ভালোবাসার ফোড়ন ২ পর্ব-১৪+১৫+১৬

0
1051

#ভালোবাসার_ফোড়ন_২
#মিমি_মুসকান
#পর্ব_১৪

“একজন এসেছে তোর জন্য, অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছে!

ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলাম,
“কে সে ?

“কি জানি বলল ছেলেটার নাম, হুমম আহিয়ান! হ্যাঁ আহিয়ান।

“কি আহিয়ান! উনি এখানে?

“হুম এই তো নাম বলল ছেলেটা। উপরে গিয়ে দেখ তোর দাদু ভাই’র সাথে বসে আছে

“দাদু ভাই!

আমি আর অপেক্ষা না করে উপরে চলে এলাম। এসে দেখি দুজনেই একসাথে সিগারেট খাচ্ছে আর গল্প করছে।‌ আহিয়ান কে দেখে বেশ অবাক হলাম যদিও তাকে আশা করি নি আমি। হাতের ব্যান্ডেজ টা এখনো আছে। কপালের ব্যান্ডেজ বোধহয় এখন আর নেই! আমি গিয়ে তাদের সামনে দাঁড়ালাম। দাদু ভাই আমাকে দেখে হাসি মুখে বললেন,

“এই তো এসে পড়েছে আমার নাতনি!

আমি হেসে দাদু ভাই’র দিকে তাকালাম। আহিয়ান মুখে সিগারেট নিয়ে আমার দিকে একবার তাকালাম। তাকানো টা বেশ স্বাভাবিক’ই ছিল। টেবিলে দেখলাম বেশ কিছু নাস্তা সাজানো। মনে হচ্ছে অনেকক্ষণ আগেই উনি এসেছেন।

দাদু ভাই বলে উঠেন,
“নাতনি অনেকক্ষণ ধরে ও অপেক্ষা করছে তোর জন্য!

“জ্বি দাদু ভাই!

আহিয়ান আমার দিকে তাকালো কিন্তু কিছু বলল না। বেশ অস্থির লাগছে আমাকে নিজের কাছে। কেমন একটা অস্থিরতা অনুভব করছি। হঠাৎ’ই আহিয়ান’র আওয়াজে কেঁপে উঠি। আমাকে ডাক দিল সে!

“হুম!

“এক গ্লাস পানি খাওয়ায় তো আমায়!

“আনছি!

উঠতে যাবো তখন’ই দাদু ভাই বলল,
“তুই বস। অনেকক্ষণ ধরে বসে আছে তোর সাথে কথা বলার জন্য। আমি বরং গিয়ে দেখি তোর দাদি কোথায়, তাকে দিয়ে পানি পাঠিয়ে দিচ্ছি। ঔষধের সময় হয়ে গেল বুঝলে নাতি খেয়ে আসি, নাহলে তোমার দাদি আবার রেগে যাবো।

আহিয়ান হেসে বলল,
“জ্বি দাদু আপনি যান!

দাদু হেসে উঠে গেল। আমি গুটিসুটি মেরে বসে রইলাম। মনে হলো দাদু ভাই ইচ্ছে করেই চলে গেল। একা ছেড়ে গেল আমায়। আহিয়ান সিগারেট টা ফেলে দিয়ে আমাকে বলল,

“ভয় পাচ্ছো নাকি তুমি।

“ভয় কেন পাবো।

“তাহলে তোমার মুখের রং কেন পাল্টে গেল।

“মুখের রং আগের মতোই আছে, আপনি এখানে কেন এসেছেন!

“ভার্সিটিতে যাও নি কেন?

আমি উনার দিকে তাকিয়ে বলি,
“ইচ্ছে হয় নি যাই নি, কেন আরো অপমান করতেন বুঝি আমায়!

উনি ঠোঁট টা ভিজিয়ে শান্ত ভাবে বলে,
“সরি!

উনার মুখে সরি শোনার পর রীতিমতো থমকে গেলাম আমি।‌ আহিয়ান কাউকে সরি বলছে এটা ভাবতেই অবাক লাগছে। আমি ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করি,

“সরি কেন?

“নিতি যা করেছে তার জন্য।

“এটার জন্য আপনাকে সরি বলার দরকার নেই।

“ঠিক বলেছো। দোষ তো ও করেছে আমি কেন সরি বলবো!

উনার কথা শুনে আবারো অবাক হলাম। এটা আবার কোন ধরনের কথা। বির বির করে বলি,
“যা হয়েছে তা তো আপনার জন্য’ই হয়েছে। আবার আসছে বলতে উনি কেন সরি বলবে হুহ!

“কাল ভার্সিটিতে যাবা!

মনে মনে বলি, (“আপনাকে কেন বলবো! )
কিন্তু মুখে বলি,
“না

“না না হ্যাঁ হবে। তুমি কাল আসছো ভার্সিটিতে!

“আমি না বলার পর আপনি হ্যাঁ বলছেন কেন!

“আমার ইচ্ছে হলো তাই বললাম। বাই দ্যা হয়ে এটা কিন্তু সত্যি যে তুমি আসছো। আর না হলে..

“না হলে!

“সে যখন হবে তখন দেখে নিও! আচ্ছা এখন উঠি আমি।

“এটা বলতেই কি এসেছেন!

“হুম! হসপিটাল থেকে বাসায় আসি ৩ দিন আগে। গত পরশু ভার্সিটি গিয়ে সব শুনি কিন্তু তোমাকে পেলাম না। দুদিন ধরে তোমাকে খুঁজেছি কিন্তু তুমি আসো নি তাই দেখতে এলাম। যদিও তুমি আমাকে সাহায্য করছো তাই দেখতে এলাম তোমায়!

“নিতি আপু জানে এটা।

“আমি কাউকে বলে কিছু করি না!

“সে যাই হোক আমি শুধু আমার ঋণ পরিশোধ করেছি। আপনিও হেল্প করেছিলেন আমায় তাই আমিও করলাম!

“তোমার মনে হয় না তুমি সেই তুলনায় খুব কম করেছো।

“হুম মনে তো হয় কিন্তু আপনার জন্য হওয়া অপমানের কারনে সেটা আর মনে হয় না।

উনি আমার থেকে চোখ সরিয়ে ফোন টা হাতে নিয়ে হাঁটা ধরলেন। তখন’ই দাদি পানি নিয়ে এলেন উনার জন্য। উনি পানির গ্লাস টা হাতে নিয়ে বললেন,

“এতো তেতো ঝগড়া করে মুখটা পুরোপুরি তেতো হয়ে গেছে।‌পানি খাওয়া দরকার!

