#ভালোবাসার_ফোড়ন_২
#মিমি_মুসকান
#পর্ব_৪
“নিতি তোকে বলেছিলাম সাবধানে গাড়ি চালাতে, কি করলি তুই এটা!
“সরি আহি আমি বুঝতে পারি নি!
“আহি” নামটা শুনেই আমি তার দিকে ফিরে তাকালাম।
দেখলাম সে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমাকে দেখে যেন থমকে গেলেন উনি। আমার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আচ্ছা তিনি কি আমায় চিনতে পেরেছেন নাকি চেনার চেষ্টা করছে। আজ প্রায় ২ মাস পর দেখছি তাকে। এই ২ মাসে আমাকে ভুলে যাওয়া টা অস্বাভাবিক কিছু না।
অনুভব করছি হাতে টনটন ব্যাথা করছে। মনে হচ্ছে হাত কিছুটা ছুলে গেছে। একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে একবার আমাকে আর একবার আহিয়ান কে দেখছে। এর মাঝেই দেখলাম পেছনে তার সেই বন্ধু গুলোও আছে। তারাও আমাকে দেখে বেশ অবাক। হঠাৎ আকাশ ভাইয়া আমার কাছে বলেন..
“তুমি নিহা নাহ!
“( আমি মাথা নাড়লাম )
আকাশ ভাইয়া হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন…
“ঠিক আছো তুমি! বেশি ব্যাথা পাও নি তো!
“জ্বি ভাইয়া ঠিক আছি আমি!
“কিন্তু তুমি এখানে..
“আমি এই ভার্সিটিতে বাংলা বিভাগের প্রথম বর্ষের স্টুডেন!
“এই ভার্সিটিতে! How coincidence, আমরাও এখানেই পড়ি তবে আমরা লাস্ট ইয়ারের স্টুডেন।
আমি হেসে তাদের দিকে তাকালাম। আহিয়ান কেমন ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। পেছনে তার দুই বন্ধু তার সাথে দুই মেয়েও আছে। আমাকে দেখে কানাকানি করছে। হয়তো আমার সম্পর্কে’ই বলছে। আমার সামনের মেয়েটা কেমন একটা চাহনির প্রতিফলন দিচ্ছে আমার দিকে। অতঃপর আমি আকাশ ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে বলি..
“ভাইয়া ক্লাস শুরু হয়ে যাবে, আমাকে যেতে হবে।
“সরি নিহা! দোষ টা আমাদের ছিল, এতো জোরে গাড়ি চালানো ঠিক হয় নি। জানি তুমি ব্যাথা পেয়েছ কিন্তু ভদ্রতার খাতিরে বলছো না।
“না ভাইয়া এমন কিছু না আমি একদম ঠিক আছি! আসছি আমি!
বলেই চলে এলাম, দ্রুত ভার্সিটির ওয়াশরুম এ এলাম। হাতের কনুই’র দিকে খুব জ্বলছে। হাত উঠিয়ে দেখলাম বেশ খানিকটা ছিলে গেছে। রক্তও পরছে! আমি পানি দিয়ে রক্ত টা ধুয়ে নিলাম। আমার গায়ে লাল রঙের একটা ওড়না ছিল। তা দিয়ে’ই সেটা ঢেকে নিলাম। কারন আমার কাছে কিছুই নেই!
চলে এলাম ক্লাসরুমে, দেখি ক্লাস অলরেডি শুরু হয়ে গেছে। আমি ম্যামের অনুমতি নিয়ে ক্লাসে ঢুকলাম। অতঃপর শেষ বেঞ্চের দিকে গেলাম। একজন খুব রেগে বসে আছে। রাগের কারনে আমার দিকেও তাকাচ্ছে না। আমি তার পাশে বসে একটা হাসি দিয়ে বললাম..
“কিরে জামাই মেরেছে বুঝি, মুখটা এতো গোমড়া করে রেখেছিস যে!
সে ফিসফিসিয়ে বলল..
“এই ক্লাসটা শেষ হতে দে, তোর ক্লাস নিচ্ছি!
