#ভালোবাসার_ফোড়ন_২
#মিমি_মুসকান
#পর্ব_১৭
জ্ঞান ফিরার পর নিজেকে ঘরের বিছানায় আবিষ্কার করলাম। মাথায় অসহ্য যন্ত্রণা! ঝাপসা ঝাপসা চোখে সামনে তাকিয়ে দেখি ইতি আমার সামনেই বসে আছে। যদিও তাকে দেখতে ঘোলা ঘোলা লাগছে তবুও আমি অনুমান করতে পারছি এটা ইতি। আমার এপাশে দাদি বসে আছে এটা সহজেই অনুমান করতে পারলাম। এর অবশ্য একটা কারন আছে আর তা হলো দাদি’র শরীর থেকে অন্যরকম একটা গন্ধ আসে। এর মাধ্যমে আমি তাকে চিনতে পারি।
জ্ঞান ফিরার পর ও কিছুক্ষণ বিছানায় শুয়ে রইলাম। অপেক্ষা করতে লাগলাম দাদি আর ইতি’র ডাকের। আমি জানি তারা আমাকে ডাকবে। ডেকেই তুলবে! তাই হলো, দুজনে আমাকে তুলে উঠালো। আমি স্বাভাবিক দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকিয়ে রইলাম অতঃপর মাথায় হাত দিলাম। মাথার যন্ত্রণা বেশ তীব্র হচ্ছে। যখন যন্ত্রণা হয় তখন কোন চিন্তা ভাবনা’ই আমার মাথায় থাকে না। শুধু মনে হয় কেউ হয়তো মাথায় বসে আছে। আর তার কারনেই মাথায় তীব্র যন্ত্রনা! এক কাপ চা পেলে হয়তো বেশ ভালো লাগতো।
ইতি উঠে আমার সামনে এক কাপ চা লাগলো, কড়া করে বানানো চা দিলো আমায়। আমি স্বাভাবিক ভঙ্গিতে’ই চা খেলাম। মাথায় এখন অবদি কোন চিন্তা ভাবনা আসছে না। দাদি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
“একটু ভাত নিয়ে আসি, খাইয়ি দেই তোকে!
আমি মাথা নাড়লাম! দাদি উঠে তাঁর ঘরে গেল। জানি ঘর থেকেই আমার জন্য ভাত নিয়ে আসবে। খুব খাটাখাটনি করে বুড়িটা আমার জন্য। এতো আদর পেতে ভালোও লাগে আবার ভয় ও লাগে কারন সুখ যে ক্ষণস্থায়ী! ইতি আমার হাতে একবার হাত রেখে জিজ্ঞেস করল ঠিক আছি কি না। আমি চা তে একটা চুমুক দিয়ে মাথা নাড়লাম!
সবটাই স্বপ্নের মতো লাগছে! লাগাটা স্বাভাবিক কারন আমার কিছুই মনে পড়ছে না। কি হয়েছিল? আমার চিন্তা ভাবনার শক্তি কি কমে গেল নাকি। মানুষ স্বপ্নে থাকলে এমনটা হয় তাহলে কি আমি স্বপ্নে আছি!
দাদি এসে পড়ল ভাতের থালা নিয়ে। আমাকে খাইয়ে দিতে লাগল। এর মাঝেই আমার চিন্তা ভাবনা শক্তি কাজ করছে। আমার শরীর কাঁপছে! সবকিছু খুব দ্রুত মনে পড়ছে আমার। সব মনে পড়ার পর’ই চোখ দু’টো মানুষ আবার ভিজে উঠছে। দাদি আমাকে খাইয়ে দেবার ঔষধ খাইয়ে দিলো যাতে জ্বর না আসে।
ঔষধ খাবার পর খানিকটা সুস্থ মনে হতে লাগল তা সম্পূর্ণ’ই শারীরিক ভাবে, মানসিক ভাবে আমি এখনো অনেকটা দুর্বল! ইতি আমার হাতে হাত রাখল। আমি তার দিকে তাকালাম। সে শান্ত ভাবেই বলল,
“চিন্তা করিস না আমি তোর টাকা দিয়ে এসেছি। এটা দয়া না তোকে ধার দিলাম বুঝলি। তুই যখন পারিস তখন দিস আর সুদ হিসেবে আমাকে একটা চকলেট দিস।
ইতির কথা শুনে না চাইতেও হেসে দিলাম। বেচারি আমাকে হাসানোর জন্য’ই তো কথা গুলো বসছিল। শরীর টা এখন অনেক ভালো তবুও মনের কোথাও বেশ অসুখ অসুখ বোধ করছি!
দুপুরের দিকে ইতি আমাকে নিয়ে গেল ছাদে। বৃষ্টির কারনে পুরো ছাদ’ই সেঁতসেঁতে অবস্থা। আমি ধীরে হেঁটে গ্রিলের সাথে ঘেসে দাঁড়ালাম। ইতি বলে উঠল,
“যা হয়েছে তার জন্য এখনো কি মন খারাপ করে আসিস!
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলি,
“মন খারাপ করে লাভ নেই জানি তবুও ভালো রাখতে পারছি না।
“যখন জ্ঞান হারালি জানিস তখন খুব পেয়ে গিয়েছিলাম!
“একটা কথা জানিস তখন তুই না থাকলে আমি জ্ঞান হারাতাম না। তুই ছিলি বলে বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে পরেছিলাম। তাই এমনটা হলো!
“যাক তাহলে আমি তোর কাছে বিশেষ কেউ।
“সেটা তুই বরাবার আছিস। কিন্তু আবেগপ্রবণ হওয়াটা ভালো না। এটা মানুষ কে দুর্বল করে দেয়।
“তবে তুই মনে হয় উল্টো কিছুই করলি, আবেগপ্রবণ হয়ে আহিয়ান ভাইয়া কে এত্তো গুলো কথা শুনালি!
মূহুর্তে’ই উনার কথাটা মাথায় এলো। মনে পড়ল উনাকে বলা কথা গুলো।
“সত্যি’ই কি ভুল করেছি আমি।
“সেটা তো তোর মন জানে তাই না!
“মনে হচ্ছে যা করেছি ঠিক করেছি কারন যা হয়েছে সব উনার জন্য’ই! না সে সেদিন নিতি আপু কে সরি বলতো, না নিতি রেগে যেত আর না সে আমার টাকা নিয়ে যেত।
“টাকা নিতি নিয়েছে বলে আমি ধারনা করেছিলাম এখন তো দেখি এটাই সত্য। তবে তোর কথার যুক্তি থাকলেও আমি আহিয়ান ভাইয়া কে ঠিক বলবো!
আমি ভ্রু কুঁচকে ইতি’র দিকে তাকালাম। ইতি আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
“কারো দল নিচ্ছি না নিজের মত টুকু জানাচ্ছি! সেদিন নিতি তোকে থাপ্পড় দিয়েছিল বলেই ভাইয়া তাকে সরি বলতে বলেছে, ভাইয়া কি আর এটা জানত যে নিতি আরো রেগে যাবে আর সেই ফল তোকে নিতে হবে!
“জানবে না কেন? নিতি কি তার ভালো বন্ধু নয়!
“হ্যাঁ ভালো বন্ধু তো অবশ্যই! কিন্তু তাই বলে তার মনে কি চলছে সে তো আর জানবে না। শোন একজন কে মানুষ কে চিনতে যেমন বছর খানেক লাগে না তেমনি আবার কিছু মানুষ আছে যাদের চিনতে তোর জীবন পার হয়ে যাবে। মানুষ সবসময় দুই সত্তা নিয়ে ঘুরে একটা তার বাহ্যিক অন্যটা তার ভিতরে! এখন যেই সত্তা ভালো সেটাই মানুষ কে দেখাবে আর খারাপ টা নিজের মনের মাঝেই পুষে রাখে! আর ধরতে গেলে আহিয়ান ভাইয়া তো তোকে সাহায্য করতে’ই চেয়েছে!