বলেই পানি খেলেন। আর আমি উনার কথার অর্থ বোঝার চেষ্টা করছি। কেন জানি মনে কথা টা আমাকেই খোঁচা মেরে বলেছেন উনি। আজব সরি বলতে এসেছে নাকি আরো অপমান করতে।

দাদি উনাকে বললেন রাতের খাবার খেয়ে যেতে। উনি না বলে দাদি কে ধন্যবাদ দিয়ে বাইরে চলে এলেন। দাদি আমাকে পাঠালেন উনাকে এগিয়ে দিয়ে আসার জন্য। দাদু ভাই আর দাদী কে দেখে মনে হচ্ছে তারা দুজনেই উনার সাথে খুব মিশে গেছেন। এটা কিভাবে হলো তাও একদিনে!

উনি সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছে, উনার পিছু পিছু আমি নামছি! হঠাৎ আমার ঘরের সামনে এসে দাড়িয়ে গেলেন। যদিও দরজা তালা মারা। উনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,

“সেদিন না তুমি বলেছিলে তোমার বাসায় আসতে তা আজ বলবে না!

উনার কথায় হতবুদ্ধি’র মতো দাঁড়িয়ে গেলাম। ব্যাপার টা কি হলো। উনি হঠাৎ এই কথা কেন বললেন। আমি আনমনে বলে উঠি,

“আপনি আসবেন আমার ঘরে।

“নাহ! এভাবেই বললাম দেখি তুমি কি বলো।

“এর মানে!

“কিছু না!

বলেই তিনি নিচে গেলেন। আমি বাইরে অবদি এলাম। কিন্তু কোন গাড়ি দেখতে পেলাম না। ব্যাপার কি, আজ কি উনি গাড়ি নিয়ে আসেন নি। যদি আনতো তাহলে তো তখন’ই দেখতাম।

দেখলাম উনি হেঁটে একটা বাইকের দিকে গেলেন। হ্যাঁ এটা দেখেছিলাম অবশ্য। মনে হয় গাড়ি এক্সিডেন্ট হবার কারনে এখন বাইক চালায়। যাই হোক উনি বাইকে চড়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,

“কাল তোমায় যেন ভার্সিটিতে দেখি!

অতঃপর বাইক চালিয়ে চলে গেলেন। আমি একটা মুখ ভেংচি কেটে বলি,
“ইশ উনার কথা মতো চলতে হবে নাকি।‌ আমি তো যাবো না দেখি কি করে উনি। আসছে উনি বললেই যেতে হবে। আচ্ছা উনি কেন এসেছেন। উনার জন্য’ই তো বার বার অপমানিত হয় আমি। ভাবলাম এখন আর উনার সামনেই যাবো না আর এখানে উনি বাড়িতে এসে হাজির।‌ আজব!
.
দাদু ভাই আর দাদি’র ঘরে গেলাম ব্যাগ টা আনার জন্য। ব্যাগ টা তাদের ঘরেই রেখে নিচে এসেছিলাম।‌যখন ব্যাগ আনতে গেলাম তখন দাদি আমাকে বসিয়ে একগাদা কথা শুনালেন। পুরোই তার কথা। তার প্রশংসা বললে বেশি সহজ হবে। দাদু ভাই আবার ঘুমের ঔষধ খেয়ে ঘুমিয়ে গেছেন নাহলে হয়তো তিনিও বলতেন কতো কথা।‌

কিন্তু একটা ব্যাপার এখনো আমার মাথায় ঢুকলো না উনি কেন আমার ঘরে আসতে চাইলেন। কি জন্য কথাটা বললেন আর এটাও কেন বললেন, আমি ভয় কেন পেয়েছি। তাকে ভয় পাবার কোন কারন কি আছে। তা অবশ্য নেই কিন্তু একটা ব্যাপার আছে যা আমাকে অস্থির করে সেটা হলো আমার মিথ্যে।‌ আসলে একটা মিথ্যে বললে সবসময় সেই মিথ্যে বলার ভয় টাকে নিয়ে চলতে হয়।

তিনি কি এটা জানতে পেরেছেন আমি তাকে মিথ্যে বলেছি। দাদু ভাই কে জিজ্ঞেস করলে হয়তো জানতে পারতাম কিন্তু তাকে কিভাবে জিজ্ঞেস করবো সেটাই তো বুঝতে পারছি না। দাদি মনে হচ্ছে কিছু জানে না কারন আমার মতে তিনি উনার খেদমতেই বেশি ব্যস্ত ছিলেন। এটা একটা আন্তরিকতা যেটা দাদি’র মধ্যে অনেক বেশি দেখা যায়। কেউ ঘরে এলেই দাদি তাকে খুব অ্যাপায়ন করে আর এটা টেবিলের উপর সাজানো খাবার দেখেই বোঝা যাচ্ছে। তার বানানো বিভিন্ন আচার ও দিয়েছেন আহিয়ান কে।

ঘরে বসে পড়তে বসেছি, খেয়াল করলাম মুন্নি আপু মিতুর আপুর সাথে বেশ ভালো ভাবেই কথা বলছে। হয়তো দুই বোনের মাঝে দ্বন্দ্ব শেষ হয়ে গেছে।‌ যাক ভালো হলো ভাই বোনের ভিতর দ্বন্দ্ব থাকলে সেটা দেখতে ভালো লাগে না।‌ তবে দুঃখ হয় আমার ভাই আজ থেকেও নেই। কি হয়েছে যদি সে আমার সৎ ভাই হয় তো। দু’জনের শরীরে তো এক’ই রক্ত তাই না। ভাই অবশ্য আমাকে একবারে আদর করত না এটা বললে ভুল হবে। ছোট বেলায় আমাকে গাছে চড়া, পুকুরে সাঁতার কাটা তিনি’ই শিখিয়েছেন।‌

কোনদিন কারো বাড়ি’র গাছের আম চুরি করে আনলে সেটার ভাগ ও দিতেন আমায়।‌ ইচ্ছে না থাকলেও আদর করতেন আমায় কিন্তু বিয়ের পর সেই অনিচ্ছাকৃত আদর টাও চলে গেল আমার ভাগ্য থেকে।
.
মিতু আপু আর মুন্নি আপু চলে গেছে অনেকক্ষণ! আমি আলসেমি করে এখনো বিছানায় শুয়ে আছি। যদিও উনি আমাকে অনেক ধমকে গেছেন তবুও আমি ভয় পাই না তাকে। আমি যখন বলেছি যাবো না তো যাবো না হুহ!