“কেন আজ কি দুলাভাই’র ক্লাস নিতে পারিস নি!
“নিহা কি বাচ্চি তোকে তো আমি!
“কিন্তু প্রেগন্যান্ট তো তুই ছিলি তাই নাহ!
ইতি আর কিছু বললো না চুপ হয়ে গেল। আমার বেশ লাগে ইতি কে জ্বালাতে। ইতি হলো আমার ক্লাসমেট আর বেস্ট ফ্রেন্ড দুটোই। এই ভার্সিটিতে শুধু ওর সাথেই আমার বন্ধুত্ব হয়েছে। সুন্দর, কিউট, ইনোসেন্ট একটা মেয়ে বললে ভুল হবে। ও একদম’ই তেমন না হি হি হি! ওর নামে আবোল তাবোল বলতে আমার বেশ লাগে।
ইতি অনেকক্ষন চুপচাপ বসে বসে ক্লাস করল। ক্লাস শেষ হওয়া মাত্র ইতি হেসে আমার দিকে তাকাল। আমি উঠে দিলাম দৌড়! ইতিও আমার পিছনে দৌড়াচ্ছে। দুজন দৌড়াতে দৌড়াতে ক্যাম্পাসে দিকে চলে গেলাম। আমি একটা গাছের পিছনে একদিক থেকে ওদিকে যাচ্ছি আর ইতি আমাকে ধরার চেষ্টা করছে। একপর্যায়ে ইতি আমার হাত ধরে ফেলল। দুজনেই ধপাস করে বসে পড়লাম ঘাসের উপর। হাপাঁচ্ছিলাম দুজন!
আমি ইতি’র গাল টা টেনে বলি..
“এসময় এতো দৌড়াদৌড়ি করতে নেয় ইতি!
“ওহ্ আচ্ছা!
বলেই ইতি আমার চুল টানল। আমি ওর হাত ধরতে যাবো তখন সে হাসি থামিয়ে আমার হাতটা ধরল। অতঃপর সেই ছিলে যাওয়া অংশ টা দেখে চমকে উঠল। বলল..
“কিরে? এটা হলো কি করে?
“আরে তেমন কিছু না।
“তেমন কিছু না মানে অনেকখানি কেটে গেছে। তুই আমার সাথে চল আমি ঔষধ লাগিয়ে দিচ্ছি।
“কিন্তু!
কিছু বলার আগেই ইতি আমাকে টেনে নিয়ে গেল রেস্ট রুমে। অতঃপর হাতে ঔষধ লাগিয়ে দিল। হালকা কিছু বকাঝকা ও করল। অতঃপর আমাকে টেনে বাইরে নিয়ে এলো। হঠাৎ করেই মাথায় একটা বাড়ি মেরে বলল..
“বাঁদর মেয়ে একটা, যদি আমি না দেখতাম তাহলে কি
হতো জানিস!
“আরে জানি জানি..
“কি এতো জানো!
আমি আর ইতি দুজনেই ধমকে গেলাম। সামনে তাকিয়ে দেখলাম আকাশ ভাইয়া আর আহিয়ান। তিনি বরাবর হাতে একটা ফোন আর কানে হেডফোন দেওয়া। কি জানি দেখছে সে ফোনে। আকাশ ভাইয়া আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। আমি হেসে বলে উঠি…
“কিছু না ভাইয়া!
“ওহ আচ্ছা!
ইতি বলে উঠে..
“তুই চিনিস আকাশ ভাইয়া কে!
আকাশ ভাইয়া বলে উঠে…
“হুম আমরা একে অপরকে চিনি অনেক, আমাদের পরিচয় টা একদম অন্যরকম ছিল। তা ইতি কোথা থেকে এলে তোমরা!
“আসলে নিহা’র হাতে একটু চোট পেয়েছিল সেই জন্য ঔষধ লাগিয়ে নিয়ে এলাম।
“চোট! নিহা তখন তুমি ব্যাথা পেয়েছিলে তাহলে বললে না কেন।
“ভাইয়া এটা তেমন কোন ব্যাথা ছিল না আমি ঠিক আছি।
“কোন ব্যাথা, আর কিসের কথা বলছো তোমরা দুজন!