“জানি আমি! কিন্তু তার সাহায্যের কারনেই আজ আমার এই হাল!
“আমি বুঝতে পারছি আর মন খারাপ করিস না!
“করে লাভ নেই এতে কিছুই হবে না!
“আল্লাহ তাআলা এক পথ বন্ধ করে আরো হাজারো পথ কিন্তু খুলে দেয় নিহা কথাটা একদিন তুই বলেছিলি আমায়! এখন সেটাই বিশ্বাস কর না, দুঃখের পর কি সুখ আসে না।
“আসে তবে তা ক্ষণস্থায়ী! কিন্তু কিছু মানুষ আছে জানিস যাদের কপালে আজীবন দুঃখ’ই থাকে কখনো সুখের দেখা মিলে না। মোটকথা সুখ তাঁদের কাছে শুধুই স্বপ্ন! আর এই স্বপ্ন একটা সমুদ্রের ন্যায় যেখানে সবাই সাঁতার কাটতে পারে না। কেউ কেউ স্বপ্নের খোঁজে সেই সমুদ্রের তলদেশে হারিয়ে যায়। হারিয়ে যায় তার স্বপ্ন, তার অস্তিত্ব, তার আবেগ ভালোবাসা সব কিছু। মানুষ ভুলে যায় তাকে। তার অস্তিত্ব কে! তার নামে যে কেউ ছিল এটাই তারা মনে করতে পারে না!
ইতি খুব মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শুনল। অতঃপর আমার ঘাড়ে হাত রেখে হেসে বলল,
“আমরা দু’জনেই সমবয়সী! তবুও তুই জীবন সম্পর্কে আমার থেকে কতোটা বেশি বুঝিস। এটার কারন হলো তুই জীবন টাকে খুব সামনে দেখে দেখেছিস। দেখছিস এই সমাজের মানুষের বিচিত্র রূপ কে। একা চলতে শিখেছিস কিন্তু এসবের কিছুই আমি করি নি। তাই তোর কষ্ট টা আমি ঠিক বুঝতে পারি না।
“কষ্ট না বোঝাই ভালো ইতি, কষ্ট কে বুঝতে গেলে আরো বেশি কষ্ট পাবি, কষ্ট বাড়বে বরং কমবে না!
আমার কথায় ইতি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। খেয়াল করলাম সে কিছু বলতে গিয়েও বলল না। আকাশের দিকে তাকালাম। পুরো আকাশ এখন পরিষ্কার, স্বচ্ছ! কালো মেঘ কাটিয়ে সূর্য আবারো উঁকি দিয়েছে।
হঠাৎ মনে পড়ল পড়াতে যেতে হবে। কিন্তু শরীর আর মন আজ আলসে তে ভরপুর তবুও যেতে হবে আমায়। মাথায় যে বোঝা চেপে গেছে। বোঝা তো আগেই ছিল তার সাথে আরো কিছু জুড়ে গেল। কবে যে আমি এই বোঝা মাথা থেকে নামাবো সেটাই ভাবছি। নাকি এই বোঝার মাঝেই আমার জীবনের সমাপ্তি হবে! ভাগ্যে কি আছে কিছুই বলা যায় না। ভাগ্য কে যেমন বিশ্বাস করতে হয় তেমন অবিশ্বাস ও করতে হয়। বিশ্বাস করতে হয় ভাগ্য নামের কিছু একটা আছে আবার অবিশ্বাস ও করতে হয় ভাগ্য আমার নিয়মে চলবে। সে চলবে তার নিজের গতিতে। আমি যা চাই তা কখনো হবে না। ভাগ্য যা চাইবে তাই হবে! এখন শুধু দেখার আমার ভাগ্য আমাকে কতদূর নিয়ে যায়!
.
ইতি আর আমি একসাথে’ই বের হলাম। অতঃপর ইতি কে বিদায় দিয়ে চললাম নিজের গন্তব্যে! গন্তব্য প্রথমে রিনু কে পড়াতে হবে, অতঃপর তোহা, তিহান আর অর্ণ কে! সবাইকে পড়িয়ে এসে ক্লান্ত শরীর টাকে বিছানায় এলিয়ে দিলাম। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম ঠিক নেই। মিতু আপু একবার ডেকে ঘুম থেকে উঠালো, তাকিয়ে দেখি দাদি ভাতের থালা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অতঃপর দাদি আবারো আমাকে খাইয়ে দিয়ে ঔষধ খাইয়ে চলে গেল!
পরিক্ষা শুরু হয়ে গেল। মন কে ঠিক রাখতে সারাক্ষণ পড়াশোনা করলাম। খুব মন দিয়ে, ভালো করে পড়লাম যাতে পরিক্ষা ভালো হয়। পরিক্ষাও ভালো হলো তবে অবাক হবার বিষয় ছিল ভার্সিটিতে আহিয়ান ওদের কারো সাথেই আমার দেখা হতো না। আসলে আমিই ওদের এড়িয়ে চলতাম কিন্তু এখন মনে হচ্ছে তারাও আমাকে এড়িয়ে চলছে। নাহলে দেখা হচ্ছে না কেন?
না হওয়াটা’ই ভালো। হলেই আবার একটা ঝামেলা, আবার কিছু না কিছু হবে। এর চেয়ে তাদের মুখোমুখি না হওয়াটাই ভালো। কিন্তু মুখোমুখি হয় নি বলে যে তাঁদের একবার দূর থেকে দেখেছি তাও না। কোন রকম যোগাযোগ হয় নি আমাদের মাঝে। মনে মনে কোথায়ও একটু খারাপ লাগতে শুরু করল। ভেবেছিলাম আহিয়ান কে দেখতে পেলে তাকে সরি বলবো।
ইতির সেদিনের কথা গুলো ঠিক ছিল, উনি তো আমাকে সাহায্য করবার জন্য’ই এসব করেছে। একবার না বার বার আমার সাহায্য করেছে কিন্তু আমিই অকৃতজ্ঞ’র মতো তাকে সবার সামনে অপমান করলাম। অপরাধ বোধ জাগছিল মনে। দিন দিন এই অপরাধ বোধ বেড়েই যাচ্ছিল। একবার দেখা পেলে হয়তো এই অপরাধ বোধ কমতো!
.
পরিক্ষার পর’ই ভার্সিটি কিছু দিনের জন্য ছুটি দিল। ইতি এই সুযোগে ওর ফুফু বাড়ি চলে গেল বেড়াতে। আমাকে অবশ্য সাধল কিন্তু আমিই না করে দিলাম। তবুও খুব জোর করছিল তাই টিউশনি’র কথা বলে বাহানা দিলাম। নাহলে আর কি উপায় ছিল!
ওদের সবার পরিক্ষা শেষ হলো, বছরও শেষ হতে চলল। কদিনের ছুটি ও পেয়ে গেলাম। নতুন বছরের আগে কেউই পড়বে না। ওদের জোর করেও পড়ানো যাবে না। তোহা চলে গেছে দাদু বাড়ি আর তিহান গেছে নানু বাড়ি। অর্ণ আর তার পুরো পরিবার গেছে বেড়াতে। অর্ণ আমাকে বলেছিলি সে নাকি পাহাড় দেখতে যাবে। মনে হয় সেখানেই গেছে।
কিন্তু সমস্যা হলো রিনু’র মা কে নিয়ে। তিনি চেয়েছেন আমি রিনু কে পুরো মাস টাই যেন পড়াই। আমিও রাজি হলাম। দুদিন পড়ানোর পড়’ই ওর মা বলল আর না পড়াতে। নতুন বছর থেকেই আবার পড়াতে। রিনু’র বাবা নাকি রিনু’র দাদু বাড়ি যাবার জন্য জোর করছে তারা সেখানেই যাবে!