হঠাৎ করেই দরজায় কেউ কড়া নাড়ল। প্রথমে ভাবলাম হয়তো উনি এসেছেন। এটা সত্যি হয়ে থাকলে আমি আর দরজা খুলছি না। উনি তত’ই দরজায় কড়া নাড়ুক আমি আজ দরজা খুলবো না ব্যস!

এখনো দরজা কড়া নেড়েই যাচ্ছে। আমি বলে উঠি,

“কে?

“আমি! [ দরজার ওপাশ থেকে ]

“ইতি!

“নাহলে কে শুনি!

“আসছি তুই একটু দাঁড়া!

“দাঁড়িয়ে আছি সেই কখন থেকে, খোল এখন!

অতঃপর আমি দ্রুত বিছানা থেকে উঠে দরজা খুলতে গেলাম।‌ তাকিয়ে দেখি ইতি রেগে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

“সরি রে আসলে…
বলতে গিয়েই চুপ হয়ে গেলাম!

#চলবে….

#ভালোবাসার_ফোড়ন_২
#মিমি_মুসকান
#পর্ব_১৫

“সরি রে আসলে…
বলতে গিয়েই চুপ হয়ে গেলাম! আমি চোখ বড় বড় তাকিয়ে আছি। ইতি’র ঠিক পিছনে আহিয়ান দাঁড়ানো হাতে ফোন নিয়ে। আমি এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি তার দিকে। ব্যাপারটা কি হলো এটা বুঝতেই আমার খানিকক্ষণ লাগাল।

ইতি বলে উঠে,
“কিরে কথা বলছিস না!

আমি অবাক স্বরে বলি,
“আপনি!

ইতি কোমরে‌ হাত দিয়ে বলে,
“কাহিনী টা কি বল তো। ভাইয়া আমাকে ফোন কে তোর বাসায় নিয়ে এলো কেন?

আমি হা করে তাকিয়ে আছি আহিয়ান’র দিকে।‌ হয়তো উনার সুবুদ্ধি হলো, ফোনের থেকে মুখ ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকালো। তার চোখে একটা সানগ্লাস ছিল। তিনি সেটা খুলে আমার দিকে তাকিয়ে আবার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,

“ঠিক আর ১০ মিনিট পর আসবো আমি। জলদি তৈরি হয়ে নাও!

বলেই সিঁড়ি দিয়ে নেমে চলে গেলেন। আমি উঁকি দিয়ে উনার চলে যাওয়া দেখছি। হঠাৎ করেই ইতি আমাকে ধাক্কা দিয়ে বলল,
“কিরে গায়ের উপর দেখছি পড়ে যাবি।

“আমি যা দেখলাম তুই ও কি সেটাই দেখলি।

“এটা আহিয়ান ভাইয়া’ই! কি বললো শুনলি না ১০ মিনিটের মধ্যে যেতে বলেছে।

ঘরের ভিতর এসে,
“উহু যাবো না।

“ভাইয়া পরে কিন্তু বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাবে। আমাকে যেভাবে নিয়ে এলো!

“দেখ ভয় দেখিয়ে লাভ নেই আমি যাবো না।

“ভাইয়া তোকে না নিয়ে যাবে না তুই এটা ধরে নে।

আমি জানাল দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখি উনি বাইকে বসে ফোন টিপছে। ইতি এসে আমার ঘাড়ে হাত রেখে বলল,

“দেখলি তো! ভালোয় ভালোয় বলছি তৈরি হয়ে নে!

আমি ইতি’র দিকে তাকালাম। অতঃপর তৈরি হয়ে নিচে এলাম। আমি উনার সামনে দাঁড়ানো। খেয়াল করলাম পাশেই আকাশ ভাইয়া। আমাকে দেখে হেসে বললেন,

“আমি বাজি জিতে গেছি আহি!

আমি ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলি,
“কিসের বাজি!

আকাশ ভাইয়া হেসে বললেন,
“বুঝলে নিহা! আমি আর আহিয়ান বাজি লেগেছিলাম। আহি বলেছি তুমি আসতে ১০ মিনিটের বেশি সময় নিবে আর আমি বলেছিলাম ঠিক ১০ মিনিট। আর আমার কথাই সত্যি হলো তুমি ১০ মিনিটের মধ্যেই এসেছো!

ইতি বলে উঠে,
“এমনটার কারন কি?

আহিয়ান বলে উঠে,
“কারনটা তুমি। আমাকে ১০ মিনিটের কথা বলে ২০ মিনিট দাঁড় করিয়ে রেখেছিলে। তাই…

আকাশ ভাইয়া আর আমি হেসে দিল। ইতি মুখ ভেংচি দিয়ে দুই হাত বাহুতে গুঁজে নিল।
আহিয়ানের দিকে তাকালাম। মুখের কোন ভাবভঙ্গি নেই। তিনি আমার হাতে হেলমেট ধরিয়ে দিয়ে বলল,

“পড়ো এটা!

“আমি হেটেই যেতে পারবো!

“তোমার হেঁটে যেতে যেতে দিন পার হয়ে যাবে, আমাদের জলদি যেতে হবে। পড়ো এইটা!

হেলমেট’র দিকে একবার তাকিয়ে আকাশ ভাইয়া’র দিকে তাকালাম। তিনিও বাইক এনেছেন। আমি আস্তেই বলে উঠি,

“আমি আকাশ ভাইয়ার সাথে যাবো!

কথাটা হয়তো আহিয়ান বা আকাশের কানে যায় নি। তবে ইতি’র কানে ঠিক’ই গেছে। সে হুট করেই আমার হাত শক্ত করে ধরে বলে,

“প্লিজ নিহা তুই আহিয়ান ভাইয়ার সাথে যা আমি আকাশ ভাইয়ার সাথে যাবো!

আমি চোখ ঘুরিয়ে ইতি’র দিকে তাকালাম। ইতি আমাকে সাধতে লাগাল। অতঃপর আকাশ ভাইয়া ডাকের সে নাচতে নাচতে চলে গেল তার কাছে। অতঃপর তারা দুজন চলে গেল একসাথে!

হঠাৎ আহিয়ান বলে উঠল,

“এটা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতি বলি নি, পড়তে বলেছি।

“হুম!