“তোকে বলছি আয়, আচ্ছা ভাইয়া আমি এখন যাই হুম!
“আচ্ছা যাও। কিন্তু একটা কথা আমার মনে রয়ে গেল।
“কি কথা!
“তোমরা সেই প্রিয় মানুষ! যার জন্য তুমি ঢাকায় এসেছিল। সে..
“আমি তার সাথেই আছি ভাইয়া। আপনি চিন্তা করবেন না।
“তাহলে কি তোমায় পড়াশোনা সে করাচ্ছে!
“জ্বি ভাইয়া!
“যাক তাহলে তো ভালো!
ভাইয়া কার কথা বলছে আমি বেশ বুঝতে পারছি কিন্তু ইতি হয়তো কিছুই বুঝতে পারছে না। সব ওর মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। সে হা করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি হেসে ইতি কে টেনে নিয়ে এলাম। সে তার প্রশ্নের ঝুড়ি নিয়ে বসল। কোথায় দেখা হলো, কিভাবে দেখা হলো, কে সে প্রিয় মানুষ, কার কথা বলছে সব জানার আগ্রহে সে প্রায় অস্থির। অতঃপর আমি আমি ওকে শুধু আধটুকু বলে বললাম..
“বাকি টা কাল শুনাবো। আমার লেট হচ্ছে যেতে হবে!
“কিন্তু..
অতঃপর তার বাকি কথা শোনার প্রয়াস করলাম না। চলে এলাম কারন আমাকে এক্ষুনি পড়াতে যেতে হবে। আর যাদের পড়াবো তাদের বাসা আমার বাসা ক্রস করে যেতে হবে। তাই এখন না গেলে দেরি হয়ে যাবে!
.
বাসায় আসতে আসতে দুপুর গড়িয়ে গেছে। অতঃপর দ্রুত বাসায় গিয়ে একটু রেস্ট নিয়ে খেয়ে নিলাম। তারপর আবার বের হলাম। ৩ টা টিউশনি করি আমি। আরেকটা খোঁজ করছি। পেলে ভালো হবে। তিনজনকে পড়িয়ে বাসায় ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা নেমে যায়। আমার দিনগুলো এখন প্রতিনিয়ত এভাবেই কাটছে।
রিণু, তোহা আর তুহিন এই তিন জনকে পড়াই আমি। তিন জনেই ২০০০ টাকা করে দেয়। মাস শেষে পাই ৬ হাজার টাকা। দাদা আর দাদি আমার থেকে একটু কম ভাড়া রাখেন, তারা খুব ভালো মানুষ। আমার অসুবিধার কথা তারা জানেন। তারা আমার থেকে ৩০০০ টাকার বেশি নেন না। যেখানে মিতু আর মুন্নি আপু ৪ হাজার করে দেয়। এতে মুন্নি আপু বেশ রাগ। কারন আমি তাঁদের থেকে কম টাকা দেই। এটা তিনি মেনে নিতে রাজি নন।
বাড়ি ভাড়া দেবার পর বাকি টাকা ভার্সিটির বেতন আর নিজের খাওয়া দাওয়ার জন্য রাখতে হয়। দেখতে দেখতে চলে এলাম রিনু’র বাসায়। সে ক্লাস ফোরের ছাত্রী। তার মা বেশ রাগী টাইপের একজন মানুষ। আমি যখন আসি তখন’ই তিনি ঘড়ি দেখেন। মানে সময় হিসেব করেন যে আমি এক ঘন্টা পড়াই কি না। আবার ১০ মিনিট পর পর এসে একবার রুমের বাইরে এসে ঘুরে যান। ব্যাপার টা কেমন অদ্ভুত তাই না। হ্যাঁ আমার কাছে অদ্ভুত কিন্তু তার কাছে না। তার ধারনা তিনি আমাকে যথেষ্ট বেতন দেন। এরপরও কি আমি তার বাচ্চা কে পড়ানোর ক্ষেত্রে চোরামি করি কি না তিনি সেটা খেয়াল করেন।