অবশেষে এতো দিনের ক্লান্ত শেষে আমি কিছুদিনের ছুটি পেলাম। ভালোই লাগল এই ছুটি। ভাবলাম এই সুযোগে একটা চাকরি খোঁজা দরকার। কিন্তু চাকরির জন্য তো সার্টিফিকেট দরকার। আর আমার সব কাগজপত্র গ্রামে। কিছুই আনি নি সাথে। এখন সার্টিফিকেট ছাড়া কোথাও চাকরি নেওয়া যাবে না।
কোন পথ না পেয়ে মনস্থির করলাম গ্রামে যাবো। এছাড়া আর কোন পথ নেই। সারাদিন টিউশনি করার চেয়ে একটা চাকরি পেলে বেশ ভালো হবে। আর এজন্য গ্রামে আমাকে যেতেই হবে। যেই ভাবা সেই কাজ। যাওয়ার প্রস্তুতি নিলাম। দাদু ভাই আর দাদি মানা করল যাবার জন্য কিন্তু আমার মন মানতে চাইছে না। কতোদিন হলো মা আর বাবা কে দেখি নি। তাদের দেখার জন্য আমার মন ছটফট করছে। এই সুযোগে দেখে আসবো তাদের।
কিন্তু গেলেই তো আরেক বিপত্তি! আমি যে বিয়ে থেকে পালিয়ে এসেছি। যদিও সেই ঘটনার কয়েকমাসও পার হয়ে গেছে, মনে হচ্ছে সবাই সবকিছু ভুলে যাবে। ভুলে যাবার’ই কথা কিন্তু আমাকে দেখলে যদি মনে পরে যায় তখন.. তখন কেউই ছেড়ে কথা বলবে না। দু চারটে কথা না শুনালে কি তাদের মন ভরবে।
তাই বলে ভয় পেয়ে বসে থাকার কোন মানে নেই। আমি যখন বলেছি তখন যাবোই। অতঃপর ব্যাগ গুছিয়ে বের হয়ে এলাম। রাস্তায় আসার সময় দাদু ভাই আর দাদি’র কথা খুব মনে পড়ছিল। শুধু ভাবছি আর কি দেখা হবে তাদের সাথে। যদি দেখা না হয় তখন! তারা কি ভুলে যাবে আমাকে। মনে পড়বে আর আমায়!
এসব ভেবে একটা দীর্ঘশ্বাস নিলাম। নিজেকে বোঝালাম নেগেটিভ যেমন আছে তেমন পজেটিভ ও আছে। হয়তো একটু বেশিই ভাবছি আমি।
রেলওয়ে স্টেশনে আসার পর ট্রেন খুঁজতে লাগলাম। টিকেট কেটেই রেখেছিলাম। কিছুক্ষণ খোঁজার পর ট্রেন পেয়েও গেলাম। মাইকে বলছে ১০ মিনিট পর ট্রেন ছাড়বে। দ্রুত উঠে গেলাম ট্রেনে!
অতঃপর এসে সিট খুঁজতে লাগলাম। সিট খুঁজতে খুঁজতে ট্রেন ছেড়ে দিল। তবুও আমি সিট খুঁজে পাচ্ছিলাম না। অনেক খোঁজাখুঁজি’র পর সিট পেলাম। অতঃপর সেখানে ধপাস করে বসে পড়লাম। ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে মুখে দিলাম। সামনে চোখ পড়তেই পানি খেতে গিয়েও বিষম লেগে গেলে আমার! আমি রীতিমতো হতবাক হয়ে গেছি!
#চলবে….
#ভালোবাসার_ফোড়ন_২
#মিমি_মুসকান
#পর্ব_১৮
আমি চোখ বড় করে করে সামনে তাকিয়ে আছি। আমার ঠিক সামনে বরাবর বসে আছে আহিয়ান! অনেকদিন পর আজ দেখলাম তাকে। সেদিনের ওই ঘটনার পর কখনো তার মুখোমুখি হয় নি। আমি তাকে এখানে দেখে বেশ অবাক। কিন্তু উনি! উনি অবাক হওয়া তো দূর, উনি হয়তো জানেন ও না তার আশপাশ কি চলছে। তিনি খুব মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে আছে তার ফোনের দিকে। পারলে হয়তো তার ভিতর’ই ঢুকে পড়ে।
আমি পানির বোতল টা ব্যাগে রেখে ভ্রু কুঁচকে উনার দিকে তাকিয়ে আছি। কেন জানি মনে হচ্ছে এটা আমার কল্পনা! আমি একটু উঁকি মেরে উনাকে দেখার চেষ্টা করছি। যদিও উনার মুখের সামনে ফোন তবুও আমি উনাকে চিনতে পরেছি। কারন উনার এই ভঙ্গি টা আমার বেশ পরিচিত। এর আগেও তাকে এমন ভাবে দেখেছি আমি।
আমি একবার এদিক একবার ওদিক করে উনাকে দেখছি। কিন্তু উনি পুরো মনটাই ফোনের ভিতর। এর মাঝেই হঠাৎ কেউ আমাকে ডাকে। আমি চমকে উঠে তাকিয়ে দেখি আকাশ ভাইয়া! তিনি আমাকে দেখে বেশ অবাক। আকাশ ভাইয়া বলে উঠে,
“নিহা তুমি এখানে!
আকাশ ভাইয়া’র আওয়াজ এ আমি হতবুদ্ধি’র মতো আহিয়ান’র দিকে তাকাই। আকাশ ভাইয়া’র মুখে আমার নাম শুনে হয়তো তিনি আমার দিকে তাকালাম। দু’জনের চোখাচোখি হয়ে গেল। আমিও নিশ্চিত হলাম এটা আমার স্বপ্ন না সত্যি! আমি অবাক হয়ে চোখ বড় বড় করে তাকে আছি আর উনি চোখ ছোট ছোট আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
হঠাৎ’ই উঠে চলে গেলেন। আমার কাছে বিষয়টা অদ্ভুত লাগল। সেদিনের কথা মনে পড়ল। একারণেই কি আমাকে দেখেই কি উঠে চলে গেলেন তিনি। আমি মাথা নিচু করে বসে রইলাম। আকাশ ভাইয়া আমার সামনে বসে বলল,
“কেমন আছো অনেক দিন পর দেখা!
আমি মাথা তুলে হেসে বলি,
“ভালো ভাইয়া, আপনি!
“হুম ভালো। তা কোথায় যাচ্ছো তুমি?
ভাইয়ার কথা শুনেই বুক মোচর দিয়ে উঠল। এখন’ই জিজ্ঞেস করবে তোমার সাথে সে কোথায় যার সাথে তুমি থাকো। তার সাথে কি এখন আর থাকবে না। গ্রামে যাচ্ছি শুনলেই নির্ঘাত বলবে যে “গ্রামে কেন একা যাচ্ছো! না জানি আর কতো কি?
আমি এসব ভাবছিলাম তখন ভাইয়া বলে উঠল,
“গ্রামে যাচ্ছো!
আমি থমকে গেলাম। অতঃপর মাথা নেড়ে নিচু করে রইলাম। মিথ্যে বলার কারনে নিজের মধ্যে অপরাধ বোধ জাগছে। তারা এতোটাও খারাপ ছিল না যতটা খারাপ আমি ভেবেছিলাম। ভাইয়া সিটে হেলান দিয়ে বসে আমার দিকে তাকিয়ে বলে উঠেন,
“সত্যি তোমার সাহস আছে, যে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে একা থাকতে শহরে এলে আবার সেই গ্রামেই যাচ্ছো! কেন?