অতঃপর আমি সেটা পড়ে উনার বাইকের সামনে এসে দাঁড়ালাম। উনি বাইকে চড়ে বললেন,

“বসো!

আমি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ভাবলাম কিভাবে বসবো। আদৌও কি বসতে পারবো কিনা। অস্বস্তিবোধ হতে লাগল। ঠিক বুঝতে পারছি না কি করবো। কখনো এভাবে কোন ছেলের সাথে বসি নি আমি। ব্যাপারটা অস্বস্তিকর !
হঠাৎ উনি বাইক থেকে নেমে গেলেন। অতঃপর নিজের হেলমেট খুলে বললেন,

“হেলমেট খুলে তোমার!

আমি অবাক হয়ে উনার দিকেই তাকিয়ে রইলাম। আবার খুলতে কেন বলছে এটা। হঠাৎ উনিই আমার হেলমেট এ হাত দিয়ে সেটা খুললেন। অতঃপর বাইকে রেখে সামনে হাঁটা ধরলেন। আমি সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলাম। উনি কিছুদূর হেঁটে পিছনে ফিরে আমাকে বললেন,

“দাওয়াত দেওয়া লাগবে নাকি তোমায়!

আমার ঘোর ভাঙল। আমি ব্যাগ টা ধরে দৌড়ে উনার পাশে গেলাম। অতঃপর উনার সাথেই হাঁটতে লাগলাম। মেইন রোডে চলে এলাম দুজন। হঠাৎ উনি আমার হাত ধরে রোড পার হয়ে এদিকে নিয়ে এলেন। আমি চোখ বড় বড় করে উনার দিকে তাকিয়ে রইলাম।

রোড পার হবার পর আমি নিজেই নিজের হাত ছুটিয়ে নিলাম। উনি আমার দিকে ছোট ছোট চোখ করে তাকালেন। অতঃপর একটা রিকসা দাড় করলেন। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,

“বসো!

আমি উঠে রিক্সায় বসলাম। অনেকটা সরে বসলাম। অতঃপর উনি এসে আমার পাশে বসলেন। এখনো কেমন একটা অস্বস্তি লাগছে নিজের মধ্যে। মাথা নিচু করে হাত দুটো মুঠ করে বসে আছি।‌

অতঃপর রিক্সাওয়ালা কে বললেন,
“মামা হুট’টা তুলে দিন প্রচুর রোদ!

আমি উত্তেজিত হয়ে বলি,
“এই না!

উনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
“আচ্ছা ঠিক আছে আপনি চলুন! ( অতঃপর আমাকে উদ্দেশ্য করে ) ঠিক আছো তুমি!

“হুম আছি!

“এক রিক্সায় যেতে কি তোমার সমস্যা হবে, তাহলে বলো আমি নেমে যাচ্ছি!

আমি উনার দিকে তাকিয়ে বলে উঠি,
“না ঠিক আছে আপনি বসুন!

“সমস্যা হলে বলতে পারো।

“না ঠিক আছি। আচ্ছা আপনি কি তাহলে এই কারনে বাইক ছেড়ে এখানে এলেন!

“সবাই সব কিছু’তে অভস্ত না এটা আমি জানি আর বুঝি!

উনার কথায় আমি মাথা নাড়লাম!
.
পুরো রাস্তা উনি আর আমি একটা কথাও বলে নি। দুজনেই চুপচাপ ছিলাম। অতঃপর রিক্সা এসে থামল কলেজের সামনে। আমি খানিকটা অন্যমনস্ক ছিলাম তখন। অন্যরকম ভাবনা চিন্তা ছিলো আমার মাথায়, ভাবছিলাম আচ্ছা নিতি যদি আমাকে আর উনাকে একসাথে দেখে তখন কি হবে।‌ সে তো পারলে আমার গায়ে আগুন ধরিয়ে দেবে। ভেবেই মনে মনে হাসলাম। কিন্তু কেন হাসলাম জানি না!

উনার কথায় ধ্যান ভাঙল। তাকিয়ে দেখি রিক্সা থেকে নেমে গেছেন। আমাকে নামতে বলছে! আমি রিক্সা থেকে নেমে সামনে তাকাতেই আরেক দফা অবাক হলাম। সবাই কেমন অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। তাদের এভাবে তাকানোর মানে কি?

উনি রিক্সার ভাড়া দিয়ে আমার পাশে দাঁড়ালেন। ব্যাপারটা এখন পুরোপুরি পরিষ্কার! আমার পাশের জনের জন্য’ই সবাই আমাকে অদ্ভুত ভাবে দেখছে। কানাকানি ও শুরু হয়ে গেছে। নিজেকে কোন ভিন গ্রহের প্রাণির মতো লাগছে।

উনি আর আমি একসাথে’ই ভার্সিটিতে ঢুকলাম। যত’ই সামনে যাচ্ছি তত’ই ভয় লাগছে,‌গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। মন বলছে কিছু হতে চলেছে। খারাপ কিছু!
“যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধ্যে হয়”‌ প্রবাদ টা এখন আমার সাথে পুরোপুরি মিলে গেছেন। একদম সেই পরিস্থিতিতে আমি। আমার সামনে নিতি, আমাকে আর আহিয়ান কে একসাথে দেখে রেগে বম হয়ে আছে।ইতি আর আকাশ ভাইয়া ও আছে দেখছি। হয়তো অনেক আগেই এসে পড়েছে। নিতি আমার দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে, ওকে দেখে মনে হচ্ছে ওর মনের কথা আমি বুঝতে পারছি। এটাই বলছে হয়তো মনে মনে,

“নিহা’র বাচ্চা তোকে তো আমি তাল গাছের সাথে ঝুলাবো, বাড়ি মেরে মাথা ফাটিয়ে দেবো, তারপর কুঁচি কুঁচি করে কুকুর কে খাওয়াব! ”

ধারনা ঠিক কি না জানি না কিন্তু এটাই মনে হচ্ছে ‌। আহিয়ান নিতি কে উদ্দেশ্য করে বলে উঠে,

“নিতি সরি বল!

নিতি শান্ত ভাবেই বলে,
“কাকে বলবো সরি!

ইতি এসে আমার পাশে দাঁড়াল। আহিয়ান বলে উঠে,
“নিহা কে!