তাকে পড়িয়ে পড়াতে যাই তোহা কে। তার মা আবার আরেক বিচিত্র মানুষ। তার মেয়েকে পড়ানোর বিষয়ে সে এতো মনোযোগ দেয় না অন্য সবার মতো। কিন্তু তোহা কে পড়ানোর পর টানা ১০ মিনিট তার সাথে বসে গল্প করতে হয়। যদিও আমি মানা করি তবুও সে মানতে চায় না। হাত ধরে তার পাশে বসিয়ে গল্প করতে শুরু করে। এর কারন ও আছে বটে, সেটা হলো তিনি প্রেগন্যান্ট! আর বাসায় মানুষ বলতে তিনি আর তার মেয়ে। বলতে গেলে নিজের একাকিত্ব টা কাটানোর জন্য’ই আমাকে নিয়ে গল্প করতে বসে পড়ে। তার সাথে চানাচুর, বিস্কুট আর এক কাপ চা। ব্যস আমাকে বসিয়ে বসিয়ে গল্প করা শুরু করে দেন।
অতঃপর বিকালের শেষ ভাগে পড়াতে যাই তুহিন কে। তুহিন সবচেয়ে দুষ্টু আর বেশ ছোট। ছোট বলেই দুষ্টুমি বেশি তার। তার মা আমার আরেক দুই স্টুডেনের মা থেকে আলাদা। আমি এলেই তিনি তুহিনের নামে একগাদা বিচার নিয়ে বসবে। বলবে..
“সারাদিন শুধু খেলাধুলা আর টিভি দেখা। একটু বই টা ছুঁয়েও দেখা না ম্যাম। আপনি আজ একটু বেশি করে বকে দেবেন ওকে।
তার কথায় আমি মাথা নাড়াই। অতঃপর সে চলে যাবার পর আমার স্টুডেন বলতে শুরু করে…
“ম্যাম আম্মু শুধু শুধু সব কিছু বানিয়ে বলছে। আমি আপনার সব পড়া পড়েছি।
“তাই নাকি। তাহলে তোমার আম্মু বিচার দিলো কেন?
“কি জানি। মনে হচ্ছে আম্মু কে চকলেট দিতে হবে। তাহলে আর বলবে না।
“ঘুস দেবে তুমি!
“এটাকে বুঝি ঘুস বলে।
“তোমাকে কেউ এমন ভাবে চকলেট দেয় বুঝি।
“হ্যাঁ আব্বু দেয়।
“কিহহ?
“হ্যাঁ তো সেদিন খাবার টেবিলে আব্বু তরকারি ফেলে দেয়। আমি সেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখতে থাকি। আব্বু আমাকে দেখতে পেয়ে আদর করে বলে “তোমাকে কাল দুটো চকলেটের প্যাকেট দেবো। তুমি আম্মু কে কিছু বলো না ঠিক আছে!
“তা তুমি কি করলে!
“আমি খুব ভালো ছেলে, সবার কথা শুনি। তাই আম্মু কে কিছু বলেনি। এখন মনে হচ্ছে আব্বু কে বলতে হবে আরো ২ টো চকলেটের প্যাকেট বেশি আনতে যাতে আম্মু কে দিতে পারি। তাহলে আম্মু আর তোমাকে কিচ্ছু বলবে না। ভালো বুদ্ধি না বলো।
“হুম খুব ভালো বুদ্ধি এখন নাও পড়তে বসো!
বলেই আমি ফিক করে হেসে দিলাম। সে খানিকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইল। অতঃপর পড়তে লাগল। হয়ত ভাবছে আমি কেন হাসলাম। কিন্তু ও”তো আর জানে না প্রতিদিন এমন বিচিত্র মানুষের কান্ড দেখে আমি অবাক। কতোটা বিচিত্র এই মানুষ প্রকৃতি!
#চলবে….