আমি হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। ভাইয়া আমার তাকিয়ে হেসে বলল,
“মানুষ কে অবাক করতে আমার দারুন লাগে। আর বিশেষ করে তুমি! তুমি অবাক হলে চোখ গুলো গোল আলুর মতো বড় করে ফেলো।
আমি ভ্রু কুচলাম! ভাইয়া এবার জোরে হেসেই বলল,
“চিল! আমি জানি সব। তুমি মিথ্যে বলেছিলে সেদিন আর আজ তা ধরা খেয়ে গেল। তাই না! হা হা হা।
অবাক স্বরে,
“আপনি কি করে মানে!
“আমি তো এটা ভাবিও নি যে তুমি একা থাকো। এটা তো শুধু আহিয়ান ভেবেছিল, যখন প্রথমবার তোমাদের বাসার দাদু’র সাথে কথা বলেছিলো। কথায় কথায় তিনি নাকি বলেছিলেন, “মেয়েটা বড্ড কষ্ট করে বুঝলে, দিন রাত খাটাখাটুনি করে বেঁচে থাকতে। খুব মায়া লাগে মেয়েটার প্রতি যদি কিছু করতে পারতাম”!
ভাইয়া আবারো এক দফা হাসে অতঃপর বলে,
“বুঝলে নিহা! আহি ভেবেছিল তোমরা হয়তো লিভ ইন এ থাকো। কিন্তু লিভ ইন এ থাকার জন্য ও তো একজন কে দরকার হয়, সেইজন তো তোমার নেই। তবুও সেদিন আহিয়ান কিছু জিজ্ঞেস করে নি। শুধু শুনল, তারপর সেদিন আমি আর আহি গেলাম চা খেতে আরে যেদিন নিতি তোমায় সরি বলল সেদিন! সেদিন বসে বসে কথার ছলে তোমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তখন সব জানলাম!
ভাইয়ার কথা শুনে আমি লজ্জায় মাথা নিচু করে রইলাম! ভাইয়া বলে উঠে,
“আরে এটা কি, মন খারাপ করছো কেন। এটাতো স্বাভাবিক, একজষ অচেনা লোক কে তুমি তোমার সব ইনফরমেশন দিবে না। কিন্তু নিহা তুমি একটা কাজ ঠিক করো নি। আমি বার বার তার কথা জিজ্ঞেস করার পরও তুমি সত্যি টা বলো নি! নাকি আমাদের বিশ্বাস করো নি।
“ছিঃ ছিঃ ভাইয়া এটা কি বলছেন। আসলে সত্যি টা বলার সুযোগ পায় নি। আপনারা খুব ভালো মানুষ, অনেক সাহায্য করেছেন আমায়।
“জানো নিহা আমি যখন এই কথাটা শুনলাম তখন সে কতো হাসলাম। আমি তো ভেবেই নিয়েছিলাম তুমি একজন বিশেষ কারোর জন্য বিয়ে আসর থেকে পালিয়ে গ্রাম থেকে শহরে চলে এসেছো। কিন্তু না আমি ভুল ছিলাম। সব মেয়েরা বিশেষ কারো জন্য আসে না। নিজের জন্যও কেউ কেউ আসে।
আমি ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে রইলাম। ভাইয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন,
“ব্যাপার কি এখন তাহলে চলছ যাচ্ছো কেন? কোন সমস্যা! আরে আমিও না, জিজ্ঞেস করছি সমস্যা আছে কি না, যেখানে তোমার জীবন পুরোটাই সমস্যা’য় ভরপুর। একা মেয়ে একটা সমাজে বেঁচে থাকা চারটে খানি কথা নয়। কিন্তু তাই বলে আবারো গ্রামে চলে আসছো।
“মা বাবা কে খুব মনে পড়ছে ভাইয়া! কি করবো বলো,কখনো থাকি নি তাঁদের ছাড়া।
“মেয়েরা যেমন মায়াবী হয়, তেমন নিজেরাও মায়া’য় আটকে থাকে। বুঝতে পারছি! আচ্ছা শোন..
বলেই তিনি ব্যাগ থেকে একটা প্যাকেট বের করলেন। অতঃপর সেই প্যাকেট আমার হাতে দিয়ে বললেন,
“নাও!
“কি এটা?
“এটা তোমার, তোমার জিনিস তোমায় ফেরত দিচ্ছি।
“মানে?
“মানে এটাই নিহা, নিতি টাকা টা ফেরত দিয়ে দিয়েছে তবে তোমাকে দেবার সুযোগ হয়ে উঠেনি। ভেবেছিলাম ফিরে গিয়ে টাকা টা দেবো তবে ভালোই হলো এখানে তোমাকে পেয়ে।
“নিতি আপু টাকা দেয় নি আপনারা তার থেকে নিয়েছেন। আবারো ঝগড়া করেছেন।
“না এবার ঝগড়া করি নি, শুধু সিসি টিভি ক্যামেরার ফুটেজ দেখিছিলাম। এতেই কাজ হয়েছে। ওর অস্বীকার করার কোন সুযোগ ছিল না। নাও! এটা নিতে দ্বিধা করো না কারন এটা তোমার। মনে রাখবে নিজের জিনিস নিজের নিতে লজ্জা নেই। কারন এটা তোমার!
আমি ভাইয়ার হাত থেকে প্যাকেট টা নিয়ে ব্যাগে রাখলাম। ভাইয়া আবারো ব্যাগ থেকে দুটো চিপস বের করে আমাকে একটা দিল আরেকটা নিজে নিয়ে খেতে লাগল। আমিও চিপস খেতে লাগলাম। ভাইয়া কে উদ্দেশ্য করে বলে উঠি,
“আপনারা কোথায় যাচ্ছেন!
“যেখানে তুমি যাচ্ছো সেখানেই তবে অন্য কাজে।
“কি কাজ!
“কাজটা আমাদের না আহিয়ানের। তবে তোমাদের গ্রাম টা খুব সুন্দর তাই আমরাও চলে এলাম ঘুরতে!
“গ্রামের মতো সৌন্দর্য সবখানে পাওয়া যায় না।
“ঠিক বলেছো। তা শোন কেন এসেছিলাম..
বলেই তিনি একটু নড়েচড়ে বসলেন। আমিও আগ্রহ নিয়ে তার দিকে তাকালাম। তিনি বলতে শুরু করলেন,
“এটা বুঝছো অনেক আগের একটা প্রেম কাহিনী। দু’জন প্রেমিক প্রেমিকার গল্প। তারা দুজন দুইগ্রামেই বাস করতো। তারা দুজনেই ছিলো জমিদার বংশের। আর এই বংশ নিয়ে তাদের মাঝে বেশ ঝগড়া বিবাদ ছিল, সোজা বলতে গেলে দুই গ্রামে ঝামেলা ছিল। তো তোমার গ্রামে থাকতো এক জমিদার আরেক জমিদার থাকতো তোমাদের পাশের গ্রামে। তোমাদের গ্রামে জমিদারের ছোট ছেলে নাহিয়ান চৌধুরী তার ভালোবাসতো তার পাশের গ্রামের জমিদারের একমাত্র মেয়েকে। মেয়েটা নাকি খুব সুন্দরী ছিল আর অহংকারী ও ছিল। যার কারনে নাহিয়ান প্রতি বার’ই তার কাছে প্রত্যাখান হয়েছিল। তো একদিন হলো কি? ( আমার দিকে উদ্দেশ্য করে.. ) নিহা তুমি ইন্টারেস্ট পাচ্ছো তো!
