ে দেখলাম নিতি দৌড়ে আসছে। তার পিছন পিছন নাহান,‌আনাফ, টিনা! আমি উঠে দাঁড়ালাম। নিতি এসে আমার সামনেই দাঁড়াল। খুব রেগে আছে মনে হচ্ছে। আমি বলে উঠি,

“আপু আহি…

বলার আগেই চুপ হয়ে গেলাম। গালে হাত দিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছি আমি। আশপাশের লোকজন সবার নজর এখন আমার দিকে। আমি চোখ বন্ধ করে নিলাম। নিতি বলে উঠে,

“সাহস হলো কিভাবে তোমার,আহির কাছে কেন তুমি!
তোমাকে তো আমি আজ!

বলেই আমার দিকে আগাতে যাবে, তখন পিছন থেকে নাহান এসে তার ধরে বলে,

“নিতি শান্ত হ,‌এটা হসপিটাল!

“নাহান!

“নিতি চুপ!

“ওকে ডান ছাড় আমায়।

অতঃপর নাহান নিতি কে ছেড়ে দেয়। নিতি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমার দিকে তাকিয়ে বলে,
“তোমাকে পরে দেখে নিচ্ছি আমি!

বলেই আমাকে একটা ধাক্কা দিয়ে কেবিনে চলে গেল। আমি গালে হাত দিয়ে আশপাশ তাকিয়ে দেখি সবাই এখনো আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আর দাঁড়ালাম না সেখানে। দৌড়ে বেরিয়ে এলাম। বেরিয়ে আশার সময় আকাশ ভাইয়া’র সাথে ধাক্কা খেলাম। তিনি আমায় ডাকলেন তবুও আমি পিছনে ফিরে তাকালাম না। আকাশ ভাইয়ারা সাথে আরো কেউ ছিল বলে মনে হলো। যাই হোক তাতে আমার কি! আমার কাজ ছিল উনাকে সাহায্য করা করে দিয়েছি। আর কি?

তবু মন মানছে না। চোখ দিয়ে কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পরল। আমি উড়না দিয়ে সেটা মুছে সামনে হাঁটা ধরলাম। মন কে বোঝালাম,

“তার প্রিয় মানুষটি অসুস্থ, আর সেই রাগ’টা সে আমার উপর ঝাড়লো। সে তো আর জানে না কি হয়েছে!

এসব ভেবে বড় একটা নিঃশ্বাস ফেলে সামনে হাঁটা ধরলাম। কিন্তু গাল টা খুব জ্বলছে এখনো। ইশ খুব জোরে মেরেছে আমাকে। সবাই অবাক ছিল কেউই বুঝতে পারি নি আপু এমন কিছু একটা করবে। বুঝতে পারলে হয়তো আটকাতো। হুম নাহান ভাইয়া তো আটকালো। সেও বেশ অবাক ছিল কিন্তু এরপর.. এরপর কি হবে।
.
বাসায় এসে গোসল করে বিছানায় বসে রইলাম। আজ আমার দুবার গোসল করতে হলো। যাই হোক চুল গুলো খুব ভিজে। পানি পড়ছে টপটপ করে। আমি বিছানা থেকে উঠে ভিজে কাপড় নিয়ে রওনা হলাম ছাদে। শুকাতে দিবো এগুলো!

সন্ধ্যায় বাসায় আসার পর চিরচেনা মুখটা দেখে বেশ অবাক হলাম। তাকে অবশ্য আমি আশা করি নি এখানে। আমাকে দেখে একটা মুচকি হেসে বলল,

“অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম!

“কখন আসলি ইতি!

“বেশ অনেকক্ষণ! এতো রাত করে বাসায় আসিস তুই জানতাম না তো!

“এতো রাত কোথায়! আয় ভেতরে আয়।

অতঃপর দরজা খুলে ইতি কে ভেতরে বসতে বললাম। ইতি ভেতরে বসে বলল,

“এখানে থাকিস তুই!

“হুম এখানেই। তা তুই আজ এখানে হঠাৎ!

“ভার্সিটিতে আজ আসলি না তাই এলাম।

“তাই বলে এখন!

“আরে শোন তো, ভেবেছিলাম খেয়ে দেয়ে আসবো। তো কি হলো আমি খেয়ে টেয়ে দিলাম এক ঘুম। এরপর চোখ খুলে দেখি বিকেল হয়ে গেছে। হায়রে কি যে একটা অবস্থা কি বলবো।

“ভালো! তা চা খাবি!