উনার কথায় উপস্থিত সবাই অবাক। আমি চমকে উঠে আহিয়ানের দিকে তাকাই। নিতি রেগে বলে উঠে,

“তুই কি মজা করছিস আমার সাথে!

“মজা করার কোন বিষয় এটা!

“তাহলে,‌ আহি তুই কি পাগল হলি। আমি এই মেয়েটা কে সরি বলবো।

“অবশ্যই! তাও সবার সামনে সরি বলবি যেভাবে সেদিন সবার সামনে থাপ্পড় মারলি!

থাপ্পড়ের কথা শুনে ইতি অবাক যেহেতু এই বিষয়ে সে কিছু জানে না তাই অবাক। আমি মাথা নিচু করে নিলাম। নিতি রেগে আহিয়ানের দিকে তাকাল। আহিয়ান শান্ত ভাবেই নিজের ফোন টা বের করে টিপতে টিপতে বলল,

“জলদি বল আমাকে আবার যেতে হবে!

নিতি রেগে আমার দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“সরি!
অতঃপর আহিয়ানের দিকে তাকিয়ে রেগে চলে গেল। তার পিছন পিছন টিনা আর আনিকাও গেল। আকাশ ভাইয়া হয়তো সব জানত তাই এতোটা অবাক না। নাহান আর আনাফ ভাইয়া অনেকটা অবাক অবশ্য!
এদিকে আমি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। পুরোটাই স্বপ্নের মতো লাগল, এই মনে হচ্ছে আমি উঠলে স্বপ্নটা ভেঙে যাবে। সবকিছুই ধোঁয়াশার মতো উড়ে যাবে।‌কোন কিছুর অস্তিত্ব থাকবে না!

ইতির ডাকে হুশ ফিরল। তাকিয়ে দেখি নাহান আর আনাফ ভাইয়া আমার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে। আকাশ ভাইয়া আর আহিয়ান হেটে ভার্সিটির বাইরে চলে যাচ্ছে! ইতি আমাকে টেনে নিয়ে গেল বাইরে। বাইরে এসে দেখে আহিয়ান ফোন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার পাশে একটা রিক্সা দাঁড়ানো। আমাদের দুজনকে সেটাতে উঠিয়ে দিল সে! আমি উনাকে কিছুই জিজ্ঞেস করলাম না কিন্তু অনেক কিছু জিজ্ঞেস করার ছিল।

সারা রাস্তায় সেদিনের কথা বললাম ইতি’র কাছে।‌ ইতি বেশ কিছুক্ষণ গালাগালি করল নিতি কে। আমার মনে হচ্ছিল রিক্সা ওয়ালা মামা হয়তো ওর বক বক শুনে অতিষ্ট হয়ে গেছেন!

ইতি’র বাসা কাছে ছিল সেখানেই সে নেমে গেল। অতঃপর রিক্সা এসে থামল আমার বাসার সামনে। আমি প্রথমে খানিকটা থতমত খেলাম যেহেতু এখনো ওইসব চিন্তা আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। রিক্সা ওয়ালা আমাকে নামতে বলছে! অতঃপর রিক্সা থেকে নেমে আবারো অবাক হলাম। পাশেই দাঁড়িয়ে আছে আহিয়ান আর আকাশ ভাইয়া!

আহিয়ান আবারো এখানে কেন? মূহুর্তে মনে পড়ল উনার বাইক তো এখানেই ছিল। হয়তো সেটাই নিতে এসেছে। আমি উনার কাছে গিয়ে বললাম,

“আপনি এমনটা কেন করলেন?

ফোনের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“তুমিই তো বলেছিলে,‌ আমি কেন সরি বলবো।

“হ্যাঁ বলেছি তার মানে তো এটা না যে নিতি আপু সরি বলবে!

“হয়তো মানে এটা না তবে কথা ঠিক! দোষ যে করেছে সরি সে বলবে!

“আপু কি খুব রেগে যাবে না!

“জানি না!

আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাসায় দিকে হাঁটা ধরলাম। হঠাৎ উপর থেকে দাদু ভাই বলে উঠে,

“আরে আহি বাবা না!

আমি থমতম খেয়ে উপরে তাকালাম। তাকিয়ে দেখি দাদু ভাই হাতে সিগারেট নিয়ে ছাদ থেকে দাঁড়িয়ে কথা টা বলল। উনি হেসে দাদু ভাই’র দিকে তাকালেন!

দাদু ভাই বললেন,
“এখানে দাঁড়িয়ে যে নাতি উপরে এসো!

আমার ধারনা ছিল আহিয়ান না বলবে। কিন্তু উনি তা বললেন না। বাইক থেকে নেমে বললেন,

“আসছি, আগে বলো চা খাওয়াবা!

উপর থেকে দাদি বলে উঠে,
“আচার আছে খেতে চাইলে আসো!

আহিয়ান একটা মুচকি হেসে আমাকে পার করে উপরে হাটা ধরলেন। পেছনে তাকিয়ে দেখি আকাশ ভাইয়া অবাক চোখে তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে আমার মতো সেও খুব অবাক!

ঘরে এসে রান্না বান্না করছিলাম। হঠাৎ করেই বাইকের আওয়াজ শুনলাম। তাকিয়ে দেখি উনারা চলে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ওদের চলে যাওয়া দেখলাম। অতঃপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলি,

“উনাকে বোঝা আমার পক্ষে সম্ভব না!
.
রাতে বিছানায় বসে পড়ছিলাম হঠাৎ নাকে চিংড়ি ভাজার ঘ্রাণ এলো! ভর্তা বানানোর জন্য’ই নিশ্চিত কেউ ভাজছে! ঘ্রাণ টা অনেক তীব্র তার মানে হয়তো মিতু আপুই বানাবে। আমি উঠে মিতু আপুর কাছে গেলাম। হ্যাঁ সত্যি মিতু আপু ভাজছে। আমাকে দেখে হেসে বলল,

“কিছু বলবি!

( মাথা নাড়লাম )

“কি বলবি!

“তুমি চিংড়ি মাছের ভর্তা বানাবে বুঝি!

“হুম মুন্নি’র অনেক প্রিয়।‌ খেতে চেয়েছে তাই ! কেন?

“আমাকে একটু দিবে গো!

“তুই খাবি!

“হুম আমার অনেক প্রিয়!

“আচ্ছা বানালে দিবো।

“আচ্ছা!