আমি চিপস মুখে দিয়ে মাথা নাড়লাম। উনি আবারো নড়চড়ে বসে বলে উঠে,
“তো একদিন হলো কি সেই নাহিয়ান চৌধুরী ওই অহংকারী মেয়েকে তার বিয়ের আসর থেকে তুলে আনল।
“কিহহ বিয়ের আসর থেকে!
“হুম কারন নাহিয়ান চৌধুরী তো ওই মেয়েকে ভালোবাসতো। আর মেয়েটার বিয়ে অন্য জনের সাথে ঠিক হয়েছিল তাই রেগে তিনি তাকে তুলে আনল। তিনি কিন্তু বেশ রাগি ছিলো বুঝলে।
“হুম হুম তারপর!
“তারপর দুই গ্রামের মাঝে তো খুব ঝগড়া, তাদের মেয়েকে তুলে আনা হয়েছে সে কি আর বসে থাকবে নাকি। কিন্তু তাদের কাউকে খুঁজে পেলো না। কেন পেলো না জানো!
“কেন?
“কারন নাহিয়ান সেই মেয়েকে নিয়ে সোজা শহরে চলে এলো। এখানে এসে শুরু করল ব্যবসা, যেহেতু জমিদার ছিল তাই শহরেও তার কিছু সম্পত্তি ছিল। এগুলোই নিয়েই সে ব্যবসা শুরু করল।
“আর সেই মেয়েকে!
“তাকে! তাকে এনে নাকি একা অন্ধকার ঘরে ৭ দিন আটকে রেখেছিল। ৭ দিন ধরে নাকি সেই মেয়ে সূর্যের আলো দেখে নি। আর তার খাবার ছিল পান্তা ভাত, পেয়াজ আর কাঁচা মরিচ!
“কিহ!
“হ্যাঁ এই ৭ দিন ধরে মেয়ে শুধু এগুলোই খেয়েছে। প্রথম দুদিন অবশ্য রেগে ফেলে দিয়েছে, কারন সে অহংকারী ছিল। কিন্তু পরে যখন দেখল না খেয়ে থাকতে পারবে না তখন এগুলোই সে খেতে লাগল।
“অতঃপর!
“অতঃপর নাহিয়ান চৌধুরী সেই মেয়েকে ঘর থেকে বের করল। মেয়ে তো বেশ রেগে ছিল। সে নাহিয়ানের সাথে কথা বলা তো দূর তার দিকে ফিরেও তাকায় নি। কিন্তু নাহিয়ান হার বার পাত্র ছিল না। সে মেয়েকে সেদিন নিজের হাতে রান্না করে খাওয়ালো। খুব ভালো ভালো খাবার ছিল তাই মেয়েটা নাহিয়ানের হাতেই সে খাবার গুলো খেলো। শুধু সেদিন না এরপর থেকে প্রতিদিন’ই সে নাহিয়ানের হাতে খেতো। অতঃপর একসময় সে নাহিয়ান কে ভালোবেসে ফেলল। তারপর তারা বিয়ে করল।
“বিয়ের পর কি আর গ্রামে আসে নি।
“এসেছে তো! তবে সাথে করে একজন কে নিয়ে এসেছিল যাকে দেখে তাদের পুরো পরিবার তাদের মেনে নিল। সে ছিল তাদের চোখের মনি!
অতঃপর সেই চোখের মনি ধীরে ধীরে বড় হলো, বিদেশ গেলো লেখাপড়া করতে। তারপর একজন রূপসী মেয়ে কে দেখে বিয়ে করে শহরে থেকে গেল। তবে শহরে থাকলেও বাবা মার সাথেও তাদের সম্পর্ক অনেক ভালো ছিল। আসলে তার বাবা চাইত এই জমিদারি ধরে রাখতে। আর তার চিন্তা ছিল অন্যরকম। আর তারা দুজনেই দুজনের মত কে সমর্থন করত। ছেলে নিয়মিত গ্রামে আসত মা বাবা’র সাথে দেখা করতে। তার মা চাইত তার মৃত্যু যেন এই গ্রামেই হয়।
“( আমি স্থির চোখে তাকিয়ে আছি ভাইয়ার দিকে। )
ভাইয়া আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল,
“অতঃপর সেখানেই তাদের মৃত্যু হলো। প্রথমে মারা গেলেন নাহিয়ান চৌধুরী’র বিবি অতঃপর ৫ মাসের মধ্যেই মারা গেলেন আহিয়ান চৌধুরী! কি বলো তো খুব ভালোবাসা ছিল তাদের দু’জনের মাঝে তো তাই একজন কে ছেড়ে অন্যজন বেশিদিন থাকতে পারল না।
“দারুন ছিল!
“আচ্ছা নিহা একটা কথা বলো তো সেই নাহিয়ান চৌধুরী কে তুমি চিনো!
আমি হেসে মাথা নাড়লাম! ভাইয়া ভ্রু কুঁচকে বলে উঠে,
“কে?
আমি দাঁত বের করে হেসে বলি,
“আহিয়ান!
ভাইয়া আমার দিকে তাকিয়ে জোরে হেসে দিল। আমরা দু’জনেই হাসতে লাগলাম। ভাইয়া বলে উঠে,
“বাহ বেশ ধরলে তো!
“হুম! সেই নাহিয়ান হলো আহিয়ানের দাদু আর অহংকারী মেয়েটা হলো তার দাদি ঠিক না!
“হুম ঠিক! নাহিয়ান থেকেই আহির বাবা ওর নাম রেখেছে আহিয়ান। আর যখন তুমি পালিয়েছিলে তখন আমরা ওর দাদি’র মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে অনাথ আশ্রমে বাচ্চাদের খাওয়াতে এসেছিলাম। ও তোমাকে বলা হয় নি এখানে একটা অনাথ আশ্রম আছে। যা ওর দাদি তৈরি করেন মানে মিসেস চৌধুরী!
“হুম! আচ্ছা ভাইয়া আহিয়ান পুরো উনার দাদা’র মতো হয়েছে নাহ!
“এই তুমি কিভাবে বুঝলে! জানো তো ওর বাড়িতে গেলে ওর মা প্রায়’ই এই কথা বলেন। দাদু’র ডুবলিকেট!
“আচ্ছা যদি উনিও উনার বউ কে ওরকমভাবে আকটে রাখে তো!
আমার কথায় এবারও আরেকদফা হাসির শব্দ উঠল। ভাইয়া হাসতে হাসতে বলল,
“নিহা তুমি পারোও বটে কি..
অতঃপর ভাইয়া চুপ হয়ে গেল। ভাইয়া চুপ হবার কারনে আমিও চুপ হয়ে গেলাম। দেখলাম ভাইয়ার দৃষ্টি আমার পিছনে! আমিও পিছনে ঘুরলাম তাকিয়ে দেখি আহিয়ান দাঁড়িয়ে আছে। তাকে দেখে আমরা দু’জনেই নিস্তব্ধ!
উনি এসে উনার সিটে বসে কিছু চাবাতে লাগলেন। আমি ভুল না করলে এটা চুইংগাম আর যদি তাই হয় তাহলে এতক্ষণ উনি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট খেয়েছিলেন। হ্যাঁ এটাই হবে!
আমি মাথা নিচু করে চুপচাপ বসে রইলাম। কিছুক্ষণ বাদেই আকাশ ভাইয়া’র ফোন বেজে উঠল। তিনি মুচকি হেসে ফোনটা হাতে নিয়ে চলে গেলেন। আমি এবার একটু একটু মাথা উঠিয়ে উনার দিকে তাকালাম। দেখলাম উনার দৃষ্টি এখন ফোনে। আমি হালকা একটু কাশলাম। এতে উনার ভাবভঙ্গি পরিবর্তন হলো না। অতঃপর আমি আস্তে করে বলে উঠি,
“সরি!