“না তুই বস গল্প করবো।

“আচ্ছা তুই দুটো মিনিট বস আমি একটা চা পাতি কিনে আনি।

“আরে নিহা শোন তো!

“তুই বস!

অতঃপর বেরিয়ে গেলাম, একটা চা পাতি আর বিস্কিট নিয়ে এলাম। চুলোয় গরম পানি বসিয়ে ইতি সাথে দাঁড়িয়ে গল্প করতে লাগলাম। অতঃপর চা বানিয়ে ইতি কে দিলাম,

“নে রং চা খা!

“এটা বেস্ট নাহলে আমি কালো হয়ে যাবো।

“ওরে সুন্দরী!

“বিস্কিট আনার কোন দরকার ছিল না।

“ছিল তুই বুঝবি না। এখন বল কি বলবি।

“শোন!
বলেই সে তার ব্যাগ থেকে দুটো বই বের করে আমায় দিল।

“এগুলো কি?

“বই! সামনে পরিক্ষা আমি জানি তোর বই লাগবে তাই নিয়ে এলাম।

“কোন দরকার ছিল না ইতি।

“ছিল। বাপি কে বলে দু সেট আনিয়েছি। একটা তোর জন্য আরেকটা আমার।

“ইতি আমি..

“এটা দয়া না নিহা, বন্ধুত্ব! বুঝলি।

“ঋণী করে দিলি তো।

“সুদে আসলে নিবো, আচ্ছা টাকার ব্যাপারে চিন্তা করিস না। আমি..

“না ইতি। আমি জোগাড় করেই রেখেছি আর না।

“আচ্ছা সেটা রেখে দে না। আংকেল’র চিকিৎসা’র জন্য কিছুটা হলেও তো হবে।

“না।‌ সেটার ব্যবস্থা হয়ে যাবে।

“কিভাবে হবে, সারাদিন ধরে কি তুই কাজ করবি শুধু।

“করলে করলাম কি হবে বল।

“তুই কেন কথা শুনতে চাস না বলতো।

“ভালো লাগে না তাই।

“ভার্সিটিতে এলি না কেন?

চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলি,
“ভাবছি কয়েকদিন যাবো না।

“কি কেনো?

“বাসায় বসে পড়বো, তাই!

“তুই না গেলে আমিও যাবো না। একটা কাজ করবো আমিও তোর বাসায় এসে পড়বো। দুজনে একসাথে পড়বো।

“আচ্ছা আসিস!

“আচ্ছা তাহলে এখন চলি রে, নাহলে খুব দেরি হয়ে যাবে।

“সাবধানে যাস কেমন!

“হুম!

অতঃপর ইতি চলে গেল। আমি খানিকক্ষণ ঠাই বসে রইলাম।কিছুই ভালো লাগছে না করতে। ইতি কে বললাম না আসল ব্যাপারটা! এড়িয়ে গেলাম, আচ্ছা কি বলতাম আমি। বলার মতো কি কিছু ছিল!

৩ দিন কেটে গেলো, ভার্সিটিতে যাই না। সকালে ইতি এলে ছাদে বসে দুজনে পড়ি। কিছুক্ষণ দাদু ভাই আর দাদি’র সাথে গল্প করি অতঃপর দুপুর হলে পড়াতে যাই। এভাবেই কেঁটে যাচ্ছে। আচ্ছা ভার্সিটিতে না যাবার কারন কি হতে পারে, নিতির মুখোমুখি! হ্যাঁ ঠিক তাই। আমি চাই না ওর মুখোমুখি হতে, অপমানিত হতে।

আচ্ছা আহিয়ান কি সব জানে, জানলেই বা কি? ও কি করবে! একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তাকিয়ে রইলাম আকাশের দিকে। চাঁদ টা কে আজ বেশ উজ্জ্বল দেখাচ্ছে, বেশ মিষ্টি লাগছে তাকে দেখতে। আকাশের বুকে যেন মা আর বাবা’র প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠলো। আমার মন টা কেঁদে উঠলো। খুব ইচ্ছে করছে তাদের সাথে কথা বলতে,‌খুব ইচ্ছে করছে তাদের দেখতে। কিন্তু আমি যে অসহায়!

বাসায় এসে সিঁড়ি তে উঠতে না উঠতেই দাদি দৌড়ে এলো আমার কাছে। আমি ভয় পেয়ে গেলাম। কিছু হলো নাকি! দাদি’র মুখে চোখে কেমন একটা অস্থিরতা। অতঃপর দাদি আমাকে বললেন,

“একজন এসেছে তোর জন্য, অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছে!

ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলাম,
“কে সে ?

#চলবে….