#ভালোবাসার_ফোড়ন_২
#মিমি_মুসকান
#পর্ব_৫
রাতের আকাশের তাঁরা দেখতে বেশ চমৎকার লাগে। কিছু কিছু তাঁরা বেশ উজ্জ্বল দেখায় আর তাদের মাঝে থাকা চাঁদ টা যেন আকাশের পরিপূর্ণ একটা অংশ। তাঁরা সম্পর্কে আমার বিশেষ জ্ঞান নেই থাকার কথাও না। জানালা দিয়ে তাঁরা দেখছি আর মাঝে মাঝে ঘরে উঁকি দিচ্ছি। মিতু আপু রান্না করছে আর মুন্নি আপু ফোনে কিসব ঘাটছে। তার কানেও হেডফোন। এসব দেখে আহিয়ান’র কথা হুট করে মনে পড়ল। মুন্নি আপু আর তিনি একরকম। আচ্ছা তারা দুজনে সারাদিন কি দেখে ফোনে।
মিতু আপু রান্না শেষ করে উড়না দিয়ে হাত মুছতে মুছতে রান্না ঘর থেকে বের হলো। আমাকে দেখে হেসে বলেন..
“কি রে পড়া শেষ!
আমি হেসে মাথা নাড়লাম। আপু বলে..
“তাহলে চল ছাদে যাই যাবি!
“এক পায়ে রাজি চলো।
“মুন্নি তুই যাবি!
( মুন্নি আপু মাথা নেড়ে না বললো)
অতঃপর আমি আর মিতু আপু এটাই গেলাম ছাদে। রাতে ছাদে বসে থাকার মজাই আলাদা। দুজনেই ছাদে এলাম। রাতের অন্ধকারে ছাদের বর্ণনা দেওয়ার মতো কিছু নেই। শুধু ছাদের দরজার সামনে মাথার উপর একটা লাল লাইট জ্বলছে এই! এছাড়া একটা দোলনা আছে ছাদের এককোনে। এটা বেশ পুরোনো। তবে ছাদে একটা দোলনা বেশ অবাক করেছিলো প্রথমে আমায়। পরে দাদি থেকে জানলাম এটা নাকি দাদু তার জন্য এনেছিল। দুজনেই মাঝে মাঝে রাতে এসে এই দোলনায় বসত। এমন ভালোবাসা দেখতে ভালোও লাগে।
আমি আর মিতু আপু ছাদের এক পাশে গ্রিলের উপর বসলাম। এসবে আমার তেমন ভয় টয় নেই। কারন রাতের বেলা গাছে উঠে পেয়ারা চুরির অভিযোগে আছে আমার নামে। আর এটা সত্যি!
মিতু আপু দেখতে ভারি মিষ্টি আর সুন্দরী। আমার দেখা সেরা সুন্দরীর মধ্যে তিনি একজন। তবে মুন্নি আপুও সুন্দরী। কিন্তু মিতু আপুর চেহারা একটা মায়া আছে যা মুন্নি আপু’র মুখে তেমন একটা দেখা যায় না। মিতু আপু আকাশের দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে। আমি তাকে খোঁচা দিয়ে বলি..
“ব্যাপার কি একটু বেশি হাসছো যে আজকাল!
“হাসতে বুঝি কারন লাগে।
“অবশ্যই লাগে আর এরকম হাসির পিছনে কারন টা অনেক রহস্যময় লাগছে।
“কি রহস্যময় শুনি!
“রহস্য খোলাসা তো তুমি করবে।
“থাকলে তো করবো!
“আছে আছে! জলদি বলো ছেলেটা কে?
“দিন দিন পেকে যাচ্ছিস!
আমি দাঁত বের করে হেসে বলি…
“এখন তো পাকার বয়স তাই না।
“দেবে একটা। বড়দের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় ভুলে গেলি নাকি।
“আরে এতো লুকিচুরি কিসের। বলে দাও। আমাকে বলবে না তো কাকে বলবে।
“হ্যাঁ এটাও ঠিক। তোকে না তো কাকে বলবে। মুন্নি তো আমার সাথে ঠিক মতো কথাও বলে না আর না ওকে কিছু বলে শান্তি পাই।
“তাহলে দেখা হলো কবে হুমম!