( উনি ফোনের ভিতর ঢুকে যাবে মনে হচ্ছে )
“আসলে সেদিন আপনাকে এভাবে এতো কিছু বলা ঠিক হয় নি।
( এখন মনে হচ্ছে ফোনের ভিতরে ঢুকে গেছেন )
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বসে পড়লাম। কিছুক্ষণ পর উনি ফোন নামিয়ে পাশে রাখলেন। অতঃপর আমার দিকে তাকিয়ে তাকালেন। আমি উনার চাহনি দেখে খানিকটা ভয় পেয়ে গেলাম। আশেপাশে কেউ নেই এটা ভেবেই বুক কেঁপে উঠল। থমতম খেয়ে বলি,
“দেখুন আমি খুব সরি, প্লিজ!
“আমি বাঘ না যে তোমায় খেয়ে ফেলবো।
উনার কথায় আমি মাথা নিচু করে নেই। হঠাৎ উনি বলে উঠেন,
“তবে সত্যি ভুল টা আমার’ই ছিল!
আমি অবাক হয়ে উনার দিকে তাকালাম। উনি বলে উঠেন,
“আমার বোঝা উচিত ছিল নিতি বসে থাকবে না। কিন্তু তাই বলে তুমি আমাকে এতো কথা শুনাবে!
( আজব তো বলছে উনার দোষ আবার বলছে আমি উনাকে বেশি কথা শুনিয়েছি! তবুও আমিই আবার বলে উঠি..) সরি!
উনি অর্ণ’র মতো নিজের মুখটা ঘুরিয়ে নেয়। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রই। একদিন অর্ণ এমনটা করেছিল। আমি ভুল করে ওকে আস্তে মারতে গিয়ে জোরে মেরে ফেলেছিলাম। সে রেগে আমার সাথে সেদিন আর কথাই বলে নি। পড়া শেষ করে উঠে চলে গেছিল। পরদিনও তার রাগ কমে নি তাই আমি তাকে সরি বলেছিলাম।সেদিন সে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল তখন আমি হেসে ছিলাম। কিন্তু এখন হাসবো কি না বুঝছি না কারন এটা অর্ণ’র মতো একটা বাচ্চা কে মানায় উনাকে না। তবুও বলে উঠি,
“সরি! এই নিয়ে তিন বার না এক, দুই, তিন, চার হ্যাঁ চার বার সরি বলেছি।
“তো! তোমার এটাই করা উচিত। হাজার বার সরি বলা উচিত!
“কেন হাজার বার বুঝি অপমান করেছিলাম।
উনি ছোট ছোট চোখ করে আমার দিকে তাকালেন। আমি একটা মুখ ভেংচি দিয়ে বাইরের দিকে তাকালাম। উনি বলে উঠেন,
“এতো ভাব নিয়ে কিভাবে চলো তুমি!
“এভাবেই চলি,আর হ্যাঁ ভাব তো মেয়েদের’ই থাকবে না।
“কিন্তু তুমি অতিরিক্ত।
“ক’দিন’ই বা চিনেন আমায় যে এইকথা বলছেন।
“যত’দিন’ই চিনি না কেন, তবুও বেশ ভালোই বলতে পারি তোমার সম্বন্ধে!
“আমিও বলতে পারি আপনার সম্পর্কে!
“কি জানো শুনি!
“এটাই আপনি পুরো আপনার দাদু’র মতো।
উনি খানিকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। অতঃপর বাইরের দিকে তাকালেন। আমিও আর কোন কথা না বলে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইলাম। আর কোন কথা হলো না দুজনের মাঝে।
.
ট্রেন এসে স্টেশনে নামল রাতের দিকে। তখন রাত খুব গভীর। আমি ইচ্ছে করেই রাতে নামার পরিকল্পনা করি যাতে গ্রামের কেউ আমায় চিনতে না পারে। এখানে আকাশ ভাইয়া সোজা বলেদিয়েছেন তিনি আমাকে বাসায় দিয়ে আসবে। মোটেও আমাকে একা ছাড়বে না।
ট্রেন থেকে নামতেই শরীর শিউরে উঠল। কাঁধের ব্যাগ টাকে হাত দিয়ে ধরে ঘ্রাণ নিতে লাগলাম গ্রামের। বেশি একটা ভিড় নেই। মানুষের আনাগোনা অনেকটা কম। আহিয়ান, আকাশ,নাহান আর আনাফ ভাইয়া দাড়িয়ে কাউকে খুঁজছে। হ্যাঁ তারাও এসেছিল তাদের সাথে তবে তাদের সিট আলাদা পড়েছিল। আমাকে দেখে তারা অবাক হলাম আমি অবশ্য হলাম না। কারন আমার ধারনা ছিল তারা থাকবে।
আহিয়ান হঠাৎ করেই সামনে এগিয়ে কারো কাছে গেল। আমি তার দিকে তাকতেই সে বিস্ময় চোখে আমার দিকে তাকাল আর আমার ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটল!
#চলবে….
#ভালোবাসার_ফোড়ন_২
#মিমি_মুসকান
#পর্ব_১৯
আহিয়ান হঠাৎ করেই সামনে এগিয়ে কারো কাছে গেল। আমি তার দিকে তাকতেই সে বিস্ময় চোখে আমার দিকে তাকাল আর আমার ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটল! সে আর কেউ না ছিল আমার চাচা। তিনি আমাকে দেখে যেমন বিস্ময় হয়ে ছিলেন ঠিক তেমন’ই অবাক। তিনি অবাক চোখে বলে উঠে,
“মা নিহা!
“চাচা!
বলেই দৌড়ে তার কাছে গেলাম। চাচা আমার মাথায় হাত রেখে বলেন,
“তুই এখানে!
“মা কেমন আছে, বাবা’র শরীর কেমন? তুমি ভালো তো?
“আমরা সবাই তো ঠিক আছি কিন্তু তুই এখানে কেন?
“তোমাদের দেখতে খুব ইচ্ছে করছিল তাই চলে এলাম।
চাচা খানিকক্ষণ আমার দিকেই তাকিয়ে রইল। আমি খেয়াল করলাম শুধু চাচা না আহিয়ান, আকাশ ভাইয়া তারা সবাই অবাক। হঠাৎ চাচা অস্থির হয়ে বলে উঠে,
“তুই এখান থেকে চলে যা।
“কি বলছো এসব চাচা। এতোদিন পর এলাম মা আর বাবা কে একটু দেখতে দিবে না।
“এসব পরে দেখা যাবে তুই এখান থেকে এক্ষুনি চলে যা। কিছুক্ষণ পর’ই ট্রেন ছাড়বে আয় তোকে আমি উঠিয়ে দিচ্ছি!
বলছি তিনি আমার হাত ধরে সামনে আগাতে থাকেন। তখন হঠাৎ করেই আহিয়ান তার সামনে দাঁড়িয়ে যায়। চাচা তার দিকে তাকায়। আকাশ ভাইয়া বলে উঠে,
“চাচা আপনি কি করছেন, এতো রাতে একটা মেয়েকে একা পাঠিয়ে দিচ্ছেন।
“আপনি বুঝতে পারছো না বাবা ও এখানে থাকলে অনেক সমস্যা হইবো।
আহিয়ান বলে উঠে,
“কি এমন সমস্যা হবে।
“আপনারা জানেন না কিছু, এখন সময় নেই এতো কিছু বলার।
“জানি না তো জানব। এর যাই হোক না কেন এদেশে আইন আছে। কেউ কিছু করলে আপনারা কেন ছেড়ে দিবেন।
“আমরা গরীব মানুষ বাবা। দিনরাত খাটার পর পরে চারটে ভাত জুটে কপালে। কিন্তু মান সম্মান অনেক আছে আমাদের। আমাদের শুধু এই একটাই মেয়ে। তার জীবন টা নষ্ট হইতে দেবো না আমি।
আকাশ ভাইয়া বলে উঠে,
“আমরাও দেবো না। আমরা সবাই আছি এখানে। দেখো নেবো সবকিছু!