বলেই বাইরে চলে এলাম। দেখলাম মুন্নি আপু কেমন ভাবে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আমি তার দিকে তাকাতেই তিনি মুখ ঘুরিয়ে নিলেন।

আমি কিছু না বলে গিয়ে আবারো পড়তে বসলাম! অনেকক্ষণ পড়ার পর মনে পড়ল দাদি আজ বাইরে গেছে। বলে গেছিল ছাদে কাপড় শুকানো, সেগুলো যেন গিয়ে ঘরে রেখে আসি। আমি একদম ভুলে গেছিলাম সেই কথা।

অতঃপর এখন উঠে যেতে নিচ্ছি তখন দেখলাম আপু ভাত বাড়ছে। আমাকে দেখে বলল,

“কোথায় যাচ্ছিস!

“ছাদে যাচ্ছি দাদি’র শুকনো কাপড় গুলো রেখে আসতে!

“আচ্ছা তাড়াতাড়ি আসিস। ভাত বাড়ছি!

“আচ্ছা!

অতঃপর আমি ছাদে গিয়ে দাদি’র কাপড় গুলো নিয়ে ঘরে রেখে আসলাম। দাদু ভাই কে দেখে এলাম। দেখি তিনি বসে টিভিতে খবর। কিছুক্ষণ তার সাথে কথা বলে নিচে নামলাম। অতঃপর…

#চলবে….

#ভালোবাসার_ফোড়ন_২
#মিমি_মুসকান
#পর্ব_১৬

নিচে আসার পর’ই মিতু আপু আর মুন্নি আপুর কিছু কথাবার্তা কানে এলো আমার। আমি দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে তাদের কথা শুনছি! মুন্নি আপু বলছে,

“কি দরকার ছিল এতো আদিখ্যেতা করার। আমরা নিজেরাই তো কতো কষ্ট করে চলি!

মিতু আপু বলল,
“তুই কি বলছিস এসব!

“বুঝতে পারছো না নাকি, এতো দরদ কিসের তোমার নিহা’র ওপর।

“বাচ্চা একটা মেয়ে, তুই এভাবে কেন বলছিস।

“এভাবেই বলবো। আমার খাবারে নজর দেয় কেন?

“নজর কোথায় দিল। তুই কি পুরোটা খাবি নাকি।

“হ্যাঁ পুরোটাই খাবো, পুরোটাই নিজে খাওয়ার জন্য কিনেছি। এতো দান দরদি করতে পারবো না।

“আজব তো এভাবে কেন বলছিস। একটু পর’ই চলে আসবে ও।

“আসুক আর শুনুক! অন্যের থেকে নিয়ে খেতে পারবে শুনতে পারবে না নাকি। শুধু সুবিধা খোঁজে কিভাবে অন্যের ঘাড়ে বসে খাওয়া যায়। এদের কাজ’ই হলো পরগাছার মতো অন্যের টা খেয়ে বেঁচে থাকা। সবসময় অন্যের ঘাড়ে বসে খাওয়ার চিন্তা ভাবনা। নিজের তো মুরদ নেই আবার আসছে!

“ও কি প্রতিদিন খায় নাকি!

“একদিন দিলেই প্রতিদিন খেতে চাইবে বুঝলে তুমি!

“মুন্নি অনেক হয়েছে চুপ কর তুই! সবাইকে নিজের মতো ভাবিস না।

“কি বললে তুমি, বাইরের একটা মেয়ের জন্য আমাকে কথা শুনাচ্ছো তুমি!

“হ্যাঁ বলছি, আর শুনতে না চাইলে নিজের খাবার নিজে খা!

“কেমন নির্লজ্জ মেয়ে একটা! এমন মেয়ে কখনো দেখি নি আমি।

“মুন্নি চুপ করতে বলছি!

“পারবো না গো আপু চুপ করতে, কষ্ট করে কাজ করে খাই। এর ভাগ অন্যকে দিতে গেলে আমার ভাগ্যে কিছুই জুটবে না। আর এতোই যখন খাওয়ার শখ নিজে কিনে খেতে পারে না নাকি। কাজ তো ঠিক করে, টাকাও তো পায়।

“এত যদি হিসেব করে চলতে চাস তাহলে নিজের রান্না এরপর থেকে তুইই করে নিস। আমি আর পারবো না তোর রান্না করতে!

“তুমি তো দেখছি…
অতঃপর চুপ হয়ে গেল। কারন আমি ঘরে এসে পড়েছি তাই সে চুপ হয়ে গেল। মুন্নি আপু ভাতের থালা নিয়ে খাটের উপর উঠে গেল। দেখে মনে হচ্ছিল বেশ রেগে আছে আমার উপর। আমাকে সহ্য করতে পারতো না সে আমি জানতাম। কিন্তু এতোটা এটা জানতাম না।

মিতু আপু আমাকে ভাতের থালা টা দিয়ে বলল,

“কখন তো গেলি আসতে কি এতো সময় লাগে নাকি, ভাত তো ঠান্ডা হয়ে পানি হয়ে যাচ্ছে!

“আপু আমি খাবো না!

“কি বললি খাবি না কেনো?

“আমার ভাত গুলোতে পানি দিয়েছি সেই দুপুরে এখন না খেলে নষ্ট হয়ে যাবে। সেগুলো’ই খাবো আমি!

“ওহ। আচ্ছা তাহলে একটু চিংড়ি ভর্তা নে, তুই তো তখন খেতে চাইলি!

আমি মুচকি হেসে বলি,
“না গো আপু, যেটার সামর্থ্য নেই তা না খাওয়াই ভালো আমার জন্য!