“প্রতিদিন’ই হয়। আমাদের অফিসে’ই চাকরি করে।
“ভালো টা প্রথম কে বাসল শুনি।
“সেই বললো।
“নামটা কি বলো!
“জহির!
“ওহ আচ্ছা মিতু আর জহির! খারাপ না!
“বেশি বলছিস। তিনি আমার সিনিয়র!
“ওহ আচ্ছা তাহলে এই ব্যাপার!
বলেই মুখ টিপে হাসলাম।
আপু মুখ ভেংচি দিয়ে বলল..
“যা তোকে আর বলবো না।
“এই না না আপি বলো না। কি হলো?
“কি হবে?
“মানে সে বলার পর তুমি কি বললে।
“কিছুই না!
“কিছুই না.. যাহ এটা কোন কথা বললে।
“কেন?
“ভালো তো তুমিই বাসো তাহলে বললে না কেন!
“তুই কখনো কাউকে ভালো বেসেছিস!
“হ্যাঁ বেসেছি না! বাবা কে, আম্মু কে তোমাকে ইতি কে!
আমার মাথায় একটা টোকা মেরে..
“আমি এই ভালোবাসার কথা বলছি না।
“তাহলে..
অতঃপর আমার মুখ থেকে একটা নিচে হাত রেখে বলল..
“এখানকার ভালোবাসার কথা বলছি।
“কেন এই ভালোবাসা ছাড়া বুঝি চলা যায় না।
“যাই না কে বললো। তবে এখানে একজন মানুষ থাকলে জীবন চলার পথ টা খুব সহজ হয়!
“তাহলে আমি কঠিন পথেই বাঁচতে চাই আপু। এসব আমার ভাগ্যে নেই।
“ভাগ্য কি আছে সেটা না আমি জানি আর না তুই।
অতঃপর আমার থিতুনি তে হাত রেখে বলে..
“দেখবি তোর মতো এমন একটা মিষ্টি মেয়ের জীবনে এমন একজন মানুষ আসবে যে তোর সব কষ্ট ভুলে দেবে। খুব ভালো বাসবে তোকে।
আপুর কথায় একটা উপহাসের হাসি হেসে বলি…
“তুমি কথা ঘুরাচ্ছো আপি। তোমার কথা বলো না। কিছু বললে না কেন?
“একটু পরিক্ষা করছি।
“ভালোবাসলে বুঝি পরিক্ষা করা লাগে।
“হুম লাগে। স্বর্ণ কে যাচাই না করে তো আর পড়তে পারি না বল।
“তা কতোদিন যাচাই করবে শুনি!
“দেখি কতোদিন করা যায়। কিন্তু তুই দেখিস তোর জীবনে যেই মানুষটি আসবে সে তোর জন্য একদম পারফেক্ট হবে।
“তুমি একথা কেন বলছো।
“কারন তুই খুব মিষ্টি একটা মেয়ে, আর কপালে ভালো কিছুই থাকবে!
আপুর কথায় আকাশের দিকে তাকালাম। মনে মনে বললাম..
” আর ভালো। আমার জীবনে আমি যা কষ্ট দেখেছি এরপর আর কি যে দেখবো সেটাই ভাবছি। পরে কি যে হতে চলছে তার সম্পর্কে আমার কোন ধারনা নেই তবে সেটা যদি আগের থেকেও আরো খারাপ হয় তখন! তখন আমি একদম নিঃস্ব হয়ে যাবো। শেষ হয়ে যাবে এই দেহ, আমার স্বপ্ন, অতীত, আমার অস্তিত্ব! ভবিষ্যতে কি চলছে তা কেউই জানে না তবে কিছু মানুষ তা আঁচ করতে পারে সেটা কি হবে ভালো না মন্দ। আমিও আঁচ করতে পারছি আমার ভবিষ্যত কিছু হতে চলছে আর তা হবে অনেক ভয়ানক! খুব ভয়ানক…
.