“কিন্তু বাবা!
আকাশ ভাইয়া চাচা’র ঘাড়ে হাত রেখে বলে,
“চাচা আর কথা বাড়িয়েন না। দেখুন নিহা কে, এতো শখ করে এসেছে মা আর বাবা কে দেখবে। এতটুকু ইচ্ছে কি রাখবেন না ওর!
আমি চোখ ভরে উঠছিল। চাচা আমার দিকে তাকাতেই চোখের থেকে পানি গড়িয়ে পড়ল। চাচা আর কিছু বলতে পারলেন না। অবশেষে চাচা আমাকে নিয়ে যেতে রাজি হলেন। সবাই মিলে হাঁটা শুরু করলাম!
কিন্তু আমার চোখের পানি যেন থামছে না। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছি আমি। হঠাৎ করেই আমার সামনে কেউ রুমাল ধরল। তাকিয়ে দেখি আহিয়ান! আমি ঝাপসা ঝাপসা চোখে তার দিকে তাকালাম। উনি বলে উঠেন,
“রুমাল নিতে বলেছি আমাকে দেখতে বলেনি!
“কিন্তু..
কিছু বলার আগেই আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে তিনি হেঁটে চলে গেলেন সামনে। আমি রুমাল দিয়ে চোখের পানি মুছলাম। বাইরে এসে দেখি একটা বড় মাইক্রো গাড়ি। চাচা নিয়ে এসেছিল আহিয়ান দের নেবার জন্য। ড্রাইভার ছিল গাড়িতে! আমরা সবাই সেই গাড়িতেই বসলাম। কিন্তু এখনো আমার কাছে ব্যাপারটা পরিষ্কার না। চাচা কেন এখানে? উনি তো এমন ধরনের কোন কাজ করে না।
গাড়ি চলছে নিজ গতিতে, একটু হেলেদুলে বলা যেতে পারে। গ্রামের রাস্তা ওতোটা ভালো না। আহিয়ান ছিল ড্রাইভার এর সাথে সামনের ছিটে, তার পরের সিটে নাহান আর আনাফ ভাইয়া, অতঃপর আমি, চাচা আর আকাশ ভাইয়া! আহিয়ান চাচা কে উদ্দেশ্য করে বলে উঠে,
“রহিম চাচা’র পরিবার কেমন আছে চাচা!
“ভালোই আছে।
আকাশ ভাইয়া বলে উঠে,
“রহিম চাচা হঠাৎ কিভাবে মারা গেল।
“জানি না বাবা, সন্ধ্যায় আমাদের সবার সাথে চা খেল, কথা বলল তারপর বাসায় গিয়ে খাইয়া দাইয়া ঘুমাইলো। মাঝরাতে নাকি হঠাৎ কইরা বুকে ব্যাথা উঠল। আর মানুষটা মইরা গেল। খুব ভালা মানুষ ছিল গো!
নাহান ভাইয়া বলে উঠে,
“হ্যাঁ অনেক ভালো মানুষ ছিলেন। আমাদের সাথে অনেক হাসি তামাশা করত বরাবর।
আনাফ ভাইয়া বলে উঠে,
“তার হঠাৎ মৃত্যুতে অনেকটা অবাক হয়েছি আমরা সবাই!
আকাশ ভাইয়া বলে উঠে,
“তখন পরিক্ষা চলছিল বলে আসতে পারি নি। তবে শুনলাম আন্টি নাকি লোক পাঠিয়েছিল।
“হ্যাঁ ম্যাডাম লোক পাঠাইছিল। তারা রহিমের কাম দিলো আমার ঘাড়ে । এছাড়া তার পরিবারের সব খরচ নিলেন। জানো তো রহিমের দুইটা সেয়ানা মাইয়া আছে। আল্লাহ যদি এখন ভালোয় ভালোয় এই দুই মাইয়ারে একটা ব্যবস্থা করে।
আহিয়ান বলে উঠে,
“চিন্তা করবেন না চাচা। আমরা দেখে রাখবো। তা আপনার কাজ কর্মে কোন অসুবিধা হচ্ছে না তো।
“প্রথম প্রথম একটু হইতো, কখনো করি নাই তো। এখন সব বুঝপার পারছি। আমি কিন্তু খুব পাইছিলাম গো বাবা তাই কামটা প্রথম নিতে চাইনি।
“এখন ভয় কমেছে!
“কি করমু বাবা, পেটের দায় যে বড় দায়। এর মাঝে ভয় ডর সব পানির মতো মিশে যায়! একলা মানুষ তবুও কতো কিছু ভাবতে হয় কও! কিন্তু এখন একা না নিহা’র মা বাপ দু’জনেই থাকে আমার লগে।
বলেই আমার দিকে তাকিয়ে মাথায় হাত দিলেন। আমি মাথা নিচু করে রইলাম। সবার কথাবার্তা আমি কিছুটা হলেও বুঝলাম। তারা যার কথা বলছিল রহিম চাচা তিনি আগে আহিয়ানদের বাড়ি দেখাশোনা করতো এখানে। তিনি মারা যাবার পর এই কাজ এখন আমার চাচা’র উপর।
.
অতঃপর গাড়ি থামল এক জমিদার বাড়ির সামনে। বাড়িটা সত্যি’ই বেশ বড়। এখন রাতের মাঝে এটা একটা ভূতের বাড়ির মতো লাগছে। চাচা তাদের নিয়ে বাড়িতে গেলেন। আমিও গেলাম তাদের পিছু পিছু! বাড়িটা ভেতর থেকে পুরোটাই রাজকিয় একটা অবস্থা। বাড়িটা অবশ্য আমি দূর থেকেই কয়েকবার গেছিলাম কিন্তু কখনো ভিতরে আসি নি। আজ’ই এলাম প্রথম।
বাড়ির প্রত্যেকটা জিনিস অনেক যত্ন করে রাখা হয়েছে। চাচা তাদের সব কিছু দেখাতে লাগল। বাড়ির সব কাজের লোকদের সব কিছু বলে এলো। বার বার করে বলল যেনো তাদের কোন অসুবিধা না হয়। অতঃপর আমাকে নিয়ে বের হলেন। বের হবার সময় আহিয়ান একবার জিজ্ঞেস করল,
“এতো রাত করে যাবেন, এখানেই থাকুন।
“না বাবা আমার বাড়ি এই কাছেই ১০ মিনিট লাগবো যাইতে।
“আমি যাবো আপনাদের সাথে।
“না বাবা যেতে পারবো। আপনি গেলে রাস্তা হারাইয়া ফেলবেন তখন আবার আরেক সমস্যা!
“সাবধানে যান তাহলে,আর হ্যাঁ আমাকে আপনি না বলে তুমি বলুন।
“আচ্ছা বাবা তুমি যা বলো। আমি আবার কাল সকালে আসমু।
“খুব সকালে আসবেন না, কেউই তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠবে না।
“আইচ্ছা বাবা গেলাম আমি!