আমার কথা শুনে আপু চুপ হয়ে আমরা মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। তার মুখটা মলিন, হয়তো ভাবছে আমি তাদের সব কথা শুনেছি। কিন্তু তার’ই বা কি করার। যদি মুন্নি আপু কথা গুলো তো সত্যি’ই ছিল। মুন্নি আপুর দিকে তাকালাম। সে নিজের মনেই খেয়ে চলেছে।‌ মনে মনে হয়তো খুশি কারন তার ভাগের খাবার আমি খাই নি!
আমি হেসে পাতিল থেকে ভাত নিয়ে বিছানায় এসে বসলাম। দুপুরে আলু ভাজি দিয়ে ভাত খেয়েছিলাম। সেই আলু ভাজি এখনো আছে কিছু। আমি সেগুলোই দিয়ে খাওয়া শুরু করলাম। মুন্নি আপুর প্রতিটা কথা কানে বাজছিল আমার। খাবার জন্য এমন খোঁটা শুনবো কখনো ভাবি নি। চোখের অশ্রু গড়িয়ে পড়ল ভাতের থালায়। আমি দ্রুত চোখ মুছে তাড়াতাড়ি করে খেয়ে নিলাম।
.
প্রতিদিন’ই ভার্সিটিতে যাচ্ছি, যদিও অনেক ভয়ে ভয়ে থাকি সারাটিক্ষণ! কখন যে নিতি এসে বোমা ফাটাবে জানি না! এই ভয়ে আহিয়ান, আকাশ ওদের কারো সাথেই কোন কথা বলি না আমি। যা হয়েছে অনেক হয়েছে। আমাকে এই ভার্সিটিতে’ই পড়তে হবে। উল্টা পাল্টা কিছু হয়ে গেল তখন কিছু করার থাকবে না আমার। পড়াশুনাও বন্ধ হয়ে যাবে। এতো বড় রিস্ক নিতে রাজি না আমি।

দেখতে দেখতে পরিক্ষার দিন এগিয়ে আসছে।‌ পড়ছি তো মন দিয়েই কিন্তু সেই সাথে টাকাও জোগাড় করতে হবে। টাকাটা অবশ্য জোগাড় করেই রেখেছি! আজ সেটা জমা দিতে হবে।

সকালে খেয়ে দেয়ে বেরিয়ে গেলাম ভার্সিটির উদ্দেশ্যে! ব্যাগ টা শক্ত করে ধরে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি, কারন হলো আমার ব্যাগে টাকা। জানি বেশি টাকা না কিন্তু আমার কাছে আজ সেটা লাখ টাকার সমান! এটা খুব কষ্ট করে রোজগার করে জমিয়েছি! কথায় আছে”টাকাই সব”! ব্যাপারটা নিজে একা থাকার পর খুব ভালো ভাবে বুঝেছি!

ভার্সিটিতে এসে ইতি কে খুঁজছি! হঠাৎ করেই ধাক্কা খেলাম কারো সঙ্গে! আমার ব্যাগ টা হাত থেকে পড়ে গেল। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম হয়তো নিতি কিন্তু না এটা অন্য মেয়ে ছিল। মেয়েটা আমাকে সরি বলে ব্যাগ টা উঠিয়ে দিল।

অতঃপর কাউন্টারে চলে গেলাম টাকা জমা দিতে। সেখানেই এসেই আমি নিস্তব্ধ হয়ে গেলাম, ব্যাগে কোন টাকা নেই!এটা কি করে হতে পারে। টাকা তো আমি ব্যাগেই জমা রেখেছিলাম। কোথায় গেলো টাকা।

আমার মাথা ঝিম ঝিম করতে লাগলো। পুরো শরীর কাঁপছে! টাকা না পেলে পরিক্ষা দিতে পারবো না আমি। টাকা গুলো যে খুব দরকার আমার। আমি দৌড়ে বার হয়ে আবারো সেই রাস্তায় হাঁটা। আশা একটাই যদি টাকা গুলো ফেরত পাই।‌ কিন্তু পেলাম না!

যেখানে ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেছিলাম আবারো সেখানেই এলাম। অনেক খুঁজলাম কিন্তু টাকা পেলাম না। খুব কষ্ট হচ্ছে এখন আমার। দিনের পর দিন এতো কষ্ট করে জমানো টাকা এভাবে কোথায় হারিয়ে গেল। কি হবে এখন! পরিক্ষা কি করে দেবো আমি!

ক্যাম্পাসে এসে বসে রইলাম! খুব কান্না পাচ্ছে এখন। জোরে জোরে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। হঠাৎ করেই মনে হলো পাশে কেউ বসল। আমি ‌পাশে তাকাতেই চমকে গেলাম! নিতি হেসে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। ওর মুখের হাসি আমার শরীরে যেন কাটার মতো বিঁধছে। কিছু আছে এই হাসির মাঝে। আমাকে উপহাস করছে সে।

খেয়াল করলাম টিনা আর আনিকাও এসে পাশে দাঁড়াল। হঠাৎ টিনা বলে উঠে,
“কি ব্যাপার নিহা! এখানে বসে আছো যে!

আনিকা বলে উঠে,
“মন খারাপ নাকি!

নিতি বলে উঠে,
“কিছু কি হারিয়ে গেছে!

নিতি’র কথায় দ্বিতীয় বারের মতো চমকে উঠলাম! কেন জানি মনে হচ্ছে টাকা টা হয়তো নিতি’ই নিয়েছে। টিনা বলে উঠে,

“কি হারাবে তুই কিসের কথা বলছিস!

নিতি হেসে বলল,
“না মানে দেখে মনে হচ্ছে কিছু হারিয়ে গেছে তাই মন খারাপ করে বসে আছে। তাই নাকি নিহা!

আমি তাদের কথার কোন উত্তর দিলাম না। মাথা নিচু করে রইলাম। নিতি আমার কানের কাছে চুল গুলো গুঁজে দিয়ে বলতে লাগলো,

“প্রথমেই বলেছিলাম নিজের যোগ্যতার মাঝে‌ থাকো কিন্তু তুমি শুনলে না। এখন যখন কথা শুনো নি তাহলে ফল তো ভোগ করতেই হবে!

আমার চোখ ভরে উঠছিল। নিতি হেসে আমার গাল দুটো চেপে ধরে বলে,
“আমাকে দিয়ে সরি বলানো না! নিতি কে দিয়ে, এতোই কি সোজা নাকি। কি ভেবেছো আমি চুপ হয়ে থাকবো কিছু বলবো না। ( অতঃপর আমাকে ছেড়ে দিয়ে ) তুমি ভাবতেও পারছো না আমি কি কি করতে পারি!

নিতি’র কথা শুনে চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পরল। আনিকা হেসে উঠে বলল,

“ইশ বেচারা কষ্ট পাচ্ছে নিতি এভাবে বলিস না।

“ওর কষ্ট তো এখন শুরু! আমার আহি’র দিকে হাত বাড়িয়েছে ও। এতো সহজে কি ছেড়ে দেবো নাকি।

আমি কিছু বলতে যাবো নিতি উঠে গিয়ে বলল,
“আমার মাঝে সিমপ্যাথি’র আশা করো না। এটা আহি কে মানায় আমায় না। তোমার মতো মেয়ে শুধু পারো ছেলেদের মন গলাতে। আর টাকা হাতাতে। খুব ভালো করে আমি চিনি তোমাদের!