সকালে খাওয়া দাওয়া করে তৈরি হয়ে ভার্সিটির জন্য রওনা দিলাম। অতঃপর পৌঁছে ইতি কে খুঁজতে লাগলাম। ম্যাডাম গাছের নিচে বসে হাতের কলম মুখে দিয়ে মাথা চুলকাচ্ছে। আমি ওর ঘাড়ে একটা টোকা দিয়ে সামনে বসে বলি..
“কিরে বিজ্ঞানি নিউটন হবার শখ নাকি যে গাছের নিচে বসেছিস, যদি আপেল মাথায় পড়ে তা নিয়ে কি আবার নতুন করে গবেষণা করবি!
“গাধি এটা কি আপেল গাছ নাকি!
“না তবে ডাব গাছ হলে সেই হতো!
ইতি আমার গাল টেনে বলল..
“হ্যাঁ তুই ছাড়া আমার অমঙ্গল আর কে চাইবে বল। হারামি একটা!
“হারামজাদি হবে! হি হি হি..
“আসলেই। আচ্ছা এখন বল! সেদিন তো আর্ধেক বলে চলে গেলি এরপর কি হলো!
“হাম শোন…( অতঃপর বাকি টুকু বললাম )
সব কথা শোনার পর ইতি’র চোখ চড়াকগাছ। সে বড় বড় চোখ করে আমার দিকে তাকিয়ে বলল..
“কি বলছিস! ট্রেনের ছেলে গুলো আহিয়ান ভাইয়া আর তার বন্ধুরা ছিল।
“হুম হুম। বর্তমান পরিস্থিতি সেটাই তো বলছে
“আচ্ছা সত্যি কি তোর কোন প্রেমিক ছিল নাকি!
“কি বললাম তোকে এতোক্ষণ! আমি মিথ্যে বলেছি, আসলে ভয় পেয়েছিলাম। কিন্তু বলতে গেলে আকাশ ভাইয়া খুব ভালো মানুষ!
“হুম তা তো বটে!
“তুই এতো লজ্জা কেন পাচ্ছিস আবার
“কিছু না এমনেই!
বলতে বলতে হঠাৎ ইতি আমাকে ইশারা করে পেছনে দেখতে বলল। দেখলাম আহিয়ান আর তার বন্ধুরা আমাদের থেকে দূরে গোল হয়ে বসে গল্প করছে। আমি দেখছি একটা মেয়ে আহিয়ান’র গা ঘেঁষে বসে আছে। কিছুক্ষণ পর আবার তার ঘাড়ে মাথা রাখল। হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে এটা উনার প্রেমিকা। এর মাঝে ইতি মুখের ভাব ভঙ্গি পরিবর্তন করে বলল…
“ঢং!
“কে আবার ঢং করছে,কার ঢং!
“ওই যে নিতি দেখছিস না কিভাবে ঘেঁষে বসে আছে, আর ওই টিনা কে দেখছিস না আকাশের কতোটা কাছে। পারলে তার বুকের মাঝেই ঢুকে যায়!
আমি একবার এদিক মুখ করে আবার ইতি’র দিকে মুখ করে বলি..
“হ্যাঁ দেখালাম কিন্তু তাতে তুই এতো রেগে যাচ্ছিস কেন? প্রেমিকা আর প্রেমিকের ঘাড়ে মাথা রেখেছে এতে তোর এতো জ্বলছে কেন সেটাই বুঝছি না।
ইতি আমার কথা শুনে চুপ হয়ে গেল। অতঃপর আচমকা জোরে হেসে বলল..
“কি বললি তুই, প্রেমিক প্রেমিকা! হা হা!
“এতো হাসার কি হলো?
“এটা কখনো সম্ভব না। আহিয়ান ভাইয়া আর আকাশ পিউর সিংগেল এটা পুরো ভার্সিটি জানে।
“তো কি আমি তো আর জানি না!
“আচ্ছা শোন আমি তোকে বলছি। ওই যে দেখছিস..
“কে নাহান ভাইয়া!