অতঃপর আমি আর চাচা বেড়িয়ে গেলাম। রাস্তা খুটখুটে অন্ধকার! চাচা’র হাতে একটা হারিকেন! সেটা দিয়েই দু’জনে আসছি রাস্তা দিয়ে। আসার সময় অনেক গল্প করলাম দুজনে। অতঃপর বাড়িতে আসার পর চাচা মা কে ডাক দিলেন। মা এসে আমাকে দেখে হতবুদ্ধি’র মতো দাঁড়িয়ে রইলেন। আমি দৌড়ে গিয়ে মা কে জরিয়ে ধরলাম। মা আমাকে দেখে যত খুশি হলেন তার চেয়ে বেশি ভয় পেলেন। এরপর কি হবে এটা ভেবেই তিনি ভয় পাচ্ছেন!
বাবা’র সাথে দেখা করতে গিয়ে দেখি তিনি ঘুমিয়ে আছেন। আমি আর ডাকলাম না তাকে। দু”চোখ ভরে দেখলাম তাকে। অতঃপর চলে এলাম মার কাছে। দুজনেই সারারাত বসে বসে কথা বললাম। চাচাও জিজ্ঞেস করল আহিয়ান কে আমি কিভাবে চিনি। আমি তাদের দুজনকেই সব বললাম!
.
কথা বলতে বলতে মায়ের কোলেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘুম যখন ভাঙল দেখি সূর্য তখন উদয় হবে। আমি উঠে গেলাম ঘুম থেকে। গোসল করে এসে বসলাম নাস্তা বানাতে। সবার জন্য গরম গরম রুটি বানালাম। আর গতকালের কিছু সবজি ছিল সেগুলো গরম করলাম। ততোক্ষণে মা উঠে গেছেন। তিনি উঠে উঠোন ঝাড়ু দিতে লাগলেন।
আমাদের বাড়ি পুরোটাই মাটির তৈরি, তার উপর টিনের চালা। এখানে ঘর মোট ৩ টা। আর একটা গোয়াল ঘর যেখানে আমাদের দুইটা গরু থাকে। যদিও সেগুলো আমাদের না চাচা’র! আমাদের গুলো হয়তো ভাবীর কাছে। তিনি রেখে দিয়েছেন। বাড়িটা বেশ বড় না তবে থাকার মতোই। বাড়ির গা ঘেঁষে একটা বড় আম গাছ। রাতের বেলায় এটা যত ভয়ানক লাগছিল তখন সেটা ততোটাই সুন্দর!
মা গরুদের খাবার দিয়ে গেল। এর মাঝেই বাবা উঠে গেল। বাবা আমাকে দেখে প্রথমে অনেক অবাক হলেন। অতঃপর অনেক খুশি হলেন। খুশিতে বাবা কেঁদে ফেললেন। মা’র কাছে শুনেছি তারা এখানে আসার পর নাকি মা কাজ করত। কিন্তু এখন আর করে না, চাচা করতে দেন না। মা বাবা দুজনকেই নাস্তা খেতে দিলাম। এতোদিন পর বাবা নিজ হাতে খাইয়ে দিলেন আমায়। আমিও বসে বসে খেলাম। আমার চাচা এখনো ঘুমাচ্ছেন। আমার চাচা কিন্তু অনেক ঘুম কাতুরে। প্রচুর ঘুমাতে পারেন তিনি। ভালোই হলো আহিয়ান তাকে বলল একটু দেরি করে যেতে আমি নিশ্চিত তিনি দেরি করেই উঠবেন ঘুম থেকে!
একটু একটু শীত পড়েছে, তার সাথে কুয়াশা। আমি বাবা’র পাশে বসে তার হাত পায়ে সরিষার তেল দিয়ে মালিশ করে দিচ্ছি। মা গেছেন রান্না বসানোর জন্য কাঠ জোগাড় করতে। কিছুক্ষণ পর মা এসেই চেঁচিয়ে কথা বলতে লাগলেন। চাচা কে উঠানোর জন্য’ই এভাবে কথা বলছে। তার এমন কান্ড দেখে আমি আর বাবা হাসতে লাগলাম!
কিন্তু বলতে হবে এটা কাজে দিয়েছে, কিছুক্ষণ’র মধ্যেই চাচা ঘুম থেকে উঠে গেছেন। উঠেই কানে হাত দিয়ে বসে রইলেন। আমি আর বাবা জোরে জোরে হাসতে লাগলাম!
চাচা হাত মুখ ধুয়ে আসার পর তাকে নাস্তা দিলাম খেতে। চাচা খেতে খেতে বললেন,
“তা মা কোন সমস্যা হচ্ছে না তো! সেখানে ভালো আছিস!
“হ্যাঁ চাচা অনেক ভালো আছি। একটা চাকরি জোগাড় করতে পারলে তোমাদের ও নিয়ে যাবো ওখানে।
মা বলে উঠেন,
“আমাদের আর যাওয়া, এখন এই গ্রাম’ই আমাদের একমাত্র থাকার জায়গা, মরলে এই গ্রামের মাটিতেই মরতে হবে রে মা।
“হয়েছে মা রাখো তো। পরের টা পরে দেখা যাবে। চাচা তুমি কি এখন বাইরে যাবে।
“কেন তুই যাবি নাকি।
“হ্যাঁ কতোদিন ধরে গ্রাম টা দেখি না, আজ বেড়াতে যাবো গ্রামে!
মা বলে উঠে,
“কোথাও যাওয়া লাগবে না। আমি ফুলিদের বলে দিয়েছি আসতে। ওরা আসলে এখানেই বসে গল্প করবি। এক পা বাড়ির বাইরে যাতে না যায় বুঝলি!
আমি খুশিতে হেলেদুলে মাথা নাড়ায়। ফুলি’রা আসবে তার মানে আজ সারাদিন আমি বাড়িতেই থাকবো না। তাদের সাথেই ঘুরবো। ফুলিরা হলো আমার পিচ্চি বাহিনী। আমার থেকে অনেক ছোট তারা। ফুলিরা বলতে ফুলি, মিলি, নদী আর রুবি! এরা চার জন হলো আমার সব অকাজের সাক্ষী! হি হি হি!
.
সূর্য তখন মাথায় উঠে গেছে। ফুলি ওরা সবাই চলে এসেছে। আমাকে দেখে পুরো বাড়ি মাথায় নিলো ওরা। সবাই এসে জড়িয়ে ধরল আমায়। গল্প করতে বসে পড়লাম সবাই। মা আমাদের সবাইকে বসে শাক বাছতে দিয়ে বাইরে গেছে। মায়ের কড়া আদেশ বাড়ির বাইরে যাতে পা না রাখি। তিনি যেতেই, আমি বাবা কে বলে ওদের নিয়ে পালিয়ে এলাম। অতঃপর বনে বাদারে ঘুরতে লাগলাম।
আমাদের গ্রামে বাগানের অভাব ছিল না। মুখ উড়না দিয়ে ঢেকে ৫ জন ঘুরতে লাগলাম। হঠাৎ করেই একটা পেয়ারা গাছ চোখে পড়ল আমাদের। মিষ্টি মিষ্টি পেয়ারা গুলো গাছের ডালে ঝুলছে!
কে গাছে উঠবে এটা নিয়ে তর্ক লেগে গেলো। এই সুযোগ টা আমিই নিলাম। চুপি চুপি উঠে গেলাম পেয়ারা গাছে। ধরতে গেলে আমরা চুরি করছি! এর মাঝেই কারো আসার শব্দ পেলাম। আমাকে গাছে রেখে বাকি সবাই লুকিয়ে পরল। আমি তখন সবে কয়েকটা পেয়ারা হাতে নিয়েছি। দেখতে দেখতে তারা গাছের নিচে এসে দাঁড়াল। আমি তাকিয়ে দেখি আহিয়ান! তাকে দেখেই চমকে উঠলাম আর তখন আমার হাত থেকে ফসকে একটা পেয়ারা পড়ে গেল। আমি বলে উঠি,
“আহিয়ান!
#চলবে….