টিনা মুখ বিকৃত করে বলে,
“উফফ এসব মেয়ে আমাদের ভার্সিটিতে কেন আসে বুঝি না।

আমি উঠে চলে যেতে নিলাম। তখন আনিকা আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল,

“যে যেখানে তাকে সেখানেই মানায়।‌ তোমার মতো মেয়ে মাটিতে থাকার কথা। সেখানেই থাকো না শুধু শুধু আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখলে তো ধপাস করে তো পড়তেই হবে!

বলেই তারা হেসে চলে গেল। আমি তাদের দিকে তাকিয়ে দেখলাম তারা ওই মেয়েটা, যার সাথে আমি ধাক্কা খেলাম সেই মেয়ের সাথে হাইফাই দিচ্ছে। খুব রাগ হচ্ছিল তখন আমার। সব ভুলটাই আমার। একদম উচিত হয় নি সেদিন আহিয়ানের সাথে ভার্সিটিতে আসা। কেন এলাম আমি সেদিন কেন? যদি জানতাম নিতি কে দিয়ে সরি বলাবে তাহলে আমি কখনোই আসতাম না।

রাগে ক্ষোভে কাঁদতে কাঁদতে বের হচ্ছিলাম ভার্সিটি
থেকে। গেটের সামনে এসেই দেখা হলো ইতি’র সাথে। আমাকে কাঁদতে দেখে ছুটে এলো সে। তার পিছু পিছু আহিয়ান, আকাশ ভাইয়া তারা সবাই আসছিল। আমাকে কাঁদতে দেখে সবাই অবাক হয়ে গেল। ইতি এসে আমার সামনে দাঁড়িয়ে বলল,

“কি হয়েছে নিহা! কাদছিস কেন?

আমি চোখ মুছে বললাম,
“কিছু না!

“কিছু না হলে কাঁদছিলি কেন?

আমি আহিয়ানের দিকে তাকিয়ে বললাম,
“তেমন কিছু না শুধু নিজের কাজের পরিণতি পেলাম।
বলেই চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালাম!

ইতি পেছন থেকে ডাকছিল কিন্তু আমার কোন ইচ্ছে ছিল না ওর সাথে কথা বলার। আকাশে মেঘ জমেছে মনে হচ্ছে বৃষ্টি হবে। দমকা হাওয়ায় বইছে! গেট দিয়ে বের হতে যাবো হুট করেই কেউ আমার হাত ধরল। আমি থমকে গেলাম। চিনতে কষ্ট হলো না এটা আহিয়ান। আমি তবুও তাকিয়ে দেখলাম এটা আহিয়ান। তাকে দেখেই বেশ রাগ উঠছিল আমার। শুধু মনে হচ্ছিল যা হয়েছে সব কিছু উনার কারনেই হয়েছে। কঠিন গলায় বললাম,

“হাত ছাড়ুন আমার!

উনি শান্ত ভাবেই বললেন,
“কি হয়েছে!

“আপনি আমার হাত ছাড়ুন!

“আগে কি হয়েছে সেটা বলো, নিতি আবার কিছু বলেছে তোমাকে!

আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উনার সামনে এসে দাঁড়ালাম। চোখের পানি মুছে বলে উঠি,

“হুম বলেছে, অনেক কিছু বলেছে, তো! এখন আপনি কি করবেন? আবারো যাবেন আর তাকে বললেন সরি বলতে। আচ্ছা আপনার কি কোন ধারনা আছে আপনার এই বোকামির কারনে আমাকে কতোটা সাফার করতে হয়। আমি কেন আসেন বলুন তো আমার জীবনে। আপনি কেন বুঝতে পারেন না আমার জীবনে যতটা উলোটপালোট হয় তা আপনার কারনেই হয়।‌ আপনি দায়ী হন আমার জীবনটা তোলপাড় করার জন্য। কে বলেছিল আপনাকে সেদিন নিতি আপু কে দিয়ে সরি বলানোর জন্য।‌ বলেছিলাম আমি একবারও। আমার কোন দরকার নেই এসবের। আমি যেমন আছি ঠিক আছি। দরকার নেই কারো দয়ার, কারো অনুগ্রহের। একা চলতে পারি আমি। দয়া করে আমার জন্য আর কিছু করবেন না আপনি, কিছু না। আমার জীবন আমি ঠিক দেখে নিতে পারবো!

বলেই বের হয়ে চলে এলাম। কথাগুলো আমি উনার চোখের দিকে তাকিয়ে’ই বলেছিলাম। দেখলাম উনি বেশ শান্ত ভাবেই আমার কথা গুলো শুনছিল।
না চাইতেও চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছিল। আকাশে মেঘ গর্জন করছে এখনি শুরু হবে বৃষ্টি।

টিপ টিপ করে বৃষ্টি ঝড়তে লাগল। আমি কাঁদছি আর বৃষ্টিতে ভিজছি। বোকার মতো বার বার চোখের পানি মুছছি! একদম কাকভেজা আমি কিন্তু তবুও বৃষ্টি থেকে পালানোর কোন চেষ্টা করছিলাম না। ভিজেছিলাম,‌শুধু ভিজেছিলাম।‌

ভিজতে ভিজতে চলে এলাম পার্কে! কেউ নেই পার্কে, বৃষ্টির কারনে সবাই চলে গেছে। আমি বৃষ্টির মাঝে এসে বেঞ্চে হাঁটু গেঁড়ে বসে রইলাম আর কাঁদতে লাগলাম। যতক্ষন বৃষ্টি ছিল ততক্ষণ’ই কাঁদছিলাম। অতঃপর বৃষ্টি থামার পর থম বেড়ে বসে রইলাম!

স্থির হয়ে বসে ছিলাম, মাথায় অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে। কিছুক্ষণ পর পর’ই বাতাসের কারনে শরীর শিউরে উঠছে,‌কাপছে! চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে! তবুও বসে ছিলাম।

হঠাৎ মনে হলো ইতি’র গলার আওয়াজ পেলাম। ঝাপসা ঝাপসা চোখে সামনে তাকালাম। তাকিয়ে দেখি ইতি দাঁড়িয়ে আছে আমার সামনে। আমি তাকে দেখা মাত্রই ঢলে পড়লাম তার দিকে। অতঃপর আর কিছু মনে নেই আমার!

#চলবে….