“হ্যাঁ তার আনাফ ভাইয়ার মাঝে বসা মেয়েটা আনিকা। ছোট খাটো মেয়ে তাই সবার আদরের। আহিয়ান ভাইয়া তো ছোট বোনের মতো আদর করে।
“তার বুঝি বোন নেই।
“আছে, বড় এক বোন আছে আয়ানা। শুনেছি সে বিবাহিত আর একটা বাচ্চা ও আছে।
“এতো খবর জানলি কিভাবে?
“এই শহরের এমন কেউ নেই যে তাদের চিনে না। তার বাবা এই শহরের খুব বড় একজন বিজনেসম্যান! কবীর চৌধুরী! তার বড় মেয়ে আয়ানা আর ছোট ছেলে আহিয়ান। শুনেছি আয়ানা নাকি পড়াশোনা শেষ করে বাবার অফিসে তাকে সাহায্য করছে।
“মা নেই!
“আছে তো। আর আকাশের পাশে থাকা মেয়েটা ( বলার সময় দাঁতে দাঁত চাপল। মনে হচ্ছে প্রচুর রাগ আছে মেয়েটার উপর ) টিনা!
“ওহ আচ্ছা! আর আহিয়ান ভাইয়ের পাশের মেয়ে..
“নিতি, তাই তো!
“তুই জানলি কিভাবে?
“নাম শুনেছি আমি।
“হুম এখন শুনে রাখ, নিতি আপু আহিয়ান ভাইয়া কে অনেক ভালোবাসে। যদি তারা ৩ জন’ই ভাইয়ার জুনিয়র তবে আমাদের সিনিয়র। মানে তৃতীয় বর্ষের স্টুডেন। আহিয়ান ভাইয়ার দিকে কোন মেয়ে তাকালে তিনি সহ্য করতে পারেন না। যদিও তিনি খুব বড়লোক।
“তাহলে বলছিস আহিয়ান তাকে ভালোবাসে না।
“না!
“কেন?
“তিনি কোনের মেয়ের দিকেই তাকান না। একদম চুপচাপ একজন লোক। তবে জানিস তিনি কিন্তু ভার্সিটির ফার্স্ট বয়। খুব মেধাবী।
“আচ্ছা নিতি আপুর চেয়েও তো সিনিয়র মেয়ে আছে। তারা যদি কখনো আহিয়ান কে প্রপোজ করে..
“করে না বল অলরেডি করে ফেলেছে। আর তখন নিতি! বাপরে বাপ যা করলো মেয়েটার সাথে। মেয়েটার মুখে পানি ছুঁড়ে মারল। অতঃপর চুলের মুঠি ধরে সবার সামনে অপমান করল। তবে এটা একবার না অনেকবার। শুধু বাপের টাকা আছে বলে বার বার বেঁচে যায়।
“আহিয়ান সব দেখল কিছু বললো না!
“আহিয়ান দেখবে কিভাবে, সে থাকতে কি করে নাকি এসব। আহিয়ান চলে গেলে সে এসব করে!
“বাহ মেয়েটার তো বেশ বুদ্ধি!
“বুদ্ধি না বল কু”বুদ্ধি!
“তাতে আমাদের কি! চল ক্লাসে যাই। কিন্তু একটা কথা..
“আবার কি?
“আমি তো এখানে আজ দু মাস পড়ছি। এতোদিন চোখে পড়ল না কেন?
“তারা ট্রিপ এ গিয়েছিল। আবার শুনেছি এর মাঝে নাকি তার বোনের ছেলে অসুস্থ ছিল। সেজন্য আহিয়ান আসে নি। আর সে আসেনি বলে তার কোন বন্ধুও আসে নি।
“অনেক জোড়ালো বন্ধুত্ব দেখছি!.
“হুম তাই। চল এখন..
অতঃপর দুজনেই উঠলাম। ক্লাস এ গিয়ে ক্লাস করতে লাগলাম। অতঃপর ক্লাস শেষ হলে দু’জনেই একসাথে বের হলাম। সিঁড়ি দিয়ে নামতে যাবো তখন হুট করে কেউ আমাকে পিছন থেকে কেউ আমার ঘাড়ে হাত রাখল। আমি পিছনে ফিরে তাকে দেখে বেশ অবাক হলাম। ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম..
#চলবে….